শূন্য, দশমিক প্রক্রিয়া, ক্যাটারাক্ট সার্জারি, শ্যাম্পু বা দাবার আবিষ্কার যে ভারতীয় উপমহাদেশেই হয়েছিলো তা আমরা সবাই কমবেশি জানি। এটা কি জানেন যে, রাইট ব্রাদার্সেরও ৮ বছর আগে এক ভারতীয় সর্বপ্রথম উড়োজাহাজ বানিয়েছিলেন? ১৮৯৫ সালে মারাঠার চৌপত্তির জনাকীর্ণ সৈকতে উড়েছিলো সেই মনুষ্যবিহীন উড়নযন্ত্র। তথ্যগত বিতর্ক থাকলেও ভারতীয় শিবকর তলপড়েকেই অনেকে বলে থাকেন ভারত, মতান্তরে বিশ্বের প্রথম সফল উড্ডয়নকৃত উড়োজাহাজের আবিষ্কারক।

শৈশব, শিক্ষা ও একটি স্বপ্নের গল্প

পুরো নাম শিবকর বাপুজি তলপড়ে, ডাকনাম শিবি। জন্মেছিলেন ভারতের বোম্বের (বর্তমান মুম্বাই) চিরা বাজার নামক স্থানে। আর্য সমাজের সদস্য ছিলেন তিনি। প্রথম থেকেই সংস্কৃত, পুরাণ ও বিজ্ঞান নিয়ে আগ্রহ ছিলো তার। স্যার জামশেদজি জিজেভয় স্কুল অব আর্টে পড়াশোনা করেন তিনি। সেখানে পড়াকালে তিনি তার এক শিক্ষক চিরঞ্জিলাল বর্মার দ্বারা ভীষণভাবে প্রভাবিত হন। সেই শিক্ষকের বিমান চালনাবিদ্যা (Aeronautics) নিয়ে ছিলো বিস্তর পড়াশোনা। শিক্ষকের আগ্রহ সঞ্চারিত হয় ছাত্রের ভেতরেও।

শিবকর; Source:huffingtonpost.in

মূলত সেই শিক্ষকের পরামর্শেই শিবকরের পরিচয় ঘটে স্বামী দয়ানন্দ সরস্বতীর লেখা বিমান চালনাবিদ্যা বিষয়ক বই ‘ঋগ্বেদ ও যজুর্বেদ ভাষ্য’-এর সাথে। সেই সঙ্গে কৃষ্ণজি বাজের উড়ান সম্পর্কিত বই থেকেই উড়োজাহাজ তৈরির পরিকল্পনা মাথায় খেলেছিলো শিবকরের। তবে ভাষ্যের একাধিক্রম থাকুক আর না থাকুক, এটা স্পষ্ট যে, শিবকর উড়োজাহাজ তৈরির প্রাথমিক ধারণাটুকু পরোক্ষভাবে বেদ থেকেই পেয়েছিলেন। কেননা উপরে বর্ণিত বইগুলোতে সংস্কৃত পুরাণ ও বেদে উল্লেখিত বিশেষ দৈবযন্ত্র ‘বিমানা’কে বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক উপায়ে ব্যাখ্যা করা হয়েছে।

উক্ত ব্যাখ্যাসমূহের মূল কথা এই যে, সেই ‘বিমানা’ বা ‘বিমান’-ই হচ্ছে অধুনা বায়ুগতিবিদ্যার (Aerodynamics) উড়নযন্ত্র বা উড়োজাহাজ। বেদ থেকে উড়োজাহাজের প্রাথমিক ধারণা পাবার পর শিবকর আরো বিশদ জানতে থমাস আলভা এডিসনের গ্যাসবেলুন ও হাইরাম ম্যাক্সিমের বদ্ধ-বাষ্পীয় ইঞ্জিন চালিত উড়োজাহাজের নকশা নিয়ে পড়াশোনা করেন। শুধু কি জেনেই ক্ষান্ত হলেন শিবকর? ভারতে বসে বিশ্বের প্রথম সফল উড়োজাহাজ বানানোর নেশা পেয়ে বসলো তাকে। সেই অনুযায়ী কাজে নেমে পড়লেন তিনি।

বৈমানিক সংহিতার পাতা থেকে; Source: huffingtonpost.in

কেমন ছিলো সে উড়োজাহাজ

শিবকরের উড়োজাহাজ তৈরির ঘটনাটি বিশদে বর্ণিত হয়েছে মারাঠি স্থপতি ও ঐতিহাসিক প্রতাপ বেলকারের বই ‘পাথারে প্রভুঞ্চ ইতিহাস’ নামক বইটিতে। শিবকরের ভাইঝি রোশান, নিকটাত্মীয় চন্দ্রকান্তের বিভিন্ন বক্তব্য এবং ছাত্র পি. সাটওয়ালকারের কিছু প্রবন্ধকে রেফারেন্স হিসেবে বইটিতে ব্যবহার করেছেন বেলকার। সেখানে বর্ণিত হয়েছে, জেজে স্কুল অব আর্টের ওয়ার্কশপে গাড়ির চাকা আর পাখির ডানা- এ দুইয়ের নকশা নিয়ে গবেষণা শুরু করেছিলেন শিবকর। এদের সংমিশ্রণে তিনি এরপর এমন একটি যন্ত্র তৈরি করতে চাইলেন, যা মাটি থেকে উড়ে যেতে সক্ষম।

শিবকরের তৈরি করা সে যন্ত্রটির নকশা সাজানো হয়েছিলো পারদ ও সৌরশক্তিকে ব্যবহার করে। শিবকর শখ করে এর নাম দেন মরুৎসখা। সংস্কৃতে মরুৎ অর্থ বায়ু ও সখা অর্থ বন্ধু। কোথাও বর্ণিত হয়েছে এ উড়োজাহাজটি ছিলো মোচাকৃতির, কোথাও বর্ণিত হয়েছে নলাকৃতির। তবে মজার বিষয়, উড়োজাহাজটিতে কোনো ডানা ছিলো না।

বেলকারের কল্পনায় শিবকরের উড়োজাহাজের মডেল; Source:huffingtonpost.in

উড়োজাহাজ বা একটি স্বপ্নের উড়বার গল্প

১৮৯৫ সালের কোনো এক সময়। উড়োজাহাজ তৈরি শেষ। এরপর এটিকে শিবকর নিয়ে যান চৌপত্তির বালুকাময় বেলাভূমিতে। অসংখ্য উৎসুক মানুষের চোখ তখন উড়োজাহাজের পানে। মোচাকৃতির বাঁশের তৈরি কাঠামোর ভেতর রাখা ছিলো গলিত পারদ। সূর্যের তাপে পারদের উদ্বায়নের দরুণ নির্গত হাইড্রোজেন গ্যাস বায়ুর থেকে হালকা। এতটাই হালকা যে, সেই হাইড্রোজেনের তোড়েই শূন্যে ভাসলো মরুৎসখা।

উড়োজাহাজটি মাটি থেকে ১,৫০০ ফুট ওপরে হাওয়ায় ভেসেছিলো ১৮ থেকে ২০ মিনিট অবধি। অনেক বর্ণনায় যদিও-বা বলা হয়, এই উড়োজাহাজ স্বল্প উচ্চতায় বিস্ফোরিত হয়েছিলো, কিন্তু বেলকার সে দাবি প্রত্যাখ্যান করেন। তবে মরুৎসখা যে উড়েছিলো, এ ব্যাপারে দ্বিমত নেই কোনো বর্ণনায়।

এ ঘটনাকে অনুপ্রেরণা করে ২০১৫ সালে বলিউডে নির্মিত হয়েছে চলচ্চিত্র ‘হাওয়াইজাদে‘, যেখানে শিবকরের চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন আয়ুষ্মান খুররানা। চলচ্চিত্রটির পরিচালক বিভু পুরি ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে জানান, তিনি বেশ কিছু নথি পেয়েছিলেন যেখানে আবার উল্লেখ ছিলো শিবকরের উড়োজাহাজের জ্বালানী ছিলো মূত্র।

হাওয়াইজাদে সিনেমার শুটিং-এর একটি দৃশ্যে শিবকর (আয়ুষ্মান); Source: rediff.com

নতুন স্বপ্নের সাথে সাথে শিবকরেরও মৃত্যু

১৯০৪ সালে পণ্ডিত সুব্বরয়া শাস্ত্রী কর্তৃক রচিত ‘বৈমানিক শাস্ত্র’ বইটি প্রকাশিত হবার পর সেখান থেকে ধারণা নিয়ে শিবকর ডানাওয়ালা নতুন আরেক উড়োজাহাজ বানাতে চেয়েছিলেন এবং এজন্য অনুদান খুঁজছিলেন। কিন্তু দুর্ভাগ্য তার, কেউই এগিয়ে আসেনি। অথচ রাইট ব্রাদার্সের জন্য ঠিকই কাঁড়ি কাঁড়ি অনুদান নিয়ে হাজির হয়েছিলো মার্কিন সেনাবাহিনী। এসব তথ্য উল্লেখ আছে ১৯৮৫ সালে ডিকে কাঞ্জিলাল রচিত ‘বিমানা ইন এনসিয়েন্ট ইন্ডিয়া’ বইটিতে।

উড়োজাহাজের ভগ্ন কাঠামো সযত্নে নিজ বাড়ির গোলাঘরে রেখেছিলেন শিবকর। তিনি মারা যাবার পর তার ভাইঝি রোশান তালপড়ে ও তার খেলার সাথীরা ‘ওড়াউড়ি’ খেলতেন এতে চড়ে। কোনো বর্ণনায় অবশ্য পাওয়া যায়, সাধের উড়োজাহাজের ভস্ম ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছিলো প্রয়াত শিবকরের ঘরের চারদিকে। আবার অনেকের মতে, মৃত্যুর আগে শিবকর উড়োজাহাজটি বিক্রি করেছিলেন র‍্যালিস ব্রাদার্সের কাছে, যদিও এ নিয়ে র‍্যালিস ইন্ডিয়া কোম্পানির কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

তবে কি রাইট ব্রাদার্স মিথ্যা?

১৯০৩ সালে রাইট ব্রাদার্সের উড়োজাহাজ উড্ডয়নের আগে দুই/এক বছর আগেই ব্রাজিলের সান্তোস দি মন্তে উড়োজাহাজ উড়িয়েছিলেন বলে কথিত আছে। তবে রাইট ব্রাদার্সের আবিষ্কারের কৃতিত্ব নিয়ে বিতর্ককে পাশ কাটিয়ে একটি সুন্দর উপসংহার টানা যেতে পারে। তা হলো, রাইট ব্রাদার্সের আবিষ্কারের কৃতিত্বের সাথে শিবকরের আবিষ্কারের কোনো তুলনা চলে না। কেননা রাইট ব্রাদার্সের বিমানটি যেখানে ছিলো মনুষ্যবাহী, সেখানে শিবকরের বিমানটি ছিলো মনুষ্যবিহীন।

রাইট ব্রাদার্সের বিমান; Source: uh.edu

অন্যদিকে মনুষ্যবিহীন বিমান প্রথম আবিষ্কারের কৃতিত্বও শিবকরকে দেওয়া যায় না। কেননা শিবকরের ৪৭ বছর আগেই জন স্ট্রিংফেলো তা আবিষ্কার করেন। এক্ষেত্রে শিবকরকে তাই বড়জোর ‘ভারতের মধ্যে সর্বপ্রথম’ বলা যেতে পারে।

আদৌ কি শিবকর ‘প্রথম’ আবিষ্কারক?

শিবকরের মৃত্যুর পর জাতীয় প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা বিএইচ বেদেকর শিবকরের সমস্ত গবেষণার নথি-নকশা সংগ্রহ করেন। চেন্নাইয়ে অনুষ্ঠিত এক আন্তর্জাতিক অ্যারোনটিক্যাল সম্মেলনে তার মূল্যায়ন অনুযায়ী, উক্ত নকশা ছিলো বেশ ত্রুটিপূর্ণ। কিছু নথি সংরক্ষিত আছে ব্যাঙ্গালোরের হিন্দুস্তান অ্যারোনটিক্সের নিজস্ব সংগ্রহশালায়। ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অব সায়েন্সের এক প্রতিবেদনে বলা হয়,“উড়োজাহাজ শিবকর বানিয়েছিলেন বটে কিন্তু সফলভাবে ওড়াতে পারেননি”

নাগরিক ঐতিহাসিক দীপক রাও-এর মতে, জাতীয়তাবাদী গৌরবের জোশে এ ইতিহাস অতিরঞ্জিত করার একটি প্রয়াস দেখা যায়, যা আদতে শিবকরের জ্ঞান চিকীর্ষার প্রতি অশ্রদ্ধার নামান্তর। এমনকি ‘আর্য ধর্ম’ পত্রিকায় লেখা প্রবন্ধসমূহে কিংবা নিজের লেখা বই ‘প্রাচীন বিমান কালেচা শোধ’-এ বিশদভাবে নিজের এ আবিষ্কার সম্পর্কে বলেননি শিবকর স্বয়ং।

শিবকরকে নিয়ে লন্ডন টাইমসে ছাপা একটি আর্টিকেল; Source: factsfootprint.blogspot.com

এ উড্ডয়নের প্রত্যক্ষদর্শী ছিলেন ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামী লালা লাজপত রাই স্বয়ং, এমনটি দাবি করা হয়েছে বহু ভারতীয় গণমাধ্যম ও লেখায়। অনেক বর্ণনায় বলা হয়, চৌপত্তির সাগর পাড়ে সেদিনের ঐতিহাসিক ঘটনার সাক্ষী হয়েছিলেন বরোদার তৎকালীন রাজা সায়াজি রাও গ্যাকোয়াড় (৩য়)। যদিও পরবর্তীতে সেই পরিবারের এক সদস্য মহেন্দ্রসিংহ চৌহান বলেন, এই তিনি ব্যাপারে কিছুই জানেন না।

তবে এ 'না জানা'র ব্যাপারটিকে বেলকার ব্যাখ্যা করেছেন এভাবে, যেহেতু ঘটনাটি যতটা না কর্তৃপক্ষের অনুদান নির্ভর কোনো কিছু, তার থেকে অনেকটা সার্কাস বা জাদু প্রদর্শনী ঘরানার ছিলো; তাই সেভাবে সরকারি দলিল পাওয়া সম্ভব নয়। সেই সাথে ঔপনিবেশিক শাসনের কড়াকড়ি এতটাই ছিলো যে, এসব কর্মকাণ্ডকে সরকার বিরোধী ষড়যন্ত্র বলে সন্দেহ পর্যন্ত করা হতো। তাই এর সম্পর্কে মূল অঞ্চলের বাইরে তথ্য বিস্তারও কঠিন।

সুতরাং নির্ভরযোগ্য প্রমাণের অপর্যাপ্ততায় এটি স্পষ্ট করে বলা যায় না যে, বিশ্বে শিবকরই প্রথম মনুষ্যবিহীন উড়োজাহাজ বানিয়ে উড়াতে পেরেছিলেন কিনা। তবে এটা বলাই যায় যে, ভারতে তিনিই সর্বপ্রথম উড়োজাহাজ তৈরির প্রচেষ্টা চালিয়েছিলেন।

ফিচার ইমেজ: huffintonpost.in