মুসোলিনি ও ফ্যাসিবাদের উত্থানে ব্রিটিশদের হাত ছিল?

শতবর্ষ আগের কথা; অক্টোবর ১৯২২, রাজধানী রোম অভিমুখে যাত্রা করছে হাজার হাজার ফ্যাসিস্ট স্বেচ্ছাসেবক, উদ্দেশ্য সরকার গঠন করে চূড়ান্ত ক্ষমতায় আসীন হওয়া। তাদের নেতা বেনিতো মুসোলিনি, ইতালিয়ান ভাষায় দ্যু চে (Duce) বা নেতা, যিনি পেশায় একজন স্কুলশিক্ষক, পরে সাংবাদিক। সাংবাদিক থেকে হয়ে উঠলেন ইতালির লাখো তরুণের নেতা, গ্রহণ করলেন উপাধি ‘ইল দ্যু চে’। তৎকালীন রাজা ভিক্টর ইমানুয়েল সেনাবাহিনীকে আদেশ দেন বিদ্রোহ দমনের। সেনাবাহিনী আদেশ অমান্য করল, মুসোলিনি ও তার ফ্যাসিস্ট দলের যাত্রা হলো সফল। ইতালির ৪০ তম প্রধানমন্ত্রী হলেন বেনিতো মুসোলিনি, শীঘ্রই পরিণত হন স্বৈরশাসকে। অক্ষশক্তির হয়ে যোগ দেন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে। মিত্রশক্তির বিরুদ্ধে যুদ্ধে অংশ নিলেও মুসোলিনি ছিলেন মিত্রশক্তির অন্যতম অংশীদার যুক্তরাজ্যের তৈরি একনায়ক। যুক্তরাজ্যই মুসোলিনি ও ফ্যাসিজমের মদদদাতা। তার উত্থানের পেছনে রয়েছে ব্রিটিশ শক্তির শক্ত হাত।

ব্রিটিশ মদদে ইতালির একজন সাংবাদিক হয়ে ওঠেন পৃথিবীতে ফ্যাসিবাদের জনক ও কুখ্যাত একনায়ক; Image source: Germania International

মুসোলিনি ও ইতালির  তৎকালীন রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট

বেনিতো অ্যামিলকেয়ার আন্দ্রেয়া মুসোলিনি, সংক্ষেপে বেনিতো মুসোলিনি ১৮৮৩ সালের ২৯ জুলাই ইতালিতে জন্মগ্রহণ করেন। কিছুদিন শিক্ষকতার পর পাড়ি জমান সুইজারল্যান্ডে, যোগ দেন সমাজতান্ত্রিক ধারার রাজনীতিতে। ১৯০৪ সালে ফিরে এসে ধরেন সাংবাদিকতা, পরে হন ‘অ্যাভান্তি’ নামে পত্রিকার সম্পাদক। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরু হলে যোগ দেন সেনাবাহিনীতে, যুদ্ধে আহত হয়ে ফিরে আসেন মিলানে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে মিত্রশক্তির পক্ষাবলম্বন তাকে করে হতাশ, হয়ে যান বামপন্থী থেকে পুরোপরি ডানপন্থী।

কর্সিকা, স্যাভয়, নিস প্রভৃতি অঞ্চল লাভের আশায় ইতালি যোগ দেয় বিশ্বযুদ্ধে, না পাওয়ায় ইতালীবাসী গণতন্ত্রের প্রতি আশা হারায়। ইতালিতে দেখা দেয় খাদ্যাভাব, মুদ্রাস্ফীতি, বেকারত্ব, যা মুসোলিনিকে তার ফ্যাসিস্ট দলের প্রচারণায় সাহায্য করে। যুবকরা যোগ দিতে থাকে সমাজতান্ত্রিক দলে। ধীরে ধীরে সমাজতান্ত্রিক দলের মধ্যে বিশৃঙ্খলা তাদের ফ্যাসিস্ট দলে যোগ দিতে উৎসাহিত করে। ইতালিতে শুরু হওয়া রাজনৈতিক অস্থিরতা মুসোলিনির জন্য বয়ে আনে সুফল। ইতালিতে দেখা দেয় গণতান্ত্রিকভাবে গঠিত মন্ত্রীসভায় ব্যর্থতা, যা মানুষকে ফ্যাসিস্ট দলে যোগদানে ইন্ধন যোগায়।

ইতালির রাজনৈতিক অস্থিরতা যুবকদের ফ্যাসিস্ট দলে যোগদানে প্ররোচিত করে; Image source : The Economist

মুসোলিনি সেসকল যুবকদের সংঘটিত করতেন সশস্ত্র স্কোয়াডে, যা পরিচিত ছিল ব্ল্যাক শার্ট নামে। অক্টোবর ১৯২২ সালে মুসোলিনির নেতৃত্বে ব্ল্যাক শার্ট যাত্রা করে রাজধানী রোম অভিমুখে। রাজনৈতিক অস্থিরতা দেখে ভিক্টর ইমানুয়েল মুসোলিনিকে আমন্ত্রণ জানান সরকার গঠনে। মুসোলিনি ক্ষমতায় গিয়ে ধীরে ধীরে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান ভেঙে দেন, হয়ে ওঠেন স্বৈরশাসক। ব্রিটিশ গোপন সহায়তায় শুরু করেন ইহুদিনিধন, আক্রমণ করেন আবিসিনিয়ায়, সখ্য গড়ে তোলেন জার্মান একনায়ক হিটলারের সাথে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হলে সেই ব্রিটিশ সরকারের বিপক্ষে গিয়ে যোগ দেন অক্ষশক্তিতে। ১৯৪৩ সালে মিত্রশক্তি আক্রমণ করে ইতালিতে, মুসোলিনিকে করা হয় ক্ষমতাচ্যুত। পরবর্তীতে পালিয়ে সুইজারল্যান্ডে যাওয়ার সময় উপপত্নী ক্লারা পিটাচির সাথে ইতালীয় পক্ষপাতীদের হাতে নিহত হন।

ব্রিটিশ এজেন্ট হিসেবে মুসোলিনি

ব্রিটিশ সামরিক গোয়েন্দা সংস্থা এমআই-৫ এর এজেন্ট হয়ে ১৯১৭ সালে মুসোলিনি রাজনীতি শুরু করেন। এমআই-৫ তাকে সপ্তাহে ১০০ পাউন্ড দিত বেতন হিসেবে, যা বর্তমান হিসেবে ৬,০০০ পাউন্ডের সমান। ইতালির কোনো এক সাংবাদিকের কাছে যার মূল্য ছিল অনেক। তৎকালীন ব্রিটিশ সামরিক গোয়েন্দা অধিদপ্তরের প্রধান ছিলেন লেফটেন্যান্ট কর্নেল স্যার স্যামুয়েল হোয়ার, পরবর্তীতে যিনি এমপি ও ব্রিটিশ ফরেইন সেক্রেটারি হন। ১৯১৭ সালের দিকে তিনি ইতালিতে এমআই-৫ এর দেখাশোনা করেন এবং তার নেতৃত্বে তখন ১০০ ব্রিটিশ ইন্টেলিজেন্স অফিসার ইতালিতে ছিলেন। এই স্যামুয়েল হোয়ারই মুসোলিনিকে সপ্তাহান্তে বেতনের অর্থ দিতেন।

অ্যাভান্তির পরিচালনাকালীন মুসোলিনি; Image source: Wikipedia

প্রথম বিশ্বযুদ্ধ চলমান, যুদ্ধে যোগ দেয় রাশিয়া। ১৯১৭ সালের দিকে রাশিয়ায় সংঘটিত হয় সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব। রাশিয়া যুদ্ধ থেকে সরে আসে। তখন ইতালি ছিল ব্রিটেনের নির্ভরশীল মিত্র। কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসবিদ পিটার মার্টল্যান্ড বলেছেন,

বিপ্লবী রাশিয়ার যুদ্ধ থেকে নিজেদের প্রত্যাহারের পর যুদ্ধে ব্রিটেনের সবচেয়ে কম নির্ভরযোগ্য মিত্র ছিল ইতালি। মুসোলিনিকে ১৯১৭ সালের শরৎ মাস থেকে সপ্তাহে ১০০ পাউন্ড দেওয়া হয়েছিল অন্তত এক বছর পর্যন্ত প্রো-ওয়ার ক্যাম্পেইনের জন্য।

মুসোলিনি করেছেনও তাই। তিনি যুদ্ধের পক্ষে বিভিন্ন প্রোপাগান্ডা ছড়াতেন এবং ব্ল্যাক শার্টের যুবকদের পাঠিয়ে শান্তি মিছিলে হামলা চালাতেন যাতে তারা ঘরে বসে থাকে। ব্রিটিশ সরকার ভূমধ্যসাগরে তাদের স্বার্থ সংরক্ষণের জন্য ইতালিতে মুসোলিনির নেতৃত্বে এক ফ্যাসিস্ট সরকার প্রতিষ্ঠা করে। সেরেগিনো এবং ফাসানেলা তাদের ‘Nero di Londra বইয়ে বলেন,

ব্রিটিশ রাজপরিবারের মিশনের উদ্দেশ্য ছিল কেন্দ্রীয় সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে যুদ্ধ থেকে ইতালিকে প্রস্থানে বাধা দেয়া, একটি গোপন সিস্টেমের ভিত্তি স্থাপন করা যারা উইন্ডসর ক্রাউনের প্রতি অনুগত, এবং এভাবে ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে ও নিকট প্রাচ্যে ব্রিটিশ স্বার্থ সংরক্ষণ করা।

স্যার হোয়ার একটি রাজনৈতিক ও আধাসামরিক বাহিনীর প্রোটোটাইপ তৈরি করেন যা শীঘ্রই বেনিতো মুসোলিনির নেতৃত্বে ইতালিকে ফ্যাসিবাদী যুদ্ধের দিকে নিয়ে যায়। তিনি মডেল হিসেবে ‘স্ট্র্যাটেজি অব টেনশন’ ব্যবহার করেন। সিক্রেট সার্ভিসের অর্থায়নে ১৯১৮ সালের শুরু থেকে ‘দ্য কাউন্ট‘ কোড নামে ভবিষ্যতের নেতা মুসোলিনি ১৯২২ সালের অক্টোবরে ক্ষমতা জয় করেন এবং একটি গণকর্তৃত্ববাদী শাসন প্রতিষ্ঠা করেন, যা বিংশ শতাব্দীতে আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিকে প্রভাবিত করবে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর মুসোলিনি তার ক্ষমতায় উত্থান শুরু করেন। নির্বাচনী জালিয়াতি এবং ব্ল্যাক শার্টের সহিংসতার সাহায্যে ১৯২২ সালে ক্ষমতায় আরোহণের পর ১৯২০ এর দশকের মাঝামাঝিতে ফ্যাসিবাদী একনায়কত্ব প্রতিষ্ঠা করেন। 

বিখ্যাত ব্রিটিশ ঔপন্যাসিক জর্জ অরওয়েলTribune’ এ প্রকাশিত তার ‘Who are the War Criminals?’  প্রবন্ধে লেখেন- মুসোলিনির উত্থানের পেছনে ব্রিটিশশক্তির হাত ছিল, এবং ব্রিটিশ নেতারাই মুসোলিনির প্রশংসা করতেন। অরওয়েলের ভাষায়- যদি মুসোলিনি অপরাধী হয়, তাহলে ইতালীয় নাগরিকরা তাকে শাস্তি বা বিচার করবে। ব্রিটিশরা কেন তার বিচার করবে? তার মতে, যারা মুসোলিনির উত্থানের পেছনে রয়েছে, তারাই অর্থাৎ ব্রিটিশ সিক্রেট এজেন্সি ও কনজারভেটিভ পার্টিই প্রকৃত যুদ্ধাপরাধী।

মুসোলিনী ও ফ্যাসিবাদকে ব্রিটিশ কেন বিকশিত করল?

প্রথমত, ব্রিটিশ সরকার দেখল যে রাশিয়া প্রথম বিশ্বযুদ্ধ থেকে নিজেদের প্রত্যাহার করে নিয়েছে। এমতাবস্থায় তাদের একমাত্র নির্ভরশীল মিত্র ইতালি। ইতালি যদি যুদ্ধ থেকে পিছপা হয় তাহলে ভূমধ্যসাগর ও নিকটপ্রাচ্য ব্রিটিশশক্তির হাতছাড়া হয়ে যাবে। ইতালির অবস্থা তখন শোচনীয়। চারদিকে খাদ্যাভাব, হতাশা, মন্দা ও বেকারত্ব। এমন সময় ইতালি যুদ্ধ থেকে পিছপা হতে পারত। তাই মুসোলিনিকে স্যার হোয়ার রাশিয়ার প্রত্যাহারের পর থেকেই রাজনীতিতে বেতনভুক্ত নিজ কর্মী বানিয়ে ইতালির রাজনীতির মাঠে ছাড়েন।

দ্বিতীয়ত, রাশিয়ার সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব তখন ইউরোপের অন্যান্য দেশে খুব সহজে ছড়াতে পারত। ইউরোপের বেশিরভাগ দেশে দেখা দিচ্ছিল খাদ্যাভাব, মন্দা, বেকারত্ব ইত্যাদি, যা যুবকদের সমাজতান্ত্রিক দলের দিকে সহজেই আকৃষ্ট করছিল। দলে দলে যুবকরা যোগ দিচ্ছিল সমাজতান্ত্রিক দলে। মুসোলিনি নিজেও সুইজারল্যান্ডে গিয়ে যোগ দেন সমাজতান্ত্রিক ধারার রাজনীতিতে। যদি এভাবে সমাজতন্ত্রের বিকাশ লাভ করে, তাহলে ভূমধ্যসাগর ও আশেপাশের এলাকা ব্রিটিশশক্তির হাতছাড়া হয়ে যেতে পারত। তাই মুসোলিনিকে বেতনের বিনিময়ে ব্রিটিশ সিক্রেট এজেন্সি এর বিরুদ্ধে কাজে লাগায়। তৎকালীন ইতালির রাজনৈতিক অস্থিরতা মুসোলিনির জন্য সহায়ক হয়ে ওঠে। তিনি সহজেই ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হন, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান ভেঙে প্রতিষ্ঠা করেন স্বৈরতন্ত্র।

১৯২৭ সালে উইনস্টন চার্চিল তার দেয়া এক বক্তব্যে বলেন,

If I had been an Italian I am sure I should have been whole-heartedly with you in your triumphant struggle against the bestial appetites and passions of Leninism… (Italy) has provided the necessary antidote to the Russian poison. Hereafter no great nation will be unprovided with an ultimate means of protection against the cancerous growth of Bolshevism.

একনায়ক মুসোলিনি এবার হাত মেলান সমমনা হিটলারের সাথে, যোগ দেন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে অক্ষশক্তির হয়ে মিত্রশক্তির বিরুদ্ধে; Image source: History Today

মিত্রশক্তির বিরুদ্ধে মুসোলিনী

১৯২০ এর দশকের মাঝামাঝি মুসোলিনি একনায়কতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করেন। একনায়কতন্ত্র প্রতিষ্ঠার পর তিনি শুরু করেন বড় বড় মানুষদের অপহরণ, গুম ইত্যাদি। তিনি প্রথমে ব্রিটিশদের সহায়তায় বিভিন্ন আক্রমণ করলেও পরে নিজে থেকে বিভিন্ন যুদ্ধে অংশগ্রহণ শুরু করেন। ১৯৩৫ সালে মুসোলিনির দখলে আসে আবিসিনিয়া। তিনি এবার হিটলারের সাথে মৈত্রীচুক্তিতে আবদ্ধ হন।

১৯৪০ সালে মুসোলিনি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে যোগদান করেন, কিন্তু এবার মিত্রশক্তিতে নয়, বরং অক্ষশক্তির হয়ে। সুতরাং দেখা যায়, মুসোলিনির মতো একজন সাংবাদিককে ব্রিটিশশক্তি নিজেদের স্বার্থের জন্য ইতালিতে ফ্যাসিবাদ ছড়িয়ে তাকে ক্ষমতায় আসীন করলো। তার রোমের অভিমুখে যাত্রার ১০০ বছর পার হয়ে গেলেও আজও গোপন নথিগুলো ব্রিটিশ নেভাল ইন্টেলিজেন্ট ডিভিশন ইন লন্ডন, ফেডারেল ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন ও ডিপার্টমেন্ট অব স্টেট ইন ওয়াশিংটনে গোপনে সংরক্ষিত রয়েছে, যা লেখক ও অনুসন্ধানী সাংবাদিকদের গবেষণায় ধীরে ধীরে বেরিয়ে আসছে। 

কথায় আছে, বিজয়ীদের হাতে ইতিহাস রচিত হয়, তাই তারা ইতিহাস নিজেদের মতো রচনা করে। কিন্তু সত্য কি চেপে রাখা যায়? ইতিহাসের প্রতিটি পৃষ্ঠায় লুক্কায়িত সত্য একদিন বেরিয়ে আসবে। বেরিয়ে আসবে চার্চিল, হোয়ার, কনজারভেটিভ পার্টির মতো আরও অনেক পক্ষের ইতিহাসও। অরওয়েল উপলব্ধি করেছিলেন, যে ব্রিটিশশক্তি মুসোলিনিকে গড়ে তুলল, সেই শক্তিই আবার তাকে বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করাল। তিনি তার প্রবন্ধে বলেন, মুসোলিনির অবশ্যই বিচার করা উচিত, তবে সেটা শুধু যুদ্ধের ঘোষণার জন্য।

This article is written in Bangla about the secret support of UK towards the rise of Mussolini and fascism. UK secretly backed the rise of Mussolini. All the necearry links are hyperlnked inside. 

Feature image: Alamy 

Related Articles