রুয়ান্ডান গণহত্যায় ফ্রান্সের বিতর্কিত ভূমিকা (পর্ব–১)

২০২১ সালের ১৯ এপ্রিল রুয়ান্ডান সরকার ৬০০ পৃষ্ঠার একটি প্রতিবেদনে দাবি করেছে, ১৯৯৪ সালে সংঘটিত রুয়ান্ডান গণহত্যার জন্য ফ্রান্স ‘ব্যাপকভাবে’ দায়ী ছিল। এর মধ্য দিয়ে রুয়ান্ডান গণহত্যায় ফ্রান্সের ভূমিকার বিষয়টি নিয়ে নতুন করে আলোচনা–সমালোচনা শুরু হয়েছে। উল্লেখ্য, ১৯৯৪ সালে সংঘটিত রুয়ান্ডান গণহত্যায় অন্তত ৮ লক্ষ মানুষ নিহত হয় এবং একে বিশ্বের সবচেয়ে নৃশংস গণহত্যাগুলোর একটি হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

রুয়ান্ডায় ঔপনিবেশিক শাসন এবং হুতু–তুতসি সংঘাত

রুয়ান্ডা আফ্রিকা মহাদেশের একটি ক্ষুদ্র স্থলবেষ্টিত রাষ্ট্র। ২৬,৩৩৮ বর্গ কি.মি. আয়তন এবং প্রায় ১ কোটি ২৩ লক্ষ জনসংখ্যাবিশিষ্ট এই রাষ্ট্রটির জনসংখ্যার প্রায় ৮৫% জাতিগতভাবে হুতু এবং প্রায় ১৪% জাতিগতভাবে তুতসি। এই জাতিগত বিভাজন এবং উক্ত বিভাজন সংক্রান্ত রাজনৈতিক কূটকৌশল রুয়ান্ডার বিগত শতাব্দীর ইতিহাসকে অত্যন্ত রক্তাক্ত করে রেখেছিল, এবং এখন পর্যন্ত দেশটি এই ভয়াবহ অভিজ্ঞতার রেশ পুরোপুরি কাটিয়ে উঠতে পারেনি।

অতীতে রুয়ান্ডায় হুতু ও তুতসি শব্দদ্বয় দ্বারা পৃথক কোনো জাতি/নৃগোষ্ঠীকে বোঝাতো না, বরং দুটি পৃথক অর্থনৈতিক শ্রেণিকে বোঝান হতো। অপেক্ষাকৃত বিত্তবান ব্যক্তিরা ছিল তুতসি শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত, এবং অপেক্ষাকৃত দরিদ্র ব্যক্তিরা ছিল হুতু শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত। সেসময় যেকোনো ব্যক্তিই নিজের অর্থনৈতিক অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে হুতু বা তুতসি হতে পারত। অর্থাৎ, একজন ব্যক্তি হুতু পরিবারে জন্ম নিয়েও নিজের অর্জিত বিত্তবলে তুতসি হতে পারত, আবার বিপরীতক্রমে একজন তুতসিও হুতুতে পরিণত হতে পারত। কিন্তু ইউরোপীয় ঔপনিবেশিক শাসন এই ব্যবস্থায় ব্যাঘাত ঘটায় এবং এক মারাত্মক দ্বন্দ্বের জন্ম দেয়।

১৮৯৭ সালে রুয়ান্ডা জার্মানির একটি আশ্রিত রাষ্ট্রে পরিণত হয় এবং জার্মানরা রুয়ান্ডার হুতুদের তুলনায় তুতসিদের অধিকতর সুযোগ–সুবিধা প্রদান করে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় রুয়ান্ডা বেলজিয়ামের হস্তগত হয় এবং ১৯২৬ সালে অঞ্চলটিতে প্রত্যক্ষ বেলজীয় শাসন স্থাপিত হয়। বেলজীয়রাও প্রাথমিক পর্যায়ে হুতুদের তুলনায় তুতসিদের অধিকতর সুযোগ–সুবিধা প্রদান করে এবং ১৯৩৫ সালে হুতু ও তুতসি সম্প্রদায় দুটিকে স্থায়ীভাবে পৃথক করে দেয়। এর মধ্য দিয়ে হুতু–তুতসি বিভাজন অর্থনৈতিক বিভাজনের পাশাপাশি জাতিগত বিভাজনেও পরিণত হয় এবং হুতু–তুতসি দ্বন্দ্বের সূচনা হয়।

মানচিত্রে রুয়ান্ডা; Source: Nations Online Project

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর বেলজীয়রা রুয়ান্ডার প্রতি তাদের নীতিতে পরিবর্তন আনে এবং হুতুদের সুযোগ–সুবিধা প্রদান করতে শুরু করে। এই পর্যায়ে হুতুরা তুতসিদের তুলনায় অধিক সুযোগ–সুবিধা দাবি করতে থাকে এবং অঞ্চলটির রাজনৈতিক ক্ষমতা ক্রমশ হুতুদের হস্তগত হতে থাকে। ১৯৫০–এর দশকের শেষভাগে উভয় পক্ষের মধ্যে তীব্র দাঙ্গাহাঙ্গামা আরম্ভ হয়ে যায় এবং এর মধ্যেই ১৯৬২ সালে বেলজিয়াম রুয়ান্ডাকে স্বাধীনতা প্রদান করে। স্বাধীন রুয়ান্ডায় একটি হুতু–কর্তৃত্বাধীন সরকার স্থাপিত হয় এবং তারা তীব্র তুতসিবিরোধী নীতি গ্রহণ করে। এর ফলে হাজার হাজার তুতসি নিহত হয় এবং কয়েক লক্ষ তুতসি দেশত্যাগ করে পার্শ্ববর্তী রাষ্ট্রগুলোতে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়, যেখানে তাদের নিচু দৃষ্টিতে দেখা হত এবং তাদের প্রতি নানাবিধ বৈষম্য করা হতো।

১৯৭৩ সালে রুয়ান্ডান সেনাবাহিনীর মেজর জেনারেল জুভেনাল হাবিয়ারিমানা একটি সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে দেশটির শাসনক্ষমতা দখল করেন এবং একটি একদলীয় শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করেন। তাঁর অধীনে রুয়ান্ডান সরকারের তুতসিবিরোধী নীতি বজায় থাকে এবং রাষ্ট্রীয় মদদে তুতসিদের বিরুদ্ধে নিষ্পেষণ চালানো অব্যাহত থাকে, যদিও এ সময় তুতসিদের বিরুদ্ধে সংঘটিত হত্যাযজ্ঞের সংখ্যা তুলনামূলকভাবে হ্রাস পায়। এ সময় রুয়ান্ডায় বৃহৎ শক্তিগুলোর মধ্যে ফ্রান্সের প্রভাব ছিল সবচেয়ে বেশি। এদিকে ১৯৭৯ সালে পার্শ্ববর্তী রাষ্ট্র উগান্ডায় তুতসি নেতারা তুতসি শরণার্থীদের সমন্বয়ে ‘রুয়ান্ডান প্যাট্রিয়টিক ফ্রন্ট’ (আরপিএফ) নামক একটি সংগঠন সৃষ্টি করেন। এই সংগঠনটির উদ্দেশ্য ছিল রুয়ান্ডায় তুতসিদের পুনর্বাসন নিশ্চিত করা এবং এজন্য তারা সশস্ত্র সংগ্রামের পথ বেছে নেয়।

রুয়ান্ডান গৃহযুদ্ধ এবং তুতসিবিরোধী গণহত্যা

১৯৯০ সালে আরপিএফ উগান্ডায় তাদের ঘাঁটি থেকে উত্তর রুয়ান্ডায় আক্রমণ চালায় এবং এর মধ্য দিয়ে রুয়ান্ডান গৃহযুদ্ধ শুরু হয়ে যায়। যুদ্ধ শুরুর সঙ্গে সঙ্গেই রুয়ান্ডান সরকার অন্তত ৮,০০০ তুতসিকে গ্রেপ্তার করে ও ব্যাপক তুতসিবিরোধী প্রচারণা শুরু করে, এবং রুয়ান্ডা জুড়ে তুতসিদের বিরুদ্ধে হত্যাযজ্ঞ শুরু হয়। প্রায় তিন বছর যুদ্ধ চলে, কিন্তু কোনো পক্ষ বিশেষ সাফল্য অর্জন করতে ব্যর্থ হয়। ১৯৯৩ সালের আগস্টে উভয় পক্ষের মধ্যে ‘আরুশা চুক্তিসমূহ’ নামক একটি শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরিত হয় এবং উভয় পক্ষ যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়, কিন্তু ১৯৯৪ সালের ৬ এপ্রিল হুতু উগ্রপন্থীরা রুয়ান্ডান রাষ্ট্রপতি হাবিয়ারিমানাকে বহনকারী হেলিকপ্টারকে ভূপাতিত করে। হাবিয়ারিমানার মৃত্যুর পরপরই হুতু উগ্রপন্থীরা একটি অভ্যুত্থানের মাধ্যমে রুয়ান্ডার শাসনক্ষমতা দখল করে নেয় এবং তুতসিদের বিরুদ্ধে এক ভয়াবহ গণহত্যা শুরু করে।

হাবিয়ারিমানা নিহত হওয়ার পরের দিনই রুয়ান্ডা জুড়ে সৈন্য, পুলিশ, মিলিশিয়া ও বেসামরিক হুতু জনসাধারণ তুতসিদের বিরুদ্ধে এক নৃশংস হত্যাযজ্ঞ শুরু করে। ১৯৯৪ সালের ৭ এপ্রিল থেকে ১৫ জুলাইয়ের মধ্যে হুতু উগ্রপন্থীদের হাতে প্রায় ৫ থেকে ৮ লক্ষ তুতসি (ও তুতসিদের সমর্থনকারী হুতু) নিহত হয় এবং আড়াই লক্ষ থেকে পাঁচ লক্ষ তুতসি নারী (ও তুতসি পুরুষদের সঙ্গে বিবাহিত হুতু নারী) ধর্ষণের শিকার হয়। এত কম সময়ের মধ্যে এত বড় মাত্রার হত্যাযজ্ঞ সম্পাদনের ঘটনা মানব ইতিহাসে বিরল।

রুয়ান্ডার রাজধানী কিগালির দক্ষিণে অবস্থিত ন্তামারা গির্জার ধ্বংসাবশেষ। ১৯৯৪ সালে হুতু মিলিট্যান্টরা এখানে আশ্রয় গ্রহণকারী প্রায় ৫,০০০ তুতসিকে হত্যা করেছিল; Source: Wikimedia Commons

আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এই গণহত্যা রোধের ক্ষেত্রে চরম ব্যর্থতার পরিচয় প্রদান করে। জাতিসংঘ কর্তৃক তুতসিদের রক্ষার উদ্দেশ্যে রুয়ান্ডায় মোতায়েনকৃত ‘জাতিসংঘ রুয়ান্ডা সহায়তা মিশন’ (United Nations Assistance Mission for Rwanda, ‘UNAMIR’) নির্বাক দর্শক হিসেবে এই হত্যাযজ্ঞ অবলোকন করে, কারণ বিশ্বশক্তিগুলো আফ্রিকার প্রত্যন্ত অঞ্চলের একটি গৃহযুদ্ধে সরাসরি হস্তক্ষেপ করতে আগ্রহী ছিল না। বৃহৎ শক্তিগুলোর মধ্যে একমাত্র ফ্রান্সই রুয়ান্ডান গৃহযুদ্ধে সরাসরি হস্তক্ষেপ করে, কিন্তু গণহত্যার শিকার তুতসিদের রক্ষা করার জন্য নয়, বরং গণহত্যাকারী রুয়ান্ডান সরকারকে রক্ষা করার জন্য!

এদিকে রুয়ান্ডান গণহত্যা শুরু হওয়ার পরপরই আরপিএফ নতুন করে আক্রমণাভিযান শুরু করে এবং ১৯৯৪ সালের জুলাইয়ের মধ্যে প্রায় সমগ্র রুয়ান্ডা অধিকার করে নেয়। এর মধ্য দিয়ে রুয়ান্ডান গণহত্যার অবসান ঘটে এবং রুয়ান্ডার হুতু–নিয়ন্ত্রিত সরকার দেশ ছেড়ে পালিয়ে পার্শ্ববর্তী জায়ারেতে (বর্তমান কঙ্গো গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র) আশ্রয় নেয়। তখন থেকে তুতসি–প্রধান আরপিএফ রুয়ান্ডার শাসনক্ষমতায় অধিষ্ঠিত রয়েছে।

লা ফ্রাঙ্কোফোনি এবং রুয়ান্ডান গৃহযুদ্ধে ফ্রান্স

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর অন্যান্য ইউরোপীয় ঔপনিবেশিক সাম্রাজ্যের মতো ফরাসি ঔপনিবেশিক সাম্রাজ্যেরও পতন ঘটে। কিন্তু ব্রিটেন যেরকম যুদ্ধ ব্যতিরেকে অধিকাংশ উপনিবেশ থেকে নিজেদের প্রত্যাহার করে নিয়েছিল, ফ্রান্স সেরকম নমনীয়তা প্রদর্শন করতে পারেনি। এর ফলে ইন্দোচীন ও আলজেরিয়ায় ফ্রান্সকে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে লিপ্ত হতে হয় এবং অবশেষে তারা তাদের ঔপনিবেশিক সাম্রাজ্য ত্যাগ করতে বাধ্য হয়। কিন্তু এরপরও ফ্রান্স বিশেষত তাদের প্রাক্তন আফ্রিকান উপনিবেশগুলোর ওপর নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ছিল।

এই উদ্দেশ্যে তারা ‘ফ্রাঙ্কোফোন বিশ্ব’ (Francophone World বা La francophonie) নামক একটি ধারণার প্রবর্তন করে। এই অনুযায়ী, যেসব রাষ্ট্রে ফরাসি ভাষা ও সংস্কৃতির প্রভাব রয়েছে, সেগুলো মিলে ফ্রান্সের নেতৃত্বে একটি ‘বৃহৎ পরিবার’ গঠন করবে। ফ্রান্সের দৃষ্টিতে রুয়ান্ডা ছিল ফ্রাঙ্কোফোন বিশ্বের অংশ। রুয়ান্ডা ফ্রান্সের উপনিবেশ ছিল না এবং সেখানকার জনসাধারণের মাত্র এক–অষ্টমাংশ ফরাসি ভাষায় কথা বলত। কিন্তু ফরাসি ভাষা ছিল দেশটির সরকারি ভাষা এবং দেশটির শাসকশ্রেণি ফ্রান্সকে তাদের সাংস্কৃতিক পরিচিতি ও নিরাপত্তার উৎস হিসেবে বিবেচনা করত। এর ফলে হাবিয়ারিমানার সরকারের সঙ্গে ফ্রান্সের ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক, সামরিক, অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল।

রুয়ান্ডার তদানীন্তন রাষ্ট্রপতি জুভেনাল হাবিয়ারিমানা (ডানে) এবং আরপিএফ নেতা ও রুয়ান্ডার বর্তমান রাষ্ট্রপতি পল কাগামে (বামে)। হাবিয়ারিমানা ছিলেন ফ্রান্সের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ মিত্র, অন্যদিকে ফরাসিরা কাগামেকে প্রতিদ্বন্দ্বী অ্যাংলোফোন বিশ্বের প্রতিনিধি হিসেবে বিবেচনা করত; Source: Wikimedia Commons

১৯৯০ সালের অক্টোবরে আরপিএফ কর্তৃক রুয়ান্ডায় পরিচালিত আক্রমণকে ফরাসি সরকার বিবেচনা করে ফ্রাঙ্কোফোন বিশ্বের সঙ্গে অ্যাংলোফোন বিশ্বের (‘Anglophone World’; ইংরেজি ভাষা ও ব্রিটিশ সংস্কৃতি দ্বারা প্রভাবান্বিত রাষ্ট্রগুলো) চিরন্তন দ্বন্দ্ব হিসেবে। তদানীন্তন ফরাসি রাষ্ট্রপতি ফ্রাঁসোয়া মিতেরার আর্কাইভ থেকে প্রাপ্ত নথিপত্র থেকে জানা যায়, মিতেরা এই আক্রমণকে একটি অ্যাংলোফোন ষড়যন্ত্র হিসেবে বিবেচনা করতেন। তার ধারণা ছিল, এর মূল উদ্দেশ্য অ্যাংলোফোন উগান্ডা (প্রাক্তন ব্রিটিশ উপনিবেশ) ও আরপিএফ কর্তৃক একটি ইংরেজিভাষী তুতসিল্যান্ড প্রতিষ্ঠা এবং এর মধ্য দিয়ে এতদঞ্চলে ফরাসি প্রভাব হ্রাস করে অ্যাংলোফোন প্রভাব বৃদ্ধি করা।

মিতেরা একা নন, ফ্রান্সের শীর্ষ রাজনীতিবিদ ও সামরিক কর্মকর্তারা সেসময় রুয়ান্ডান গৃহযুদ্ধকে ফ্রাঙ্কোফোন হুতু এবং ‘হানাদার’ অ্যাংলো–স্যাক্সন তুতসিদের মধ্যবর্তী দ্বন্দ্ব হিসেবে বিবেচনা করতেন। রুয়ান্ডার জনসংখ্যার ১৫% যে তুতসি এবং তাদের বিরুদ্ধে রুয়ান্ডার সরকার যে দীর্ঘদিন ধরে বৈষম্য, হত্যাযজ্ঞ ও অন্যান্য নিষ্পেষণ চালিয়ে আসছিল, এই বিষয়টিকে তারা সম্পূর্ণরূপে উপেক্ষা করেন। কিছু কিছু ফরাসি সামরিক কর্মকর্তা দাবি করেন যে, আরপিএফ রুয়ান্ডার হুতুদের ধ্বংস করতে চায় এবং তারা কার্যত ‘কৃষ্ণাঙ্গ খেমার’। উল্লেখ্য, ১৯৭০–এর দশকে উগ্র বামপন্থী ‘লাল খেমার’ বা ‘খেমার রুজ’ দল কম্বোডিয়ায় এক ভয়াবহ গণহত্যা চালিয়েছিল এবং ২০ থেকে ৩০ লক্ষ মানুষকে হত্যা করেছিল।

রুয়ান্ডান গৃহযুদ্ধ চলাকালে ফ্রান্সের একদল উচ্চপদস্থ সামরিক ও গোয়েন্দা কর্মকর্তা, রাজনীতিবিদ, কূটনীতিক ও ব্যবসায়ী মিলে রুয়ান্ডা সংক্রান্ত একটি গোপন নেটওয়ার্ক গড়ে তোলেন, যেটির কেন্দ্রে ছিলেন রাষ্ট্রপতি মিতেরা। তাদের মুখ্য উদ্দেশ্য ছিল রুয়ান্ডান গৃহযুদ্ধে আরপিএফ যাতে সামরিকভাবে বিজয়ী হতে না পারে, সেটি নিশ্চিত করা। উল্লেখ্য, ফরাসি পররাষ্ট্রনীতিতে আফ্রিকার একটি বিশেষ স্থান রয়েছে এবং ফরাসি রাষ্ট্রপতির অধীনস্থ ‘আফ্রিকা সেল’ ফ্রান্সের আফ্রিকা নীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করে থাকে। এজন্য রুয়ান্ডার বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য মিতেরাকে ফরাসি আইনসভার পরামর্শ বা অনুমোদন নিতে হয়নি। এ সময় আফ্রিকা সেলের প্রধান ছিলেন মিতেরার ছেলে জাঁ ক্রিস্তফ মিতেরা এবং হাবিয়ারিমানার সঙ্গে তাঁর বন্ধুত্ব ছিল।

রুয়ান্ডান গৃহযুদ্ধ শুরুর পরপরই এই যুদ্ধে ফ্রান্সের অবস্থান সুস্পষ্ট হয়ে যায়। যুদ্ধ শুরুর সঙ্গে সঙ্গেই ফ্রান্স রুয়ান্ডান সরকারি বাহিনীকে রসদপত্র সরবরাহ শুরু করে। যুদ্ধ শুরুর কয়েক সপ্তাহের মধ্যে জাঁ–বস্কো বারায়াগউয়িজা ও অন্যান্য উচ্চপদস্থ রুয়ান্ডান সরকারি কর্মকর্তারা প্যারিস সফর করেন এবং ফরাসি রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। বারায়াগউয়িজাকে পরবর্তীতে রুয়ান্ডান গণহত্যার বিচারের জন্য গঠিত আন্তর্জাতিক আদালতে গণহত্যার দায়ে দোষী সাব্যস্ত করা হয়।

রুয়ান্ডান গৃহযুদ্ধ এবং ফরাসি–রুয়ান্ডান সামরিক সহযোগিতা

এ সময় ফ্রান্স ও রুয়ান্ডার মধ্যে যে সামরিক সংক্রান্ত চুক্তিগুলো হয়, সেগুলোর সিংহভাগই সম্পাদিত হয় ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসে অবস্থিত রুয়ান্ডান দূতাবাসের মাধ্যমে। পরবর্তীতে এই দূতাবাস থেকে প্রচুর নথিপত্র উদ্ধার করা হয়, কিন্তু ফরাসি–রুয়ান্ডান সম্পর্ক সংক্রান্ত কোনো নথিই পাওয়া যায়নি। কারণ, রুয়ান্ডান গৃহযুদ্ধে আরপিএফের বিজয়ের পর ফ্রান্সে নিযুক্ত রুয়ান্ডান সামরিক অ্যাটাশে কর্নেল সেবাস্তিয়েন ন্তাহোবারি এই সংক্রান্ত সকল নথিপত্র ধ্বংস করে দিয়েছিলেন। কিন্তু তা সত্ত্বেও অন্যান্য সূত্র থেকে ফ্রান্স ও রুয়ান্ডার মধ্যবর্তী সামরিক সহযোগিতা সম্পর্কে প্রচুর তথ্য পাওয়া গেছে।

রুয়ান্ডান গৃহযুদ্ধের সময় ফ্রান্সের রাষ্ট্রপতি ছিলেন ফ্রাঁসোয়া মিতেরা; Source: Wikimedia Commons

রুয়ান্ডান গৃহযুদ্ধের প্রাক্কালে রুয়ান্ডায় ৪৭ জন সদস্যবিশিষ্ট একটি ফরাসি সামরিক সহযোগিতা দল ছিল এবং এটি কোনো গোপন তথ্য ছিল না। রুয়ান্ডান সশস্ত্রবাহিনী ও মিলিশিয়াগুলোর গুরুত্বপূর্ণ ইউনিটগুলোতে এরা ‘উপদেষ্টা’ ও ‘কারিগরি সহায়ক’ হিসেবে কর্মরত ছিল। রুয়ান্ডান সেনাবাহিনীর রিকনিস্যান্স ব্যাটালিয়নে ৩ জন ফরাসি কারিগরি সহায়ক ছিল। রুয়ান্ডান বিমানবাহিনীতে ২ জন ফরাসি ফ্লাইং ইনস্ট্রাক্টর, ১ জন নেভিগেটর, ১ জন এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোলার ও ১ জন মেকানিক ছিল। রুয়ান্ডান প্যারাকমান্ডো বাহিনীতে ৪ জন ফরাসি সদস্য ছিল, যাদের মধ্যে একজন ছিল ফরাসি সেনাবাহিনীর মেজর।

তদুপরি, রুয়ান্ডান গৃহযুদ্ধ আরম্ভ হওয়ার পর রুয়ান্ডান প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় ফরাসি ক্যাপ্টেন পল বারিলকে একটি বিশেষ ইউনিট গঠনের জন্য নিযুক্ত করে। উল্লেখ্য, বারিল ছিলেন একজন প্রাক্তন ফরাসি পুলিশ কর্মকর্তা এবং রুয়ান্ডান রাষ্ট্রপতি হাবিয়ারিমানার প্রাক্তন নিরাপত্তা উপদেষ্টা। বারিল উত্তর–পশ্চিম রুয়ান্ডার বিগোগোয়েতে অবস্থিত একটি ঘাঁটিতে ১২০ জন রুয়ান্ডান সৈন্যকে প্রশিক্ষণ প্রদান করেন। এই বিশেষ ইউনিটটিকে লক্ষ্যভেদ ও অনুপ্রবেশ সংক্রান্ত কৌশল শেখানো হয় এবং আরপিএফ–নিয়ন্ত্রিত ভূমির গভীরে অভিযান চালানোর জন্য প্রস্তুত করা হয়।

তদুপরি, প্রাক্তন রুয়ান্ডান সামরিক প্রশিক্ষক ইসিদোর ঞ্জেয়িমানার ভাষ্যমতে, রুয়ান্ডান গৃহযুদ্ধ চলাকালে ফরাসি সেনা কর্মকর্তারা রুয়ান্ডার ‘ইন্টারাহামোয়ে’ মিলিশিয়া সদস্যদের প্রশিক্ষণ প্রদান করে। এই মিলিশিয়াটি পরবর্তীতে তুতসিদের বিরুদ্ধে পরিচালিত গণহত্যায় অগ্রণী ভূমিকা পালন করে। রুয়ান্ডান সেনাবাহিনীর প্রাক্তন সদস্য কর্পোরাল জাঁ দামাসে কাবুরারের ভাষ্যমতে, রুয়ান্ডান সৈন্যদের মধ্যে তুতসিবিদ্বেষী মনোভাব সৃষ্টিতে এবং উগ্র হুতু জাতীয়তাবাদী মতাদর্শ ছড়িয়ে দেয়ার ক্ষেত্রেও ফরাসি সৈন্যরা ভূমিকা রেখেছিল।

ফ্রান্স রুয়ান্ডান সরকারকে বিপুল পরিমাণ সামরিক সরঞ্জাম সরবরাহ করে, কিন্তু এই তথ্য গোপন রাখা হয়। ‘হিউম্যান রাইটস ওয়াচে’র প্রতিবেদন অনুসারে, ১৯৯০ থেকে ১৯৯৪ সালের মধ্যে ফ্রান্স রুয়ান্ডাকে ৩৬টি অস্ত্রের চালান সরবরাহ করে, কিন্তু এগুলোর মধ্যে ৩১টি চালানই ফ্রান্সের অস্ত্র বাণিজ্যের প্রচলিত নিয়ম ভেঙে প্রেরণ করা হয়েছিল। তদুপরি, ফ্রান্সের সহায়তায় রুয়ান্ডান সরকার মিসর ও দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে লক্ষ লক্ষ মার্কিন ডলারের সামরিক সরঞ্জাম লাভ করে, এবং রুয়ান্ডান গণহত্যা শুরু হওয়ার পরেও অস্ত্রশস্ত্রের এই প্রবাহ অব্যাহত থাকে।

তুতসি–নিয়ন্ত্রিত ‘রুয়ান্ডান প্যাট্রিয়টিক ফ্রন্ট’ বা ‘আরপিএফ’–এর পতাকা; Source: Wikimedia Commons

রুয়ান্ডায় কর্মরত বেলজীয় গোয়েন্দাদের প্রদত্ত তথ্য অনুযায়ী, রুয়ান্ডান গৃহযুদ্ধ শুরুর পর রুয়ান্ডায় অবস্থানরত ফরাসি কূটনীতিকরা রুয়ান্ডার বিরোধী দলীয় হুতু নেতাদের রুয়ান্ডার সরকারের সঙ্গে সহযোগিতা করার জন্য চাপ প্রদান করেন। তাঁরা রুয়ান্ডান বিরোধী দলীয় রাজনীতিবিদদের বুঝান যে, তুতসি আরপিএফকে প্রতিহত করতে হলে হাবিয়ারিমানাকে সমর্থন করা ছাড়া হুতুদের আর কোনো বিকল্প নেই। এভাবে রুয়ান্ডান গৃহযুদ্ধ চলাকালে রুয়ান্ডার অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে হাবিয়ারিমানার অবস্থান সুদৃঢ় করার জন্যও ফ্রান্স সচেষ্ট ছিল।

রুয়ান্ডায় ফ্রান্সের প্রথম সামরিক অভিযান

রুয়ান্ডান গৃহযুদ্ধ চলাকালে রুয়ান্ডান সরকারের প্রতি ফ্রান্সের সমর্থন কেবল পরোক্ষ সামরিক সহায়তার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। এই যুদ্ধ চলাকালে ফ্রান্স রুয়ান্ডান সরকারের সমর্থনে দেশটিতে তিনটি সামরিক অভিযান পরিচালনা করে। এর মধ্যে প্রথম অভিযানটি পরিচালিত হয় ১৯৯০ সালের অক্টোবরে।

১৯৯০ সালের অক্টোবরে আরপিএফ যখন উগান্ডা থেকে উত্তর রুয়ান্ডায় আক্রমণ চালায়, সেসময় রুয়ান্ডান সশস্ত্রবাহিনী অসতর্ক অবস্থায় ছিল। ফলে যুদ্ধের প্রথম দিনগুলোতে আরপিএফ দ্রুত অগ্রসর হয় এবং রুয়ান্ডান সরকার আশঙ্কা করতে থাকে যে, আরপিএফের হাতে রুয়ান্ডার রাজধানী কিগালির পতন ঘটবে। আরপিএফের অগ্রাভিযান প্রতিহত করার জন্য রুয়ান্ডান সরকার ফ্রান্সের কাছে সহায়তা প্রার্থনা করে। ফ্রান্স এই আহ্বানে সাড়া প্রদান করে এবং রুয়ান্ডায় ৬০০ সৈন্য প্রেরণ করে।

আনুষ্ঠানিকভাবে রুয়ান্ডায় ফরাসি সৈন্য প্রেরণের কারণ ছিল দেশটিতে অবস্থানরত ফরাসি নাগরিকদের সুরক্ষা প্রদান করা। কিন্তু কার্যত ফরাসিদের মূল উদ্দেশ্য ছিল আরপিএফের অগ্রযাত্রা প্রতিহত করা। ফরাসি সৈন্যরা কিগালি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবস্থান গ্রহণ করে এবং আরপিএফ যাতে কিগালির দিকে অগ্রসর হতে না পারে সেজন্য অবস্থান গ্রহণ করে। বিভিন্ন সূত্রের মতে, রুয়ান্ডান সেনাবাহিনী যে আরপিএফের ওপর গোলাবর্ষণ করছিল, সেটি ফরাসিরা তত্ত্বাবধান করতে থাকে এবং ফরাসি হেলিকপ্টার গানশিপ আরপিএফের অবস্থানের ওপর আক্রমণ পরিচালনা করে।

রুয়ান্ডান গৃহযুদ্ধের সময় গ্যাবনের রাজধানী লিব্রেভিলে একটি ফরাসি ‘সি–১৩০ হারকিউলিস’ পরিবহন বিমান। এই বিমানে করেই ফরাসিরা রুয়ান্ডায় সৈন্য প্রেরণ করত; Source: Wikimedia Commons

এমতাবস্থায় আরপিএফের পক্ষে কিগালি আক্রমণ করা সম্ভব হয়নি এবং তাদের অগ্রাভিযান গতি হারিয়ে ফেলে। ক্রমশ রুয়ান্ডান সরকারি বাহিনী আরপিএফ কর্তৃক অধিকৃত অধিকাংশ অঞ্চল পুনর্দখল করে নেয়। আরপিএফ রুয়ান্ডার পার্বত্য অঞ্চলে পশ্চাৎপসরণ করে এবং গেরিলা পদ্ধতিতে যুদ্ধ চালিয়ে যেতে থাকে। বস্তুত ফরাসি সামরিক হস্তক্ষেপের ফলে এই পর্যায়ে রুয়ান্ডান সরকার রক্ষা পায়। যদি ফরাসিরা আরপিএফের অগ্রযাত্রা প্রতিহত না করত, সেক্ষেত্রে হয়ত রুয়ান্ডান সরকারের পতন ঘটত এবং তারা তিন বছর পর তুতসিদের বিরুদ্ধে গণহত্যা চালানোর সুযোগ পেত না।

রুয়ান্ডান গৃহযুদ্ধ শুরুর পরপরই রুয়ান্ডান সরকার তুতসিদের ওপর ব্যাপক দমন–পীড়ন শুরু করে এবং বিভিন্ন স্থানে তুতসিদের বিরুদ্ধে হত্যাযজ্ঞ শুরু হয়। ১৯৯৩ সাল নাগাদ এটি ক্রমশ স্পষ্ট হয়ে উঠছিল যে, রুয়ান্ডায় তুতসিদের বিরুদ্ধে বড় ধরনের একটি গণহত্যা সংঘটিত হতে যাচ্ছে। কিন্তু রুয়ান্ডান সরকারের প্রতি ফ্রান্সের সমর্থন অব্যাহত থাকে।

[রুয়ান্ডান গৃহযুদ্ধের পরবর্তী পর্যায় এবং গণহত্যায় ফ্রান্সের ভূমিকা দ্বিতীয় পর্বে আলোচিত হবে]

Related Articles