‘ঈশপ’ নামটির সাথে আমরা কম বেশি সবাই পরিচিত। বর্তমানে বাংলা মিডিয়ামের আধুনিকায়নেও কেউ কেউ হয়তো এই নাম অশ্রুত থাকতে পারেন। কিন্তু আদর্শ মানুষ গড়ার কারখানায় নিত্যপাঠ্য এই ঈশপের গল্প। ছোট ছোট গল্পে বিভিন্ন পশু পাখির বাস্তবিক রুপায়নে নীতিশাস্ত্রের পাঠ পড়াতে সফল এক গল্পকার ঈশপ। এই গল্পগুলো “ঈশপের গল্প” নামেই আমাদের কাছে পরিচিত।

ঈশপের গল্পের শৈল্পিক আবেদন আবাল-বৃদ্ধ-বনিতা সবার জন্য। জীবনের নানা পর্যায়ে আমাদের বিভিন্ন রিপু দমনে ঈশপের গল্প এক ধরনের উপাত্ত হিসেবে কাজ করে, যা আমাদের জীবনে কোনো ভুল কাজ থেকে নিজেকে বিরত রাখতে সাহায্য করে। নীতিবাক্য কীভাবে ছোট গল্পের ঢঙে সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছানো যায়, তার এক সার্বজনিন দ্রষ্টা এই ঈশপ।

ঈশপের ভাস্কর্য

মানুষের পরিবর্তে বিভিন্ন পশু পাখির অলংকারে কল্পনার আশ্রয়ে সমাজের প্রেক্ষাপট তুলে ধরা ঈশপের প্রতিটি গল্পের মূল আখ্যান। অনেকে ভাবেন ‘ঈশপের গল্প’ একটি বই এর নামমাত্র। আবার আজকাল বাজারে লেখক-সম্পাদকের নাম দিয়েও ঈশপের গল্পের বই বের করতে দেখা যায়।

আমরা হয়তো জানি না, এই ঈশপ আসলে একজন গ্রীক গল্পকার ছিলেন। তার জন্ম তারিখ সম্পর্কে সঠিক তথ্য পাওয়া না গেলেও ধারণা করা হয় আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব ৬২০ সালে এক কৃতদাস পরিবারে তার জন্ম। অনেকের মতে তিনি প্রতিবন্ধী ছিলেন। তবে এর কোনো সঠিক প্রমাণ পাওয়া যায় নি।

ঈশপের তৈলচিত্র

ঈশপকে উপকথার জনক হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়ে থাকে। তাকে নিয়েও আছে অনেক ধরনের গল্প-কাহিনী। জনশ্রুতিই তার সম্পর্কে জানার একমাত্র ভরসা। সকলের কথাতে একটা দিক ভালভাবেই উঠে এসেছে যে, প্রজ্ঞা আর বুদ্ধিমত্তার জোরে হাস্যোদ্দীপক ও মজার গল্প বলে সাধারণ মানুষের কাছাকাছি চলে গিয়েছিলেন তিনি। সকলে তার কথা বলার ধরণ, অমায়িক ব্যবহার এবং গল্পের সারমর্ম শুনে তাকে খুব সহজেই ভালবেসে ফেলতেন। তার জীবন সম্পর্কে সকল মতবাদের আদতে কোনো ভিত্তি নেই। ঈশপের জন্মস্থান নিয়েও বেশ বিতর্ক রয়েছে।

থ্রেস, ফ্রিজিয়া, এথিওপিয়া, সামোস, এথেন্স এবং সার্দিস – শহরগুলোর প্রত্যেকটিই তাঁর জন্মস্থানের সম্মাননার দাবীদার। মনে করা হয় যে, তিনি দক্ষিণ-পূর্ব ইউরোপের থ্রেস অঞ্চলে জন্মগ্রহণ করেছেন যা বর্তমান গ্রিস ও তুরস্কের মধ্যবর্তী অংশে অবস্থিত। তিনি জীবনের অধিকাংশ সময়ই এশিয়া মাইনর উপকূলের নিকটবর্তী সামোস দ্বীপে দাসত্বজীবনে আবদ্ধ ছিলেন। প্রথম মনিব ছিলেন জানযুস এবং পরবর্তীতে লোডম্যানের দাসত্বে ছিলেন। দুই মনিবই ঈশপের উপর বেশ খুশি ছিলেন। ঈশপের গল্প বলার ভঙ্গি এবং দর্শন দেখে লোডম্যান তাকে দাসত্ব থেকে মুক্তি দেন।

ঈশপের বিখ্যাত শেয়াল ও বকের উপকথা

মুক্ত জীবন পেয়ে ঈশপ বিভিন্ন দেশ বিদেশে ঘুরতে লাগলেন। যেখানেই যান, সেখানেই গল্প বলার আসর জমিয়ে ফেলেন। এই গুণতো তার রক্তে মিশে আছে, এর থেকে মুক্তি কোথায়? তার মুখনিঃসৃত গল্প চারদিক ছড়িয়ে যেতে লাগল। অনেকেই ঈশপের গল্পের ভক্ত হতে লাগলো। তার নীতিশাস্ত্রগুলো মানুষের মনে আবেগের সঞ্চার করত।

ধীরে ধীরে ঈশপ লাইডিয়া নামক একটি নগর রাজ্যে পৌঁছলেন। ক্রোসাস ছিলেন সেখানকার রাজা। লোকমুখে ততদিনে রাজার কান পর্যন্ত চলে গিয়েছে ঈশপের কথা। তাই ঈশপকে দেখার আগ্রহ রাজার মনে বেশ ভালভাবেই তেঁতে উঠেছিল। ডাক পড়ল ঈশপের। ঈশপের সাথে কথা বলে মুগ্ধ হয়ে গেলেন রাজা। রাজার মাথায় তখন এক বুদ্ধি খেলে গেল। ভাবলেন, ঈশপকে দিয়ে রাজ্যে নীতিবাক্য ছড়িয়ে দিবেন। লোকের মাঝে সমাজ সচেতনতা গড়ে তোলাটা যে খুব দরকার হয়ে পড়েছিল সেই সময়। ক্রোসাস তখন ঈশপকে নিজের সভাসদ হিসেবে নির্বাচিত করলেন। রাজসভায় বিভিন্ন নীতিবাক্যের গল্প বলে রাজাকে বেশ প্রভাবিত করেছিলেন ঈশপ। দিনে দিনে রাজার প্রিয়পাত্র হয়ে উঠলেন তিনি। রাজ্যের বুড়ো থেকে বাচ্চারা ঈশপের কাছে গল্প শোনার জন্য অস্থির হয়ে যেত।

‘আঙুর ফল টক’ নামক বিখ্যাত গল্পটি

কিন্তু সুখের দিন ঈশপের জন্য খুব বেশি দিন স্থায়ী হলো না। রাজ্যের কিছু প্রভাবশালী লোক মনে করতে লাগল ইনিয়ে বিনিয়ে ঈশপ তাদের কুকর্মই রাজার চোখের সামনে তুলে ধরছেন। তাই তারা ফন্দি করে রাজাকে প্রভাবিত করল যেন ঈশপকে ডেলফিতে পাঠানো হয়। ডেলফি ছিল গ্রীসের নগর রাজ্য।  রাজাও ঈশপকে বিশ্বাসীভেবে ডেলফিতে পাঠালেন সেখানকার অধিবাসীদের কিছু সোনা বিতরণ করতে। ঈশপ সোনা নিয়ে ডেলফিতে গিয়ে এক বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়লেন। চক্রান্ত অবশ্য আগে থেকেই বোনা ছিল। সোনা বন্টনের পরিমাণ নিয়ে এক প্ররোচিত মতবিরোধের শুরু হয়ে গেল। অসহায় ঈশপ তখন উপায়ন্তর না দেখে পুনরায় রাজা ক্রোসাস এর কাছে ফিরে আসার মনঃস্থির করলেন। কিন্তু তা বললে হবে কেন? চক্রান্তকারীরা এক গভীর নীল-নকশা আঁকলেন।

এপোলো মন্দিরের বর্তমান চিত্র

ডেলফিতে দেবতা এপোলোর মন্দির ছিল। এই মন্দির নিয়ে ডেলফিবাসীর বেশ গর্ব ছিল। বেশ শ্রদ্ধা করতেন এই মন্দির এবং এর জিনিসপত্রকে। ষড়যন্ত্রকারীরা গোপনে এপোলো মন্দিরের একটি সোনার পাত্র ঈশপের মালপত্রের মধ্যে রেখে দিল। ঈশপ যখন ডেলফি নগরীর সীমানা পার হচ্ছিল। তখন ষড়যন্ত্রকারী ডেলফিবাসীরা ঈশপের মালপত্র পরীক্ষা করার নামে সেই সোনার পাত্রটি উদ্ধার করল। দেবতার মন্দিরের পবিত্র দ্রব্য চুরি! এটি ছিল খুবই গুরুতর অভিযোগ। ঈশপকে তখন ধরে নিয়ে যাওয়া হলো মন্দির প্রাঙ্গণে। সোনার পাত্র চুরের অপরাধে তাকে মৃত্যুদন্ড দেয়া হলো। এটাই নাকি এই সোনা চুরির অপরাধের প্রকৃত শাস্তি।

তারপর বিধান অনুযায়ী ঈশপকে পাহাড় চূড়া থেকে নিক্ষেপ করে হত্যা করা হলো। এটা খ্রিস্টপূর্ব ৫৬৪ সালের দিকের কথা। এভাবে ঈশপের জীবনের করুণ পরিসমাপ্তি ঘটল। কিন্তু ঈশপের মৃত্যুর এই মতবাদ নিয়েও অনেক দ্বিমত রয়েছে। কিন্তু তা নিয়ে আর মাথা ঘামিয়ে লাভ কি? ঈশপের মৃত্যু হলেও তার বলা গল্পগুলো তো আর হারিয়ে যায় নি। গল্পগুলো ছড়িয়ে পড়ল দেশ-দেশান্তরে। দিন দিন গল্পগুলোর জনপ্রিয়তা বাড়তে লাগল। এক জনপদ থেকে অন্য জনপদ, এক অঞ্চল থেকে অন্য অঞ্চল, এক দ্বীপ থেকে অন্য দ্বীপ, এক নগর রাজ্য থেকে অন্য নগর রাজ্য। এভাবেই ছড়িয়ে গেল ঈশপের গল্পগুলো। যেন পাখায় ভর করে উড়ে চলল গল্পগুলো।

ঈশ্বর তাকেই সাহায্য করে যে নিজের সাহায্য করে

চতুর্দশ শতকে পাদ্রী প্লানুদেশ প্রথম ঈশপের গল্পের সংকলন প্রস্তুত করেন। অনেকগুলো গল্প একসাথে পুস্তকবন্দি হলো। এই পাদ্রীই প্রথম ঈশপের জীবনী রচনা করেন। ১৮৪৪ খ্রিস্টাব্দে ব্যাবিআসের লেখা ঈশপের একটি দুষ্প্রাপ্য সঙ্কলন মাউন্ট এথেসের মঠ থেকে সংগ্রহ করা হয়েছিল। ঈশপের নামে প্রচলিত লেখাগুলো মূলত সেখান থেকেই সংগৃহীত। ঈশপের গল্প দেশে দেশে এখনও সমান জনপ্রিয়।

ধীর কিন্তু অবিচলিতরাই জয়লাভ করে

ঈশপের গল্প মূলত একটা সমাজের বাস্তব সময়ের দর্পণস্বরূপ। সমাজের নানা ভুলগুলো এখনও হাতে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়ার মতো ক্ষমতা রাখে ঈশপের গল্পগুলো। আমাদের পাঠ্যপুস্তকের পড়ার  ফাঁকে এইসব নীতিশাস্ত্র পর্যালোচনা করার অবকাশ আজকের সমাজে নেই বললেই চলে। কিন্তু সমাজকে সঠিকভাবে গড়ে তুলতে হলে, সমাজের সকল অন্যায় অবিচার রুখতে হলে আমাদের নিজেদের মনস্তাত্ত্বিক পরিবর্তন ঘটাতে হবে। ঈশপের গল্পের নীতিবাক্যগুলো যদি আমরা আমাদের পাঠ্যপুস্তকের সাথে সাথে জীবনের চলার পথে হৃদয়ঙ্গম করতে পারি আর তা থেকে শিক্ষা নিতে পারি, তাহলে এই কাজ অনেক সহজ হয়ে যাবে।

 

This article is in Bangla language. It's about the life and works of Aesop the Greek fabulist and story teller.


References:

1) oldsite.dailyjanakantha.com/news_view_all.php?nc=52&dd=2014-06-07


Featured Image: reading.ge