এই লেখাটি লিখেছেন একজন কন্ট্রিবিউটর।চাইলে আপনিও লিখতে পারেন আমাদের কন্ট্রিবিউটর প্ল্যাটফর্মে।

সিজার কনস্যুল নির্বাচিত হওয়ার পর রোমান সিনেটে তখন প্রকৃতপক্ষে কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল না। কারণ ক্রাসিয়াস ও পম্পেই সমঝোতার মাধ্যমে জোট গঠন করেন। তাই সিনেটে সেটাই পাশ হতো যেটা সিজার- ক্রাসিয়াস-পম্পেই ত্রয়ী চাইত, যদিও কিছু সিনেটর সিজারের বিরোধিতা শুরু করেছিলেন। সিজার তাই অবাধ্য সিনেটরদের বাগে আনার সিদ্ধান্ত নিলেন। তিনি কিছু ব্যক্তিগত ঘাতক নিয়োগ দিলেন। এরা সিজারের কথামতো অবাধ্য সিনেটরদের উপর গুপ্তহামলা চালাতেন। কাউকে হত্যা না করলেও তাদের শারীরিকভাবে আঘাত করা হতো।

রোমান সিনেটের অনেক সদস্যই বয়স্ক ছিলেন। তাই শারীরিক নির্যাতন তাদের কাছে বেশ ভয়াবহই হয়ে উঠেছিল। তারপর থেকে কোনো সিনেটর আর তাদের বিরোধিতার সাহস পাননি। কনস্যুল নির্বাচিত হওয়ার পর সিজার তার কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন দুই সহযোগী ক্রাসিয়াস ও পম্পেইয়ের নিকট। তিনি সিনেটে পম্পেইয়ের সেনাবাহিনীর জন্য জমি ও মুদ্রার বরাদ্দ পাস করেন। আর ক্রাসিয়াসের জন্য কর মওকুফের আদেশ পাশ করেন। রোমান সিনেটে চলতে থাকে এই ত্রয়ীর দাপট ।প্রকৃতপক্ষে সেই সময় রোমে তারা যা চাইত তা-ই করতে পারত, কারণ তাদের হাতে একদিকে যেমন ছিল ক্রাসিয়াসের টাকা, আরেকদিকে ছিল পম্পেইয়ের সেনাদল। সিজারের প্রশাসনিক ক্ষমতা তাদের ত্রি-শাসনের ভিত্তিকে নজিরবিহীন শক্ত করে তোলে।

জুলিয়াস সিজার; Image Courtesy: Britannica

 

অল্প কিছুদিনের মধ্যেই সিজারের আর্থিক অবস্থার বেশ কিছুটা উন্নতি ঘটে। তিনি রোমে একটি প্রাসাদ কিনে নেন। সেই প্রাসাদে প্রায়ই তিনি পার্টির আয়োজন করতেন, যেখানে রোমের প্রভাবশালী ব্যক্তিবর্গ উপস্থিত থাকতেন। এমনই এক পার্টিতে তিনি সেভিলিয়া নামক এক বিধবার প্রেমে পড়েন। ঠিক প্রেমে পড়েন কি না এই বিষয়ে ঐতিহাসিকরা দ্বিধাবিভক্ত। যেহেতু তিনি বেশ ক্ষমতাবান হয়ে উঠেছিলেন তাই তিনি চাইলেই যেকোনো নারীর সাথে সম্পর্ক স্থাপন করতে খুব বেশি বেগ পাওয়ার কথা নয়।

এছাড়াও তার যৌন জীবনকে বেশ রোমাঞ্চকরই বলতে হয়। স্ত্রী থাকার পরও তিনি অন্য নারীর সঙ্গে রাত্রি যাপনে দ্বিধা করতেন না। এমনকি তিনি তার শত্রুর স্ত্রীদের সাথে তথ্য সংগ্রহের জন্য প্রায়ই শারীরিক সম্পর্কে লিপ্ত হতেন। তবে খুব সম্ভবত সেভিলিয়ার সাথে বেশ গভীর সম্পর্কেই জড়িয়ে পড়েন সিজার। এই সেভিলিয়ার ছেলে ছিল ব্রুটাস, যিনি পরবর্তীতে প্রভাবশালী সিনেটর এ পরিণত হন। শুধুমাত্র একজন সাধারণ সিনেটর নয়, রোমান ইতিহাস আসলে ব্রুটাসকে মনে রেখেছে এক বিশেষ কারণে, যা যথাসময়ে আপনাদের সামনে আনা হবে।

Image Courtesy: Historic UK

যা-ই হোক, প্রবল ভোগ-বিলাসের মধ্য দিয়ে রোমে সিজারের দিন কাটতে থাকে। সময়ের সাথে সাথে তিনি সিনেটে নিজের ক্ষমতা বাড়াতে থাকেন। তার প্রভাব-প্রতিপত্তি উঠে যায় তুঙ্গে। বেশ কিছু সংস্কারমূলক পরিকল্পনা হাতে নেয়ায় রোমান জনগণের মধ্যে তার জনপ্রিয়তা গড়ে উঠতে থাকে। তার এই মাত্রাতিরিক্ত প্রভাব ও জনপ্রিয়তা ক্রাসিয়াস আর পম্পেইয়ের জন্যে হুমকির কারণ হয়ে ওঠে। দিন দিন সিজার এমন জায়গায় নিজেকে নিয়ে যাচ্ছিলেন যে, তিনি চাইলেই তাদের পাশ কাটিয়ে যেকোনো কাজের সমর্থন সিনেট থেকে আদায় করে নিতে পারবেন। তাই সঙ্গত কারণেই তাদের কাছে সিজারের বিকল্পের প্রয়োজন অনুভূত হতে থাকে। তারা বুঝতে পারেন- এখনই সিজারকে না সরালে হয়তো সামনের দিনগুলোতে তাদের রাজনৈতিক প্রভাব সিজারের সামনে দাঁড়াতে পারবে না।

প্রবল ভোগ-বিলাস ও রাজনৈতিক খরচের কারণে সিজারকে মাঝে মাঝে ক্রাসিয়াসের কাছে ঋণ নেওয়ার দরকার পড়তো। সেসময়ের রোমান রাজনীতি যে আজকের দিনের চেয়ে অনেক বেশি মূল্যবোধসম্পন্ন ছিল এমন নয়। প্রাচীন রোমেও নির্বাচিত হতে সিনেটরদের ভোট কেনার প্রয়োজন পড়তো। তাই কনস্যুল নির্বাচন বেশ ব্যয়বহুল একটা ব্যাপারই ছিল সিজারের জন্য। এসব কারণে তিনি বেশ ঋণী হয়ে পড়েন। তার আর্থিক অবস্থার অবনতি ঘটে। এ কথা ক্রাসিয়াস জানতেন। পম্পেই ও ক্রাসিয়াস ভেবেছিলেন, রোম থেকে সিজারকে দূরে রাখতে পারলে রোমের উপর তার প্রভাব কমে যাবে।

সেসময় রোমের কনস্যুলরা পরবর্তীতে রোম-শাসিত বিভিন্ন অঞ্চলে পরবর্তী পাঁচ বছরের জন্য গভর্নর হিসেবে নিয়োগ পেতেন। তাই তারা সিজারকে কনস্যুল থেকে অপসারণ করেন। তাকে উত্তরের এক রোমান অঞ্চলের গভর্নর নিয়োগ করা হয়। যাদের সহায়তায় তিনি কনস্যুল নির্বাচিত হয়েছিলেন তারাই তাকে সেই পদ থেকে সরিয়ে দেয়, যদিও সিজারকে বলা হয় যেহেতু তিনি একটি অঞ্চলের শাসক নিযুক্ত হবেন তাই তার হাতে অঞ্চল রক্ষার জন্য একটি সৈন্যদল থাকবে। এই সৈন্যদল নিয়েই তিনি যদি কিছু অঞ্চল জয় করেন তবে সেসব অঞ্চলের বিপুল সম্পত্তি তার আর্থিক অবস্থার উন্নতি ঘটাবে। ফলে গভর্নরের পদ প্রকৃতপক্ষে তার জন্য আশির্বাদ।

সিজার জানতেন এসব আসলে লোক দেখানো কথা। ক্রাসিয়াস আর পম্পেই মূলত তাকে রোমে রাখতে চাচ্ছেন না, কারণ তার জনপ্রিয়তা তাদের জন্য হুমকির কারণ। কিন্তু সিজারের কিছু করার ছিল না। কারণ তিনি এতদিন যে প্রভাব-প্রতিপত্তির মালিক হয়েছেন তার পেছনে একটা বড় অবদান ছিল ক্রাসিয়াস ও পম্পেইয়ের। তাদের সমর্থন ছাড়া রোমের যুদ্ধ তার জন্য বেশ কঠিন হতো। তাছাড়া সেসময় পর্যন্ত সিজারের কাছে বলার মতো একক কোনো সেনাসাফল্য ছিল না। তিনি জানতেন, যদি তিনি পম্পেই ও ক্রাসিয়াসের মতো ক্ষমতাবান হতে চান, তাহলে অবশ্যই তাদের মতো যুদ্ধগত সাফল্য প্রয়োজন। কারণ প্রাচীন রোমে যুদ্ধে সাফল্য ছাড়া সিনেটের উপর প্রভাব বিস্তার অসম্ভব ছিল। আর যুদ্ধে সাফল্য তাকে বেশ ধন-সম্পদের মালিক করবে। সব মিলিয়ে তিনি রোমে তাদের বিরোধিতা না করে আপাতত গভর্নর হিসেবে উত্তরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন।

আগেই বলা হয়েছে, সেইসময় পর্যন্ত সিজারের বড় কোনো সেনা সাফল্য ছিল না। সিজার এতদিন মূলত একজন বিচক্ষণ রাজনীতিবিদ হিসেবে রোমে প্রভাবশালী ছিলেন। তবে রোম থেকে নির্বাসন মূলত তার জন্য শাপে বর হয়ে এসেছিল। কারণ রোমের বাইরের জীবন তাকে রাজনীতিবিদ থেকে দুধর্ষ একজন সেনাপতিতে রুপান্তর করে। যদি রোম থেকে বিতাড়িত না হতেন তবে সিজার হয়তো রোমের ইতিহাসে একজন সাধারণ কনস্যুল হিসেবেই থেকে যেতেন। তার নামের পাশে 'বিজেতা' শব্দটি যুক্ত হতো না। যা-ই হোক, একজন দুধর্ষ জেনারেল রোমান রাজনীতিতে কেমন প্রভাবসম্পন্ন হতে পারে তা তিনি জানতেন। তিনি জানতেন, একটি বড় জয় তাকে পুনরায় রোমে কনস্যুল হিসেবে শপথ নেওয়ার যোগ্য দাবিদার করে তুলবে। তাই তিনি এমন কিছু করার পরিকল্পনা করলেন যা তার পূর্বের কোনো রোমান সেনাপতি কখনো পারেনি।

Image Courtesy: History

 

সেসময় প্রায় দুই লাখ বর্গ মাইলের সাম্রাজ্য ছিল গল, যেটা বর্তমানে ফ্রান্স ও বেলজিয়াম। এছাড়াও সুইজারল্যান্ড, নেদারল্যান্ড ও জার্মানির কিছু অংশও ছিল। অভিবাসনজনিত সমস্যার কারণে গল সাম্রাজ্য সেসময় রোমানদের জন্য সবচেয়ে বড় আতংকের কারণ ছিল। এছাড়াও গল সেনারা একবার নগররষ্ট্র রোম আক্রমণ করে এবং প্রবল লুটতরাজ চালায়। সেই থেকেই বড় চুলওয়ালা বর্বর গলদের সম্পর্কে একটা ভীতি ছিল রোমানদের। সিজার তাই গল অভিযানের সিদ্ধান্ত নেন। কারণ তার আগে কোনো রোমান জেনারেল গল জয় করতে পারেনি।

সিজার জানতেন, গল জয় শুধু তাকে পুরোনো পদ ফিরিয়েই দেবে না, বরং রোমান ইতিহাসের পাতায় নিজের নামকে ধরা-ছোঁয়ার বাইরে নিয়ে যাবে। সে কথা সিজার যেমন জানতেন, রোমে বসে থাকা তার প্রতিদ্বন্দ্বী ক্রসিয়াস ও পম্পেইও জানতেন। সেসময় রোমের কোনো অঞ্চলের গভর্নর যদি অন্য কোনো অঞ্চল আক্রমণ করতে চাইতেন, তবে সবার আগে সিনেটের অনুমোদনের প্রয়োজন হতো। সিজার জানতেন, তার গল অধিগ্রহণের প্রস্তাব ক্রাসিয়াস ও পম্পেই কখনোই পাস হতে দেবেন না। তাই সিজার সিনেটের অনুমতি ছাড়াই গল আক্রমণের সিদ্ধান্ত নিলেন।

খ্রিস্টপূর্ব ৫৮ সালে ২০ হাজার সেনা নিয়ে তিনি গল সাম্রাজ্যের দিকে অগ্রসর হন। গল ছিল বিশালায়তনের। তাই পুরো সাম্রাজ্য জুড়ে গ্যালিক দুর্গ আর সৈন্যবাহিনীর ছড়ানো-ছিটানো ছিল। সিজার সিদ্ধান্ত নিলেন যেহেতু তার সৈন্য সংখ্যা কম তাই তিনি গ্যালিকদের একাধিক সৈন্যদলকে মিলিত  হতে দেবেন না। তিনি এক এক করে গ্যলিক দুর্গগুলো আক্রমণ শুরু করলেন এবং খুব সহজেই বিজয় অর্জন করলেন। অল্পদিনেই তার এই বিজয়ের কথা রোমে পৌঁছে গেল। গ্যালিকদের ছোট ছোট দুর্গের উপর সিজারের এই জয় রোমান জনগণের কাছে বেশ প্রশংসা পেল। তার এই বিজয়ের ফলে রোমান যোদ্ধারা দলে দলে তার সাথে যোগ দিতে লাগল, যাদের মধ্যে মার্ক এন্টনি নামক এক দলপতি ছিলেন, যিনি পরবর্তীতে রোমের ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের অবতারণা করেন। যা-ই হোক, সিজারের জন্য তখনও অনেক পথ বাকি, পুরো গল এখনও অনেক দূরের স্বপ্ন। এরপর সিজার ও মার্ক এন্টনি মিলে আরও কিছু অঞ্চল দখল করে নিতে থাকেন। তাদের এই বিজয়ের খবরে রোমে প্রশংসার সাগরে ভাসতে থাকেন সিজার। রোমানদের কাছে তিনি পরিণত হযন 'জাতীয় বীর' হিসেবে।

মার্ক অ্যান্টনি; Image Courtesy: Britannica

সিজারের এই বিজয়ের খবর ক্রাসিয়াস ও পম্পেইয়ের জন্য সুখকর ছিল না। এজন্য ক্রাসিয়াস পার্থিয়া আক্রমণের সিদ্ধান্ত নেন ।পার্থিয়া জয়ের মাধ্যমে ক্রাসিয়াস সিনেটে নিজের অবস্থান শক্ত করতে চেয়েছিলেন। তাই খ্রিস্টপূর্ব ৫৩ সালে তিনি প্রায় ৩৫ হাজার সেনা নিয়ে পাৰ্থিয়া আক্রমণ করেন। কিন্তু এতে হিতে বিপরীত ঘটে। সংখ্যায় পার্থিয়ান সেনাবাহিনীর চেয়ে বড় হলেও যুদ্ধে ক্রাসিয়াসের বাহিনী খুব বাজেভাবে পরাজিত হয়। ক্রাসিয়াসকে বন্দী করা হয়। তাকে বন্দী অবস্থায় উত্তপ্ত সোনা ঢেলে হত্যা করা হয়। রোমের সবচেয়ে ধনী ব্যক্তির মৃত্যু হয় গলিত উত্তপ্ত সোনা মুখে নিয়ে।

রোমে ক্রাসিয়াসের মৃত্যুর খবর পৌঁছালে পম্পেই কনস্যুল হিসেবে নিজেকে অধিষ্ঠিত করেন। কারণ ক্রাসিয়াসের মৃত্যুর ফলে রোমে তার বিরোধিতা করার মতো কার্যত আর কেউ ছিলেন না। এর ফলে রোমের উপর পম্পেইয়ের একক আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হয়।

অন্যদিকে গলে সিজারের জয়রথ ছুটেই চলছিল। গলের অধিকাংশ এলাকা তিনি দখল করে নেন। খ্রিস্টপূর্ব ৫২ সালে তার সেনাবাহিনী এসে থামে এলিশিয়া নামক একটি শহরের বাইরে।

এলিশিয়া ছিল গলের বেশ গুরুত্বপূর্ণ একটি দুর্গ। তাই এর পতন হলে কার্যত সম্পূর্ণ গল বিজয় করা হয়ে পড়তো সময়ের ব্যাপার। তিনি এলিশিয়া অবরোধের নির্দেশ দেন। এ সময় সিজার সবাইকে অবাক করে দিয়ে শহরকে ঘিরে দেয়াল নির্মাণের আদেশ দেন। সবাই তার সিদ্ধান্তে অবাক হলেও সিজার জানতেন, যদি শহরে খাবার ও পানি প্রবেশের ব্যবস্থা বন্ধ করে দেওয়া যায় তাহলে শহর আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হবে। তাই তিনি দেয়াল নির্মাণ করে এলিশিয়া অবরোধ করে রাখলেন এবং এলিশিয়ার বাহিনীর আত্মসমর্পণের অপেক্ষা করতে থাকলেন।

এলিশিয়ার সেনাপতি ভার্সিনজেটরিক্স ছিলেন একজন বীর যোদ্ধা। তিনি গলের আরো কিছু সেনাদল একত্রিত করেন এবং এলিশিয়ার দিকে অগ্রসর হওয়ার অনুরোধ জানান। গ্যালিক সৈন্যবাহিনী জানতো, সিজারকে যদি এলিশিয়ায় আটকে দেওয়া যায় তাহলে গলের কিছু অংশ রক্ষা পাবে। তাই প্রায় আড়াই লক্ষ সৈন্যের একটি বিশাল বাহিনী এলিশিয়ার দিকে অগ্রসর হওয়া শুরু করে। এত বিপুল সংখ্যক সেনা এলিশিয়ার দিকে অগ্রসর হওয়ার খবর পেয়ে সিজার একটু হোঁচট খেলেন। তখন পর্যন্ত তিনি গলের বিভিন্ন অঞ্চল এত সহজে জয় করতে পারছিলেন তার কারণ গলের সৈন্যবাহিনীকে তিনি একত্রিত হওয়ার সুযোগ দিচ্ছিলেন না। তবে গলের একত্রিত এই সৈন্যবাহিনী সিজারের জন্য আসলেই বেশ চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। এদিকে এলিশিয়ার মজুদ করা খাবার ও পানীয় শেষ হয়ে আসছিল। কিন্তু তারা দাঁতে দাঁত চেপে গলের সম্মিলিত বাহিনীর সাহায্যের অপেক্ষা করতে থাকলো।

সিজার আবার একটি হতবাক করা সিদ্ধান্ত নিলেন। তিনি এবার আগের দেয়ালের ১০০ গজ দূরত্বে আরো একটি দেয়াল নির্মাণ শুরু করলেন, যাতে ভেতরের দেয়াল এলিশিয়ার দুর্গের ৮০ হাজার সৈন্যের থেকে তাদের রক্ষা করে, আর বাইরের দেয়াল অগ্রসরমান ২ লাখ ৫০ হাজার সৈন্য থেকে তার বাহিনীকে রক্ষা করে। এলিশিয়ার বাইরে নির্মিত এই দুই দেয়াল ছিল প্রাচীন রোমানদের প্রকৌশল দক্ষতার ফল। একইসাথে এটি ছিল সামরিক প্রকৌশলের একটি অনবদ্য উদাহরণ।

যা- ই হোক, আড়াই লাখ সৈন্যের গল সেনাবাহিনীর ও ৮০ হাজার সৈন্যের এলিশিয়া বাহিনীর বিপরীতে রোমানদের সৈন্য সংখ্যা ছিল মাত্র ৭০হাজার। কিন্তু এই ৭০ হাজার সৈন্যের নেতৃত্বে ছিলেন সিজারের মতো দক্ষ ও বিচক্ষণ সেনাপতি।

Image Courtesy: Pinetrest

আড়াই লাখ গ্যালিক সৈন্য যখন বাইরের দেয়াল আক্রমণ করে, প্রায় একইসাথে ভেতরের দেয়ালেও আক্রমণ শুরু করে এলিশিয়ার সেনাপতি ভার্সিনজেটরিক্সের বাহিনী। উভয়দিকের বাহিনীর উপর সিজারের তীরন্দাজ বাহিনী মুহুর্মুহু তীর নিক্ষেপ করতে থাকে।

কিন্তু দুদিকের আক্রমণে বেশ বেগ পোহাতে হয় সিজারের বাহিনীকে। একসময় ভেতরের দেয়ালের একটি অংশ দুর্বল হতে শুরু করে। সিজার জানতেন, যদি দেয়াল ভেদ করে এলিশিয়ার সেনাদল ঢুকে পড়ে, তাহলে আর প্রতিরোধ সম্ভব হবে না। তখন উভয়দিকের আক্রমণে তার একটি সৈন্যও রক্ষা পাবে না। তাই নিজের সৈন্যদল বাঁচাতে ও যুদ্ধের মোড় ঘুরিয়ে দিতে অসাধারণ কিছু করার দরকার ছিল সিজারের। খুব দ্রুতই কোনো পদক্ষেপ না নিলে ভেতরের দেয়াল ভেঙে যাবে এবং এলিশীয় বাহিনী রোমানদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়বে। তখন সিজার একটি অনবদ্য রণকৌশল গ্রহণ করলেন।

তিনি তার তীরন্দাজ বাহিনীকে দায়িত্ব দিলেন ভেতরের দেয়াল সুরক্ষার। ফলে এলিশীয় বাহিনীর আক্রমণ দুর্বল হতে থাকল ভেতরের দেয়ালের উপর। একইসাথে সিজার তার অশ্বারোহী বাহিনীকে নির্দেশ দিলেন গ্যালিক সৈন্যদের পেছন থেকে আক্রমণ করতে। অপ্রত্যাশিত এই আক্রমণে তারা গল বাহিনীকে ধরাশায়ী করে ফেলল। অল্প সময় পরেই গল বাহিনী ছত্রভঙ্গ হয়ে গেল। ফলে এলিশীয় বাহিনী আর যুদ্ধ চালিয়ে যেতে পারল না। আত্মসমর্পণ ছাড়া তাদের কছে আর কোনো পথ ছিল না। এত বিপুল সেনাসদস্য নিয়েও সিজারের কাছে আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হন এলিশিয়ার সেনাপতি ভার্সিনজেটরিক্স। পুরো গল চলে আসে রোমান প্রজাতন্ত্রের অধিকারে।

গল অভিযানের মোট আট বছরে সিজার ২ লাখ বর্গ মাইলের বেশি অঞ্চল রোমান প্রজাতন্ত্রের অন্তর্ভুক্ত করেন।এটি ছিল রোমের একক অভিযানে দখলকৃত সবথেকে বড় ভূখণ্ড। সিজারের পূর্বে কোনো রোমান সেনাপতি একবারের অভিযানে এত বিশাল অঞ্চল রোমের অন্তর্ভুক্ত করতে পারেননি। তার এই গল বিজয় রোমানদের ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে।

এত বড় ও সফল একটি অভিযানও সিজারকে যেন ঠিক সন্তুষ্ট করতে পারছিল না। উচ্চাভিলাষী সিজার আসলে ছাড়িয়ে যেতে চাচ্ছিলেন নিজেকে। তিনি এই বিজয় উদযাপন করতে চাচ্ছিলেন আরেকটা জয় দিয়ে।তবে এবার তার লক্ষ্য সম্পূর্ণ আলাদা। তার নজর এবার পৃথিবীর শেষ প্রান্ত। দ্য গ্রেট ব্রিটেন...

এই সিরিজের পূর্ববর্তী পর্বগুলো পড়তে ক্লিক করুন নিচের লিঙ্কে:

১) জুলিয়াস সিজার (পর্ব-১): প্রজাতন্ত্রের সম্রাট

This is a bengali series article detailing the life of Julius Caesar.

তথ্যসূত্র:
১. Julius Caesar Biography
২. SLAVE REBELLIONS IN ANCIENT ROME
৩. Ancient Rome, c. 500 BC/BCE-500 AD/CE
৪. Julius Caesar ROMAN RULER
৫. Roman Empire - Issac Asimov

Feature Image: ENCYCLOPÆDIA BRITANNICA