এল ক্লাসিকো: ফুটবলের বাইরে দুটি ভিন্ন সংস্কৃতির লড়াই

স্প্যানিশ ফুটবলের সবচেয়ে বড় নামগুলোর প্রসঙ্গ উঠলে বার্সেলোনা ও রিয়াল মাদ্রিদের নাম আসতে বাধ্য। হালের আতলেতিকো মাদ্রিদ ‘জায়ান্ট কিলার’ হিসেবে খ্যাতি কুড়ালেও এই দুই ক্লাবের পর্যায়ে উঠে আসতে আরও বহু পথ পাড়ি দিতে হবে। বার্সেলোনা কিংবা রিয়াল মাদ্রিদ– দুই ক্লাবই স্পেনের জাতীয় গন্ডি পেরিয়ে বৈশ্বিক ক্লাব ফুটবলের জগতে নিজেদের অস্তিত্বের জানান দিয়ে আসছে সগর্বে। ক্লাব ফুটবলের জাতীয় কিংবা আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় উভয় ক্লাবকেই প্রতিপক্ষ দলগুলো আলাদাভাবে সমীহ করে থাকে, কারণ বিশ্বের অন্যতম সেরা ফুটবলারেরা খেলে থাকেন এই দুই ক্লাবে। আরেকটি বড় বৈশিষ্ট্য হলো, বিশ্বজুড়ে উভয় ক্লাবেরই কোটি কোটি সমর্থক রয়েছে, উভয়েই প্রতি বছর শত শত মিলিয়ন ইউরো আয় করে।

বিশ্ববিখ্যাত দুই ক্লাব যখন পরস্পরের মুখোমুখি হয়, তখন তা ফুটবলবোদ্ধা থেকে শুরু সমর্থকদের নজর কাড়তে সক্ষম হবে, এটাই স্বাভাবিক। দুই ক্লাবের মুখোমুখি লড়াইকে অভিহিত করা হয় ‘এল ক্লাসিকো’ নামে, যেটি ইতিহাসের সবচেয়ে ধ্রুপদী লড়াইগুলোর একটি। আপনি যদি ভেবে থাকেন শুধু তিন পয়েন্ট কিংবা একে অপরকে নক-আউট করার লক্ষ্যে ক্লাব দুটির খেলোয়াড়েরা ফুটবলীয় লড়াইয়ে নেমে যায়, তাহলে বলতে হবে আপনি পর্দার আড়ালের অনেক কিছু সম্পর্কেই অবগত নন। বার্সেলোনা-রিয়াল মাদ্রিদের লড়াই শুধু ফুটবলের না, দুটি ভিন্ন সংস্কৃতি, দুটি ভিন্ন প্রদেশের আলাদা রাজনৈতিক মতাদর্শেরও লড়াই।

জতজতজতিতজত
এল ক্লাসিকো মানেই সময়ের অন্যতম সেরা খেলোয়াড়দের লড়াই; image source: en.as.com

“ফুটবল সবসময় রাজনীতি থেকে আলাদা রেখে খেলা হয়েছে কিংবা ফুটবলের সাথে কখনও রাজনীতি মেশানো হয়নি”– এই ধরনের কোনো মন্তব্যের পক্ষে কিন্তু স্প্যানিশ ফুটবলের ইতিহাস সায় দেয় না। শাসকের অন্যায়-নিপীড়ন থেকে জনগণের মনোযোগ সরিয়ে দিতে অসংখ্যবার খেলাধুলাকে ব্যবহার করা হয়েছে, হচ্ছে। ইতালির মুসোলিনি ইতালির জাতীয় দলের ফুটবলীয় শ্রেষ্ঠত্বকে কাজে লাগিয়ে তীব্র জাতীয়তাবাদের আফিমে জনগণকে ডুবিয়ে রেখেছিলেন। রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন তরুণ প্রজন্মের মধ্যে নিজের জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি এবং রুশ জনগণের ক্রমবর্ধমান জনরোষকে ভিন্নপথে ঘুরিয়ে দিতেই ২০১৮ সালের বিশ্বকাপের জন্য রাশিয়াকে প্রস্তুত করেছিলেন, এরকম কানাঘুঁষাও শোনা যায়। ইতিহাস ঘাঁটতে বসলে হয়তো এরকম আরও অনেক উদাহরণ সামনে আসবে।

রিয়াল মাদ্রিদ ক্লাবটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল স্পেনের রাজধানী মাদ্রিদে। স্পেনের তৎকালীন শাসকগোষ্ঠী মূলত মাদ্রিদ-কেন্দ্রিক হওয়ায় রিয়াল মাদ্রিদকে কখনও শাসকের রোষানলে পড়তে হয়নি– এই কথার পক্ষে ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়। কুখ্যাত জেনারেল ফ্রাংকো তার সময়ে রিয়াল মাদ্রিদের ইউরোপীয় পর্যায়ে অর্জিত সাফল্যে বেশ উচ্ছ্বসিত হন। তার এরকম একটি নিজ অঞ্চলের ক্লাবের প্রয়োজন ছিল, যার সাফল্যকে তিনি ‘নিজ শাসনের সাফল্য’ হিসেবে প্রচার করতে পারবেন। রিয়াল মাদ্রিদ এই ধরনের মহাদেশীয় সাফল্য এনে দেওয়ায় ক্লাবটি জেনারেল ফ্রাংকোর কাছ থেকে আরও বেশি অনুগ্রহ পেতে থাকে। স্পেনের রাজপরিবারও রিয়াল মাদ্রিদের প্রতি অনুরক্ত ছিল বলে ইতিহাসে জানায়।

জেনারেল ফ্রাংকোর সময়ে স্প্যানিশ জাতীয়তাবাদের বিরোধিতা যারা করেছিল তাদের উপর চরম অত্যাচার নেমে আসে। কাতালোনিয়ার নাগরিকেরা চেয়েছিল স্পেন থেকে আলাদা হতে, আলাদা রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে। সেজন্য তাদেরকে দমিয়ে রাখা হয়, সেই সাথে রাজনৈতিক অধিকারও কেড়ে নেয়া হয়। স্বায়ত্তশাসিত সকল কাতালান প্রতিষ্ঠানকে নিষিদ্ধ করা হয়, এমনকি কাতালান ভাষার ব্যবহারও নিষিদ্ধ করা হয়। যেহেতু জেনারেল ফ্রাংকোর চোখে কাতালান স্বাধীনতাকামীরা ছিল ‘বিচ্ছিন্নতাবাদী’, তাই অনেক কাতালান নাগরিককে জেলে পুরে রাখা হয়, সশস্ত্র বাহিনীর মাধ্যমে হত্যা করা হয়। কাতালান নাগরিকদের উপর রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন সেসময়ের নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা ছিল।

হডুডুডিড
জেনারেল ফ্রান্সিসকো ফ্রাংকো: কাতালানদের চোখের কাঁটা; image source: slate.com

জেনারেল ফ্রাংকোর সকল ধরনের নিপীড়ন-নির্যাতন সহ্য করেও কাতালান নাগরিকেরা একটি জায়গায় এসে স্বাধীনতার স্বাদ উপভোগ করতো। সেই জায়গার নাম ক্যাম্প ন্যু। বার্সেলোনা ক্লাবটির ঐতিহ্যবাহী হোমগ্রাউন্ড, ইউরোপের সবচেয়ে বড় ফুটবল স্টেডিয়াম হিসেবে যেটি এখন পৃথিবী বিখ্যাত। ক্যাম্প ন্যুতে কাতালান ভাষায় কথা বলতেন বার্সেলোনার সমর্থকেরা, কাতালোনিয়ার পতাকা পতপত করে উড়ত সেখানে। গোটা কাতালান রাজ্যে যখন ফ্রাংকোর সৈন্যরা কঠোর নজরদারিতে রেখেছিল সেখানকার অধিবাসীদের, তখন বার্সেলোনার খেলা দেখতে আসা হাজার হাজার সমর্থকের কণ্ঠে তীব্র আওয়াজে উচ্চারিত হতো স্বাধীনতার স্লোগান। ক্যাম্প ন্যুতে প্রতিটি ম্যাচের ১৭ মিনিট ১৪ সেকেন্ডের সময় সমর্থকেরা সমস্বরে গেয়ে উঠেন, “ইন! ইন-দে! ইন-দে-পেন-দেন-সি-য়া! (স্বা-ধী-ন-তা!)।” ১৭ মিনিট ১৪ সেকেন্ডে গেয়ে ওঠার তাৎপর্য হলো, ১৭১৪ সালে প্রথম কাতালোনিয়ার স্বায়ত্তশাসনের অধিকার হরণ করা হয়।

জেনারেল ফ্রাংকো যেহেতু কাতালোনিয়ার স্বাধীনতাকামী আন্দোলনকে কোনোভাবেই সহ্য করতে পারেননি, তাই কাতালানদের প্রাণের ক্লাব বার্সেলোনা স্বাভাবিকভাবেই ফ্রাংকোর নিষ্পেষণের শিকার হয়। কাতালান ভাষা নিষিদ্ধ হওয়ার কারণে বার্সেলোনার নামেও পরিবর্তন আসে ১৯৭৪ সালে। এছাড়া ১৯৩৬ সালে ফ্রাংকোর সৈন্যরা বার্সেলোনার তৎকালীন প্রেসিডেন্টকে প্রথমে অন্যায়ভাবে গ্রেফতার করে, পরবর্তীতে গোপন ট্রাইবুনালের মাধ্যমে অভিযুক্ত করে হত্যা করে। তবে এর পেছনে যতটা না ফুটবলীয় প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছিল, তার চেয়ে বেশি ছিল রাজনৈতিক মতাদর্শগত বিরোধ। হত্যার শিকার হওয়া দুর্ভাগা প্রেসিডেন্ট বামপন্থী রাজনীতির সাথে জড়িত ছিলেন, একটি বামপন্থী পত্রিকা নিয়মিত প্রকাশ করতেন। এছাড়া বার্সার খেলোয়াড়দের জার্সি থেকেও কাতালোনিয়ার সকল চিহ্ন ও প্রতীক মুছে ফেলতে নির্দেশ দেয়া হয়।

য়ননয়য়হসজজ
বার্সেলোনার হোমগ্রাউন্ড ক্যাম্প ন্যুতে সবসময়ই কাতালোনিয়ার স্বাধীনতার পতাকা উড়েছে; image source: thedailystar.net 

 

একটি ঘটনা হয়তো বুঝতে সাহায্য করবে যে জেনারেল ফ্রাংকোকে কাতালানবাসী কতটা ঘৃণা করতো। ১৯৭৫ সালের ২০ নভেম্বর জেনারেল ফ্রান্সিসকো ফ্রাংকো মারা যান। তার মৃত্যুর সংবাদে সেসময়ের বার্সেলোনা ক্লাব সেক্রেটারি জউমে রোসেল ও ডিরেক্টর হোয়ান গ্রানাদোয়েস জেনারেল ফ্রাংকোর ভাস্কর্য হাতে নিয়ে অবজ্ঞাভরে ছোড়াছুড়ি করতে থাকেন, যেটি বোঝায় কতটা অবরুদ্ধ অবস্থায় তারা দিনাতিপাত করছিলেন।

ঐতিহ্যগতভাবেই কাতালোনিয়া স্পেনের অঞ্চলগুলোর মধ্যে মুক্তচিন্তার পবিত্রভূমি হিসেবে পরিচিত। এখানকার মানুষ অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী হিসেবে পরিচিত যুগ যুগ দরে, কুসংস্কার কিংবা ধর্মীয় গোঁড়ামি থেকে তারা অনেক আগে থেকেই বের হয়ে এসেছে। অপরদিকে মাদ্রিদের অধিবাসীরা তুলনামূলক রক্ষণশীল। দুই অঞ্চলের ভাষা থেকে শুরু করে সব কিছুতেই পার্থক্য রয়েছে। মাদ্রিদ তুলনামূলক স্থিতিশীল অঞ্চল, এখানকার আকাশে বিদ্রোহের ঘনঘটা নেই, এখানকার অধিবাসীদের দশকের পর দশক পুলিশি নির্যাতন ভোগ করতে হয়নি। অপরদিকে কাতালোনিয়া হারানো স্বাধীনতা আবার ফিরে পাওয়ার স্বপ্নে বিভোর থাকা পরিশ্রমীদের জায়গা, মুক্ত বাতাসে শ্বাস নেয়ার অপেক্ষায় থাকা উন্মত্ত ফুটবলপ্রেমীদের জায়গা।

সনসহহসসহ
স্পেনের শৃঙ্খল থেকে মুক্ত হতে কাতালান নাগরিকদের স্বাধীনতা আন্দোলনের খন্ডচিত্র; image source: counterfire.org

বার্সেলোনা দলটি শুরু থেকেই কাতালানবাসীদের চেতনা লালন করে আসছে। কাতালোনিয়ার বাইরের ফুটবলাররাও এখানে এসে কাতালানবাসীদের সাথে সংহতি প্রকাশ করেন। ক্লাব কর্তৃপক্ষ কখনও স্প্যানিশ শাসকগোষ্ঠীর কাছে বিক্রি হয়ে যায়নি, সবসময় কাতালান নাগরিকদের কথা বলার, স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষাকে প্রকাশ করার জায়গা দিয়ে এসেছে। বার্সেলোনার ট্রফি ক্যাবিনেটে হয়তো রিয়াল মাদ্রিদের মতো শিরোপার প্রাচুর্য নেই, তারপরও ‘ক্লাবের চেয়েও বেশি কিছু’ হয়ে ওঠার সব ধরনের গল্প রচনা করা হয়েছে এখানে।

জেনারেল ফ্রাংকোর নির্যাতন সহ্য করে খেলা চালিয়ে যাওয়া, আলফ্রেডো ডি স্টেফানোকে চোখের সামনে থেকে কেড়ে নিয়ে যাওয়া, ফ্লোরেন্তিনো পেরেজের কৌশলে লুই ফিগোর বার্সেলোনা থেকে চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী রিয়াল মাদ্রিদে গমন থেকে শুরু করে আরও অনেক ঘটনা এল ক্লাসিকোর তাৎপর্য ক্রমশ বাড়িয়েছে।

শুধু স্পেনেই নয়, এল ক্লাসিকোর টানটান উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে পুরো বিশ্বে। এল ক্লাসিকো নিয়ে শুরু হওয়া তর্কের জেরে আফ্রিকার দেশ অ্যাঙ্গোলায় নিহতের ঘটনা ঘটে, ইরাকে সংঘর্ষ হয়, ভারত ও দক্ষিণ কোরিয়ায় মারামারির সংবাদ আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় জায়গা করে নেয়। ইতালির তুরিনে পাড়ি দেয়ার আগে মেসি-রোনালদোর দ্বৈরথে এল ক্লাসিকো হয়ে উঠেছিল আরও অনেক বেশি উপভোগ্য। বার্সেলোনা-রিয়াল মাদ্রিদ দ্বৈরত শুধু তাই আর তিন পয়েন্টে আটকে নেই, হয়ে উঠেছে দুটি ভিন্ন সংস্কৃতি ও রাজনৈতিক মতাদর্শ লালন করে চলা লাখ লাখ মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষা, চেতনার নির্ধারক হিসেবে।

Related Articles