কাস্পিয়ান স্টর্ম: ইরানে ব্রিটিশ নৌবহরের বিরুদ্ধে লাল রুশদের লড়াই

ধরুন, আপনাকে বলা হলো, একসময় ইরানের মাটিতে রাশিয়া আর ব্রিটেনের মধ্যে যুদ্ধ হয়েছিল। শুধু তাই নয়, ইরানের মাটিতে ভারতীয় সৈনিকরা রুশদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছিল! এই পর্যন্ত মেনে নেয়া যায়, কিন্তু এরপর যদি বলা হয়, প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর গৃহযুদ্ধে বিধ্বস্ত রাশিয়া তদানীন্তন বিশ্বের সর্ববৃহৎ নৌশক্তি ‘গ্রেট’ ব্রিটেনের কাছ থেকে পুরো একটি নৌবহর দখল করে নিয়েছিল? এক্ষেত্রে হয়ত পাঠকের মাথা ১৮০° ঘুরে যাবে! যাই হোক, বাস্তবেই আজ থেকে ১০০ বছর আগে সত্যিই রাশিয়া ইরানের মাটিতে ব্রিটেনকে পরাজিত করেছিল এবং ব্রিটেনের কাছ থেকে একটি আস্ত নৌবহর দখল করে নিয়েছিল!

এই ঘটনাটিতে যাওয়ার পূর্বে ঘটনাটির পটভূমি জেনে নেয়া প্রয়োজন। ঊনবিংশ শতাব্দীতে বিশ্বের সর্ববৃহৎ নৌশক্তি ব্রিটেন এবং বিশ্বের সর্ববৃহৎ স্থলশক্তি রাশিয়ার মধ্যে ইউরেশিয়া জুড়ে প্রভাব বিস্তারের এক তীব্র প্রতিযোগিতা চলেছিল, যেটি ব্রিটেনে ‘দ্য গ্রেট গেম’ (The Great Game) এবং রাশিয়ায় ‘টুর্নামেন্ট অফ শ্যাডোজ’ (Tournament of Shadows) নামে পরিচিত ছিল। কিন্তু ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষদিকে জার্মানি অত্যন্ত শক্তিশালী একটি রাষ্ট্রে পরিণত হয়, এবং উগ্র জাতীয়তাবাদী জার্মানরা ব্রিটেনের ঔপনিবেশিক সাম্রাজ্য ও রাশিয়ার ইউরোপীয় সাম্রাজ্য উভয়ই দখল করে নেয়ার পরিকল্পনা করতে থাকে। এর পরিপ্রেক্ষিতে ১৯০৭ সালে ব্রিটেন ও রাশিয়ার মধ্যে ‘ইঙ্গ–রুশ আঁতাত’ সম্পাদিত হয়, এবং প্রথম বিশ্বযুদ্ধ চলাকালে রাশিয়া ও ব্রিটেন উভয়েই জার্মানির বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে।

কিন্তু প্রথম বিশ্বযুদ্ধ চলাকালে ১৯১৭ সালে রুশ বিপ্লব সংঘটিত হয় এবং বলশেভিকরা রাশিয়ার শাসনক্ষমতা অধিকার করে। বলশেভিকরা রাশিয়াকে ‘রুশ সোভিয়েত ফেডারেল সমাজতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র’ (সংক্ষেপে ‘সোভিয়েত রাশিয়া’) নামকরণ করে, প্রথম বিশ্বযুদ্ধ থেকে রাশিয়াকে প্রত্যাহার করে নেয় এবং বলশেভিকবিরোধীদের বিরুদ্ধে একটি রক্তক্ষয়ী গৃহযুদ্ধে (১৯১৭–১৯২৩) লিপ্ত হয়। বলশেভিকদের সৈন্যবাহিনী ‘লাল ফৌজ’ (Red Army) এবং বলশেভিকবিরোধীদের সৈন্যবাহিনী ‘শ্বেত ফৌজ’ (White Army) নামে পরিচিত ছিল। রুশ বলশেভিকরা ‘লাল রুশ’ (Red Russians/Reds) নামে পরিচিতি অর্জন করে, আর রুশ বলশেভিকবিরোধীরা ‘শ্বেত রুশ’ (White Russians/Whites) নামে পরিচিতি লাভ করে।

দক্ষিণ রাশিয়ায় শ্বেত ফৌজের একদল সৈন্য; Source: Wikimedia Commons

রাশিয়াকে পুনরায় প্রথম বিশ্বযুদ্ধে অংশগ্রহণ করতে বাধ্য করার জন্য, বলশেভিকদের ‘বিশ্ব বিপ্লবে’র প্রচেষ্টাকে প্রতিহত করার জন্য এবং রাশিয়ার ওপর নিজেদের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার জন্য ব্রিটেন, ফ্রান্স, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, জাপান ও অন্যান্য রাষ্ট্র শ্বেত ফৌজকে সহায়তা প্রদান করতে শুরু করে, এবং রাশিয়ায় নিজেদের সৈন্য প্রেরণ করে। কিন্তু প্রাথমিক সাফল্যের পর শ্বেত ফৌজ ও তাদের সহায়তাকারী বিদেশি সৈন্যদল ক্রমশ কোণঠাসা হয়ে পড়তে থাকে।

১৯২০ সালের বসন্তকাল। ততদিনে শ্বেত ফৌজের মূল সৈন্যদলগুলো লাল ফৌজের নিকট পরাজিত হয়েছে এবং সোভিয়েত রাশিয়ার অভ্যন্তরে প্রতিটি রণাঙ্গনে শ্বেত ফৌজের সৈন্যরা পশ্চাদপসরণ করতে বাধ্য হয়েছে। শ্বেত ফৌজ কর্তৃক অধিকৃত কাস্পিয়ান সাগরের তীরবর্তী প্রতিটি বন্দর লাল ফৌজ দখল করে নিয়েছে। এমতাবস্থায় শ্বেত ফৌজ সোভিয়েত রাশিয়া থেকে পশ্চাদপসরণ করে কাস্পিয়ান সাগরের তীরবর্তী অপর রাষ্ট্র ইরানে আশ্রয় নিল। ইরান এসময় একটি স্বাধীন রাষ্ট্র ছিল, কিন্তু ইরানের মাটিতে ব্রিটিশ সৈন্য অবস্থান করছিল এবং কার্যত ইরান হয়ে উঠেছিল একটি ব্রিটিশ ‘আশ্রিত রাষ্ট্র’। শ্বেত ফৌজ তাদের কাস্পিয়ান নৌবহরকে ব্রিটিশদের নিকট সমর্পণ করে এবং কাস্পিয়ান সাগর তীরবর্তী ‘বন্দর–এ–আঞ্জালি’তে (সংক্ষেপে আঞ্জালি) এই নৌবহরটি অবস্থান করছিল।

শ্বেত নৌবহরটি সোভিয়েত রাশিয়ার সীমানার বাইরে অবস্থান করলেও বেশ কয়েকটি কারণে কাস্পিয়ান সাগরে তাদের উপস্থিতিকে মস্কো নিজেদের জন্য বিপজ্জনক হিসেবে বিবেচনা করছিল।

রুশ গৃহযুদ্ধের সময় উত্তর রাশিয়ার আর্খানজেলস্কে ব্রিটিশ সৈন্যরা; Source: Wikimedia Commons

প্রথমত, তেলসমৃদ্ধ ‘আজারবাইজান সোভিয়েত সমাজতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্রে’র (সংক্ষেপে ‘সোভিয়েত আজারবাইজান’) রাজধানী বাকু থেকে কাস্পিয়ান সাগরের মাধ্যমে সোভিয়েত রাশিয়ার আস্ত্রাখান বন্দরে তেল সরবরাহ করা হত। কাস্পিয়ান সাগরে শ্বেত নৌবহরের উপস্থিতি সোভিয়েত রাশিয়ার জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য হুমকি হয়ে উঠতে পারত, কারণ শ্বেত ফৌজ চাইলেই তাদের নৌবহর ব্যবহার করে জ্বালানি সরবরাহে ব্যাঘাত ঘটাতে পারত। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, এসময় আজারবাইজান ছিল আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাধীন, কিন্তু কার্যত সোভিয়েত রাশিয়ার সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কযুক্ত একটি রাষ্ট্র, এবং সেখানে লাল ফৌজের ঘাঁটি ছিল।

দ্বিতীয়ত, আনুষ্ঠানিকভাবে শ্বেত নৌবহরটি ইরানের সীমায় অবস্থান করছিল এবং সেখান থেকে তারা যেন সোভিয়েত রাশিয়ার বিরুদ্ধে কোনো কার্যক্রম পরিচালনা করতে না পারে, সেটি নিশ্চিত করার জন্য ইরান দায়বদ্ধ ছিল। কিন্তু এটি নিশ্চিত করার কোনো বাস্তবিক ক্ষমতা তখন ইরানের ছিল না। ১৮২৮ সালে রাশিয়া ও ইরানের মধ্যে স্বাক্ষরিত ‘তুর্কমেনচাই চুক্তি’ অনুযায়ী কাস্পিয়ান সাগরে কেবল রাশিয়ার নৌবাহিনী রাখার অধিকার ছিল। অর্থাৎ, কাস্পিয়ান সাগরে ইরানের কোনো নৌবহর ছিল না, সুতরাং ইরান চাইলেও সোভিয়েত রাশিয়ার ওপর আক্রমণ চালানো থেকে শ্বেত নৌবহরকে বিরত রাখতে পারত না।

সর্বোপরি, মস্কোর দৃষ্টিতে, আঞ্জালি বন্দরে অবস্থানরত শ্বেত নৌবহরটি ছিল সোভিয়েত রাশিয়ার সম্পত্তি, এবং সেগুলো ব্রিটেন বা ইরানের হাতে ছেড়ে দেয়ার কোনো ইচ্ছে বলশেভিকদের ছিল না। বলশেভিকরা চাচ্ছিল, হয় এই নৌবহরটি নিজেদের দখলে নিতে, নয়ত সেটিকে পুরোপুরি ধ্বংস করে ফেলতে।

মানচিত্রে কাস্পিয়ান সাগরের তীরবর্তী ইরানি বন্দর আঞ্জালি; Source: ResearchGate

কিন্তু আঞ্জালিতে আক্রমণ চালালে দুইটি কারণে বিরূপ কূটনৈতিক প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়ার সম্ভাবনা ছিল।

প্রথমত, ইরান ছিল আনুষ্ঠানিকভাবে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র এবং রুশ গৃহযুদ্ধে তারা কঠোরভাবে নিরপেক্ষতা বজায় রেখেছিল। তদুপরি, সোভিয়েত রাশিয়া এসময় ইরানের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখতে ইচ্ছুক ছিল। আঞ্জালিতে অবস্থানরত শ্বেত নৌবহরটিকে ইরানি সরকার আন্তর্জাতিক নিয়ম অনুযায়ী ‘অন্তরীণ’ (interned) করে রেখেছিল, এবং এই পরিস্থিতিতে আঞ্জালিতে শ্বেত নৌবহরের ওপর আক্রমণ চালালে সেটি হত ইরানি ভূখণ্ডের বিরুদ্ধে আগ্রাসন চালানো। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, ১৯০৪–১৯০৫ সালের রুশ–জাপানি যুদ্ধের সময় রুশ নৌবাহিনীর কিছু জাহাজকে চীনা কর্তৃপক্ষ ‘অন্তরীণ’ করে রেখেছিল এবং জাপানিরা চীনের সার্বভৌমত্ব ও নিরপেক্ষতাকে সম্মান জানিয়ে সেগুলোর ওপর আক্রমণ চালানো থেকে বিরত ছিল।

এবং দ্বিতীয়ত, আঞ্জালিতে অবস্থানরত শ্বেত নৌবহরটি ব্রিটিশ সৈন্যদের নিরাপত্তাধীনে ছিল, এবং সেখানে আক্রমণ চালালে ব্রিটেনের সঙ্গে সোভিয়েত রাশিয়ার বড় ধরনের কূটনৈতিক দ্বন্দ্ব দেখা দেয়ার সম্ভাবনা ছিল। এমনকি, ব্রিটেন ও রাশিয়ার মধ্যে পরিপূর্ণ যুদ্ধ বেঁধে যাওয়ারও আশঙ্কা ছিল। এসময় ব্রিটিশরা সোভিয়েত রাশিয়া থেকে তাদের সিংহভাগ সৈন্য প্রত্যাহার করে নিয়েছিল, এবং তাদের সঙ্গে নতুন করে বড় ধরনের কোনো সংঘাতে জড়ানোর ইচ্ছে মস্কোর ছিল না।

লাল নৌবহরের কমান্ডার ভাইস অ্যাডমিরাল আলেক্সান্দর নিমিৎস; Source: Wikimedia Commons

কিন্তু শ্বেত নৌবহরটিকে নিষ্ক্রিয় করা মস্কোর জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল। এজন্য সোভিয়েত রুশ প্রধানমন্ত্রী ভ্লাদিমির লেনিন এবং যুদ্ধমন্ত্রী লিয়ন ত্রৎস্কি আঞ্জালি আক্রমণের পরিকল্পনা অনুমোদন করেন। তাদের নির্দেশনা মোতাবেক লাল নৌবাহিনীর কমান্ডার ভাইস অ্যাডমিরাল আলেক্সান্দর নেমিৎস ভোলগা–কাস্পিয়ান নৌবহরের কমান্ডার ফিয়োদোর রাসকোলনিকভকে আঞ্জালি আক্রমণের নির্দেশ দেন। নেমিৎস রাসকোলনিকভকে নির্দেশ দেন যে, আঞ্জালিতে আক্রমণ চালানোর পরই তিনি যেন স্থানীয় ইরানি কর্মকর্তাদের জানান, শ্বেত ফৌজকে নিরস্ত্র করার ক্ষেত্রে ইরানিদের অক্ষমতার জন্যই সোভিয়েত রাশিয়া এই পদক্ষেপ নিতে বাধ্য হয়েছে এবং এই কাজটি সম্পন্ন হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই লাল ফৌজ ইরানের ভূখণ্ড ত্যাগ করবে।

পরিস্থিতি যদি মস্কোর জন্য খারাপ দিকে যায়, সেক্ষেত্রে সোভিয়েত রুশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী গিওর্গি চিচেরিন একটি বিকল্প পরিকল্পনাও প্রস্তুত রেখেছিলেন। এই পরিকল্পনা অনুযায়ী, রাসকোলনিকভ যদি তার অভিযানে ব্যর্থ হতেন অথবা যদি আঞ্জালিতে আক্রমণ নিয়ে ইরান/ব্রিটেনের সঙ্গে সোভিয়েত রাশিয়ার গুরুতর কোনো দ্বন্দ্ব দেখা দিত, সেক্ষেত্রে সোভিয়েত রুশ সরকার রাসকোলনিকভকে ‘বিদ্রোহী’ বা ‘জলদস্যু’ হিসেবে ঘোষণা করত এবং তার সঙ্গে কোনো ধরনের সম্পর্ক থাকার কথা অস্বীকার করত। রাসকোলনিকভ এই ব্যাপারে অবগত ছিলেন, এবং এজন্য এই অভিযান ছিল ব্যক্তিগতভাবে তার জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।

আঞ্জালি বন্দরটি ইরানের গিলান প্রদেশের অন্তর্গত এবং কাস্পিয়ান সাগরের তীরে অবস্থিত। সেসময় বন্দরটিতে যে শ্বেত নৌবহরটি অবস্থান করছিল, সেটিতে ছিল ১০টি ক্রুজার, ৪টি অক্সিলিয়ারি জাহাজ এবং ১টি ‘মিনি’ এয়ারক্রাফট ক্যারিয়ার, যেটিতে ৪টি সী–প্লেন ছিল। শ্বেত নৌবহরের পাশাপাশি সেখানে একটি ব্রিটিশ নৌবহরও ছিল, যেটিতে ছিল ৪টি টর্পেডো বোট এবং ১০টি ট্রান্সপোর্ট শিপ। আঞ্জালিতে অবস্থিত নৌবহরটিতে সব মিলিয়ে মোট ২৯টি জাহাজ ছিল, এবং এগুলো ব্রিটিশ কমান্ডের অধীনস্থ ছিল। আঞ্জালি শহরে ২,০০০ ব্রিটিশ সৈন্য অবস্থান করছিল, এবং তাদের কাছে এক ব্যাটারি ১৫৫ মি.মি. কামান ছিল। এর পাশাপাশি শহরটিতে কয়েক হাজার শ্বেত ফৌজের সৈন্যও ছিল। এর বাইরে আশেপাশের শহরগুলোতেও ব্রিটিশ সৈন্য মোতায়েনকৃত অবস্থায় ছিল, এবং প্রয়োজনে এরা তাদের সহায়তার জন্য আঞ্জালিতে আসতে পারত।

ফিয়োদোর রাসকোলনিকভ ছিলেন আঞ্জালির যুদ্ধে সোভিয়েত রুশ নৌবহরের কমান্ডার; Source: Alpha History

প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, আঞ্জালিতে মোতায়েনকৃত ব্রিটিশ সৈন্যদলটি ছিল প্রধানত ব্রিটিশ ‘উত্তর পারস্য সৈন্যদলে’র (North Persia Force) অন্তর্ভুক্ত ৩৬তম ভারতীয় ব্রিগেড। এই ব্রিগেডটিতে ব্রিটিশ অফিসার ও সৈনিকদের পাশাপাশি ব্রিটিশ–শাসিত ভারতবর্ষ থেকে আগত শিখ, গুর্খা ও মুসলিম পাঞ্জাবি সৈনিকরাও ছিল। সুতরাং, টেকনিক্যালি এই যুদ্ধে ভারতীয় সৈন্যরা শ্বেত রুশদের পক্ষে এবং লাল রুশদের বিপক্ষে যুদ্ধ করেছিল! এর বাইরে আঞ্জালিতে ব্রিটিশ ও শ্বেত রুশদের পাশাপাশি একটি ইরানি সৈন্যদলও ছিল, কিন্তু যুদ্ধ শুরু হলে তাদের ভূমিকা কী হবে সেটি তখনো স্পষ্ট ছিল না।

আঞ্জালিতে আক্রমণ পরিচালনার জন্য সোভিয়েতদের পরিকল্পনা ছিল এরকম: একটি লাল নৌবহর জলপথে আঞ্জালির নিকটবর্তী হয়ে শহরটি আক্রমণ করবে এবং সৈন্য অবতরণ করবে, আর সোভিয়েত আজারবাইজান থেকে লাল ফৌজের একটি অশ্বারোহী ডিভিশন স্থলপথে আঞ্জালিকে অবরোধ করবে, যাতে ব্রিটিশ ও শ্বেত রুশরা সেখান থেকে পশ্চাদপসরণ করতে না পারে। আক্রমণ পরিচালনার জন্য নিযুক্ত সোভিয়েত রুশ নৌবহরটিতে ছিল ৪টি ডেস্ট্রয়ার, কয়েকটি ক্রুজার এবং বেশ কয়েকটি প্যাট্রোল বোট ও গানবোট। এর পাশাপাশি আঞ্জালিতে আক্রমণ পরিচালনার জন্য ২,০০০ সৈন্যের একটি ‘স্ট্রাইক ফোর্স’ও নিযুক্ত করা হয়।

১৯২০ সালের ১৮ মে ভোরে সোভিয়েত রুশ নৌবহরটি আঞ্জালির নিকটবর্তী হয়। কিন্তু আঞ্জালি বন্দরের একেবারে কাছাকাছি আসার পরও তারা প্রতিপক্ষের কোনো সী/এয়ার প্যাট্রোল লক্ষ্য করেনি। এমনকি বন্দরটিতে কোনো প্রহরীও ছিল না। ব্রিটিশরা যে এতটা অপ্রস্তুত অবস্থায় থাকতে পারে, এটা সোভিয়েতদের ধারণার বাইরে ছিল। লাল রুশ নৌ কমান্ডাররা আশঙ্কা করছিলেন যে, ব্রিটিশরা হয়ত জেনেশুনেই তাদেরকে এতটা কাছাকাছি যেতে দিয়েছে, যাতে গোলাবারুদের অপচয় না হয় এবং সোভিয়েত রুশ জাহাজগুলো সহজে তাদের শিকারে পরিণত হয়। এটি ছিল নৌযুদ্ধের একটি চিরায়ত কৌশল।

আঞ্জালির যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী লাল রুশ অক্সিলিয়ারি ক্রুজার ‘রোজা লুক্সেমবার্গ’; Source: Russia Beyond the Headlines

কিন্তু তাদের আশঙ্কা সত্যি হয়নি। ব্রিটিশ বা শ্বেত রুশদের কেউই ভাবতে পারেনি যে, সোভিয়েতরা ইরানি ভূখণ্ডে তাদের ওপর আক্রমণ চালাবে। এজন্য তারা সম্পূর্ণ অপ্রস্তুত অবস্থায় ছিল। এজন্য সকাল ৫টা ১৯ মিনিটে যখন সোভিয়েত রুশ নৌবহর আঞ্জালির ওপর গোলাবর্ষণ আরম্ভ করে, তখন তাদের মধ্যে তীব্র বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি হয়। আক্রমণের শুরুতেই একটি গোলা আঞ্জালির ব্রিটিশ সামরিক সদর দপ্তরে আঘাত করে এবং এর ফলে ব্রিটিশ অফিসারদের মধ্যে আতঙ্কের সৃষ্টি হয়। উপকূলে ব্রিটিশরা অনেকগুলো কামান বসিয়ে রেখেছিল, কিন্তু সেগুলো থেকে লাল নৌবহরের দিকে একটি পাল্টা গোলাও ছোঁড়া হয়নি। পরে শ্বেত রুশরা খোঁজ নিয়ে দেখতে পায় যে, উপকূল রক্ষায় নিযুক্ত ব্রিটিশ সৈন্যরা আক্রমণের শুরুতেই পালিয়ে গেছে!

অবশ্য ব্রিটিশ ও শ্বেত রুশ সৈন্যরা পরবর্তীতে প্রতিরোধ গড়ে তোলার চেষ্টা করে। কিন্তু লাল রুশ সৈন্যরা বন্দরে অবতরণ করে তাদেরকে পিছু হটতে বাধ্য করে। সোভিয়েত নৌবহর গোলাবর্ষণ করে ব্রিটিশদের মেশিনগান পোস্টগুলো ধ্বংস করে দেয়। লাল রুশ সৈন্যরা আঞ্জালির টেলিগ্রাফ লাইনের তার কেটে দেয়, যাতে ব্রিটিশ সৈন্যরা বাগদাদে অবস্থিত তাদের মূল সদর দপ্তরের সঙ্গে যোগাযোগ করতে না পারে। পরিস্থিতি বেগতিক দেখে ব্রিটিশ ও শ্বেত রুশরা আঞ্জালি থেকে দক্ষিণ দিকে রেশত শহরে পশ্চাদপসরণের চেষ্টা করে। কিন্তু সোভিয়েত আজারবাইজান থেকে আগত লাল রুশ অশ্বারোহীরা তাদের সেই প্রচেষ্টাকে ব্যর্থ করে দেয়। উপায়ান্তর না দেখে ব্রিটিশ ও শ্বেত রুশ সৈন্যরা লাল রুশদের কাছে আত্মসমর্পণ করে।

আঞ্জালির যুদ্ধে লাল রুশদের ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ ছিল অত্যন্ত কম। তাদের মাত্র একজন সৈন্য নিহত হয় এবং ১০ জন আহত হয়। অন্যদিকে, ব্রিটিশ ও শ্বেত রুশদের ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ ছিল তুলনামূলকভাবে বেশি, কিন্তু এর কোনো সঠিক পরিসংখ্যান জানা যায়নি। শহরটিতে অবস্থানরত বাকি সকল ব্রিটিশ ও শ্বেত রুশ সৈন্য সোভিয়েতদের হাতে বন্দি হয়। পরবর্তীতে অবশ্য লাল রুশরা তাদের মুক্তি দিতে সম্মত হয় এবং তারা শহরটি ত্যাগ করে।

১৯২০ সালের মে মাসে বাকুতে লাল ফৌজ৷ সোভিয়েত আজারবাইজান থেকে আগত লাল ফৌজের অশ্বারোহী সৈন্যরা আঞ্জালির যুদ্ধে অংশ নিয়েছিল; Source: Wikimedia Commons

আঞ্জালির যুদ্ধে লাল রুশদের সবচেয়ে বড় সাফল্য ছিল ব্রিটিশ ও শ্বেত রুশ নৌবহরটি হস্তগত করা। ২৯টি ব্রিটিশ ও শ্বেত রুশ জাহাজ লাল রুশদের হস্তগত হয়, এবং এর মধ্য দিয়ে কাস্পিয়ান সাগরে ব্রিটিশ ও শ্বেত রুশদের উপস্থিতির অবসান ঘটে। নৌবহরটি ছাড়াও ৫০টির বেশি কামান, ২০,০০০ কামানের গোলা এবং প্রচুর পরিমাণ তুলা, তামা ও অন্যান্য দ্রব্যাদি লাল রুশদের হস্তগত হয়। ব্রিটিশরা তাদের সমস্ত রসদপত্র ফেলে রেখে গিয়েছিল, এবং স্থানীয় ইরানিরা ব্রিটিশ গুদামগুলোতে লুণ্ঠন চালায়।

এই যুদ্ধে সোভিয়েত রাশিয়ার সবগুলো লক্ষ্যই অর্জিত হয়, এবং তাদের জন্য এই অভিযানটি ছিল একটি পরিপূর্ণ বিজয়। অন্যদিকে, ব্রিটেনের জন্য এটি ছিল একটি অপমানজনক পরাজয়। এই পরাজয়ের ফলে ইরানিদের দৃষ্টিতে ব্রিটিশদের মর্যাদা দারুণভাবে হ্রাস পায় এবং ইরান জুড়ে ব্রিটিশ আধিপত্যের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিক্রিয়ার বহিঃপ্রকাশ ঘটে। আশ্চর্যজনকভাবে, শ্বেত রুশরাও তাদের ‘মিত্র’ ব্রিটিশদের পরাজয়ে খুশিই হয়েছিল। আঞ্জালির যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী শ্বেত রুশ কর্মকর্তা আনাতোলি ভাকস্মুৎ–এর মতে, লাল রুশদের বিজয়ে শ্বেত রুশরা গৌরব বোধ করছিল, কারণ লাল রুশরা তাদের শত্রু হলেও তারা রাশিয়ার ‘ঐতিহাসিক শত্রু’ ব্রিটেনকে পরাজিত করেছে! এটি থেকে ব্রিটিশদের প্রতি শ্বেত রুশদের মনোভাব কেমন ছিল সেই বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

আঞ্জালিতে ব্রিটিশরা অপমানজনকভাবে পরাজিত হলেও সোভিয়েত রাশিয়ার সঙ্গে নতুন করে যুদ্ধে জড়ানোর কোনো ইচ্ছে তাদের ছিল না। ফলে তারা এই ঘটনার প্রতি কোনো প্রতিক্রিয়া প্রদর্শন থেকে বিরত থাকে। অন্যদিকে, আঞ্জালিতে অবস্থানরত ইরানি সৈন্যরা এই যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেনি, এবং যুদ্ধের সময় তারা সম্পূর্ণভাবে নিরপেক্ষ ছিল। কিন্তু ইরানি সরকার লাল রুশ সৈন্যদের দ্বারা ইরানি ভূখণ্ড দখলের প্রতিবাদ জানিয়ে সোভিয়েত রুশ সরকারের কাছে একটি চিঠি প্রেরণ করে। অবশ্য সেসময় স্থায়ীভাবে আঞ্জালি দখল করে রাখার কোনো পরিকল্পনা মস্কোর ছিল না। অবশেষে ১৯২১ সালে সোভিয়েত রাশিয়া ও ইরানের মধ্যে মৈত্রী চুক্তি স্বাক্ষরিত হওয়ার পর মস্কো আঞ্জালি বন্দরকে ইরানের কাছে হস্তান্তর করে এবং সেখান থেকে সৈন্য প্রত্যাহার করে নেয়।

Related Articles