মুঘল সাম্রাজ্যের উত্থান: হিন্দুস্তানে বাবরের চূড়ান্ত লড়াই

১৫২৫ সালের নভেম্বরের শেষের দিকের ঘটনা।

কাবুল অধিপতি বাবর পঞ্চমবারের মতো হিন্দুস্তান বিজয়ের উদ্দেশ্যে কাবুল ত্যাগ করলেন। কাবুল ত্যাগের সময় হয়তো তিনি নিজেও জানতেন না হিন্দুস্তান বিজয়ের জন্য এটাই হবে তাঁর শেষ অভিযান। এসময় বাবরের সাথে ছিলো আফগান, বাদাখশান, তাজিকসহ বিভিন্ন পাহাড়ি উপজাতির দুর্ধর্ষ যোদ্ধাদের সমন্বয়ে গঠিত একটি বহুজাতিক সেনাবাহিনী, যুদ্ধক্ষেত্রে যাদের দক্ষতা ছিলো অতুলনীয়। এদিকে পিতার হিন্দুস্তান যাত্রার কথা শুনে বাবরের সাথে অভিযানে অংশ নিতে পুত্র হুমায়ুন বাদাখশান প্রদেশ থেকে ছুটে আসেন।

১০ ডিসেম্বর বাবর তাঁর বহুজাতিক সেনাবাহিনী নিয়ে পেশোয়ারে প্রবেশ করেন। এরপর রাভি নদী অতিক্রম করে তিনি পাঞ্জাবে পৌঁছান। পাঞ্জাবে প্রবেশ করা মাত্রই বাবরের সাথে তাঁর মিত্র লঙ্গর খান নিয়াজি দেখা করেন। তাঁর কূটনৈতিক প্রচেষ্টায় মুসলিম জানজুয়া রাজপুতদের সাথে বাবরের মিত্রতা দৃঢ় করা সম্ভব হয়। বাবর ইতোপূর্বেই ১৫২১ সালে গাক্কারদের বিরুদ্ধে মুসলিম জানজুয়া রাজপুতদের সহায়তা করেছিলেন।

বর্তমান রাভি নদীর একাংশের একটি দৃশ্য; Source: Wikimedia Commons

পাঞ্জাবে নিজের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ বজায় রেখে বাবর সিন্ধু নদ অতিক্রম করেন। এ সময় তাঁর বাহিনীর যোদ্ধা সংখ্যা ছিলো মাত্র ১২ হাজার! বিশাল ভারত আক্রমণের জন্য সত্যিই খুব ছোট আকারের সেনাবাহিনী এটি। কিন্তু এই বাহিনীর প্রতিই বাবরের ছিলো প্রবল আত্মবিশ্বাস। বাবরের সেনাবাহিনী তাদের প্রতি তাদের সুলতানের আত্মবিশ্বাসে কখনই চিড় ধরতে দেয়নি।

সড়কপথে পেশোয়ার থেকে পাঞ্জাব যেতে এখন সময় লাগে মাত্র ৬ ঘন্টা; Source: Google Map

হিন্দুস্তানের উদ্দেশ্যে কাবুল ত্যাগের পরপরই ১৫২৫ সালের ১১ ডিসেম্বর দৌলত খান ও গাজী খানের নিকট থেকে বাবর একাধিক বার্তা পান। বার্তায় তাঁকে জানানো হয়, প্রায় ৩০ হাজারের একটি সেনাবাহিনী নিয়ে তাঁরা কিলানপুর থেকে লাহোর অভিমুখে অগ্রযাত্রা করেছেন। বার্তা পাওয়ার দুদিন পর বাবর তাঁর সেনাবাহিনীসহ সিন্ধু নদ পাড়ি দেন। ১৫২৫ সালের ২৪ ডিসেম্বর বাবর তাঁর এই ক্ষুদ্র সেনাবাহিনীটি নিয়ে ঝিলাম নদী পার হন। ঝিলাম নদী পাড়ি দেয়ার পর দৌলত খানের বিশাল সেনাবাহিনীটি সম্পর্কে বাবর লোকমুখে শুনতে পাচ্ছিলেন। তবে বাবর দৌলত খান লোদির উপর কোনো ভরসাই করছিলেন না। ‘বাবরনামা’-তে বাবর উল্লেখ করেন,

‘ঐ দিন জায়গায়-জায়গায় আলোচনা চলছিলো যে, গাজী খান ও দৌলত খানের পক্ষ থেকে ৩০ থেকে ৪০ হাজারের একটি বিশাল সেনাবাহিনী এগিয়ে আসছে। তবে এ কথা আমি বিশ্বাস করছিলাম না। আমার শুধু নিজের শক্তির উপরেই ভরসা ছিলো যা সেইসময়ে আমার সাথে ছিলো। আমি শুধুমাত্র নিজের তরবারির শক্তির উপরেই ভরসা করছিলাম।’

বাদশাহ বাবর সেনাবাহিনীসহ সিন্ধু নদ পাড়ি দিচ্ছেন; Source: Wikimedia Commons

১৫২৫ সালের ২৬ ডিসেম্বর বাবর চেনাবে পৌঁছান। চেনাব থেকে সামনে অগ্রসরের সময় বাবর আবারো স্থানীয় উপজাতিগুলোর বিরুদ্ধে ছোটখাট অভিযান চালাতে বাধ্য হলেন। ৩১ ডিসেম্বর বাবর কলাভারে পৌঁছান। এখানে জানী বেগ, শাহ হাসান, মাহমুদ মির্জা আর আদিল হাসান অল্প কিছু সংখ্যক করে সৈন্য নিয়ে মূল বাহিনীর সাথে যোগ দিলেন।

এরপরের দিন, অর্থাৎ, ১৫২৬ সালের ১ জানুয়ারী বাবর মেওয়াত গিয়ে পৌঁছান। বাবরের মেওয়াতে অবস্থানের সময়ই তাঁর পুত্র হুমায়ুন তাঁর সাথে এসে মিলিত হন।

বাবরপুত্র হুমায়ুনের একটি তৈলচিত্র; Source: Wikimedia Commons

হিন্দুস্তান বিজয়ের উদ্দেশ্যে বাবর দুর্দান্ত গতিতে ধেয়ে আসছেন, এই খবর কিন্তু ইব্রাহীম লোদির অজানা ছিলো না। তাই তিনি বাবরকে বাঁধা দিতে হিসার ফিরোজার হামিদ খানের নেতৃত্বে একটি বাহিনী পাঠান। আম্বালায় পৌছানোর পর বাবর এই বাহিনী সম্পর্কে জানতে পারেন। ইব্রাহীম লোদি এ সময় মূল সেনাবাহিনী নিয়ে দিল্লীর উত্তর দিকে অবস্থান করছিলেন। বাবর শাহজাদা মীর্জা হুমায়ুনের নেতৃত্বে ছোট একটি বাহিনীকে হিসার ফিরোজার দিকে যাত্রা করতে নির্দেশ দেন। হিসার ফিরোজা থেকে ২৫/৩০ মাইল দূরে হামিদ খানের সাথে বাবরপুত্র মীর্জা হুমায়ুন মুখোমুখি হন। অল্প সময়ের মধ্যেই শাহজাদা মির্জা হুমায়ুন যুদ্ধে জয়ী হন। নিজের পুত্র হুমায়ুনের যুদ্ধ জয়ে উচ্ছ্বসিত হয়ে বাবর তাঁর আত্মজীবনীতে লিখেন,

‘এটা ছিলো হুমায়ুনের প্রথম যুদ্ধজয় ও প্রথম যুদ্ধের অভিজ্ঞতা। হুমায়ুনের বাহিনী হামিদ খানের হস্তীবাহিনীর ৭/৮টি হাতি আর প্রায় ১০০ সেনা বন্দী করে নিয়ে এলো।’

নিজের প্রথম এ যুদ্ধের অভিজ্ঞতালাভের সময়ে হুমায়ুনের বয়স ছিলো মাত্র ১৭ বছর!

তুঘলক রাজবংশের সুলতান ফিরোজ শাহ তুঘলকের নামে ১৩৫৪ সালে হিসার ফিরোজার নামকরণ করা হয়। শহরটি বর্তমান ভারতের হরিয়ানা রাজ্যের হিসার বিভাগের অন্তর্গত; Source: Youtube

হিসার ফিরোজায় হুমায়ুনের জয়লাভের পর বাবর দক্ষিণ দিকে তাঁর অগ্রযাত্রা বজায় রাখেন। বাবরকে বাঁধাদানের জন্য ইব্রাহীম লোদি আবারো দাউদ খান লোদি ও হাতিম খান লোদির নেতৃত্বে ৬ হাজার সৈন্যের একটি সেনাবাহিনী পাঠান। এই বাহিনীকে মোকাবেলার জন্য বাবর জুনায়েদ মির্জা, মীর হুসাইন, কুতল কদম আর কিন্তা বেগের নেতৃত্বে একটি বাহিনী সামনে পাঠিয়ে দেন। ইব্রাহীম লোদি সত্যিকার অর্থেই দুর্ভাগা ছিলেন। কারণ অতর্কিত আক্রমণে ইব্রাহীম লোদির এ বাহিনীটিও পরাজিত হয়। এ যুদ্ধে দাউদ খান, হাতিম খানসহ প্রায় ৬০-৭০ জন সৈন্য যুদ্ধবন্দী হিসেবে বাবরের বাহিনীর হাতে আসে। এছাড়া যুদ্ধে ৬/৭টি যুদ্ধহাতি আটক করা সম্ভব হয়।

হিসার ফিরোজায় তুঘলক সুলতান ফিরোজ শাহ তুঘলকের তৈরি ‘ফিরোজ শাহ প্রাসাদ’-এর একাংশ। প্রাসাদটি ১৩৫৪ সালে নির্মাণ করা হয়; Source: Wikimedia Commons

বাবর সামনে এগিয়ে যেতে থাকেন। ১৫২৬ সালের ১২ এপ্রিল তিনি উত্তর-পশ্চিম ভারতের হরিয়ানা রাজ্যের “পানিপাত” নামক জেলার একটি শহরে যেয়ে পৌছান। জায়গাটি ইতিহাসে পানিপথের প্রান্তর নামে পরিচিত। বাবরের যাত্রাপথে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বাহিনী এসে তাঁর বাহিনীতে যোগ দেয়। পানিপথের প্রান্তরে এসে পৌছানোর সময় বাবরের সেনাবাহিনীর আকার ২৫,০০০-এ গিয়ে পৌঁছায়। ইব্রাহীম লোদি এ সময় বাবরের থেকে মাত্র প্রায় ১২ মাইল দূরে অবস্থান করছিলেন। বাবর সেনাপতিদের সাথে আলোচনা করে পানিপথের প্রান্তরেই ইব্রাহীম লোদিকে মোকাবেলা করতে সিদ্ধান্ত নেন। মজার ব্যাপার হচ্ছে, বাবর তাঁর সারা জীবনে অসংখ্য যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছেন কিংবা পরোক্ষভাবে নেতৃত্ব দিয়েছেন। কিন্তু সুশৃংখল কোনো সেনাবাহিনী বা সত্যিকার অর্থে কোনো সাম্রাজ্যকে মোকাবেলা করার অভিজ্ঞতা বাবরের ছিলো না। আর তাই পানিপথের এই যুদ্ধটি বাবরের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ ছিলো।

হিন্দুস্তান অভিমুখে বাবরের যাত্রাপথ; Source: dome.mit.edu

বাবরকে বাঁধা দেয়ার জন্য ইব্রাহীম লোদি প্রায় এক লাখের একটি বিশাল সেনাবাহিনীর সমাবেশ ঘটিয়েছিলেন। সাথে ছিলো প্রায় ১,০০০ এর মতো হাতি। প্রাচীনকাল থেকেই হাতি হিন্দুস্তানের যুদ্ধগুলোতে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতো। হাতির বিশাল আকার আর উদ্ভট চিৎকারে বিপক্ষ দলের ঘোড়াগুলো ঘাবড়ে যেতো। কোনোমতেই ঘোড়াগুলোকে হস্তীবাহিনীর সামনে নেয়া যেতো না, যার ফলে শত্রুপক্ষের অশ্বারোহী বাহিনী ছত্রভঙ্গ হয়ে যেতো।

বাবর অগ্রসর হওয়ার সময়েই ইব্রাহীম লোদির বিরাট সেনাসমাবেশের কথা শুনছিলেন। একদিকে ইব্রাহীম লোদির সেনাবাহিনীর বিরাটাকার বাবরের জন্য সত্যিকার অর্থেই চিন্তার ব্যাপার ছিলো। তার উপরে আবার আছে হস্তিবাহিনীর উপদ্রব! ‘বাবরনামা’-তে বাবর উল্লেখ করেছেন।

‘শত্রু সেনাদের সম্পর্কে বড় বড় কথা আসছিলো যে, এক লাখের একটি বাহিনীসহ প্রায় ১ হাজার হাতির সমাবেশ তাঁরা ঘটিয়েছে। এসব শুনে আমার সৈন্যদের মনোবল নষ্ট হয়ে যাচ্ছিলো। কিন্তু তাদের সাহস ছিলো অটুট।’

ইব্রাহীম লোদির বিশাল সেনাবাহিনীর মোকাবেলায় বাবরের বাহিনী সত্যিকার অর্থে নিতান্তই তুচ্ছ ছিলো। আর তাই ইব্রাহীম লোদিকে মোকাবেলার জন্য বাবরকে উন্নত কৌশলের উপরে নির্ভর করতে হয়েছিলো। বাবরের প্রাথমিক কৌশলটি ছিলো অনেকটা অটোমানদের মতো। তুর্কী পদ্ধতিতে তিনি গরু আর ঘোড়ার গাড়িগুলোকে চামড়ার দড়ির সাহয্যে পাশাপাশি বেঁধে একটি প্রাথমিক বাঁধা তৈরি করেন। গাড়িগুলোর মাঝে আবার অনেকটা জায়গা জুড়ে ফাঁদ পাতা থাকতো। এসব ফাঁদের পেছনে বাবর তাঁর সৈন্যদের মোতায়েন করেন। অটোমান সেনাবাহিনী গাড়িগুলোকে বাঁধতো লোহার তৈরি চেইনের সাহায্যে। এই কৌশলকে বলা হতো “আরাবা”।

তীরন্দাজ আর পদাতিক সৈন্যদের মাঝেও বাবর একটি সরুপথ খোলা রাখেন, যেন যুদ্ধের সময় বিপক্ষ দলের সৈন্যরা এই সরুপথে এসে আটকে যায়। হস্তীবাহিনীকে প্রতিহত করার জন্য বাবর নিজ বাহিনীর অবস্থানের সামনে একটি পরিখা খনন করান। পরিখাটি গাছ-লতাপাতা দিয়ে ঢেকে রাখেন যেন দূর থেকে বোঝা না যায়। আর পরিখার ডান ও বামপাশ বরাবর নিয়োজিত করেন একদল সৈন্যকে, যাদের মূল কাজ ছিলো আক্রমণ শুরু হলে যুদ্ধক্ষেত্রের পার্শ্বদেশ দিয়ে সামনে এগিয়ে ইব্রাহীম লোদির বাহিনীর পেছন দিক দিয়ে ঘিরে আক্রমণ করা।

হিন্দুস্তানে বাবর একটি নতুন অস্ত্র নিয়ে আসেন, যাকে আমরা এখন কামান নামে চিনি। বাবরের নিয়ে আসার পূর্বে হিন্দুস্তান কখনো কামান দেখে নি। হিন্দুস্তানবাসীর কামানের গর্জন শোনা ছিলো নতুন এক অভিজ্ঞতা। তবে এটাও সত্য, বাবরের সময়ের কামানগুলোর কার্যকারীতা খুব অল্প ছিল। এসব কামানের পাল্লা খুব অল্প ছিলো, গোলার বিষ্ফোরণ ক্ষমতা অল্প ছিলো। একটি গোলা ছোড়ার পর আরেকটি গোলা ছোড়ার জন্য পুনরায় কামানকে প্রস্তুত করতেও অনেক সময় লেগে যেতো। কিন্তু তা-ও বাবরের কামান একটি স্বতন্ত্র ক্ষেত্রে এই যুদ্ধে তার কার্যকারীতা প্রমাণ করে। বাবর তাঁর কামানগুলো সংগ্রহ করেছিলেন উসমানীয় সুলতানের কাছ থেকে। ইব্রাহীম লোদির কাছে যেহেতু কোনো কামান ছিলো না, তাই বাবর নিশ্চিতে ‘আরাবা’ কৌশলের নিরাপত্তায় তাঁর কামানগুলোকে মোতায়েন করে দেন। বাবরের কামানগুলোকে পাল্টা আক্রমণের জন্য ইব্রাহীম লোদির কোনো আর্টিলারী ব্যাকআপ ছিলো না বিধায় কামানগুলো কোনোরুপ বাঁধা ছাড়াই যুদ্ধক্ষেত্রে গোলা নিক্ষেপ করতে সক্ষম হয়েছিলো।

পানিপথের যুদ্ধে মুঘল সেনাবাহিনীর আর্টিলারী ইউনিটের অবস্থানের চিত্র; Source: Wikimedia Commons

পানিপথের এ যুদ্ধে বাবর প্রায় ২০-২৪টি কামান ব্যবহার করেছিলেন। মজার ব্যাপার হচ্ছে, ইব্রাহীম লোদির সৈন্যরা দূর থেকে কামানগুলোকে দেখে উন্নত ধরনের তীর-ধনুকের মতো অস্ত্র ভেবেছিলো!

এই যুদ্ধে আরেকটি নতুন অস্ত্র বাবর ব্যবহার করেন। কামানের মতোই দেখতে কিন্তু আকারে ছোট বন্দুক জাতীয় এক ধরনের অস্ত্র তিনি এ যুদ্ধে ব্যবহার করেছিলেন। এই বন্দুককে বলা হতো ‘ম্যাচলক’। তবে বাবরের সৈন্যরা ম্যাচলক অপেক্ষা তীর-ধনুকে বেশ স্বচ্ছন্দ ছিলো। কারণ ধনুক থেকে খুব সহজে আর বেশি মাত্রায় তীর নিক্ষেপ করা যেতো, যা প্রথমদিকের ম্যাচলক বন্দুকে করা যেত না। বাবরের আর্টিলারী কোরের দায়িত্বে ছিলেন অটোমান ওস্তাদ আলী কুলি খান। আর ম্যাচলকধারী সৈন্যদের নেতৃত্বে ছিলেন অটোমান মোস্তফা রুমি।

ম্যাচলক বন্দুক; Source: lofty.com

যুদ্ধের শুরুর আগেই বাবর তাঁর বাহিনীকে মোট ছয়টি ভাগে ভাগ করে ফেলেন। মূল বাহিনী, মধ্য বাহিনী, ডানবাহু, বামবাহু, অগ্রবর্তী বাহিনী ও রিজার্ভ বাহিনী। সেনাবাহিনীর অবস্থানের আশেপাশের এলাকার নিরাপত্তা বজায় রাখার জন্য ছিলো একটি বিশেষ প্রহরী বাহিনী। ডানপাশের বাহিনীর নেতৃত্বে ছিলেন শাহজাদা হুমায়ুন মির্জা। যুদ্ধে অনভিজ্ঞ মির্জা হুমায়ুনকে সহায়তা করার জন্য বাবর হুমায়ুনের সাথে অভিজ্ঞ খ্বাজা কঁলা, সুলতান মুহাম্মদ আর হিন্দু বেগের মতো অভিজ্ঞ সেনাপতিদের হুমায়ুনকে সহায়তা করার জন্য নির্দেশ দেন। বাহিনীর বাম অংশের নেতৃত্বে ছিলেন বাবরের আত্মীয় সুলতান মির্জা, মুহাম্মদ মির্জা, মুহাম্মদ খ্বাজা, আদিল সুলতান শাহ, মীর হুসাইন, জুনাইদ মির্জা, কুতলক কদম, জানী বেগ আর শাহী হুসাইনের মতো অভিজ্ঞ জেনারেলরা। ডান এবং বাম অংশকে সহায়তা করার জন্য বাবর আরো দুটি ক্ষুদ্র বাহিনীকে রিজার্ভ হিসেবে রাখেন। অগ্রবর্তী বাহিনীর নেতৃত্বে ছিলেন খসরু কুকুলদাস আর মুহাম্মদ আলী জং। আর অশ্বারোহী বাহিনীর নেতৃত্ব ছিলো আবদুল আজিজের কাছে। পানিপথে অবস্থানের পুরোটা সময় মুঘল সেনাবাহিনী যুদ্ধের ফর্মেশনে থাকতো।

দিল্লীর সুলতান ইব্রাহীম লোদি; Source: Wikimedia Commons

মূল যুদ্ধ শুরুর আগে দুই বাহিনী প্রায় ৭ দিন মুখোমুখি অবস্থান নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। কেউ কাউকে আক্রমণ করছিলো না। অপেক্ষাকৃত দুর্বল হওয়ায় বাবর নিজে প্রথমে আক্রমণ শুরু করতে ইচ্ছুক ছিলেন না। তিনি বিভিন্নভাবে ইব্রাহীম লোদিকে আক্রমণ শুরুর জন্য প্ররোচনা দিতে থাকেন। কিন্তু ইব্রাহীম লোদিও প্রথমে আক্রমণ না করার ব্যাপারে অনড় থাকেন। আসলে ইব্রাহীম লোদির জন্য এই যুদ্ধটি তেমন গুরুত্বপূর্ণ কোনো যুদ্ধ ছিলো না। কারণ এই যুদ্ধে বিজয়ী হলেও ইব্রাহীম লোদির অর্জন বলতে তেমন কিছুই হতো না। এ যুদ্ধে ইব্রাহীম লোদির একমাত্র লক্ষ্য ছিলো বাবরকে পরাজিত করে তাঁর বাহিনীকে কাবুলের দিকে ঠেলে দেয়া, যেন এই আপদকে বিদায় করতে পারলেই তিনি বেঁচে যান!

৭ দিন অবস্থান নিয়ে অপেক্ষা করেও মূল যুদ্ধ শুরু না হওয়ায় বাবর ইব্রাহীম লোদিকে আবারো প্ররোচিত করতে একটি ছোট আক্রমণ পরিচালনা করেন। এই উদ্দেশ্যে বাবর ৪ কিংবা ৫ হাজার সৈন্যের একটি ক্ষুদ্র বাহিনীকে ২০ এপ্রিল রাতে ইব্রাহীম লোদির সেনা অবস্থানের নিকট পাঠান। কিন্তু ইব্রাহীম লোদিকে প্ররোচণা দিতে গিয়ে বাবরের এই বাহিনীটি ব্যর্থ হয়ে মূল সেনাবাহিনী থেকে আলাদা হয়ে যায়। সফল হওয়ার সম্ভাবনা দেখে ইব্রাহীম লোদি পরের দিন সকালের দিকে তাঁর মূল বাহিনী নিয়ে সামনে এগিয়ে আসেন। বাবর তাঁর পুত্র হুমায়ুনকে অগ্রবর্তী বাহিনীর নেতৃত্ব দিয়ে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া সেনাদের উদ্ধারে পাঠিয়ে নিজে মূল বাহিনী নিয়ে সামনে এগিয়ে যান।

১৫২৬ সালের ২১ এপ্রিল ইব্রাহীম লোদি তাঁর বাহিনীর নিশ্চল অবস্থা ছেড়ে বাহিনী নিয়ে সামনে এগিয়ে আসেন। আগের রাতে বাবরের সেনাবাহিনীর আক্রমণটি ব্যর্থ হওয়ায় ইব্রাহীম লোদি আত্মবিশ্বাস ফিরে পান। তিনি প্রচন্ড একটি আক্রমণের মাধ্যমে বাবরকে পরাজিত করে হিন্দুস্তান থেকে বিতাড়িত করার চেষ্টাতেই ছিলেন তিনি। ইব্রাহীম লোদি প্রথমেই বাবরের সেনাবাহিনীর ডান অংশের উপরে আক্রমণ পরিচালনা করেন। বাবরের রিজার্ভ সৈন্যরা ডানবাহুকে সহায়তা করে আক্রমণ ঠেকিয়ে দেয়। হঠাৎ করে থেমে যাওয়ায় লোদির বাহিনীর পেছন থেকে সামনের অংশে চাপ বেড়ে যায়, ফলে সামনের সৈন্যরা অসুবিধায় পড়ে যাচ্ছিলো। আর এদিকে বাবর তাঁর সেনাদের নিয়ে গাড়ির ফাঁদের মাঝ থেকে ইব্রাহীম লোদির বাহিনীর উপরে ক্রমাগত আক্রমণ করে যাচ্ছিলেন। ফলাফল এই দাঁড়ায়, প্রায় বিনা প্রতিরোধে লোদি সৈন্যরা মারা যেতে থাকেন।

পানিপথের যুদ্ধ; Source: Wikimedia Commons

পানিপথের এই যুদ্ধে বাবর তুর্কী ‘তুগুলাম’ কৌশলের সফল প্রয়োগ ঘটান। কৌশলটি হচ্ছে- গোটা সেনাবাহিনীকে ছোট ছোট অংশে ভাগ করে আক্রমণ পরিচালনা করা। বিপক্ষ দলের আক্রমণের মুখে পিছু হটে পালানোর ভান ধরে হঠাতই ঘোড়া থেকে মুখ ঘুরিয়ে তীর ছুড়ে মারা এবং সেই সাথে শত্রুবাহিনীকে চারিদিক থেকে ঘিরে ধরা। বাবরের ‘তুগুলামা’ ও ‘আরাবা’ কৌশলের সফল প্রয়োগে ইব্রাহীম লোদির বাহিনী বিপর্যস্ত হয়ে উঠে, কারণ ইতিপূর্বে তারা এই কৌশলের সাথে পরিচিত ছিলো না। এই তুগুলামা কৌশলটির সফল প্রয়োগে ব্যর্থ হয়ে ১১৯১ সালে তরাইনের প্রথম যুদ্ধে মুহাম্মদ ঘুরি পৃথ্বিরাজ চৌহানের কাছে পরাজিত হয়েছিলেন। আর পরের বছর, অর্থাৎ, ১১৯২ সালে এই কৌশলের সফল প্রয়োগের মাধ্যমেই তরাইনের দ্বিতীয় যুদ্ধে মুহাম্মদ ঘুরি পৃথ্বিরাজ চৌহানকে পরাজিত করেছিলেন।

যা-ই হোক, ইতোমধ্যেই পরিখার দুইপার্শ্বে নিয়োজিত বাহিনী, যাদের মোতায়েন করা হয়েছিলো মূল যুদ্ধ এড়িয়ে যুদ্ধক্ষেত্রের দুইপাশ দিয়ে এগিয়ে যেয়ে ইব্রাহীম লোদির বাহিনীর পেছনের অংশে আক্রমণ চালানোর জন্য, তারা তাদের কাজ শুরু করে দেয়। একইসাথে লোদি বাহিনীর উপর তীব্রমাত্রায় তীরবর্ষণ চলতে থাকে। যুদ্ধের এ পর্যায়ে কার্যত ইব্রাহীম লোদির বাহিনী মুঘল সৈন্যদের দ্বারা অবরুদ্ধ হয়ে যায়। সত্যিকার অর্থে, এই কৌশলী তীব্র আক্রমণে ইব্রাহীম লোদি হতবুদ্ধি হয়ে পাল্টা কোনো আক্রমণের সক্ষমতাই হারিয়ে ফেলেন।

পানিপথের লড়াই; Source: Wikimedia Commons

মুঘল সৈন্যরা ইব্রাহীম লোদির বাহিনীকে তিনদিক থেকেই ঘিরে ধরলে এই অবস্থা থেকে মুক্তি পেতে ইব্রাহীম লোদি তাঁর হস্তিবাহিনীকে সামনে এগিয়ে দেন। কিন্তু হস্তিবাহিনী পরিচালনা করেও তিনি তেমন সুবিধা করতে পারেন নি। কারণ হস্তীবাহিনী পরিচালনার সাথে সাথেই বাবরের কামানগুলো একসাথে গর্জে উঠে। হিন্দুস্তানের এ হাতিগুলো কোনোদিনই কামানের বিকট গর্জন শোনেনি। কামানের গর্জনে তারা ভয় পেয়ে যুদ্ধ বিন্যাস ছেড়ে ছোটাছুটি শুরু করতে থাকে আর নিজেদের সৈন্যদেরই পিষ্ট করতে থাকে। যদিও কামানের গোলাগুলো তেমন বিষ্ফোরণক্ষম আর কার্যকর ছিলো না, কিন্তু কামানের শব্দই গোলার থেকে বেশি কার্যকর প্রমাণিত হয়। কামানের এই বিকট শব্দের কারণেই ইব্রাহীম লোদির হস্তিবাহিনী বিধ্বস্ত হয়। ‘বাবরনামা’-এর বর্ণনানুযায়ী,

‘শত্রুদের হস্তীবাহিনী তোপের (কামান) মারে ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে পিছু হটে নিজেদের সৈন্যদেরই পদদলিত করতে লাগলো। তখন শত্রুবাহিনীতে ছুটোছুটি শুরু হয়ে গেলো। এতে শত্রুবাহিনীর অনেক সৈন্যই পদদলিত হয়ে মারা গেলো।’

যুদ্ধক্ষেত্রে ইব্রাহীম লোদির বাহিনী মুঘল সৈন্যদের সামনে অসহায় হয়ে পড়েছিলো। এর আসল কারণটা অবশ্য টের পাওয়া যায় আরো পরে। প্রকৃতপক্ষে যুদ্ধ শুরুর কিছুক্ষণের (প্রায় ৩ ঘন্টা) ভেতরেই ইব্রাহীম লোদি কামানের গোলায় আহত হয়ে মারা যান, লোদির সেনাপতি বা উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা সৈন্য পরিচালনার কোনো চেষ্টা বা তাদের অবরুদ্ধ অবস্থা থেকে বের করার কোনো চেষ্টা না করেই পালিয়ে যান। এর কারণও বোঝা যায় যুদ্ধ শেষের পর। বেতন বাকী থাকায় ইব্রাহীম লোদির সৈন্য ও জেনারেলরা তাঁর প্রতি অসন্তুষ্ট ছিলো। আর তাই তারা এই যুদ্ধে তেমন আগ্রহী ছিলো না। ইতোমধ্যেই যুদ্ধ শুরুর আগেই লোদির বহু সৈন্য আর জেনারেল তাকে পরিত্যাগ করে চলে যায়, আর বাহিনীর উল্ল্যেখযোগ্য সৈন্য যুদ্ধে অংশই নেয়নি!

ফলাফল অবশেষে এই দাঁড়ায় যে, পানিপথের এই যুদ্ধে ইব্রাহীম লোদি পরাজিত হলেন, আর বাবরের সামনে ভারতের ভূখন্ডগুলো চিরদিনের জন্য খুলে গেলো!

ইব্রাহীম লোদির পরাজয় প্রসঙ্গে বাবর তাঁর আত্মজীবনীতে লিখেছেন,

‘তিনি (ইব্রাহীম লোদি) অত্যন্ত ক্ষিপ্রতার সঙ্গে আমাদের বাহিনীর উপরে ঝাঁপিয়ে পড়লেন। কিন্তু তিনি আমাদের রক্ষা ব্যূহের ব্যপারে কোনো ধারণাই রাখতেন না। তিনি তরুণ ছিলেন, অনভিজ্ঞ ছিলেন। আমাদের সামরিক দক্ষতা সম্পর্কে তিনি সামান্যতম ধারণাও অর্জন করতে পারেন নি। তিনি জানতেন না, যুদ্ধক্ষেত্রে কীভাবে সেনাবাহিনীকে নিয়ন্ত্রণ করতে হয়।’

মূলত এই যুদ্ধে ইব্রাহীম লোদির পরাজয়ের কারণ ছিলো বাবরের উন্নত কৌশলের জবাবে উন্নত কৌশলের প্রয়োগ ঘটাতে না পারা, উন্নত অস্ত্রশস্ত্রের অভাব, সেনাদের মনোবল আর ত্যাগ করার মানসিকতার অভাব। অন্যদিকে বাবরের সেনাবাহিনী এসব স্বীমাবদ্ধতা থেকে সম্পূর্ণরুপে মুক্ত ছিলো, মুঘল সেনাবাহিনীর দক্ষতা আর আনুগত্য ছিলো প্রশ্নাতীত। উপরন্তু পানিপথের এই যুদ্ধে বাবর টেরেইন বা যুদ্ধক্ষেত্রের অবস্থানগত প্রত্যেকটি সুবিধার সফল প্রয়োগ ঘটান, যে ক্ষেত্রে ইব্রাহীম লোদি চরম ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছিলেন। সেই সাথে আকারে বড় হওয়ার কারণে বাহিনীর উপরে তাঁর নিয়ন্ত্রণ ছিলো বেশ দুর্বল। এই দুর্বলতা পুষিয়ে নেয়া যেত যদি তাঁর অফিসাররা নিবেদিতপ্রাণ হয়ে যুদ্ধ নিয়ন্ত্রণ করতো। কিন্তু তারা তা করেন নি।

আসলে ইব্রাহীম লোদির প্রতি সত্যিকার অর্থে বিশ্বস্ত সৈন্যের অভাব ছিলো খুব বেশি, যার কারণে ১ লাখের একটি সেনাবাহিনী নিয়েও শুধুমাত্র আন্তরিকতা আর আনুগত্যের অভাবে দুর্বল একটি বাহিনীর কাছে ইব্রাহীম লোদি পরাজিত হন। তারপরেও ইব্রাহীম লোদি যদি নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে আর কিছুক্ষণ যুদ্ধ পরিচালনায় সক্ষম হতেন, তাহলে হয়তো পানিপথের প্রথম যুদ্ধের ফলাফল সম্পূর্ণ ভিন্ন হতো। কারণ বাবর ইতিমধ্যেই তাঁর সবগুলো রিজার্ভ ফোর্সকে যুদ্ধে মোতায়েন করে ফেলেছিলেন, আর অন্যদিকে ইব্রাহীম লোদি তাঁর মূল সেনাবাহিনীর একটা বিরাট অংশকে যুদ্ধে মোতায়েনই করতে পারেন নি, অন্য অংশগুলোর কথা তো বলাই বাহুল্য!

যুদ্ধ শেষে ইব্রাহীম লোদির মৃতদেহ অন্যান্য সৈন্যদের সাথে বিকেলের দিকে খুঁজে পাওয়া যায়। বাবর নিজে একজন জাত যোদ্ধা ছিলেন। একজন প্রকৃত যোদ্ধা কখনোই অন্য কোনো যোদ্ধাকে অসম্মান করতে পারেন না। হোক সে শত্রু কিংবা মিত্র। আর তাই বাবর ইব্রাহীম লোদির মৃতদেহকে কোনো প্রকার অসম্মান না করে পূর্ণ মর্যাদার সাথে তাঁর নিহত হওয়ার স্থানেই তাকে দাফন করেন। ইব্রাহীম লোদির বাহিনীর হিন্দু যোদ্ধাদের তাদের নিজেদের ধর্মীয় রীতি অনুযায়ীই সৎকার করার অনুমতি দেন।

দিল্লীর লোদি রাজবংশের শেষ সুলতান ইব্রাহীম লোদির সমাধিক্ষেত্র, পানিপথ; Source: Wikimedia Commons

পানিপথের এই যুদ্ধে মুঘল সেনাবাহিনীর প্রায় ৪,০০০ সৈন্য নিহত হন। অপরদিকে ‘বাবরনামা’-এর বর্ণনানুযায়ী ইব্রাহীম লোদির ১৫-২০ হাজার সৈন্য এ যুদ্ধে জীবন হারান। তবে বাবর আগ্রা পৌঁছানোর পর জানতে পারলেন পানিপথের প্রান্তরে দিল্লী সেনাবাহিনীর নিহত সৈন্যসংখ্যা ছিলো প্রায় ৪০-৫০ হাজার।

পানিপথের যুদ্ধে জয়ী হয়ে ঐ দিনই বাবর সোজা দিল্লী অভিমুখে একটি বাহিনী পাঠিয়ে দেন। আর পুত্র হুমায়ুনকে পাঠান আগ্রা অধিকারের জন্য। এসময় হুমায়ুনের সাথে খ্বাজা কঁলা, শাহ মনসুর, ইউনুস আলী, আবদুল্লাহ খ্বাজা অবস্থান অবস্থান করছিলেন। দিল্লীগামী বাহিনীর নেতৃত্বে ছিলেন মুহাম্মদ খ্বাজা, মুহাম্মদ মির্জা, আদিল সুলতান, জুনাইদ মির্জা আর কুতলক কদম। তাদের উপর নির্দেশ ছিলো দিল্লীর রাজকোষের নিরাপত্তা বিধান করা। দিল্লীগামী বাহিনীটি খুব সহজেই দিল্লীর দায়িত্ব নিয়ে নেয়। বাবর দিল্লী পৌঁছেছিলেন ২৫ এপ্রিল সকালের দিকে। এদিনই বাবর গিয়াসউদ্দীন বলবন আর হিন্দুস্তানের একসময়ের প্রতাপশালী শাসক আলাউদ্দীন খিলজির বাসভবন পরিদর্শন করেন। ২৬ এপ্রিল বাবর তুঘলকাবাদ পরিদর্শন করেন। ২৭ এপ্রিল দিল্লীতে মাওলানা মাহমুদ আর শায়খ জেন বাবরের নামে খুতবা পাঠ করেন। হিন্দুস্তান বিজয় উপলক্ষে বাবর দিল্লীর রাজকোষের একটা বিশাল অংশ গরীব ও দুঃখীদের মাঝে বন্টন করে দেন। এরপরের দিন, অর্থাৎ, ১৫২৬ সালের ২৮ এপ্রিল বাবর আগ্রার দিকে যাত্রা করেন।

তুঘলকাবাদ দুর্গের প্যানারোমা ভিউ; Source: Wikimedia Commons

এদিকে, ৪ মে হুমায়ুন আগ্রা শহরটি অবরোধ করেন। বাবরের আগ্রা পৌঁছানোর আগেই, খুব দ্রুতই আগ্রার পতন ঘটে। এরপর একে একে জৈনপুর, কালপি ও জব্বলপুরে মুঘল শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়।

আগ্রা দখলের পর বাবর আগ্রা পৌঁছালে হুমায়ুন বাবরকে আগ্রার সমস্ত দায়িত্ব বুঝিয়ে দেন। আগ্রার রাজকোষের পাশাপাশি হুমায়ুন বাবরকে আরেকটি বহুমূল্যবান বস্তু প্রদান করেছিলেন। আর তা হলো সেই কিংবদন্তীতুল্য কোহ-ই-নূর হীরা। হুমায়ুন হীরাটি গোয়ালিয়রের রাজা বিক্রমাদিত্যের পরিবারের থেকে পেয়েছিলেন। রাজা বিক্রমাদিত্য ইব্রাহীম লোদির সাথে পানিপথের যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলেন এবং যুদ্ধক্ষেত্রেই মারা যান। এসময় তার স্ত্রী আর সন্তানরা আগ্রাতে অবস্থান করছিলেন। মুঘল সেনাবাহিনী তাদের পূর্ণ নিরাপত্তা প্রদান করেছিলো।

তুঘলকাবাদ দুর্গের ভগ্নাবশেষ; Source: gounesco.com

যা-ই হোক, কোহ-ই-নূর হীরাটি বাবরের সামনে পেশ করা হলে বাবর হীরাটিকে তাঁর পুত্রকে উপহার হিসেবে প্রদান করেন। এছাড়া বাবর সেনাবাহিনীর প্রত্যেক সেনাপতি থেকে শুরু করে সব সৈন্যের মাঝেই গণিমতের সম্পদ বন্টন করে দেন। কাবুলে বাবরের অন্যান্য আত্মীয়স্বজন ও পুত্রদের জন্যও উপহার হিসেবে স্বর্ণমুদ্রা, রৌপ্যমুদ্রা ও মূল্যবান রত্নসামগ্রী পাঠান হয়। এমনকি গণিমতের একটি বিশাল অংশ বাবরের জন্মভূমি ফারগানা, সমরকন্দ, খোরাসান, কাশগড়, পারস্য, হেরাতসহ মক্কা এবং মদীনাতে পাঠান। রাজকোষের অবশিষ্ট অংশ সেনাবাহিনী পুনর্গঠন আর রাজ্যের উন্নয়নের জন্য সঞ্চয় করেন। হিন্দুস্তান বিজয়ের পর সবাইকে তাদের যোগ্যতা অনুযায়ী বিভিন্ন পরিমাণ সম্পদ ভাগ করে দিলেও বাবর নিজে এই সম্পদ থেকে কিছুই গ্রহণ করেননি। একটি মুদ্রাও না! এমনকি সারা পৃথিবীর বিস্ময় কোহ-ই-নূর হীরাটিও তিনি তাঁর পুত্র হুমায়ুনকে দান করে দিয়েছিলেন। হিন্দুস্তানে বাবরের এই সম্পদের প্রতি নির্লোভ স্বভাব তাকে বিশেষ সম্মান আর খ্যাতি এনে দিয়েছিলো।

কিংবদন্তীর কোহ-ই-নূর হীরাটি; Source: CNN

রাজা বিক্রমাদিত্যের পরিবারের পাশাপাশি আগ্রায় ইব্রাহীম লোদির বেশ কিছু আত্মীয় আর বিশ্বস্ত লোকজন অবস্থান করছিলেন। এদের মাঝে ইব্রাহীম লোদির মা, মালিকদাদ করঘানী, সির্দুক আর ফিরোজ খান মেওয়াতি উল্লেখযোগ্য ছিলেন। বাবর তাদের সবাইকেই পূর্ণ নিরাপত্তা প্রদান করেন। তাদের মুক্ত করে দেয়া হয়। এমনকি সবাইকে বিভিন্ন পরগণার দায়িত্ব দিয়ে দেওয়া হয়। ইব্রাহীম লোদির মা তৎকালীন সময়ের ৭ লাখ হিন্দুস্তানী মুদ্রার সমমূল্যমানের একটি পরগণা নিজের নামে পেয়েছিলেন।

সম্রাট বাবর ও হুমায়ুন। পিতা-পুত্র একসাথে; Source: Wikimedia Commons

১৫২৬ সালের ১০ মে-এর মধ্যেই সমগ্র দিল্লী আর আগ্রা বাবরের পদানত হয়।

১০

পানিপথের প্রান্তরে ভাগ্যবিড়ম্বনায় জর্জরিত কাবুলের সুলতান জহির উদ-দিন মুহাম্মদ বাবর এবং দিল্লীর লোদি রাজপরিবারের ইব্রাহীম খান লোদির মধ্যকার এ যুদ্ধটি পানিপথের প্রথম যুদ্ধ হিসেবে পরিচিতি পায়। এ যুদ্ধের পর অখ্যাত পানিপথের এ প্রান্তরটি রাতারাতি ইতিহাসে বিখ্যাত হয়ে যায়। কারণ ইব্রাহীম লোদি এবং বাবরের মধ্যকার এ যুদ্ধটি ছিলো ইতিহাসের মোড় ঘুরিয়ে দেয়া একটি যুদ্ধ। যদি এ যুদ্ধে বাবর পরাজিত হতেন, বা পানিপথের যুদ্ধ নামে কোনো যুদ্ধ কখনো সংগঠিতই না হতো, তাহলে হিন্দুস্তানের ইতিহাস নিশ্চিতভাবেই অন্যরকম হত। কিন্তু পানিপথের যুদ্ধটি সংগঠিত হয়েছিলো এবং এ যুদ্ধে বাবর জয়লাভ করেছিলেন। বাবর নাগাল পেয়েছিলেন তাঁর স্বপ্নের হিন্দুস্তানের, যেখানে তিনি তাঁর ভবিষ্যত বংশধরদের জন্য রেখে যাবেন উন্নয়নের অপেক্ষায় থাকা সমৃদ্ধিশালী একটি সাম্রাজ্যকে। তাঁরা নিজেদের মতো করে হিন্দুস্তানের ভূখন্ডগুলোকে সাজাবেন। বাবর এবং তাঁর বংশধরদের বীরত্বের কথা কিংবদন্তীর ন্যায় চারদিকে ছড়াতে থাকবে।

সম্রাট বাবর; Source: Wikimedia Commons

তবে, বাবর কিন্তু শুরুতে নিজে সরাসরি হিন্দুস্তানের অধিপতি হয়ে বসতে চান নি। বরং তিনি চেয়েছিলেন তাঁর অধীনে তাঁর বিশ্বস্ত অন্য কেউ হিন্দুস্তান শাসন করুক। এ কারণে শুরুতেই বাবরের পছন্দের তালিকায় ছিলেন ইব্রাহীম লোদির চাচা আলম খান। কিন্তু হিন্দুস্তানের বাবরের অন্যান্য মিত্ররা আলম খানের ব্যপারে দ্বিমত পোষণ করেন। বাবরের হাতে আরেকটি পছন্দ ছিলো। তিনি হলেন দৌলত খান লোদি। কিন্তু দৌলত খান লোদির মতিগতি বাবরের কাছে তেমন ভালো লাগছিলো না। এমনকি তিনি বেশ কয়েকবারই বাবরের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেন। আর তাই বাবর দৌলত খান লোদিকেও বাদ দিয়ে দিলেন। শেষ পর্যন্ত তিনি নিজেই হিন্দুস্তানের সিংহাসনে বসার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। সে যা-ই হোক, পানিপথের যুদ্ধে বাবর বিজয়ী হয়েছেন। হিন্দুস্তানের দরজা এখন বাবরের জন্য উন্মুক্ত। বাবরের জন্য আর পিছনে তাকানোর কোনো সুযোগ নেই। তাঁকে সামনে দ্রুতগতিতে এগিয়ে যেতে হবে। কারণ, শত্রুরা এখনো বাবরকে হিন্দুস্তান ছাড়া করতে সংগঠিত হচ্ছে। আর মুঘল ঘোড়াগুলো অস্থিরভাবে পায়চারী করছে হিন্দুস্তানের উন্মুক্ত মাটিতে ছুটে বেড়ানোর জন্য!

তথ্যসূত্র

১। বাবরনামা- জহির উদ দিন মুহাম্মদ বাবুর (অনুবাদ: মুহাম্মদ জালালউদ্দীন বিশ্বাস)

২। হুমায়ুননামা- মূল গুলবদন বেগম (অনুবাদ: এ কে এম শাহনাওয়াজ)

৩। মোগল সাম্রাজ্যের সোনালী অধ্যায়- সাহাদত হোসেন খান

এই সিরিজের আগের পর্বসমূহ

১। প্রাক-মুঘল যুগে হিন্দুস্তানের রাজনৈতিক অবস্থা

২। তরাইনের যুদ্ধ: হিন্দুস্তানের ইতিহাস পাল্টে দেওয়া দুই যুদ্ধ

৩। দিল্লী সালতানাতের ইতিকথা: দাস শাসনামল

৪। রাজিয়া সুলতানা: ভারতবর্ষের প্রথম নারী শাসক

৫। দিল্লি সালতানাতের ইতিকথা: খিলজী শাসনামল

৬। দিল্লি সালতানাতের ইতিকথা: তুঘলক শাসনামল

৭। দিল্লি সালতানাতের ইতিকথা: তৈমুরের হিন্দুস্তান আক্রমণ ও সৈয়দ রাজবংশের শাসন

৮। দিল্লী সালতানাতের ইতিকথা: লোদী সাম্রাজ্য

৯। রাজকীয় মুঘল সেনাবাহিনীর গঠন এবং গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস

১০। রাজকীয় মুঘল সেনাবাহিনীর ব্যবহৃত কিছু অস্ত্রশস্ত্র

১১। জহির উদ-দিন মুহাম্মদ বাবুর: ‘একজন’ বাঘের উত্থান

১২। বাদশাহ বাবরের কাবুলের দিনগুলো

১৩। বাদশাহ বাবর: হিন্দুস্তানের পথে

১৪। বাদশাহ বাবরের হিন্দুস্তান অভিযান: চূড়ান্ত লড়াইয়ের প্রস্তুতি

ফিচার ইমেজ: Shutterstock

Related Articles