এবলা: সিরিয়ার মাটিতে চাপা পড়া এক কিংবদন্তি

সভ্যতা; হাজার বছরের ক্রমবিকাশের এক চূড়ান্ত রূপ, হাজার বছরের ধরে প্রকৃতির সাথে সংগ্রাম, দিগন্তে ওঠা একেকটি সূর্যোদয়। এই সভ্যতার কথা আসতেই আমাদের সামনে ভেসে ওঠে মিশরীয়, ব্যাবিলনীয়, পার্সিয়ান, গ্রীক, চৈনিকসহ নানা সভ্যতার কথা। কিন্তু সিরীয় সভ্যতা? ইতিহাসের অতলে হারিয়ে যাওয়া এক সিরীয় সভ্যতা নিয়ে আজ আমরা কথা বলব, ইতিহাসের হাজার বছরের পূর্বের পৃষ্ঠায় ফিরে যাব, যার নাম এবলা (Ebla)। মাটির নিচে চাপা পড়া এক অনবদ্য ইতিহাস, এক কিংবদন্তি। শত বছরের উত্থান-পতনের কীর্তিগাথা। ইতিহাসের সোনালী অধ্যায়ের মহাকাব্য। হাজার বছর পরও ইতিহাসপ্রেমীদের কাছে যার গুরুত্ব ন্যূনতম কমে যায়নি।

প্রার্থমিক পরিচিতি

প্রত্নতাত্ত্বিক ও ইতিহাসবিদদের কাছে এবলা শহর এখনও বেশ তাৎপর্যপূর্ণ। এবলা শব্দের সম্ভাব্য অর্থ সাদা পাথর। এর দেয়ালগুলো সাদা পাথরের তৈরি বলে এমন নামকরণ করা হয়েছে বলে ধারণা করা হয়। তবে কোন সময়ে বা কোন রাজা এই শহর প্রতিষ্ঠা করেছেন, তা এখনও অজানা। ধারণা করা হয়, খ্রিষ্টপূর্ব ৩০০০ সালে বা এর আশেপাশের সময়ের দিকে এই শহরের অস্তিত্ব ছিল, এবং খ্রিষ্টপূর্ব ২৪ শতকে এই শহর ক্ষমতার চূড়ান্ত পর্যায়ে ছিল। এই শহর অ্যাসিরীয় সাম্রাজ্য তৈরি করেনি। বরং এখন পর্যন্ত পাওয়া বেশ কিছু নথিপত্র অনুসারে প্রাচীন এই শহর ব্যাবিলনীয় অথবা ঊর সাম্রাজ্যের তৃতীয় রাজবংশের দ্বারা প্রতিষ্ঠা পায়।

শহরটির নাম ঊর সাম্রাজ্যের তৃতীয় রাজবংশের সাম্রাজ্যের অর্থনৈতিক গ্রন্থে দেখা যায়। ঊরের পর এর অস্তিত্ব উত্তর সিরিয়ার আলালাহ থেকে প্রাপ্ত ফলকগুলোতে, এবং খ্রিস্টপূর্ব ১৭ ও ১৫ শতাব্দীতে মিশরীয় ফেরাউন তৃতীয় তুথমোসিসের সাইরো-ফিলিস্তিন বিজয়ের খোদাই করা ইতিহাসে পাওয়া যায়। 

এবলা উত্তর সিরিয়া, লেবানন এবং উত্তর মেসোপটেমিয়ার (আধুনিক ইরাক) কিছু অংশে আধিপত্য বিস্তার করেছিল। মিশর, পারস্য (বর্তমান ইরান) এবং সুমেরের মতো দূরবর্তী রাজ্যগুলোর সাথে এই শহরের বাণিজ্য ও কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিল বলে ধারণা করা হয়।

আবিষ্কার

১৯৬০ সাল পর্যন্ত প্রত্নতাত্ত্বিক ও ইতিহাসবিদগণ খ্রিষ্টপূর্ব তৃতীয় শতাব্দীর সিরিয়াকে মূলত মিশরীয় ও মেসোপটেমীয় সভ্যতা থেকে দূরে সরে যাওয়া এক ছোট সম্প্রদায়ের অপভ্রংশ, এবং মেসোপটেমিয়ার প্রথম মহান সভ্যতার অবশেষ মনে করতেন। এছাড়া তারা মেসোপটেমিয়া, মিশর এবং প্যালেস্টাইন অঞ্চলের দিকে খুব মনোযোগ কেন্দ্রীভূত করায় সিরীয় সভ্যতার উন্মোচনের সম্ভাবনা কমে গিয়েছিল।

কিন্তু ইতালীয় প্রত্নতত্ত্ববিদ পাওলো ম্যাথিয়া বিশ্বাস করতেন, সিরীয় সভ্যতাকে পুরোপুরি অবহেলা করা উচিত নয়। তিনি তদন্তের জন্য বর্তমান আলেপ্পো থেকে প্রায় ৬০ কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিমে উত্তর সিরিয়ার টেল মারদিখ নামক স্থানটি বেছে নেন, যাকে ‘নিরপেক্ষ ব্যাকওয়াটার’ বলে উল্লেখ করা হতো। মূলত, গুরুত্বহীন বোঝাতেই এই শব্দের ব্যবহার।

পাওলো ম্যাথিয়া; image source: alchetron.com
পাওলো ম্যাথিয়া; image source: alchetron.com

টেল মারদিখে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা ফলকগুলোতে উল্লেখ থাকা বিভিন্ন তারিখ, এবং ক্রমান্বয়ে সেই পরিসর বাড়তে থাকায় প্রফেসর ম্যাথিয়া সিরীয় সভ্যতা নিয়ে উৎসাহিত হন। ফলে ১৯৬৪ সালে তিনি রোমের ইউনিভার্সিটি লা সাপিয়েঞ্জার ইতালীয় প্রত্নতাত্ত্বিক অভিযানের প্রধান হিসেবে টেল মারদিখ অভিযানের নেতৃত্ব দেন। এই সময় এটা স্পষ্ট হয়ে যায় যে, সিরিয়ার তথাকথিত ‘ব্যাকওয়াটার পিরিয়ড’-এর সময়ে প্রকৃতপক্ষে সেখানে একটি বসতি ছিল, এমনকি সেটি একটি বড় রাজ্যও হতে পারে। স্থানটি পুরোপুরি শনাক্ত করতে আরো চার বছর সময় লেগে যায়। 

সিরীয় সভ্যতা উন্মোচনের জন্য ১৯৬৮ সাল বেশ উল্লেখযোগ্য। সেই বছরে সেখানে শিলালিপিসহ একটি মূর্তির অংশ পাওয়া যায়। মূর্তিটি এবলার তৃতীয় রাজ্যের রাজা ইব্বিট-লিম ‘ইশতার’ নামক এক দেবীকে উৎসর্গ করেছিলেন। টেল মারদিখ প্রকৃতপক্ষে প্রাচীন এবলার অন্তর্ভুক্ত ছিল। 

এবলা শহরে প্রাপ্ত প্রত্নতত্ত্ব

সিরিয়ার যেকোনো জায়গায় পাওয়া প্রত্নতত্ত্বের মাঝে এটি ছিল সবচেয়ে প্রাচীন। এই শহর থেকে প্রাপ্ত প্রত্নতত্ত্ব প্রারম্ভিক ব্রোঞ্জ যুগ সম্পর্কে সমৃদ্ধ তথ্য প্রদান করেছে। ১৯৭৪ সালের পূর্ব পর্যন্ত এই স্থান নিকট প্রাচ্যের বাইরে খুব একটা আগ্রহ জাগাতে পারেনি। তবে ১৯৭৪ সালের খননকার্যগুলোতে নাটকীয় পরিবর্তন আসে।

ম্যাথিয়ার দল স্থানটির পশ্চিম ঢালে খননের সময় একটি ঢিবির পৃষ্ঠের ঠিক নীচে একটি বড় প্রাসাদের চিহ্ন দেখে। এটি ছিল বৃহৎ ও বহু-কক্ষ বিশিষ্ট। যার কিছু অংশে দেয়াল এখনও সাত মিটার উচ্চতা পর্যন্ত অবশিষ্ট রয়েছে। প্রত্নতাত্ত্বিকগণ এর ছদ্মনাম নাম দিয়েছেন ‘প্যালেস জি’। প্রাসাদের পাশে বৃহৎ খোলা জায়গায় তৈরি একটি কমপ্লেক্স ছিল, যাকে প্রত্নতাত্ত্বিকগণ ‘দর্শকের আদালত’ হিসেবে চিহ্নিত করেছে, যার উত্তর দেওয়ালে মাটির ইটের তৈরি একটি উঁচু মঞ্চ ছিল। সম্ভাবত এটি রাজার সিংহাসন হিসেবে ব্যবহৃত হতো।

প্যালেস জি-র ধ্বংসাবশেষ; image source: atlastour.net
প্যালেসের সামনে দর্শকের আদালত; image source: wikiwand.com

এবলার খনন থেকে হাজার হাজার খোদাই করা মাটির ফলক পাওয়া গিয়েছিল, যার বেশিরভাগই টুকরো টুকরো এবং প্রাসাদের বিভিন্ন কক্ষে ছিল। ১৯৭৪ এবং ১৯৭৬ সালে খ্রিষ্টপূর্ব ২৪ শতকের ফলক পাওয়া যায়। এগুলো স্থানীয় সেমেটিক ভাষায় লেখা হয়েছে, যাকে এখন ‘এব্লাইট’ ডাকা হয়।

প্যালেস জি-তে প্রাপ্ত ফলক; image source: atlastour.net

এই সময়ের মধ্যে উচ্চস্তরের এব্লাইট কারুশিল্পের একটি মানব মাথাযুক্ত ষাঁড়, কাঠের কোরের সাথে সংযুক্ত সোনার ফয়েল, এবং দেওয়াল সাজাতে ব্যবহৃত কিছু জিনিস পাওয়া যায়। এসব সূক্ষ্ম কাজ মূলত ব্যাবিলনীয় অনুপ্রেরণায় তৈরি।

প্যালেসের দেয়ালে খোদাই করা চিত্র; image source: historyinformation.com

এছাড়া প্রাসাদে একটি স্তবকসহ বেশ কয়েকটি সুমেরীয় পাঠ্য এবং এবলাইট ও সুমেরীয় ভাষার কিছু আভিধানিক তালিকা রয়েছে। এটি বিশ্বের সবচেয়ে প্রাচীন অভিধান হিসেবে পরিচিত। বেশিরভাগ ফলকের বিষয়বস্তু মোটামুটি জাগতিক। এছাড়া সেখানে কয়েকটি সাহিত্যিক পাঠ্য পাওয়া গিয়েছিল, যেগুলো এবলা ও আশেপাশের অঞ্চলের প্রশাসনিক বিষয়ের সাথে সম্পর্কিত। এগুলো আমলাতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থার ইঙ্গিত দেয়। কিছু ফলকে অসংখ্য কর্মী, কর্মকর্তা, কারিগর, ও শ্রমিকদের বিস্তৃত বর্ননা ও তাদের ভরণপোষণের জন্য রেশন ব্যবস্থার উল্লেখ আছে। এবলার সম্পদের বেশিরভাগই ছিল কৃষিভিত্তিক। প্রাসাদে বেশ কিছু নথি পাওয়া গেছে, যেখানে উল উৎপাদনের বিবরণসহ এবলার স্থানীয় আধিকারিক এবং গুরুত্বপূর্ণ বিদেশীদের কাছে এই পণ্যগুলোর বিতরণ সম্পর্কে বর্ণনা আছে। শহরের অনেক কারুশিল্প এবং ঐতিহ্য এখনও সিরিয়ার সংস্কৃতির সাথে মিশে আছে।

প্রথম অধিবাসীর আগমন

এই মুহূর্তে আমাদের অ্যামোরাইট (The Amorites) সম্পর্কে কিছু বলা উচিত। অ্যামোরাইটরা মূলত সেমিটিকভাষী জাতি, যারা সিরিয়া এবং ফিলিস্তিনের কিছু অংশে বসবাসকারী যাযাবর গোষ্ঠী। খ্রিষ্টপূর্ব ২৪ শতকের মধ্যে তাদের মধ্যে কেউ কেউ এবলায় চলে আসে, এবং সেখানে বসতি স্থাপন করে। পরবর্তীতে এরা ‘হুরিয়ান’ নামক অপর এক জাতির সাথে পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে মিশে যায়। বলে রাখা ভালো, অ্যামোরাইটদের তৃতীয় ঊর রাজবংশের পতনের অন্যতম কারণ বলে মনে করা হয়।

‘Amorites’ শব্দটি ‘MAR.TU’ নামক একটি শব্দ থেকে উৎপন্ন, যা সুমেরীয় গ্রন্থে দেখা যায়, যার অর্থ ‘পশ্চিম’। একটি সুমেরীয় সাহিত্যের রচনায় অ্যামোরীয়দের সম্পর্কে বলা হয়েছে: “তারা অবুঝ, শিকড়হীন, সংস্কৃতিহীন বর্বর জাতি, যারা শস্য উৎপাদন করতে জানে না, এবং হাঁটু বাঁকা করে না (জমি চাষ করতে)। যাদের কোনো বাড়ি বা শহর নেই, কাঁচা মাংস খায়। যাদের মৃত্যুর পর কবর দেওয়া হয় না।

একজন সদস্য; image source: worldhistory.com

এছাড়া ওল্ড টেস্টামেন্ট অনুসারে, তারা কেনানের কিছু অংশ দখলকারী উপজাতি, যাদেরকে ঈশ্বর ইসরাইল ধ্বংসের আদেশ দিয়েছিলেন,

“However, in the cities of the nations the Lord your God is giving you as an inheritance, do not leave alive anything that breathes. Completely destroy them—the Hittites, Amorites, Canaanites, Perizzites, Hivites and Jebusites—as the Lord your God has commanded you.” (Deuteronomy 20:16-17)

এবলা প্রথম রাজ্য, বিস্তৃতি ও পতন

প্রথম রাজ্যটি আনুমানিক খ্রিষ্টপূর্ব ৩০০০-২৩০০ সাল পর্যন্ত স্থায়ী ছিল। ধারণা করা হয়, প্রথম রাজ্যটি এবলার দ্বিতীয় ও তৃতীয় রাজ্যের তুলনায় বেশি সমৃদ্ধ ও শক্তিশালী ছিল। প্রথম রাজ্যের সময় শহরের আয়তন ছিল ৫৬ হেক্টর, এবং কাদা-ইটের দুর্গ দ্বারা সুরক্ষিত ছিল। এবলা চারটি জেলায় বিভক্ত, এবং প্রত্যেকটির বাইরের দেয়ালে নিজস্ব গেট ছিল। এই চারটি গেটের নামকরণ করা হয় দাগান, হাদাদ বা হাদ্দা, রাসাপ এবং উতু নামক দেবতাদের নামে। জনসংখ্যার হিসেবে তখন রাজধানীতে প্রায় চল্লিশ হাজার ও পুরো রাজ্যে দুই লাখ মানুষ বসবাস করত। এই সময়েই ‘প্যালেস জি’ তৈরি করা হয়, যে সম্পর্কে পূর্বে আলোচনা করা হয়েছে। এছাড়া মূল শহরে দুটি মন্দির ছিল, যেগুলো দেবতা কুরাকে উৎসর্গ করে তৈরি করা হয়।

প্রথম রাজ্যের কাঠামো; image source: deeperstudy.com

খ্রিষ্টপূর্ব ২৭০০ সালের দিকে রাজ্যটি প্রতিবেশী মারি নামক অন্য এক রাজ্যের সাথে শতবর্ষী যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে। মারি ছিল এবলার রাজনৈতিক ও বাণিজ্যিক প্রতিদ্বন্দ্বী। তখন মারির রাজা ছিলেন সাউমু। তিনি এবলার অনেক শহর জয় করেছিলেন। যদিও এবলাকে চূড়ান্তভাবে পরাজিত করতে ব্যর্থ হন। পরবর্তীতে এবলার রাজা কুন-দামু বেশ শক্তিশালী প্রতিরোধ গড়ে মারিকে পরাভূত করেন। যদিও এই যুদ্ধের পরেই রাজা কুন দামু ও এবলার ক্ষমতা ক্রমাশ হ্রাস পেতে থাকে।

মারি দ্বারা কিছু অঞ্চল দখল হওয়ার পর এবলার মানচিত্র; image source: worldhistory.com

এরপর অনেক বছর কেটে যায়, যা এখনও ইতিহাসের গহীনে চাপা পড়ে আছে। ঐতিহাসিকরা মনে করেন, এই সময়ে রাজ্যটি বেশ ক্ষয়িষ্ণু ও দুর্বল হয়ে পড়ে। তবে রাজ্যের সমৃদ্ধি পুনরায় ফিরে আসে রাজা ইরকাব-দামুর সময়। তিনি খ্রিষ্টপূর্ব ২৩৪০ সালের দিকে পুনরায় মারিতে আক্রমণ চালান। একই সময়ে আবরসাল নামক অন্য এক রাজ্যের সাথে ব্যবসায়িক চুক্তি করেন, যা ছিল ইতিহাসের প্রাচীনতম চুক্তিগুলোর মধ্যে একটি। 

এ সময় এবলা আধুনিক সিরিয়ার মোটামুটি অর্ধেক আয়তনের একটি এলাকা নিয়ন্ত্রণ করত। উত্তরে উরসাউম থেকে দক্ষিণে দামেস্কের আশেপাশের এলাকা; পশ্চিমে ফেনিসিয়ার উপকূলীয় পর্বতমালা থেকে পূর্বের হাড্ডু পর্যন্ত। রাজ্যের বড় অংশ সরাসরি রাজার নিয়ন্ত্রণে ছিল, এবং বাকি অংশ গভর্নরদের দ্বারা পরিচালিত হতো। এবলার চৌদ্দটি বিভাগ এবং ষাটটিরও বেশি শহর ছিল। শহরগুলোর মধ্যে অন্যতম হাজুয়ান, বর্মন, ইমার, হালাবিতু এবং সালবাতু।

দখলকৃত অঞ্চল পুনরূদ্ধার করার পর এবলার মানচিত্র; image source: wikiwand.com

ইরকাব-দামুর পর ক্ষমতায় আসেন রাজা ইসার-দামু। যিনি প্রথমবারের মতো মারিকে সরাসরি এবলার অধীনে নিয়ে আসতে সক্ষম হন, এবং উত্তর ও দক্ষিণ মেসোপটোমিয়ার বাণিজ্যিক পথ অবরুদ্ধ করেন। ইসার-দামুর সময়ে রাজ্যে বেশ কয়েকবার বিদ্রোহ দেখা দেয়, যা রাজা বেশ শক্তভাবে দমনে সক্ষম হন। যদিও তার মৃত্যুর পর রাজ্যটি পুনরায় দুর্বল হতে থাকে। 

এবলার অস্তিত্বের এই পর্বের সমাপ্তি হয় একজন আক্কাদিয়ান রাজার দ্বারা। প্রায় নিশ্চিতভাবে সারগন (যদিও সারগনের নাতি নারাম-সিন দায় স্বীকার করেন) প্রাচীন এই শহর ধ্বংস করেন। এই শাসকদের মধ্যে কেউ একজন ধারণা করেন যে, শহরটি খুব শক্তিশালী হয়ে উঠছে, যা ইউফ্রেটিসের পশ্চিমে আক্কাদিয়ান আঞ্চলিক উচ্চাকাঙ্ক্ষাকে হুমকির মুখে ফেলতে পারে। আর এভাবেই পতন ঘটে এবলার প্রথম রাজ্যের।

আক্কাদীয়দের সাথে যুদ্ধকালে এবলার মানচিত্র; image source: Wikiwand
সারগনের কল্পিত চেহারা; image source: Worldhistory.org
নারাম-সিন (সবার উপরে); image source: Worldhistory.org

এবলা দ্বিতীয় রাজ্য, বিস্তৃতি ও পতন

প্রথম রাজ্য ধ্বংসের পর দ্বিতীয় রাজ্যের যাত্রা শুরু, যার সময় খ্রিষ্টপূর্ব ২৩০০-২০০০ সাল পর্যন্ত। এটি প্রথম রাজ্যের মতো এতটা সমৃদ্ধ ছিল না। এর সম্পর্কে খুব কমই জানা যায়, কারণ ওই সময়ের একটি শিলালিপি ছাড়া কোনো লিখিত উপাদান এখনও আবিষ্কৃত হয়নি। একটি নতুন স্থানীয় রাজবংশ দ্বারা রাজ্য শাসিত হতো। ধ্বংসপ্রাপ্ত প্যালেস জি-র স্থলে আবারও নতুন এক প্রাসাদ তৈরি করা হয়। প্রথম রাজ্যের ধর্মীয় স্থাপনাগুলো সংস্কার ও সেগুলোর পবিত্রতা রক্ষা করা হয়। প্রথম রাজ্যের মতো দ্বিতীয় রাজ্যের পতনও আক্কাদীয়দের হাতে ঘটে। রাজা নারাম-সিন আমানুস পর্বতের বন পর্যন্ত আক্কাদীয় সীমানা বিস্তারের লক্ষ্যে এবলার উত্তর সীমানা আক্রমণ করেন, যা পরবর্তীতে এবলার দ্বিতীয় রাজ্যের পতন ডেকে আনে। ১৯৮৩ সালে আবিষ্কৃত হুরো-হিট্টাইটদের কিংবদন্তি মহাকাব্য ‘সং অফ রিলিজ’-এ এবলার এই ধ্বংসের কথা উল্লেখ করা আছে।

এবলার তৃতীয় রাজ্য, বিস্তৃতি ও চূড়ান্ত পতন

তৃতীয় রাজ্য ‘মারদিখ’ হিসেবেও পরিচিত, যার ব্যাপ্তিকাল খ্রিষ্টপূর্ব ২০০০-১৬০০ সাল পর্যন্ত। তৃতীয় রাজ্যের প্রথম রাজা ছিলেন ইব্বিট-লিম। তিনি খুব দ্রুত শহরটি পুনরায় পরিকল্পিতভাবে সাজান। রাজ্যের জন্য নতুন করে প্রাসাদ, মন্দির এবং দুটি দুর্গ তৈরি করেন। তৃতীয় সাম্রাজ্যের সময় এবলা ছিল প্রায় ৬০ হেক্টর আয়তনের একটি বড় শহর। ইয়েমা ছিলেন তৃতীয় রাজ্যের সবচেয়ে সফল রাজা। তিনি মিশরের ফেরাউন হোটেপিব্রের সাথে সন্ধি করেন। ধীরে ধীরে এবলা পুনরায় প্রাচীন মধ্যপ্রাচ্যের মিশর, আনাতোলিয়া, পারস্যের মাঝে সংযোগ হিসেবে ব্যবহৃত হতে থাকে, যা রাজ্যকে বাণিজ্যিকভাবে বেশ লাভবান করে। খ্রিষ্টপূর্ব ১৬০০ সালে  হিট্টাইট রাজা প্রথম মুরসিলির হাতে এবলা ধ্বংস হয়। ইন্দিলিম্মা সম্ভবত এবলার শেষ রাজা। দ্বিতীয় রাজ্যের মতো ‘সং অফ রিলিজ’-এ তৃতীয় রাজ্যের ধ্বংসের কথাও উল্লেখ রয়েছে, যার সাথে সূর্য অস্তমিত হয় এবলার আকাশ থেকে। পৃথিবী থেকে হারিয়ে যায় এবলা। এরপর এবলা আর পুনরূদ্ধার হয় নি। তবে ধারণা করা হয়, প্রারম্ভিক লৌহ যুগে এখানে এক ছোট বসতি গড়ে উঠেছিল, যা ৬০ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত টিকেছিল।

প্রশাসন, রাজপরিবার ও ক্ষমতার বন্টন

এবলার প্রথম রাজ্য ছিল রাজতান্ত্রিক, অর্থাৎ বংশানুক্রমে রাজারা এবলাকে শাসন করতেন। এ ব্যাপারে দ্বিতীয় ও তৃতীয় রাজ্য সম্পর্কে এখনও কিছু জানা যায়নি। তাই এখানে কেবল প্রথম রাজ্য নিয়ে আলোচনা করা হবে।

রাজা থাকতেন রাজ্যের প্রধান হিসেবে। তার সাহায্যের জন্য তিনি একজন উজির রাখতেন। সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য একটা পরিষদ থাকত, উজির যার প্রধানের ভূমিকায় থাকতেন। উজির ছাড়া আরো তেরোজন এই পরিষদের সদস্য থাকতেন, যাদের প্রত্যেকের অধীনে বেশ কিছু লোক কাজ করতো, এবং সকলে মিলে একটি আমলাতন্ত্র গঠন করতো। পরিষদ প্রধানের পাশাপাশি উজির সামরিক প্রধান হিসেবে থাকতেন। ক্রাউন প্রিন্স রাজ্যের আভ্যন্তরীণ বিষয়াদি দেখাশোনা করতেন, এবং দ্বিতীয় ক্রাউন প্রিন্স বিদেশী বিষয় দেখতেন। কাপড় তৈরির দায়িত্ব থাকতো রানীর অধীনে।

রাজ্যটি চৌদ্দটি বিভাগে বিভক্ত ছিল। সেসবের মধ্যে দুটি রাজধানীতে, এবং বাকি বারোটি রাজ্যের অন্যান্য অংশে বিস্তৃত ছিল। রাজা কর্তৃক নিযুক্ত চৌদ্দজন গভর্নর হিসেবে দায়িত্ব পালন করতেন, যাদের প্রত্যেকে একেকটি বিভাগ শাসন করতেন।

এবলার প্রথম রাজ্যের প্রাসাদের দেওয়াল ও ফলকে একত্রিশজন রাজার কথা উল্লেখ আছে। যাদের মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত চারজন: ইগ্রিস-হালাব, কুন-দামু, ইরকাব-দামু, এবং ইসার-দামু। ইসার-দামু পঁয়ত্রিশ বছর শাসন করেন। অন্যদিকে, এবলার তৃতীয় রাজবংশ প্রতিষ্ঠা করেন রাজা ইব্বিত-লিম। এই রাজবংশের মোট আটজন শাসন ক্ষমতায় এসেছিলেন, যাদের মধ্যে ইয়েমা ও ইন্দিলিম্মা ছিলেন অন্যতম। ক্রাউন প্রিন্সদের মাঝে কেবল মারাতেওয়ারির নাম পাওয়া গিয়েছে। তিনি রাজা ইন্দিলিম্মার পুত্র।

রাজা ইব্বিট-লিম; image source: wikiwand.com
ক্রাউন প্রিন্স মারাতেওয়ারি/Maratewari (বামে); image source: wikiwand.com

জীবন-জীবিকা

এবলার অবস্থান ছিল উত্তর সিরিয়ার সমৃদ্ধ সমভূমিতে, যা কৃষির জন্য উপযুক্ত। ফলে এবলা একটি সমৃদ্ধ কৃষিভিত্তিক শহরে পরিণত হয়। সেখানে যব, গম, আঙুর, ডালিম, জলপাই, ডুমুর এবং শণ জন্মাত। শহরের অধিবাসীরা গবাদি পশু, ভেড়া, ছাগল এবং শূকর পালন করতো।

দামাস্ক কাপড়, লিনেন কাপড় এবং উল ছিল প্রধান পণ্য। রাজ্যের উত্তর ও পশ্চিমাঞ্চল রূপা ও কাঠসমৃদ্ধ এলাকা। এবলা ছিল উৎপাদন কেন্দ্র। এখান থেকে রাজ্যের অন্যান্য শহরে পণ্য বিপনন করা হতো। সোনা, রূপা, টিন, সীসা, তামা গলিতকরণ এবং সংকরকরণ সহ ধাতব কাজ ছিল শহরটির দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ কাজ। জলপাই তেল, ওয়াইন এবং বিয়ার উৎপাদনের জন্যও শহরের বেশ খ্যাতি ছিল।

সামাজিক ব্যবস্থা

প্রাপ্ত ফলক থেকে এবলার কঠোর প্রশাসনিক ও সামাজিক শ্রেণিবিন্যাসের পাশাপাশি তৃতীয় সহস্রাব্দের মাঝামাঝি উত্তর সিরিয়ার সামাজিক, রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক অবস্থা সম্পর্কে জানা যায়। প্রারম্ভিক ব্রোঞ্জ যুগের মাঝামাঝিতে এই অঞ্চলে নগর রাজ্যের ধরন ছিল সমসাময়িক মেসোপোটেমিয়া ও মিশরীয় সভ্যতার মতো, যেখানে রাজা, রাজকীয় আধিকারিক এবং প্রবীণ পদক্রমের শীর্ষে ছিলেন। সাধারণ নাগরিকদের রাজ্যের অনুগত থেকে কাজ করতে হতো। রাজ্যের প্রশাসনের সাথে তাদের কোনো সংযোগ ছিলো না। কেউ অপরাধ করলে তাদের রাজ্যের দণ্ডবিধি অনুসারে সাজা দেওয়া হতো। প্রত্যেক বছরে একটা নির্দিষ্ট সময়ে প্রত্যেকে কর প্রদান করতে বাধ্য থাকতো। 

বাণিজ্য

বাণিজ্য ছিল এবলার অর্থনীতির তৃতীয় বৃহত্তম খাত। কাপড়, উৎপাদিত পণ্য, এবং জলপাই তেল ছিল এর প্রধান রপ্তানি পণ্য। পক্ষান্তরে, আমদানি পণ্যের মধ্যে ছিল সোনা, রূপা, তামা, টিন, মূল্যবান পাথর এবং ভেড়া। ভৌগলিক অবস্থানের কারণে এবলা ট্রানজিট বাণিজ্যে ধনী হয়ে ওঠে। এছাড়া অর্থনৈতিক, বাণিজ্যিক, প্রশাসনিক, আইনী, সাহিত্যিক, কূটনৈতিক কারণে এবলা একটি গুরুত্বপূর্ণ শহরে পরিণত হয় এবং আশেপাশের শহরগুলোর সাথে এর যোগাযোগ তৈরি হয়। এতে কোনো সন্দেহ নেই যে রাজনৈতিক, বাণিজ্যিক এবং সাংস্কৃতিকভাবে পরিশীলিত কেন্দ্র হিসেবে এবলার বিকাশ ব্যাবিলনিয়ার সাথে শক্তিশালী সাংস্কৃতিক সংযোগের জন্য অনেক বেশি ঋণী। স্পষ্টতই দক্ষিণ সিরিয়া, মধ্য আনাতোলিয়া, মেসোপটেমিয়া এবং আরও পূর্বের অঞ্চলগুলোর সাথে সংযোগসহ একটি আন্তর্জাতিক বাণিজ্য নেটওয়ার্ক হিসেবে এবলাকে ব্যবহার করা হতো। এমনকি, প্রাচীন মিশর ও বর্তমান আফগানিস্তান পর্যন্ত বাণিজ্যেরও প্রমাণ পাওয়া যায়। এবলা থেকে উগারিট বন্দর দিয়ে সাইপ্রাসের টেক্সটাইল-জাত পণ্যের বাণিজ্য হতো। বাণিজ্যের দিক থেকে মারি ছিল এবলার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী।

ভাষা

শহরের ভাষা ছিলো ‘এবলাইট’। এটি সবচেয়ে প্রাচীন সেমেটিক ভাষাগুলোর একটি, যা কেনানী উপভাষার সাথে বেশ ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত।

ধর্মবিশ্বাস

প্রার্থমিক পর্যায়ে এবলার প্রথম রাজ্যের অধিবাসীরা তাদের মৃত রাজাদের পূজা করতো। পরে তারা বহু-ঈশ্বরবাদীতে রূপান্তরিত হয়। প্রাচীন কেনান দ্বারা তাদের ধর্মবিশ্বাস বেশ প্রভাবিত ছিল। এবলাইটরা মেসোপটেমিয়ার কিছু দেবতা এবং উত্তর-পশ্চিম অঞ্চলের সেমিটিক দেবতাদের উপাসনা করত। তারা মূলত জোড়া দেবতাদের পূজা করতো, অর্থাৎ দেবতা ও তার স্ত্রীকে একসাথে পূজা করতো। এবলার জন্য অনন্য দেবতা জুটি ছিল হাদাবাল ও তার স্ত্রী বেলাতু, এবং রাসাপ ও তার স্ত্রী আদমামা। কুরা ছিল শহরের পৃষ্ঠপোষক দেবতা,  তার স্ত্রী ছিল বারামা। এছাড়া দাগন, ইতিস, ইশতার, সিপিশ, আস্তার্তে, টিট, শাহার, শালিম, হাদাদ বা হাদ্দা (তার স্ত্রীর নাম হালাবাতু, যার অর্থ হাদাদের স্ত্রী), উতু এবং বালাতু নামক দেবতাদের পূজা করা হতো। তৃতীয় রাজ্যের সময়ে হাদাদ বা হাদ্দা প্রধান দেবতা হয়ে ওঠে। এ সময়ে তারা কিছু উত্তর সেমিটিক দেবতাদের পূজা করতো।

দাগন ও হাদাদ দেবতাদের এবলা ছাড়াও প্রাচীন মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে ব্যাপকভাবে পূজা করা হতো। উভয়ই ছিলেন হিব্রু-সেমিটিক। দাগন ছিল শস্যের দেবতা। দেবতা দাগানকে লাঙলের কিংবদন্তি উদ্ভাবক হিসেবে চিহ্নিত করা হতো। প্রায় ২৫০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে তার ধর্মের প্রমাণ পাওয়া যায়। রাস শামরা গ্রন্থে পাওয়া লেখা অনুসারে, তিনি ছিলেন দেবতার পিতা। রাস শামরা নামক এক নগরে দাগানের একটি গুরুত্বপূর্ণ মন্দির ছিল। অপরদিকে হাদাদ ছিল ঝড়, বজ্র এবং বৃষ্টির দেবতা। দেবী আটারগাটিস ছিলেন তার স্ত্রী।

শেষ কথা

ইতিহাসের রহস্য একদিনে উন্মোচন করা সম্ভব নয়। টেল মারদিখের মাটির নিচে যে এখনও এবলার হাজারো রূপকথা লুকিয়ে আছে— এ কথা অস্বীকারের উপায় নেই। এই রূপকথা বিশ্বের সামনে নিয়ে আসার জন্য দরকার আরো অনুসন্ধান, আরো সময়। কিন্তু সিরিয়ার গৃহযুদ্ধের ফলে ২০১১ সালের প্রথমার্ধ থেকে এবলার খনন বন্ধ হয়ে গেছে। এরপর থেকে স্থানটি বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণে ছিল। তাছাড়া, স্থানীয় গ্রামবাসীরা এখানে বিভিন্ন সময়ে খনন করে চালিয়ে অনেক মূল্যবান ঐতিহাসিক জিনিস চুরি ও নষ্ট করেছে। সবশেষ, ৩০ জানুয়ারি ২০২০ সালে সিরিয়ার সরকারি বাহিনী উত্তর-পশ্চিম সিরিয়া পুনরুদ্ধারের সময় আশেপাশের গ্রামগুলোর সাথে টেল মারসিখ নিজেদের দখলে নিয়েছিল। অবশ্য এখনও খনন পুনরায় শুরু হয়নি। তাই এবলা রূপকথার সমাপ্তি দেখার জন্য আমাদের হয়তো আরো অপেক্ষা করতে হবে।

Related Articles