মানিকতলা গুপ্ত সংঘ: ইংরেজদের বিপক্ষে বিপ্লবী লড়াইয়ের রচয়িতা

ইংরেজদেরকে ভারতীয় উপমহাদেশ থেকে বিতাড়িত করতে এই দেশের মানুষ, বিশেষ করে বাঙ্গালীরা যে প্রচেষ্টা দেখিয়েছিল তা কখনোই ভুলবার নয়। ১৯৪৭ সালের দেশ বিভাগের আগে বিভিন্নভাবে তারা ইংরেজদেরকে ভীত করার চেষ্টা করেছে। তাদের প্রচেষ্টাগুলোর মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ ছিল ইংরেজদের বিপক্ষে সন্ত্রাসবাদের সূচনা করা। সন্ত্রাসবাদ শব্দটির সাথে নেতিবাচক ভাব জড়িয়ে থাকলেও এ ক্ষেত্রে ইতিবাচকভাবেই বিষয়টি নেয়া যায়, কারণ ইংরেজদের পক্ষপাতিত্ব থেকে উপমহাদেশকে বাঁচানোর জন্যে এমন ভূমিকা এদেশের বিপ্লবীদের পালন করতে হয়েছিলো।

এখানে একটা কথা বলে নেয়া গুরুত্বপূর্ণ। এ রকম বিপ্লবের সদস্যদের প্রায় সিংহভাগ কিন্তু স্বশিক্ষায় শিক্ষিত ছিল। প্রত্যেকে স্বাধীন দেশের স্বাদ এবং সেই দেশে স্বাবলম্বী হওয়ার গুরুত্বের কথা বুঝতে পেরেছিলো বিধায় দেশকে ইংরেজমুক্ত করতে সচেষ্ট হয়েছিলো।

অরবিন্দ ঘোষ; Source: Times of India

বিশিষ্ট গবেষক এবং ইতিহাসবিদ পিটার হিস জাতে আমেরিকান, কিন্তু গবেষণার বিষয় ভারতীয় ইতিহাস। ১৯৯২ সালে প্রকাশিত তার গবেষণামূলক প্রবন্ধ– “The Maniktala Secret Society: An Early Bengali Terrorist Group”- তে কলকাতার গুপ্ত সংঘ নিয়ে আলোচনা করেছেন। ১৯০৬-০৮ সাল পর্যন্ত এই সংঘটি তাদের কার্যকলাপ চালিয়ে যায়। ১৯০৮ সালে পুলিশের কাছে ধরা পড়ার আগে এরা বেশ কিছু আইন লঙ্ঘনকারী কার্যকলাপ করে, যেগুলোর একটিও সফল হয়নি। কিন্তু বিপ্লবের একটি নতুন দিক নির্দেশনার বীজ বপন করে দিয়েছিলো এই সংঘ। এই লেখায় খুব সংক্ষেপে এই সংঘের কার্যকলাপ নিয়ে আলোচনা করা হবে।

পিটার হিস; Source: outlook India

ধারণা করা হয়, ১৯০৫ সালে মানিকতলা গুপ্ত সমিতির উৎপত্তি হয়। ১৯০৬-০৮ সালের মধ্যে ইংরেজদের বিপক্ষে যে কয়টি অভিযানে তারা নেমেছিল, তার সবগুলোই ছিল বারিন্দ্রকুমার (বারিন) ঘোষের নেতৃত্বাধীন। “মানিকতলা গুপ্ত সমিতি” এই নামটি পিটার হিসের দেয়া। যেহেতু এই লেখাটি তার প্রবন্ধের একটি সংক্ষিপ্তরূপ, তাই এখানেও মানিকতলা নামটিই ব্যবহার করা হবে। এই সংঘটিকে বলা হয় আধুনিক ভারতীয় উপমহাদেশের প্রথম বৈপ্লবিক সংঘ, যাদের একটি রাজনৈতিক উদ্দেশ্য ছিল- “স্বাধীনতা “এবং যাদের থেকে উৎসাহিত হয়ে পরবর্তীতে আরও কয়েকটি প্রদেশে এমন সমিতি তৈরি হয় যারা দেশ স্বাধীনের জন্য কাজ করে যাচ্ছিলো। এই সমিতির সদস্যরা ছিলেন অরবিন্দ ঘোষ, বারিন ঘোষ, হেমচন্দ্র দাস, যতিন্দ্রনাথ ব্যানার্জি, ভুপেন্দ্রনাথ দত্ত প্রমুখ।

স্বদেশী আন্দোলন; Image Source: India Today

সংঘটনটির প্রস্তুতি পর্ব শুরু হয়েছিলো ১৯০২ সাল থেকে। তাদের কার্যকলাপ কতগুলো ভাগে ভাগ করা ছিল। যেমন: সদস্য নিয়োগ, অভ্যন্তরীণভাবে মতবাদ প্রচার করা, সংঘটিকে অভ্যন্তরীণভাবে সুগঠিত করা, অন্যান্য সমিতি, যেমন: কলকাতা এবং ঢাকা অনুশীলন সমিতি ইত্যাদির সাথে সম্পর্ক স্থাপন, অস্ত্র সংগ্রহ করা এবং বোমা বানানোর প্রশিক্ষণ এবং অর্থের যোগান।

অনুশীলন সমিতির লোগো; Source: Indianetzone

যতিন ব্যানার্জী এবং বারিন ঘোষ সদস্য নিয়োগের কাজটি করতো। যতিন ব্যানার্জী একটি আখড়া তৈরি করে যেখানে তরুণদেরকে লাঠি খেলা, ড্রিল, ঘোড়া চালানোর প্রশিক্ষণ ইত্যাদির নামে ডেকে আনতো এবং প্রশিক্ষণ দেয়া হতো। অপরদিকে বারিন ঘোষ বিভিন্ন জায়গায় গিয়ে সদস্য সংগ্রহের কাজটি করতো। ১৯০৮ সালে ধরা পড়ার পর পুলিশের কাছে বারিন বলে,

“After being there [Baroda, where his brother Aurobindo was posted] for a year I came back to Bengal with the idea of preaching the cause of independence as a Political Missionary. I moved about from District to District and started gymnasiums. There young men were brought together to learn physical exercises and study politics”.

বারিন ঘোষ; Image Source: aurobindo.ru

১৯০৫ সালে অনুষ্ঠিত স্বদেশী আন্দোলন তখনকার তরুণদেরকে অনেক উজ্জীবিত করে তুলেছিল। রাজনৈতিক নতুন একটি দিকের সূচনা হয়েছিলো সেদিন। প্রথম পনেরো মাসে মানিকতলা সংঘে মাত্র ২০০ জনকে নিয়োগ করা সম্ভব হয়েছিলো। কিন্তু এই আন্দোলনের পরে সদস্য সংখ্যা ৫০,০০০ এ গিয়ে পড়ে। এখানে উল্লেখ্য, বারিন ঘোষ এবং অন্যান্যরা মিলে “যুগান্তর” শুরু করে। সেখানে প্রকাশিত প্রবন্ধগুলো তরুণদের অনেক প্রভাবিত করে। ১৯০৭ সালে সেখানে প্রকাশিত রচনা “মুক্তি কোন পথে” সবার মাঝে প্রচণ্ড নাড়া দেয়। এই রচনাটি সারা ভারতবর্ষে ছড়িয়ে পড়ে। ধরা পড়ার পর এই সংগঠনের অনেকেই এই কথা স্বীকার করেন যে যুগান্তর তাদেরকে এই সংঘে যোগ দিতে উৎসাহিত করে। বীরেন্দ্রনাথ দত্ত যে ডিটেকটিভ শামসুল হককে গুপ্তহত্যার জন্য দায়ী, ধরা পড়ার পর সে বলেছিল, “On reading the Jugantar, I got a very strong wish to do brave and violent works”

হেমচন্দ্র দাস; Image Source: aurobindo.ru

মানিকতলা সংঘের সদস্যদের সবাই ছিল ভদ্র হিন্দু সম্প্রদায়ের। তাদের পুরো সংগঠনটি ছিল রাশিয়ান বিপ্লবের আদলে তৈরি।  ধরা পড়ার পর পুলিশের তল্লাশিতে যে কাগজপত্রগুলো পাওয়া যায় তাতে দেখা যায়, এই সংগঠনের বিপ্লব করার জটিল ছকগুলো আসলে রাশিয়ান মডেলের উপর ভিত্তি করে তৈরি। পরবর্তীতে উপেন ব্যানার্জী  এবং নলিনী কান্ত গুপ্ত প্রকাশ করে যে তাদের দুটি বিভাগ ছিল। একটি ছিল মিলিটারি বিভাগ যেটা সন্ত্রাস কর্মকাণ্ডে যুক্ত থাকতো এবং অপরটি ছিল সিভিল বিভাগ যেটা জনবল নিয়োগ থেকে শুরু করে অন্যান্য কাজ করতো।

অন্যান্য জায়গার সমিতিগুলোর সাথে মোটামুটি সম্পর্ক বজায় ছিল মানিকতলা সংঘের। এসব সমিতির মধ্যে অন্যতম কলকাতা অনুশীলন, যার প্রশাখা হিসেবে মানিকতলাকে মনে করে অনেকে এবং আত্মোন্নতি সমিতি যাদের সাথে সদস্য ভাগ করে নেয়া হতো। পূর্ব বাংলার ঢাকা অনুশীলনের সাথে এবং ময়মনসিংহের সাধনা সমাজের সাথেও তাদের যোগাযোগ ছিল।

অস্ত্র সংগ্রহ করা তাদের জন্য কঠিন হয়ে পড়েছিল, কারণ ১৮৭৮ সালে প্রস্তাবিত আইন অনুযায়ী সাধারণ মানুষ, বিশেষ করে যারা ভারতীয়, তাদের জন্য অস্ত্র বহন করা একদমই বেআইনি ছিল। কিন্তু একটি বৈপ্লবিক সংগঠন চালাতে হলে অস্ত্র ছাড়া কোনো গতি নেই। তাই তারা চুরি করে কিংবা বেআইনিভাবে অস্ত্র সংগ্রহ করা শুরু করে দিল। এভাবে তারা হাত বন্দুক, স্পোর্টিং রাইফেল, ডাবল ব্যারেল শট গান, রিভলভার ইত্যাদি সংগ্রহ করে ফেলল। এরই মাঝে বারিন ঘোষ বোমা বানানোর প্রতি আগ্রহী হয়ে উঠলো। বোমা বানানোর প্রশিক্ষণের জন্য হেমচন্দ্র দাস ১৯০৭ সালে ইউরোপে যায়। ১৮৬০ এবং ১৮৭০ সালে নাইট্রোগ্লিসারিন এবং জেলিগনাইট আবিষ্কারের পর বোমা ছিল ইউরোপিয়ান বিপ্লবীদের প্রধান অস্ত্র। সে প্যারিস থেকে ১৯০৮ সালে বোমা বানানোর প্রশিক্ষণ এবং একটি ৭০ পৃষ্ঠার ম্যানুয়াল নিয়ে দেশে ফেরত আসে। এরপর বেশ কিছু মিশনে বোমা বানিয়ে সেগুলো ব্যবহার করা হয়, কিন্তু খুব কম ক্ষেত্রেই সফলতা পাওয়া গিয়েছিলো। যেমন- ব্রিটিশ ম্যাজিস্ট্রেটকে মেরে ফেলার জন্য একটি পারসেল বোমা বানানো হয়। বোমাটি অত্যন্ত আধুনিক ছিল, কিন্তু ম্যাজিস্ট্রেট খাম খুলতে অপারগতা প্রকাশ করায় সে যাত্রা বোমা ফাটানো যায়নি। আবার পিকরিক এসিড দিয়ে তৈরি বোমা চন্দর নগরে এবং জেলিগনাইট দিয়ে তৈরি বোমা মজাফফরপুরে ব্যবহার করা হয়। এই ক্ষেত্রে প্রথমটি ফাটেনি, কিন্তু পরেরটি ফাটলেও এতে দুজন মহিলা মারা যায়। এর ফলে মানিকতলার বেশীরভাগ সদস্য ধরা পড়ে যায়।

যতিন্দ্রনাথ ব্যানার্জী; Image Source: aurobondo.ru

এই সংগঠনের সদস্যরা টাকা-পয়সা যোগাড় করতো লুট করে। অনেক ক্ষেত্রেই সমাজের ধনী এবং সম্মানিত ব্যক্তিদের থেকে এবং ব্যবসায়ীদের থেকেও তারা অর্থের যোগান পেত। কিন্তু এসব মানুষদের থেকে অর্থ শর্তের পরিবর্তে নেয়া হতো। অর্থাৎ তাদের জন্যও মানিকতলা সংগঠনকে গুপ্তহত্যা চালাতে হতো।

এরকম বিপ্লব আগে শুধু ইউরোপিয়ানরা করার ক্ষমতা রেখেছিলো। কিন্তু উপমহাদেশে এরকমটি এটাই প্রথম ছিল। তাই বিভিন্ন কারণে তাদের অভিযানগুলো  সফলতার মুখ দেখেনি, বরং অনেক ক্ষেত্রে নির্দোষ মানুষ মারা গিয়েছে এতে। যেমন- ১৯০৭ সালের নারায়ণগড়ে এবং ১৯০৮ সালের জানুয়ারিতে কলকাতায় যে অভিযান চালানো হয় তা পুরোপুরি ব্যর্থ হয়। ফ্রেজার নামক এক ইংরেজকে চার বার মেরে ফেলার চেষ্টা করা হলেও একবারও সফল হতে পারেনি তারা। কিন্তু এই কথা অনস্বীকার্য যে, এই সংগঠনের প্রাথমিক প্রচেষ্টাই পরবর্তীতে অন্যদেরকে বিশ্বাসী করে তোলে যে, তারা বিপ্লব করতে পারবে, তারা দেশকে স্বাধীন করতে পারবে। মানিকতলা বিপ্লবী সংঘের তৈরি করে দেয়া রূপরেখাই পরবর্তীতে অন্যদের সাহস যুগিয়েছে বিপ্লব করার।

তথ্যসূত্র:

[১] Heehs, P. (1992). The Maniktala Secret Society: An Early Bengali Terrorist Group, The Indian Economic and Social History Review, Volume: 29 issue: 3, page(s): 349-370 .

ফিচার ইমেজ: wanderlust

Related Articles