এই লেখাটি লিখেছেন একজন কন্ট্রিবিউটর।চাইলে আপনিও লিখতে পারেন আমাদের কন্ট্রিবিউটর প্ল্যাটফর্মে।

ফার্স্যালাসের যুদ্ধ ছিল রোমান প্রজাতন্ত্রের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যুদ্ধগুলোর একটি। যুদ্ধের পূর্বেই এর সুদুরপ্রসারী ফলাফল সম্পর্কে অবগত ছিল দুই পক্ষই। সংখ্যায় সিজারের দ্বিগুণেরও বেশি সৈন্য নিয়েও পম্পেই হেরে যান। যুদ্ধের পর পম্পেইয়ের পক্ষ নেয়া সিনেটরদের ক্ষমা করে ফেরত পাঠানো হয় রোমে।

তখন রোমে কোনো প্রশাসন না থাকায় বেশ নাজুক অবস্থা ছিল নগরীর। শহরে একদিকে যেমন আইনশৃঙ্খলার চূড়ান্ত অবনতি ঘটেছিল, অন্যদিকে দেখা দিয়েছিল তীব্র খাদ্য সংকট। তাই শহরের শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনারও একটা তাগিদ ছিল সেসময়। ফলে সিজারের কাছে সিনেটরদের রোমে ফেরত পাঠানোটাই যুক্তিযুক্ত ছিল।

যা-ই হোক, যুদ্ধে পরাজয় নিশ্চিত জেনে পম্পেই আগেই পালিয়ে যান। তাকে উন্মুক্ত অবস্থায় রেখে দেয়ার ভুল সিজার করতে চাননি। তিনি জানতেন, পম্পেই নিঃসন্দেহে রোমান ইতিহাসের সবচেয়ে দুর্ধর্ষ জেনারেলদের একজন। এ যুদ্ধে হেরে গেলেও তিনি যে আবার সৈন্যদল গঠন করবেন তা বলার অপেক্ষা রাখে না। তাই ভবিষ্যতের বড় যুদ্ধ এড়ানোর জন্য পম্পেইয়ের একটা বন্দোবস্ত করা প্রয়োজন ছিল।

পম্পেই দ্য গ্রেট; Image Courtesy: Britannica

গ্রিস থেকে পালিয়ে পম্পেই কোথায় যেতে পারেন সেই বিষয়ে নিশ্চিত কোনো তথ্য ছিল না। তবে সিজার এ বিষয়ে অনেকটা নিশ্চিত ছিলেন যে, পম্পেই রাজনৈতিক আশ্রয়ের জন্য আপাতত মিশরেই যাবেন। পম্পেইয়ের রাজনৈতিক আশ্রয়স্থল হিসেবে মিশরকে বেছে নেওয়ার যথেষ্ট কারণও ছিল। সেই কারণগুলো বোঝার জন্য মিশরের তৎকালীন রাজপরিবার সম্পর্কে একটু জেনে নেওয়া দরকার। এই জানার শুরুটা আমরা করব সিজারের সময়ের একটু আগে থেকে। রোমান সেনাপতি জুলিয়াস সিজারের গল্পে কিছুক্ষণের জন্য স্মরণ করা হবে আলেকজান্ডার দ্য গ্রেটকে।

খ্রিস্টপূর্ব ৩২৩ সাল, ব্যাবিলন; বাবা ফিলিপের মৃত্যুর পর মাত্র ২০ বছর বয়সে সাম্রাজ্যের দায়িত্ব পাওয়া আলেকজান্ডার ততদিনে বাবার মেসিডোনীয় সাম্রাজ্যকে বিস্তৃত করেছেন পৃথিবীব্যাপী। সেই সময় মেসিডোনীয় সাম্রাজ্যের বিস্তৃতি ছিল ইতিহাসখ্যাত। কিন্তু দুঃখজনকভাবে মাত্র ৩৩ বছর বয়সে পৃথিবীর মায়া কাটিয়ে পরপারে চলে যান তিনি।

আলেকজান্ডার দ্য গ্রেট; Image Courtesy: Greece Is

আলেকজান্ডার প্রায় পুরো পৃথিবীকে নিজের সাম্রাজ্যের পতাকাতলে নিয়ে আসেন। কিন্তু তার মৃত্যুর পর সবচেয়ে দুর্ভাবনার বিষয় ছিল এত বড় সাম্রাজ্যের উত্তরাধিকার নিয়ে। জীবদ্দশায় তিনি কোনো উত্তরাধিকার নির্বাচন করে যাননি। তাই তার মৃত্যুর পর ক্ষমতার দ্বন্দ্ব চরমে উঠতে থাকে। পারিবারিকভাবেও এত বড় সাম্রাজ্যের কোনো যোগ্যতম উত্তরাধিকারী ছিল না । ফলস্বরূপ আলেকজান্ডারের মৃত্যুর পর তার সেনাপতিরা প্রত্যেকেই একেকটি অঞ্চল কব্জা করতে থাকেন।

আলেকজান্ডারের প্রধান সেনাপতিদের মধ্যে দুজন ছিলেন সেলুকাস আর টলেমি। আলেকজান্ডারের মৃত্যুর পর সেলুকাস ব্যাবিলনে নিজের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেন। তার হাত ধরে উত্থান হয় সেলুকীয় সাম্রাজ্যের, আর অপর সেনাপতি টলেমি মিশরের গভর্নর ক্লিওমেনিসকে অপসারণ করেন এবং গভর্নরের পদে নিজেকে অধিষ্ঠিত করেন। এর কিছুকাল পরেই পুরো মিশরের রাজারুপে আত্মপ্রকাশ ঘটে তার। আলেকজান্ডারের অন্যান্য সেনাপতির মতো তিনিও প্রতিষ্ঠা করেন নিজস্ব সাম্রাজ্য। মিশরে শুরু হয় টলেমির শাসন।

প্রথম টলেমি; Image Courtesy: Wikimedia Commons

বলার অপেক্ষা রাখে না, টলেমি ছিলেন মিশরের বাইরের মানুষ। বহিরাগত হওয়ার সত্ত্বেও মিশরীয়রা যে টলেমির শাসন মেনে নিয়েছিল এর পেছনে বেশ বড় প্রভাব ছিল ধর্মীয় সংস্কৃতির। সেই সময় মিশরীয়রা দেব-দেবীর পূজা করত। তাদের এসব ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান পালনকে বেশ শ্রদ্ধা করে চলতো টলেমীয়রা। এমনকি রাজকীয়ভাবে তাদের ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানে উপস্থিতও থাকতো তারা। তাই বহিরাগত হওয়া সত্ত্বেও সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠায় বড় কোনো বাধার সম্মুখীন হতে হয়নি তাদের।

নীলনদের পলিমাটির কারণে সেসময় মিশর ছিল পৃথিবীর সবচেয়ে উৎপাদনশীল অঞ্চল। এজন্য মিশরের রাজকোষ সবসময় বেশ ভারী থাকতো। ফলে টলেমির রাজবংশ বেশ স্বাচ্ছন্দ্যেই শাসন করতে থাকে। তিনি যে রাজবংশের প্রতিষ্ঠা করে যান সেখানে কিছু ব্যাপার ছিল অন্য রাজবংশের থেকে আলাদা। তার প্রতিষ্ঠিত রাজবংশের প্রত্যেক রাজাই টলেমি নাম ধারণ করতেন। তাই সেই অনুসারে আলেকজান্ডারের সম্রাট টলেমির নাম ছিল প্রথম টলেমি। এছাড়াও রাজবংশে দ্বৈত শাসন ব্যবস্থা চালু ছিল। অর্থাৎ ক্ষমতার কেন্দ্রে থাকতেন দুজন মানুষ। একজন রাজপুত্র ক্ষমতায় আসার পর তার বোনের সাথে রাজকার্য পরিচালনা করতে পারতেন। সবচেয়ে আশ্চর্য বিষয় ছিল দ্বৈত শাসনের ক্ষেত্রে ভাই ও বোনের বিয়ের প্রচলন। শাসনকার্য পরিচালনার জন্য রাজা নিজের বোনকে বিয়ে করে তাকে রানী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে পারতেন। যা-ই হোক, নীলের উপত্যকায় বেশ সফলতার সাথেই চলতে থাকে টলেমীয় শাসন।

তবে সমস্যা দেখা দেয় রাজা পঞ্চম টলেমির সময়। চতুর্থ টলেমি মৃত্যুর পর প্রথমবারের মতো টলেমি রাজবংশ একজন প্রাপ্তবয়স্ক রাজার সংকটে পড়ে। পাঁচ বছর বয়সী বালক পঞ্চম টলেমি নাম ধারণ করে সিংহাসনে বসেন। সেই সময় সেলুকীয় সাম্রাজ্যের সম্রাট ছিলেন তৃতীয় এন্টিয়কাস, যে সাম্রাজ্যের কথা পূর্বেই উল্লেখ করা হয়েছে। পারিবারিকভাবে এই দুই সাম্রাজ্যের বিরোধ চলছিল আলেকজান্ডারের মৃত্যুর পর থেকেই। তাই এন্টিয়কাসের জন্য এটা ছিল মোক্ষম সময়। বালক টলেমির অনভিজ্ঞতার সুযোগে তিনি মিশর আক্রমণ করে বসেন।

এই সময়েই মিশরের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো আবির্ভাব হয় রোমের। রোম তখন ছিল পশ্চিমের উদীয়মান শক্তি। তাদের সহায়তায় পঞ্চম টলেমি নিজের সিংহাসন ধরে রাখতে সমর্থ হন। মিশরের রাজনীতিতে শুরু হয় রোমান প্রভাব বিস্তার। এরপর থেকেই টলেমিগণ বিভিন্ন সময়ে সিংহাসন সুসংহত রাখার জন্য রোমকে খুশি রাখার চেষ্টা করত। যেহেতু নীলের অববাহিকায় ফসলের বেশ ভালো উৎপাদন হত, তাই করের টাকায় রোমানদের খুশি রাখতে বেগ পোহাতে হয়নি তাদের। এরপরে সময় যত গড়িয়েছে, টলেমি রাজাগণ ততই শক্তি হারিয়েছেন এবং একসময় রোমের অঘোষিত প্রদেশে রূপ নেয় মিশর। তবে নিজেদের করের টাকায় রোমান কোষাগার ভর্তির কারণে মিশরীয়দের ক্ষোভের মুখে মাঝে মাঝেই পড়তে হতো তাদের।

খ্রিস্টপূর্ব ৮০ সালে একাদশ টলেমি ক্ষমতায় বসেন। তবে ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য রোমান সিনেটের অনুমোদন খুব গুরুত্বপূর্ণ ছিল। আর এই কাজটা করতে পারত রোমানদের জন্য একটা যথাযোগ্য উপোঢৌকন। রোমানদের বহুমূল্য উপহারের জন্য তিনি করের মাত্রা ব্যাপকহারে বাড়িয়ে দেন। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে জনগণ তাকে দেশ থেকে তাড়িয়ে দেয়। তবে রোমানদের সহায়তায় তিনি পুনরায় ক্ষমতায় বসেন।

এরপর দৃশ্যপটে আবির্ভাব ঘটে পম্পেইয়ের। সেলুকীয় সাম্রাজ্যের সাথে পারিবারিকভাবেই খণ্ড খণ্ড যুদ্ধ সংগঠিত হত মিশরের। ব্যাপারটা মিশরের জন্য বেশ বিব্রতকর ছিল। তাই রোমান সহায়তায় এর একটা বিহিত করার সিদ্ধান্ত নেন একাদশ টলেমি। খ্রিস্টপূর্ব ৬৪ সালে পম্পেই এর নেতৃত্বে তত্কালীন সেলুকীয় সম্রাট ত্রয়োদশ এন্টিয়কাসকে একটা কড়া জবাব দেওয়া হয় মিশরের উপর হামলাগুলোর জন্য।

মেসিডোনীয়দের উপর রোমানদের এই বিজয় অর্জনের ফলে সেলুকীয় সাম্রাজ্য শক্তি হারিয়ে ফেলে এবং শুধুমাত্র সিরিয়ায় আবদ্ধ হয়ে পড়ে। অবশেষে টলেমিয়দের সাথে সেলুকীয়দের দীর্ঘ পারিবারিক দ্বন্দ্বের অবসান ঘটে পম্পেইয়ের হাত ধরে। ফলে পম্পেই এর উপর একাদশ টলেমি বেশ অনুগত হয়ে পড়েন। এরপর একাদশ টলেমি তার ছেলে দ্বাদশ টলেমিকে নিজের উত্তরাধিকার ঘোষণা করেন এবং রোমান সিনেটকে তার অভিভাবক হিসেবে নিজের দলিলে উল্লেখ করেন। একাদশ টলেমি তার ছেলে দ্বাদশ টলেমির সাথে তার মেয়ে সপ্তম ক্লিওপেট্রাকে দ্বৈত শাসনের জন্য মনোনীত করেন।

দ্বাদশ টলেমি; Image Source: Wikimedia Commons

একাদশ টলেমির মৃত্যুর পর দশ বছরের বালক দ্বাদশ টলেমি ক্ষমতায় বসেন। আর সেসময়ই গ্রিসে সিজারের বিরুদ্ধে পরাজয় ঘটে পম্পেইয়ের। পূর্বেই বলা হয়েছে, পম্পেইয়ের সাহায্যের জন্য টলেমি রাজপরিবার তার প্রতি বেশ অনুগত ছিল। আর নীলনদের পলিমাটিতে ফুলে-ফেঁপে ওঠা তীরের রাজকোষ তাকে নতুন সেনাবাহিনী দাঁড় করাতে যথেষ্ট অর্থের যোগান দিতে পারত। তাই সঙ্গত কারণেই সিজারের সাথে গৃহযুদ্ধে পরাজয়ের পর পম্পেইয়ের জন্য পালানোর সবচেয়ে উপযুক্ত জায়গা ছিল মিশর।

আলেকজান্দ্রিয়া ছিল টলেমিয় মিশরের রাজধানী। সেসময় নগরী হিসেবে আলেকজান্দ্রিয়ার জৌলুস ছিল বিশ্বনন্দিত। আলেকজান্দ্রিয়ার বাতিঘর ছিল প্রাচীন আশ্চর্য। এছাড়াও সেখানকার লাইব্রেরি তত্কালে জ্ঞান পিপাসুদের জন্য অন্যতম আকর্ষণের কারণ ছিল। তাই জাকজমক ও জ্ঞান-গরিমা উভয় দিক থেকেই সমৃদ্ধ ছিল প্রাচীন মিশরের এই নগরী।

টলেমি রাজবংশ মিশর শাসন করত আলেকজান্দ্রিয়া থেকেই। চার হাজার সৈন্য নিয়ে সিজার এই আলেকজান্দ্রিয়ার উদ্দেশ্যে রওনা হন। তার উদ্দেশ্য ছিল পম্পেইকে বন্দী করে বড় সেনাদল গঠন থেকে বিরত রাখা। আলেকজান্দ্রিয়া নেমেই সিজার প্রথম চমকের মুখোমুখি হন। মিশরের রাজদরবারে তার সামনে উপহার দেওয়া হলো পম্পেইয়ের কাটা মাথা!

বালক রাজা দ্বাদশ টলেমির এমন আচরণে একেবারে হতবাক হয়ে যান সিজার। রাজনৈতিকভাবে পম্পেই ও সিজার একে অপরের প্রতিদ্বন্দ্বী হলেও সিজার সম্পর্কে ছিলেন পম্পেইয়ের শ্বশুর। কথিত আছে, সিজারের সামনে যখন পম্পেইয়ের কাটা মাথা নিয়ে আসা হয়, তিনি কিছুক্ষণের জন্য অশ্রুসজল হয়ে পড়েন। নিজের একসময়ের রাজনৈতিক সহযোগী ও আত্মীয়ের এমন মৃত্যু তিনি মেনে নিতে পারেননি। রোমান ইতিহাসের শ্রেষ্ঠতম জেনারেলদের মধ্যে একজনের এভাবে অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যু সিজারকে ব্যথিত করে।

আলেকজান্দ্রিয়া; Image Courtesy: Analisamimpi.com

পম্পেই যখন মিশরে পালিয়ে যান রাজনৈতিক আশ্রয়ের জন্য, তখন মিশর নিজেই একটা গৃহযুদ্ধের মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল। বালক রাজা দ্বাদশ টলেমির সাথে দ্বৈত শাসনের দায়িত্বে ছিল তার বোন সপ্তম ক্লিওপেট্রা। কিন্তু অচিরেই ক্ষমতার দ্বন্দ্ব প্রকট হয়ে ওঠে এবং টলেমি তার বোনকে সরিয়ে একাই ক্ষমতা দখলের চেষ্টা করেন। ক্লিওপেট্রাও ক্ষমতা গ্রহণের জন্য পাল্টা পদক্ষেপ নিলে গৃহযুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে দুই পক্ষ।

আসলে দ্বৈত শাসন ব্যবস্থা থাকলেও বেশিরভাগ টলেমি রাজাই ক্ষমতা নিজেদের কাছে কুক্ষিগত রাখতে চাইতেন। ক্ষমতা ধরে রাখার জন্য সিংহাসনে বসার পরেই অনেক রাজা নিজেদের বোনদের হত্যা করেছেন- এমন নজিরও দেখা যায়। তাই যেসব রাজা দ্বৈত শাসন চাইতেন শুধু তারাই নিজেদের বোনকে বিয়ের মাধ্যমে শাসনকার্য এগিয়ে নিতেন। কিন্তু বেশিরভাগ রাজার কাছেই এই দ্বৈত শাসন পছন্দনীয় ছিল না। প্রত্যেকেই ক্ষমতার শীর্ষে থাকতে চাইতেন।

দ্বাদশ টলেমিও ব্যতিক্রম ছিলেন না। ফলে ক্ষমতার দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়ে দুই ভাই-বোন। টলেমি নিশ্চিতভাবেই পম্পেইকে সাহায্য করার মতো অবস্থায় ছিলেন না। আর সবচেয়ে বড় কথা হলো একজন পরাজিত জেনারেলকে সাহায্য করা তার কাছে নিরাপদ মনে হয়নি। পম্পেই ও সিজারের গৃহযুদ্ধের কথা তখন দিগ্বিদিক ছড়িয়ে পড়েছে। মিশরও এর ব্যতিক্রম নয়। পম্পেইকে সাহায্য করার মাধ্যমে সিজারের রোষানলে পড়ার কোনো ইচ্ছাও ছিল না তার। আর টলেমি ভেবেছিলেন, যদি সিজারকে পম্পেইয়ের কাটা মাথা উপহার দেওয়া যায়, তাহলে হয়তো সিজার তার উপর খুশি হবেন এবং তার বোন ক্লিওপেট্রাকে পরাজিত করতে তার সেনাবাহিনীকে সহায়তা করবেন। ফলে এই শিরশ্ছেদ অপেক্ষাকৃত লাভজনক সিদ্ধান্ত ছিল টলেমির জন্য।

পম্পেই এর মৃত্যুর মধ্য দিয়ে দ্য গ্রেট রোমান সিভিল ওয়্যারের সমাপ্তি ঘটে। সিজার পরিণত হন রোমান প্রজাতন্ত্রের সবচেয়ে প্রভাবশালী ব্যক্তিতে। পম্পেইয়ের মৃত্যুতে সিজারের রাজনৈতিক লাভ হলেও হিতে বিপরীত হলো টলেমির জন্য। সিজার পম্পেইয়ের এরূপ মৃত্যুর জন্য বেশ দুঃখ পান। মূলত নিজ দেশের একজন জেনারেলের বাইরের কারো হাতে এমন মৃত্যু তিনি মেনে নিতে পারেননি। তাই রাজা টলেমি যখন সিজারকে তার বোনের বিরুদ্ধে যুদ্ধে সাহায্যের জন্য বললেন, তখন সিজার সেই প্রস্তাবে ঘোর অসম্মতি জানান।

সিজার মাত্র চার হাজার সৈন্য নিয়ে আসেন মিশরে। আর টলেমিদের ভাই-বোনের এই যুদ্ধে ন্যূনতম আগ্রহও ছিল না সিজারের। তার মন তখন পড়ে ছিল রোমে। সেখানে ফিরে গিয়ে প্রজাতন্ত্রের দায়িত্ব নেয়া এখনও বাকি যে! তাই অবিলম্বে সিজার রোমে ফেরার প্রস্তুতি নিলেন। কিন্তু সিজারের এমন আচরণ হতাশ করে টলেমিকে। একইসাথে তিনি সিজারের উপর রাগান্বিতও ছিলেন। তিনি ভাবলেন, অল্প সংখ্যক সেনাবাহিনীর সাথে সিজারকে যদি পরাজিত করা যায়, তাহলে সিজার-বিরোধীরা রোমের দখল নিয়ে নেবে। তখন সিজারকে হত্যার জন্য হয়তো রোমের সিজার-বিরোধীরা তাকে ক্লিওপেট্রার বিরুদ্ধে যুদ্ধে সাহায্য করবেন। যেভাবে সিজারের সাহায্য পাবার আশায় তিনি পম্পেইকে হত্যা করেছিলেন, ঠিক সেভাবেই সিজার-বিরোধীদের সাহায্যের আশায় তিনি সিজারকে হত্যার কথা ভাবলেন। টলেমি এরপর সিজারের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে বসলেন এবং তাকে রোমে ফিরে যাওয়া থেকে আটকালেন।

কিন্তু এরপরেই সিজারের জন্য অপেক্ষা করছিল দ্বিতীয় চমক, যা মিশরের গৃহযুদ্ধের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। সব হিসাব-নিকাশ পাল্টে দিয়ে সিজার জড়িয়ে পড়েন আপাত অপ্রয়োজনীয় এই গৃহযুদ্ধে!

এই সিরিজের পূর্ববর্তী পর্বগুলো পড়তে ক্লিক করুন নিচের লিঙ্কে:

১) জুলিয়াস সিজার (পর্ব - ১): প্রজাতন্ত্রের সম্রাট 
২) জুলিয়াস সিজার (পর্ব - ২): রাজনীতিবিদ থেকে সেনাপতির পথে যাত্রা 
৩) জুলিয়াস সিজার (পর্ব - ৩): মিস্টিরিয়াস আইল্যান্ডের রহস্যভেদ
 
৪) জুলিয়াস সিজার (পর্ব -৪): শ্রেষ্ঠ রোমান সেনাপতি থেকে দেশদ্রোহী হয়ে ওঠার গল্প

This is a bengali series biographical article on Julius Caesar.

Reference:

তথ্যসূত্র:
১. Roman Egypt
২. War in Alexandria
৩. The Egyptians (1967); Isaac Asimov; Page:120-164

Feature Image: Zonared