১৯৬১ সালের ৪ জুন। সোভিয়েত প্রেসিডেন্ট নিকিতা ক্রুশ্চেভের বিগত এক ঘোষণার পুনঃপ্রকাশকে কেন্দ্র করে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে বিশ্ব রাজনীতিতে। উত্তেজনা তৈরি হয়েছে যুক্তরাষ্ট্র এবং সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যে। কী সেই ঘোষণা? বার্লিনকে ঘিরে যে চার-শক্তি সংকট (সোভিয়েত ইউনিয়ন, ফ্রান্স, আমেরিকা ও ব্রিটেন) সৃষ্টি হয়েছে, তার সমাধানকল্পে পূর্ব জার্মানির সাথে পৃথক শান্তি চুক্তি সই করতে হবে। চুক্তি সইয়ের জন্য ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত সময়ও বেঁধে দেন ক্রুশ্চেভ! এই চুক্তি সই করলে, বিদ্যমান চার দেশের সমঝোতা চুক্তি বাতিল হয়ে যেত, এবং আমেরিকা, ফ্রান্স ও ব্রিটেনের পশ্চিম জার্মানিতে প্রবেশও বন্ধ হয়ে যেত। ফলে যুক্তরাষ্ট্র সহ অন্য দুই মিত্র সাফ জানিয়ে দিল, তারা এই চুক্তি সই করবে না! শুরু হলো নতুন সংকট, যার নাম বার্লিন সংকট।

জেনারেল লুসিয়াস ক্লে; source: rarehistoricalphotos.com

১৯৬১ সালের ২৫ অক্টোবর। পূর্ব বার্লিন আর পশ্চিম বার্লিনের সীমানা তথা বার্লিন দেয়ালের আশেপাশে পূর্ব বার্লিন পুলিশের সাঁজোয়া উপস্থিতি। এই উপস্থিতি দেখে ক্রুব্ধ হলেন পশ্চিম জার্মানিতে অবস্থানরত মার্কিন সেনানায়ক জেনারেল লুসিয়াস ডি ক্লে। কারণ তার সশস্ত্র বহরের জন্য এই পুলিশ প্রহরীরা বাঁধা সৃষ্টি করেছে। তিনি তৎক্ষণাৎ ফোন করলেন সোভিয়েত স্টেট ডিপার্টমেন্টে এবং জানিয়ে দিলেন নিজেদের অসন্তুষ্টির কথা। কিন্তু সোভিয়েত সেনানায়ক সলোভেভ বরং উল্টো ধমক দিয়ে দিলেন! তিনি সাফ জানিয়ে দিলেন, যথাযথ কাগজপত্র এবং পরিচয়পত্র দেখাতে না পারলে কোনো মার্কিন সৈন্যকেই সীমানা পার হতে দেয়া হবে না। বরং মার্কিনীদের পরিচয়পত্র ছাড়া পূর্ব জার্মানিতে প্রবেশের এই প্রচেষ্টাকে তিনি ‘সরাসরি উসকানি’ বলে মন্তব্য করেন!

চেকপয়েন্ট চার্লিতে সোভিয়েত-মার্কিন ট্যাংকের মুখোমুখি অবস্থান; source: rarehistoricalphotos.com

অবস্থার আরো অবনতি ঘটাতেই যেন দু’দিন পর, ২৭ অক্টোবর পূর্ব বার্লিনে প্রবেশের চেষ্টা করেন মার্কিন দূত হেমসিং। তিনি দ্রুত পশ্চিম বার্লিনে ফিরে আসলেও সোভিয়েতদের ততক্ষণে যথেষ্ট বিরক্ত করে ফেলেছেন! সলোভেভের আদেশে, ৩৩টি সোভিয়েত ট্যাঙ্কের এক বিশাল বহর ব্রান্ডেনবার্গ গেইটের সামনে অবস্থান নেয়। এর মধ্যে ১০টি আরো সামনে অগ্রসর হয়ে, বার্লিন দেয়ালের মাত্র ৫০ থেকে ১০০ মিটারের মধ্যে অবস্থান নেয়। অবস্থা যখন এই, তাহলে আর দূরে বসে থাকা চলে না। ক্লের আদেশে এবার সমসংখ্যক মার্কিন ট্যাংক, পশ্চিম জার্মানির ভেতরে সীমান্ত থেকে সমান দূরত্বে অবস্থান নিল! এই স্থানটির নাম দেয়া হলো ‘চেকপয়েন্ট চার্লি’। বাঘে-সিংহে সামনাসামনি অবস্থান, আক্রমণ করবার মতো শক্তিশালী থাবা নিয়ে উভয়েই প্রস্তুত!

২৭ অক্টোবর সন্ধ্যায় মার্কিন বিমানবাহিনী এবং পশ্চিম জার্মানিতে অবস্থিত সকল সামরিক কর্মকর্তার নিকট বিশেষ সতর্ক সংকেত পাঠানো হলো। যেকোনো মুহূর্তে আক্রমণ করতে পারে সোভিয়েত বাহিনী! কারণ মুখোমুখি অবস্থান যে এটাই প্রথম! তবে লুসিয়াস ক্লের উত্তেজনা প্রশমন করতে তার সাথে যোগাযোগ করলেন স্টেট সেক্রেটারি ডিন রাস্ক। তিনি সাফ জানিয়ে দিলেন, “পূর্ব জার্মানি আমাদের জন্য এতটাও জরুরী নয় যে এর জন্য কোনোরূপ যুদ্ধে জড়াতে হবে! মাথা ঠাণ্ডা রেখে কাজ করাই শ্রেয়।”

বার্লিন দেয়াল এবং বার্লিন সংকট নিয়ে বক্তৃতা দিচ্ছেন আমেরিকান প্রেসিডেন্ট কেনেডি; source: rawstory.com

এরই মাঝে কেজিবি গোয়েন্দা জর্জি বলশেকভ, দুই পক্ষের মধ্যে যোগাযোগ স্থাপনের তৎপরতা শুরু করে দিয়েছেন। তিনি ভালোমতোই অনুধাবন করতে পারছিলেন যে, সামান্য ব্যাপারে উত্তেজনা বাড়তে দিলে তা একসময় বড় ঘটনায় পরিণত হতে পারে। তিনি কেনেডি এবং ক্রুশ্চেভ উভয়কে বোঝাতে সক্ষম হলেন যে, খামোখা উত্তেজনা বাড়িয়ে লাভ নেই। তার তৎপরতায় দুই প্রেসিডেন্ট ট্যাংক সরিয়ে নিতে রাজি হয়ে গেলেন। উভয় প্রেসিডেন্টের নির্দেশনা পৌঁছে গেল সীমান্তে। প্রথমে, একটি সোভিয়েত ট্যাংক পেছনে সরতে শুরু করলো এবং ৫ মিটার পেছনে গিয়ে মার্কিন প্রতিক্রিয়ার জন্য থামলো। এবার একটি মার্কিন ট্যাংকও পিছিয়ে যেতে শুরু করলো, আর তারপর একে একে সরে গেল সবগুলো ট্যাংক। শেষ হলো দুইদিনের মুখোমুখি অবস্থান এবং উত্তেজনাময় বার্লিন সংকট।

 “দেয়াল কোনো ভালো সমাধান নয়। তবে যুদ্ধের চেয়ে এটি শতগুণ ভালো সমাধান!”

– প্রেসিডেন্ট জন এফ কেনেডি

বার্লিন সংকটের প্রেক্ষাপট ইতিহাসের অনেক গভীরে প্রোথিত। ইতিহাসের ধারা যেন ইচ্ছা করেই এই সংকটের দিকে ধাবিত হয়েছে! সংকটের কারণ আলোচনা করতে গেলে শুরু করতে হবে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ থেকে। তবে আলোচনা দীর্ঘ না করতে, প্রধান রাজনৈতিক ঘটনাবলী সংক্ষেপে তুলে ধরা হবে।

সোভিয়েত ইউনিয়নের পূর্ব ইউরোপ দখল সংক্রান্ত একটি কার্টুন; source: euromaidanpress.com

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষে সোভিয়েত ইউনিয়ন পূর্ব ইউরোপের অধিকাংশ দেশ দখল করে নেয়। নাৎসিদের সাথে গোপন ‘মলটোভ-রিবেনপোর্ট প্যাক্ট’ এর কল্যাণে এই দেশগুলো দখল করে সোভিয়েত ইউনিয়ন। এসব দেশে নিজেদের মদদপুষ্ট কমিউনিস্ট সরকার প্রতিষ্ঠা করে তারা। তবে অসংখ্য স্বধীনতাকামী মানুষ এ সময় ‘ইস্টার্ন ব্লক’(সোভিয়েত দখলকৃত রাষ্ট্রগুলো) ছেড়ে পশ্চিমা দেশগুলোতে শরণার্থী হয়। বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী ১০ বছরেই শরণার্থীর সংখ্যা দেড় কোটি ছাড়ায়! পশ্চিমা দেশগুলোও সোভিয়েত বিরোধী মনোভাব তৈরি করতে সাদরে গ্রহণ করে এই দেশত্যাগী মানুষগুলোকে। তবে, এই মানুষগুলোর একটা বিরাট সংখ্যাই যুক্তরাষ্ট্রের দখলকৃত পশ্চিম জার্মানিতে রাজনৈতিক আশ্রয়ে থেকে যায়।

পূর্ব ব্লকের সোভিয়েত দখলকৃত রাষ্ট্রগুলো, বিশেষ করে পূর্ব জার্মানির সাথে পশ্চিম ব্লকের সীমান্ত অঞ্চলগুলো ছিল প্রায় উন্মুক্ত। ফলে ব্যাপক পরিমাণ নাগরিকের দেশত্যাগ, দেশে একটি বিশৃঙ্খল অবস্থার সৃষ্টি করে, যার পরিপ্রেক্ষিতে সোভিয়েত বিরোধী আন্দোলন শুরুর একটা লক্ষণ দেখা যায়। এই সমস্যার সমাধানের জন্য সোভিয়েত ইউনিয়ন দ্রুত, পূর্ব জার্মানির সীমান্তগুলো বন্ধের ব্যবস্থা গ্রহণ করে। ১৯৫৬ সালে পূর্ব-পশ্চিম জার্মানির মধ্যকার সব ধরনের ভ্রমণ বন্ধ ঘোষণা করা হয়।

বার্লিন আল্টিমেটাম পাঠ করছেন সোভিয়েত প্রেসিডেন্ট নিকিতা ক্রুশ্চেভ; source: sutori.com

এদিকে, ১৯৫৮ সালের নভেম্বরে হঠাৎ করেই সংকট ঘনীভূত হতে শুরু করলো। সোভিয়েত প্রেসিডেন্ট নিকিতা ক্রুশ্চেভ পশ্চিমা রাষ্ট্রগুলোকে পশ্চিম বার্লিন ত্যাগ করার জন্য ৬ মাসের আল্টিমেটাম দিয়ে বসলেন। তিনি পশ্চিম বার্লিনকে একটি বেসামরিক শহর করার প্রস্তাব দিলেন। পশ্চিমা রাষ্ট্রগুলোর সামরিক বাহিনী চলে যাওয়ার পর, পূর্ব জার্মানির হাতে ক্ষমতা বুঝিয়ে দিয়ে সোভিয়েতরাও চলে যাবে বলে ঘোষণা দেন। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স এবং ব্রিটেন একযোগে এই আল্টিমেটাম মানতে অস্বীকৃতি জানায়। তারা দ্রুত সময়ের মধ্যে, যেকোনো সোভিয়েত সামরিক আগ্রাসন থেকে পশ্চিম বার্লিনকে রক্ষার্থে, একটি সামরিক সংগঠন তৈরি করে যার নাম দেয়া হয়, ‘লাইভ ওএকে’।

চার দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের ৩ মাসব্যাপী কূটনৈতিক আলোচনার পর, ১৯৫৯ সালের মে মাসে সোভিয়েত ইউনিয়ন আল্টিমেটাম তুলে নেয়। এই সংকট সাময়িকভাবে প্রশমিত হলেও, পূর্ব জার্মানদের পশ্চিম জার্মানিতে চলে যাওয়া অব্যাহত ছিল। তবে এবার রুট পরিবর্তন হলো। অন্যান্য সীমান্ত অঞ্চল বন্ধ হলেও, পূর্ব বার্লিন এবং পশ্চিম বার্লিন সীমান্তে চার দেশের সৈন্যদের উপস্থিতির জন্য কিছুতেই তা পুরোপুরি বন্ধ করা সম্ভব হচ্ছিল না। আর এই সীমান্তই হয়ে ওঠে দেশত্যাগের একমাত্র উপায়।

চেকপয়েন্ট চার্লিতে সোভিয়েত ট্যাংক; source: commons.wikimedia.org

১৯৬১ সালের মধ্যে, ৪৫ লাখেরও বেশি মানুষ পূর্ব জার্মানি ত্যাগ করে, যা কিনা পূর্ব জার্মানির মোট জনসংখ্যার ২০ ভাগ! ব্যাপক পরিমাণ দক্ষ শ্রমিক থেকে শুরু করে শিক্ষক, রাজনীতিবিদ, ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার আর আইনজীবীদের দেশত্যাগের ফলে, পূর্ব জার্মানির অর্থনীতিতে বড় ধরনের বিপর্যয় অবশ্যম্ভাবী হয়ে যায়। এমতাবস্থায় কোনো কঠিন সিদ্ধান্ত নেয়া ছাড়া উপায় ছিল না সোভিয়েত ইউনিয়ন এবং পূর্ব জার্মানির কাছে।

 “আমাদের কারোরই দেয়াল নির্মাণের কোনো ইচ্ছা নেই।” – ১৯৬১ সালের ১৫ জুন, পূর্ব জার্মানির কমিউনিস্ট পার্টির সেক্রেটারি        উলব্রিশট

১৯৬১ সালের শুরুর দিক থেকে, দুই বার্লিনের সীমান্তে একটি দেয়াল তৈরির পরিকল্পনা করতে থাকে সোভিয়েত ইউনিয়ন এবং পূর্ব জার্মানি। তবে, এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে বিরূপ প্রতিক্রিয়া হতে পারে ভেবে প্রাথমিকভাবে তা প্রকাশ্যে আনা হয়নি। আগস্টের মধ্যে পশ্চিম জার্মানি এবং পশ্চিমা রাষ্ট্রগুলোর কাছে দেয়াল তৈরির সম্ভাব্য খবর পৌঁছে যায়। যুক্তরাষ্ট্র,  ফ্রান্স এবং ব্রিটেনের মধ্যে শুরু হয় আলোচনা। এই আলোচনার মাঝেই ১২ আগস্ট বার্লিন দেয়াল বিষয়ক এক চুক্তি স্বাক্ষর করেন এবং দেয়াল নির্মাণ শুরুর আদেশ দেন পূর্ব জার্মানির কমিউনিস্ট পার্টির নেতা উলব্রিশট।

চলছে বার্লিন দেয়াল নির্মাণের কাজ; source: commons.wikimedia.org

এদিকে জুন মাসে সোভিয়েত প্রেসিডেন্ট ক্রুশ্চেভ পুনরায় আল্টিমেটাম ঘোষণা করায় সংকট বাড়তে থাকে। এরই মাঝে জুলাই মাসের ২৫ তারিখ কেনেডি জাতির উদ্দেশ্যে ভাষণে, “যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধ চায় না, তবে হার মানতেও নারাজ!” বলে ঘোষণা দেন। পাশাপাশি পশ্চিম জার্মানিতে ৩.২৫ বিলিয়ন সামরিক ব্যয়, ছয়টি নতুন পদাতিক ডিভিশন এবং দুটি মেরিন ডিভিশন স্থাপনের ঘোষণা দেন। ঘোষণা করা হয় পশ্চিম জার্মানিতে সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধিরও। চলমান সামরিক উত্তেজনার প্রেক্ষিতে পদাতিক এবং নৌবাহিনী সহ পশ্চিম জার্মানিতে যুক্তরাষ্ট্রের সৈন্যসংখ্যা বৃদ্ধি করা হয়।

১৩ আগস্ট শুরু হয় ঐতিহাসিক বার্লিন দেয়াল নির্মাণের কাজ। ৩২ হাজার পূর্ব জার্মান সৈন্য (প্রকৌশলী এবং কমব্যাট সৈন্য) এই দেয়াল নির্মাণে অংশ নেয়। পশ্চিম জার্মানির যেকোনো ধরনের হস্তক্ষেপ রুখতে উপস্থিত ছিল সোভিয়েত সৈন্যরাও। ১৫৫ কিলোমিটার দীর্ঘ দেয়াল, ১০৫.৫ কিলোমিটার যানবাহনরোধী পরিখা, ৩০২টি ওয়াচ টাওয়ার এবং ২০টি বাংকার বিশিষ্ট ৩.৬ মিটার উচ্চতার এই দেয়ালের মূল অংশ তৈরির কাজ শেষ হয়ে যায় ১৫ আগস্টেই।

বার্লিন দেয়ালের ম্যাপ; source: Pinterest

২৩ আগস্ট, সকল পশ্চিম জার্মানদের পূর্ব জার্মানিতে প্রবেশ নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়। এর প্রাথমিক প্রতিক্রিয়ায় ৩০ আগস্ট থেকে, বার্লিন দেয়াল সংলগ্ন পশ্চিম বার্লিন অঞ্চলে ১ লক্ষ ৪৮ হাজার প্রহরী নিয়োগ করেন প্রেসিডেন্ট কেনেডি। আর যুক্তরাষ্ট্রের ‘এয়ার ন্যাশনাল গার্ড’ এর ইতিহাসের বৃহত্তম কৌশলগত মহড়া ‘অপারেশন স্টেয়ার স্টেপ’ পরিচালনা করা হয়। তবে দুই পক্ষের মধ্যে এ ধরনের উত্তেজনা বেশিদিন স্থায়ী হয়নি। যার ফলে বার্লিন সংকটের দ্রুত সমাধান ঘটে এবং একটি বড় যুদ্ধ থেকে রক্ষা পায় বিশ্ব।

ফিচার ছবি: elcajondekrusty.com