ইউএস বাংলা ফ্লাইট বিএস২২১ এর মর্মান্তিক দুর্ঘটনাটি ঘটেছে নেপালের রাজধানী কাঠমান্ডুর ত্রিভুবন ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্টে। নিহত হয়েছে অন্তত ৪৯ জন, যাদের মধ্যে অনেকেই বাংলাদেশী। যদিও বিভিন্ন গণমাধ্যমে পাইলটের সাথে এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোলারের কথপোকথনের সময় সৃষ্ট ভুল বোঝাবুঝি, বিমানের যান্ত্রিক ত্রুটি, পাইলটের ভুল, প্রভৃতি সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা করা হচ্ছে, কিন্তু দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ জানতে হয়তো আমাদেরকে অপেক্ষা করতে হবে আরো কিছু দিন।

এই দুর্ঘটনাটির কারণে যা-ই হোক না কেন, ত্রিভুবন এয়ারপোর্টে সংঘটিত এটিই একমাত্র কিংবা সবচেয়ে মারাত্মক দুর্ঘটনা নয়। গত কয়েক দশক জুড়ে অনেকগুলো বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটেছে এই এয়ারপোর্টটিতে। এর মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ ছিল ১৯৯২ সালের পাকিস্তান ইন্টারন্যাশনাল এয়ারলাইন্সের একটি বিমান বিধ্বস্ত হওয়ার ঘটনা। সে ঘটনায় নিহত হয় বিমানটির ১৬৭ জন আরোহীর সকলেই।

ত্রিভুবন ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্টটি হচ্ছে নেপালের একমাত্র আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর। তবে নেপালে এর বাইরেও অনেকগুলো স্থানীয় বিমানবন্দর আছে। এ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরটির অবস্থান রাজধানীর কেন্দ্র থেকে ছয় কিলোমিটার দূরে কাঠমান্ডু উপত্যকায়। সমুদ্র সমতল থেকে এর উচ্চতা ১,৩৩৮ মিটার এবং এর রানওয়ের দৈর্ঘ্য প্রায় তিন কিলোমিটার।

নেপালের ভূ-প্রাকৃতিক গঠনের কারণে এখানে প্রচুর উঁচু পাহাড় অবস্থিত। এসব পাহাড় মাঝে মাঝেই দুর্ঘটনার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। এছাড়া ত্রিভুবন এয়ারপোর্টটিতে ‘ইনস্ট্রুমেন্ট ল্যান্ডিং সিস্টেম’ নেই। বিশেষ এই সিস্টেম থাকলে খারাপ আবহাওয়ার কারণে খালি চোখে রানওয়ে দেখা না গেলেও যন্ত্রের সাহায্যে রানওয়ের অবস্থান শনাক্ত করা সম্ভব হয়।

ত্রিভুবন ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্টের রানওয়ে; Source: Wikimedia Commons

ইউএস বাংলা ফ্লাইটের দুর্ঘটনার পর থেকে অনেক বাংলাদেশী পত্রিকা এবং অনলাইন মিডিয়াতে ত্রিভুবন এয়ারপোর্টকে বিশ্বের সবচেয়ে বিপজ্জনক এয়ারপোর্ট হিসেবে উল্লেখ করা হচ্ছে। তবে এটি পুরোপুরি সত্য নয়। বিশ্বের সবচেয়ে বিপজ্জনক বিমানবন্দর হিসেবে যে এয়ারপোর্টটির নাম পওয়া যায়, সেটি হচ্ছে নেপালের লুকলা এয়ারপোর্ট

এছাড়াও বিবিসির বরাত দিয়ে বাংলাদেশের একটি জনপ্রিয় পত্রিকা জানিয়েছে, ত্রিভুবনে আন্তর্জাতিক ফ্লাইট চালুর পর থেকে এ পর্যন্ত সেখানে ৭০টিরও বেশি দুর্ঘটনা ঘটেছে এবং ৬৫০ জনের বেশি মারা গেছে। কিন্তু বিবিসির মূল প্রতিবেদনে গিয়ে দেখা যায়, এটাও ভুল তথ্য। বিবিসির পরিসংখ্যানটি সমগ্র নেপালের পরিসংখ্যান, শুধু ত্রিভুবন এয়ারপোর্টের না।

আরো একটি দাবি করা হয়েছে পত্রিকাটিতে। বলা হয়েছে, ২০১৬ সালে ত্রিভুবন এয়ারপোর্টে একটি টুইন অটার প্লেন ক্র্যাশ করেছিল, যেখানে ২৩ জন যাত্রী নিহত হয়েছিল। এটাও সত্য নয়। ঐ দুর্ঘটনাটিও নেপালেই সংঘটিত হয়েছিল, কিন্তু ত্রিভুবনের সাথে এর কোনো সম্পর্ক ছিল না। ওটা ছিল পোখারা এয়ারপোর্ট থেকে জমসমের উদ্দেশ্যে যাওয়ার পথের ঘটনা।

তবে পত্রিকায় আসা এসব তথ্য ভুল কিংবা মিথ্যা হলেও এটা সত্য যে, ত্রিভুবন ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্টে এ পর্যন্ত অনেকগুলো মারাত্মক বিমান দুর্ঘটনা ঘটেছে। চলুন জেনে নিই এখানের উল্লেখযোগ্য কিছু বিমান দুর্ঘটনার কথা।

টার্কিশ এয়ারলাইন্স ফ্লাইট, টিকে ৭২৬, মার্চ ২০১৫

কুয়াশাচ্ছান্ন রানওয়ের পাশে মুখ থুবড়ে পড়া বিমান থেকে বেরিয়ে আসছে যাত্রীরা; Source: NBC News

রানওয়ের পাশে আটকে থাকা বিমানটি; Source: PRAKASH MATHEMA/ AFP

২০১৫ সালের ৪ মার্চ ইস্তাম্বুল থেকে কাঠমান্ডুগামী টার্কিশ এয়ারলাইন্সের একটি বিমান ত্রিভুবন এয়ারপোর্টের রানওয়েতে দুর্ঘটনায় পতিত হয়। সেদিন কাঠমান্ডুর আকাশ ছিল ঘন কুয়াশায় আচ্ছন্ন। টার্কিশ এয়ারলাইন্সের ফ্লাইট টিকে ৭২৬ এর এয়ারবাস ৩৩০ বিমানটি এর ২২৪ জন যাত্রী এবং ১১জন ক্রুসহ সাত ঘন্টার যাত্রা শেষে যখন কাঠমান্ডুতে অবতরণের চেষ্টা করে, তখনই এ দুর্ঘটনাটি ঘটে।

কুয়াশার কারণে প্লেনটি প্রথমবার অবতরণে ব্যর্থ হয়ে আধঘন্টা ধরে কাঠমান্ডুর আকাশে চক্কর দিতে থাকে। পরে দ্বিতীয়বার যখন এটি রানওয়েতে নামার চেষ্টা করে, তখন শিশির ভেজা রানওয়েতে প্লেনটির চাকা পিছলে যায় এবং এটি রানওয়ে থেকে সরে পাশের নরম ঘাসের মাটিতে গিয়ে মুখ থুবড়ে পড়ে। সৌভাগ্যবশত প্লেনটির যাত্রী বা ক্রুদের কেউ গুরুতর আহত হয়নি। আরোহীদের সবাইকে দ্রুত টার্মিনালে সরিয়ে নেওয়া হয়। কিন্তু দুর্ঘটনার কারণে এয়ারপোর্টটিতে সেদিনের জন্য বিমান ওঠা-নামা বন্ধ করে দেওয়া হয়।

সিতা এয়ার ফ্লাইট ৬০১, সেপ্টেম্বর ২০১২

সিতা এয়ারের বিধ্বস্ত প্লেনটি; Source: Mirror

সিতা এয়ার ফ্লাইট ৬০১ ছিল নেপালের অাভ্যন্তরীণ একটি ফ্লাইট। ২০১২ সালের ২৮ ডিসেম্বর ফ্লাইটটির ডর্নিয়ার ২২৮ প্লেনটি ত্রিভুবন এয়ারপোর্ট ছেড়ে জনপ্রিয় পর্যটন স্থান লুকলার তেনজিং-হিলারী এয়ারপোর্টের উদ্দেশ্যে যাত্রা করে। যাত্রা শুরুর পরপরই পাইলট কন্ট্রোল টাওয়ারের সাথে যোগাযোগ করেন এই বলে যে, তিনি প্লেনটিতে অস্বাভাবিকত্ব অনুভব করছেন। তিনি ত্রিভুবনে ফিরে আসার অনুমতি চান।

অনুমতি পাওয়ার পরপর পাইলট প্লেনটির দিক ঘুরিয়ে ল্যান্ড করার প্রস্তুতি নেন। কিন্তু রানওয়েতে পৌঁছার পূর্বেই ২ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত মনোহারা নদীর তীরে প্লেনটি বিধ্বস্ত হয়। প্লেনটির ১৯ জন আরোহীর সবাই ঘটনাস্থলে নিহত হয়। এটি ছিল ২০০২ সাল থেকে শুরু করে তখন পর্যন্ত সংঘটিত বিশ্বের সবচেয়ে ভয়াবহ দশটি বিমান দুর্ঘটনার একটি। পরবর্তীতে তদন্তে দেখা যায়, শকুনের আঘাতে প্লেনটি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার কারণেই দুর্ঘটনাটি ঘটেছিল।

বুদ্ধ এয়ার ফ্লাইট ১০৩, সেপ্টেম্বর ২০১১

বুদ্ধ এয়ারের প্লেনটির ধ্বংসাবশেষের পাশে গ্রামবাসী; Source: Niranjan Shrestha/ AP Photo

নেপালের বুদ্ধ এয়ার ফ্লাইট ১০৩ হচ্ছে দর্শনার্থীদেরকে প্লেনে করে হিমালয় দেখানোর একটি বিশেষ ফ্লাইট। ২০১১ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর ১৯ জন যাত্রী নিয়ে হিমালয় দর্শন শেষে ত্রিভুবন এয়ারপোর্টে ফেরার সময় ফ্লাইটটির বিচক্র্যাফট ১৯০০ ডি প্লেনটি বিধ্বস্ত হয়। প্রচণ্ড কুয়াশা এবং বৃষ্টিপাতের কারণে দৃষ্টিসীমা হ্রাস পাওয়ায় প্লেনটি দুর্ঘটনায় পতিত হয়। এটি কাঠমান্ডু থেকে ১০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত গোদাভরি এলাকায় কোতদাদা নামের একটি পাহাড়ের গায়ে আছড়ে পড়ে। স্থানীয়দের দেয়া তথ্য অনুযায়ী এটি একটি বাড়ির ছাদেও আঘাত করে। প্লেনটির ১৯ জন আরোহীর সকলেই ঘটনাস্থলে নিহত হয়।

অগ্নি এয়ার ফ্লাইট ১০১, আগস্ট ২০১০

বাসিতপুরে অগ্নি এয়ারের প্লেনটির বিচ্ছিন্ন ধ্বংসাবশেষ; Source: avherald.com

২০১০ সালের আগস্টের ২৪ তারিখে নেপালের স্থানীয় অগ্নি এয়ারের ফ্লাইট ১০১ এর ডর্নিয়ার ২২৮ প্লেনটি ত্রিভুবন এয়ারপোর্ট থেকে যাত্রা শুরু করেছিল পর্যটন শহর লুকলার উদ্দেশ্যে। এতে ১১ জন যাত্রী এবং ৩ জন ক্রু ছিল। যাত্রা শুরুর ২০ মিনিটের মাথায়ই ক্রুরা কন্ট্রোল টাওয়ারের সাথে যোগাযোগ করে যান্ত্রিক ত্রুটির কথা জানায় এবং ত্রিভুবন এয়ারপোর্টে ফিরে যাওয়ার অনুরোধ জানায়। কিন্তু খারাপ আবহাওয়ার কারণে ত্রিভুবন এয়ারপোর্ট প্লেনটিকে সেখানে অবতরণের অনুমতি না দিয়ে সিমারা নামক অন্য একটি এয়ারপোর্টে অবতরণের পরামর্শ দেয়।

এর ৫ মিনিট পরেই প্লেনটির সাথে ত্রিভুবনের কন্ট্রোল টাওয়ারের সকল যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। পরবর্তীতে কাঠমান্ডু থেকে ৮০ কিলোমিটার দূরে বাসিতপুর নামক এলাকায় প্লেনটির ধ্বংসাবশেষ খুঁজে পাওয়া যায়। খারাপ আবহাওয়া এবং যান্ত্রিক ত্রুটির সমন্বিত কারণে প্লেনটি দুর্ঘটনায় পতিত হয়েছে বলে ধারণা করা হয়। এর ধ্বংসাবশেষ প্রায় ১০০ মিটার ব্যাসার্ধের এলাকা জুড়ে ছড়িয়ে পড়ে। এর আঘাতে স্থানীয় একটি স্কুলের মাঠে ৩ মিটার গভীর খাদের সৃষ্টি হয়। ১৪ জন আরোহীর সকলেই নিহত হয়।

লুফথান্সা কার্গো ফ্লাইট ৮৫৩৩, জুলাই ১৯৯৯

১৯৯৯ সালের ৭ জুলাই জার্মানির লুফথান্সা কার্গো এয়ারলাইন্সের ফ্লাইট ৮৫৩৩ এর একটি বোয়িং ৭২৭ প্লেন ত্রিভুবন এয়ারপোর্ট থেকে যাত্রা শুরু করে। প্লেনটিতে মোট ২১ টন কার্গো ছিল, যার অধিকাংশই ছিল উলের কার্পেট। গন্তব্যস্থল ছিল ভারতের দিল্লীর ইন্দিরা গান্ধী ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্ট। যাত্রা শুরুর ৫ মিনিটের মাথায়ই প্লেনটি কাঠমান্ডু থেকে ১১ কিলোমিটার দূরের একটি পাহাড়ের গায়ে বিধ্বস্ত হয় এবং এর ৫ ক্রুর সকলে নিহত হয়। দুর্ঘটনার কারণ হিসেবে ক্রুদের অনভিজ্ঞতাকে দায়ী করা হয়।

পিআইএ ফ্লাইট ২৬৮, সেপ্টেম্বর ১৯৯২

নিহতদের স্মরণে কাঠমান্ডুতে নির্মিত স্মৃতিসৌধের প্রবেশপথ; Source: Dawn

১৯৯২ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর পাকিস্তান ইন্টারন্যাশনাল এয়ারলাইন্সের ফ্লাইট ২৬৮ এর একটি এয়ার বাস বিমান করাচির জিন্নাহ ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্ট থেকে নেপালের ত্রিভুবন এয়ারপোর্টের উদ্দেশ্যে যাত্রা করে। ত্রিভুবনের এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোলারদের নির্দেশ অনুযায়ী কাঠমান্ডু থেকে ৬৬ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত ‘রোমিও’ নামক পয়েন্ট থেকে প্লেনটির ১৫ হাজার ফুট থেকে শুরু করে সাতটি ধাপে ধীরে ধীরে নিচে নেমে আসার কথা ছিল।

কিন্তু পাইলটের ভুলের কারণে এটি প্রতিটি ধাপের হিসেব একটু আগে থেকে শুরু করে দেয়। ফলে কাঠমান্ডুতে প্রবেশের পূর্বে যখন এর থাকার কথা ছিল ৯,৫০০ ফুট উপরে, তখন এটি উড়ছিল ৭,৩০০ ফুট উপর দিয়ে। এরকম অবস্থায় প্লেনটি ৮,২৫০ ফুট উঁচু একটি পাহাড়ের গায়ে আঘাত করে এবং টুকরো টুকরো হয়ে পড়ে। এর ১৬৭ যাত্রীর সবাই ঘটনাস্থলে নিহত হয়। এটি ত্রিভুবন এয়ারপোর্টের সবচেয়ে মর্মান্তিক দুর্ঘটনা।

ফিচার ইমেজ- Mirror