স্যাটেলাইট স্টেট: পরাধীনতায় মোড়া স্বাধীনতা

কৃত্রিম স্যাটেলাইট সম্পর্কে আমাদের সবারই কম-বেশি ধারণা আছে। সাধারণত কোনো বৃহৎ গ্রহ কিংবা উপগ্রহের চারপাশে স্যাটেলাইটগুলোকে নির্দিষ্ট কক্ষপথে স্থাপন করা হয় এবং সেগুলো মহাশূন্যে চলমান অবস্থায় থাকে। স্যাটেলাইটে বিজ্ঞানীরা স্বয়ংক্রিয় যোগাযোগের ব্যবস্থা রাখেন যাতে করে পৃথিবী থেকে স্যাটেলাইটের উদ্দেশ্যে কোনো সিগন্যাল প্রেরণ করা হলে স্যাটেলাইট সেগুলো গ্রহণ করতে পারে এবং ট্রান্সপন্ডারের মাধ্যমে পৃথিবীতে ফিরতি সিগন্যাল প্রেরণের সক্ষমতা রাখে। স্যাটেলাইটের মাধ্যমে আমরা যেমন আবহাওয়ার পূর্বাভাস পেয়ে থাকি ও টেলিভিশন দেখতে পারি, তেমনই পৃথিবীর অনেক শক্তিশালী দেশের সেনাবাহিনী প্রতিপক্ষের উপর নজরদারি চালানোর জন্য স্যাটেলাইট প্রেরণ করে। এছাড়াও আরও নানাবিধ কাজেই ব্যবহৃত হয় স্যাটেলাইট। মোটামুটি স্যাটেলাইট সম্পর্কে এসবই অধিকাংশের ধারণা।

রাজনৈতিক বিশ্বের ‘স্যাটেলাইট স্টেট’ সম্পর্কে আমাদের ধারণা খুবই সীমিত, একেবারে নেই বললেই চলে। অথচ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে পৃথিবীতে ‘স্যাটেলাইট স্টেট’ নিয়ে বিশদ আলোচনা ও তর্ক-বিতর্ক হয়েছে।

সাধারণভাবে বললে, ‘স্যাটেলাইট স্টেট’ বলতে এমন সব রাষ্ট্রকে বোঝানো হয়, যেগুলো কাগজে-কলমে স্বাধীন দেশ হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করলেও বাস্তবে কোনো বৃহৎ ও শক্তিশালী দেশের প্রভাব বলয়ে থাকার কারণে স্বকীয়তা হারিয়ে ফেলে। বৃহৎ দেশটি এক্ষেত্রে তার ‘স্যাটেলাইট স্টেট’ এর প্রতিরক্ষা খাত, অর্থনীতি ও রাজনীতি– সবক্ষেত্র নিয়ন্ত্রণ করতে শুরু করে এবং নিজের সিদ্ধান্তগুলো চাপিয়ে দেয়। এই কাজ করার জন্য শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলোর পক্ষ থেকে ‘স্যাটেলাইট স্টেট’গুলোতে পুতুল সরকার বসানোর বিষয়টি নিশ্চিত করতে হয়। পুতুল সরকার বলতে বোঝানো হচ্ছে এমন ধরনের রাজনীতিবিদদের রাষ্ট্রপরিচালনার দায়িত্ব দেয়া হয় যারা শক্তিশালী দেশগুলোর নিঃশর্ত তাবেদারি করতে বাধ্য থাকবে।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর পূর্ব ইউরোপের অনেক দেশে সোভিয়েত ইউনিয়নের একাধিপত্য প্রতিষ্ঠা করা হয়। অপরদিকে পশ্চিম ইউরোপের অনেক দেশে আমেরিকার আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হয়। পূর্ব ইউরোপের দেশগুলোতে সোভিয়েত ইউনিয়নের একাধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হওয়ায় সেই দেশগুলোকে (যেমন- হাঙ্গেরি, আলবেনিয়া, বুলগেরিয়া ইত্যাদি) ‘স্যাটেলাইট স্টেট’ বলা হতো।

জতকগলগলব
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ন্যাটো গঠনের পাল্টা প্রতিক্রিয়ায় পূর্ব ইউরোপের সাতটি দেশ নিয়ে সোভিয়েত ইউনিয়ন ‘ওয়ারশ প্যাক্ট’ চুক্তি স্বাক্ষর করে; image source: gojimo.com

স্যাটেলাইট স্টেটের উত্থান বুঝতে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর আমেরিকা ও সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যকার স্নায়ুযুদ্ধের সময়ের কিছু ঘটনার দিকে আলোকপাত করতে হবে। ১৯৪৯ সালে আমেরিকা ইউরোপের বেশ কিছু দেশের সাথে ন্যাটো (NATO – North Atlantic Treaty Organisation) প্রতিষ্ঠা করে। ন্যাটোর মূল কাজ ছিল এর সদস্য রাষ্ট্রগুলোর সামরিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। এর গঠনতন্ত্রে বলা হয়- এই সংগঠনের সদস্য রাষ্ট্রগুলো বাইরের কোনো দেশের সামরিক আক্রমণের শিকার হলে সম্মিলিতভাবে প্রতিরোধ করা হবে। এছাড়াও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর আমেরিকা ‘মার্শাল প্ল্যান’ নামে এক বিশদ পরিকল্পনা হাতে নেয়। এই পরিকল্পনার মাধ্যমে আমেরিকা পশ্চিম ইউরোপের দেশগুলোর দিকে অর্থনৈতিক সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেয়। আমেরিকার ভয় ছিল- হয়তো ইউরোপের এই দেশগুলো দ্রুত ক্ষয়ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে না পারলে কমিউনিস্ট শাসনব্যবস্থার গোড়াপত্তন ঘটতে পারে।

আমেরিকা যেভাবে ন্যাটো গঠন করেছিল, সোভিয়েত ইউনিয়নও পূর্ব ইউরোপীয় সাতটি দেশের (আলবেনিয়া, বুলগেরিয়া, চেকোস্লোভাকিয়া, পূর্ব জার্মানি, হাঙ্গেরি, পোল্যান্ড ও রোমানিয়া) সাথে ‘ট্রিটি অব ফ্রেন্ডশিপ, কো-অপারেশন অ্যান্ড মিউচুয়াল অ্যাসিস্টেন্স’ (Treaty of Friendship, Co-operation and Mutual Assistance) নামের এক চুক্তি করে। এই চুক্তি ‘ওয়ারশ প্যাক্ট’ (Warsaw Pact) হিসেবেই অধিক পরিচিত। চুক্তির মাধ্যমে এই দেশগুলোতে সোভিয়েত ইউনিয়নের সেনাবাহিনী সামরিক ঘাঁটি নির্মাণের অনুমোদন লাভ করে। এছাড়াও আমেরিকার মার্শাল প্ল্যানের মতো সোভিয়েত ইউনিয়নও ‘মলোটোভ প্ল্যান’ হাতে নেয়। মলোটোভ প্ল্যানের মাধ্যমে মধ্য ও পূর্ব ইউরোপীয় দেশগুলোতে অর্থনৈতিক সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেয়া হয়। আমেরিকার মতো সোভিয়েত ইউনিয়নেরও ভয় ছিল- যদি মস্কো থেকে সাহায্য পাঠানো না হয়, তাহলে হয়তো এই দেশগুলো আমেরিকার সাহায্য নিতে প্রলুব্ধ হবে। এভাবে দেশগুলোতে পুঁজিবাদের প্রতিষ্ঠা ঘটবে।

Hdkfkfkg
স্যাটেলাইট স্টেট গঠনের পেছনে স্নায়ুযুদ্ধের বিশাল অবদান রয়েছে; image source: time.com

আমেরিকার সাথে পশ্চিম ইউরোপের দেশগুলোর সম্পর্ক তৈরি হয় পরিবর্তিত পরিস্থিতির জন্য। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর এই দেশগুলোর দরকার ছিল অর্থনৈতিক সাহায্য, আবার আমেরিকারও দরকার ছিল কমিউনিজম প্রতিরোধ করা। তাই এই দেশগুলোর সাথে আমেরিকা অর্থনৈতিক ও সামরিক সম্পর্ক গড়ে তোলে। বিশ্বযুদ্ধের আগে এই দেশগুলোর সাথে আমেরিকার খুব গভীর সম্পর্ক ছিল না। কিন্তু সোভিয়েত ইউনিয়নের সাথে তার প্রতিবেশী দেশগুলোর ঐতিহাসিক সম্পর্ক ছিল। রুশ সাম্রাজ্যের অধীনে এই দেশগুলোর অন্তর্ভুক্তিও বিরাট ভূমিকা রেখেছিল ওয়ারশ চুক্তির পেছনে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জার্মানি যখন সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন ঘটানোর জন্য পৃথিবীর ইতিহাসের সবচেয়ে বড় সামরিক অভিযান ‘অপারেশন বারবারোসা’ পরিচালনা করে, তখন আগে এই দেশগুলোর পতন হয়। সোভিয়েত ইউনিয়ন শেষপর্যন্ত জার্মানদের পরাজিত করতে সক্ষম হয় এবং একেবারে বার্লিন পর্যন্ত দখল করে নেয়। পূর্ব-ইউরোপের দেশগুলোতে নাৎসিদের পরাজিত করতে মূল ভূমিকা পালন করে স্ট্যালিনের সোভিয়েত সেনাবাহিনী। এজন্য যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর স্বাভাবিকভাবেই এই দেশগুলো সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রতি কৃতজ্ঞ ছিল।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হওয়ার কিছুদিন আগে ইয়াল্টা সম্মেলনে যুদ্ধপরবর্তী সময়ে ইউরোপের চেহারা কেমন হবে– এ নিয়ে মিত্রপক্ষের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিদের নিয়ে এক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। সম্মেলনে স্ট্যালিন অন্য রাষ্ট্রপ্রধানদের বলেছিলেন, পূর্ব-ইউরোপীয় দেশগুলোতে সোভিয়েত আধিপত্য বজায় রাখা জরুরি, কারণ জার্মানি প্রতিবার এই পূর্ব-ইউরোপীয় দেশগুলোর উপর দিয়েই সোভিয়েত ইউনিয়নের উপর হামলা করে। তবে তিনি সম্মেলনে প্রতিশ্রুতি দেন- কমিউনিজম প্রতিষ্ঠার জন্য তিনি বলপ্রয়োগের কৌশল গ্রহণ করবেন না ও বিশ্বযুদ্ধ শেষ হওয়ার পর খুব অল্প সময়ের মধ্যে বহুদলীয় নির্বাচন সম্পন্ন করবেন। পরবর্তীতে তার প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী ঠিকই দেশগুলোতে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। কিন্তু তিনি সেনাবাহিনী ও গোয়েন্দা বাহিনী পাঠিয়ে নির্বাচনে তার প্রতি অনুগত রাজনৈতিক দলগুলোকে বিজয়ের সুযোগ করে দেন। এজন্য বাকি ইউরোপীয় দেশগুলোতে যেন সোভিয়েত আগ্রাসন আঘাত হানতে না পারে, তাই মার্শাল প্ল্যান হাতে নেয়া হয় ও ন্যাটো গঠন করা হয়।

Hdiitkfkfkfjd
ইয়াল্টা সম্মেলনে পূর্ব ইউরোপের দেশগুলোর উপর স্ট্যালিন কর্তৃত্ব আরোপের কথা নিশ্চিত করেন; image source: history.com

পরবর্তীতে, ১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন ঘটে। ১৯৮৫ সালের দিক থেকেই ভাবা হচ্ছিল- সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন আসন্ন। তাই স্যাটেলাইট স্টেটগুলোতে সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রভাব বলয় থেকে বের হওয়ার জন্য ছোটখটো আন্দোলন গড়ে উঠতে শুরু করে। সোভিয়েত ইউনিয়ন এসব আন্দোলন দমনের জন্য আগের মতো আর কঠোরপন্থা অবলম্বনে আগ্রহী হয়নি। এছাড়া, আমেরিকা যেসব দেশকে সাহায্য করেছিল, তারা অর্থনৈতিক দিক থেকে সোভিয়েত স্যাটেলাইট স্টেটগুলোর চেয়ে অনেক উন্নতি করেছিল। সোভিয়েতপন্থী শাসকদের কঠোর দমন-পীড়ন ও অতি ধীরগতির অর্থনৈতিক উন্নয়নের কারণে একসময় এই দেশগুলোর মানুষেরা হাঁপিয়ে ওঠে। তাই ১৯৯০ সালের দিকে ওয়ারশ প্যাক্ট থেকে দেশগুলো একে একে বেরিয়ে যেতে শুরু করে।

মজার বিষয় হচ্ছে, আমেরিকা ও পশ্চিম ইউরোপের দেশগুলো সোভিয়েত স্যাটেলাইট স্টেট নিয়ে বেশি করে প্রচারণা চালালেও পশ্চিমা দেশগুলোর মধ্যেও কিন্তু আমেরিকার স্যাটেলাইট স্টেট হওয়ার সমস্ত উপকরণ ছিল। মার্শাল প্ল্যান ও ন্যাটো গঠনের মাধ্যমে ইউরোপের দেশগুলোর উপর আমেরিকা ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করতে শুরু করে। আমেরিকা বিশ্বযুদ্ধে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতার সুযোগ নিয়ে দেশগুলোর অর্থনীতি, রাজনীতি ও সামরিক বাহিনীর উপরও প্রভাব বিস্তারে সফল হয়। আমেরিকা-প্রভাবিত বিশ্বব্যাংক ও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল এই দেশগুলোর অর্থনীতি উদারীকরণের জন্য বেশ কিছু অর্থনৈতিক সংস্কারের প্রস্তাব দেয় এবং দেশগুলো সেগুলো মেনে নিতে বাধ্য হয়। এছাড়াও, আমেরিকার পরামর্শে সামরিক বাহিনীর আধুনিকায়নের উপর জোর দেয় এই দেশগুলো। যেহেতু আমেরিকা ছিল পুঁজিবাদের অভিভাবক, তাই এই দেশগুলোতে নির্বাচনের মাধ্যমে যেন কখনও কমিউনিস্টরা শাসনক্ষমতায় আসতে না পারে, সেটাও নিশ্চিত করে আমেরিকা।

Related Articles