চীনের রহস্যময় ঝুলন্ত কফিন

মানুষ মারা গেলে ধর্ম, সংস্কৃতি এবং প্রচলিত প্রথাভেদে বিভিন্নভাবে তার দেহটি সৎকারের ব্যবস্থা করা হয়। যেমন মাটিতে কবর দেওয়া, আগুনে পোড়ানো, কফিনে রেখে ভূগর্ভস্থ করা ইত্যাদি। আবার বিভিন্ন জাতিভেদে এই সৎকার ব্যবস্থাতেও অনেক ভিন্নতা দেখা যায়। যুগে যুগে প্রাচীন অনেক জাতি বিভিন্ন ও অদ্ভুতভাবে তাদের নিজেদের মৃতদেহগুলো সৎকার করতো। যেমন চীনের দক্ষিণাঞ্চলের কিছু পার্বত্য এলাকায় ঝুলন্ত কফিন দেখতে পাওয়া যায়। ধারণা করা হয়,  প্রায় ৩,০০০ বছরের পুরনো। প্রাচীন ‘বো’ জাতি তাদের নিজেদের মৃতদেহ এভাবে কফিনে পুরে খাড়া পর্বতের গা জুড়ে ঝুলিয়ে রাখতো বলে ধারণা করা হয়। আসুন আজ এ সম্পর্কে বিস্তারিত জানা যাক।

ইতিহাস

চীনের দক্ষিণাঞ্চলে রয়েছে সবুজে ঘেরা বন, নদী এবং প্রচুর পাহাড়-পর্বত। এই অঞ্চলেই রয়েছে চীনের বহু প্রাচীন রহস্যগুলোর একটি। তা হলো ইয়াংৎজী নদীর অববাহিকায় অবস্থিত পর্বতগুলোর সাথে থাকা ঝুলন্ত কফিন। ইতিহাসবিদগণ ধারণা করেন, এই অদ্ভুত গোরস্থানটি আসলে বো জাতিদের। তারা প্রায় ৩,০০০ বছর পূর্বে এভাবে নিজেদের সঙ্গী-সাথীদের সৎকার করার প্রথাটি চালু করেছিলো।

ঝুলন্ত কফিন; Source: giaoducthoidai.vn

অদ্ভুত ব্যাপার হলো, এই কফিনগুলো পর্বতের একদম খাড়া গা জুড়ে লাগিয়ে রাখা এবং সেগুলো ভূমি থেকে কমপক্ষে প্রায় ১৩০ মিটার উঁচুতে। যুগ যুগ ধরে ইতিহাসবিদগণ, সাহিত্যিকরা এই ঝুলন্ত কফিনের রহস্য সমাধানের চেষ্টা করে যাচ্ছেন। কেন বো জাতি মৃতদেহগুলো এমন অদ্ভুতভাবে পাহাড়ে ঝুলিয়ে রাখতো এবং কী করে তারা এমন খাড়া এবং উঁচু স্থানে কফিনগুলো তুলতো, তা আজও সকলের কাছে রহস্য।

চীনে ঝুলন্ত কফিনের সবচেয়ে পুরনো যে ইতিহাস পাওয়া যায়, তা হলো ফুজিয়ান প্রদেশে, যা প্রায় এখন থেকে ৩,০০০ বছরেরও আগের ঘটনা। সেখান থেকেই চীনের দক্ষিণাঞ্চলে এই রীতিটি ছড়িয়ে পড়ে। বিশেষ করে হুবেই, সিচুয়ান এবং ইউনান প্রদেশে এটি প্রচলিত হয়ে যায়। তবে ইতিহাসবিদগণ মনে করেন, বো জাতিই এই কফিনগুলো তৈরি করেছিলো। কারণ কফিনগুলোর যে সময়ে তৈরি করা হয়েছে, সে সময়টিতেই বো জাতির আবির্ভাব হয়েছিলো। পাশাপাশি মিং রাজবংশের শেষের দিক থেকে এই ঝুলন্ত কফিনের প্রথাটি এবং বো জাতি উভয়ের ব্যাপারেই ইতিহাসে আর কোনো নথি পাওয়া যায় না। অনেকে ধারণা করেন, বোদের এমন হঠাৎ করে হারিয়ে যাওয়ার পেছনে মিং রাজবংশই দায়ী। তাদের মতে, মিং-রাই আসলে বো জাতিদের সকলকে হত্যা করেছিলো। তবে বো জাতি আসলে কোথা থেকে এসেছিলো এবং তাদের শেষ পরিণতি কী হয়েছে, তা নিয়ে আজও গবেষণা করা হয়।

কিছু ঝুলন্ত কফিন; Source: historywonders.ir

এখন প্রশ্ন জাগতে পারে কেন বো জাতি তাদের মৃতদেহগুলো মূলত মানুষের বসবাসের স্থানগুলো বাদ দিয়ে, নদীকে সামনে রেখে পাহাড়ের গায়ে কফিনে করে ঝুলিয়ে রাখতো? এর পেছনে মূল কারণ ছিল প্রাচীন সেই জাতিগুলোর নিজস্ব পারলৌকিক বিশ্বাস এবং ধ্যানধারণা। চলুন কিছু ধারণা সম্পর্কে আলোচনা করা যাক।

মাতা-পিতার প্রতি কর্তব্য

পরিবারের সদস্যদের প্রতি আনুগত্য এবং গভীর ভালোবাসা সবসময়েই এশিয়ান সংস্কৃতির একটি অন্যতম বিষয়। প্রাচীনকাল থেকেই এশিয়ার প্রত্যেকটি অঞ্চলে, প্রত্যেক জাতির মধ্যে মাতাপিতাকে শ্রদ্ধা এবং ভালোবাসার সর্বোচ্চ আসনটি দেওয়া হয়। পাশাপাশি হাজার বছর পূর্বে এশিয়ার অনেক স্থানে নিজেদের পূর্বপুরুষদের পূজার রীতিও প্রচলিত ছিল। ঐতিহাসিকভাবেই চাইনিজ লোকেরা তাদের মৃত আপনজনকে নিজেদের কাছে রাখার সিদ্ধান্তই নিয়েছিলো যাতে তারা তাদের প্রিয় মানুষদের অবশিষ্টাংশের যথাযথ পরিচর্যা করতে পারে এবং শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা জানাতে পারে। তারা বিশ্বাস করতো, এভাবে তারা তাদের মৃত আপনজনদের আত্মাকেও খুশি করতে পারতো। তারা ধারণা করতো, একটি সন্তুষ্ট এবং সুখী আত্মা খুব কমই দুনিয়ায় ফিরে এসে জীবিতদের হানা দেয়।

ফিলিপাইনের এরকম কিছু ঝুলন্ত কফিন; Source: 4tololo.ru

কিন্তু বো জাতি ছিল আলাদা। তারা তাদের প্রিয় আপনজনদের মৃতদেহ দুর্গম পরিবেশে রেখে দিতো। ধারণা করা হয়, বো-রা বিশ্বাস করতো, যত উপরে একজনকে রাখা হবে তত তার প্রতি মর্যাদা ও সম্মান দেখানো হবে। এতে করে মৃতদের আত্মাও খুশি হবে। আর একজন যদি তার পূর্বপুরুষদের আত্মাকে খুশি করাতে পারে, তাহলে সেই আত্মাগুলোর আশীর্বাদও পুরোপুরি বর্ষিত হবে তার উপর।

স্বর্গের কাছাকাছি

ইউনান প্রদেশের জাদুঘরের গবেষক গুয়ো জিংয়ের মতে,

“প্রাচীনকালে অনেক মানুষ বিশ্বাস করতো যে, স্বর্গীয় আত্মারা প্রকৃতিতেই বসবাস করে; যেমন নদী, পাহাড় এবং পাথুরে এলাকায়। পাহাড়ের চূড়া এবং উঁচু স্থানগুলোকেও ধরা হতো এমন পবিত্র এলাকা, যেগুলো স্বর্গের একদম কাছাকাছি।”

তিনি আরো বলেন, বো জাতি এই পাহাড়ের ধারগুলো স্বর্গে প্রবেশের রাস্তা হিসেবে বিশ্বাস করতো। যেখানে কফিনগুলো পরকালের সেতু হিসেবে কাজ করতো।

মৃতদেহগুলোর উন্নত সংরক্ষণ ব্যবস্থা

আরেকটি তত্ত্ব থেকে উপলব্ধি করা যায়, বো জাতির মৃতদেহগুলো এমন উঁচু জায়গায় রাখার পেছনে একটি প্রায়োগিক ব্যাখ্যাও রয়েছে, যা তাদের পারলৌকিক বিশ্বাসের সাথেও সঙ্গতিপূর্ণ। তা তাদের প্রিয়জনদের দেহ সবচাইতে উপযুক্ত এবং ভালো স্থানে সংরক্ষণ করে রাখা, যেখানে দেহগুলোর সবচেয়ে কম ক্ষয় হবে এবং যেখানে তাদেরকে কেউ কোনোভাবে বিরক্ত করবে না! তাদের বিশ্বাস ছিল, এভাবে পরকালে একটি আত্মা অমরত্ব লাভ করে। তাই মৃতদেহগুলো প্রাণী এবং মানুষের ধরাছোঁয়ার বাইরে রাখাটা বেশ গুরুত্বপূর্ণ ছিল তাদের কাছে, যাতে কেউ কফিনগুলোর কোনো ক্ষতি এবং চুরি না করে।

উদ্ধার করা একটি কফিনের ভেতরে থাকা কঙ্কাল; Source: vilagvege2012.hu

ঝুলন্ত কফিনগুলো রাখা হতো পাহাড়ের গা ঘেঁষে এবং নদীর সামনে, যেখানে প্রচুর বাতাস, শুষ্কতা এবং ছায়া ছিল। যার ফলে মৃতদেহগুলোতে খুবই কম গতিতে পঁচন ধরতো। অন্যদিকে মাটিতে রাখলে বা কবরস্থ করলে জল এবং আর্দ্র পরিবেশে দেহগুলোতে খুব দ্রুতই পচন ধরতো। এজন্য বো জাতি মাটির কাছাকাছি স্থান এড়িয়ে উঁচুতে কফিন ঝুলিয়ে রাখতেই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলো বলে ধারণা করা হয়।

কফিনগুলোর প্রস্তুতকরণ

কফিনগুলো তৈরি করতে এবং তা পাহাড়ের গা ঘেঁষে উঁচুতে ঝোলাতে অনেক যত্ন, অসুবিধা এবং ঝুঁকি নিতে হতো। তাই ধারণা করা হয়, এই ঝুলন্ত কফিনগুলো মূলত সমাজের উচ্চপদস্থ, ধনী এবং সম্মানীয় ব্যক্তিদের জন্যেই প্রস্তুত করা হতো। সিচুয়ান বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক লিন শিয়াং ১৯৭৯ সালে দা’নিং নদীর সামনের এমন একটি চূড়া থেকে একবার একটি কফিন উদ্ধার করেছিলেন। কফিনটি লম্বায় ছিল প্রায় ৭ ফুট। তিনি কফিনে ব্যবহার করা কাঠ পরীক্ষানিরীক্ষা করে দেখলেন। সেটি ছিল ‘নানমু’ নামক বিশেষ একটি গাছের কাঠ। এই গাছটি প্রায় ৪০ মিটার পর্যন্ত লম্বা হয়। গাছটির কাঠ হয় বেশ পুরু এবং বিশেষভাবে পচন রোধে সহায়ক।

একটি নানমু গাছের কাণ্ড; Source: globaltimes.cn

প্রাচীন কফিন প্রস্তুতকারীরা গাছটি প্রথমে মাঝখান দিয়ে কেটে অর্ধেক করতো। তারপর গাছের মাঝখান থেকে কাঠ খুঁড়ে তুলে ফেলতো। এভাবে তারা গাছটির একপাশের অংশ মৃতদেহ রাখার ঘর হিসেবে এবং অপর অংশ কফিনের ডালা হিসেবে ব্যবহার করতো।

কফিন ঝোলানো

এখন পর্যন্ত পাহাড়ের গায়ে মোট তিনভাবে কফিনগুলো ঝুলানো অবস্থায় দেখতে পাওয়া গিয়েছে। সেগুলো হলো- পাহাড়ের গায়ে গেঁথে থাকা কাঠের বিমের উপর, প্রাকৃতিকভাবে তৈরি গুহা ও ফাটলে এবং পাহাড়ের পাথুরে স্তরে।

কাঠের বিমের উপর রাখা কফিন; Source: ibtimes.co.uk

কিছু কিছু কফিন মাটি থেকে ৪০০ ফুট উপরেও রয়েছে। কফিন এবং মৃতদেহ মিলে মোট ওজন কয়েকশ পাউন্ডের কাছাকাছি হয়। তাই ঠিক কীভাবে এই কফিনগুলো এমন উঁচু এবং দুর্গম স্থানে নিয়ে গিয়ে স্থাপন করা হয়েছে তা আজও বেশ বিতর্কিত এবং রহস্যময় একটি বিষয়। তবে তিনটি উপায়ের কথা বলা যেতে পারে। সেগুলো হলো:

১) রাস্তা তৈরি

একটি তত্ত্ব থেকে বলা হয়, বো জাতি পাহাড়ে ওঠার জন্য পাহাড়ের গা দিয়ে মাটির র‍্যাম্প তৈরি করেছিলো, যেগুলো পাহাড়ে উঠার ক্ষেত্রে পায়ে হাঁটা পথ হিসেবে কাজ করতো। তারপর কফিনগুলো সেই পথ ধরে বহন করে উপরে নিয়ে যাওয়া হতো। কিন্তু অনেকেই এই তত্ত্বকে অসঙ্গত বলে বাতিল করে দেন। তাদের মতে এ ধরনের র‍্যাম্প তৈরি করতে যে জনবলের দরকার ছিল, সে তুলনায় বো ছিল ক্ষুদ্র একটি জাতি।

২) মঞ্চ তৈরি

পাহাড়ের চিড়ে একটি কফিন; Source: historicmysteries.com

আরেক দল গবেষক মনে করেন, উঁচু পাহাড়ে কফিনগুলো নিয়ে যেতে সেই পাহাড়ের গা ঘেঁষে, পাহারের খাঁজ, স্তর এবং চিড়ে তারা বিশেষ কাঠ বা বাঁশ ঠেকিয়ে আরোহণ করার বিশেষ মঞ্চ বানিয়েছিলো। মঞ্চগুলো তারা ধীরে ধীরে নিচ থেকে বানিয়ে উপরের দিকে নিয়ে গিয়েছিলো। তবে এই ধারণারও কোনো উপযুক্ত প্রমাণ পাওয়া যায় না।

৩) দড়ির মাধ্যমে

কফিনগুলো পাহাড়ে ঝুলিয়ে রাখতে দড়ির ব্যবহার করা হয়েছিলো বলে অধিকাংশের ধারণা। আর এই ধারণা সঠিক হবার বেশ প্রমাণও পাওয়া গিয়েছে। কারণ বিভিন্ন গুহায় দড়ির সন্ধান পাওয়া গিয়েছে। আরো কিছু দড়ির দেখা পাওয়া গিয়েছে কিছু গুহায়, যেগুলোতে এখনো যাওয়া সম্ভব হয়নি। ধারণা করা হয়, বো-রা পাহাড়ের নির্দিষ্ট কোনো স্থানে কফিনগুলো স্থাপন করতে পাহাড়ের ঠিক উপর থেকে দড়ি ব্যবহার করেছিলো। অর্থাৎ তারা দড়ি দিয়ে কফিনগুলো পাহাড়ের নিচের দিকে নামাতো। কিন্তু অন্যরা মনে করেন, বো জাতি আসলে মাটি থেকেই কফিনগুলো উপরের দিকে দড়ি দিয়ে টেনে তুলতো।

গুহায় পাওয়া দড়ি; Source: theunknownmystries.com

এসব ধারণা প্রচলিত থাকলেও আসলে ঠিক কীভাবে তারা কফিনগুলো পাহাড়ের গায়ে স্থাপন করতো, তার মূল রহস্য আজও অজানা। তবে বো জাতির এই অদ্ভুত সংস্কৃতি আজও বেশ আলোচ্য বিষয়। যদিও তাদের এই সংস্কৃতি যেমন দ্রুত প্রচলিত হয়েছিলো, তেমনভাবে দ্রুতই হারিয়ে গিয়েছে।

বো জাতির বিলুপ্তির ৪০০ বছরের মধ্যেই এই প্রথা হারিয়ে যায় সবখান থেকে। তারপর থেকে অনেক ঝুলন্ত কফিনের কাছেই পৌঁছানো সম্ভব হয়েছে; অনেক কফিন আবার চুরিও হয়ে গিয়েছে। তবে কিছু গুহা এবং ফাটলে অনেক কফিন আজও বেশ অক্ষত অবস্থায় রয়েছে। ধারণা করা হয়, সেই কফিনগুলোতে অনেক মূল্যবান ধনদৌলতও রয়েছে। তবে স্থানগুলো খুবই দুর্গম এবং বিপদজনক হওয়ায় সেই কফিনগুলো আজও নির্বিঘ্নে রয়েছে। তাই আপনজনদের মতে, হয়তো তারা বেশ শান্তিতেই রয়েছে, কারণ তাদের পরিবার তাদেরকে এমন একটি স্থানে চিরনিদ্রায় শায়িত করেছে, যেখানে কেউই তাদেরকে আর বিরক্ত করতে পারছে না।

ফিচার ইমেজ: Cookiesound.com

Related Articles