এই লেখাটি লিখেছেন একজন কন্ট্রিবিউটর।চাইলে আপনিও লিখতে পারেন আমাদের কন্ট্রিবিউটর প্ল্যাটফর্মে।

খ্রিস্টপূর্ব ১০০ অব্দ। রোম তখনও সাম্রাজ্য হয়ে ওঠেনি। কেবল একটি নগর রাষ্ট্র, যার নাম রোমান রিপাবলিক বা রোমান প্রজাতন্ত্র। এই প্রজাতন্ত্র পরিচালিত হতো সিনেট নামক নির্বাচিত এক প্রতিনিধি পরিষদের দ্বারা। গাইয়্যাস সিজার ছিলেন একজন রোমান সিনেটর। তার স্ত্রী অরেলিয়া কোট্টার ঔরসে জন্ম নেয় রোমান ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সেনাপতি জুলিয়াস সিজার। শুধু সেনাপতি বললে হয়তো কম বলা হয়। আসলে জুলিয়াস সিজার ছিলেন 'প্রজাতন্ত্রের সম্রাট'।

খ্রিস্টপূর্ব ১০০ অব্দের ১২ জুলাই রোম থেকে প্রায় ২০ মাইল দক্ষিণে অ্যালবা লঙ্গা নামক স্থানে সিজারের জন্ম।আগেই বলা হয়েছে, তার বাবা ছিলেন একজন সিনেটর। মা কোট্টা ছিলেন একজন কনস্যুলের মেয়ে (কনস্যুল হলো রোমান সিনেটের প্রধান)। শুধু তা-ই নয়, কোট্টার তিন ভাই অর্থাৎ সিজারের তিন মামাও বিভিন্ন সময়ে কনস্যুল ছিলেন। তাই বেশ সম্ভ্রান্ত পরিবারেই তার জন্ম। কথিত আছে, তিনি রোমান পুরাণের প্রেমের দেবী ভেনাস ও ট্রোজান রাজকুমার ইনিয়াসের বংশধর।

জুলিয়াস সিজার; Image Courtesy: Easy Incentive

জন্মের কয়েক বছর পরেই রোমে গৃহযুদ্ধ শুরু হয়। একপক্ষে ছিলেন প্রভাবশালী সিনেটর গ্যারিয়াস মারিয়াস, অপরপক্ষে সুলা নামক আরেক সিনেটর। গ্যারিয়াস ছিলেন সম্পর্কে সিজারের ফুপা। তাই পারিবারিকভাবেই সিজারের বাবার সমর্থন ছিল গ্যারিয়াসের প্রতি। কিন্তু এর মধ্যে খ্রিস্টপূর্ব ৮৫ সালে সিজারের বাবা গাইয়াস সিজার মারা যান। জুতা পরতে গিয়ে রহস্যজনকভাবে তার মৃত্যু ঘটে। সিজারের দাদাও ইতালির পিসা নগরীতে একইভাবে মারা গিয়েছিলেন বলে ধারণা করা হয় এটা ছিল একটা হত্যাকান্ড।

যা-ই হোক, মারা যাবার পূর্বে সিজারের বাবা তার জন্য বেশ কিছু সম্পত্তি রেখে যান। কিন্তু ফুপা গ্যারিয়াস সিজার সেই গৃহযুদ্ধে হেরে যান। ফলে বাবার রেখে যাওয়া সম্পত্তি দখল করে নেয় অপর বিজয়ী সিনেটর সুলা। সিজারের বাবার কারণে তাদের পুরো পরিবার সুলার রোষানলে পড়ে। কিন্তু তার মামা বাড়ির হস্তক্ষেপে অবস্থার কিছুটা পরিবর্তন হয়। তিনি ও তার পরিবার সুলার রোষানল থেকে রক্ষা পান। কিন্তু তখনঅ রোম নিরাপদ মনে না হওয়ায় তিনি চলে যান এশিয়ায়।

তখন সিজারের বয়স সবে ১৬ বছর। বেশ কম বয়সেই পরিবারের দায়িত্ব এসে পরে তার কাঁধে। সেই সাথে গৃহযুদ্ধে পরাজিত হওয়ায় তার পরিবারের প্রভাব প্রতিপত্তিও কমে যায়। তিনি সিদ্ধান্ত নেন যে করেই হোক পরিবারের হারানো প্রভাব-প্রতিপত্তি তিনি ফিরিয়ে আনবেন। এজন্য সিজার বেছে নেন সেনাবাহিনীকে। কারণ তিনি জানতেন, রোমান সিনেটে প্রভাব বিস্তারের জন্যে সেনাবাহিনী সবচেয়ে কার্যকর রাস্তা। তিনি ঠিক করেন  সেনাসাফল্য দ্বারা নিজেদের হারানো বংশমর্যাদা পুনরুদ্ধার করবেন।

সিজারের যখন জন্ম তখন রোম কিন্তু কেবল ছোট নগর রাষ্ট্র নয়। অনেক পথ পাড়ি দিয়ে প্রায় ৭ লক্ষ বর্গ মাইলের বিশাল অঞ্চল তখন রোমান সিনেটের দখলে। এই বিপুল পরিমাণ অঞ্চল জয় করার জন্য রোমানদের প্রচুর যুদ্ধে জয়লাভ করতে হয়। এসব যুদ্ধে জয়ের পর রোমানরা সেই অঞ্চলের মানুষদের দাসে রূপান্তর করত। এই দাসদের দিয়ে মূলত তারা সৈন্যদল তৈরি এবং রাস্তা নির্মাণ করতো, যা প্রজাতন্ত্রের বিস্তারে গুরুত্তপূর্ণ ভূমিকা রাখে। রোমানরা ৭৫ খ্রিস্টপূর্ব পর্যন্ত প্রায় ২০ লাখ দাস দ্বারা মোট ৫০,০০০ মাইলের বেশি রাস্তা নির্মাণ করে। এসব নির্মাণকাজ চালাতে গিয়ে দাসদের উপর অকথ্য নির্যাতন করা হতো। ফলে খ্রিস্টপূর্ব ৭৩ সালে স্পার্টাকাস নামক একজন দাসের নেতৃত্বে শক্তিশালী বিদ্রোহ দানা বাঁধে। দাসরা বীর যোদ্ধা ছিল। তাই বিদ্রোহ দমনের জন্য রোমান সিনেট বেশ কিছু সৈন্যবাহিনী প্রেরণ করে।

বিদ্রোহ এত মারাত্মক রূপ নেয় যে রোমান সিনেটের পাঠানো সব সৈন্যবহর পরাজিত হয় স্পার্টাকাসের বাহিনীর কাছে। খুব অল্পদিনেই তারা রোমের খুব কাছাকাছি চলে আসে এবং দাসবাহিনী আর রোম শহরের মধ্যে একমাত্র বাধা ছিল শুধু ক্রাসিয়াস নামক রোমান সেনাপতির এক সৈন্যদল। ক্রাসিয়াস ছিলেন রোমের সবচে' ধনী ব্যক্তি ও একজন সিনেটর। এই সৈন্যদলের একজন দলপতি ছিলেন জুলিয়াস সিজার। দাস বাহিনীর বিরুদ্ধে রোমানদের যুদ্ধকৌশলে সবচেয়ে বড় ভুল ছিল- প্রতিটি আক্রমণে রোমান সৈন্যদল দাস বাহিনীকে প্রতিরোধ করার চেষ্টা করছিল। কিন্তু দাস বাহিনীর ক্ষিপ্রতা ও গতি তাদের প্রতিরোধ ভেঙে দিচ্ছিল। তাই সিজার ক্রাসিয়াসকে যুদ্ধকৌশল পরিবর্তনের পরামর্শ দেন। তিনি বলেন, প্রতিরোধ নয়, রোমানদের প্রকৃতপক্ষে আক্রমণের কৌশল অবলম্বন করা উচিত।

সিজারের পরামর্শে দাস বাহিনীর উপর অতর্কিত হামলা চালায় ক্রাসিয়াসের সৈন্যদল। দাস বাহিনী যখন ভোরের ঘুমের উষ্ণতা নিচ্ছিল, ঠিক তখনই তাদের উপর আক্রমণ করে রোমান বাহিনী। অতর্কিত আক্রমণের কারণে দাস বাহিনী দিশেহারা হয়ে পড়ে। রোমানদের আক্রমণে টিকতে না পেরে তারা বিশৃঙ্খল হয়ে যায়। যুদ্ধে স্পার্টাকাস পরাজিত ও নিহত হয়। তার সৈন্যবাহিনী অনেক সৈন্য পরাজয় দেখে পালিয়ে যায়। ফলে রোমানদের সবচেয়ে বড় মাথাব্যথার কারণের সমাপ্তি ঘটে।

সমাপ্তির পর যুদ্ধক্ষেত্রের আহত ও পরাজিত দাসদের এক অমানবিক শাস্তি ভোগ করতে হয়। ক্রাসিয়াসের বাহিনী পরাজিত এই দাসদের ক্রুশবিদ্ধ করতে শুরু করে। কথিত আছে, তার বাহিনী প্রায় ৬ হাজার দাসকে ক্রুশবিদ্ধ করে, যা প্রায় ৬০ মাইল জুড়ে বিস্তৃত ছিল। রোমানরা মূলত এই কাজটি করে বিদ্রোহীদের কাছে উদাহরণ সৃষ্টির জন্য।সিজারের রণকৌশলে ক্রাসিয়াসের বাহিনীর এই জয় সিজারকে ক্রাসিয়াসের ঘনিষ্ঠ করে তোলে। তাই ক্রাসিয়াসের ঘনিষ্ঠতা সিজারের জন্য রাজনৈতিকভাবে বেশ গুরুত্বপূর্ণ ছিল।

Image Courtesy: O Cafezinho

পম্পেই ম্যাগনাস ছিলেন সেই সময়ের আরেকজন প্রভাবশালী সিনেটর। সিনেটে তিনি ছিলেন ক্রাসিয়াসের মূল প্রতিদ্বন্দ্বী। সিনেটর হওয়ার পাশাপাশি তিনি ছিলেন একজন দুর্ধর্ষ সেনাপতি। তিনিও সে সময় তার সৈন্যদল নিয়ে যুদ্ধক্ষেত্রের অদূরেই ছিলেন। পম্পেই ক্রাসিয়াসের বিজয়ে স্বভাবতই খুশি ছিলেন না। কারণ ক্রাসিয়াসের এই বিজয় সিনেটে তার ক্ষমতাকে বাড়িয়ে দেবে, যা পম্পেইয়ের জন্য মোটেও সুখকর নয়। তাই তিনি স্পার্টাকাসের পলায়ন করা কিছু সৈন্য তাড়া করেন এবং তাদের হত্যা করেন। তারপর ক্রাসিয়াসের আগেই রোমে প্রত্যাবর্তন করেন এবং সিনেটের কাছে স্পার্টাকাসের বিরুদ্ধে এই জয়কে নিজের নামে চালিয়ে দেন। ফলে ক্রাসিয়াস ও সিজার যখন রোমে ফিরে আসেন তখন দেখেন সবাই পম্পেইয়ের বিজয় উদযাপন করছে।

পম্পেই; Image Source: Youtube

এই ঘটনা ক্রাসিয়াস আর পম্পেইয়ের মাঝে তুমুল বিরোধিতার সৃষ্টি করে এবং ক্রাসিয়াস পম্পেইয়ের এই কাজের যথাযথ জবাব দেয়ার সিদ্ধান্ত নেন। ক্রাসিয়াস সিনেটকে কাজে লাগিয়ে পম্পেইয়ের সৈন্যদলের বেতন আটকে দেন। ফলে পম্পেইয়ের সৈন্যদলের মধ্যে অস্থিরতা দেখা দেয়। এই ঘটনা পম্পেই ও ক্রাসিয়াসকে মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেয় এবং একটি অনিবার্য সংঘাতের দিকে এগিয়ে যেতে বাধ্য করে। ফলে রোমের আরেকটি গৃহযুদ্ধে জড়িয়ে পড়া তখন ছিল কেবল সময়ের ব্যাপার।

কিন্তু বিচক্ষণ সিজার এই গৃহযুদ্ধের সম্ভাবনাকে সুযোগ হিসেবে দেখতে পান। তিনি জানতেন যে তিনি এমন এক জায়গায় এসে দাঁড়িয়েছেন যেখানে কয়েক বছর পূর্বে দাঁড়িয়ে ছিলেন তার বাবা। তিনিও যদি তার বাবার মতো গৃহযুদ্ধে ভুল পক্ষ সমর্থন করেন, তাহলে তার পরিবার চিরদিনের মতো ধুলোয় মিশে যাবে। তাই তিনি একটি অসাধারণ পরিকল্পনা করেন। তিনি সিদ্ধান্ত নেন দুই পক্ষের মধ্যস্থতার ব্যবস্থা করবেন। প্রকৃতপক্ষে এটি ছিল বেশ ঝুঁকির কাজ। এই কাজ করতে গিয়ে দুই পক্ষেরই রোষানলে পড়ার সম্ভাবনা ছিল। কারণ বিবাদমান দুই পক্ষ কোনোভাবেই একে অপরের সাথে আপোষ করতে রাজি হতো না। তাই তিনি দুজনকেই আলাদা আলাদা চিঠি লেখেন। তাতে লেখা ছিল, সিজার শুধুমাত্র তার সাথে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সাক্ষাৎ করতে চান।

তিনি দুই পক্ষকেই আলাদা পত্র মারফত একটি গোপন জায়গায় আসতে অনুরোধ করেন। অনেক ঐতিহাসিকের মতে, সিজারের এই মধ্যস্থতার সিদ্ধান্ত ছিল নিজের উপর অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাসের ফল।

যখন পম্পেই ও ক্রাসিয়াস সেই গোপন স্থানে উপস্থিত হন, তখন তারা বুঝতে পারেন যে, এটা আসলে কোনো সাক্ষাৎ নয়, প্রকৃতপক্ষে সিজার তাদের সমঝোতার জন্য ডেকেছেন। এরপর সিজারের জন্য পরিস্থিতি খুবই খারাপ হতে পারত। তাদের অনুমতি ছাড়াই এই ধৃষ্টতা দেখানোর জন্য দুই পক্ষই তার বিরোধী বনে যাওয়ার সুযোগ ছিল। কিন্তু সিজার তার বাগ্মিতা দিয়ে দুই পক্ষের আস্থা অর্জনে সক্ষম হন। তার বিচক্ষণতা ও মধ্যস্থতায় রোম গৃহযুদ্ধের হাত থেকে বেঁচে যায়। তিনি দুই পক্ষকে বোঝাতে সক্ষম হন যে, যদি ক্রাসিয়াস আর পম্পেই একজোট হন তাহলে ক্রাসিয়াসের সম্পদ আর পম্পেইয়ের সামরিক শক্তি তাদের জোটকে রোমের সবচেয়ে শক্তিশালী ব্যক্তিতে পরিণত করবে এবং সিনেটে তাদের কার্জসিদ্ধির জন্য সিজার নিজেকে কনস্যুল হিসেবে নির্বাচিত করতে বলেন (রোমান সিনেটের প্রধানকে বলা হতো কনস্যুল)। এটি ছিল সিজারের জন্য অনেক বড় পদক্ষেপ। তিনি একদিকে যেমন রোমকে গৃহযুদ্ধের হাত থেকে বাঁচান, অপরদিকে নিজের রাজনৈতিক অবস্থানও শক্ত করতে সক্ষম হন।

বিশ্বস্ততার জন্য সিজার নিজের মেয়ের সাথে পম্পেইয়ের বিয়ে দেন। মধ্যস্থতার ফলে অর্থ-সেনা-সিনেট এই তিন ক্ষমতা এই তিন ব্যক্তির কাছেই কুক্ষিগত হয়। তারা হয়ে ওঠেন রোমের সবচেয়ে প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব এবং রোম পরিণত হয় এই তিন ব্যক্তির ত্রি-শাসনের প্রজাতন্ত্রে। সিজার নিজেকে আবার তার হারানো পারিবারিক ঐশ্বর্যের মধ্যে আবিষ্কার করেন। কিন্তু তার এখনও অনেক পথ হাঁটা বাকি...

This is a bengali article describing the life of Julius Caesar in a series of articles.

Reference:

১. Julius Caesar Biography
২. RESISTING SLAVERY IN ANCIENT ROME
৩. Ancient Rome, c. 500 BC/BCE-500 AD/CE
৪. Julius Caesar

Feature Image: Atlantico