আমাদের জীবনে মাঝে মাঝে এমন কিছু ঘটনা ঘটে যায় যার ব্যাখ্যা পাওয়া বেশ দুষ্কর। কেউ কেউ সেগুলোকে কাকতালীয় ঘটনা বলে ভাবতে চান, কেউ আবার একধাপ এগিয়ে গিয়ে সেগুলোকে কারো ‘অভিশাপ’ হিসেবে ভাবতেই বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন। ইতিহাসেও এমন কিছু কাকতালীয় ঘটনা আছে যা অনেকের কাছেই অভিশাপ হিসেবে পরিচিত। ইতিহাসের বিখ্যাত তেমনি কিছু অভিশাপের কাহিনী নিয়েই সাজানো হয়েছে আজকের পুরো লেখা।

তৈমুর লং-এর হুঁশিয়ারি

তুর্কী-মোঙ্গল সেনাধ্যক্ষ তৈমুর লং ছিলেন তিমুরীয় সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা। ১৩৭০ থেকে ১৪০৫ সাল পর্যন্ত ৩৫ বছর পর্যন্ত ছিলো তার রাজত্ব। আজকের দিনের তুরষ্ক, সিরিয়া, ইরাক, কুয়েত, ইরান থেকে মধ্য এশিয়ার অধিকাংশ অংশ (কাজাখস্তান, আফগানিস্তান, রাশিয়া, তুর্কমেনিস্তান, উজবেকিস্তান, কিরগিজস্তান, পাকিস্তান, ভারত, এমনকি চীনের কাশগর পর্যন্ত) তার সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত ছিলো। ১৪০৫ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি মারা যান সুপরিচিত এ বিজেতা।

তৈমুর লং-এর ভাষ্কর্য

এখন কয়েক শতাব্দী সামনে আসা যাক। ১৯৪১ সালের কথা। স্থানীয় মুসলমান বাসিন্দা ও ইমামের সতর্কতা উপেক্ষা করে সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের নেতা জোসেফ স্টালিন একদল ভূতত্ত্ববিদকে উজবেকিস্তানের সমরকন্দে পাঠিয়েছিলেন তৈমুরের কবরটি খনন করে দেহাবশেষ বের করে আনার জন্য। অবশেষে ১৯৪১ সালের ১৯ জুন দলনেতা মিখাইল গেরাসিমভের নেতৃত্বে তৈমুর লং-এর কবরটি পুনরায় খনন করা হয়। কবর খোড়ার পর তারা একটি কফিন পান যাতে লেখা ছিলো- “যে আমার কবর খুলবে, সে আমার চেয়েও ভয়াবহ এক আক্রমণকারীকে লেলিয়ে দিবে।”

কাকতালীয়ভাবে এর মাত্র দু’দিনের মাথায় হিটলার আক্রমণ করে বসেন সোভিয়েত ইউনিয়নে এবং এর ধাক্কায় প্রায় ২৬ মিলিয়ন লোক প্রাণ হারায়। ঐতিহাসিকদের মতে, তৈমুরের যুদ্ধাভিযানে ১৭ মিলিয়নের মতো মানুষ মারা গিয়েছিলো। ১৯৪২ সালে স্টালিন তৈমুরের দেহাবশেষ ইসলামিক রীতি অনুযায়ী পুনরায় কবর দেয়ার নির্দেশ দেন। আবারো কাকতালীয়ভাবে এর কিছুদিন পরেই স্টালিনগ্রাদে জার্মান বাহিনী আত্মসমপর্ণ করে।

অভিশপ্ত রত্ন

সতের শতকে ফরাসী রত্ন ব্যবসায়ী জিন-ব্যাপ্টিস্ট ট্যাভার্নিয়ার ভারতে এসে এক দেবীর মূর্তি থেকে ১১৫.১৬ ক্যারাটের নীলরঙা একটি ডায়মন্ড চুরি করেন। এটি সেই দেবীর চোখের জায়গায় লাগানো ছিলো।

জিন-ব্যাপ্টিস্ট ট্যাভার্নিয়ার

১৬৬৯ সালে ফ্রান্সের রাজা চতুর্দশ লুই এটি ট্যাভার্নিয়ারের কাছ থেকে কিনে নেন। ১৬৭৩ সালে তিনি একে পুনরায় কাটানোর ব্যবস্থা করেন। তখন এটি ‘The Blue Diamond Of The Crown’ অথবা ‘French Blue’ নামে পরিচিত ছিলো। ৭২ বছর বয়সে গ্যাংগ্রিনে আক্রান্ত হয়ে মারা যান তিনি।

রাজা চতুর্দশ লুই

চতুর্দশ লুইয়ের রাজস্ব বিভাগের নিয়ন্ত্রক ছিলেন নিকোলাস ফুকুয়েট, যিনি কিনা কিছু উৎসবে এ ডায়মন্ডটি নিজের শোভাবর্ধনের জন্য ব্যবহার করেছিলেন। এর কিছুদিন পরেই রাজার সাথে কিছু কারণে তার সম্পর্ক খারাপ হয় এবং তাকে ফ্রান্স থেকে নির্বাসন দেয়া হয়। পরবর্তীতে রাজা এ শাস্তি পরিবর্তন করে তাকে যাবজ্জীবন কারাদন্ড দেন। পিগ্নেরল দূর্গে ফুকুয়েটকে ১৫ বছর বন্দী রাখা হয়।

পরবর্তীতে উত্তরাধিকার সূত্রে এ ডায়মন্ডটি পান রাজা ষোড়শ লুই। তাই স্ত্রী মেরি অ্যান্টোইনেট এটি ব্যবহার করতেন। ফরাসী বিদ্রোহে দুজনেরই শিরোচ্ছেদ করা হয়েছিলো।

একসময় এ ডায়মন্ডটি যায় ইংল্যান্ডের লর্ড ফ্রান্সিস হোপের কাছে। তিনি আমেরিকান এক নারীকে বিয়ে করেছিলেন। দুজনেরই টাকা ওড়ানোর অভ্যাস ছিলো। ফলে একসময় তারা ডায়মন্ডটি বেঁচে দেন এবং পরবর্তীতে দারিদ্র্য তাদের আরো ঘিরে ধরেছিলো।

ডাচ রত্ন ব্যবসায়ী উইলহেল্‌ম ফল্‌সের হাতে ডায়মন্ডটি পড়লে তিনি এটিকে আবারো কেটেছিলেন। শেষ পর্যন্ত নিজের ছেলের হাতে তিনি খুন হন। ছেলেটি নিজেও আত্মহত্যা করেছিলো।

গ্রীক বণিক সাইমন মাওন্‌কারিড্‌স একবার ডায়মন্ডটির মালিক হয়েছিলেন। খাঁড়া পাহাড় থেকে গাড়িসহ পড়ে গিয়ে স্ত্রী, সন্তানসহ মৃত্যুবরণ করেন তিনি।

নীল বর্ণের এ ডায়মন্ডটির সর্বশেষ মালিক ছিলেন আমেরিকার নাগরিক এভালিন ওয়ালশ ম্যাকলীন। ডায়মন্ডটি কেনার আগপর্যন্ত তার জীবন বেশ চমৎকারভাবেই কাটছিলো। ডায়মন্ডটি তিনি মাঝে মাঝেই গলায় ঝোলাতেন। এমনকি কখনো কখনো নিজের পোষা কুকুরের নেকলেসেও শোভা পেতো সেটি। এরপরই যেন তার জীবনে নেমে আসে অন্ধকার। প্রথমেই মারা যান তার শাশুড়ি। এরপর মাত্র নয় বছর বয়সে মারা যায় তার ছেলে। পরবর্তীতে আরেক মহিলার আশায় তাকে ছেড়ে যান তার স্বামী (যদিও তিনি শেষ পর্যন্ত এক মানসিক হাসপাতালে মারা যান)। পঁচিশ বছর বয়সে মাত্রাতিরিক্ত ওষুধ সেবনের ফলে মারা যায় তার মেয়ে। অর্থ সংকটে ভুগে নিজের সহায়-সম্পদ বিক্রি করতে বাধ্য হন তিনি। ঋণগ্রস্ত অবস্থায়ই মারা যান এভালিন।

এভালিন ওয়ালশ ম্যাকলীন

এভালিনের বেঁচে থাকা সন্তানেরা এ ডায়মন্ডটি হ্যারি উইনস্টন নামে আরেক লোকের কাছে বিক্রি করে দেন। নয় বছর পর তিনি এ ডায়মন্ডটি স্মিথসোনিয়ান ন্যাশনাল মিউজিয়াম অফ ন্যাচারাল হিস্টোরিতে কিছু অর্থের বিনিময়ে ডাকযোগে পাঠিয়ে দেন। সেই ডায়মন্ড নিয়ে যাওয়া ডাকপিয়ন জেমস টড এক ট্রাক দুর্ঘটনার শিকার হয়েও সৌভাগ্যক্রমে বেঁচে। কিছুদিন পরই বেচারার স্ত্রী ও পোষা কুকুরটি মারা যায়। আরেকটি দুর্ঘটনায় মাথাতেও আঘাত পেয়েছিলেন টড। আরেকবার তার বাড়িতেও আগুন ধরে গিয়েছিলো।

অবশেষে ১৯৫৮ সাল থেকে ডায়মন্ডটি স্মিথসোনিয়ান মিউজিয়ামেই আছে। এরপর থেকে একে ঘিরে আর কোনো দুর্ঘটনার কথা শোনা যায় নি।

মমি রহস্য

১৯৯১ সালের সেপ্টেম্বর মাসের কথা। অস্ট্রিয়ার দক্ষিণাঞ্চলের ওট্‌জাল পর্বতমালায় খুঁজে পাওয়া গেলো প্রায় ৩,৩০০ বছরের পুরনো এক প্রাকৃতিক মমির সন্ধান। জায়গার নাম অনুযায়ী মমিটির নাম রাখা হলো ওটজি। সন্ধান পাবার বছরখানেক পর থেকেই ওটজিকে ঘিরে এমন সব কান্ডকারখানা ঘটতে থাকলো যে, লোকে তাকে অভিশপ্ত ভাবা শুরু করে দিলো।

ওটজি

ওটজিকে প্রথম দেখতে পান জার্মান ট্যুরিস্ট হেলমুট সাইমন। ২০০৪ সালে হাইকিংয়ের সময় পড়ে গিয়ে মারা যান তিনি। তিনি যে জায়গায় দাঁড়িয়ে প্রথম ওটজিকে দেখেছিলেন, এর কাছাকাছি জায়গাতেই তার মৃত্যু হয়। সাইমনের নিখোঁজ হবার খবর পাওয়া গেলে তাকে খুঁজে বের করতে এক উদ্ধারকারী দল পাঠানো হয় যার প্রধান ছিলেন ডিয়েটার ওয়ারনেক। সাইমনের মৃতদেহ খুঁজে পাবার পর আয়োজন করা হয় শেষকৃত্যানুষ্ঠানের। এর এক ঘন্টার মাথায় হার্ট অ্যাটাকে মারা যান ওয়ারনেক। এপ্রিলে মাল্টিপল স্ক্লেরোসিসে মারা যান প্রত্নতত্ত্ববিদ কন্‌রাড স্পিন্ডলার যিনি প্রথম ওটজির দেহটি পরীক্ষা করেছিলেন। ওটজিকে নিয়ে পরীক্ষা করা ফরেনসিক টিমের প্রধান রেইনার হেন তাকে নিয়ে এক লেকচার দিতে যাবার সময় সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যান। কার্ট ফ্রিৎজ নামক যে পর্বতারোহী হেনকে ওটজির কাছে নিয়ে গিয়েছিলেন, তিনিও তুষারধ্বসে মারা যান। আবার ওটজিকে বরফের নিচ থেকে তুলে আনার দৃশ্য ধারণ করা অস্ট্রিয়ান সাংবাদিক রেইনার হোয়েলজ্‌ল মারা যান ব্রেইন টিউমারে।

রহস্যময় চেয়ার

এখনের ঘটনাটি একটু অদ্ভুত। এজন্য ১৭০২ সালের উত্তর ইয়র্কশায়ারে চলে যেতে হবে আমাদের। থমাস বাস্‌বি নামক এক লোক শ্বশুরের সাথে বিবাদে জড়িয়ে তাকে খুন করে বসে। বাস্‌বির আবার মাঝে মাঝেই মদ্যপানের অভ্যাস ছিলো। তার প্রিয় চেয়ারে তার শ্বশুর বসায় তিনি তাকে খুন করেছিলেন!

এরপর যথারীতি পুলিশের হাতে ধরা পড়েন তিনি। বাস্‌বির মৃত্যুদন্ড কার্যকরের আগে তিনি কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে অনুমতি চান একবার সেই পানশালায় যাবার। তারপর সেখানে গিয়ে তিনি অভিশাপ দিয়ে আসেন যে, তার চেয়ারে যে লোকই বসবে, শীঘ্রই তার মৃত্যু হবে। বাস্‌বির এমন অভিশাপের কথা শুনে তখনকার সময়ের মানুষ ভয়ে আর সেই চেয়ারে বসতে সাহস পেত না।

বাস্‌বির সেই চেয়ার মিউজিয়ামের দেয়ালে ঝোলানো

এরপর একসময় আসে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ। পানশালাটিতে প্রায় সময়ই বিমান বাহিনীর সদস্যরা ভিড় জমাতেন। খেয়াল করে দেখা গেলো- যারা বাস্‌বির সেই চেয়ারটিতে বসছেন, তারা কেউই আর যুদ্ধ থেকে ফেরত আসেন নি! পরবর্তীকালে রয়্যাল এয়ার ফোর্সের দুজন সদস্য, এক মিস্ত্রী, এক শ্রমিক এবং এক মালামাল সরবরাহকারী ব্যক্তি এ চেয়ারে বসেছিলেন। এদের প্রত্যেকেই কোনো না কোনো দুর্ঘটনায় মারা যান।

সব শেষে পানশালার মালিক নিজেও এতে ভয় পেয়ে যান। তিনি এরপর থার্স্ক মিউজিয়ামে এ চেয়ারটি দিয়ে দেন। সেখানেও চেয়ারটিকে দেয়ালের সাথে ঝুলিয়ে রাখা আছে যাতে কেউ সেখানে বসতে না পারে! অর্থাৎ এতসব অপঘাতে মৃত্যু দেখে মিউজিয়াম কর্তৃপক্ষও ‘বাস্‌বির অভিশাপ’ নামক কুসংস্কারটিতে বিশ্বাস করেছিলো।

রাসপুতিনের ভবিষ্যৎ বাণী

গ্রিগরি রাসপুতিনের নাম শুনেছেন অনেকেই। সাইবেরিয়ার কৃষক পরিবারে জন্ম নেয়া রাসপুতিন তার অদ্ভুত রোগ সারানোর ক্ষমতার বলে একসময় রাশিয়ার সম্রাট দ্বিতীয় নিকোলাসের সভায় জায়গা করে নিতে সক্ষম হন। রাসপুতিনের করা ভবিষ্যৎ বাণীগুলোর কার্যকারিতা দেখে সম্রাজ্ঞী আলেকজান্দ্রা ফিওদোরোভ্‌না তাকে তার ব্যক্তিগত পরামর্শক হিসেবে নিয়োগ দেন।

গ্রিগরি রাসপুতিন

রাসপুতিন অনেকের কাছে পরিচিত ছিলেন এক জাদুকর হিসেবে। সেন্ট পিটার্সবার্গের অভিজাত ব্যক্তিবর্গ তার এমন কাজকর্মে মুগ্ধ হলেও তার মতো একজন লোকের সাথে সম্রাজ্ঞীর ঘনিষ্ঠতাকে তারা সহজভাবে নিতে পারে নি। তাই এরপর থেকে নানা কারণে শুরু হয় তাকে হত্যার নানা প্রচেষ্টা। বিষ খাইয়ে, অমানুষিকভাবে পিটিয়ে, এমনকি বেশ কয়েকটি গুলি গায়ে লাগার পরও বেঁচে যান তিনি। অবশ্য শেষ রক্ষা আর হয় নি। শেষ পর্যন্ত হাত-পা বেঁধে এক নদীতে ফেলে দিলে সেখানেই ডুবে মৃত্যু হয় বেচারার।

মৃত্যুর আগে রাসপুতিন সম্রাটের কাছে একটি চিঠি পাঠিয়েছিলেন। সেখানে তিনি তাকে খুন করা হলে রাশিয়ার রাজ পরিবারের কী হবে সেই সম্পর্কে চমৎকার ভবিষ্যৎ বাণী করেছিলেন। সেখানে তিনি বলেছিলেন যে, আর বছরখানেকের মাঝেই সপরিবারে নিহত হবেন সম্রাট এবং সত্যি সত্যিই সেটি ঘটেছিলো। মাত্র দেড় বছরের মাঝেই সম্রাট, সম্রাজ্ঞী এবং তাদের পাঁচ সন্তান নৃশংসভাবে খুন হয়েছিলেন।

সপরিবারে সম্রাট দ্বিতীয় নিকোলাস

ইতিহাস ঘাঁটলে এমন আরো অনেক ঘটনারই সন্ধান পাওয়া যাবে। আপনি এটাকে কাকতালীয়ও ভাবতে পারেন, আবার অভিশাপও ভাবতে পারেন। এ অধিকার আপনার আছেই। তবে এসব কাকতালীয় ঘটনার একের পর এক ঘটে যাওয়ার ইতিহাস মাঝে মাঝে আমাদের আশ্চর্য করে বৈকি!

 

This article is in Bangla Language. Its about famous historical curses of the world.

References:

1. livescience.com/38670-famous-historical-curses.html
2. listverse.com/2013/10/06/10-cruel-curses-and-their-unfortunate-victims/
3. unsolvedmysteries.wikia.com/wiki/Chair_of_Death

Featured Image:  REUTERS/Sudtiroler Archaeologiemuseum/EURAC/Marco Samadelli-Gregor Staschitz/ Handout via Reuters