পাঞ্জাবের আম্রিতসারে অবস্থিত ছোট একটি জায়গার নাম “জালিয়ানওয়ালা বাগ”। ব্রিটিশ উপনিবেশের অবদানগুলোর পাশাপাশি যে কয়টি নাম তাদের অত্যাচারের কথা বিষদভাবে মনে করিয়ে দেয়, সেগুলোর মাঝে এই জালিয়ানওয়ালা বাগ একটি। এর হাত ধরেই আসে অসহযোগ আন্দোলন।

এই ঘটনাটিকে বিংশ শতাব্দীর জঘন্য এক রাজনৈতিক চাল হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়ে থাকে। ১৯১৯ সালের ১৩ই এপ্রিল, পহেলা বৈশাখের আগেরদিন। ব্রিটিশদের “রোলেট অ্যাক্ট” এর বিরুদ্ধে গান্ধীজি তখন আন্দোলন করছেন, এই উপলক্ষ্যে ৩০ই মার্চ আর ৬ই এপ্রিল হরতালের ডাক দেন মহাত্মা গান্ধী। পাঞ্জাববাসীরা গান্ধীজির ডাকে বিপুলভাবে সাড়া দেয়।

পাঞ্জাবের সে সময়কার ব্রিটিশ লেফট্যানেন্ট গভর্নর মাইক্যাল ও’ডায়ার, হরতালে হিন্দু আর মুসলমানদের সংহতি দেখে খানিকটা বিচলিত হয়ে উঠে। ফলস্বরূপ তা-ই হয় যা বরাবরই ব্রিটিশরা করে এসেছে। হাজারো নিষেধাজ্ঞার মতো আরো এক নিষেধাজ্ঞা জারি করে। পাঞ্জাবে মহাত্মা গান্ধীর প্রবেশ নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়। আম্রিতসারের দুই নেতা ড. সাইফুদ্দিন আর ড. সত্যপালকে অ্যারেস্ট করা হয়। তারা দুজনেই ছিলেন সত্যাগ্রহ আন্দোলনের প্রবক্তা।

১০ই এপ্রিল, ১৯১৯। পাঞ্জাবের বেশ কিছু জায়গায় ছোটখাট জমায়েত সৃষ্টি করা হয়। সেখানেও গুলি চলে ব্রিটিশ মিলিটারির। একই দিনে কয়েকটি ব্যাংক আর সরকারী দালানে লুঠ করা হয়, এই তান্ডবের আগুন ছড়িয়ে পড়ে রেলস্টেশন আর পাঞ্জাবের টাউন হলে। পাঁচজন ইউরোপীয়ানসহ বেশ কিছু সরকারী কর্মকর্তার মৃত্যু হয়। মিলিটারিরাও হাত গুটিয়ে বসে থাকেনি, যেখানে যেখানে সুযোগ পেয়েছে বন্দুক থেকে গুলি ছুঁড়েছে তারা। আন্দোলনকারীদের মাঝেও অনেকেই মারা যায়।

এ ঘটনাগুলো মানুষের মনে জন্ম দেয় আন্দোলনের আগুন। একসাথে বেশ কিছু জায়গায় মানুষ প্রবল বিদ্বেষী হয়ে উঠে।

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব পড়ে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল রেগনল্ড ডায়ারের উপর। ডায়ার তার কাজের শুরুতেই মিটিং-মিছিলে নিষেধাজ্ঞা দেয়, আর নির্বিচারে মানুষ অ্যারেস্ট করার হুকুম জারি করে।

ড. সাইফুদ্দিন আর ড. সত্যপালকে অ্যারেস্ট করার ঘটনার বিরুদ্ধে আন্দোলন করতেই সাধারণ মানুষগুলো সেই জালিয়ানওয়ালা বাগে অবস্থান নেয়। নিঃসন্দেহে তারা মিটিং-মিছিলের উপর নিষেধাজ্ঞার ব্যাপারে ওয়াকিবহাল ছিল না। তাছাড়া খুবই শান্তিপূর্ণভাবে পহেলা বৈশাখকে সামনে রেখে আন্দোলনের জন্যে জমায়েত সৃষ্টি করে।

কিন্তু ডায়ার তো আর হাত গুটিয়ে বসে নেই। এক বিশাল সেনাবহর নিয়ে ডায়ার সেখানে উপস্থিত হয় আর কোনো ধরণের ঘোষণা ছাড়াই গুলির নির্দেশ দেয়। জেনারেল ডায়ারের নির্দেশে নিরীহ মানুষজনের উপর সেদিন হত্যাযজ্ঞ শুরু করা হয়। ডায়ারবাহিনী পাক্কা দশ মিনিটের মতো একটানা গুলি করতেই থাকে, হাজারের উপর মানুষ মারা যায় সেদিন এই গুলিতে। ডুবন্ত মানুষ যেমন খঁড়-কুটো আঁকড়ে ধরে বাঁচার চেষ্টা করে, সেদিনও এই উদাহরণ দেখা গিয়েছিল।

জালিয়ানওয়ালা বাগ পুরোটা জায়গা ছিল ১০ ফুট উঁচু দেয়ালে ঘেরা, ৬ থেকে ৭ একরের শূন্যভূমি। বের হওয়ার রাস্তা ছিল পাঁচটি, সরু এই পথগুলো ঘিরে দাঁড়িয়ে ছিল ডায়ারবাহিনীর পঞ্চাশেক সৈন্য। সেখানে একটি কুয়া ছিল, মানুষ গুলি থেকে বাঁচতে সেই কুয়ার মাঝে ঝাঁপিয়ে পড়ে। কুয়া থেকে পরবর্তীতে প্রায় ১২০ জন মানুষের লাশ উদ্ধার করা হয়। এমন লাশও পাওয়া যায় যে, মায়ের কোলে শিশুর মৃতদেহ। কতটা অসহায় হলে, নিজের সন্তানকে কোলে নিয়েই কুয়ার পানিতে ঝাঁপ দেয় একজন মা।

চিত্রঃ এখানে দাঁড়িয়েই গুলি ছুঁড়ে ডায়ারবাহিনী

এইসব আপামর প্রতিরক্ষাবিহীন জনসাধারণকে একে একে মারতে শুরু করে ডায়ার বাহিনী। নির্বিচারে এই গুলি ততক্ষণ পর্যন্ত চলতে থাকে, যতক্ষণ না ডায়ার বাহিনীর গুলি শেষ হয়ে যায়। জালিয়ানওয়ালা বাগে সেদিন হাজারেরও বেশি মানুষকে নির্বিচারে গুলি করে হত্যা করা হয়। ডায়ার পরবর্তীতে স্বীকার করেছিল যে, পুরো পাঞ্জাবে মানুষের মনে ভয় সৃষ্টি করাটাই ছিল তার এই হত্যাযজ্ঞের উদ্দেশ্য।

এই হত্যাযজ্ঞ উপমহাদেশের মানুষের মনে গভীর ভাবে দাগ কাটে। মানুষ স্বাধীনতার জন্য তখন আরো পাগল হয়ে উঠে। জালিয়ানওয়ালা বাগের এই ঘটনাই মোড় ঘুরিয়ে দেয় পুরো স্বাধীনতা আন্দোলনের।

ঘটনার কিছুদিন পর মানুষের এর বিরুদ্ধে করা আন্দোলন। ছবিতে মানুষেরা দেয়ালে গুলির চিহ্নগুলি খুঁজে দেখাচ্ছে

ইতিহাসের সবথেকে দুঃখজনক ঘটনাগুলোর মধ্যে একটি হলো এই জালিয়ানওয়ালা বাগের হত্যাযজ্ঞ। এই ঘটনাটি এমনই রোমহর্ষক যে, কখনোই আমাদের স্মৃতির পাতা থেকে মুছে যাবে না। মানুষ আজও অবাক চোখে এই ঘটনাকে মনে করে, ইশ্! যদি ঘটনাটা কখনো না ঘটতো।

চিত্রঃ জালিয়ানওয়ালা বাগের দেয়ালে গুলি চিহ্ন একশত বছর পরেও নৃসংস সেই হত্যাযজ্ঞের স্বাক্ষী বহন করে আছে

এই হত্যাযজ্ঞেরও ২৮ বছর পর উপমহাদেশ পায় স্বাধীনতা; আর সবথেকে আশ্চর্যের বিষয় হলো, নির্মম এ হত্যাযজ্ঞের প্রায় একশত বছর পার হয়ে গেলেও ব্রিটিশদের তরফ থেকে কোনো ধরণের সহমর্মিতা কিংবা ক্ষমাপ্রার্থনার ঘোষণা আজও করা হয়নি।

ঘটনার পরবর্তী সময়ের জালিয়ানওয়ালা বাগ

The Legend of Bhagat Singh মুভিটায় একটা অংশ জুড়ে রয়েছে জালিয়ানওয়ালা বাগের এই হত্যাকান্ড, এর পেছনের কারণগুলোও খুব সুন্দর ভাবে তুলে ধরা হয়েছে। ভগৎ সিং গান্ধীজির আদর্শ বুকে লালন করে বড় হয়ে উঠা এক যুবক, বয়স বৃদ্ধির সাথে সাথে বুঝতে পারে, অহিংসা উপমহাদেশকে স্বাধীনতা এনে দেয়ার জন্য যথেষ্ঠ নয়। ভগৎ সিং এর নাম নেয়ার সাথে সাথে সুখদেব আর রাজগুরুর নামও চলে আসে। স্বাধীনতা আন্দোলনে এই তিনজনের অবদান দেখার মত।

যা বলছিলাম, এ ঘটনার পরবর্তীতে ডায়ার উচ্চতন কর্মকর্তাদের কাছে রিপোর্ট করে তার এই হত্যাযজ্ঞের কথা এই ভাবে যে, “He was confronted by a revolutionary army”। ডায়ারের এই ঘৃণিত কাজের পক্ষে মত দেয় মেজর জেনারেল উইলিয়াম ব্যানন, “Your action correct and Lieutenant Governor approves”। ডায়ার অনুরোধ করে যে, আম্রিতসারসহ আশেপাশের জায়গাগুলোতে যেন মার্শাল ল’ জারি করা হয়। লর্ড কেমসফোর্ড এই অনুরোধে সঙ্গে সঙ্গেই অনুমোদন দেয়।

উইনস্টন চার্চিল আর সাবেক প্রধানমন্ত্রী হারবার্ট হেনরী অ্যাসকুইথ, দু’জনেই এই ঘটনার প্রবল নিন্দা জানান। চার্চিল হাউজ অব কমন্সে এই ব্যাপারে উল্লেখ করেন যে,

“The crowd was unarmed, except with bludgeons. It was not attacking anybody or anything… When fire had been opened upon it to disperse it, it tried to run away. Pinned up in a narrow place considerably smaller than Trafalgar Square, with hardly any exits, and packed together so that one bullet would drive through three or four bodies, the people ran madly this way and the other. When the fire was directed upon the centre, they ran to the sides. The fire was then directed to the sides. Many threw themselves down on the ground, the fire was then directed down on the ground. This was continued to 8 to 10 minutes, and it stopped only when the ammunition had reached the point of exhaustion.”

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কাছে খবরটা পৌঁছায় ২২শে মে নাগাদ। তিনি চেষ্টা করেন কলকাতায় এর বিরুদ্ধে আন্দোলন করার। কিন্তু পরে সিদ্ধান্ত নেন নাইটহুড খেতাব ত্যাগ করার। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নিজের নাইটহুড ফিরিয়ে দেন এই হিংস্র হত্যাযজ্ঞের প্রতিবাদে।

ভাইসরয় লর্ড কেমসফোর্ড কে উদ্দেশ্য করে লেখা চিঠি তে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর উল্লেখ করেন,

“I … wish to stand, shorn, of all special distinctions, by the side of those of my countrymen who, for their so called insignificance, are liable to suffer degradation not fit for human beings.”

হান্টার কমিশনের মাধ্যমে ডায়ারের উপর পরবর্তীতে অনুসন্ধান চালানো হয়, কিন্তু ডায়ারের উপর তেমন কোনো চার্জ আরোপ করা যায় নি। কেননা ডায়ারের এই হিংস্র ঘৃণিত হত্যাযজ্ঞটি উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের স্বীকৃত ছিল।

 

জালিয়ানওয়ালাবাগে স্মৃতিস্মারক

১৩ই মার্চ, ১৯৪০। হত্যাযজ্ঞের এক আহতের নাম হল উধাম সিং, যে নিজেই ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী। লন্ডনের ক্যাক্সটন হলে, উধাম সিং নামের এক লোক মাইক্যাল ও’ডায়ারকে হত্যা করে। এই ডায়ারই জালিয়ানওয়ালা বাগে হত্যাযজ্ঞের সময়ে ব্রিটিশ লেফট্যানেন্ট গভর্ণর ছিল।

৩১শে জুলাইতে উধাম সিং এর ফাঁসি কার্যকর করা হয়। ভারতে উধাম সিংকে শহীদ ঘোষণা করা হয়, এই উদ্দেশ্যে জওহরলাল নেহেরু উল্লেখ করেন,

“I salute Shaheed-i-Azam Udham Singh with reverence who had kissed the noose so that we may be free.”

তথ্যসূত্র

1. en.wikipedia.org/wiki/Jallianwala_Bagh_massacre
2. jallianwalabagh.ca/pages.php?id=4
3. scroll.in/article/806572/bloodbath-on-baisakhi-the-jallianwala-bagh-massacre-april-13-1919
4. indiatimes.com/news/india/8-pictures-of-jallianwala-bagh-that-will-leave-you-teary-eyed-231833.html