২২ এপ্রিল, ২০০৪। ভয়াবহ একটি বিস্ফোরণে কেঁপে ওঠে উত্তর কোরিয়া। বিস্ফোরণের ফলে উত্তর কোরিয়ায় প্রায় ছোটখাট ভূমিকম্পই ঘটে গিয়েছিল বলা যায়। কয়েক হাজার মানুষ ও শত শত ঘরবাড়ি ধ্বংস হলেও উত্তর কোরিয়ার আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে বলা হয় মাত্র ৫৪ জনের মৃত্যু আর ১,২৪৯ জনের আহত হবার কথা। রেডক্রসকে সাহায্যের অনুমতি দেয়া হলেও পুরো এলাকায় উত্তর কোরিয়ার কর্মকর্তাদের আনাগোনা হতে থাকে অস্বাভাবিক রকমের। এ দুর্ঘটনার পরপরই উত্তর কোরিয়া দেশে সকল প্রকার টেলিফোন লাইন বন্ধ করে দেয়। সরকারিভাবে জানানো হয় তরল পেট্রোলিয়াম বহনকারী দুটি ট্রেনের সংঘর্ষের ফলে এই বিস্ফোরণ ঘটেছে। কিন্তু উত্তর কোরিয়ার এই ট্রেন দুর্ঘটনাটি জন্ম দেয় এক অবিশ্বাস্য অভিযানের, অপারেশন অর্চার্ড।

একনায়কতন্ত্রের উত্তর কোরিয়ার তৎকালীন নেতা কিম জং ইলকে হত্যা করার চেষ্টা সবসময়ই পশ্চিমারা করতে থাকে বলে উত্তর কোরিয়া দাবী করে থাকে। ২০০৪ সালের সেই দুর্ঘটনার দিন, দুর্ঘটনার কয়েক ঘণ্টা আগে কিম জং ইল একই রাস্তা দিয়ে চীন থেকে দেশে ফিরেছিলেন। খুব স্বাভাবিকভাবেই বিস্ফোরণের এই ঘটনাটি ইলের হত্যা চেষ্টার গুজব হিসেবে ছড়িয়ে পড়ে। তবে উত্তর কোরিয়ার সবচেয়ে বড় শত্রু তাদের প্রতিবেশী দক্ষিণ কোরিয়া এই ঘটনাকে একটি দুর্ঘটনা হিসেবেই দেখে।

উত্তর কোরিয়ায় ট্রেন দুর্ঘটনার পর বিধ্বস্ত শহর; Source: Global Security

এশিয়ার পূর্ব প্রান্তে এই দুর্ঘটনা ঘটলেও মধ্যপ্রাচ্যের দুটি দেশ এই ঘটনায় নড়েচড়ে বসে। দেশ দুটি হলো সিরিয়া ও ইসরায়েল। দুর্ঘটনার পরপরই সিরিয়া থেকে সাহায্য পাঠানো হয় উত্তর কোরিয়ার উদ্দেশ্যে। মধ্যপ্রাচ্যের সাথে উত্তর কোরিয়ার সেরকম কোনো সম্পর্ক কখনোই ছিল না। প্রতিবেশি ও শত্রুভাবাপন্ন হবার কারণে সিরিয়ার কার্যক্রমে কড়া নজর রাখত ইসরায়েল। ফলে সিরিয়ার প্রতিবেশী ইসরায়েল অবাক হয়েই নিজেদের এজেন্টদের নিয়োগ করে ঘটনার পেছনের কাহিনী জানার জন্য।

সিরিয়ার পাঠানো সাহায্য বাস্তবে কোনো সাহায্য ছিল না, বরং ছিল ট্রেন দুর্ঘটনায় নিহত সিরিয়ানদের লাশ আনার মিশন। উত্তর কোরিয়ায় সিরিয়ানরা কী করছিল সে প্রশ্ন মনে জাগা খুবই স্বাভাবিক। ইসরায়েলিদের মনেও এই প্রশ্ন জেগেছিল। ইসরায়েলিদের আরো বেশি অবাক করে দেয় যখন তারা খবর পায় পুরো এলাকায় উদ্ধারকার্যে নিয়োজিতরা বিশেষ ধরনের বায়োহ্যাজার্ড স্যুট পরে উদ্ধারকার্য পরিচালনা করছে। এ ধরনের স্যুট সাধারণত তেজস্ক্রিয়তা সংক্রান্ত দুর্ঘটনাতেই ব্যবহার হয়।

আর উদ্ধার করা মৃতদেহগুলোর মধ্যে সিরিয়ান বিজ্ঞানীদের মৃতদেহও রয়েছে। সেগুলো সিরিয়ায় নিয়ে যাবার জন্য বিশেষ ধরনের কফিন ব্যবহার করার খবর মোসাদের কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলে। বিস্ফোরণের মাত্রা আর অস্বাভাবিক উদ্ধার কার্যক্রমে ইসরায়েল শঙ্কিত হয়ে ওঠে, সিরিয়া খুব সম্ভবত উত্তর কোরিয়ার সাহায্যে পারমাণবিক বোমা বানানো শুরু করেছে!

বিস্ফোরণে বিধ্বস্ত শহর; Source: Global Security

তাৎক্ষণিকভাবে মোসাদের সরাসরি কিছু করার উপায় ছিল না বিস্তারিত তথ্য হাতে না থাকায়। এরপরই শুরু হয় মোসাদের তথ্য সংগ্রহের অভিযান। প্রায় দুই বছর কোনোপ্রকার সাফল্য ছাড়াই অনুসন্ধান চালিয়ে যেতে হয় তাদের। তবে ২০০৬ সালে লন্ডনে প্রথমবারের মতো বড় ধরনের সাফল্য পায় মোসাদ। সিরিয়ার আণবিক শক্তি কমিশনের প্রধান ইব্রাহিম ওসমান লন্ডনে যান ছদ্মনামে। ধারণা করা হয়, উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক বিশেষজ্ঞদের সাথে মিশেষ মিটিংয়ের জন্যই তার এই যাত্রা। লন্ডনে তাদের পৌঁছানোর খবর আগেই পেয়ে যায় মোসাদ। ফলে হিথ্রো বিমানবন্দর থেকেই শুরু হয় মোসাদের অভিযান।

মোসাদের কিদন ও নেভিওত ডিভিশনের বিশেষ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত এজেন্টরা পেছনে লাগে ওসমানের। এই কিদনের সদস্যরা গুপ্তহত্যায় বিশেষ পারদর্শী ছিল। আর নেভিওত ডিভিশনের পারদর্শীতা ছিল হোটেল, দূতাবাস কিংবা বাসাবাড়িতে ঢুকে গোপনে বাগিং ডিভাইস (নজরদারি করার যন্ত্রবিশেষ) স্থাপন করা। মোসাদের এজেন্টরা ছদ্ম পরিচয়ে ওসমানকে হোটেলের বাইরে ব্যস্ত রেখে তার হোটেল কক্ষে ঢুকে বাগিং ডিভাইস স্থাপন করে। তবে তাদের ভাগ্য খুলে যায় ওসমানে ল্যাপটপ পেয়ে। মোসাদ ল্যাপটপের সব তথ্য হাতিয়ে নেয়ার পাশাপাশি তার ল্যাপটপে বিশেষ একটি সফটওয়্যার ইন্সটল করে দেয়, যাতে ল্যাপটপে কী কাজ হচ্ছে তা তারা জানতে পারে।

ল্যাপটপে পাওয়া তথ্য দ্রুততম সময়ের মধ্যে পৌঁছে যায় মোসাদের হেড কোয়ার্টারে। ওসমানের ল্যাপটপ থেকে প্রথম কিছু ছবিতে মোসাদ দেখতে পায় বেশ বড় ধরনের একটি কারখানা তৈরির প্রাথমিক অবস্থার ছবি। আরো কিছু ছবিতে মোসাদ দেখতে পায় পরবর্তী ধাপগুলোর ছবি। মোসাদের এনালিস্টদের সেই পরবর্তী ধাপগুলো চিনতে মোটেও কষ্ট হয়নি, কারণ এ ধরনের ছবি তারা আগেও দেখেছে। ইসরায়েলে মোসাদ নিরীক্ষা করে নিশ্চিত হয় তাদের আশঙ্কাই সত্যি। উত্তর কোরিয়ার যোগসাজশে পারমাণবিক বোমা বানানোর প্রস্তুতি নিচ্ছিল সিরিয়া। উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক চুল্লিগুলোর সাথে হুবহু মিলে যায় ওসমানের ল্যাপটপ থেকে পাওয়া সিরিয়ার নির্মাণাধীন ফ্যাসিলিটির।

ওসমানের ল্যাপটপ থেকে এই স্থাপনার বিভিন্ন ছবি পাওয়া গিয়েছিল। মূল ছবিটি আমেরিকান স্যাটেলাইটের তোলা; Source: Spiegel Online

সিরিয়া পারমাণবিক বোমা বানাচ্ছে নিশ্চিত হলেও ইসরায়েল তখনও জানে না এসব কর্মকাণ্ড সিরিয়ার কোথায় হচ্ছে। মোসাদ আমেরিকার সিআইএকেও এ ব্যাপারে অবগত করে, যেন কোনো তথ্য পেলে তাদের সাহায্য করতে পারে। ২০০১ সাল থেকেই মোসাদ বাশার আল আসাদকে তাদের নজরদারীতে রাখলেও তারা বিন্দুমাত্র বুঝতে পারেনি তাদের নাকের ডগা দিয়ে সিরিয়া পারমাণবিক বোমা বানাচ্ছিল! এমনকি ইসরায়েলের সামরিক গোয়েন্দা বিভাগ মোসাদকে এ ব্যাপারে একবার সতর্ক করলেও মোসাদ তাদের কথায় পাত্তাই দেয়নি!

সিরিয়ার পারমাণবিক কার্যক্রম খোঁজা ইসরায়েলের জন্য ছিল খড়ের গাদায় সুচ খোঁজার মতো। স্যাটেলাইট আর সিগনাল ইন্টারসেপ্টের মাধ্যমে ইসরায়েল তাদের প্রচেষ্টা চালিয়ে যেতে থাকে। সাফল্য পেতেও খুব একটা দেরি হয়নি। সিরিয়ার উত্তর-পূর্বে আল-কিবার মরুভূমিতে অস্বাভাবিক রেডিও ফ্রিকোয়েন্সির খোঁজ পায় ইসরায়েল। সিরিয়ার রাজধানী দামাস্কাস থেকে বেশ দূরেই অবস্থিত আল-কাবার মরুভূমি। স্যাটেলাইট দিয়ে আল-কাবার মরুভূমিতে খোঁজ চালায় ইসরায়েল।

স্যাটেলাইটের বদৌলতে আল-কিবারে সিরিয়ার নির্মাণাধীন পারমাণবিক চুল্লিকে সহজেই খুঁজে পায় ইসরায়েল। ওসমানের ল্যাপটপে পাওয়া ছবিগুলোর সাথে খাপে খাপে মিলে যায় স্যাটেলাইট থেকে পাওয়া তথ্য। মোসাদ এবার যোগাযোগ করে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী এহুদ ওলমার্টের সাথে। ইসরায়েলের ঠিক পাশেই সিরিয়ার পারমাণবিক চুল্লি যে ইসরায়েলের জন্য ভালো কোনো কিছুর সংকেত নয় সেটা তাকে আলাদা করে বোঝাতে হয়নি। সিরিয়ার এই পারমাণবিক চুল্লি ধ্বংস করার পরিকল্পনা করেন তিনি।

এহুদ ওলমার্ট; Source: Times of Isreal

তবে সম্ভাব্য পারমাণবিক চুল্লি চাইলেই বোমা মেরে উড়িয়ে দেয়া যায় না। চুল্লিটি যদি ততদিনে কাজ শুরু করে থাকে তাহলে সেখানে বোমা মারা হবে নিছক বোকামি। ওসমানের ল্যাপটপে পাওয়া তথ্যগুলোও ততোদিনে পুরনো হয়ে গিয়েছে। ফলে চুল্লিটির বর্তমান অবস্থা জানার উপায় ছিল একটিই- আল-কিবারে গিয়ে নমুনা সংগ্রহ করে আনা!

২০০৭ সালের আগস্ট মাসে নমুনা সংগ্রহের জন্য ইসরায়েলের ১২ জন কমান্ডো প্রবেশ করে সিরিয়ায়। আল-কাবারে নির্মাণাধীন চুল্লির ছবি ও এর আশপাশের এলাকার মাটি নিয়ে ফিরে আসে নমুনা হিসেবে। তবে ইসরায়েলের সব পরিকল্পনাই প্রায় নস্যাৎ হয়ে যেত একটুর জন্য। টহলরত সিরিয়ান বাহিনীর কাছে একটুর জন্য ধরা পড়েনি ইসরায়েলি কমান্ডো দল! তাদের নিয়ে আসা নমুনা থেকে ইসরায়েল নিশ্চিত হয় চুল্লি তখনও পুরোপুরি চালু হয়নি। বিমান হামলা করে স্থাপনাটি উড়িয়ে দিলেও তেজস্ক্রিয়তার কোনো ভয় নেই।

বিমান হামলার দায়িত্ব দেয়া হয় ইসরায়েলের বিমান বাহিনীর উপরে। বিমানবাহিনীর প্রধান নিজে কয়েকজন বিশ্বস্ত ও তুখোড় পাইলট নির্বাচন করেন। আল-কাবারে অভিযানের জন্য বিশেষভাবে প্রশিক্ষণ দেয়া হয় এসব পাইলটদের। কিন্তু পাইলটরা একেবারে শেষ সময়ের আগে জানতোও না তাদের অভিযান কী!

৩ সেপ্টেম্বর একজন মোসাদ এজেন্ট সিরিয়ার সমুদ্রবন্দরে উত্তর কোরিয়ার একটি মালবাহী জাহাজের ছবি তুলে পাঠায় হেড কোয়ার্টারে। মোসাদ ধারণা করে এটি হয়তো উত্তর কোরিয়ার বিস্ফোরণের কারণে সিরিয়া ও উত্তর কোরিয়া দ্রুত সিরিয়ায় চুল্লি নির্মাণের কাজ শেষ করতে চাচ্ছে। উত্তর কোরিয়ার জাহাজটি যদি সে লক্ষ্যেই সিরিয়ায় গিয়ে থাকে তাহলে ইসরায়েলের হাতে সময় ছিল খুবই কম। তাই সিদ্ধান্ত নেয়া হয় আক্রমণ করা হবে যত দ্রুত সম্ভব।

ইসরায়েলি এফ-১৫; Source: Tech. Sgt. Kevin Gruenwald

সে লক্ষ্যে মূল অভিযান, অপারেশন অর্চার্ড, শুরু হয় শুরু হয় ৬ সেপ্টেম্বর রাতে। অভিযানের ঠিক আগে পাইলটদেরকে তাদের অভিযানের বিস্তারিত জানানো হয়। সিরিয়ার এয়ার ডিফেন্স ব্যবস্থা বেশ উন্নত ছিল। তবে পুরো এয়ার ডিফেন্স ব্যবস্থা জ্যামিং করে রাখা হবে বলে আশ্বস্ত করা হয় পাইলটদের। দশটি এফ-১৫ বিমান রওনা হয় সিরিয়ার উদ্দেশ্যে, তাদের সুরক্ষা দেবার জন্য সাথে ছিল এফ-১৬। তিনটি এফ-১৫-কে মাঝপথে ফেরত যেতে বলা হলেও বাকি যুদ্ধবিমানগুলো এগিয়ে যেতে থাকে তাদের লক্ষ্যের দিকে। অন্যদিকে ইসরায়েলের ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ারের সৌজন্যে সিরিয়ার এয়ার ডিফেন্স ব্যবস্থা কোনো কিছুই বুঝতে পারেনি।

ইসরায়েলের যুদ্ধবিমানগুলো সিরিয়ায় প্রবেশ করে তুরস্ক হয়ে। প্রবেশের পর কোনোরকম বিপদ ছাড়াই নিরাপদেই আল-কাবারে পৌঁছে যায়। সেখানে আগে থেকেই উপস্থিত ছিল ইসরায়েলি কমান্ডোদের আরেকটি দল। লেজার ডেজিগনেটর দিয়ে তারা বিমানগুলোকে আক্রমণস্থল চিহ্নিত করে দেয়। সহজেই আল-কিবারের চুল্লিটি ধ্বংস করে ফেলে ইসরায়েল। ফেরার পথে বিমানগুলো তাদের অতিরিক্ত জ্বালানী ট্যাঙ্ক তুরস্কে ফেলে আসে। আক্রমণের পরপরই ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী এহুদ ওলমার্ট যোগাযোগ করেন তুরস্কের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী এরদোগানের সাথে। ওলমার্ট এরদোগানকে পুরো পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করেন এবং বাশারের কাছে তার বার্তা পৌঁছে দিতে বলেন। ওলমার্টের বার্তা ছিল, এবার শুধু নির্মাণাধীন চুল্লি উড়িয়ে দিয়েই ইসরায়েল শান্ত থাকছে, কিন্তু এরপরে এ ধরনের কার্যক্রম তারা বরদাস্ত করবে না। সেই সাথে না বলে তুরস্কের আকাশে ইসরায়েলি বিমান প্রবেশের কারণে এরদোগানের কাছে ক্ষমাও চান ওলমার্ট।

ইসরায়েলি বিমানের ফ্লাইট পাথ; Source: Black Ops, S02E01

আসলে ইসরায়েল ও সিরিয়ার সম্পর্ক শত্রুভাবাপন্ন হলেও সেসময় দুই দেশ যুদ্ধাবস্থায় ছিল না। ফলে এই ঘটনা যেন সেখানেই শেষ হয় আর এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে যেন পরবর্তীতে যুদ্ধ না লাগে তাই ওলমার্ট এই কাজ করেছিলেন। তার আশা ছিল বাশারও যুদ্ধ করার চেয়ে চুপচাপ থাকাই শ্রেয় মনে করবে।

এত বড় অভিযান ও সে অভিযানের সাফল্যের পরেও ইসরায়েল প্রকাশ্যে কিছুই বলেনি। এমনকি সিরিয়া পর্যন্ত চুপ ছিল প্রথম কিছুদিন। বিমান হামলার কথা প্রথম মিডিয়ায় আসে সিএনএনের সৌজন্যে। প্রথমদিকে ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ কিছু স্বীকার না করলেও একপর্যায়ে বিমান হামলার কথা স্বীকার করে। কিন্তু কোথায়, কেন, কোন টার্গেটে, কোন স্কোয়াড, কীভাবে হামলা করেছে এসব ব্যাপারে মুখ বন্ধ রাখে ইসরায়েল।

আল-কিবার স্থাপনা, ধ্বংসের আগে (বামে) ও পরে (ডানে); Source: Times of Isreal

অন্যদিকে সিরিয়ার প্রতিক্রিয়া ছিল অবাক করার মতো। নির্মাণাধীন পারমাণবিক চুল্লি একেবারে শেষ পর্যায়ে এসে হারানোর পরেও সিরিয়ানরা মাথা গরম না করে শান্তই ছিল। প্রথম দিকে কিছু স্বীকার না করলেও পরে একেকজন কর্মকর্তা একেক কথা বলতে থাকেন। তবে শেষপর্যন্ত প্রেসিডেন্ট বাশার পারমাণবিক চুল্লির কথা অস্বীকার করেন এবং নির্মাণাধীন সামরিক স্থাপনা ধ্বংস হবার কথা বলেন। তিনি দাবী করেন, সিরিয়া যদি পারমাণবিক চুল্লিই বানায় তাহলে পুরো স্থাপনাটির নিরাপত্তা ব্যবস্থা এত দুর্বল হবার কথা না। তবে সামরিক বিশেষজ্ঞরা বলেন, অতিরিক্ত নিরাপত্তা দিলে চোখে পড়তে পারে বলে সিরিয়া হয়তো নিরাপত্তা জোরদার করেনি।

সিরিয়া ও ইসরায়েল দীর্ঘদিন পুরো ব্যাপারটি নিয়ে বিস্তারিত কোনো তথ্যই দেয়নি। বরং দুই পক্ষই যতটা সম্ভব কম কথায় পুরো ব্যাপারটি শেষ করতে চাইছিল। এতে আসলে দুই পক্ষেরই লাভ ছিল। সিরিয়া যদি সত্যি পারমাণবিক চুল্লি বানিয়ে থাকে তাহলে সেটি তারা বলতেও পারছে না। আবার সিরিয়া চুপ থাকায় ইসরায়েলকে কেউ সেভাবে দোষারোপ করতে পারছে না অন্য দেশের সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘন করার ব্যাপারে। পুরো আরব বিশ্ব নীরবেই পুরো ঘটনা পর্যবেক্ষণ করে। এ ব্যাপারে কেউই কিছু বলেনি। অন্যদিকে উত্তর কোরিয়ার দিকে আঙ্গুল ওঠায় তারা নিজেদের নির্দোষ দাবী করে। আন্তর্জাতিক আণবিক শক্তি এজেন্সি পুরো ঘটনার তদন্ত করে এবং ২০১১ সালের এপ্রিলে নিশ্চিত করে আল-কিবারে সত্যি পারমাণবিক চুল্লি নির্মাণ হচ্ছিল।

তবে ইসরায়েলের চিন্তা তখনো শেষ হয়নি। তাদের ঠিক নাকের ডগায় বসে সিরিয়া কীভাবে গোপনে পারমাণবিক বোমা বানাচ্ছিল সেটা তাদের ভাবিয়ে তোলে। তদন্তে বের হয়ে আসে সিরিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ সুলাইমানের কথা। বাশার আল আসাদের বিশেষ উপদেষ্টা সুলাইমানের নেতৃত্বেই মূলত তৈরি হচ্ছিল এই পারমাণবিক বোমার স্থাপনা। শত্রুকে অন্ধকারে রাখার জন্য সকল প্রকার ডিজিটাল ট্রান্সমিশন অর্থাৎ টেলিফোন, মোবাইল ইত্যাদি যোগাযোগ নিষিদ্ধ ছিল। যোগাযোগের জন্য সবচেয়ে পুরনো পদ্ধতি, চিঠি ব্যবহার করা হতো। কিন্তু উত্তর কোরিয়ার ট্রেন দুর্ঘটনা আসলে বদলে দেয় পরিস্থিতি।

জেনারেল সুলাইমান; Source: Total War

পারমাণবিক চুল্লির স্থাপনা ধ্বংস করলেও ইসরায়েল জানে জেনারেল সুলাইমান জীবিত থাকলে সিরিয়া আবারো চেষ্টা চালাবে আরেকটি স্থাপনা বানানোর। তাই ইসরায়েল এবার পরিকল্পনা করে সুলাইমানকে হত্যা করার। কিন্তু এবার তো আগের বারের মতো বোমা মেরে একজন মানুষকে মারা যায় না। তার উপর জেনারেল সুলাইমান নিজেকে গুটিয়ে রাখতেই পছন্দ করতেন। এবার তাকে হত্যার দায়িত্ব পড়ে ইসরায়েলের নেভি কমান্ডোদের উপর।

এই কমান্ডোরা ইসরায়েলের সবচেয়ে গোপন সংস্থাগুলোর একটি। তাদের কোনো কার্যক্রমের ব্যাপারে কখনোই কোনো তথ্য ইসরায়েল প্রকাশ করে না। কমান্ডোরা ২০০৮ সালে সুলাইমানকে হত্যা করতে সফল হলেও ইসরায়েল এ ব্যাপারে কখনোই মুখ খোলেনি। বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন পত্রিকা ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষের বরাতে এ অভিযানের ব্যাপারে খবর করলেও ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ আনুষ্ঠানিকভাবে এ ব্যাপারে কিছুই বলেনি। আর পরিস্থিতির বিচারে সবাই বুঝে নিয়েছিল কোন ঘটনা থেকে কোন ঘটনা ঘটেছে। কিন্তু যাদের নিয়ে ঘটনা তারাই যখন চুপ ছিল, তখন অন্যরাও আর এ ব্যাপারে কিছু বলেনি।

প্রায় সাড়ে সাত হাজার কিলোমিটার দূরে ঘটে যাওয়া এক ট্রেন দুর্ঘটনার বদৌলতে ইসরায়েল হাঁফ ছেড়ে বাঁচে সিরিয়ার পারমাণবিক বোমার হাত থেকে। অন্যদিকে পারমাণবিক বোমা বানালে সিরিয়ার হাত ধরে মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতির অনেক কিছুই হয়তো বদলে যেতো। দীর্ঘদিন গোপন থাকার পরেও শেষ রক্ষা হয়নি সিরিয়ার। পারমাণবিক চুল্লির সাথে হারাতে হয় গুরুত্বপূর্ণ সামরিক ব্যাক্তিত্ব জেনারেল সুলাইমানকে। হাজার হাজার কিলোমিটার দূরের একটি ঘটনা কীভাবে পাল্টে দেয় পরিস্থিতি তারই এক উদাহরণ হয়ে থাকবে অপারেশন অর্চার্ড আর এর সাথে সম্পর্কিত ঘটনাগুলো।

তথ্যসূত্র

Black ops (Operation Orchard: Israel’s strike on the Syrian reactor) Season 2, Episode 1

ফিচার ইমেজ- The National Interest