প্রাচীন রোমে বেশ রাজকীয় ও মর্যাদাপূর্ণ রঙ হিসেবে সমাদৃত ছিল বেগুনী। প্রতিদিন সকালে সম্রাট নিজে এই রঙের আলখেল্লা গায়ে জড়াতেন। তবে সবচেয়ে অদ্ভুত বিষয় হলো, অন্য কারো এই রঙের পোশাক পরার অধিকার ছিল না। আইন করেই বিষয়টি নিষিদ্ধ করে দেয়া হয়েছিল! কেউ যদি রোমের নাগরিক না হতো, তাহলে তার জন্য তো আলখেল্লা গায়ে জড়ানোতেই মানা ছিল।

Source: Wikimedia Commons

কেবলমাত্র সম্রাটের পোশাক হিসেবে নির্ধারিত এই আলখেল্লার দামও ছিল আকাশছোঁয়া। এগুলো আমদানি করা হতো ফোনিসিয়া থেকে, যেখানে রঙ প্রস্তুতিতে ব্যবহার করা হতো শামুক। একটি আলখেল্লা বানাতে যে পরিমাণ রঙের দরকার পড়তো, তাতে কমপক্ষে ১০,০০০ শামুককে জীবন দিতে হতো!

তৎকালে রোমানদের মৃতদেহ নিয়ে যাত্রার ধরনটা ছিল অনেকটা আজকের মতোই। আসলে শোক প্রকাশ এমন একটি বিষয় যার মূলভাবটা অপরিবর্তিত রয়েছে হাজার হাজার বছর ধরে। তাদের সময়েও মৃতদেহ নিয়ে লোকজন রাস্তা ধরে দলবেধে হেঁটে যেত। একজনের শবযাত্রায় লোক সমাগম যত বেশি হতো, তিনি তত বেশি জনপ্রিয় বলে মনে করত আশেপাশে থাকা মানুষজন। অদ্ভুত বিষয় হলো, মৃত ব্যক্তিটিকে জনপ্রিয় দেখাতে একসময় রোমানরা এই শবযাত্রায় ভাড়া করে লোক আনা শুরু করে দিয়েছিল!

Source: Marie-Lan Nguyen

ভাড়ায় হাঁটানোর জন্য এমন সব নারীকে ধরে আনা হতো, যারা মৃত ব্যক্তিকে কোনোভাবে চিনতোই না। কিন্তু তারা হাঁটতে হাঁটতে এমনভাবে নিজেদের চুল টানাটানি করে আর মুখ খামচে কান্নাকাটি করত যেন তাদের সবচেয়ে আপনজনই মারা গিয়েছে! অবস্থা যখন বেশ গুরুতর আকার ধারণ করে, তখন শেষপর্যন্ত আইন করে শবযাত্রায় কান্নাকাটি নিষিদ্ধ করা হয়েছিল।

যদি কোনো স্বামী তার স্ত্রীকে অন্য কোনো পুরুষের সাথে পরকীয়ায় লিপ্ত অবস্থায় পেত, তাহলে সাথে সাথেই সে দুজনকে বন্দী করে ফেলতে পারতো। এরপর সে বেরিয়ে যেত পাড়া-প্রতিবেশী সংগ্রহ করতে, যাতে করে কুকর্মের সঙ্গীদের সে সবার সামনে মুখোশ উন্মোচন করতে পারে। এভাবে সবার সামনে তাদেরকে দেখানোর জন্য সেই স্বামী ২০ ঘণ্টা সময় পেত।

এরপর সেই স্বামীর হাতে তিনদিন সময় থাকত। এর মাঝেই সবার সামনে স্ত্রীকে সে কীভাবে খুঁজে পেল, কার সাথে তার স্ত্রী মিলিত হচ্ছিল এবং এমন আরো বক্তব্য রসিয়ে রসিয়ে দিতে হত। সেই সাথে আইনগতভাবে লোকটি তার স্ত্রীকে তালাক দিতে বাধ্য ছিল। নাহলে বরং সে নিজেই বেশ্যালয়ের দালাল হিসেবে অভিযুক্ত হতো!

Source: Ad Meskens

স্ত্রীর সাথে পরকীয়ায় লিপ্ত লোকটি যদি কোনো দেহ-ব্যবসায়ী কিংবা ক্রীতদাস হত, তাহলে দোষী স্ত্রীর স্বামী বিনা বিচারেই তাকে হত্যা করে ফেলতে পারত। কিন্তু যদি সেই লোকটি রোমের নাগরিক হতো, তাহলে স্বামী গিয়ে বিচার দিত শ্বশুরের কাছে। শ্বশুর চাইলে সেই ছেলেটিকে হত্যা করতে পারতেন। ছেলের সামাজিক মর্যাদা যেমনই হোক না কেন, প্রাচীন রোমে কোনো বাবা তার মেয়ের প্রেমিককে হত্যা করে ফেলতে পারতেন!

তবে নারীরা এক্ষেত্রে ছিল একেবারেই অসহায়। কোনো স্ত্রী যদি তার স্বামীকে অন্য কোনো নারীর সাথে পরকীয়ায় লিপ্ত অবস্থায় পেত, তাহলে আসলে চেঁচামেচি করা আর নীরবে অশ্রু বিসর্জন দেয়া ছাড়া তার হাতে অন্য কোনো উপায় থাকত না।

যদি কেউ কোনো মোটামুটি মাত্রার অপরাধ করতো, তবে তার শাস্তি হতো মস্তক ছিন্নকরণের মাধ্যমে মৃত্যুদণ্ড। অপরাধের মাত্রা যদি গুরুতর হতো, তাহলে জেলখানার প্রহরীরা তাকে টেনেহিচড়ে ভবনের ছাদে নিয়ে যেত। এরপর সরাসরি ছুঁড়ে ফেলতো নিচে।

Source: Wikimedia Commons

তবে কেউ যদি নিজের বাবাকে হত্যার মতো জঘন্য কান্ড ঘটিয়ে ফেলত, তবে তার খবর ছিল। এক্ষেত্রে তাকে গ্রেফতার করে চোখ বেঁধে ফেলা হতো এবং বলা হতো, “তুমি পৃথিবীর আলো-বাতাসের যোগ্য নও!” এরপর তাকে শহরের বাইরের কোনো মাঠে নিয়ে যাওয়া হত, কাপড়-চোপড় খুলে নেয়া হত এবং সবশেষে রড দিয়ে পেটানো শুরু হতো। পেটাতে পেটাতে লোকটি যখন আধমরা হয়ে যেত, তখন সেই পর্বের সমাপ্তি ঘটতো, শুরু হতো চূড়ান্ত পর্বের। তখন তাকে একটি বস্তায় ভরা হত, সাথে থাকতো একটি করে সাপ, কুকুর, বানর ও মোরগ। এরপর বস্তার মুখ ভালো করে আটকে তাদের নিক্ষেপ করা হত সমুদ্রে।

আত্মহত্যার মতো বিষয়কে কখনো কখনো উৎসাহিত করা হতো প্রাচীন রোমান সাম্রাজ্যে। খারাপ পরিস্থিতির মুখোমুখি হওয়া এড়াতে রাজা কখনো কখনো হাতে রাখতেন বিষের বোতল, এমনকি অসুস্থ শরীর নিয়ে কষ্ট করে বেঁচে থাকার চেয়ে মরে যাওয়াকেই অনেক সময় উৎসাহিত করা হতো।

Source: Cesare Maccari

অবশ্য সবার বেলায় এমনটা খাটতো না। তিন শ্রেণীর মানুষের আত্মহত্যার ব্যাপারে নিষেধাজ্ঞা ছিল। এরা হলো সৈনিক, বন্দী ও ক্রীতদাস। এখানে কোনো মানবিক অনুভূতি না, বরঞ্চ আর্থিক দিকটাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ ছিল। সৈনিকেরা একটি জাতির নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার জন্য কতটা গুরুত্বপূর্ণ সেটা তো না বললেও চলে। তাই তাদের হারানো মানে ছিল অপূরণীয় ক্ষতির শিকার হওয়া। দোষী সাব্যস্ত হওয়ার আগে কোনো বন্দী যাতে আত্মহত্যা না করে সেদিকে নজর রাখা হতো, কারণ তাহলে রাষ্ট্র তার সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করতে পারতো না। আর কোনো ক্রীতদাস আত্মহত্যা করলে এর পুরো ক্ষতিপূরণ তার মালিককেই দেয়া লাগতো।

এমনকি এক জায়গায় এমন নিয়মও চালু ছিল যে, যদি কেউ আত্মহত্যা করতে চায়, তবে তাকে সিনেটে সেই আবেদন জানাতে হবে। যদি তার আবেদন মঞ্জুর হতো, তাহলে তাকে এক বোতল ভর্তি বিষ পাঠিয়ে দেয়া হতো!

রোমের ইতিহাসের শুরুর দিককার সময়ে পরিবারের উপর একজন বাবার ক্ষমতা যে কতটুকু বিস্তৃত থাকতো তা ভাবলেও অবাক হতে হয়। সন্তানকে শাসন করাই শুধু নয়, কোনো কারণে সে বাবার সাথে অসৌজন্যমূলক আচরণ করলে তিনি তাকে মেরেও ফেলতে পারতেন! এর কোনো কিছুর জন্যই তাকে জবাবদিহি করতে হতো না। ছেলে-মেয়ে বড় হলেও এর থেকে তাদের নিস্তার ছিল না। বিয়ের পরেও মেয়েরা তাদের বাবাকে সমঝে চলতো। বাবা একেবারে মারা যাওয়ার আগপর্যন্ত পূর্ণ স্বাধীনতা ছিল না ছেলেদেরও।

Source: crystalinks.com

খ্রিস্টপূর্ব ১ম শতকের দিকে এসে পরিস্থিতি বদলাতে শুরু করে। তখন পরিবারের সকল সদস্যকে হত্যার ক্ষমতা কেড়ে নেয়া হয়। নতুন আইনে বলা হলো, ছেলে যদি কোনো অপরাধে অভিযুক্ত হয়, কেবলমাত্র তখনই একজন বাবা তার ছেলেকে হত্যা করতে পারবে!

বজ্রপাতকে দেবতা জুপিটারের পক্ষ থেকে পাঠানো অভিশাপ মনে করতো প্রাচীন রোমানরা। যদি কোনো ব্যক্তি বা গাছ বজ্রপাতে আক্রান্ত হতো, তাহলে এর মানে দাঁড়াত সেই মানুষ কিংবা গাছটিকে দেবতা আর পছন্দ করছেন না। তাই সেটি থেকে মুক্তি পেতে তিনি এই বজ্রপাত প্রেরণ করেছেন।

যদি বজ্রাঘাতে মারা যাওয়া মানুষটি আপনার খুব কাছের কোনো মানুষও হতো, তারপরও সেই মানুষটিকে আপনার হাঁটুর চেয়ে বেশি উচ্চতায় তুলে ধরার ব্যাপারে আইনী নিষেধাজ্ঞা ছিল। আর যদি আপনি সেই মৃতদেহটিকে কবর দেয়ার ব্যবস্থা করতেন, তাহলে সেটা দেবতা জুপিটারের উদ্দেশ্যে বলী দেয়া কোনোকিছু কেড়ে নেয়ার সামিল হতো। তখন আপনার সেই পরিচিত মানুষটির বদলে আপনাকেই দেবতার উদ্দেশ্যে বলী দেয়ার আইনগত বিধান ছিল!

ফিচার ইমেজ- Factinate