অতিপ্রাকৃতের সন্ধানে-১: আলকেমি আর পরশমণি

স্যার আইজ্যাক নিউটন।

তার নাম জানেন না এমন শিক্ষিত লোক খুঁজে পাওয়া সম্ভবই নয়। বিজ্ঞান জগতের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র, অসামান্য প্রতিভা। তার অবদান না থাকলে আজকের পৃথিবী বর্তমান পর্যায়ে পৌঁছাতে হয়তো আরও দু’শো বছর লেগে যেত। বিজ্ঞানের প্রতিটি স্তরেই ছিল তার অবাধ বিচরণ।কিন্তু, অনেকেই জেনে অবাক হবেন যে, তার সারা জীবনের যত গবেষণা তার অল্প একটা অংশই ছিল বিজ্ঞান নিয়ে, প্রথাগত বিজ্ঞান। এর চেয়ে অনেক বেশি সময় তিনি ব্যয় করেছেন কীসের পেছনে বলতে পারেন?

ব্যয় করেছেন অতীন্দ্রিয় আর অতিপ্রাকৃত জিনিসের পেছনে। তবে তাকে এসব কাজ করতে হয়েছিল গোপনে।

স্যার নিউটন; Source: Wikimedia Commons

আপনি কি জানেন কেন স্যার নিউটন শেষ বয়সে পাগল হয়ে যান? ৩১ মার্চ, ১৭২৭ সালে ৮৪ বছর বয়সে মারা যান ইতিহাসের শেষ আলকেমিস্ট আইজ্যাক নিউটন। তাঁর লাশ থেকে তখন কীসের প্রমাণ পাওয়া যায় বলতে পারেন?

কেন মারা যান তিনি? কী নিয়ে সারা জীবন গবেষণা করে কাটিয়ে দিলেন নিউটন? আর কেনই বা তা গোপন করে গেছেন?  

উত্তরটা হলো অকাল্ট (Occult) স্টাডিজ। ‘অকাল্ট’ অর্থই হলো ‘অতিপ্রাকৃত’। হ্যাঁ, ঠিকই বুঝেছেন, স্কুল-কলেজের পাতায় পাতায় যে বিজ্ঞানীর নাম দেখে এসেছেন আর তার সূত্র দিয়ে অংক কষে এসেছেন, সেই নিউটনের গোপন গবেষণা ছিল এই অকাল্ট বা অলৌকিকতা নিয়েই। চেষ্টা করে গেছেন বিজ্ঞানের সাথে যোগসূত্র আনতেও, আলকেমি ব্যবহার করে পরশ পাথর তৈরি করতে। অবাক লাগছে জেনে? তার মৃত্যুর পেছনে কিন্তু কিয়দংশে হলেও দায়ী বলতে হয় এই অদ্ভুত গবেষণা। 

রোর বাংলার পাঠকদের অনুরোধে আমরা এ নতুন সিরিজ-লেখনীতে ধীরে ধীরে নিউটনের এ গোপন আকাঙ্ক্ষা আর গবেষণা উদ্ঘাটন করবো। তবে, নিউটন উপলক্ষ মাত্র, তাকে দিয়ে শুরু করে আমরা খোঁজ নিতে চেষ্টা করবো সেসব নিষিদ্ধ জিনিসের, যেগুলো হারিয়ে গিয়েছে ইতিহাসের অন্তরালে। এমন নয় যে একেক পর্বে আমরা কেবল একটি বিষয় নিয়েই আলোচনা করবো, বরং একইসাথে কয়েকটি বিষয় নিয়ে কথা বলতে বলতে সেগুলোর মাঝে সম্পর্ক স্থাপন করব আমরা। থাকবে আলকেমির ইতিহাস, নিউটনের পাগলামি গবেষণা, নিকোলাস ফ্লামেলের পরশমণি, নানা মুনির নানা মত ও তাদের অমরত্ব পাবার চেষ্টা। আর এ অমরত্বের সন্ধান করতে গিয়ে আমরা খুঁজে বের করবো নানা উপকথা বা লিজেন্ড, জানবো লুকায়িত কোহেকাফ নগরীর উপকথা, অমরত্বের সুধার ঝর্ণা, প্রাচীন আধ্যাত্মিকতা ও জাদুবিদ্যার চেষ্টা, যুগে যুগে ডার্ক ম্যাজিকের প্রচেষ্টা, শয়তানের সঙ্ঘ, ফেরেশতা-শয়তান নিয়ে নানা ধর্মের ঘটনাগুলো, ইহুদীদের তথাকথিত ‘জাদুবিদ্যা’ কাব্বালা এবং পাঠকদের মনের নানা জিজ্ঞাসা! 

তবে শুরু করা যাক যাত্রা- অতীন্দ্রিয়ের অন্বেষণে… অতিপ্রাকৃতের সন্ধানে।

আলকেমি আর নিউটন; Source: Universe Inside You

‘পরশমণি’ শব্দটা শুনলেই মনে চলে আসবার কথা হ্যারি পটারের কথা। লাল টুকটুকে যে পাথরখানা নিকোলাস ফ্লামেল বানিয়েছিলেন।

হ্যারি পটারের পরশমণি; Source: Harry Potter Wiki – Fandom

কিংবা মনে আসতে পারে ফুলমেটাল আলকেমিস্টের এলরিক ভাইদের কথা। অবশ্য, পাওলো কোয়েলহোর ‘দ্য আলকেমিস্ট’-এর কথাও মনে হতে পারে। যেটাই মনে হোক না কেন, সবগুলোতেই পরশ পাথর বানাবার জন্য দরকার আলকেমি।

দ্য আলকেমিস্ট; Source: Minitokyo

অনেকে ভুলবশত আলকেমিকে রসায়ন বা কেমিস্ট্রির সাথে গুলিয়ে ফেলেন। কিন্তু আসলে এ দুটো বিষয়ে ব্যাপক ফারাক আছে। এটা ঠিক যে, আলকেমি শব্দ থেকে কেমিস্ট্রি শব্দ এসেছে। কিন্ত, আলকেমি মানেই কেমিস্ট্রি বা রসায়ন নয়। আলকেমি (Alchemy) শব্দ এসেছে আরবি আল-কিমিয়া (الكيمياء) শব্দ থেকে। আর আরবি ‘কিমিয়া’ শব্দ এসেছে প্রাচীন গ্রিক শব্দ ‘কেমিয়া’ থেকে।

আলকেমির পূর্ণ কেতাবি সংজ্ঞা দিতে গেলে এমন দাঁড়াবে- আলকেমি হচ্ছে সেই শাস্ত্র যার চর্চার মাধ্যমে লাভ করা যায় পরিপূর্ণতা, ধাতুকে পরিণত করা যায় সোনায়, আর মানুষ লাভ করতে পারে অমরত্ব। শেষ অংশটুকু অবশ্য আধুনিক বিজ্ঞান স্বীকার করে না, আগেকার আলকেমিস্ট বা বিজ্ঞানীদের শত প্রচেষ্টা সত্ত্বেও।

তাহলে প্রশ্ন আসতে পারে, আমকেমি আর রসায়নের পার্থক্য কী?

গোড়ার দিকে আলকেমিস্টদের মতে, আলকেমিতে দরকার একটি অদৃশ্য আধ্যাত্মিক শক্তির অতিপ্রাকৃত সাহায্য, যেটা ছাড়া কোনো আলকেমিক্যাল কাজ সম্পূর্ণ হবে না। এ আধ্যাত্মিক সাহায্য আসতে পারে ভালো দিক থেকে অথবা খারাপ দিক থেকে। যখন খারাপ (নেগেটিভ) শক্তি ব্যবহার করে করা হয় তখন বলা হয় ডার্ক আর্টস বা কালো জাদুবিদ্যার সাহায্য নেয়া হচ্ছে, তবে একে কালো বলাটা অবশ্য শুরু করেন পরের আলকেমিস্টরা যারা ব্যবহার করতেন না ‘খারাপ’ শক্তি। ভালো (পজিটিভ) শক্তির বিষয়ে প্রথম ধারণা দেন যিনি তিনি হলেন আলকেমিস্ট জাবির ইবনে হাইয়ান (جابر بن حیان), যাকে পশ্চিমারা ‘Geber’ হিসেবে জানতেন। অন্যদিকে, রসায়নে এমন কোনো সাহায্যের প্রয়োজন পড়ে না, এটা সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক বিষয়।  

জাবির বিন হাইয়ান; Source: Wikimedia Commons

আলকেমি থেকে রসায়ন বা কেমিস্ট্রি কীভাবে এলো? আলকেমিস্ট জাবির ইবনে হাইয়ানকে (৭২২-৮০৪) বলা হয় ‘আদি রসায়নের জনক’; তিনি আলকেমি নিয়ে গবেষণা করতে করতে অনেক কিছুই তৈরি করে ফেলেন। যেমন, হাইড্রোক্লোরিক এসিড, নাইট্রিক এসিড, সালফিউরিক এসিড, একুয়া রেজিয়া ইত্যাদি।

আপনি জানেন কি, জাবির ইবনে হাইয়ানকে এ পথে অনুপ্রাণিত করেন কে? কিছু কিছু সূত্র মতে, তিনি ছিলেন ইমাম জাফর সাদিক; যিনি কি না নবী মুহাম্মাদ (স) এর সরাসরি বংশধর। এজন্য জাবির প্রায়ই বলতেন, “আমি আলকেমির যা যা শিখেছি সবই আমার শিক্ষক জাফর সাদিকের কাছ থেকে।”

যা-ই হোক, এবার ফিরে আসা যাক আলকেমির উদ্দেশ্য কী ছিল সে বিষয়ে। আলকেমির চূড়ান্ত লক্ষ্য ছিল এমন একটি পদার্থ তৈরি করা, যেটা সম্পর্কে বিশ্বাস করা হয়, সেই পদার্থ দিয়ে মহাবিশ্বের সকল নিগুঢ় প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যাবে। সেই পদার্থের রয়েছে দুটো অংশ, প্রথমটা কঠিন আর দ্বিতীয়টি তরল-

১) পরশ মণি বা পরশ পাথর (Philosopher’s Stone
২) অমৃত সুধা (Elixir Of Life)

দ্বিতীয় নামটি জাবির ইবনে হাইয়ানেরই দেয়া। তিনি নাম দিয়েছিলেন আরবিতে ‘আল-ইকসির’ (إكسير)  যেটা হয়ে যায় ‘এলিক্সির’ (Elixir)।

আলকেমির নয় ছয়; Source: zyzixun

পরশমণি তৈরির যে পদ্ধতি আলকেমিস্টরা অনুসরণ করতেন সেটাকে বলা হত ‘ম্যাগনাম ওপাস’ (Magnum Opus); এ প্রক্রিয়ার ধাপ ছিল ৪টি, উপধাপ ১২-১৪টি। প্রধান ধাপগুলো ছিল-

১) নিগ্রেডো: কালো হতে শুরু করবে
২) আল্বেডো: সাদা হতে শুরু করবে
৩) সাইট্রিনিটাস: হলুদ হতে শুরু করবে
৪) রুবেডো: লাল হতে শুরু করবে

পরশমণির কিছু ধর্ম প্রাচীন কিছু পাণ্ডুলিপি থেকে পাওয়া যায়। প্রথম প্রশ্ন আসে, এ পাথরের রঙ কী?

এর উত্তর হচ্ছে, দুই রকমের পরশমণির কথা জানা যায়। একটি সাদা, আরেকটি লাল। উপরের চার ধাপের এদিক সেদিক করলেই এই দু’রকম পরশমণি পাওয়া যায়। সাদা পরশমণির শক্তি কম আর সেটি ধাতুকে পরিণত করতে পারে রূপায়। লাল পরশমণির শক্তি বেশি আর সেটি ধাতুকে সোনায় পরিণত করতে পারে। 

লাল পাথর নিয়ে বেশি লেখা পাওয়া যায়। বলা হয়েছে, গুড়ো করলে এ পাথরের রঙ কমলা বা লালের মতো দেখায়, কিন্তু কঠিন (সলিড) অবস্থায় টকটকে লাল (স্যাফ্রন) অথবা লাল-বেগুনির মাঝের একটা রঙের মতো দেখায়। তখন এটা থাকে স্বচ্ছ আর কাঁচের মতো। এর ভর সোনার চেয়ে বেশি। যেকোনো তরলে দ্রবীভূত হতে পারে। আগুনে এটি মোটেও দাহ্য নয়। 

এবার আসা যাক এলিক্সিরের কথাতে; ‘অমৃত সুধা’ বলে যাকে- এলিক্সির অফ লাইফ। আলকেমির লেখনীতে বলা হয়েছে, এ সাদা রঙের তরল কয়েক ফোঁটা পান করলে দীর্ঘায়ু লাভ করা যায়। তবে এটাকে অমরত্বের জন্যই মূলত বানানোর চেষ্টা করা হত। ফারসিতে একে বলা হয় ‘আবে হায়াত’ (آبِ حیات)।

প্রাচীন আলকেমি নিয়ে এটুকু জানাটাই যথেষ্ট পরবর্তী ঘটনাগুলো বুঝবার জন্য। প্রথম যিনি ‘সোনা বানাতে পারতেন’ বলে শোনা গিয়েছিল তিনি ছিলেন মারিয়া নামের এক নারী, তিনিই ছিলেন ইতিহাসের প্রথম আলকেমিস্ট। ইবনে নাদিমের কিতাব আল-ফিহরিস্ত এর সর্বকালের সেরা ৫২ আলকেমিস্টদের তালিকায় আছে তার নাম একজন। তবে ‘আলকেমিস্ট মারিয়া’-র চেয়ে তিনি বেশি পরিচিতি হয়েছিলেন কী হিসেবে জানেন? ‘ইহুদিনী মারিয়া’।

খ্রিস্টের জন্মের প্রায় সাড়ে তিনশ বছর আগে সম্রাট আলেক্সান্ডারের দরবারে এসে হাজির হন প্রথম আলকেমিস্ট মারিয়া। সে কাহিনীই এবার শুরু করা যাক।

ইহদিনী মারিয়া; Source: Wellcome Collection

চলবে পরের পর্বে, পড়তে ক্লিক করুন:

অতিপ্রাকৃতের সন্ধানে-২: পরশমণির খোঁজে আলকেমিস্ট নিকোলাস ফ্লামেল

অতিপ্রাকৃতের সন্ধানে-৩: নিকোলাস ফ্লামেলের রহস্যময় জীবন

অতিপ্রাকৃতের সন্ধানে-৪: নিকোলাস ফ্লামেলের ‘রহস্যময়’ অন্তর্ধান

অতিপ্রাকৃতের সন্ধানে-৫: যুগের শেষ ‘জাদুকর’ স্যার আইজ্যাক নিউটন

অতিপ্রাকৃতের সন্ধানে-৬: স্যার আইজ্যাক নিউটনের বাইতুল মুকাদ্দাস গবেষণা

অতিপ্রাকৃতের সন্ধানে-৭: অমরত্বের সুধার খোঁজে

This article is in Bangla language and deals with the myths of the super-natural pursuits of mankind. For references, please visit the hyperlinked websites. 

Featured Image: Pinterest-Mabula

Related Articles