মুঘল সম্রাট বাবরের মৃত্যু: মুঘল সাম্রাজ্য এবং হিন্দুস্তানের উজ্জ্বল এক নক্ষত্রের পতন

বিশাল কক্ষটি ঠিক মাঝখানে বড় আর উঁচু একটি বিছানা পাতা। কক্ষটির ছাদ বেশ উঁচু। অবশ্য দুর্গের কক্ষগুলো এমনিতেই বেশ উঁচু হয়। কক্ষের ভেতরে সুগন্ধীর গন্ধ পাওয়া যাচ্ছে। খুব বেশি তীব্র না, আবার তেমন হালকাও না। কক্ষের ভেতরে কোথাও উজ্জ্বল আলো জ্বলে নেই। কিছুটা চাপা আলো পুরো হালকা কক্ষটিকে আলোকিত করে রেখেছে। রাজকীয় বিছানার উপরে একজন ব্যক্তি শুয়ে আছেন। কক্ষের ভেতরটা নির্জন হলেও বাইরের দিকটা তেমন নির্জন না। বাইরে বেশ কিছু চিকিৎসক আর বিছানায় শুয়ে থাকা ব্যক্তির আত্মীয়-স্বজনের উদ্বিগ্ন চেহারা চোখে পড়ছে। কেউ কেউ বিছানার উপরে তাকিয়ে আছেন, কেউ তাকিয়ে আছেন বিছানার চারপাশে। অবশ্য দূর থেকেও দেখে বোঝা যাচ্ছে বিছানার উপরে থাকা ব্যক্তিটি বেশ অসুস্থ। প্রায় অচেতনের মতো অবস্থায় পড়ে আছেন তিনি। কিছুক্ষণ আগেও গায়ে প্রচন্ড জ্বর ছিলো। আর তাই বেশ কয়েকটি ভারী কাপড় গায়ে জড়িয়ে দেয়া হয়েছে। খুব ধীরে ধীরে শ্বাস নিচ্ছেন তিনি। তবে হঠাৎ করে তার দিকে তাকালে তিনি জীবিত না মৃত, তা ঠিক বোঝা যায় না।

মধ্যরাত। হঠাৎ ধীরে ধীরে চোখ মেললেন তিনি। গায়ের উপরের ভারি কাপড়গুলো সরানোর চেষ্টা করছেন। তিনি দেখলেন কিনা তা ঠিক বোঝা গেলো না, তবে প্রায় অচেতন লোকটির শয্যার চারপাশে অন্য আরেকজন লোক বিড়বিড় করতে করতে পাক খাচ্ছেন। তার কথা দূর থেকে স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছিলো না, তবে খুব মনোযোগ দিয়ে চেহারার দিকে তাকালে লোকটির মনের তীব্র আকুতি বেশ ভালোভাবেই বোঝা যাচ্ছিলো। তিনি বিড়বিড় করতে করতে বলছিলেন,

“হে আল্লাহ, যদি একজনের প্রাণ নিয়ে আরেকজনের প্রাণ ফিরিয়ে দেয়া সম্ভব হয়, তাহলে পুত্রের প্রাণের বিনিময়ে আমার নিজের প্রাণ উৎসর্গ করতে আমি প্রস্তুত।”

১৫২৯ সালে ঘাঘরার যুদ্ধে আফগানদের বিরুদ্ধে চূড়ান্ত বিজয় মুঘল সাম্রাজ্যকে হিন্দুস্তানে পাকাপোক্ত একটি অবস্থান গড়ে দিলো। যদিও খানুয়ার যুদ্ধে রাজপুতদের পরাজয়ের পর মুঘল সাম্রাজ্যের সমস্ত শত্রু শক্তিই মাটিতে মিশে গিয়েছিলো, কিন্তু তারপরেও হিন্দুস্তানের পূর্বাঞ্চলে আফগানরা বেশ শক্ত অবস্থান ধরে রেখেছিলো। অবশেষে নতুন আফগান অধিপতি ইব্রাহীম লোদির ভাই সুলতান মাহমুদের পরাজয়ের মধ্য দিয়ে মুঘল সাম্রাজ্যের জন্য শেষ এই হুমকিটিও নির্মূল হয়ে গেলো। মুঘল সাম্রাজ্য এখন সবদিক থেকেই নিরাপদ।

সিংহাসনে উপবিষ্ট সম্রাট বাবর; Source: Pinterest.com

ঘাঘড়ার যুদ্ধের বেশ কয়েকমাস আগেই, ১৫২৭ সালের ১৬ মার্চ খানুয়ার যুদ্ধে রাজপুতদের পরাজিত করে সম্রাট বাবর নিজের পরিবারের জন্য হিন্দুস্তানকে নিরাপদ ভাবতে শুরু করেন। তিনি কাবুল দুর্গে অবস্থানরত তার পরিবারকে আগ্রা আসার অনুমতি প্রদান করেন। এর কিছুদিন পরেই সম্রাট বাবরের পুরো পরিবার আগ্রা দুর্গে চলে আসেন। নিজের স্ত্রী ও পরিবারবর্গ নিয়ে বাবর বেশ কিছুদিন শান্তিতেই সময় কাটাতে লাগলেন।

সাম্রাজ্য সংক্রান্ত বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে বাবরকে কাজ করতে হচ্ছিলো, তবে এই সময়টুকু তিনি নিজের মতো করে তার পরিবারের সাথে অতিবাহিত করলেন। এই সময় তিনি তার প্রিয় স্ত্রী মাহাম বেগমকে নিয়ে ধোলপুর থেকেও একবার ঘুরে আসেন। কিন্তু এর ৩ মাস পরেই মুঘল পরিবারে পারিবারিক একটি সমস্যার উদ্ভব হয়। প্রচন্ড পেটে ব্যথার কারণে সম্রাটের এক পুত্র অসুস্থ হয়ে হঠাৎ করেই মারা যান। সম্রাট বাবর ও দিলদার বেগমের এই পুত্রের নাম ছিলো আলোয়ার মির্জা। ঘটনার আকস্মিকতায় পুরো মুঘল পরিবার হতভম্ব হয়ে যায়। মুঘল রাজদরবারে নেমে আসে শোকের ছায়া। পুত্রশোকে দিলদার বেগম পাগলপ্রায় হয়ে যান।

শোকের প্রাথমিক ধাক্কা কাটতে বেশ কিছুটা সময় লেগে যায়। কিছুদিন পর এরকম থমথমে অবস্থা কাটাতে সম্রাট বাবর আবারো তার স্ত্রীদের নিয়ে ধোলপুরের দিকে যাত্রা করলেন। এমন শোকের সময় স্থান বদল করলে হয়তো শোকের তীব্রতা কমে আসবে, এটাই ছিলো পরিবারের প্রধান হিসেবে মুঘল সম্রাট বাবরের একমাত্র আশা।

তবে ধোলপুর যেয়েও বাবর তেমন একটা স্বস্তি পেলেন না। কারণ দিল্লি থেকে মাওলানা মুহাম্মদ ফারঘালি বাবরের জন্য একটি পত্র পাঠালেন। পত্রে মাওলানা ফারঘালি দিল্লিতে বাবরের প্রিয়পুত্র হুমায়ুনের অসুস্থতার খবর জানালেন।

এই পত্র পেয়ে বাবর দ্রুত হুমায়ুনকে দিল্লি থেকে রাজধানী আগ্রা নিয়ে আসার নির্দেশ দিয়ে আগ্রার দিকে ছুটতে লাগলেন। বাবরের সাথে তখন হুমায়ুনের মা মাহাম বেগম ছিলেন। পুত্রের অসুস্থতার কথা শুনে তিনি ইতোমধ্যেই বেশ কয়েকবার জ্ঞান হারিয়েছিলেন। যা-ই হোক, পুত্র হুমায়ুনের সাথে মাহাম বেগমের মথুরার কাছাকাছি এসে দেখা হলো। পুত্রকে দেখে মাহাম বেগম নিজের আবেগ সামলে রাখতে পারলেন না। পুত্রের এরুপ অসুস্থতায় তিনি উদ্ভ্রান্তের মতো আচরণ করতে লাগলেন। এর অবশ্য কারণও ছিলো। হুমায়ুন কখনোই এরকম মারাত্মক অসুস্থতায় ভোগেনি। বাবরের এক পুত্র আলোয়ার মির্জা কিছুদিন আগেই মারা গেছেন। কাজেই মাহাম বেগমের মাথায় সবচেয়ে খারাপ চিন্তাটাই আগে ভর করলো। উন্নত চিকিৎসার জন্য দ্রুত শাহজাদা হুমায়ুনকে দ্রুত নৌকাযোগে রাজধানী আগ্রা নিয়ে নিয়ে আসা হলো।

সম্রাট বাবরের আত্মজীবনী ‘বাবরনামা’-তে পাওয়া শাহজাদা হুমায়ুনের একটি মিনিয়েচার ছবি; Source: Wikimedia Commons

আগ্রার রাজপ্রাসাদে তৎকালীন শ্রেষ্ঠ চিকিৎসকেরা হুমায়ুনের চিকিৎসা শুরু করলেন। বাবরের মনে তখন আর কোনো শান্তি ছিলো না। হুমায়ুনকে তিনি তার অন্য যেকোনো পুত্র থেকে বেশি ভালোবাসতেন। গোটা হিন্দুস্তান অভিযানের সময় বাবরকে সঙ্গ দিয়েছিলেন তার এই পুত্র। তাই বাবর আর হুমায়ুনের মাঝে একটি বিশেষ আত্মিক বন্ধন তৈরি হয়েছিলো, যা বাবরের মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত বজায় ছিলো। বাবর পুত্রের অসুস্থতায় অস্থির হয়ে ঘন ঘন পুত্রের শারীরিক অবস্থার খোঁজখবর নিচ্ছিলেন। হুমায়ুন প্রায় অচেতনের মতো বিছানায় শুয়ে ছিলেন। তবে পিতাকে দেখে তিনি নিজের আবেগ নিয়ন্ত্রণ করতে পারলেন না। হুমায়ুন সম্রাট বাবরকে আক্ষরিক অর্থেই প্রচন্ড ভালোবাসতেন আর শ্রদ্ধা করতেন।

হুমায়ুনের অবস্থা দিন দিন খারাপ হচ্ছিলো। মাহাম বেগমের মাতৃআবেগ ধীরে ধীরে লাগামছাড়া হয়ে যাচ্ছিলো। একদিন তিনি সম্রাট বাবরকে পুত্রের জন্য বিচলিত হতে দেখে বলে বসলেন,

‘আমার ছেলের জন্য আপনার আর কতটুকু দুশ্চিন্তা আছে?আপনার আরো ছেলে আছে, কিন্তু আমার ছেলে তো মাত্র একটিই ছেলে।‘

কিন্তু মাহাম বেগম হয়তো কখনোই ধারণা করতে পারেন নি, বাবর তার এই পুত্রটির জন্য তার মনে কতোটা ভালোবাসা সঞ্চয় করে রেখেছিলেন। সম্রাট বাবর নিজে জানতেন হুমায়ুনকে তিনি কতটা ভালোবাসতেন। আর তাই পুত্রের রোগশয্যার পাশে বসে পুত্রের জন্য একমনে তিনি আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করতেন তিনি। তারপরও চিকিৎসা কিংবা প্রার্থনা- হুমায়ুনের জন্য এর কোনোটিই কাজ করছিলো না। সুস্থতার কোনো লক্ষণই হুমায়ুনের মাঝে দেখা যাচ্ছিলো না।

এ সময় বাবরের দরবারের বেশ কয়েকজন পরামর্শ দিলো, বাবর যদি তার নিজের জীবনের সবচেয়ে প্রিয় বস্তুটি উৎসর্গ করে দেন, তাহলে হয়তো আল্লাহ তার পুত্র হুমায়ুনের জীবন ভিক্ষা দিতে পারেন।

হুমায়ুনের একটি তৈলচিত্র; Source: Wikimedia Commons

এই কথা শোনামাত্র বাবর ভাবতে লাগলেন এমন কী আছে যা তিনি সবচেয়ে বেশি ভালোবাসেন। হঠাৎ বাবরের মাথায় আসলো প্রতিটি মানুষই তার নিজের জীবনকে অন্য সবকিছুর চেয়ে বেশি ভালোবাসে। আর তাই বাবর তার পুত্র হুমায়ুনের জন্য নিজের জীবন উৎসর্গ করার সিদ্ধান্ত নিলেন। কারণ, একজন পিতা হিসেবে বাবর তার পুত্র হুমায়ুনকে তার জীবন থেকেও বেশি ভালোবাসতেন। বাবর চাইছিলেন নিজের জীবনের বিনিময়ে হলেও পুত্র হুমায়ুনের জীবন যেন রক্ষা পায়।

এরপরেই একরাতে তিনি পুত্রের শয্যার পাশে চক্রাকারে ঘুড়তে লাগলেন, আর বিড়বিড় করে বলতে লাগলেন,

‘হে আল্লাহ, যদি একজনের প্রাণ নিয়ে আরেকজনের প্রাণ ফিরিয়ে দেয়া সম্ভব হয়, তাহলে পুত্রের প্রাণের বিনিময়ে আমার নিজের প্রাণ উৎসর্গ করতে আমি প্রস্তুত।’

আশ্চর্যজনক হলেও সত্য, এর কিছুদিন পরেই হুমায়ুন ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে উঠতে লাগলেন। আর সম্রাট বাবর ধীরে ধীরে অসুস্থ হতে শুরু করলেন। তবে হুমায়ুনের সুস্থ হয়ে ওঠা আর সম্রাট বাবরের অসুস্থ হয়ে বিছানায় পরে যাওয়ার মাঝে কয়েক মাসের ব্যবধান ছিলো।

সুস্থ হয়ে ওঠার পরও পুরোপুরি আরোগ্য লাভের জন্য শাহজাদা হুমায়ুন ২/৩ মাস বিশ্রাম নেন। এই সময়ে ধীরে ধীরে সম্রাট বাবরের ভেতরে অসুস্থতার লক্ষণ ফুটে উঠতে শুরু করে। এই অসুস্থতার ভেতরেই বাবর হুমায়ুনকে রাজকীয় কাজে কালিঞ্জর যেতে নির্দেশ দেন। পিতার এই অসুস্থতায় হুমায়ুন কালিঞ্জর যেতে একটু দ্বিধান্বিত ছিলেন। কিন্তু সম্রাটের আদেশ সবসময়ই আদেশ। তাই তিনি তার পিতা ও সম্রাটের আদেশ মেনে নিয়ে কালিঞ্জর চলে যান। পিতার এই অসুস্থতার মাঝে শেষ পর্যন্ত হুমায়ুন হয়তো কালিঞ্জর যেতে রাজি হতেন না, কিন্তু শেষমেশ কী মনে করে যেন কালিঞ্জর চলে যান। হুমায়ুন ভেবেছিলেন তার পিতার অসুস্থতা হয়তো তেমন গুরুতর কিছু না। কিন্তু কালিঞ্জর যাওয়ার কিছুদিনের ভেতরের বাবরের মারাত্মক অসুস্থতার খবর তাকে জানানো হলে তিনি দ্রুত আগ্রায় ফিরে আসেন।

হুমায়ুন ফিরে এসে পিতাকে খুবই অসুস্থ অবস্থায় পেলেন। তিনি পিতাকে এমন গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় দেখতে পেয়ে সবাইকে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘মহান বাদশাহর শরীর এতোটা খারাপ হলো কেমন করে?’ কিন্তু কেউই হুমায়ুনের এই প্রশ্নের সদুত্তর দিতে পারলো না। তিনি আবারো সবাইকে উদ্দেশ্য করে প্রশ্ন করলেন, ‘আমি তো পিতাকে অনেকটা ভালো দেখে গিয়েছিলাম। হঠাৎ এতোটা খারাপ হওয়ার কারণ কী? এবারো উপস্থিত সবাই চুপচাপ থাকলেন।

রাজকীয় দুর্গে বাবরের দ্রুত উন্নত চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হলো। কিন্তু তারপরও ধীরে ধীরে বাবরের রোগের প্রকোপ বাড়তে থাকলো। বাবর এ সময় প্রায়ই অচেতন হয়ে যেতেন। কিছুটা চেতনা ফিরে পেলেই তিনি বারবার হিন্দালের কথা জিজ্ঞাসা করতেন। বাবর দীর্ঘদিন তার এই ছোটপুত্রকে দেখেন নি। তিনি বারবার একই কথা পুনরাবৃত্তি করছিলেন, ‘হিন্দাল কোথায়? হিন্দালকে দেখছি না কেন?’

পরিণত বয়সে যুবরাজ মির্জা হিন্দাল। তবে ছবিটি আসলেই মির্জা হিন্দালের নাকি, সেটা নিশ্চিত না। এমনকি উইকিমিডিয়া কমন্সে ছবিটির শিরোনামেও একটি প্রশ্নবোধক (?) চিহ্ন দেয়া আছে। Source: Wikimedia Commons

হিন্দালকে দ্রুত পিতার অসুস্থতার খবর দেয়া হলো। হিন্দাল ঝড়ের বেগে কাবুল থেকে আগ্রার পথে ছুটতে লাগলেন।

অসুস্থ অবস্থাতেই বাবরের মাথায় আরেকটি বিচিত্র শখ ভর করলো। তিনি জীবিত থাকতেই তার এবং দিলদার বেগমের দুই কন্যা গুলরঙ বেগম আর গুলচেহারা বেগমের বিয়ে দিতে দিলদার বেগমকে আদেশ করলেন। বাবর তার এই দুই কন্যার জন্য নিজের পছন্দ অনুযায়ী পাত্রও ঠিক করে দিলেন। বাবরের আদেশ অনুযায়ী তার এই অসুস্থতার ভেতরেও রাজকীয় মুঘল প্রসাদে বিয়ের আয়োজন করা হলো। বাবরের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী গুলরঙকে ইশান তৈমুর সুলতান এবং গুলচেহারা বেগমকে তুঘতা বুঘা সুলতানের হাতে তুলে দেয়া হলো। সম্পর্কের দিক দিয়ে এই দুজন বাবরের মামা আলুনাদ খানের পুত্র ছিলেন।

এই বিয়ের কিছুদিন পরেই সম্রাট বাবর অসুস্থতার কারণে আরো দুর্বল হয়ে যেতে লাগলেন। এমনকি হাঁটাচলা কিংবা বিছানা থেকে উঠে বসার শক্তিটুকুও হারিয়ে ফেললেন তিনি। তার মুখমন্ডল ফ্যাকাশে হয়ে যেতে লাগলো। হিন্দুস্তানের মহান অধিপতি সম্রাট বাবর বুঝতে পারলেন পৃথিবীতে তার সময় শেষ হয়ে আসছে। নিজের যা কাজ ছিলো পৃথিবীতে, তা তিনি শেষ করে ফেলেছেন। তবে তখনো একটা কাজ বাকী ছিলো। তিনি সেই কাজটি সম্পাদনের জন্য তার দরবারের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের রাজদরবারে ডাকলেন।

২২ ডিসেম্বর, ১৫৩০ সাল। আগ্রার পুরাতন দুর্গ।

নিজের শারীরিক দুর্বল অবস্থা নিয়েই সম্রাট বাবর রাজদরবারে তার সিংহাসনে গিয়ে বসলেন। পরিবার আর সভাসদের সবাই অনুরোধ করছিলেন যা বলার তা নিজের ব্যক্তিগত কক্ষ থেকেই ঘোষণা করতে। কিন্তু সম্রাট বাবর চাইছিলেন যা বলার তা এই সিংহাসন থেকেই বলবেন। অসুস্থ সম্রাট সিংহাসনে বসে আছেন। দরবার আর পরিবারের লোকেরা উৎসুক দৃষ্টিতে সম্রাটের দিকে চেয়ে আছেন।

সম্রাট বাবর হঠাৎ কিছু বলতে শুরু করলেন। তবে তার কন্ঠ শুনে বোঝা যাচ্ছিলো কথা বলতে সম্রাটের বেশ কষ্ট হচ্ছিলো। তারপরও তিনি বলতে লাগলেন,

‘আল্লাহর কৃপায় ও আপনাদের সমর্থনে আমি আমার জীবনে সব কিছুই অর্জন করতে সক্ষম হয়েছি। পৃথিবীতে আমার সব ইচ্ছাই পূরণ হয়েছে। তবে আমি সুস্থ অবস্থায় নিজের সব কাজ সম্পন্ন করতে পারলাম না। আজ আপনাদের সামনে আমি নিজের শেষ ইচ্ছা প্রকাশ করছি। আমার পরে আমি মুঘল সিংহাসনে হুমায়ুনকে বসিয়ে যেতে চাই। আমি আশা করবো, আমার প্রতি আপনারা যেমন অনুগত ছিলেন, বাদশাহ হিসেবে আপনারা হুমায়ুনের প্রতিও ঠিক তেমনই অনুগত থাকবেন। তার সকল কাজকে সমর্থন জানাবেন। আমি আশা করছি, মহান আল্লাহর দয়ায় হুমায়ুন সফলভাবে তার দায়িত্ব পালন করতে সক্ষম হবে।’

দরবারে উপস্থিত বাবরের সভাসদরা কান্নাভেজা চোখে তাদের প্রিয় সম্রাটের সামনে শপথ করলেন, তারা নিজেদের জীবন দিয়ে হলেও তাদের সম্রাটের শেষ ইচ্ছা অক্ষরে অক্ষরে পালন করবেন।

এরপর সম্রাট বাবর হুমায়ুনের দিকে তাকিয়ে দুর্বল কন্ঠে বললেন,

‘হুমায়ুন আমি তোমাকে, তোমার ভাই-বোন, আত্মীয়স্বজন ও তোমার প্রজাদের আল্লাহর হাতে সমর্পণ করে যাচ্ছি।’

সম্রাট বাবর চাইলেই পারতেন নিজের ব্যক্তিগত কক্ষে সবাইকে ডেকে নিজের শেষ ইচ্ছার কথা বলে যেতে। কিন্তু তিনি ষড়যন্ত্রকারীদের কোনো সুযোগ দিতে রাজী ছিলেন না। তিনি জানতেন, তার মৃত্যুর পর হুমায়ুনকে সিংহাসনে বসতে বাঁধা দেয়া হবে। তাই জীবিত থাকতেই সবার সামনে আনুষ্ঠানিকভাবে তিনি হুমায়ুনকে সিংহাসনের বৈধ দাবীদার স্বীকৃতি দিয়ে দিলেন। তিনি বেশ ভালো করেই জানতেন, ৪ বছর পূর্বে ইব্রাহীম লোদির মায়ের দেয়া বিষের ফলে তিনি যখন শয্যাশায়ী ছিলেন, তখন এই দরবারের একাংশ হুমায়ুনের পরিবর্তে তার ভগ্নিপতি মেহেদি খ্বাজাকে সিংহাসনে প্রায় বসিয়ে ফেলার আয়োজন করে ফেলেছিলো। সম্রাট বাবর হয়তো এই ষড়যন্ত্রের ব্যাপারটি জানতেনই না, কিন্তু মেহেদি খ্বাজার বোকামীতে বিষয়টি ধরা পড়ে যায়।

মুকিম হারাভির পুত্র নিজাম উদ্দিন আহমেদ রচিত ‘তাবাকাত-ই-আকবরী’ গ্রন্থে প্রত্যক্ষদর্শী মুকিম হারাভির সূত্রে ঘটনাটি এভাবে বর্ণনা করা হয়েছে,

‘মহান বাদশাহ (বাবর) তখনো জীবিত। একদিন মুকিম হারাভি মেহেদি খ্বাজার শিবিরে প্রধান উজিরের সাথে সাক্ষাৎ করেন। বাবরের দরবার থেকে ডাক পড়ায় মুকিম হারাভি প্রধান উজিরের সাথে বেশিক্ষণ কথা বলতে পারেন নি। মেহেদি খ্বাজা প্রধান উজিরকে দরজা পর্যন্ত এগিয়ে দিতে আসেন। প্রধান উজির কানে কিছুটা কম শুনতেন। মেহেদি খ্বাজা আশেপাশে আর অন্য কেউ আছে কিনা তা খেয়াল না করেই হঠাৎ আপন মনে বলে উঠলেন, আল্লাহর ইচ্ছায় বাদশাহ হতে পারলে আমার প্রথম কাজ হবে তোমার আর অন্যান্য গাদ্দারদের চামড়া ছিলে ফেলা। এই কথা বলেই তিনি তার পেছনে মুকিম হারাভির উপস্থিতি টের পান। সাথে সাথেই তিনি মুকিম হারাভির কান টেনে ধরে গালি দিয়ে বলতে থাকেন, যা শুনেছো, যদি বুদ্ধিমান হও তাহলে তা প্রকাশ করবে না। তা না হলে তোমাকে পরপারে পাঠানো হবে।’

এই কথার পর মুকিম হারাভি মেহেদি খ্বাজার কথা মেনে নেন। এরপর দ্রুত বিদায় নিয়েই তিনি প্রধান উজিরের কাছে গিয়ে সব কথা বিস্তারিত খুলে বলেন। উজির কানে কম শুনলেও বুদ্ধিমান ছিলেন। তিনি দ্রুত হুমায়ুনকে ডেকে পাঠিয়ে তার সাথে সাক্ষাৎ করেন। হুমায়ুনের পরামর্শে মেহেদি খ্বাজাকে নিজের বাড়িতে পাঠিয়ে দেয়া হয়। একইসাথে তার জন্য দরবারের কারো সাথে সাক্ষাৎ কিংবা বাবরের দরবারে তার প্রবেশ নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়।

পরবর্তীতে এই ঘটনা সম্রাট বাবর জানতে পেরেছিলেন।

সম্রাট বাবর ও হুমায়ুন। পিতা-পুত্র একসাথে; Source: Wikimedia Commons

তবে সম্রাট বাবর যে হুমায়ুনকেই তার প্রতিষ্ঠিত মুঘল সাম্রাজ্যের উত্তরসূরি ঘোষণা করবেন, তা বহু আগে থেকেই বোঝা যাচ্ছিলো। তিনি তার এই পুত্রটিকে খুব বেশি ভালোবাসতেন। হুমায়ুনের অসুস্থতার সময়ে বাবর কী কী করেছিলেন, তা সবাই দেখেছে। তাছাড়া, গুলবদন বেগম রচিত ‘হুমায়ুননামা’-তে একটি ঘটনার উল্লেখ আছে, যা থেকে স্পষ্টই বোঝা যায়, সম্রাট বাবর হুমায়ুনকেই তার পরবর্তী সম্রাট ঘোষণা দিতে যাচ্ছেন। ঘটনাটি হুমায়ুননামা থেকে সরাসরি উল্লেখ করা হলো,

‘এর কিছুদিন পর (কাবুল থেকে বাবরের পরিবার হিন্দুস্তানে আসার পর) বাদশাহ বাবুর ‘বাগ-ই-জার-আফসান’ বা, স্বর্ণখচিত বাগিচা পরিদর্শনে এলেন। এখানে অজু করার একটি চৌবাচ্চা তৈরি করা হয়েছিলো। বাদশাহ বাগান দেখে অভিভূত হলেন। আবেগাপ্লুত হয়ে বললেন, আমার বাদশাহি ও রাজত্ব করার আকাঙ্ক্ষা পূর্ণ হয়েছে। এখন আমার ইচ্ছে এ বাগানের নির্জনে বাকী জীবন অতিবাহিত করি। আমার সেবার জন্য খানসামা তাহেরই যথেষ্ট। বাদশাহির দায়িত্ব আমি হুমায়ুনের হাতেই ছেড়ে দিবো।

সম্রাটের এ কথায় যেন কোন অশুভ ইঙ্গিত ছিলো। আমার মা ও সাথে থাকা অন্যান্যরা বাদশাহ-এর এ কথা শুনে কান্নাকাটি শুরু করে দিলেন। তারা বলতে লাগলেন, মহান বাদশাহ আরো অনেক বছর বেঁচে থেকে নিজের সাম্রাজ্য পরিচালনা করবেন। তার সন্তান-সন্ততিও বাদশাহর সামনেই বেড়ে উঠবে এবং বার্ধক্যে পৌছাবেন।’

এই বর্ণনা থেকে মৃত্যুর অনেক পূর্বেই সম্রাট বাবরের হুমায়ুনের হাতে মুঘল সাম্রাজ্যের শাসনভার ছেড়ে দেয়ার ইঙ্গিত স্পষ্ট ছিলো।

২৬ ডিসেম্বর, ১৫৩০ সাল। আগ্রার পুরাতন দুর্গ।

হুমায়ুনকে মুঘল সাম্রাজ্যের পরবর্তী সম্রাট ঘোষণা দেয়ার তিনদিন পরে হিন্দুস্তান ও মহান মুঘল সাম্রাজ্যের প্রথম সম্রাট জহির উদ-দিন বাবর এই নশ্বর পৃথিবীকে বিদায় জানিয়ে মহান আল্লাহর কাছে চলে গেলেন। পেছনে রেখে গেলেন নিজের জীবনের বিশাল এক কীর্তি আর বীরত্বপূর্ণ এক অসমাপ্ত অধ্যায়।

সম্রাটের মৃত্যুর পর এই সংবাদটি গোপন রাখার সিদ্ধান্ত নেয়া হলো। কারণ মুঘল সাম্রাজ্যের এই শোকময় অবস্থায় শত্রুরা অবশ্যই এর সুযোগ নেয়ার চেষ্টা করবে। তাছাড়া বাবরের সামনে দরবারের সবাই হুমায়ুনকে নতুন সম্রাট হিসেবে মেনে নিলেও দরবারে এমন অনেক আমিরই আছেন, যারা হুমায়ুনকে বৈধ সম্রাট হিসেবে বিবেচনা করতেন না। সম্রাটের মৃত্যু এই মূহুর্তে প্রকাশ পেলে তার ঝামেলা করার চেষ্টা করবেই।

কিন্তু বাধ সাধলেন বাবরের এক হিন্দুস্তানীয় আমির। তিনি এই সংবাদ চেপে না গিয়ে ভিন্নভাবে পরিবেশন করার পরামর্শ দিলেন। তিনি বললেন, এভাবে অসুস্থ সম্রাটের কোনো খবরই জনগণের সামনে না প্রকাশ করলে তাতে বিভ্রান্তি আরো বাড়বে। আর সম্রাটের মৃত্যু গুজব হিসেবে ঠিকই ছড়িয়ে যাবে। তাতে গোটা সাম্রাজ্যে লুটপাট শুরু হয়ে যাবে। তিনি অনুরোধ করলেন, এই শোকের সময় মুঘল পরিবারের সামান্য ভুলও হিন্দুস্তানের পরিস্থিতি আরো উত্তপ্ত করে তুলতে পারে। তার পরামর্শেই ঘোষকের দল গোটা রাজ্যে ঘোষণা করলো, সম্রাট অসুস্থ থাকায় স্বেচ্ছায় রাজকার্য থেকে অব্যহতি নিয়ে নিজের পুত্র হুমায়ুনকে মুঘল সাম্রাজ্যের সিংহাসনে বসিয়েছেন।

এই ঘোষণা শোনার পর জনগন আশ্বস্ত হলো যে তাদের সম্রাট জীবিত আছেন, এবং নিজ পুত্রের কাছে দায়িত্ব হস্তান্তর করে অবসর গ্রহন করেছেন।

সম্রাটের মৃত্যুর পর তাৎক্ষণিক হুমকির মোকাবেলার প্রস্তুতি গ্রহণ করে পরবর্তীতে সম্রাটের মৃত্যু সংবাদ সাম্রাজ্যে প্রকাশ করা হয়।

সম্রাট বাবর মৃত্যুর পূর্বেই তাকে কাবুলে সমাহিত করার নির্দেশ দিয়ে গিয়েছিলেন। তার ইচ্ছানুযায়ীই মৃত্যুর পর মুঘল এই বীরকে যমুনার আড়াই কিলোমিটার পূর্বে আরামবাগের চারবাগে সমাহিত করা হয়।  এখানেই একটি বিভ্রান্তির সৃষ্টি হয়েছে। যমুনার পূর্বদিকে  তৎকালীন সময়ে প্রচুর বাগান ছিলো, যা হিন্দুস্তানের স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য থেকে বেশ ব্যতিক্রম ছিলো। ঠিক এ কারণেই হিন্দুস্তানের অধিবাসীরা তখন এই স্থানটিকে কাবুল বলতো। বাবর তার ইচ্ছাতে এই কাবুলের কথাই বলেছেন। আর সম্রাট হুমায়ুনও পিতার ইচ্ছাটির কথা জানতেন। তাই সম্রাট বাবরকে যমুনার পূর্ব তীরেই সমাহিত করা হয়েছিলো। কিন্তু ৯ বছর পর, ১৫৩৯ সালের ২৬ জুন শের শাহ সূরীর নিকট পরাজিত হয়ে মুঘল সম্রাট হুমায়ুন হিন্দুস্তানের কর্তৃত্ব হারান। হিন্দুস্তানে সাময়িক ছেদ পড়ে মুঘল শাসনামলের। আর এই শের শাহ-এর শাসনামলে বাবরেরই এক স্ত্রী বেগা বেগম বাবরের দেহাবশেষ আফগানিস্তানের কাবুলে বাবরের আরেক সৃষ্টি ‘বাগ-ই-বাবরে’ স্থানান্তর করেন। বেগা বেগমের এই সিদ্ধান্তের কারণ আজও অস্পষ্ট!

কাবুলের ‘বাগ-ই-বাবুর’। বাদশাহ বাবরের আদেশে ১৫২৮ সালে কাবুলে এই বাগানটি নির্মাণ করা হয়। মুঘলদের সবসময়ই বাগানের প্রতি বিশেষ আকর্ষণ ছিলো। মুঘলরা যেখানেই সীমানা বিস্তার করতে পেরেছিলেন, এখানেই তৈরি করেছেন বিভিন্ন সুন্দর সুন্দর বাগান; Source: beautifulglobal.com

কিন্তু এটা নিশ্চিতভাবেই বলা যায়, হুমায়ুন তখন ক্ষমতায় থাকলে নিজের পিতার সমধি কখনোই আফগানিস্তানের কাবুলে স্থানান্তর করা হতো না। বাবর সারাজীবন তার ভালোবাসার হিন্দুস্তানের মাটিতেই শুয়ে থাকতে পারতেন।

১০

শারীরিক দিক থেকে সম্রাট বাবর ভীষণ শক্তপোক্ত গড়নের মানুষ ছিলেন। কথিত আছে, তিনি তার দুই কাঁধে দুজন প্রাপ্তবয়ষ্ক মানুষ নিয়ে দৌড়ে পাহাড়ের চূড়ায় উঠে যেতে পারতেন। এছাড়া, একটানা ৩০ ঘন্টা সাঁতার কাটতে পারতেন তিনি। কিন্তু হিন্দুস্তানের একের পর এক যুদ্ধে তিনি বেশ অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন, তার স্বাস্থ্য দ্রুতই ভেঙ্গে পড়ছিলো। তাছাড়া দিল্লি আর আগ্রা অধিকার করার পর পরই ইব্রাহিম লোদি মা বাবরের খাবারে বিষ প্রয়োগ করে বাবরকে হত্যার চেষ্টা করেছিলেন। সেইবার বাবর বেঁচে গেলেও বিষের প্রভাব তার শরীরে রয়ে গিয়েছিলো। খুব ধীরে ধীরে হলেও বিষাক্রান্তের ফলে শরীরের ভেতর থেকে দুর্বল হচ্ছিলেন তিনি।

এই ঘটনার পর পরই তাকে বেশ বড় এবং সিদ্ধান্তমূলক দুটি যুদ্ধে নামতে হয়। সব মিলিয়ে তার শরীরের অবস্থা বেশ খারাপই যাচ্ছিলো। এছাড়া তার পুত্র আলোয়ার মির্জার মৃত্যু আর তার কিছুদিন পরেই প্রিয় পুত্র হুমায়ুনের অসুস্থতা পিতা হিসেবে বাবরকে মানসিকভাবে বেশ দুর্বল করে দিয়েছিলো। হিন্দুস্তানের আবহাওয়াও বাবরকে কম ভোগায়নি। সব মিলিয়ে হিন্দুস্তানে আসার পর থেকেই বাবর বিভিন্ন মানসিক আর শারিরিক অসুস্থতায় ভুগছিলেন।

কাবুলে নিজেরই তৈরি ‘বাগ-ই-বাবুর’-এ সাদামাটা এই কবরে শুয়ে আছেন হিন্দুস্তানের মহান এই সম্রাট। হিন্দুস্তানের মাটিকে আপন করে নেয়া এ সম্রাটের ইচ্ছা ছিলো হিন্দুস্তানের মাটিতেই নিজের শেষ ঠিকানা করে নেয়া। কিন্তু পরবর্তীতে তার কথার ভুল ব্যাখ্যা করে তাকে হিন্দুস্তান থেকে দূরে কাবুলে সমাহিত করা হয়; Source: Wikimedia Commons

হিন্দুস্তান বাবরের নিকট অপছন্দীয় হলেও তিনি নিজের ভাগ্য মেনে নিয়েছিলেন। তিনি জানতেন, তার ভবিষ্যৎ বংশধররা ঠিকই একদিন হিন্দুস্তানকে নিজেদের মতো করে সাজিয়ে নিবে। আর তারা হিন্দুস্তানকে মন থেকেই আপন করে নিবে। বাবরের ধারণা কোনো অংশেই ভুল প্রমাণিত হয়নি। বাবরের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম ঠিকই হিন্দুস্তানকে ভালোবেসে শক্ত করে আঁকড়ে ধরেছিলেন। নিজেদের মন মতো নানা রঙ্গে তারা হিন্দুস্তানকে সাজিয়ে তুলেছিলেন। আজও হিন্দুস্তানের পথে প্রান্তরে তাদের ভালোবাসার সেসবের ছাপ খুঁজে পাওয়া যায়।

 

তথ্যসূত্র

১. মোগল সাম্রাজ্যের সোনালী অধ্যায়, সাহাদত হোসেন খান, আফসার ব্রাদার্স, ২য় মুদ্রণ

২. বাবরনামা, মূল: জহির উদ দিন মুহাম্মদ বাবুর, অনুবাদ: মুহাম্মদ জালালউদ্দীন বিশ্বাস, ঐতিহ্য, প্রকাশকাল: ফেব্রুয়ারী ২০১৬

৩. হুমায়ুননামা, মূল: গুলবদন বেগম, অনুবাদ: এ কে এম শাহনাওয়াজ, জ্ঞানকোষ প্রকাশনী, প্রকাশকাল: জানুয়ারী ২০১৬

এই সিরিজের আগের পর্বসমূহ

১। প্রাক-মুঘল যুগে হিন্দুস্তানের রাজনৈতিক অবস্থা || ২। তরাইনের যুদ্ধ: হিন্দুস্তানের ইতিহাস পাল্টে দেওয়া দুই যুদ্ধ || ৩। দিল্লী সালতানাতের ইতিকথা: দাস শাসনামল || ৪। রাজিয়া সুলতানা: ভারতবর্ষের প্রথম নারী শাসক || ৫। দিল্লি সালতানাতের ইতিকথা: খিলজী শাসনামল || ৬। দিল্লি সালতানাতের ইতিকথা: তুঘলক শাসনামল || ৭। দিল্লি সালতানাতের ইতিকথা: তৈমুরের হিন্দুস্তান আক্রমণ ও সৈয়দ রাজবংশের শাসন || ৮। দিল্লী সালতানাতের ইতিকথা: লোদী সাম্রাজ্য || ৯। রাজকীয় মুঘল সেনাবাহিনীর গঠন এবং গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস || ১০। রাজকীয় মুঘল সেনাবাহিনীর ব্যবহৃত কিছু অস্ত্রশস্ত্র || ১১। জহির উদ-দিন মুহাম্মদ বাবুর: ‘একজন’ বাঘের উত্থান || ১২। বাদশাহ বাবরের কাবুলের দিনগুলো || ১৩। বাদশাহ বাবর: হিন্দুস্তানের পথে || ১৪। বাদশাহ বাবরের হিন্দুস্তান অভিযান: চূড়ান্ত লড়াইয়ের প্রস্তুতি || ১৫। মুঘল সাম্রাজ্যের উত্থান: হিন্দুস্তানে বাবরের চূড়ান্ত লড়াই || ১৬। খানুয়ার যুদ্ধ: মুঘল বনাম রাজপুত সংঘাত || ১৭। ঘাঘরার যুদ্ধ: মুঘল বনাম আফগান লড়াই || ১৮। কেমন ছিল সম্রাট বাবরের হিন্দুস্তানের দিনগুলো?

ফিচার ইমেজ: tolonews.com

Related Articles