উপসাগরীয় যুদ্ধে ইসরায়েলে ইরাকের ক্ষেপণাস্ত্র আক্রমণ: কারণ ও ফলাফল

১৯৯০–৯১ সালের উপসাগরীয় যুদ্ধ (যেটাকে ‘ইরাক–কুয়েত যুদ্ধ’, ‘প্রথম উপসাগরীয় যুদ্ধ’, ‘অপারেশন ডেজার্ট স্টর্ম’, ‘অপারেশন ডেজার্ট শিল্ড’ বা ‘মাদার অফ অল ব্যাটলস’ নামেও অভিহিত করা হয়) সংঘটিত হয় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন আন্তর্জাতিক জোট ও ইরাকের মধ্যে। ১৯৯০ সালের আগস্টে ইরাক কর্তৃক পার্শ্ববর্তী রাষ্ট্র কুয়েত আক্রমণ ও দখলের মধ্য দিয়ে এই যুদ্ধ আরম্ভ হয় এবং ১৯৯১ সালের জানুয়ারি–ফেব্রুয়ারিতে মার্কিন–নেতৃত্বাধীন আন্তর্জাতিক জোটের প্রচণ্ড আক্রমণের মুখে কুয়েত থেকে ইরাকি সৈন্য প্রত্যাহারের মধ্য দিয়ে এই যুদ্ধের অবসান ঘটে। এই যুদ্ধে ইসরায়েল অংশগ্রহণ করেনি, কিন্তু যুদ্ধের সময় যে রাষ্ট্রগুলোর বেসামরিক নাগরিকরা প্রাণ হারিয়েছে, সেই তালিকায় সংখ্যার বিচারে ইসরায়েলের অবস্থান ছিল তৃতীয়। কিন্তু ইসরায়েল তো যুদ্ধে অংশই নেয়নি, তাহলে তাদের বেসামরিক নাগরিক কীভাবে নিহত হলো?

বস্তুত যুদ্ধ চলাকালে ১৯৯১ সালের ১৭ জানুয়ারি থেকে ২৩ ফেব্রুয়ারির মধ্যে ইরাক ইসরায়েলকে লক্ষ্য করে অন্তত ৪২টি সোভিয়েত–নির্মিত ‘স্কাড’ ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র বা স্কাড ক্ষেপণাস্ত্রের ইরাকি সংস্করণ ‘আল–হুসেইন’ নিক্ষেপ করে। নিক্ষিপ্ত ইরাকি ক্ষেপণাস্ত্রগুলোর কারণে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে অন্তত ৭৪ জন ইসরায়েলি বেসামরিক নাগরিকের মৃত্যু ঘটে। স্বাভাবিকভাবেই যুদ্ধে অংশগ্রহণ না করেও আক্রমণের শিকার হওয়ার কারণে ইসরায়েলে তীব্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়, কিন্তু ইসরায়েল কার্যত ইরাকের বিরুদ্ধে কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করেনি। ইসরায়েলকে লক্ষ্য করে ইরাকের এই অকস্মাৎ ক্ষেপণাস্ত্র আক্রমণ এবং ইসরায়েলি নিষ্ক্রিয়তার কারণ কী ছিল? এই প্রশ্নের উত্তর নিহিত রয়েছে আরব/ফিলিস্তিনি–ইসরায়েলি দ্বন্দ্ব এবং এই দ্বন্দ্বে ইরাকের ভূমিকার মধ্যে।

১৯৪৮ সালে ফিলিস্তিনের ভূমিতে ইহুদিবাদী–জায়নবাদী রাষ্ট্র ইসরায়েল প্রতিষ্ঠিত হয়, কিন্তু ফিলিস্তিনি আরব সম্প্রদায় এবং আরব বিশ্বের রাষ্ট্রগুলো ইসরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার তীব্র বিরোধিতা করে। আরব বিশ্বের অন্যান্য রাষ্ট্রের মতো ইরাকও ইসরায়েলি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার তীব্র বিরোধী ছিল। ইরাকের এই অবস্থানের মূল কারণ ছিল ফিলিস্তিনি আরবদের প্রতি ইরাকি জনসাধারণের সহানুভূতি এবং লেভান্ট অঞ্চলে ইরাকি সরকারের প্রভাব বিস্তারের আকাঙ্ক্ষা। এজন্য ১৯৪৮–৪৯ সালের আরব–ইসরায়েলি যুদ্ধে ইরাক সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করে এবং সম্মিলিত আরব জোটের পক্ষে ১৮,০০০-২০,০০০ সৈন্য প্রেরণ করে। কিন্তু এই যুদ্ধে ইসরায়েলিরা বিজয়ী হয় এবং ১৯৪৭ সালে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ কর্তৃক ফিলিস্তিনে ইহুদি রাষ্ট্রের জন্য বরাদ্দ ভূমির চেয়ে বেশি ভূমি দখল করে নিতে সক্ষম হয়।

মানচিত্রে ইরাক (সবুজ রঙে চিহ্নিত) এবং ইসরায়েল (কমলা রঙে চিহ্নিত); Source: Wikimedia Commons

পরবর্তী দশকগুলোতে আরব–ইসরায়েলি দ্বন্দ্ব চলতে থাকে এবং এর ফলে ইরাকের সঙ্গে ইসরায়েলের দ্বান্দ্বিক সম্পর্কও চলমান থাকে। ইরাকের জন্য কঠোর ইসরায়েলবিরোধী অবস্থান গ্রহণ করা ছিল অপেক্ষাকৃতভাবে নিরাপদ, কারণ ইসরায়েল ও ইরাকের মধ্যে কোনো সীমান্ত ছিল না এবং এজন্য ইসরায়েল চাইলেই মিসর, সিরিয়া, জর্দান বা লেবাননের মতো ইরাকের ভূমিতে আক্রমণ পরিচালনা বা ভূমি দখল করতে পারত না। এজন্য ইরাকের মনোযোগ অন্যদিকে ঘুরিয়ে রাখার উদ্দেশ্যে ইসরায়েল ইরাকের জাতিগত কুর্দি বিচ্ছিন্নতাবাদীদের সক্রিয় সমর্থন (অস্ত্রশস্ত্র–সহ) প্রদান করে। ১৯৬১-৭০ সালের মধ্যে সংঘটিত ইরাকি–কুর্দি যুদ্ধে অন্তত ১০,০০০ ইরাকি সৈন্য নিহত হয়।

১৯৬৭ সালের আরব–ইসরায়েলি যুদ্ধের সময় জর্দানে একটি ইরাকি সৈন্যদল অবস্থান করছিল, কিন্তু মাত্র ৬ দিনের মধ্যে যুদ্ধের সমাপ্তি ঘটায় তারা কার্যকরভাবে এই যুদ্ধে অংশ নেয়নি। তবুও এই যুদ্ধে ১০ জন ইরাকি সৈন্য নিহত ও ৩০ জন আহত হয়। ১৯৭৩ সালের আরব–ইসরায়েলি যুদ্ধে ৬০,০০০ ইরাকি সৈন্য আরব জোটের পক্ষে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করে, এবং এই যুদ্ধে ২৭৮ জন ইরাকি সৈন্য নিহত, ৮৯৮ জন আহত ও ১৩ জন বন্দি হয়। ১৯৭৪–৭৫ সালের ইরাকি–কুর্দি যুদ্ধের সময়ও ইসরায়েল কুর্দি বিচ্ছিন্নতাবাদীদের সক্রিয়ভাবে সহায়তা প্রদান করে এবং এই যুদ্ধে অন্তত ৭,০০০ ইরাকি সৈন্য নিহত হয়। ১৯৮০–৮৮ সালের ইরাকি–ইরানি যুদ্ধের সময় ইসরায়েল ইরানকে অস্ত্রশস্ত্র, খুচরো যন্ত্রাংশ ও সামরিক উপদেষ্টা সরবরাহ করে ব্যাপকভাবে সহায়তা করে। সর্বোপরি, ১৯৮১ সালের ৭ জুন ইসরায়েলিরা বিমান হামলা চালিয়ে ইরাকের ‘ওসিরাক পারমাণবিক রিঅ্যাক্টর’ ধ্বংস করে দেয় এবং এর মধ্য দিয়ে ইরাকি পরমাণু প্রকল্প স্থগিত হয়ে যায়।

একই সময়ে ইরাক বিভিন্ন ফিলিস্তিনি গেরিলা দলকে সহায়তা প্রদান অব্যাহত রাখে এবং যেসব আরব রাষ্ট্র (মূলত মিসর) ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণ করেছিল, তাদের বিরুদ্ধে ব্যাপক প্রচারণা চালায়। তদুপরি, ইরাকি রাষ্ট্রপতি সাদ্দাম হুসেইন ব্যক্তিগতভাবে তীব্র ইসরায়েলবিরোধী ছিলেন এবং ইরাকি রাষ্ট্রীয় প্রচারণায় ‘জেরুজালেম’কে ইসরায়েলি দখলদারিত্ব থেকে মুক্তকরণের বিষয়টি ব্যাপকভাবে উল্লেখ করা হতো। সামগ্রিকভাবে, ১৯৯০–১৯৯১ সালের উপসাগরীয় যুদ্ধের প্রাক্কালে ইরাক ও ইসরায়েলের মধ্যেকার সম্পর্ক ছিল খুবই শত্রুভাবাপন্ন।

মানচিত্রে উপসাগরীয় যুদ্ধের সময় ইরাকের বিরুদ্ধে গঠিত আন্তর্জাতিক জোটের সদস্য রাষ্ট্রগুলো (নীল রঙে চিহ্নিত); Source: Wikimedia Commons

এদিকে কুয়েত আক্রমণ ও দখলের পর ইরাকের বিরুদ্ধে বিশ্বব্যাপী তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। বিশেষত পশ্চিমা ও আরব রাষ্ট্রগুলো নিজ নিজ স্বার্থে ইরাকি সম্প্রসারণের তীব্র বিরোধিতা করে। ইরাককে কুয়েত থেকে সৈন্য প্রত্যাহারের জন্য একটি নির্দিষ্ট সময়সীমা বেধে দেয়া হয় এবং জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের অনুমোদনক্রমে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কুয়েতকে ‘মুক্ত’ করার উদ্দেশ্যে বিভিন্ন রাষ্ট্রের সমন্বয়ে একটি জোট গঠন করে। উক্ত জোটটি ইরাকের আশেপাশের অঞ্চলে সৈন্য সমাবেশ শুরু করে। তাদের উদ্দেশ্য ছিল, নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে ইরাক কুয়েত থেকে সৈন্য প্রত্যাহার করে না নিলে সামরিক শক্তি প্রয়োগ করে ইরাকি সৈন্যদেরকে কুয়েত থেকে অপসারণ করা।

ইরাকের বিরুদ্ধে গঠিত মার্কিন–নেতৃত্বাধীন জোটকে যাতে ‘আরব/মুসলিম ইরাকের বিরুদ্ধে পশ্চিমা/খ্রিস্টান আগ্রাসন’ হিসেবে চিহ্নিত করা না যায়, সেজন্য যুক্তরাষ্ট্র এই জোটে বিভিন্ন আরব ও মুসলিম–অধ্যুষিত রাষ্ট্রকে অন্তর্ভুক্ত করার জন্য বিশেষ প্রচেষ্টা চালায়। তাদের প্রচেষ্টা উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করে, কারণ অন্তত ১৪টি আরব ও মুসলিম–প্রধান রাষ্ট্র বিভিন্ন কারণে এই জোটে যোগদান করে। এই রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে ছিল সৌদি আরব, মিসর, সিরিয়া, মরক্কো, কুয়েত, ওমান, পাকিস্তান, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, বাংলাদেশ, নাইজার, সেনেগাল, বাহরাইন এবং তুরস্ক। তদুপরি, আফগান সরকারের বিরুদ্ধে যুদ্ধরত মার্কিন–সমর্থিত মিলিট্যান্ট গ্রুপগুলোর অন্তত ৩০০ সদস্য স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে এই জোটে যোগদান করে।

ইরাকি সরকার ইরাকের বিরুদ্ধে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধকে ‘আরব ও মুসলিম বিশ্বের বিরুদ্ধে মার্কিন আগ্রাসন’ হিসেবে চিহ্নিত করেছিল এবং এর মধ্য দিয়ে আরব ও মুসলিম বিশ্বের সহানুভূতি লাভের প্রচেষ্টা চালিয়েছিল। কার্যত ইরাক কর্তৃক কুয়েত দখলের পর আরব বিশ্বের জনসাধারণের একটি উল্লেখযোগ্য ইংশ ইরাকের পক্ষে ছিল। কিন্তু মার্কিন–নেতৃত্বাধীন জোটে বেশ কয়েকটি আরব ও মুসলিম–প্রধান রাষ্ট্রের অংশগ্রহণ ইরাকিদের পরিকল্পনায় ব্যাঘাত ঘটায়। এর ফলে ইরাকের পক্ষে আর এই যুদ্ধকে মুসলিম/খ্রিস্টান বা আরব/পশ্চিমা দ্বন্দ্ব হিসেবে উপস্থাপন করা সম্ভব ছিল না। এজন্য ইরাকিরা এই জোটে ফাটল ধরানোর জন্য একটি ভিন্ন কৌশল বেছে নেয়।

উপসাগরীয় যুদ্ধের সময় সৌদি আরবে মোতায়েনকৃত একদল মিসরীয় সৈন্য। মার্কিন–নেতৃত্বাধীন জোটে প্রেরিত দ্বিতীয় বৃহত্তম মুসলিম সৈন্যদলটি ছিল মিসরের; Source: D. W. Holmes via Wikimedia Commons

১৯৯১ সালের ১৬ জানুয়ারি থেকে মার্কিন–নেতৃত্বাধীন জোট কুয়েতে মোতায়েনকৃত ইরাকি সৈন্যদলের ওপর এবং ইরাকের বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুর ওপর আক্রমণ শুরু করে। ১৭ জানুয়ারি থেকে ইরাকিরা ইসরায়েলের ওপর ‘স্কাড’ ও ‘আল–হুসেইন’ ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ শুরু করে এবং ২৩ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত এই আক্রমণ অব্যাহত থাকে। উল্লেখ্য, ১৯৮০–এর দশক জুড়ে ইরাকিরা সোভিয়েত–নির্মিত ‘স্কাড’ ক্ষেপণাস্ত্রের সংস্কার সাধন করে ‘আল–হুসেইন’ নামক স্বল্পপাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করে। স্কাডের এই নতুন সংস্করণ তৈরির পেছনে ইরাকিদের মূল উদ্দেশ্য ছিল ক্ষেপণাস্ত্রগুলোর পাল্লা বৃদ্ধি করা। কিন্তু পাল্লা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে ক্ষেপণাস্ত্রগুলোর কার্যকারিতা ও গঠনগত স্থিতিশীলতার মাত্রা হ্রাস পায়। এর ফলে ইসরায়েলের উদ্দেশ্যে নিক্ষিপ্ত বেশ কয়েকটি ইরাকি ক্ষেপণাস্ত্র আকাশে থাকা অবস্থাতেই ভেঙে পড়ে কিংবা লক্ষ্যবস্তু পর্যন্ত পৌঁছাতে ব্যর্থ হয়। তদুপরি, বেশ কিছু ক্ষেত্রে ক্ষেপণাস্ত্র লক্ষ্যবস্তুর ওপর আপতিত হওয়ার পর ক্ষেপণাস্ত্রের ওয়ারহেড বিস্ফোরিত হতে ব্যর্থ হয়।

তাছাড়া, ইসরায়েলের ওপর দ্বিতীয় ইরাকি ক্ষেপণাস্ত্র আক্রমণ পরিচালিত হওয়ার পর থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তাদের কৃত্রিম উপগ্রহগুলোর সাহায্যে ইরাকিদের ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ সংক্রান্ত কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করতে থাকে এবং ইরাকিরা ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করা মাত্রই সেই তথ্য ইসরায়েলকে জানিয়ে দিতে থাকে। এর ফলে ইসরায়েলি সরকার প্রত্যেকবার ইরাকি ক্ষেপণাস্ত্র ইসরায়েলি ভূখণ্ডে আঘাত হানার আগেই জনসাধারণকে সতর্ক করে দিতে সক্ষম হয় এবং জনসাধারণ নিরাপদ আশ্রয়ে চলে যাওয়ার সুযোগ লাভ করে। এছাড়া, ইসরায়েলে সেসময় নির্মিত বহুতল ভবনগুলোকে খুবই মজবুত করে নির্মাণ করা হতো এবং এর ফলে এরকম বহু ভবনের আশেপাশে ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত করলেও ভবনগুলো ধ্বসে পড়েনি।  সর্বোপরি, ইরাকিরা তাদের ক্ষেপনাস্ত্রগুলো কেবল রাতের বেলায় ছুড়ত। এজন্য ইরাকি ক্ষেপণাস্ত্র আক্রমণে ইসরায়েলের গুরুতর কোনো ক্ষয়ক্ষতি সাধিত হয়নি।

ইরাকিদের নিক্ষিপ্ত ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে সরাসরি মাত্র তিনজন ইসরায়েলি বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়, কিন্তু ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপের ফলে সৃষ্ট শকের কারণে হার্ট অ্যাটাক ও আতঙ্কে আরো অন্তত ৭১ জন বেসামরিক ইসরায়েলি নাগরিক প্রাণ হারায়। প্রায় ২৩০ জন ইসরায়েলি নাগরিক এই আক্রমণের ফলে আহত হয়। তদুপরি, ইরাকি ক্ষেপণাস্ত্র আক্রমণের ফলে ইসরায়েলের ১,৩০২টি বসতবাড়ি, ৬,১৪২টি অ্যাপার্টমেন্ট, ২৩টি সরকারি ভবন, ২০০টি দোকান এবং ৫০টি গাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ১৯৮০–এর দশকে ইরাক রাসায়নিক অস্ত্র নির্মাণের জন্য বিস্তৃত একটি প্রকল্প গ্রহণ করে এবং ১৯৯১ সাল নাগাদ ইরাকের কাছে একটি উল্লেখযোগ্য রাসায়নিক অস্ত্রভাণ্ডার ছিল। ইরাক কর্তৃক ইসরায়েলে নিক্ষিপ্ত ক্ষেপণাস্ত্রগুলোর ওয়ারহেডগুলো ছিল প্রচলিত (conventional), কিন্তু ইসরায়েলিদের আশঙ্কা ছিল, ইরাক ইসরায়েলের বিরুদ্ধে রাসায়নিক অস্ত্রবাহী ওয়ারহেড ব্যবহার করতে পারে। এরকম ক্ষেত্রে ইসরায়েলের ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা বহুগুণে বৃদ্ধি পেত।

উপসাগরীয় যুদ্ধের সময় পরিত্যক্ত ইরাকি ট্যাঙ্ক; Source: PHC Holmes via Wikimedia Commons

স্বভাবতই ইসরায়েলি সরকার উদ্বিগ্ন হয়ে ওঠে এবং ইরাকের ওপর পাল্টা আক্রমণ পরিচালনার জন্য উদ্যোগ গ্রহণ করে। ইরাকি সরকার এটাই চাইছিল। ইসরায়েলের ওপর অতর্কিতভাবে ক্ষেপণাস্ত্র আক্রমণ পরিচালনার পেছনে তাদের মূল উদ্দেশ্যই ছিল ইসরায়েলকে প্রতি–আক্রমণ চালাতে বাধ্য করা। ইরাকি সরকারের হিসেব ছিল এরকম: ইসরায়েল যদি সেসময় ইরাকের বিরুদ্ধে আক্রমণ চালাত, সেটি মার্কিন–নেতৃত্বাধীন জোটে ইসরায়েলের অংশগ্রহণ হিসেবে বিবেচিত হতো। কিন্তু মার্কিন–নেতৃত্বাধীন জোটে যেসব আরব ও মুসলিম–অধ্যুষিত রাষ্ট্র অন্তর্ভুক্ত ছিল, তারা ইসরায়েলের সঙ্গে মিলে ইরাকের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে আগ্রহী হতো না। এই রাষ্ট্রগুলোর (বিশেষত আরব রাষ্ট্রগুলোর) জনসাধারণের বৃহদাংশ ছিল তীব্রভাবে ইসরায়েলবিরোধী এবং তাদের সরকারগুলো ইসরায়েলের সঙ্গে মিলে মুসলিম–অধ্যুষিত ইরাকের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করছে, এরকম দৃশ্যকল্প মোটেই তাদের পছন্দনীয় হতো না।

ফলে অভ্যন্তরীণ জনমতের চাপে এই রাষ্ট্রগুলো মার্কিন–নেতৃত্বাধীন জোট থেকে নিজেদেরকে প্রত্যাহার করে নিতে বাধ্য হতো, এমনটাই ছিল ইরাকি সরকারের বিশ্বাস। সেক্ষেত্রে মার্কিন–নেতৃত্বাধীন জোট বড় ধরনের একটি কূটনৈতিক ও কৌশলগত সমস্যার সম্মুখীন হতো। ইরাকবিরোধী জোটের সামরিক কার্যকলাপ পরিচালনার জন্য সৌদি ভূখণ্ডের ব্যবহার ছিল খুবই জরুরি। তদুপরি, এই যুদ্ধের জন্য সৌদি আরব, মিসর, সিরিয়া ও মরক্কো উল্লেখযোগ্য সংখ্যক সৈন্য মোতায়েন করেছিল। সর্বোপরি, মার্কিনিরা বিশ্বব্যাপী এই যুদ্ধ সম্পর্ক প্রচারণা চালাচ্ছিল যে, এটি ইরাকের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের ‘আগ্রাসন’ নয়, বরং ইরাকি দখলদারিত্ব থেকে কুয়েতকে ‘মুক্ত’ করার উদ্দেশ্যে পরিচালিত একটি যুদ্ধ। মার্কিন–নেতৃত্বাধীন জোটে ইরাকের প্রতিবেশী আরব রাষ্ট্রগুলো ও অন্যান্য আরব ও মুসলিম–অধ্যুষিত রাষ্ট্রের অংশগ্রহণের ফলে মার্কিনিদের এই প্রচারণা গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছিল।

শুধু তা-ই নয়, ইসরায়েলের সঙ্গে ইরাকের সীমান্ত নেই। এজন্য ইরাকের ওপর আক্রমণ পরিচালনা করতে হলে ইসরায়েলকে সিরীয় বা জর্দানীয় আকাশসীমা ব্যবহার করতে হতো। কিন্তু সেসময় সিরিয়া ও জর্দানের সঙ্গে ইসরায়েলের সম্পর্ক ছিল শত্রুভাবাপন্ন। ইসরায়েলিরা তাদের আকাশসীমা লঙ্ঘন করলে এবং তারা সেটা বুঝতে পারলে তাদের সঙ্গে ইসরায়েলের গুরুতর দ্বন্দ্ব দেখা দিতে পারত। সেক্ষেত্রে মার্কিন–নেতৃত্বাধীন জোটের জন্য নতুন সমস্যার সৃষ্টি হতে পারত।

বস্তুত ইরাকের ওপর বিমান হামলা শুরুর আগে থেকেই মার্কিন কর্মকর্তারা আশঙ্কা করছিলেন যে, তাদের আক্রমণ শুরুর পর ইরাক ইসরায়েলের বিরুদ্ধে ক্ষেপণাস্ত্র আক্রমণ চালাতে পারে এবং এর মধ্য দিয়ে মার্কিন–নেতৃত্বাধীন জোটে ভাঙন ধরানোর প্রচেষ্টা চালাতে পারে। অনুরূপভাবে, ইসরায়েলিরাও ইরাকের পক্ষ থেকে অনুরূপ আক্রমণের আশঙ্কা করছিল। এজন্য ইরাকের ওপর বিমান হামলা শুরুর চারদিন আগে মার্কিন উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী ল্যারি ঈগলবার্গার ও উপপ্রতিরক্ষামন্ত্রী পল উলফোভিটজ ইসরায়েল সফর করেন। তারা ইসরায়েলি নেতৃবৃন্দকে এই মর্মে অনুরোধ করেন যে, ইসরায়েল যেন ইরাকের বিরুদ্ধে কোনো ‘প্রি–এম্পটিভ স্ট্রাইক’ না চালায় এবং এই যুদ্ধে অংশ না নেয়। তারা ইসরায়েলিদেরকে প্রতিশ্রুতি প্রদান করেন যে, কয়েক দিনের মধ্যেই তারা ইরাকের স্কাড ভাণ্ডার ধ্বংস করে ফেলবেন, আর যদি এক্ষেত্রে তারা ব্যর্থ হন, সেক্ষেত্রে তারা ইসরায়েলকে ইরাকের বিরুদ্ধে আক্রমণ চালাতে অনুমতি প্রদান করবেন।

ইসরায়েলের তেল আবিব শহরের আকাশে মার্কিন–নির্মিত ‘এমআইএম–১০৪ প্যাট্রিয়ট’ সিস্টেম ইরাকি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ধ্বংস করার চেষ্টা করছে; Source: Alpert Nathan/Government Press Office/Flickr 

ইসরায়েলের বিরুদ্ধে ইরাকের ক্ষেপণাস্ত্র আক্রমণ শুরু হওয়ার পর মার্কিনিরা বেশ ভালোভাবেই বুঝতে পেরেছিল যে, ইরাক ইসরায়েলকে যুদ্ধে অংশগ্রহণের জন্য প্ররোচিত করছে, যাতে মার্কিন–নেতৃত্বাধীন জোটে অন্তর্ভুক্ত আরব ও মুসলিম–অধ্যুষিত রাষ্ট্রগুলো জোট ত্যাগ করে। এজন্য এই জোট টিকিয়ে রাখার উপায় ছিল ইসরায়েলকে ইরাকের বিরুদ্ধে পাল্টা আক্রমণ পরিচালনা থেকে নিবৃত্ত রাখা। যুদ্ধের পুরো সময় জুড়ে মার্কিন রাষ্ট্রপতি জর্জ বুশ ইসরায়েলকে এই যুদ্ধ থেকে দূরে সরিয়ে রাখার জন্য সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালান।

ইরাকি ক্ষেপণাস্ত্রের আক্রমণ থেকে ইসরায়েলকে রক্ষা করার জন্য যুক্তরাষ্ট্র দ্রুত ইসরায়েলে একটি ‘এমআইএম–১০৪ প্যাট্রিয়ট’ এয়ার ডিফেন্স আর্টিলারি ব্যাটালিয়ন মোতায়েন করে। নেদারল্যান্ডসের বিমানবাহিনীও অনুরূপভাবে ইসরায়েলে একটি প্যাট্রিয়ট মিসাইল স্কোয়াড্রন মোতায়েন করে। কিন্তু ইরাকি ক্ষেপণাস্ত্রগুলোর বিরুদ্ধে এগুলো ছিল সম্পূর্ণ অকার্যকর। যুদ্ধের পুরোটা সময় জুড়ে ইরাকিরা ইসরায়েলের ওপর ক্ষেপণাস্ত্র আক্রমণ চালাতে থাকে, কিন্তু মার্কিন বা ডাচ প্যাট্রিয়ট সিস্টেম একটি ইরাকি ক্ষেপণাস্ত্রও ধ্বংস করতে পারেনি। মার্কিনিদের প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী, এক্ষেত্রে ইসরায়েল ইরাকের বিরুদ্ধে পাল্টা আক্রমণ চালাতে পারত। কিন্তু মার্কিন রাষ্ট্রপতি বুশ নিয়মিত ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী ইৎঝাক শামিরের সঙ্গে যোগাযোগ করতে থাকেন এবং ইরাকের বিরুদ্ধে কোনো ধরনের আক্রমণ পরিচালনা থেকে বিরত থাকার জন্য তাকে অনুরোধ করতে থাকেন। কিন্তু ইসরায়েলিরা ক্রমশ অধৈর্য হয়ে উঠতে থাকে।

মার্কিন/ডাচ এয়ার ডিফেন্স সিস্টেম ইরাকি ক্ষেপণাস্ত্র আক্রমণ প্রতিহত করতে পারছিল না, এবং সেসময় ইসরায়েলের নিজেরও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ধ্বংস করার সামর্থ্য ছিল না। এজন্য ইসরায়েলিরা ইরাকের অভ্যন্তরে কমান্ডো হামলা চালিয়ে ইরাকিদের ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপণ কেন্দ্রগুলো ধ্বংস করে দিতে চাইছিল। তারা ইরাকের ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপণ কেন্দ্রগুলোকে চিহ্নিত করে এবং সেগুলোকে ধ্বংস করার উদ্দেশ্যে অভিযান পরিচালনার প্রস্তুতি নেয়। কিন্তু এই অভিযান পরিচালনার জন্য তাদের মার্কিনিদের সঙ্গে নিজেদের কার্যক্রম সমন্বয় করার প্রয়োজন ছিল। সেসময় মার্কিন যুদ্ধবিমান ইরাকি আকাশ ছেয়ে রেখেছিল এবং তাদের না জানিয়ে ইসরায়েলিরা যদি বিমানযোগে ইরাকে কমান্ডো প্রেরণ করত, সেক্ষেত্রে মার্কিনিরা ইসরায়েলি বিমানকে শত্রুবিমান মনে করে ভূপাতিত করতে পারে, এরকম সম্ভাবনা ছিল।

উপসাগরীয় যুদ্ধে ইরাকের বিরুদ্ধে ব্যবহৃত মার্কিন ‘এফ–১১৭ নাইটহক’ যুদ্ধবিমান; Source: Aaron Allmon II via Wikimedia Commons

কিন্তু মার্কিনিরা এই ধরনের অভিযানের বিরোধিতা করতে থাকে এবং এজন্য ইসরায়েলি সরকার দ্বিধায় পড়ে যায়। এই পর্যায়ে ইসরায়েলি প্রতিরক্ষামন্ত্রী মোশে অ্যারেন্স যুক্তরাষ্ট্র সফর করেন এবং ইরাকের বিরুদ্ধে ইসরায়েলের নিজস্ব অভিযান চালানোর জন্য মার্কিন রাষ্ট্রপতি বুশের অনুমোদন আদায়ের চেষ্টা করেন। কিন্তু বুশ দৃঢ়ভাবে এই প্রস্তাবে অস্বীকৃতি জানান। তিনি মন্তব্য করেন, “যেটা মার্কিন বিমানবাহিনী পারছে না, সেটা আপনাদের বিমানবাহিনী কীভাবে করবে?” বুশকে মার্কিন কর্মকর্তারা জানিয়েছিলেন যে, ইসরায়েলে মোতায়েনকৃত প্যাট্রিয়ট সিস্টেমগুলো সাফল্যের সঙ্গে ইরাকি ক্ষেপণাস্ত্র আক্রমণ প্রতিহত করছে, এবং এর ভিত্তিতে বুশ মতপ্রকাশ করেন যে, ইসরায়েলের কোনো পদক্ষেপ নেয়ার প্রয়োজন নেই। অবশ্য পরবর্তীতে মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী ডিক চেনি অ্যারেন্সকে জানান, ইসরায়েলিরা যদি ইরাকে কোনো অভিযান পরিচালনা করতে চায়, সেক্ষেত্রে মার্কিন সৈন্যরা তাদের জন্য কোনো প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করবে না।

কিন্তু শেষ পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রী শামির ইরাকে কোনো অভিযান পরিচালনার সিদ্ধান্ত নেয়া থেকে বিরত থাকেন। তার এই পদক্ষেপের দুটি কারণ ছিল:

(১) ইরাকি ক্ষেপণাস্ত্র আক্রমণের ফলে ইসরায়েলের ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ ছিল সীমিত এবং এজন্য ইসরায়েলি জনসাধারণ পাল্টা আক্রমণ চালানোর জন্য ইসরায়েলি সরকারকে তেমন চাপ দিচ্ছিল না। এজন্য শামির ইরাকে কমান্ডো আক্রমণ পরিচালনা করতে তেমন উৎসাহ বোধ করছিলেন না।

(২) ইসরায়েল ইরাকে আক্রমণ পরিচালনা করলে মার্কিন সৈন্যরা সেক্ষেত্রে কোনো প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি করত না, কিন্তু মার্কিন সরকারের সঙ্গে ইসরায়েলের সম্পর্কের অবনতি ঘটার সম্ভাবনা ছিল। শামির যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখতে ইচ্ছুক ছিলেন এবং এজন্য যুক্তরাষ্ট্রকে অসন্তুষ্ট করতে আগ্রহী ছিলেন না।

এর ফলে ইরাকিদের পরিকল্পনা ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয় এবং মার্কিন–নেতৃত্বাধীন জোটে যুদ্ধের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত কোনো ভাঙন ধরেনি। অবশেষে ১৯৯১ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করে এবং এর মধ্য দিয়ে উপসাগরীয় যুদ্ধের অবসান ঘটে।

Related Articles