এই লেখাটি লিখেছেন একজন কন্ট্রিবিউটর।চাইলে আপনিও লিখতে পারেন আমাদের কন্ট্রিবিউটর প্ল্যাটফর্মে।

গলের বিজয় সিজারকে রোমান ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সেনাপতিতে পরিণত করেছিল। এলিশিয়ার পতনের পর পুরো গল সাম্রাজ্য সিজারের, তথা রোমান সাম্রাজ্যের অধীনে চলে আসে। নিজের চেয়ে কয়েকগুণ বড় সৈন্যবাহিনীর দু'দিকের আক্রমণের জবাবে যেভাবে বিজয় অর্জিত হয়েছিল, তা আজও সমরবিদদের অবাক করে। এলিশিয়ার এই বিজয় এতটাই দুর্দান্ত ছিল যে বলা হয়, আলেকজান্ডার দ্য গ্রেটও কখনও এত কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হননি, যিনি কি না প্রায় পুরো পৃথিবীর সম্রাট ছিলেন। কিন্তু এত বড় সাফল্যের পরও সিজার বেশ বিব্রত ছিলেন গলের পূর্ব বিজিত কিছু অঞ্চল নিয়ে। এসব অঞ্চল থেকে ছোটখাট বিদ্রোহের খবর আসতে থাকে। তবে বিদ্রোহের চেয়েও খারাপ ব্যাপার ছিল যে, বিদ্রোহীরা বহির্শক্তির মদদে বিদ্রোহে লিপ্ত হচ্ছিল।

জুলিয়াস সিজারের ভাস্কর্য; Image Source: History

তাই সিজার এই বিদ্রোহগুলো নিয়ে বেশ বিব্রত ছিলেন। তিনি জানতে পারেন, বিদ্রোহগুলো সমুদ্রের ওপারের বহির্শক্তির সহায়তার সংগঠিত হচ্ছিল। সেসময় সিজারের গল অভিযানের ফলে সমগ্র ইউরোপের মূল ভূখণ্ড রোমান প্রজাতন্ত্রের অধিকারে চলে এসেছিল। বাকি ছিল শুধু সমুদ্রের ওপারের একটা দ্বীপ, যার নাম ব্রিটেন। প্রকৃতপক্ষে এই দ্বীপ সম্পর্কে তেমন কোনো পূর্ব অভিজ্ঞতা ছিল না রোমানদের। কারণ এই দ্বীপের পরেই ছিল পরিচিত জগতের সমাপ্তি। এই দ্বীপ সম্পর্কেও তাই ধারণা কমই ছিল পৃথিবীবাসীর। প্রকৃতপক্ষে, জনবিচ্ছিন্ন ছোট্ট এই দ্বীপ নিয়ে কেউ চিন্তিতও ছিল না সেসময়। কিন্তু বিদ্রোহীদের সাহায্যের জন্য এই দ্বীপের বাসিন্দাদের একটা শিক্ষা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন সিজার।

সেই সময়ের ব্রিটেন সম্পর্কে জেনে নেওয়াটা বেশ জরুরি। ভৌগোলিক অবস্থানগত কারণে সঙ্গতভাবেই ব্রিটেন আক্রমণের একমাত্র উপায় সেসময় ছিল নৌপথ। আর এই দ্বীপের অধিবাসী সম্পর্কে তৎকালীন ইউরোপীয়রা এতটাই অজ্ঞ ছিল যে এই দ্বীপকে বলা হতো 'দ্য মিস্টিরিয়াস আইল্যান্ড' বা রহস্যময় দ্বীপ। উত্তরের এই দ্বীপের সবচেয়ে খারাপ বিষয় ছিল এর আবহাওয়া। সে অঞ্চলের আবহাওয়া বেশ বৈরী ছিল, যা ইউরোপীয়দের কল্পনাতীত। গা হিম করা ঠাণ্ডার সাথে হঠাৎ আসা ঝড়-ঝঞ্ঝা ছিল এই দ্বীপের নিত্যকার ব্যাপার।

ব্রিটেন দ্বীপের বৈরী আবহাওয়া; Image source: The Time

সব দিক বিবেচনায়, সিজারের জন্য ব্রিটেন অভিযান ছিল বেশ ঝুঁকিপূর্ণ। এটা ছিল তার জীবনের প্রথম যুদ্ধ, যেখানে প্রতিপক্ষ ওপারের সৈন্যবাহিনী নয়। মূল প্রতিপক্ষ আবহাওয়া আর দুই ভূখণ্ডের মধ্যবর্তী সমুদ্রপথ। কিন্তু সেনাপতির নাম যে সিজার। এতসব প্রতিকূলতা তিনি মানবেন কেন! তাই তার নির্দেশমতো জাহাজ তৈরির কাজ শুরু হলো। যেহেতু শীতের মৌসুম কোনোভাবেই তিনি ওই দ্বীপে কাটাতে ইচ্ছুক ছিলেন না, তাই তার পরিকল্পনা ছিল বসন্তে অভিযান শুরু করে শীতের আগেই এপারে ফিরে আসতে। তাছাড়া অনেকসময় থেকে তিনি রোমের বাইরে। এতসব যুদ্ধজয় যে পদ পাবার জন্য, তার নিয়ন্ত্রণ নিতে তাকে রোমেও ফেরত যেতে হতো। তাই সিজার ব্রিটেন অধিগ্রহণ ন্যূনতম সময়ের মধ্যে সম্পন্ন করতে চাচ্ছিলেন। এ কারণে তার কারিগররা বসন্তের আগেই জাহাজগুলো প্রস্তুত করার জন্য দিনরাত এক করে কাজ করতে থাকলেন।

সিজারের কখনোই এই দ্বীপ বিজয়ের পর সেখানে দীর্ঘ সময় অবস্থানের পরিকল্পনা ছিল না। তাছাড়া গলের বিশাল ভূখণ্ড দখল হওয়ার পর ওই অঞ্চলের রোমান কর্তৃত্ব রক্ষার জন্য বেশ কিছু সৈন্য ওই অঞ্চলগুলোতে রেখেও আসতে হয়ছে তাকে। তাই তিনি অল্প সংখ্যক সৈন্য নিয়ে ব্রিটেনের উদ্দেশে যাত্রার পরিকল্পনা করলেন। তিনি দুই লিজিয়ন সৈন্য ও কিছু অশ্বারোহী বাহিনীর জন্য জাহাজ নির্মাণের আদেশ দিলেন। বলে রাখা ভালো, লিজিয়ন হলো সেই সময় রোমান সেনাবাহিনীর এককের নাম। প্রকৃতপক্ষে, লিজিয়নের আকার ইতিহাসের বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন রকম ছিল।

তবে সিজারের সময়ে একেকটা লিজিয়নে প্রায় ৫ থেকে ৬ হাজার সৈন্য থাকত। এদের মধ্যে শতকরা ৮০ জন থাকত যোদ্ধা, আর বাকি লোক ছিল অন্যান্য কাজের জন্য। প্রতিটি লিজিয়নে কিছু সংখ্যক অশ্বারোহী বাহিনীও থাকত। যা-ই হোক, দুই লিজিয়ন সেনা ও কিছুসংখ্যক অশ্বারোহী বাহিনী নিয়ে তিনি বসন্তের অপেক্ষায় থাকলেন।

আগস্ট মাসের মাঝামাঝি সময়। সিজারের সৈন্যবাহিনী বহনের জন্য জাহাজ প্রস্তুত। দুই লিজিয়ন সৈন্য ও কিছুসংখ্যক অশ্বারোহী বাহিনী নিয়ে সিজার যাত্রা করলেন রহস্যময় সে দ্বীপের উদ্দেশে। সমুদ্র পার করে ব্রিটেনের কেন্ট প্রদেশের উপকূলের কাছাকাছি পৌঁছলেন সিজার। কিন্তু সেখানে তিনি অপ্রত্যাশিতভাবে কিছু ব্রিটন অশ্বারোহী বাহিনীর উপস্থিতি লক্ষ্য করলেন। তাই অবস্থান পরিবর্তন করে তিনি তার জাহাজগুলোকে সৈন্য অবতরণের জন্য সুবিধামতো জায়গায় নিয়ে যেতে  নির্দেশ দিলেন।

কিন্তু তাদের সাথে সাথে ব্রিটন অশ্বারোহী বাহিনীও তাদের অনুসরণ করতে থাকল। সিজারের জাহাজগুলো ছিল বেশ বড়। সেগুলোকে পাড়ের খুব কাছাকাছি নিয়ে যাওয়া সম্ভব ছিল না। তাই জাহাজগুলো থেকে সৈন্য অবতরণের সময় সৈন্যদের ব্যক্তিগত জিনিসপত্রসহ পানিতে কিছুটা সাঁতার কেটে কূলে ওঠার পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু ব্রিটন এই অশ্বারোহী বাহিনীর কারণে সেটা সম্ভব হচ্ছিল না। কারণ, জাহাজ থেকে অবতরণের পরপরই তাদের উপর আক্রমণ হলে তার সৈন্যবাহিনী পানিতে প্রতিরোধের কোনো সুযোগই পাবে না। দ্বীপের ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে অবতরণের পূর্বেই সিজার তার অভিযানের প্রথম ধাক্কা খেলেন।

ব্রিটেন দ্বীপে অবতরণ; Image source: livescience.com

তিনি দেখলেন, যদি কোনোভাবে ডাঙায় অবতরণ করতে পারেন, তাহলে এই বাহিনীকে পরাস্ত করা তার কাছে খুব কঠিন হবে না। তাই তার জাহাজগুলোর সাথে থাকা ছোট নৌকাগুলোতে কিছু সৈন্যকে এগিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দিলেন, যাতে এদের তীরের আক্রমণে ডাঙার ব্রিটন বাহিনী পিছু হটে এবং তার বাহিনী ডাঙায় অবতরণ করতে পারে। তার পরিকল্পনা কাজে দিল। ব্রিটন অশ্বারোহী বাহিনী পিছু হটল এবং তার বাহিনী অবশেষে ডাঙায় নামতে সক্ষম হলেন। সিজার এই অবতরণের মাধ্যমে প্রথম রোমান জেনারেল হিসেবে এই রহস্যময় দ্বীপ, তথা ব্রিটেনে পা রেখেছিলেন।

তবে তিনি তো শুধু পদাঙ্ক আঁকতে এই দ্বীপে আসেননি। তার উদ্দেশ্য ছিল ব্রিটেনকে রোমানদের অধিকারে আনার মাধ্যমে বিদ্রোহীদের সহযোগিতার একটা যথোপযুক্ত শিক্ষা দেওয়া। যা হোক, অবতরণের পর তিনি আর ব্রিটন বাহিনীর পিছু ধাওয়া না করে সেনা তাঁবু স্থাপনের সিদ্ধান্ত নিলেন। কারণ, ব্রিটনদের অশ্বারোহী বাহিনীর বিপরীতে তার এই বাহিনী ছিল মূলত পদাতিক বাহিনী। তার কাছে অশ্বারোহী বাহিনীর সদস্য ছিল অতি নগণ্য। তাই তাদের পিছু ধাওয়া করলেও তাদের নাগাল পাওয়া সম্ভব ছিল না। কেন্ট উপকূলের অদূরে তিনি তার ঘাঁটি স্থাপন করলেন। তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন এখানে মূল সেনা ঘাঁটি স্থাপন করে তিনি যুদ্ধ পরিচালনা করবেন।

কিন্তু তাকে অবাক করে দিয়ে ব্রিটনদের এক রাজা শান্তিচুক্তির আবেদন করে বসলেন। সিজার কিছু যুদ্ধবন্দির বিনিময়ে তার শান্তিচুক্তিতে রাজি হলেন। সিজার এবার ব্রিটেনের অভ্যন্তরের রাজ্যগুলোর দিকে নজর দিলেন। সিজারের অবতরণের পর থেকে সবকিছু পরিকল্পনা মোতাবেক এগোচ্ছিল। কিন্তু এখনও সিজারের সবচেয়ে বড় শত্রুর মুখোমুখি হওয়া বাকি ছিল। বৈরী প্রকৃতির সাথে তার সাক্ষাৎ তখনও বাকি।

হঠাৎ করে প্রচুর ঝড়-ঝঞ্ঝা শুরু হলো কেন্ট উপকূলে। এক রাতের ঝড়ে তাদের জাহাজগুলোর ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হলো। তাদের সেনা ছাউনি এবং রসদও ক্ষতিগ্রস্ত হলো। ঝড়ের তীব্রতা এতটাই বেশি ছিল যে রোমানদের বেশ কিছু জাহাজ মেরামতের অযোগ্য হয়ে পড়ল। রোমানরা প্রথমবার বুঝতে পারল, প্রকৃতির বিরুদ্ধে যুদ্ধ আসলে কতটা কঠিন। ঝড়ের ক্ষয়ক্ষতি সম্পর্কে ব্রিটনরাও অবগত ছিল। তাই তাদের যে রাজা শান্তিচুক্তির আবেদন করেছিলেন, তিনিও রোমানদের দুর্বলতার সুযোগে চুক্তি ভঙ্গ করে সৈন্য জমায়েত করতে শুরু করলেন। রসদ না থাকার কারণে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়াটা বোকামি হবে। অপরদিকে জাহাজগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার কারণে রোমানরা উভয় সংকটে পড়ে যায়।

সিজার দ্রুত তার কারিগরদের প্রথমে জাহাজ মেরামতের নির্দেশ দেন। এরপর আশপাশের এলাকা থেকে কিছু রসদ সংগ্রহ করে রসদ সমস্যার কিছুটা সমাধান করেন। এসব সমস্যার মধ্যে মরার উপর খাঁড়ার ঘা হয়ে আসে শীতকাল। সিজার হিসেব করে দেখেন, এই বাহিনী নিয়ে আক্রমণ করলেও শীতের আগে তিনি হয়তো গলে ফিরে যেতে পারবেন না। আর রসদ সমস্যা তো ছিলই। অগত্যা তাকে প্রকৃতির কাছে হার মানতে হয়। সিজার অভিযান সামনে না এগিয়ে তার জাহাজ মেরামত করে গলে ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। তিনি পরিকল্পনা করেন সামনের বসন্তে আবার আক্রমণের। আক্রমণের কোনো সফলতা ছাড়াই প্রথম অভিযানের পর রোমান বাহিনী গলে ফিরে আসতে বাধ্য হয়। সিজার বুঝে যান, এই দ্বীপ এত কম সময়ে তাকে নিজের হতে দেবে না।

পরের বসন্তের জন্য প্রস্তুত হতে থাকেন সিজার। এবার অভিযানটি তার কাছে রীতিমতো সম্মানের প্রশ্ন। পুরো গলের অধিকর্তা হয়েও একটা ছোট দ্বীপ ভূখণ্ড তাকে রুখে দিচ্ছে, এটা মেনে নিতে বেশ বিব্রত হচ্ছিলেন তিনি। তাই এবার আগের থেকেও দ্বিগুণ বাহিনী নিয়ে আক্রমণের সিদ্ধান্ত নেন। এছাড়াও গলের বিভিন্ন স্থান থেকে তিনি নিজের বাহিনীতে আরো কিছু অশ্বারোহী যুক্ত করেন। তিনি কারিগরদের এবার একটু আধুনিক মানের জাহাজ নির্মাণের নির্দেশ দেন, যা তাদের তীরের সর্বোচ্চ সম্ভব কাছাকাছি নিয়ে যেতে পারবে এবং ব্রিটেনের বৈরী আবহাওয়া থেকেও বাঁচাতে পারবে। পূর্ণোদ্যমে চলতে থাকে সিজারের দ্বিতীয় অভিযানের প্রস্তুতি।

এক বছর পর রোমান বাহিনীর পাঁচ লিজিয়ন সৈন্য ও দুই হাজার অশ্বারোহী বাহিনী বহনকারী প্রায় ৮০০ জাহাজ নিয়ে সিজার ব্রিটেনের উদ্দেশে তার যাত্রা শুরু করেন। এবার তার লক্ষ্য আরও পরিষ্কার। এবার তিনি আরো অভিজ্ঞ। তিনি তার বাহিনীসহ এক বছর পূর্বে যেখানে অবতরণ করেছিলেন, সেখানেই অবতরণ করেন এবং পূর্বের স্থানেই মূল সেনাঘাঁটি স্থাপন করেন। এবার সিজারের সাথে সামনাসামনি যুদ্ধের জন্য সাহস পাচ্ছিলেন না কোনো ব্রিটন রাজা। তাই প্রথমদিকে তারা গেরিলা যুদ্ধের কৌশল অবলম্বন করতে থাকেন। কিন্তু তাদের এই গেরিলা আক্রমণ রোমান শিবিরে সমীহ সৃষ্টির মতো কিছু ছিল না।

সিজার ধীরে ধীরে ব্রিটেনের অভ্যন্তরে প্রবেশ করতে থাকলে ব্রিটনদের বাহিনী পিছু হটতে থাকে। প্রকৃতপক্ষে, তারা প্রতিরোধের জন্য সক্ষম ছিল না। রোমানদের সামনে ব্রিটনদের রাজ্যগুলোর পরাজয় ছিল সময়ের ব্যাপার। এমন সময় প্রকৃতি আবার ব্রিটনদের উপর সদয় হয়। উত্তরের বৈরী আবহাওয়া আরো একবার রোমানদের জাহাজগুলোর ক্ষতি সাধন করে। অগত্যা অগ্রসর হওয়ার বদলে জাহাজ মেরামতের জন্য সিজারকে উপকূলের কাছাকাছি মূল সেনাঘাঁটিতে ফিরে আসতে হয়। তবে এবার তিনি বদ্ধপরিকর। তাই দিন-রাত এক করে জাহাজ মেরামত শেষে তিনি আবার অগ্রসর হওয়া শুরু করেন।

এর মধ্যে ব্রিটেনের আশপাশের সব বাহিনী ক্যাসিভেলিনিয়াস নামক এক সেনাপতির নেতৃত্বে একত্র হয়। ক্যাসেভেলিনিয়াস ছিলেন ব্রিটেনের থেমস নদীর অববাহিকায় গড়ে ওঠা এক রাজ্যের রাজা। তার নেতৃত্বে ব্রিটেনের সম্মিলিত বাহিনী রোমানদের প্রতিহত করার জন্য একত্র হয়। সিজারও পূর্ণোদ্যমে অগ্রসর হতে থাকে এবং খুব শীঘ্রই দুই বাহিনী একটি অনিবার্য যুদ্ধের মধ্যে পড়ে যায়। ব্রিটেনের অশ্বারোহী বাহিনীর কাছে রোমান পদাতিক বাহিনী প্রথমদিকে কিছুটা নাস্তানাবুদ হলেও রোমান অশ্বারোহী বাহিনী যুদ্ধের ময়দানে অবতীর্ণ হবার পর পরিস্থিতি পাল্টে যায়। রোমানদের আক্রমণে দিশেহারা হয়ে ব্রিটেন বাহিনী পিছু হটতে থাকে। একসময় ক্যাসেভেলিনিয়াস সৈন্য বাহিনী নিয়ে নিজ রাজ্যের দিকে পলায়ন করেন এবং সেখানেই রোমান বাহিনীকে প্রতিরোধের সিদ্ধান্ত নেন।

সিজারের বাহিনীও তাদের থেমসের অববাহিকা পর্যন্ত ধাওয়া করে। সিজারের বাহিনী এসে পৌঁছায় থেমস নদীর এপারে। যে থেমস নদীর পাড়ে গড়ে উঠেছে আজকের লন্ডন শহর। রোমান বাহিনীর সামনে ছিল ক্যাসেভেলিনিয়াসের নেতৃত্বে ব্রিটেনের সম্মিলিত বাহিনী। ব্রিটেন জয় আর রোমান বাহিনীর মাঝে ছিল শুধু থেমস নদী।

রোমান বাহিনী থেমস নদী পার করে আক্রমণ চালাল ক্যাসেভেলিনিয়াসের শক্তিশালী দুর্গে। প্রথমদিকে বেশ কঠিন প্রতিরোধ গড়ে তুললেও রোমানদের দ্বিমুখী আক্রমণের তোপে বেশিক্ষণ টিকতে পারল না ব্রিটন বাহিনী। খুব সহজেই ভেঙে পড়তে থাকল তাদের একের পর এক প্রতিরোধ দেয়াল। অগত্যা পরাজয় নিশ্চিত জেনে ক্যাসেভেলিনিয়াস শান্তি চুক্তির আবেদন করলেন সিজারের কাছে। পূর্বেই বলেছি, সিজারের এই দ্বীপে রোমান বাহিনী নিয়ে দীর্ঘদিন থাকার কোনো ইচ্ছা বা পরিকল্পনা কোনোটাই ছিল না। তাই তিনি ক্যাসেভেলিনিয়াসের শান্তিচুক্তিতে রাজি হলেন এবং ব্রিটনদের উপর কিছু শর্তারোপ করে যুদ্ধ শেষ করলেন। রোমানদের বাৎসরিক কর প্রদানের শর্তে ক্যাসেভেলিনিয়াস ক্ষমতা ধরে রাখলেন। 'দ্য মিস্টিরিয়াস আইল্যান্ড' এলো রোমান প্রজাতন্ত্রের পতাকাতলে।

ব্রিটেন অভিযানে সিজারের যাত্রাপথ; Image source: livescience.com

এরপরের কাহিনী খুব সংক্ষিপ্ত। রোমানরা কেন্ট উপকূলের দিকে যাত্রা শুরু করল, কিন্তু ঝড়ের কারণে আবারো তাদের জাহাজগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় সিজার তার অর্ধেক বাহিনীকে গলে প্রেরণ করলেন এবং নিজে অবশিষ্ট সেনাদলের সাথে ব্রিটেনেই থেকে গেলেন। পরিকল্পনা হলো যে, অর্ধেক সৈন্য রেখে জাহাজগুলো আবার ফিরে আসবে এবং বাকি অর্ধেক সৈন্য নিয়ে যাবে। সেই সাথে তিনি ক্ষতিগ্রস্ত জাহাজগুলো ও মেরামতের নির্দেশ দিলেন। কিন্তু প্রকৃতি আরো একবার তার উপর নিষ্ঠুর হাসি হাসল। তার গল অভিমুখী সৈন্যবাহী জাহাজগুলো আবার ঝড়ের কবলে পড়ল এবং ব্রিটেনে ফিরে যাওয়ার অবস্থায় রইল না। এদিকে ব্রিটেনে শীতকাল সন্নিকটে। সংবাদ পেয়ে অগত্যা সিজার ঝুঁকি নিয়েই মেরামত করা জাহাজগুলোতে অতিরিক্ত সৈন্য নিয়ে যাত্রার সিদ্ধান্ত নিলেন। সমাপ্ত হলো সিজারের ব্রিটেন অভিযান। এ অভিযানের মধ্য দিয়ে 'পরিচিত দুনিয়া'র একপ্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে পৌঁছাল রোমের পতাকা। সিজার হলেন প্রথম সেনাপতি, যিনি ব্রিটেনে রোমান আধিপত্যের ঝঙ্কার শুনিয়ে এলেন।

রহস্য দ্বীপের সব রহস্য ভেদ করে উত্তর সাগরে জাহাজ ভাসিয়ে সিজার নিজের আধিপত্যের গভীরতা অনুভব করলেন। এত যুদ্ধজয়, এতদিনের নির্বাসন যার জন্য, সেই রোম তাকে ডাকছে। সিনেটের ক্ষমতা গ্রহণের সময় এসে গেছে। এবার তার রোমে ফেরার পালা!

এই সিরিজের পূর্ববর্তী পর্বগুলো পড়তে ক্লিক করুন নিচের লিঙ্কে:

১) জুলিয়াস সিজার (পর্ব - ১): প্রজাতন্ত্রের সম্রাট 
২) জুলিয়াস সিজার (পর্ব - ২): রাজনীতিবিদ থেকে সেনাপতির পথে যাত্রা

This is a Bangla article. This is about Emperor Julius Caeser's Britain victory while the region was called 'Mysterious Island'.

Featured Image: Ancient Origins

References:
1. Julius Caesar’s First Landing in Britain
2. Cassivellaunus
3. Caesar's invasion of Britain began from Pegwell Bay in Kent, say archaeologists
4. Caesar: Second Invasion of Britain, 54 BC
5. Caesar: First Invasion of Britain, 55 BC