বঙ্গভঙ্গ: প্রতিক্রিয়া

ভারতীয় উপমহাদেশের ইতিহাসের অন্যতম বিতর্কিত ঘটনা ছিল বঙ্গভঙ্গ। বাংলা প্রদেশের বিশাল আয়তনের কারণে বঙ্গভঙ্গের অনেক আগে থেকেই ব্রিটিশরা বাংলাকে ভাগ করার চিন্তা ভাবনা করছিল। বঙ্গভঙ্গের পটভূমি আর পরবর্তীতে যেসব কারণ বঙ্গভঙ্গে ভূমিকা রেখেছিল সেগুলো নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে পূর্বের পর্বে (বঙ্গভঙ্গ: পেছনের গল্প)। আজ আলোচনা করবো বঙ্গভঙ্গের পরবর্তী ঘটনা এবং প্রতিক্রিয়া নিয়ে।

হিন্দুদের প্রতিক্রিয়া

বঙ্গভঙ্গের পর দুই বাংলার প্রতিক্রিয়া ছিল সম্পূর্ণ উল্টো। পূর্ব বাংলায় যেখানে বঙ্গভঙ্গকে স্বাগতম জানানো হয় সেখানে পশ্চিম বাংলায় বঙ্গভঙ্গ কার্যকর হবার দিনটিকে পালন করা হয় শোক দিবস হিসেবে। তবে বঙ্গভঙ্গের সবচেয়ে নেতিবাচক দিক ছিল বঙ্গভঙ্গকে কেন্দ্র করে দুই বাংলায় হিন্দু-মুসলিম বিদ্বেষ শুরু হয়। কারণ কলকাতাকেন্দ্রিক রাজনীতিবিদ, আইনজীবী ও ধনীরা পুরো ব্যাপারটিকে ধর্মীয়ভাবে উপস্থাপন করে। কলকাতার উচ্চ বর্ণের ও শিক্ষিত হিন্দু সম্প্রদায়ের জমিদার, রাজনীতিবিদ, শিল্পপতি, আইনজীবীরা বঙ্গভঙ্গের বিপক্ষে অবস্থান নেন। হিন্দু নেতৃবৃন্দ বাংলা ভাগ করাকে বাঙালি বিরোধী, জাতীয়তাবাদ বিরোধী ও বঙ্গমাতার অঙ্গচ্ছেদ বিশেষণে আখ্যায়িত করেন।

মূলত কংগ্রেসের নেতৃত্বে, বঙ্গভঙ্গ বাস্তবায়ন হবার আগে থেকেই উচ্চ শ্রেণীর হিন্দুরা বঙ্গভঙ্গের বিরোধিতা করে আসছিল। ১৯০৫ সালের ৭ আগস্ট কলকাতার টাউন হলে কাশিম বাজারের জমিদার মহারাজা মহেন্দ্রচন্দ্র নন্দীর সভাপতিত্বে এক প্রতিবাদ সভার আয়োজন করা হয়। বিভিন্ন পত্রপত্রিকার মাধ্যমে এ প্রতিবাদে প্রায় এক লক্ষ লোক উপস্থিত থাকার কথা জানা যায়। নতুন প্রদেশে মুসলমানদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা ছিল মহারাজার মাথাব্যাথার মূল কারণ।

তার মতে, এর ফলে হিন্দুরা ‘নিজ দেশেই প্রবাসী’ হবে বলে দাবী করেন তিনি। এরপর ২২ সেপ্টেম্বর রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নেতৃত্বে রাখিবন্ধন কর্মসূচি পালন করেন বাংলার ঐক্য ও ভ্রাতৃত্বের প্রতীক হিসেবে। বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত “আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি” বঙ্গভঙ্গের সময়েই রচিত। কুষ্টিয়ার বাউল গগন হরকরার “আমি কোথায় পাব তারে” গানের সুরেই রবীন্দ্রনাথ “আমার সোনার বাংলা” গানটির সুর করেন।

গগন হরকারার স্মৃতির উদ্দেশ্যে কুষ্টিয়ায় নির্মিত ভাস্কর্য; Source: Prothom Alo, Sculptor: Faisal Mahmud

কলকাতার উচ্চবর্ণের হিন্দুরা বিরোধীতা করলেও পূর্ব বাংলার হিন্দুরা, বিশেষ করে নিম্নবর্ণের হিন্দুরা বঙ্গভঙ্গকে স্বাগতমই জানিয়েছিল। মূলত কৃষিকাজ করা পূর্ব বাংলার হিন্দু সমাজের আয় বেড়ে যাওয়া ছিল এর মূল কারণ। বঙ্গভঙ্গের আগে পূর্ব বাংলার আয়ের বড় অংশই পশ্চিমের জমিদাররা নিয়ে যেত। ফলে কৃষকরা তাদের ন্যায্য পাওনা পেতো না। কিন্তু বঙ্গভঙ্গের পর সেই অবস্থা পাল্টে যায়। ১৯০৬-০৭ সালে পাটের দাম বেড়ে ১৯০৪ সালের দ্বিগুণ হয়ে যায়। এর ফলে পূর্ব বাংলায় মধ্যবিত্ত শ্রেণী গড়ে উঠতে থাকে। কলকাতার রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্বার্থবাদী হিন্দুদের স্বার্থ পূর্ব বাংলার হিন্দুদের স্পর্শ করেনি। ফলে বঙ্গভঙ্গের পক্ষেই তারা অবস্থান নেন।

মুসলিমদের প্রতিক্রিয়া

মুসলিমরা প্রথম দিকে বঙ্গভঙ্গের বিরোধীতা করলেও পরবর্তীতে বঙ্গভঙ্গের পক্ষেই অবস্থান নেয়। এক্ষেত্রে নবাব সলিমুল্লাহর ভূমিকা প্রথম পর্বেই বলা হয়েছে। বঙ্গভঙ্গের পরই মুসলমানদের রাজনৈতিক অধিকার আদায়ে ১৯০৬ সালে গঠিত হয় মুসলীম লীগ। পূর্ব বাংলা প্রদেশ গঠনের সিদ্ধান্ত ভারতের অন্যান্য অঞ্চলের মুসলমানরাও স্বাগত জানিয়েছিল। মোহামেডান লিটারারি সোসাইটি, মুসলিম সাহিত্য সমিতি, মোহামেডান প্রভিন্সিয়াল ইউনিয়নসহ বিভিন্ন মুসলিম সংগঠনগুলো বঙ্গভঙ্গকে স্বাগত জানিয়েছিল।

তবে মুসলমানরা সবাই যে পক্ষে ছিলেন তা-ও নয়। শিক্ষিত মুসলিমদের একটি অংশ বঙ্গভঙ্গের বিরোধীতাও করেছিলেন। তবে এদের বেশিরভাগই ছিলেন কলকাতায় বাস করা জমিদার কিংবা কংগ্রেসপন্থী রাজনীতিবীদ। ভারতীয় মুসলমান সমিতি বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা রেখেছিল। কিন্তু পশ্চিমের মুসলমানদের কেউই পূর্বের নবাব সলিমুল্লাহর মতো জনগণকে প্রভাবিত করতে পারেননি। ফলে বঙ্গভঙ্গবিরোধী আন্দোলনে মুসলমানদের ভূমিকা ছিল খুবই কম।

স্বদেশী আন্দোলন

১৯০৫ সালের ১৭ জুলাই ইংরেজদের বিরুদ্ধে বয়কটের ডাক দেন সুরেন্দ্রনাথ ব্যানার্জী। ৭ আগস্ট টাউন হলের সমাবেশে সেই বয়কট প্রস্তাব গৃহীত হয়, শুরু হয় স্বদেশী আন্দোলনের। বিদেশী পণ্য বর্জন করার ফলে দেশীয় শিল্পের উন্নয়ন ঘটতে থাকে। তাঁত শিল্প, রেশম বয়ন এবং আরও কয়েকটি ঐতিহ্যবাহী কারুশিল্পে উল্লেখযোগ্য পুনর্জাগরণ ঘটেছিল স্বদেশী আন্দোলনের ফলে। দেশীয় শিল্পের পাশাপাশি আধুনিক শিল্পেরও বিকাশ ঘটে এসময়। ১৯০৬ সালের আগস্ট মাসে বঙ্গলক্ষ্মী কটন মিল প্রতিষ্ঠা করা হয়। পোর্সেলিন, ক্রোম, সাবান, ম্যাচ ও সিগারেট- এসব ক্ষেত্রেও কয়েকটি সফল উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়।

সুরেন্দ্রনাথ ব্যানার্জী; Source: Marvel Art Gallery

স্বদেশী আন্দোলন প্রথম দিকে বয়কট করে শুরু হলেও একটি পর্যায়ে চরমপন্থা অবলম্বন করা একটি পক্ষের উদ্ভব হয়। দুই পক্ষের লক্ষ্য এক হলেও পন্থা ছিল ভিন্ন। রবীন্দ্রনাথসহ কলকাতার শিক্ষিত সমাজ যখন অহিংসভাবে শিক্ষা ও বাঙালি সংস্কৃতির বিস্তারের মাধ্যমে আন্দোলনে নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন তখন উত্তেজিত যুব সমাজ শুরু করে সহিংস পন্থা।

১৯০৮ সালে ইংরেজ ম্যাজিস্ট্রেট কিংসফোর্ডকে হত্যা করতে যাওয়া একদল বিপ্লবী ভুল করে হত্যা করে এক ব্রিটিশ দম্পতিকে। সহিংস হত্যাকান্ডে জড়িত থাকায় ধরা পড়ে প্রফুল্ল চাকি ও ক্ষুদিরামের মতো বিপ্লবীরা। সহিংস আন্দোলনের ফলে সন্ত্রাসী কর্মকান্ড বাড়তে থাকে এবং হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গা প্রকট আকার ধারণ করে। তবে ১৯১১ সালে বঙ্গভঙ্গ রদের পূর্বেই সহিংস কর্মকান্ড অনেকটাই কমে গিয়েছিল।

স্বদেশী আন্দোলন বঙ্গভঙ্গকে কেন্দ্র করে শুরু হলে এটি একসময় ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনে অগ্রগণ্য ভূমিকা পালন করে। উইল ডুরান্ট এর মতে,

“It was in 1905; that the Indian Revolution began.”

১৯০৮ সালে মহাত্মা গান্ধী মন্তব্য করেন,

“বঙ্গভঙ্গের পরই ভারতের প্রকৃত জাগরণ ঘটেছে। এই বঙ্গভঙ্গ ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের বিভক্তির কারণ হবে।”

মূলত বাংলা থেকেই ভারতীয় জাতীয়তাবাদের উত্থান ঘটে আর সেটি ছড়িয়ে পড়ে পুরো ভারতে।

ক্ষুদিরাম বসু; Source: New18.com

বঙ্গভঙ্গ পরবর্তী ব্রিটিশ সরকার

লর্ড কার্জনের দ্রুততম সময়ে বাংলাকে ভাগ করার সিদ্ধান্ত ব্রিটেনের সরকারি মহলেও দুই পক্ষ সৃষ্টি করে। সরকারের সাথে মতানৈক্যের কারণে ১৯০৫ সালের শেষের দিকে লর্ড কার্জনকে ভারত থেকে প্রত্যাহার করা হয়। সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা দমনে ব্যর্থ ব্যামফিল্ড ফুলারকে পদত্যাগে বাধ্য করা হয় বঙ্গভঙ্গের ৯ মাস পরেই। বিরোধীদের কঠোর হস্তে দমনসহ মুসলমানদের পক্ষে কথা বলার কারণে তিনি হিন্দুদের কাছে অপছন্দের পাত্রে পরিণত হন। এছাড়া বড় লাট মিন্টো নিজেও ফুলারের উপর রাগান্বিত ছিলেন।

লর্ড হার্ডিঞ্জ; Source: Wikimedia Commons

ফুলারের স্থলাভিষিক্ত লেনসলট হেয়ার ফুলার বিদ্বেষী হলেও দায়িত্ব পেয়ে ফুলারের মতোই কঠোর নীতি গ্রহণ করেন বিপ্লবীদের বিরুদ্ধে। ফলে তিনিও হিন্দুদের কাছে চক্ষুশূল হয়ে ওঠেন। প্রতিনয়ত অসহযোগিতা, সন্ত্রাসী কর্মকান্ড বৃদ্ধি পাওয়া, হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গার ফলে ব্রিটিশ সরকার দ্রুতই বাংলাকে ভাগ করার পুরো ব্যাপারটিতে আগ্রহ হারিয়ে ফেলতে শুরু করে। ফলে ১৯১০ সাল থেকে গোপনে নিজেদের ভেতর বঙ্গভঙ্গ বাতিলের পরিকল্পনা শুরু করে।

১৯১০ সালের নভেম্বরে ভারতের শাসন বিভাগে দুটি বড় পরিবর্তন আসে। ভারত সচিব হয়ে আসেন লর্ড ক্রিউ এবং বড় লাট হন লর্ড হার্ডিঞ্জ। বড়লাট ঘোষণা দেন, ব্রিটিশ সম্রাট ও সম্রাজ্ঞী ১৯১১ সালের ডিসেম্বরে ভারতে আসবেন। তবে ভেতরে ভেতরে ব্রিটিশরা তখন আরো বড় চাল চেলেছিল, যার ফলে ভারতের প্রশাসনিক চেহারা একেবারে বদলে গিয়েছিল।

হিন্দু-মুসলিম ঐক্যে ভাঙ্গন

কংগ্রেসসহ উগ্র হিন্দুত্ববাদী রাজনীতিবীদদের বিভিন্ন কর্মকান্ড ও কথাবার্তায় বঙ্গভঙ্গবিরোধী আন্দোলন ধর্মীয় ছোঁয়া পায়। সুরেন্দ্রনাথ ব্যানার্জী বাংলা ভাগকে হিন্দুদের অপমান আর মুসলমানদের প্রতি পক্ষপাতমূলক আচরণ বলে দাবী করে পুরো ব্যাপারটিকে একটি ধর্মীয় রঙ দেবার চেষ্টা করেন। অথচ বাস্তবে বঙ্গভঙ্গের ফলে পূর্ব বাংলার হিন্দুদের উন্নতিই হয়েছিল। স্বদেশী আন্দোলন ও বঙ্গভঙ্গবিরোধী আন্দোলনকে একটি শ্রেণী ব্যবহার করে হিন্দু জাতীয়তাবাদের উত্থানের জন্য।

সুরেন্দ্রনাথ দাবী করেন, মন্দিরে স্বদেশী শপথ নেওয়ার পদ্ধতি তিনিই প্রথম চালু করেন। ‘বন্দে মাতরম’ গানটিকে নিজেদের জাতীয় সংগীত হিসেবে গ্রহণ করে হিন্দুবাদীরা। আপাত দৃষ্টিতে গানটিতে হিন্দুত্ববাদের সাথে সম্পর্কিত মনে না হলেও এই গানটি মূলত বঙ্কিমচন্দ্রের লেখা একটি কবিতা থেকে নেওয়া। বঙ্কিমচন্দ্রের ‘আনন্দমঠ’ উপন্যাসে দেবী দূর্গার উদ্দেশ্যে এই কবিতাটি রচিত হয়। পরবর্তীতে রবীন্দ্রনাথ এই কবিতাটিতে সুর দেন। এ উদ্যোগ বঙ্গভঙ্গের বিপক্ষে থাকা মুসলিমদের রাগান্বিত করে।

এছাড়াও আন্দোলনে হিন্দুধর্মের বিভিন্ন রীতিনীতি পালন করায় পশ্চিম বাংলার মুসলিমরা ধীরে ধীরে আন্দোলন থেকে নিজেদের সরিয়ে নিতে থাকে। এছাড়া ব্রিটিশ সরকারের মুসলমানদের বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কর্মসূচির পক্ষে প্রচারণা, মুসলমানদের স্বদেশী আন্দোলন বিরোধী করে তোলে। উগ্র হিন্দুবাদীদের কারণে আন্দোলন একসময় সাম্প্রদায়িক আন্দোলনে পরিণত হয়। বিভিন্ন স্থানে শুরু হয় হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গা। ১৯০৬-০৭ সালে কুমিল্লা, ঢাকা, পাবনা, রাজশাহী, ময়মনসিংহ সহ বেশ কিছু স্থানে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা হয়, হতাহত হয় প্রচুর লোক। বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনের পূর্বে সকল ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনে হিন্দু-মুসলিম ঐক্য ছিল ভারতীয়দের এক শক্তি। কিন্তু বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলনে সেই ঐক্য ভেঙে যায়।

ধর্ম নাকি ব্যক্তিগত স্বার্থ

দুই বাংলার প্রতিক্রিয়া থেকে মনে হতেই পারে মুসলমানদের এগিয়ে যাওয়াটা সহ্য করতে না পেরেই হিন্দুরা প্রতিবাদ করেছিল বঙ্গভঙ্গের। কিন্তু একটু খেয়াল করলেই বোঝা যাবে স্বার্থটা ধর্মের ছিল না, বরং ছিল নিজেদের অর্থনৈতিক স্বার্থের। আগের পর্বেই বলা হয়েছিল, রাজধানী ঢাকা থেকে সরে যাবার পর থেকেই পূর্ব বাংলার উন্নয়ন অনেক কমে গিয়েছিল। অন্যদিকে কলকাতাসহ পশ্চিমের শহরগুলোতে উন্নয়ন হয়েছিল তুলনামূলক বেশি। ফলে ব্যবসায়ী, শিল্পপতি, আইনজীবী, রাজনীতিবীদদের বাস ছিল কলকাতাকেন্দ্রিক। আর বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়েছিল এই ব্যক্তিরাই।

বিলেতি পণ্য বয়কটের পাশাপাশি বিদেশী কাপড়ে আগুন ধরানোর আহবানের পোস্টার; Source: Swadeshi Posters

পশ্চিমের ধনী মুসলমানদের বঙ্গভঙ্গ বিরোধীতাই প্রমাণ করে বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলনের সূচনা ধর্মীয় কারণে নয় বরং অর্থনৈতিক কারণেই ছিল। অন্যদিকে পূর্বের গরীব ও নিম্নশ্রেণীর হিন্দুরা ছিলেন বঙ্গভঙ্গের পক্ষে। নতুন প্রদেশ হলে সেখানে সুযোগ সুবিধা বাড়বে, ব্যবসা বাণিজ্য নতুন প্রাণ পাবে। পশ্চিমের ধনী শ্রেণী এগুলো নিয়েই ভয়ে ছিল। নিজেদের আয় কমে যাবে, বেড়ে যাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা! আর ধনী শ্রেণীর স্বার্থকে কাজে লাগিয়ে উগ্র হিন্দুত্ববাদীরা নিজেদের প্রভাব বিস্তার করতে থাকে, কেননা পশ্চিমে হিন্দুরা সংখ্যাগরিষ্ঠ আর পূর্বে মুসলমানরা। ফলে একপর্যায়ে গিয়ে আন্দোলনটি রূপ নেয় ধর্মীয় সহিংসতায়। দুই বাংলার বেশ কিছু নেতা ধর্মীয় ঐক্য বজায় রাখার চেষ্টা করলেও ব্যর্থ হন। হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গা বাড়তেই থাকে, সাথে বাড়তে থাকে দুই পক্ষের মাঝে দূরত্ব। একপর্যায়ে পূর্বের মুসলমান ও পশ্চিমের হিন্দুদের মাঝে সৃষ্টি হয় অবিশ্বাসের।

বঙ্গভঙ্গের পরিকল্পনা বাতিলে ব্রিটিশ সরকারের কূটচাল আর বঙ্গভঙ্গ বাতিলের বিস্তারিত থাকছে পরবর্তী পর্বে।

তথ্যসূত্র

১. ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গ ও পূর্ববঙ্গে প্রতিক্রিয়া, মুনতাসির মামুন

২. বাংলাদেশের ইতিহাস (১৯০৫-১৯৭১), ড. আবু মোঃ দেলোয়ার হোসেন

৩. Bengal Electoral Politics and Freedom Struggle 1832-1947, Gautum Chattopadhyay

৪. The New Province of Eastern Bengal and Assam, M. K. U. Molla

৫. The History of Bengal, Volume II, Sir Jadunath Sarkar

৬. From Plassey to Partition – A History of Modern India (2004), Sekhar Bandyopadhyay

৭. India: A Sacred Geography, Diana L. Eck

ফিচার ইমেজ – armaeniaeditorial.com

Related Articles