অপারেশন ব্যানার: উত্তর আয়ারল্যান্ডে ব্রিটিশ সামরিক বাহিনীর সুদীর্ঘ উপস্থিতি

ইউরোপ মহাদেশের উত্তর-পশ্চিমে দিকে আটলান্টিক মহাসাগরের তীরে আয়ারল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জ অবস্থিত। ইংল্যান্ডের মধ্যযুগীয় শাসকগোষ্ঠী একত্রে অ্যাংলো-নর্মান হিসেবে পরিচিত। অ্যাংলো-নর্মান বাহিনী দ্বাদশ শতাব্দীর শেষদিকে আয়ারল্যান্ডের উপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠায় আক্রমণের সূচনা করে। এভাবে পর্যায়ক্রমে আয়ারল্যান্ডের উপর ইংরেজদের অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়।

টিউডর রাজবংশের রাজত্বকালে ১৫৪০ এর দশকে আয়ারল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জ ইংল্যান্ডের একটি নির্ভরশীল রাজ্যে পরিণত হয়। এরপর ১৫৪২ সালে ইংল্যান্ডের টিউডর রাজবংশের রাজা অষ্টম হেনরি আয়ারল্যান্ডের রাজা হিসেবে অধিষ্ঠিত হন। দীর্ঘ সময় ধরে কিংডম অফ ইংল্যান্ড অ্যান্ড ওয়েলসের সাথে কিংডম অফ স্কটল্যান্ড যুক্ত হয়ে গঠিত হওয়া দ্য কিংডম অফ গ্রেট ব্রিটেন থেকে কিংডম অফ আয়ারল্যান্ড পৃথক রাজ্য হিসেবে টিকে থাকে। তবে ১৫৪২ সাল থেকে ইংল্যান্ডের রাজাই কার্যত আয়ারল্যান্ডের রাজা হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছিলেন।

রাজা তৃতীয় জর্জের রাজত্বকালে একটি আইনের মাধ্যমে ১৮০১ সালের ১ জানুয়ারি দ্য কিংডম অফ গ্রেট ব্রিটেন এবং কিংডম অফ আয়ারল্যান্ড একত্রে মিলিত হয়ে ইউনাইটেড কিংডম অফ গ্রেট ব্রিটেন অ্যান্ড আয়ারল্যান্ড গঠিত হয়। তবে সাংস্কৃতিক পার্থক্য, বৈষম্য নীতিসহ বিভিন্ন কারণে আয়ারল্যান্ডের সাধারণ জনগণের সাথে ইংরেজ শাসকদের আস্থার সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হয়নি।

ব্রিটিশ সরকারের কার্যকর ব্যবস্থার অভাবে এবং আলুর লেট ব্লাইট রোগের কারণে আয়ারল্যান্ডে মহা দুর্ভিক্ষ ছড়িয়ে পড়েছিল; image source: London News

উনবিংশ শতাব্দীর চল্লিশের দশকে আলুর লেট ব্লাইট রোগের কারণে আয়ারল্যান্ডে ব্যাপক ফসলহানির ঘটনা ঘটে। ১৮৪৫ সালে অঞ্চলটিতে ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ শুরু হয়। এই সময় অনাহারে এবং বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হয়ে প্রায় ১০ লক্ষ আইরিশ মৃত্যুবরণ করেন এবং প্রায় ২০ লক্ষ মানুষ দেশত্যাগ করতে বাধ্য হন। লেট ব্লাইট রোগের কারণে টানা কয়েক বছর ধরে আয়ারল্যান্ডে আলুর ফলন ব্যাহত হলেও সেই সময় ব্রিটিশ পার্লামেন্ট খাদ্য আমদানিতে চালু থাকা নিষেধাজ্ঞা তুলে নিতে দেরি করে। ফলে ব্রিটিশ প্রশাসনের চরম অব্যবস্থাপনার কারণে ১৮৫২ সাল পর্যন্ত চলা দুর্ভিক্ষে বিপুল সংখ্যক আইরিশ মৃত্যুবরণ করেন।

এই মহা দুর্ভিক্ষ আয়ারল্যান্ডের ইতিহাসে একটি কালো অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত। বিট্রিশ শাসনের বিরুদ্ধে এবং অঞ্চলটির মানুষের আত্মনিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে ‘আইরিশ রিপাবলিকান আর্মি’ প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৯১৬ সালের ২৪ থেকে ২৯ এপ্রিল পর্যন্ত আয়ারল্যান্ডে ব্রিটিশ শাসন বিরোধী সক্রিয় অসন্তোষ শুরু হয়, যা ‘ইস্টার রাইজিং’ নামে পরিচিত; একইসময় আইরিশ প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠার রূপরেখা ঘোষিত হয়। ১৯১৮ সালের ১৪ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত যুক্তরাজ্যের সাধারণ নির্বাচনে পার্লামেন্টের নিম্নকক্ষ হাউস অফ কমন্সের ৭০৭টি আসনের মধ্যে ১০৫টি আসন আয়ারল্যান্ডের জন্য বরাদ্দ করা ছিল। এই ১০৫টি আসনের মধ্যে আয়ারল্যান্ডের স্বাধীনতাকামী রাজনৈতিক দল ‘সিন ফেইন’ ৭৩টি আসনে বিজয়ী হয়।

সিন ফেইন নির্বাচনী ইশতেহারে স্বাধীন আইরিশ প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি দিয়ে নির্বাচনে চমক দেখায়। তবে উলস্টারসহ আয়ারল্যান্ডের উত্তরাঞ্চলের এলাকায় যুক্তরাজ্যের অখণ্ডতার প্রতি প্রতিশ্রুতিশীল ইউনিয়নিস্ট পার্টি নির্বাচনে সফলতা দেখায়। ১৯১৯ সালের ২১ জানুয়ারি সিন ফেইন দলের নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরা পার্লামেন্টের নিম্নকক্ষ হাউস অফ কমন্স এ যোগদান না করে আয়ারল্যান্ডে একটি বিপ্লবী সংসদ প্রতিষ্ঠিত করে আয়ারল্যান্ডের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। তবে আয়ারল্যান্ডের উত্তরাঞ্চলীয় কয়েকটি এলাকার অধিকাংশ জনগণ অখণ্ড যুক্তরাজ্যের সাথে অন্তর্ভুক্ত থাকার ব্যাপারে একমত প্রকাশ করে। একপর্যায়ে ব্রিটিশ প্রশাসন একটি আইনের মাধ্যমে ১৯২১ সালের ৩ মে আয়ারল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জকে উত্তরাঞ্চলীয় এবং দক্ষিণাঞ্চলীয় দুটো ভাগে বিভক্ত করে। দ্বীপপুঞ্জটির ৩২টি প্রাচীন কাউন্টি বা এলাকার মধ্যে ২৬টি কাউন্টি সাউদার্ন আয়ারল্যান্ড এবং বাকি ৬টি কাউন্টি নর্দান আয়ারল্যান্ড হিসেবে পরিচিত অর্জন করে।

বৈশ্বিক মানচিত্রে আয়ারল্যান্ড প্রজাতন্ত্র এবং উত্তর আয়ারল্যান্ডের অবস্থান; image source: everycrsreport.com

স্বাধীনতা ঘোষণার দিন থেকে ১৯২১ সালের ১১ জুলাই পর্যন্ত ব্রিটিশ বাহিনীর সাথে আইরিশ রিপাবলিকান আর্মির সশস্ত্র গেরিলা লড়াইয়ের ঘটনা ঘটে। এরপর দু’পক্ষ আলোচনার মাধ্যমে সেই বছরের ৬ ডিসেম্বর একটি চুক্তি স্বাক্ষর করে; যা অ্যাংলো-আইরিশ চুক্তি নামে পরিচিত। এই চুক্তিটি স্বাক্ষরের মাধ্যমে সাউদার্ন আয়ারল্যান্ড আনুষ্ঠানিকভাবে ‘আইরিশ ফ্রি স্টেট’ নামে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। ১৯৪৯ সালের ১৮ এপ্রিল আনুষ্ঠানিকভাবে ‘আইরিশ ফ্রি স্টেট’ এর নামকরণ ‘আয়ারল্যান্ড প্রজাতন্ত্র’ করা হয়। ১৯২২ সালের ২৫ অক্টোবর আইরিশ ফ্রি স্টেট কর্তৃক প্রণীত সংবিধান অনুযায়ী উত্তর আয়ারল্যান্ড অঞ্চলকে ইউনাইটেড কিংডম অফ গ্রেট ব্রিটেনের সাথে অঙ্গীভূত হওয়ার সুযোগ প্রদান করা হয়।

১৯২২ সালের ৭ ডিসেম্বর উত্তর আয়ারল্যান্ড অঞ্চলের স্থানীয় রাজনৈতিক নেতারা আইরিশ ফ্রি স্টেট থেকে পুরোপুরি পৃথক হয়ে ইউনাইটেড কিংডম অফ গ্রেট ব্রিটেনের সাথে যুক্ত হয়, যা একত্রে ইউনাইটেড কিংডম অফ গ্রেট ব্রিটেন অ্যান্ড নর্দার্ন আয়ারল্যান্ড নামে পরিচিত। কিন্তু উত্তর আয়ারল্যান্ডের জনগণের একাংশ এই সিদ্ধান্ত মেনে নিতে পারেনি। ফলে এরপরেও উত্তর আয়ারল্যান্ড অঞ্চলে স্থিতিশীলতা ফিরে আসেনি। উত্তর আয়ারল্যান্ডের জনগণ কার্যত দুটো অংশে বিভক্ত হয়ে পড়ে:

  • প্রথমত, ইউনিয়নিস্ট যারা উত্তর আয়ারল্যান্ডকে যুক্তরাজ্যের অংশ হিসেবে বজায় রাখার পক্ষে অবস্থান নিয়েছিলেন। ইউনিয়নিস্টদের অধিকাংশই খ্রিস্টধর্মের প্রোটেস্ট্যান্ট মতবাদের অনুসারী ছিলেন।
  • দ্বিতীয়ত, ন্যাশনালিস্ট বা জাতীয়তাবাদী যারা উত্তর আয়ারল্যান্ডকে যুক্তরাজ্য থেকে পৃথক করে আয়ারল্যান্ড প্রজাতন্ত্রের সাথে যুক্ত করার দাবি জানিয়েছিলেন। অন্যদিকে, অধিকাংশ ন্যাশনালিস্ট খ্রিস্টধর্মের ক্যাথলিক মতবাদ অনুসরণ করতেন।

যুক্তরাজ্যের সাথে যুক্ত হওয়ার সময় উত্তর আয়ারল্যান্ডের স্থানীয় প্রশাসনে ইউনিয়নিস্টদের প্রভাব বেশি ছিল। তৎকালীন সময়ে উত্তর আয়ারল্যান্ডে খ্রিস্টধর্মের ক্যাথলিক মতবাদের অনুসারীদের চেয়ে প্রোটেস্ট্যান্ট মতবাদের অনুসারীদের সংখ্যা বেশি ছিল। অর্থাৎ, উত্তর আয়ারল্যান্ডের জনগণের মধ্যে ধর্মীয় সংস্কৃতিগত বৈচিত্র্য ছিল। ক্রমান্বয়ে, উত্তর আয়ারল্যান্ডে ক্যাথলিক মতবাদের অনুসারীদের জন্য বাসস্থান এবং চাকরির সুযোগ সংকুচিত হতে শুরু হয় এবং তারা এর প্রতিবাদ জানান।

১৯৬৯ সালে লন্ডনডারি শহরে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সাথে দাঙ্গাকারীদের সংঘর্ষ; Image Courtesy: PA Images / Contributor

এই দুটো পক্ষের মধ্যে পারস্পরিক বিরোধ ১৯৬০-এর দশকে এসে তীব্র সহিংসতার রূপধারণ করে। যদিও এই সহিংসতার মূল কারণ আন্তঃসম্প্রদায়গত বিরোধ ছিল না এবং প্রায় তিন দশকেও বেশি সময় ধরে এই অচলাবস্থা বিরাজমান ছিল। ১৯৬৯ সালের ১২-১৬ আগস্ট উত্তর আয়ারল্যান্ডের বিভিন্ন শহরে দুটো পক্ষের মধ্যে তীব্র সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে। ন্যাশনালিস্টদের পক্ষে মিলিশিয়া বাহিনী হিসেবে ‘প্রভিশনাল আইরিশ রিপাবলিকান আর্মি’ এবং ‘দ্য আইরিশ ন্যাশনাল লিবারেশন আর্মি’ অংশগ্রহণ করে। অপরপক্ষে, ইউনিয়নিস্টদের পক্ষে মিলিশিয়া বাহিনী হিসেবে ‘উলস্টার ভলান্টিয়ার ফোর্স’ এবং ‘উলস্টার ডিফেন্স অ্যাসোসিয়েশন’ অংশগ্রহণ করে।

উত্তর আয়ারল্যান্ডের বেলফাস্ট শহরে টহলরত ব্রিটিশ সামরিক বাহিনীর সদস্যরা; image Courtesy: Gerry Collins

এই সংঘাত শুধু ন্যাশনালিস্ট এবং ইউনিয়নিস্ট মিলিশিয়া বাহিনীগুলোর মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। সেই সময় ইউনিয়নিস্টদের সহায়তা করার জন্য সেখানে ব্রিটিশ নিরাপত্তা বাহিনী মোতায়েন করা হয়। ১৯৬৯ সালের ১৪ আগস্ট প্রথম দফায় ব্রিটিশ সামরিক বাহিনীর প্রায় ৩০০ জন সদস্য উত্তর আয়ারল্যান্ডের লন্ডনডারি শহরে পৌঁছে। ব্রিটিশ সামরিক বাহিনী উত্তর আয়ারল্যান্ডে পরিচালিত সামরিক অভিযানের সাংকেতিক নামকরণ করেছিল ‘অপারেশন ব্যানার’। ১৯৭২ সালের ৩০ জানুয়ারি লন্ডনডারি শহরে ন্যাশনালিস্ট সমর্থকদের একটি শান্তিপূর্ণ সমাবেশে ব্রিটিশ সামরিক বাহিনীর অতর্কিত গুলিবর্ষণের ঘটনায় ১৪ জন ব্যক্তি নিহত হন। বিশ্বজুড়ে আলোচিত এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের ঘটনাটি উত্তর আয়ারল্যান্ডের ইতিহাসে ‘Bloody Sunday’ হিসেবে পরিচিত।

প্রভিশনাল আইরিশ রিপাবলিকান আর্মি গ্রান্ড ব্রাইটন হোটেলে মার্গারেট থ্যাচারকে হত্যার উদ্দেশ্যে বোমা হামলা চালায়; image source: BBC

অন্যদিকে, আইরিশ নিরাপত্তা বাহিনী ন্যাশনালিস্ট মিলিশিয়া বাহিনীসমূহকে সহযোগিতা করে। ১৯৮৪ সালের ১২ অক্টোবর প্রভিশনাল আইরিশ রিপাবলিকান আর্মি ব্রাইটন শহরের একটি হোটেলে তৎকালীন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী মার্গারেট থ্যাচারকে হত্যার উদ্দেশ্যে বোমা হামলা চালায়। সেই হামলায় মার্গারেট থ্যাচার প্রাণে রক্ষা পেলেও তৎকালীন ক্ষমতাসীন কনজারভেটিভ পার্টির পাঁচজন সদস্য মৃত্যুবরণ করেন। ১৯৯১ সালের ৭ ফেব্রুয়ারি প্রভিশনাল আইরিশ রিপাবলিকান আর্মি তৎকালীন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী জন মেজরকে হত্যার উদ্দেশ্য ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ১০ নম্বর ডাউনিং স্ট্রিটে মর্টার শেল হামলা চালায়। এছাড়াও সেই সময় যুক্তরাজ্যের বিভিন্ন স্থানে হামলার সাথে প্রভিশনাল আইরিশ রিপাবলিকান আর্মি’র মিলিশিয়াদের জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে। তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে চলা এই সংঘাতে প্রায় সাড়ে তিন হাজার মানুষের প্রাণহানির ঘটনা ঘটে।

সংঘাতরত বিভিন্ন পক্ষের মধ্যে ১৯৯৪ সাল থেকে শান্তি আলোচনা শুরু হয়। কয়েক দফা যুদ্ধবিরতি এবং যুদ্ধবিরতি ভঙ্গ করে সংঘাতে জড়িয়ে পড়ার পর সংকট সমাধানে ইউনিয়নিস্ট এবং ন্যাশনালিস্ট মিলিশিয়া গ্রুপগুলো একটি চুক্তি সম্পাদনে একমত হয়। এরপর ১৯৯৮ সালের ১০ এপ্রিল সাবেক মার্কিন সিনেটর জর্জ মিশেলের মধ্যস্থতায় তৎকালীন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ার এবং তৎকালীন আইরিশ প্রধানমন্ত্রী বার্টি অ্যাহার্ন উত্তর আয়ারল্যান্ডের রাজধানী বেলফাস্টে একটি চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন। খ্রিস্টধর্মের উল্লেখযোগ্য উৎসব ‘গুড ফ্রাইডে’র দিনে স্বাক্ষরিত এই চুক্তিটি ‘গুড ফ্রাইডে চুক্তি’ হিসেবে পরিচিত।

গুড ফ্রাইডে চুক্তিতে স্বাক্ষর করছেন তৎকালীন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ার এবং তৎকালীন আইরিশ প্রধানমন্ত্রী বার্টি অ্যাহার্ন; Image Courtesy: PA Photos / Topfoto

এই চুক্তিটি কার্যকর করার পূর্বে জনমত যাচাইয়ের লক্ষ্যে ১৯৯৮ সালের ২২ মে আয়ারল্যান্ড প্রজাতন্ত্র এবং উত্তর আয়ারল্যান্ডে পৃথক গণভোট অনুষ্ঠিত হয়। পৃথক গণভোটের প্রতিটিতে দুই-তৃতীয়াংশেরও বেশি সংখ্যক জনসমর্থনের পর ১৯৯৯ সালের ২ ডিসেম্বর ‘গুড ফ্রাইডে চুক্তি’ কার্যকর হয়।

উত্তর আয়ারল্যান্ডের রাজনৈতিক দলসমূহের মধ্যকার ঐক্যমত্য এবং ব্রিটিশ ও আইরিশ সরকারের মধ্যকার ঐক্যমত্যের ভিত্তিতে এই চুক্তিটি স্বাক্ষরিত হয়। এই চুক্তি অনুসারে, মিলিশিয়া বাহিনীগুলো পর্যায়ক্রমে অস্ত্রসমর্পণ করে এবং উত্তর আয়ারল্যান্ড থেকে ব্রিটিশ নিরাপত্তা বাহিনী প্রত্যাহার করা শুরু হয়। স্বাক্ষরিত চুক্তিতে সমতা, ধর্মীয় স্বাধীনতা ও মানবাধিকার নিশ্চিত করতে পক্ষগুলো ঐক্যমত্য হয় এবং ইউনিয়নিস্ট এবং ন্যাশনালিস্ট দলসমূহের সমন্বয়ে অংশীদারিত্বমূলক সরকার গঠনের কথা বলা হয়। এই চুক্তিতে উত্তর আয়ারল্যান্ডের জনগণের জন্য ‘নর্দান আয়ারল্যান্ড অ্যাসেম্বলি’ গঠনের বিষয়ে বলা হয়েছিল এবং ব্রিটিশ সরকার কর্তৃক কিছুু ক্ষমতা এই অ্যাসেম্বলির উপর অর্পণ করা হয়। ১৯৯৮ সালের ২৫ জুন এই অ্যাসেম্বলির প্রথম নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়।

১৯৯৮ সালে যৌথভাবে নোবেল শান্তি পুরস্কার বিজয়ী ডেভিড ট্রিম্বল এবং জন হিউম; image source: Matt Kavanagh/ The Irish Times

তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে চলা সংঘাত বন্ধ করে গুড ফ্রাইডে চুক্তির মাধ্যমে সংকটের শান্তিপূর্ণ সমাধানে ভূমিকা পালন করার জন্য উত্তর আয়ারল্যান্ডের সোশ্যাল ডেমোক্রেটিক অ্যান্ড লেবার পার্টির নেতা জন হিউম এবং উলস্টার ইউনিয়নিস্ট পার্টির নেতা ডেভিড ট্রিম্বল ১৯৯৮ সালে যৌথভাবে নোবেল শান্তি পুরস্কার অর্জন করেন। ২০০৭ সালের ৩১ জুলাই আনুষ্ঠানিকভাবে ব্রিটিশ নিরাপত্তা বাহিনীর অবস্থানরত সকল সদস্যকে উত্তর আয়ারল্যান্ড থেকে প্রত্যাহার করা হয়। টানা প্রায় ৩৮ বছর ব্যাপী চলা এই সামরিক উপস্থিতি ‘অপারেশন ব্যানার’ ব্রিটিশ সামরিক বাহিনীর ইতিহাসে সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী সামরিক উপস্থিতগুলোর মধ্যে অন্যতম।

Related Articles