Titanic was called the Ship of Dreams, and it was. It really was.

১৯১২ সালের ১০ এপ্রিল সকাল সাড়ে নয়টা। এইমাত্র লন্ডন এন্ড সাউথ ওয়েস্টার্ন রেলওয়ের একটি ট্রেন লন্ডন ওয়াটারলু স্টেশন থেকে সাউদাম্পটন টার্মিনাস রেলওয়ে স্টেশনে এসে পৌছেছে। অন্য সব দিনের চেয়ে স্টেশনটিতে ভিড় আজ অনেক বেশি। মানুষের একটি দীর্ঘ লাইন স্টেশন থেকে সাউদাম্পটন ডকের দিকে চলে গেছে।

কারণ ওখানেই ৪ নাম্বার গেইটের ৪৪-বার্থে রয়েছে টাইটানিক। আজ তার প্রথম সমুদ্র যাত্রা। গন্তব্য যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক শহর।

সাউদাম্পটন ডকে যাত্রা শুরুর পূর্বমুহুর্তে টাইটানিক

এই ভীড়ের মধ্যে মাইকেল নেভ্রাটিলকে তার ছোট দুই ছেলেকে সামলাতে বেশ নাকানিচুবানি খেতে হচ্ছে। তার সাথে তার স্ত্রীর ডিভোর্স হয়েছে মাত্র কয়েক মাস হয়েছে। কিন্তু দুই ছেলেকে নিজের কাছে রাখতে পারেননি। এমনিতে ছেলেদের সাথে দেখা সাক্ষাৎ করার সুযোগ খুব একটা পান না। শেষ পর্যন্ত ইস্টারের পুরো দিনটি তাদের সাথে কাটানোর সুযোগ হলো তার। আর তখনই একটি সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললেন তিনি। সাবেক স্ত্রীকে কিছু না জানিয়েই ছেলেদেরকে নিয়ে মন্টি কার্লোতে চলে এলেন। ঠিক করলেন সব কিছু ছেড়ে দিয়ে আমেরিকা চলে যাবেন ছেলেদের নিয়ে। এরপর টাইটানিকে দ্বিতীয় শ্রেণীর টিকেট ও কেটে ফেললেন।

টাইটানিকের ক্যাপ্টেন এডওয়ার্ড জন স্মিথকে এই মুহুর্তে একটু চিন্তিত দেখাচ্ছে। হোয়াইট স্টার লাইনের সবচেয়ে সিনিয়র ক্যাপ্টেন তিনি। পুরো পৃথিবীজুড়েই ক্যাপ্টেন হিসেবে নামডাক তার। এ কারণেই বোধ হয় শেষ মুহুর্তে এসে কোম্পানীর পক্ষ থেকে টাইটানিক ক্যাপ্টেন হওয়ার জন্য বলা হয়েছে। যদিও তার দায়িত্ব পালন করার কথা ছিল অলিম্পিক জাহাজে। তার সাথে আছেন চীফ মেট হেনরী টিনগল ওয়াইল্ড, ফার্স্ট অফিসার উইলিয়াম মারডক এবং সেকেন্ড অফিসার চার্লস লাইটওলার।

টাইটানিকের অফিসার মারডক, ইভানস, আলেকজান্ডার এবং ক্যাপ্টেন স্মিথ (বাম দিক থেকে)

জাহাজের ডেক থেকে নিচের দিকে তাকালেন তিনি। তৃতীয় শ্রেণীর যাত্রীরা ইতিমধ্যে জাহাজে উঠা শুরু করে দিয়েছে। জাহাজে ওঠার আগে তাদেরকে বেশ ভালভাবেই তল্লাশী করা হচ্ছে যাতে আমেরিকায় প্রবেশের সময় তাদের কাছে অবৈধ কোনো কিছু পাওয়া না যায়। স্বাস্থ্য পরীক্ষাও করা হয়েছিল অনেকের, যাতে জাহাজে কোনো রোগ ছড়াতে না পারে। সেই রিপোর্টগুলোও দেখা হচ্ছে। বোঝাই যাচ্ছে তৃতীয় শ্রেণীর সব যাত্রীদের জাহাজে উঠতে বেশ ভালোই সময় লাগবে।

টাইটানিক থেকে সাউদাম্পটন ডক

টাইটানিকের তৃতীয় শ্রেণীর যাত্রীদের বেশীরভাগেরই উদ্দেশ্য আমেরিকা কিংবা কানাডা গিয়ে নতুন জীবন শুরু করা; যেমন বেরট্রাম ফ্রাংক ডিন এবং জর্জেট এভা লাইটের কথাই ধরা যাক। নিজেদের দুই মাস বয়সী মেয়ে এবং দুই বছর বয়সী ছেলেকে নিয়ে উঠেছেন টাইটানিকে। উদ্দেশ্য যুক্তরাষ্ট্রের ক্যানসাসে গিয়ে থিতু হওয়া। রোডা এবোট তার দুই ছেলেকে নিয়ে ইংল্যান্ড ভ্রমণে এসেছিলেন কয়েকদিন আগে। আবার ফিরে যাচ্ছেন যুক্তরাষ্ট্রে।

প্রথম শ্রেণীর যাত্রীদের অধিকাংশই এখনো জাহাজে ওঠেননি। এদের বেশিরভাগই মূলত ইংল্যান্ডের অভিজাত শ্রেণীর লোকজন। আগে নিজেদের জিনিসপত্র জাহাজে ওঠাতেই ব্যস্ত তারা। এসব জিনিসপত্রের মধ্যে আয়না থেকে শুরু করে গাড়ি পর্যন্ত রয়েছে। বেশ কয়েকজন মিলিয়নিয়ারও আছেন এই দলে। সাংবাদিক এবং সাধারণ মানুষের মূল আকর্ষণ এখন বলতে গেলে তারাই। ক্যাপ্টেন স্মিথ প্রথম শ্রেণীর ডেকের সামনে দাঁড়িয়ে আছেন। নিজে উপস্থিত থেকে তাদেরকে অভ্যর্থনা জানাবেন তিনি।

যাত্রা শুরুর আর তখন মাত্র এক ঘন্টার মতো বাকি। তৃতীয় শ্রেণীর যাত্রীদের পর একে একে প্রথম এবং দ্বিতীয় শ্রেণীর যাত্রীরাও জাহাজে উঠা শুরু করলেন। প্রথম এবং দ্বিতীয় শ্রেণীর যাত্রীদেরকে তাদের নিজ নিজ কেবিন বুঝিয়ে দেয়া হলো। বেঞ্জামিন গুয়েনহেম তার স্ত্রী এবং তাদের আরও তিনজন কর্মচারী নিয়ে নিজেদের কেবিন খুঁজছেন। তারা এক জায়গায় সবগুলো কেবিন পাননি। অগত্যা বেঞ্জামিন তার সহকারীকে নিয়ে B82 নাম্বার কেবিনে উঠলেন এবং তার স্ত্রী ও পরিচারিকা মিলে B35 নাম্বার কেবিনে থাকার সিদ্ধান্ত নিলেন। তাদের আরেকজন কর্মচারী, যার নাম পেরনট, চলে গেলেন দ্বিতীয় শ্রেণীর একটি কেবিনে। কোনোভাবে এই কেবিনের একটি টিকেট সংগ্রহ করতে পেরেছিলেন তিনি।

টাইটানিকের ভিতরে এবং বাইরে ডকে তখন হুলস্থুল কান্ড। সকল যাত্রী উঠে গেছেন ইতিমধ্যে। বেশীরভাগ যাত্রীই তখন টাইটানিকের রেলিংয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। ডকে থাকা আত্মীয়স্বজনদের কাছ থেকে শেষবারের মতো বিদায় নিচ্ছেন তারা।

সাউদাম্পটন ডক ছেড়ে যাচ্ছে টাইটানিক

দুপুর আনুমানিক ১২টা তখন। অবশেষে টাইটানিকের যাত্রা শুরু হলো। সাউদাম্পটন ডক ধীরে ধীরে ছাড়তে শুরু করল সে। এতবড় জাহাজের জন্য এখানে জায়গা তুলনামূলকভাবে একটু কম। এই সময়েই খুব বড় ধরনের দুর্ঘটনার হাত থেকে বেঁচে গেল টাইটানিক। মাত্র কয়েক মিটারের জন্য অন্য একটি জাহাজের সাথে সংঘর্ষ হলো না টাইটানিকের। টাইটানিক থেকে সৃষ্ট বিশাল ঢেউগুলোর কারণে একটি ছোট বোট আরেকটু হলেই তাল হারিয়ে উল্টিয়ে যেত। কিন্তু শেষমুহুর্তে এসে শেষ রক্ষা হলো।

সাউদাম্পটন চ্যানেল পাড়ি দিয়ে ধীরে ধীরে ইংলিশ চ্যানেলের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে জাহাজটি। আবহাওয়া যদিও একটু ঠান্ডা, কিন্তু বেশ বাতাস বইছে। ক্যাপ্টেন স্মিথ এখন বেশ ফুরফুরে মেজাজে আছেন। ফার্স্ট অফিসার মারডককে নির্দেশ দিলেন জাহাজ একদম পূর্ণগতিতে চালানোর জন্য।

টাইটানিকের একদম উপরের ডেকে যাত্রীরা হাঁটাহাঁটি করছেন

বিকেলের পড়ন্ত সূর্যের আলোয় ছুটে চলছে টাইটানিক। বেশকিছু ডলফিনও সঙ্গী হলো টাইটানিকের। নেভ্রাটিলের ছেলে দুটোকে দেখেই বোঝা যাচ্ছে তারা জাহাজটিকে খুব পছন্দ করেছে। জাহাজে উঠার পর থেকেই সামনের ডেকে দৌড়াদৌড়ি করছে দুজন। একজন ফটোগ্রাফারকে দেখা যাচ্ছে যিনি ঘুরে ঘুরে জাহাজের বিভিন্ন জায়গার ছবি তুলছেন। তিনি হলেন ফাদার ফ্রান্সিস ব্রাউনি, যিনি আসলে একজন প্রিস্ট। চাচার কাছ থেকে টাইটানিকে করে আয়ারল্যান্ডের কুইন্সটাউন পর্যন্ত যাওয়ার একটি টিকেট পেয়েছেন তিনি। হাতে যদিও খুব সময় নেই, তারপরও বেশ কিছু ছবি তিনি তুলে ফেলেছেন। এগুলোর মধ্যে আছে টাইটানিকের জিমনেসিয়াম, মার্কনী রুম , প্রথম শ্রেণীর ডাইনিং রুমের ছবি। এছাড়া জাহাজের যাত্রীরা বোট ডেকে হাঁটাহাঁটি করছে এরকম ছবিও তুলছেন এখন।

টাইটানিকের ডেক

সাউদাম্পটন থেকে ছেড়ে যাওয়ার চার ঘন্টা পর টাইটানিক পৌছল চেরবর্গ ফ্রেঞ্চ পোর্টে। এখান থেকে বেশ কিছু যাত্রী তোলা হবে। কিন্তু টাইটানিকের মতো বিশাল জাহাজকে ঠিকমতো নোঙর করানোর মতো যথাযথ ব্যবস্থা এই ডকে নেই। অগত্যা দুটি ছোট বোট ব্যবহার করা হলো যাত্রীদেরকে জাহাজে তোলার জন্য। বোট দুটি হলো এস এস ট্রাফিক এবং এস এস নমেডিক। এস এস নমেডিক হোয়াইট স্টার লাইনের একমাত্র জাহাজ যেটি এখনও পর্যন্ত টিকে আছে। হ্যানাহ তুমাহ তার ছেলে জর্জ এবং মেয়ে মারিয়াকে নিয়ে উঠছেন টাইটানিকে। তারা এসেছে সুদূর সিরিয়া থেকে। বেশ দীর্ঘ পথ পারি দিতে হয়েছে তাদের। উঠের ক্যারাভানে করে বৈরূত এবং সেখান থেকে ফ্রান্স। তারপর তারা এখানে এসে পৌছেছে। ‌

যাত্রী তোলার পুরো প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন করতে সময় লাগল নব্বই মিনিটের মতো। এরপরই রাত ৮টার দিকে কুইন্সটাউনের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করে টাইটানিক। আবহাওয়া ধীরে ধীরে ঠান্ডা হতে শুরু করেছে তখন।

১৯১২ সালের ১১ এপ্রিল সকাল সাড়ে ১১টা। টাইটানিক আয়ারল্যান্ডের সাউথ কোস্টের কর্ক হার্বারে পৌছল। আকাশ এখন কিছুটা মেঘলা, কিন্তু বেশ গরম আবহাওয়া। এখানেও আগেই মতোই ঝামেলা বাধল। ডকে নোঙর করার কোনো উপায় নেই। এবারও বোট ব্যবহার করতে হলো যাত্রী তোলার কাজে। ফটোগ্রাফার ফ্রান্সিস ব্রাউনে ইতিমধ্যে নেমে পড়েছেন ডকে। টাইটানিক এখন কুইন্সল্যান্ড ত্যাগ করবে। ফ্রান্সিস তবুও দাঁড়িয়ে রয়েছেন। উদ্দেশ্য শেষবারের মতো কিছু ছবি তোলা। টাইটানিক ধীরে ধীরে কুইন্সল্যান্ড ডক থেকে দূরে সরে যাচ্ছে এরকম অবস্থায় বেশ কয়েকটি ছবি তুললেন তিনি। কেইবা জানতো এগুলোই হবে টাইটানিকের তোলা সর্বশেষ ছবি। ফ্রান্সিস ব্রাউনের হয়তো আক্ষেপ থাকবে কেন আরও ছবি তুললেন না।

টাইটানিকের তোলা শেষ ছবি

মাইকেল নেভ্রাটিল তার দুই ছেলেকে সব সময় চোখে চোখে রাখছেন। শুধু কোনো একদিন বোধহয় তাস খেলছিলেন সহযাত্রীদের সাথে। তখন বার্থা লেহমান নামে কোনো এক সুইস মহিলাকে বললেন তার ছেলে দুটোকে একটু দেখে রাখতে। এতবড় জাহাজে তারা একেবার হারিয়ে গেলে খুঁজে পেতে অবস্থা খারাপ হয়ে যাবে।

হাডসন এবং বেসি বেশিরভাগ সময় ব্যস্ত ছিলেন তাদের ছেলেমেয়েদের নিয়েই। প্রথম শ্রেণী তো বটেই, জাহাজের পুরো অংশই বলতে গেলে একসাথে ঘুরে দেখেছেন তারা। তবে যতবারই তারা ওই গ্র্যান্ড সিড়িটা দিয়ে উঠছিলেন কিংবা নামছিলেন, অবধারিতভাবে তাদের চোখ যেত উপরের দিকে। একটি বিশাল কারুকার্যময় কাঁচের গম্বুজ পুরো জায়গাটিকে আলোকিত করে রেখেছে!

প্রথম কিংবা দ্বিতীয় শ্রেণীর মতো তৃতীয় শ্রেণীর যাত্রীদের জন্য বিনোদনের এত ব্যবস্থা নেই। এ কারণেই দেখা যেত বিশাল ডেকে সবাই মিলে নিজ উদ্যোগে পার্টি করছে তারা। গান এবং নাচ সবই হচ্ছে সেখানে। পানীয় এবং খাবারেরও অবশ্য কোনো কমতি নেই। একদিকে বাচ্চারা দৌড়াদৌড়ি করছে, অন্য দিকে বুড়ো মানুষেরা একসাথে হয়ে কোনো সিরিয়াস ব্যাপার নিয়ে আলোচনা করছে। অনেকে হয়ত ডাইনিং রুমে অপেক্ষা করছে খাবারের জন্য। ভোজনরসিকদের জন্য বিশাল আয়োজনই বলতে হবে। প্রতি বেলার জন্য প্রায় ১০-১২ পদের খাবার। রোস্টেড বিফ, হার্টি স্ট্যু, ভেজিটেবল স্যুপ, পর্ক রোস্ট, সিদ্ধ আলু, পুডিং, বিস্কুট এবং নানা রকম ফল আছে এর মধ্যে।

টাইটানিকের প্রথম দিনের খাবারের একটি তালিকা

তিনদিন ধরে আটলান্টিক পাড়ি দিচ্ছে টাইটানিক। এমন সময়ে একটি দুর্ঘটনা ঘটে গেল। কোল বাংকারে হঠাৎ করে আগুন ধরে গেল। জাহাজের কোল বাংকারে আগুন ধরে যাওয়া খুব নতুন কোনো বিষয় নয়, প্রায় সময়েই হয়ে থাকে। ফায়ারম্যান ফ্রেডরিক ব্যারেট তখন পুরো ব্যাপারটা পর্যবেক্ষণ করছেন। কারণ এ ধরনের ছোটখাট দুর্ঘটনা পরবর্তী সময়ে অনেক মারাত্মক ব্যাপার হতে পারে। আগুন লাগার এই ঘটনাটি অবশ্য সাধারণ যাত্রীরা কেউ জানে না। এছাড়া এই সময়টুকুর মধ্যে তেমন উল্লেখযোগ্য কোনো ঘটনা ঘটলো না।

আয়ারল্যান্ড ছেড়ে আসার পর থেকেই আকাশ মোটামুটি পরিষ্কার হতে শুরু করেছিল। ১৩ এপ্রিল পর্যন্তও বেশ ভাল আবহাওয়াই ছিল। কিন্তু এর পরদিন থেকে আবহাওয়া বেশ ঠান্ডা হতে শুরু করে ধীরে ধীরে, সাথে আছে শক্তিশালী বায়ুপ্রবাহ এবং আড়াই মিটারের মতো উচু ঢেউ।

১৯১২ সালের ১৪ এপ্রিল সকাল নয়টা। টাইটানিক এখন আাটলান্টিকের অনেকটা পাড়ি দিয়ে আমেরিকার এবং কানাডার বেশ কাছাকাছি চলে এসেছে। এমন সময় আর এম এস ক্যারোনিয়া থেকে টাইটানিকে একটি মেসেজ এল এরকম, “bergs, growlers and field ice“। দুপুর ১টা ৪২ মিনিটের দিকে আর এম এস বাল্টিক গ্রীক জাহাজ অ্যাথেনিয়া থেকে একটি রিপোর্ট পায় যেখানে বলা ছিল যে জাহাজটি তার যাত্রাপথে বড় আকারের আইসবার্গ এবং আইসফিল্ড দেখেছে। আর এম এস বাল্টিক থেকে এই রিপোর্টটিও টাইটানিকে প্রেরণ করা হয় এবং এটি জাহাজের ক্যাপ্টেনকেও জানানো হলো। ক্যাপ্টেন রিপোর্টটি ব্রুস ইসময়কে দেখালেন। এরপর ক্যাপ্টেন আদেশ দিলেন টাইটানিকের যাত্রাপথে একটু পরিবর্তন আনার জন্য। জাহাজটিকে আরও একটু দক্ষিণে নিয়ে যাওয়া হলো। জাহাজের গতি কিন্তু থাকলো ঠিক আগের মতোই।

দুপুর দুইটার দিকে টাইটানিকের রেডিও অপারেটর জ্যাক পিলিপস্ এবং হ্যারল্ড ব্রীজ কিছু ত্রুটিযুক্ত যন্ত্রাংশ ঠিক করার কাজ করছিলেন। এমন সময় এস এস আমেরিকা নামের একটি জার্মান জাহাজ থেকে রেডিওর মাধ্যমে টাইটানিক জাহাজকে জানানো হলো যে তারা এইমাত্র দুটি বড় আকারের আইসবার্গ পার হয়ে এসেছে যা টাইটানিকের যাত্রাপথে থাকতে পারে। এবারের বার্তাটি আর টাইটানিকের ক্যাপ্টেন বা উচ্চপদস্থ কোনো কর্মকর্তার কাছে পৌঁছাল না।

হ্যারল্ড ব্রীজ মার্কনী রুমে কাজ করছেন

কিন্তু যতই দুপুর গড়িয়ে বিকেল হতে লাগল টাইটানিকের যাত্রীরা চারপাশে অনেক ছোটবড় বরফখন্ড লক্ষ্য করতে লাগলেন। টাইটানিক ঢুকে পড়েছে আটলান্টিকের বরফাচ্ছাদিত এলাকায়। এই জায়গার বর্তমান পরিস্থতি গত ৫০ বছরের মধ্যে সবচেয়ে খারাপ। তাছাড়া এই সময়টাতে চাঁদ পৃথিবীর সবচেয়ে কাছাকাছি থাকে। চাঁদের আকর্ষণেই মনে হয় আইসবার্গগুলোর জায়গাও বদল হচ্ছে। তাপমাত্রা শুণ্য ডিগ্রীর কাছাকাছি নেমে এসেছে এখন।

সন্ধ্যা সাড়ে সাতটা দিকে এসএস ক্যালিফোর্নিয়ান টাইটানিকে আর একটি সংকেত পাঠালো। সংকেতটি এরকম, “three large bergs“। এরপর রাত নয়টা চল্লিশ মিনিটের সময় Mesaba নামের আরও একটি জাহাজ থেকে এই একই ধরনের সতর্কবার্তা পাঠানো হয় টাইটানিকে। এ সময়ও টাইটানিকের রেডিও যোগাযোগের দায়িত্বে ছিলেন জ্যাক ফিলিপস ও হ্যারল্ড ব্রীজ। দু’বারই তাদের দুজনের কাছে এই সতর্কবার্তাকে অপ্রয়োজনীয় মনে হয়। তাই তারা এই সতর্কবার্তা দুটিও টাইটানিকের মূল নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্রে পাঠালেন না।

রাত ১০টা ৩০ মিনিট। ক্যালিফোর্নিয়ান জাহাজের অপারেটর সিরিল ইভানস রেডিওর মাধ্যমে টাইটানিকের সাথে যোগাযোগ করে একটি আইসবার্গ সম্পর্কে বলতে চাইলেন। কিন্তু সারাদিনের পরিশ্রমে ফিলিপস তখন বেশ ক্লান্ত। কিছুটা বিরক্ত হয়ে বলেন, “থামো। আমি এখন জরুরী কাজে ব্যস্ত।“। একথা বলেই সে লাইন কেটে দিল। এরপর সিরিল ইভানসও তার ওয়্যারলেস বন্ধ করে ঘুমাতে চলে গেলেন। এটিই ছিল টাইটানিকে পাঠানো শেষ সতর্কবাণী। বলতে গেলে বিশাল আটলান্টিক মহাসাগরে টাইটানিক এখন একরকম একা। তার আশেপাশে যোগাযোগ করার মতো আর কোনো জাহাজ নেই।

টাইটানিকের পথ পর্যবেক্ষণকারীদের কাছে এই মুুুহুর্তে কোনো বাইনোকুলারও নেই যা দিয়ে সামনের আইসবার্গগুলোকে চিহ্নিত করা সম্ভব। সাউদাম্পটনে জাহাজ ছাড়ার কিছু আগে একটা ঝামেলার কারণে এই অবস্থা। অবশ্য বাইনোকুলার থাকলেও কতটুকু লাভ হত সেটা ভাবনার বিষয়। আকাশ পুরোপুরি পরিষ্কার, কিন্তু চাঁদের দেখা নেই। চারদিকে তাই ঘুটঘুটে অন্ধকার। একটু ঢেউ যদি থাকত তাহলেও হয়ত আইসবার্গগুলো বোঝা যেত।

এর এক ঘন্টা পর। রাত তখন ১১টা বেজে ৩০ মিনিট। পথ পর্যবেক্ষণকারী ফ্রেডরিক ফ্লিট এবং লী একটু দিগন্তে কুয়াশার মতো কিছু একটা দেখতে পেলেন। কিন্তু কিছুই বুঝতে পারলেন না। তারা বরফের বিপদ সম্পর্কে খুব একটা সচেতন যে নন তা তাদের আচরণ দেখেই বোঝা যাচ্ছে। কিছুক্ষণ আগেই নাইটওলার তাদেরকে ছোট ছোট বরফখন্ডগুলোর ব্যাপারে সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছেন। জাহাজ এখন যে জায়গাটিতে আছে তার নাম হলো “গ্রেট ব্যাংকস অফ নিউফাউন্ডল্যান্ড”। টাইটানিকের গতি এখনো ২১ নট অর্থাৎ প্রতি ঘন্টায় ৩৯ কিলোমিটারের কাছাকাছি।

নয় মিনিট পর।

রাত ১১ টা ৩৯ মিনিট। ফ্লিট তাকিয়ে আছেন জাহাজের সামনের দিকটাতে। হঠাৎ দেখতে পেলেন একটু দূরেই বিশালাকার একটি আইসবার্গ টাইটানিকের পথ রোধ করে আছে! মাত্র কয়েক সেকেন্ডের দূরত্ব!

(চলবে)

টাইটানিক সিরিজের আগের পর্বঃ

১) টাইটানিক নির্মাণের পেছনের ইতিহাস

তথ্যসূত্র

১) wikipedia.org/wiki/RMS_Titanic

২) history.com/topics/titanic

৩) encyclopedia-titanica.org