শৈল্পিক প্যারিসে চেপে রাখা এক নির্মম গণহত্যা

প্যারিস আমাদের কাছে ভালোবাসার শহর, পৃথিবীর সাংস্কৃতিক রাজধানী। প্যারিস আমাদের শেখায় কীভাবে অসংখ্য সংস্কৃতি নিজের মধ্যে ধারণ করে অন্তরীক্ষের বিশালতা ছাড়িয়ে যেতে হবে। প্যারিসের মায়াবী সন্ধ্যায় প্রিয়জনকে নিয়ে মানুষ হারিয়ে যায় অপার্থিব অনুভূতির জগতে। ‘মিডনাইট ইন প্যারিস’ সিনেমা আমাদের ঘুরতে না পারার অতৃপ্তি বাড়িয়ে দেয় বহুগুণ। প্যারিস আমাদের সামনে ছড়িয়ে দেয় ফরাসি বিপ্লবের সৌরভ, অন্যায়ের বিরুদ্ধে তেজোদ্দীপ্ত হয়ে জ্বলে ওঠা মশাল হওয়ার আহ্বান জানায়। প্যারিসের আইফেল টাওয়ার কিংবা ল্যুভর জাদুঘর আমাদের সামনে উন্মোচিত করে অজানা ইতিহাস। এতকিছুর পরও মায়াবী এই শহর গত শতকের ষাটের দিকে এমন এক নির্মম ঘটনার সাক্ষী হয়েছিল, যার ইতিহাস চেপে রাখার জন্য ফরাসি সরকারের পক্ষ থেকে সবধরনের চেষ্টা করা হয়েছে। বিপ্লবের আলোয় উদ্ভাসিত ফরাসি বিপ্লবীদের উত্তরসূরীরা এমন কাজ করে নিজেদের ইতিহাসকে কলঙ্কিত করতে মোটেও দ্বিধাবোধ করেনি সেদিন।

হডওওবপব
শহর হিসেবে প্যারিসের খ্যাতি রয়েছে পুরো বিশ্বজুড়ে; image source: austrianblog.com

স্বাধীনতা কে না চায়? আলজেরিয়ানরাও চেয়েছিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর পৃথিবীর প্রায় সব মহাদেশের উপনিবেশগুলোতে শুরু হয় স্বাধীনতা সংগ্রাম। সংগ্রামের হাওয়া বইছিল আলজেরিয়াতেও। দেশটির স্বাধীনতাকামী নেতৃত্ব বুঝতে পেরেছিল, সশস্ত্র সংগ্রাম ব্যতীত স্বাধীনতার স্বাদ কখনোই পাওয়া হবে না। তাই তারা ফরাসিদের বিরুদ্ধে অস্ত্র হাতে তুলে নেয়। ফরাসিরাও এত সহজে একটি উপনিবেশ নিজেদের হাতছাড়া করতে প্রস্তুত ছিল না। তারা নিজেদের যেটুকু সামরিক শক্তি আছে, তা দিয়েই আলজেরিয়ার স্বাধীনতাকামীদের প্রতিহত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। ফরাসিদের সাথে প্রায় আট বছরের যুদ্ধ হয় আলজেরিয়ার স্বাধীনতাকামীদের। পৃথিবীতে স্বাধীনতাকামী কোনো জাতিকে কখনোই দমিয়ে রাখা যায় না। আট বছরের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর অবশেষে আলজেরিয়ানরা স্বাধীনতা লাভ করে, ফরাসিরা লজ্জাজনক পরাজয় স্বীকার করে দেশটি থেকে তল্পিতল্পা গুটিয়ে নেয়।

িতওআপবেন
তখন আলজেরিয়ায় ফরাসি উপনিবেশের বিরুদ্ধে আন্দোলন চলছিল; image source: newstatesman.com

মূলত আলজেরিয়ায় যখন ফরাসি উপনিবেশবাদীদের পরাজয় যখন সুনিশ্চিত হয়ে গিয়েছে, তখনই প্যারিসে সেই অভিশপ্ত ঘটনার সূত্রপাত ঘটে। আলজেরিয়ায় যে দলটি স্বাধীনতা সংগ্রামের নেতৃত্ব দিচ্ছিল, সেই দলটির নাম ছিল ‘ন্যাশনাল লিবারেশন ফ্রন্ট’। তাদের অন্যতম লক্ষ্য ছিল তাদের এই ন্যায় সংগ্রাম সম্পর্কে যেন বিশ্ববাসী জানতে পারে। এতে করে ফ্রান্সের উপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি হতো। এই লক্ষ্যে তারা ফ্রান্সে ন্যাশনাল লিবারেশন ফ্রন্টের একটি শাখা স্থাপন করে, যে শাখার মূল কাজ ছিল ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসে নিয়মিত মানববন্ধন, জমায়েত, কিংবা অন্যান্য শান্তিপূর্ণ পদক্ষেপের মাধ্যমে আলজেরিয়ানদের স্বাধীনতার স্বপক্ষে জনমত গড়ে তোলা। প্যারিস যেহেতু একটি বহুজাতিক শহর, অসংখ্য সংস্কৃতি লালন করা মানুষের সম্মিলন ঘটেছে এই শহরে। তাই আলজেরিয়ার নেতারা বিশ্ববাসীকে তাদের স্বাধীনতা সংগ্রাম জানাতে এই শহরের মূল জায়গাগুলোতে শান্তিপূর্ণ কর্মসূচির পক্ষে ছিলেন। কিন্তু কে জানতো, তাদের এই শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি দিনশেষে পুলিশি নির্মমতায় অসংখ্য অংশগ্রহণকারীর প্রাণনাশের কারণ হয়ে দাঁড়াবে?

আলজেরিয়ার স্বাধীনতা সংগ্রামের অংশ হিসেবে ন্যাশনাল লিবারেশন ফ্রন্টের ডাকে যখন রাজধানী প্যারিসে শান্তিপূর্ণ মানববন্ধনের আয়োজন করা হয়, তখন ফরাসিরা বাধ সেধে বসে সেখানেও। ১৯৬১ সালের ৬ অক্টোবর ফ্রান্সে বসবাসরত আলজেরিয়ানদের উপর কারফিউ জারি করা হয়। এর পেছনে মূল কারণ ছিল- আলজেরিয়ানরা একত্রিত হয়ে যেন কোনো সমাবেশ বা মানববন্ধন করতে না পারে, সেটি নিশ্চিত করার পাশাপাশি আলজেরীয়রা তাদের কার্যক্রম পালনের চেষ্টা করলে যেন তাদের উপর বলপ্রয়োগ করার আইনগত বৈধতা থাকে, সেটিও নিশ্চিত করা। কিন্তু স্বাধীনতাকামী আলজেরীয়রা এত সহজে দমে যাবার পাত্র নয়। স্বাধীনতার প্রশ্নে তারা ছিল একাট্টা। সামান্য কারফিউ জারির ঘটনা তাদেরকে রুখে দেবে, এমনটা হওয়ার কথা নয়, হয়ওনি। অক্টোবর মাসের ১৭ তারিখে, কারফিউ জারির এগারো দিন পর প্রায় ত্রিশ হাজার আলজেরীয় কারফিউ ভেঙে প্যারিসের রাস্তায় বেরিয়ে আসে।

জচহচজচ
আলজেরীয় সমাবেশকারীদের বিরুদ্ধে হঠাৎ ফরাসি পুলিশ চড়াও হতে শুরু করে; image source: bolnews.com

১৯৩০ সালের পর থেকে ফ্রান্সে অসংখ্য আলজেরীয় ব্যক্তির আগমন ঘটে, যারা মূলত উন্নত জীবিকার আশায় দেশটিতে এসেছিলেন। কিন্তু আত্মগর্বী ফরাসিদের কাছে তারা বর্ণবৈষম্যের শিকার হন, বিভিন্নভাবে তাদেরকে ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হয়। এমনকি, যখন আলজেরিয়ার স্বাধীনতাকামী জনগণ মুক্তির লড়াইয়ের ডাক দেয়, তখন ফরাসিরা এর প্রতিশোধ নেয়ার জন্য তাদের দেশের অনেক আলজেরীয় ব্যক্তিকে কর্মক্ষেত্র থেকে বিনা কারণে ছাটাই করতে শুরু করে। তাদের উপর পুলিশি হয়রানি বাড়িয়ে দেয়া হয়। বর্ণবৈষম্যের মাত্রা বেড়ে গিয়েছিল বহুগুণ। এর ফলে তরুণ আলজেরীয়দের একটি অংশ বর্ণবৈষম্য, পুলিশি হয়রানি, কিংবা ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত হওয়ার প্রতিশোধ হিসেবে গোপনে সংগঠিত হয়। এরপর ফরাসি পুলিশের উপর ঝটিকা আক্রমণ চালাতে শুরু করে। ফ্রান্সের শ্বেতাঙ্গ আধিপত্যবাদীরা এর প্রতিক্রিয়ায় নিয়মিত আলজেরীয়দের উপর চড়াও হয়। প্যারিসের আশেপাশে উপশহরগুলোতে বসবাসরত আলজেরীয়দের অনেকটা একঘরে করে ফেলা হয়।

১৯৬২ সালের ৩০ অক্টোবর সমস্ত রাগ-দুঃখ সাথে নিয়ে প্রায় ত্রিশ হাজার আলজেরীয় কারফিউ ভেঙে প্যারিসের বিভিন্ন জায়গায় জমায়েত হতে শুরু করে। কিন্তু এবার ফরাসি পুলিশ তাদের আসল রূপ প্রদর্শন করে। নিরস্ত্র আলজেরীয়দের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে তারা। হাতে থাকা বিশেষ লাঠি দিয়ে তারা আলজেরীয়দের বেদম প্রহার করে, প্যারিসের রাজপথে পড়ে থাকা আহত আলজেরীয়রা যাতে পালাতে না পারে, সেজন্য তাদের গলা বুট দিয়ে চেপে ধরা হয়। পুলিশের বন্দুকের গুলির আঘাতে ঘটনাস্থলেই মারা যান অসংখ্য আন্দোলনকারী। পুলিশ এতটাই নির্মমতা প্রদর্শন করেছিল যে, অনেক আলজেরীয় ব্যক্তি গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছিল, পুলিশ তাদেরকে ধরে প্যারিসের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হওয়া সিন নদীতে ফেলে দেয়। তারা ডুবে মারা যান। অনেকের লাশও পরবর্তীতে পাওয়া যায়নি। শান্তিপূর্ণ কর্মসূচিতে অংশ নেয়া ত্রিশ হাজার ব্যক্তির মধ্যে চৌদ্দ হাজারকে গ্রেফতার করা হয়। গ্রেফতারকৃতদের জেলখানায় নিয়ে চালানো হয় নির্মম নির্যাতন।

হডহডজতচ
অনেক আহত আলজেরীয়কে নদীতে ফেলে দেয়া হয়েছিল; image source: dw.com

পুরো ঘটনার পেছনে কলকাঠি নাড়ছিলেন একজন ব্যক্তি– প্যারিস পুলিশের প্রধান কর্মকর্তা মরিস পাপোন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে স্বদেশের প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা করে নাৎসি জার্মানির পক্ষে ভূমিকা পালন করার পরও আশ্চর্যজনকভাবে এই মানুষটি কোনো ঝামেলা ছাড়াই আলজেরিয়ায় ফরাসি প্রশাসনের বড় পদে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। এরপর তাকে দেয়া হয়েছিল প্যারিস পুলিশের শীর্ষ পদটি। নাৎসি জার্মানির পক্ষে তিনি প্রায় দেড় হাজার ইহুদি ব্যক্তিকে কুখ্যাত গ্যাস চেম্বারে পাঠিয়েছিলেন- এমন গুরুতর অভিযোগ ছিল তার বিরুদ্ধে। এছাড়া তার বিভিন্ন সিদ্ধান্তে ফুটে উঠেছিল যে, তিনি বর্ণবাদী। আলজেরিয়ায় যখন কর্মরত ছিলেন, তখন স্থানীয় স্বাধীনতাকামীদের দমনের জন্য সবচেয়ে কঠোর পদ্ধতিগুলো অবলম্বন করতেন তিনি। কারফিউ ভেঙে যখন আলজেরীয়রা শান্তিপূর্ণ সমাবেশে অংশগ্রহণ করছিল, তখন তার নির্দেশেই পুলিশ হিংস্র রূপ ধারণ করে ঝাঁপিয়ে পড়ে আলজেরীয়দের উপর।

ব্রিটিশ ইতিহাসবিদ নিল ম্যাকমাস্টার ও জিম হাউজ গবেষণা করে দেখিয়েছেন, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর যতগুলো আন্দোলন দমন করা হয়েছে, তার মধ্যে সবচেয়ে নির্দয় উপায়ে দমন করা হয়েছিল এই শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি। গ্রেফতারকৃত অসংখ্য আলজেরীয়কে পরবর্তীতে নির্মম নির্যাতনের পর ফ্রান্স থেকে বহিষ্কার করা হয়। তাদের ফেলে আসা হয় আলজেরিয়াতে। শুধু তা-ই নয়, বহির্বিশ্বে এই গণহত্যার কথা প্রচারিত হলে ফরাসিদের ভাবমূর্তি সংকটের মুখে পড়বে, এই আশঙ্কা থেকে এই গণহত্যার ইতিহাস যেন প্রচারিত হতে না পারে, সেটি নিশ্চিতে ফরাসি সরকারের পক্ষ থেকে সবধরনের পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়। সাংবাদিকরা যেন এই গণহত্যার কোনো সংবাদ প্রকাশ না করে, সেজন্য কঠোর হুশিয়ারি দেয়া হয়। সুপরিকল্পিতভাবে ঘটনাস্থল থেকে প্রমাণ লোপাট করা হয়। সিন নদীতে অসংখ্য আহত ব্যক্তিকে ফেলে দেয়া হয়, যাদের রক্তে লাল হয়ে গিয়েছিল নদীর পানি।

১৯৬১ সালের পর থেকে পরবর্তী প্রায় চার দশক ধরে এই গণহত্যার পক্ষে ফরাসি সরকার কোনো স্বীকৃতি দেয়নি, বরং ‘ফরাসি পুলিশের আঘাতে মাত্র তিনজন আলজেরীয় মারা গিয়েছেন’ বলে সত্য ধামাচাপা দেয়ার চেষ্টা করা হচ্ছিল। ইতিহাসবিদ ও প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, সেদিন পুলিশের আক্রমণে শতাধিক আলজেরীয় মারা যান, আহত হন কয়েক হাজারের মতো। ১৯৯৮ সালে প্যারিস প্রসিকিউটরের অফিস থেকে এই গণহত্যার স্বীকৃতি দেয়া হয়। ২০১২ সালে তৎকালীন ফরাসি প্রেসিডেন্ট ফ্রাঙ্কো হল্যান্ড গণহত্যার পক্ষে স্বীকৃতি প্রদান করলেও আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো ক্ষমা প্রার্থনা করেননি। গত বছরের ১৭ অক্টোবর যখন এই গণহত্যার ষাট বছর পূর্তি হয়, তখন অনেকেই ভেবেছিলেন ফরাসি প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল ম্যাঁখো হয়তো এবার গণহত্যার স্বীকৃতি দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে ক্ষমা প্রার্থনা করবেন। কিন্তু তিনিও সাবেক প্রেসিডেন্ট হল্যান্ডের মতো কোনো আনুষ্ঠানিক ক্ষমা প্রার্থনা করেননি। অনেক সংগঠন ফরাসি সরকারের প্রতি বার বার আহ্বান জানিয়ে আসছে, যাতে আনুষ্ঠানিকভাবে ক্ষমা প্রার্থনা করা হয় ফরাসি সরকারের পক্ষ থেকে।

ইতিহাস পুরোপুরি চেপে রাখা কখনও সম্ভব নয়, প্যারিস গণহত্যার পক্ষেও এটি সম্ভব হয়নি। ফরাসি সরকার এই গণহত্যার জন্য আনুষ্ঠানিক ক্ষমা প্রার্থনা না করলেও সেদিন তাদের প্রদর্শিত নির্মমতার পরিমাণ ম্লান হবে না কখনও।

 

Related Articles