যেসব রাষ্ট্রে ব্রিটিশরা কখনো আক্রমণ করেনি (পর্ব – ২): উজবেকিস্তান ও কঙ্গো

[প্রথম পর্বের পর]

উজবেকিস্তান

‘উজবেকিস্তান প্রজাতন্ত্র’ (উজবেক: Oʻzbekiston Respublikasi) মধ্য এশিয়ায় অবস্থিত একটি স্থলবেষ্টিত মাঝারি আকৃতির রাষ্ট্র। ৪,৪৮,৯৭৮ বর্গ কি.মি. আয়তনবিশিষ্ট রাষ্ট্রটির উত্তরে কাজাখস্তান, উত্তর–পূর্বে কিরগিজস্তান, দক্ষিণ–পূর্বে তাজিকিস্তান, দক্ষিণে আফগানিস্তান এবং দক্ষিণ–পশ্চিমে তুর্কমেনিস্তান অবস্থিত। উজবেকিস্তানের সীমান্তবর্তী রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে প্রত্যেকটিই স্থলবেষ্টিত রাষ্ট্র। বিশ্বে মোট দুটি এমন রাষ্ট্র রয়েছে, যারা চতুর্দিকে স্থলবেষ্টিত রাষ্ট্রসমূহ দ্বারা পরিবেষ্টিত। উজবেকিস্তান এই দুটি রাষ্ট্রের মধ্যে একটি। যেহেতু উজবেকিস্তান একটি স্থলবেষ্টিত রাষ্ট্র এবং এর প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোও স্থলবেষ্টিত, বিখ্যাত ব্রিটিশ নৌবহরের পক্ষে অঞ্চলটিতে পৌঁছান সম্ভব ছিল না। ফলে এই অঞ্চলে সামরিক অভিযান চালানো ছিল ব্রিটেনের জন্য খুবই কঠিন।

অবশ্য তাই বলে যে ব্রিটিশরা এতদঞ্চলে প্রভাব বিস্তারের প্রচেষ্টা চালায়নি, এমন নয়। বস্তুত ১৮১৫ সালে ফরাসি সম্রাট নেপোলিয়নের চূড়ান্ত পরাজয়ের পর থেকেই মধ্য এশিয়ায় প্রভাব বিস্তারের জন্য ব্রিটেন ও রাশিয়ার মধ্যে সূক্ষ্ম প্রতিযোগিতা শুরু হয়। এই ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতা ব্রিটেনে ‘মহৎ ক্রীড়া’ (The Great Game) নামে এবং রাশিয়ায় ‘প্রতিবিম্বের টুর্নামেন্ট’ (Tournament of the Shadows) নামে পরিচিতি অর্জন করে। মধ্য এশীয় রাষ্ট্রগুলোতে প্রভাব বিস্তারের জন্য চলমান রুশ–ব্রিটিশ প্রতিযোগিতার একটি ক্ষেত্র ছিল ‘বুখারা আমিরাত’। বর্তমান উজবেকিস্তান ও তাজিকিস্তানের একটি বড় অংশ এবং তুর্কমেনিস্তানের অংশবিশেষ নিয়ে মাঙ্গিত বংশের শাসনাধীন এই রাষ্ট্রটি গঠিত ছিল। এই রাষ্ট্রকে বর্তমান উজবেকিস্তানের পূর্বসূরী রাষ্ট্র হিসেবে বিবেচনা করা হয়। নেপোলিয়নীয় যুদ্ধসমূহের অবসানের পর এই অঞ্চলে যাতে রুশরা প্রভাব বিস্তার লাভ করতে না পারে, সেটি নিশ্চিত করার জন্য ব্রিটিশরা সক্রিয় হয়ে ওঠে।

১৮৩০–এর দশকে ব্রিটিশ পরিব্রাজক ও কূটনীতিবিদ ক্যাপ্টেন স্যার আলেকজান্ডার বার্নস বুখারা সফর করেন এবং এই অভিযানের জন্য তিনি ব্রিটিশ জনসাধারণের কাছে ‘বুখারা বার্নস’ (Bukhara Burnes) নামে পরিচিতি অর্জন করেন। ১৮৩৮ সালে ব্রিটিশ গোয়েন্দা কর্মকর্তা কর্নেল চার্লস স্টডার্ট বুখারায় গমন করেন। তার উদ্দেশ্য ছিল বুখারায় থাকা রুশ ক্রীতদাসদের মুক্ত করা (যাতে রুশরা বুখারায় হস্তক্ষেপ করার কোনো অজুহাত না পায়) এবং বুখারার আমিরকে ব্রিটেনের সঙ্গে মৈত্রী চুক্তিতে স্বাক্ষর করার জন্য রাজি করানো। কিন্তু বুখারার তদানীন্তন আমির নাসরুল্লাহ খান স্টডার্টকে বন্দি করে রাখেন।

বুখারা আমিরাতের রাষ্ট্রীয় পতাকা; Source: Wikimedia Commons

১৮৪১ সালে ব্রিটিশ গোয়েন্দা কর্মকর্তা ক্যাপ্টেন আর্থার কনোলি বুখারায় গমন করেন। উল্লেখ্য, কনোলিই প্রথম ব্যক্তি, যিনি ‘গ্রেট গেম’ শব্দগুচ্ছটি ব্যবহার করেছিলেন বলে জানা যায়। বুখারায় পৌঁছে তিনি কর্নেল স্টডার্টকে মুক্তি প্রদান করার জন্য বুখারার আমিরকে রাজি করানোর চেষ্টা করেন। কিন্তু নাসরুল্লাহ খান তাকেও বন্দি করে রাখেন এবং অবশেষে ১৮৪২ সালের ২৪ জুন আমিরের নির্দেশে স্টডার্ট ও কনোলিকে ‘ব্রিটিশ গুপ্তচর’ হিসেবে আখ্যায়িত করে তাদের শিরশ্ছেদ করা হয়। এর মধ্য দিয়ে বুখারায় প্রভাব বিস্তারের ব্রিটিশ প্রচেষ্টা শোচনীয়ভাবে ব্যর্থ হয়।

এদিকে ১৮৩৯–৪২ সালের প্রথম ব্রিটিশ–আফগান যুদ্ধে ব্রিটেন শোচনীয়ভাবে পরাজিত হয় এবং আফগানিস্তান থেকে সৈন্য প্রত্যাহার করে নিতে বাধ্য হয়। ব্রিটিশ–শাসিত ভারতবর্ষ ও বুখারার মধ্যে কোনো সীমান্ত ছিল না এবং ব্রিটিশ–নিয়ন্ত্রিত ভারত থেকে বুখারায় পৌঁছানোর জন্য আফগানিস্তান অতিক্রম করতে হতো। কিন্তু আফগানিস্তানে ব্রিটেন পরাজিত হওয়ার পর ঐ অঞ্চলের মধ্য দিয়ে বুখারায় সৈন্য প্রেরণ করা তাদের পক্ষে সম্ভব ছিল না। এজন্য ব্রিটিশদের পক্ষে বুখারা আক্রমণ করা কিংবা স্টডার্ট ও কনোলির মৃত্যুর ‘প্রতিশোধ’ নেয়া সম্ভব হয়নি।

রুশদের জন্য অবশ্য বুখারা আক্রমণের পথে এরকম কোনো প্রতিবন্ধকতা ছিল না। এর ফলে ১৮৬০–এর দশকে রাশিয়া বুখারা আক্রমণ করে এবং ১৮৬৮ সাল নাগাদ বুখারাকে পরাজিত করে রাষ্ট্রটির ভূখণ্ডের একটি বড় অংশ দখল করে নেয়। রাশিয়া কর্তৃক বুখারার দখলকৃত অংশকে রুশরা তুর্কিস্তান জেনারেল–গভর্নরেটের অন্তর্ভুক্ত করে, যেটির রাজধানী ছিল তাসখন্দ। ১৮৭৩ সালে রাশিয়া ও বুখারার মধ্যে একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয় এবং এই চুক্তি অনুযায়ী বুখারার অবশিষ্টাংশ কার্যত রাশিয়ার একটি ‘আশ্রিত রাষ্ট্রে’ (protectorate) পরিণত হয়। ১৯১৭ সালের রুশ বিপ্লব পর্যন্ত রাশিয়া ও বুখারার মধ্যে অনুরূপ সম্পর্ক বজায় ছিল। 

‘তাসখন্দ সোভিয়েতে’র কার্যালয়। ব্রিটেন তাসখন্দ সোভিয়েতের সঙ্গে একটি সমঝোতায় পৌঁছানোর মধ্য দিয়ে তুর্কিস্তানকে ব্রিটিশ প্রভাব বলয়ের অন্তর্ভুক্ত করতে আগ্রহী ছিল; Source: Wikimedia Commons

এসময় ব্রিটিশদের পক্ষে বুখারায় রুশ আধিপত্য বিস্তার রোধের জন্য কার্যকর কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করা সম্ভব হয়নি। অবশ্য ১৮৭৮–৮০ সালের দ্বিতীয় ব্রিটিশ–আফগান যুদ্ধে ব্রিটেন বিজয়ী হয় এবং আফগানিস্তান ব্রিটেনের একটি আশ্রিত রাষ্ট্রে পরিণত হয়। এর ফলে ব্রিটেনের জন্য আফগানিস্তানের মধ্য দিয়ে বুখারা আক্রমণের সুযোগ সৃষ্টি হয়। কিন্তু সেসময় বুখারা ছিল কার্যত রাশিয়ার আশ্রিত রাষ্ট্র। ফলে ব্রিটেন বুখারা আক্রমণ করলে ব্রিটেন ও রাশিয়ার মধ্যে যুদ্ধ শুরু হয়ে যেত। রাশিয়ার সঙ্গে যুদ্ধে জড়াতে ব্রিটেন আগ্রহী ছিল না, এজন্য তারা এ সময় এই জাতীয় কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করা থেকে বিরত থাকে।

কিন্তু ১৯১৭ সালে রাশিয়ায় সংঘটিত বলশেভিক বিপ্লব/অভ্যুত্থানের পর ব্রিটেনের জন্য এতদঞ্চলে প্রভাব বিস্তারের একটি নতুন সুযোগ সৃষ্টি হয়। বলশেভিক বিপ্লব/অভ্যুত্থানের পর রাশিয়া জুড়ে গৃহযুদ্ধ আরম্ভ হয়ে যায় এবং বলশেভিক কেন্দ্রীয় সরকার রাশিয়ার প্রান্তিক অঞ্চলগুলোর ওপর থেকে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে। এমতাবস্থায় ১৯১৮ সালের এপ্রিলে তুর্কিস্তান জেনারেল–গভর্নরেটের ভূখণ্ডে বলশেভিকরা ‘তুর্কিস্তান সোভিয়েত ফেডারেটিভ প্রজাতন্ত্র’ নামক একটি আইনত স্বাধীন (কিন্তু কার্যত মস্কোর বলশেভিক কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কযুক্ত) রাষ্ট্র স্থাপন করে। অবশ্য ১৯২০ সাল পর্যন্ত বলশেভিকবিরোধীদের সঙ্গে উক্ত বলশেভিক রাষ্ট্রটির দ্বন্দ্ব চলতে থাকে। অন্যদিকে, বলশেভিক কেন্দ্রীয় সরকারের দুর্বলতার সুযোগে বুখারার আমির কার্যত স্বাধীনভাবে রাষ্ট্রীয় কার্যক্রম পরিচালনা করতে শুরু করেন।

এদিকে ১৯১৮ সালে মিত্রশক্তির রাশিয়া আক্রমণের অংশ হিসেবে ব্রিটেন রাশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলে আক্রমণ চালায় এবং এর অংশ হিসেবে জেনারেল উইলফ্রিড ম্যালেসনের নেতৃত্বাধীন একটি ব্রিটিশ সৈন্যদল বর্তমান তুর্কমেনিস্তানের ভূখণ্ডে (তৎকালে রাশিয়ার অধীন) আক্রমণ চালায়। একই সময়ে ব্রিটিশ গোয়েন্দা কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কর্নেল ফ্রেডেরিক বেইলি তুর্কিস্তান সোভিয়েত ফেডারেটিভ প্রজাতন্ত্রের রাজধানী তাসখন্দে গমন করেন এবং ‘তাসখন্দ সোভিয়েতে’র প্রধানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। তার উদ্দেশ্য ছিল তাসখন্দ সোভিয়েত ও ব্রিটেনের মধ্যে এক ধরনের সমঝোতা স্থাপন করা এবং এর মধ্য দিয়ে তুর্কিস্তানকে বলশেভিক রাশিয়া থেকে বিচ্ছিন্ন করে ব্রিটিশ প্রভাব বলয়ের অন্তর্ভুক্ত করা। কিন্তু তার প্রচেষ্টা ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয় এবং একপর্যায়ে তিনি আত্মগোপন করতে বাধ্য হন। এসময় তিনি একজন অস্ট্রীয় যুদ্ধবন্দির ছদ্মবেশ ধারণ করেন এবং বুখারার মধ্য দিয়ে ব্রিটিশ–শাসিত ভারতবর্ষে প্রত্যাবর্তন করেন।

তদানীন্তন সোভিয়েত ইউনিয়নের মানচিত্রে ‘বুখারা জনসোভিয়েত প্রজাতন্ত্র’ (লাল রঙে চিহ্নিত অংশ)। ব্রিটেন কর্তৃক বুখারা আমিরাতকে নিজস্ব প্রভাব বলয়ে অন্তর্ভুক্ত করার প্রচেষ্টা ব্যর্থ হওয়ার পর বলশেভিকরা বুখারা দখল করে নেয় এবং সেটিকে একটি সোভিয়েত রাষ্ট্রে পরিণত করে; Source: Wikimedia Commons

অন্যদিকে, জেনারেল ম্যালেসন বুখারার আমির সাইয়্যেদ মুহাম্মাদ আলিম খানের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করেন এবং আলিম খানের প্রতিনিধি ম্যালেসনের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। আলিম খান ম্যালেসনকে দুটি বুখারান কার্পেট ও একটি রেশমি আলখাল্লা উপহার প্রদান করেন এবং ম্যালেসন আমিরকে উপহার হিসেবে দুইটি স্পোর্টিং রাইফেল প্রদান করেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ব্রিটেন ও বুখারার মধ্যে কোনো সহযোগিতামূলক চুক্তি সম্পাদিত হয়নি, এবং ব্রিটেন বুখারায় সামরিক হস্তক্ষেপ করেনি। অবশ্য ব্রিটিশরা বুখারার আমিরকে অল্প কিছু অস্ত্রশস্ত্র সরবরাহ করে। কিন্তু তুর্কমেনিস্তানে মোতায়েনকৃত ব্রিটিশ সৈন্যদলের ওপর বলশেভিকদের চাপ ক্রমাগত বাড়তে থাকে এবং এমতাবস্থায় ১৯২০ সালের এপ্রিলে ব্রিটিশ সৈন্যরা তুর্কমেনিস্তান ত্যাগ করতে বাধ্য হয়। একই বছরের সেপ্টেম্বরে বলশেভিকরা বুখারা অধিকার করে নেয় এবং বুখারার ভূখণ্ডে ‘বুখারা জনসোভিয়েত প্রজাতন্ত্র’ নামক একটি আইনত স্বাধীন বলশেভিক রাষ্ট্র স্থাপন করে।

এভাবে তাসখন্দ সোভিয়েত ও বুখারার সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপনের মধ্য দিয়ে বর্তমান উজবেকিস্তানের ভূখণ্ডে ব্রিটিশ প্রভাব বিস্তারের প্রচেষ্টা ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়। এর ফলে উজবেকিস্তান সেই অল্প সংখ্যক রাষ্ট্রগুলোর একটিতে পরিণত হয়, যেটির ভূখণ্ডে ব্রিটিশরা কখনো আক্রমণ পরিচালনা করেনি।

কঙ্গো

‘কঙ্গো প্রজাতন্ত্র’ (ফরাসি: République du Congo; কিতুবা: Repubilika ya Kôngo; লিঙ্গালা: Republíki ya Kongó) মধ্য আফ্রিকার পশ্চিম উপকূলে কঙ্গো নদীর তীরে অবস্থিত একটি মাঝারি আকৃতির রাষ্ট্র। ৩,৪২,০০০ বর্গ কি.মি. আয়তনবিশিষ্ট রাষ্ট্রটির পশ্চিমে গ্যাবন, উত্তর–পশ্চিমে ক্যামেরুন, উত্তর–পূর্বে মধ্য আফ্রিকান প্রজাতন্ত্র, দক্ষিণ–পূর্বে কঙ্গো গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র, দক্ষিণে কাবিন্দা (অ্যাঙ্গোলার মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন একটি প্রদেশ) এবং দক্ষিণ–পশ্চিমে আটলান্টিক মহাসাগর অবস্থিত। কঙ্গো প্রজাতন্ত্র এবং রাষ্ট্রটির দক্ষিণ–পূর্বাঞ্চলীয় প্রতিবেশী রাষ্ট্র কঙ্গো গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র একই নামের অধিকারী, কারণ উভয়েই কঙ্গো নদীর তীরে অবস্থিত। কিন্তু রাষ্ট্র দুটি পরস্পর থেকে ভিন্ন। কঙ্গো প্রজাতন্ত্র ফ্রান্সের উপনিবেশ ছিল, আর অপেক্ষাকৃত বৃহত্তর কঙ্গো গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র বেলজিয়ামের উপনিবেশ ছিল। কঙ্গো প্রজাতন্ত্র অপেক্ষাকৃত উত্তরে অবস্থিত এবং কঙ্গো গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র অপেক্ষাকৃত দক্ষিণে অবস্থিত, এজন্য প্রথমটিকে ‘উত্তর কঙ্গো’ এবং পরেরটিকে ‘দক্ষিণ কঙ্গো’ হিসেবে অভিহিত করা যেতে পারে।

ব্রিটিশ টহল জাহাজ ‘ব্রিস্ক’ দাসবাহী জাহাজ ‘এমানুয়েলা’র পথ রোধ করছে। ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে ব্রিটিশ নৌবাহিনী কঙ্গো নদীতে দাসব্যবসা–বিরোধী টহল দিত; Source: Wikimedia Commons

কঙ্গোর সঙ্গে আটলান্টিক মহাসাগরের সরাসরি সংযোগ রয়েছে। এজন্য নৌপথে কঙ্গোর ওপর আক্রমণ পরিচালনা ব্রিটেনের জন্য খুবই সহজ ছিল। কিন্তু ব্রিটেন কখনো এই ধরনের কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করেনি। অবশ্য ব্রিটিশরা যে এই অঞ্চলে একেবারেই কোনো সামরিক কার্যক্রম চালায়নি, এমন নয়। ঊনবিংশ শতাব্দীতে ব্রিটেন দাসপ্রথার বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান গ্রহণ করে এবং ব্রিটিশ নৌবাহিনীর ‘পশ্চিম আফ্রিকা স্কোয়াড্রন’ আফ্রিকার জলসীমায় দাসব্যবসা–বিরোধী টহল পরিচালনা করতে থাকে। এই টহল কার্যক্রমের উদ্দেশ্য ছিল আফ্রিকা থেকে সমুদ্রপথে অন্যান্য মহাদেশে দাস রপ্তানির বাণিজ্য বন্ধ করা। এসময় উক্ত ব্রিটিশ নৌবহর কঙ্গো নদীতে বিস্তৃত সময় জুড়ে টহল দিয়ে বেড়াত এবং এর অংশ হিসেবে তারা তখন বর্তমান কঙ্গো প্রজাতন্ত্রের জলসীমায়ও টহল দিত। কিন্তু একে আক্রমণ হিসেবে অভিহিত করা যায় না, কারণ এই অভিযান পরিচালিত হয়েছিল দাস ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে এবং কঙ্গোর তদানীন্তন রাষ্ট্র/প্রশাসন/অধিবাসীরা একে ‘আক্রমণ’ হিসেবে চিহ্নিত করেনি।

এদিকে ১৮৮০ সালে কঙ্গো নদীর উত্তরে বসবাসরত ‘বাতেকে’ জাতির রাজা ফ্রান্সের সঙ্গে একটি ‘অধীনতামূলক মিত্রতা’ চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন এবং এর মধ্য দিয়ে বর্তমান কঙ্গোর ভূখণ্ড একটি ফরাসি আশ্রিত রাষ্ট্রে পরিণত হয়। পরবর্তী প্রায় ৮০ বছর ধরে কঙ্গো ছিল ফ্রান্সের একটি উপনিবেশ। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালে ১৯৪০ সালের জুনে ফ্রান্স জার্মানির নিকট আত্মসমর্পণ করে এবং ফ্রান্সের ভূখণ্ডে একটি জার্মান আশ্রিত রাষ্ট্র স্থাপিত হয়, যেটি ‘ভিশি ফ্রান্স’ (Vichy France) নামে পরিচিতি অর্জন করে। জার্মানবিরোধী সামরিক কর্মকর্তারা এই রাষ্ট্রকে প্রত্যাখ্যান করেন এবং ‘মুক্ত ফ্রান্স’ (Free France) নামক একটি পাল্টা রাষ্ট্র ঘোষণা করে জার্মানির বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালিয়ে যেতে থাকেন। ফ্রান্সের উপনিবেশগুলোর মধ্যে বেশকিছু উপনিবেশের প্রশাসন ভিশি ফ্রান্সের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করে। কিন্তু কঙ্গো ছিল এক্ষেত্রে ব্যতিক্রম।

কঙ্গোর ফরাসি ঔপনিবেশিক প্রশাসন ভিশি ফ্রান্সের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করেনি, বরং ‘মুক্ত ফ্রান্সে’র পক্ষে যোগদান করে। এজন্য কঙ্গোর রাজধানী ব্রাজাভিলকে মুক্ত ফ্রান্সের প্রতীকী রাজধানী হিসেবে ঘোষণা করা হয়। কঙ্গো যদি ভিশি ফ্রান্সের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করত, সেক্ষেত্রে ব্রিটেনের কঙ্গো আক্রমণের সম্ভাবনা ছিল প্রবল। কারণ, সেসময় মিত্রশক্তি ভিশি ফ্রান্স কর্তৃক নিয়ন্ত্রিত প্রায় প্রতিটি উপনিবেশেই আক্রমণ চালিয়েছিল। কিন্তু কঙ্গো মুক্ত ফ্রান্সের পক্ষে যোগদান করায় কঙ্গোর ভূখণ্ড মিত্রশক্তির ভূখণ্ড হিসেবে গণ্য হতে থাকে, তাই ব্রিটেন এই অঞ্চলে আক্রমণ পরিচালনার কোনো প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেনি। যুদ্ধের পর ১৯৫৮ সালে কঙ্গো একটি প্রজাতন্ত্রে পরিণত হয় এবং ১৯৬০ সালে প্রজাতন্ত্রটি ফ্রান্সের কাছ থেকে স্বাধীনতা লাভ করে।

স্বাধীন কঙ্গোয় ব্রিটেন অন্তত একবার সামরিক কার্যক্রম পরিচালনা করেছে, কিন্তু এটি কঙ্গোর বিরুদ্ধে পরিচালিত কোনো আক্রমণ ছিল না। ১৯৯৭ সালের মে মাসে ব্রিটেন কঙ্গোর রাজধানী ব্রাজাভিলে প্রায় ৩৫০ জন সৈন্য মোতায়েন করে। কঙ্গোয় আক্রমণ পরিচালনা এই অভিযানের উদ্দেশ্য ছিল না। সেসময় পার্শ্ববর্তী রাষ্ট্র জায়ারেতে (বর্তমান নাম কঙ্গো গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র) গৃহযুদ্ধ চলছিল এবং যেকোনো সময় কিনশাসা (জায়ারের রাজধানী) থেকে ব্রিটিশ ও ‘কমনওয়েলথ অফ ন্যাশন্স’ভুক্ত অন্যান্য রাষ্ট্রগুলোর নাগরিকদের অপসারণ করার প্রয়োজন দেখা দিতে পারত। এরকম ক্ষেত্রে ব্রিটিশরা যেন সহজেই তাদেরকে অন্যত্র সরিয়ে নিতে পারে, সেজন্যই তারা কঙ্গোয় কিছু সৈন্য মোতায়েন করেছিল।

সামগ্রিকভাবে, কঙ্গোর ইতিহাসে রাষ্ট্রটির ভূখণ্ড অন্তত দুবার ব্রিটিশ সামরিক কার্যক্রমের সংস্পর্শে এসেছে। ব্রিটেন কঙ্গোর জলসীমায় দাসব্যবসা–বিরোধী টহল পরিচালনা করেছে এবং যুদ্ধকবলিত কঙ্গো গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র থেকে নিজেদের নাগরিকদের নিরাপদ আশ্রয়ে সরিয়ে নেয়ার জন্য কঙ্গোকে একটি ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহার করেছে। উভয় ক্ষেত্রেই ব্রিটিশ সামরিক কার্যক্রমের লক্ষ্যবস্তু কঙ্গো ছিল না এবং কঙ্গোর প্রশাসনও উক্ত ব্রিটিশ সামরিক কার্যক্রমকে নিজেদের ভূখণ্ডের ওপর পরিচালিত আক্রমণ হিসেবে বিবেচনা করেনি। সুতরাং, কঙ্গো সেই ২২টি রাষ্ট্রের মধ্যে একটি, যেখানে ব্রিটেন কখনো আক্রমণ পরিচালনা করেনি।

Related Articles