পাল শাসনের প্রতিষ্ঠা, প্রাচীন বাংলা অঞ্চলের ইতিহাসে একটি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। শশাঙ্কের পর প্রাচীন বাংলার শত বছরের রাজনৈতিক শূন্যতা ও অরাজকতাপূর্ণ সময় 'মাৎস্যন্যায়' যুগ পেরিয়ে জনজীবনে একপ্রকার স্বস্তি এনেছিল পাল শাসন।

পালদের শাসনাধীন এলাকা যদিও বেশিরভাগ সময়ই খুব বেশি বড় ভূখণ্ডজুড়ে ছিল না, কিংবা পুরোটা সময় ধরে নিরবচ্ছিন্ন কিংবা শক্তিশালী সাম্রাজ্য হিসেবেও টিকে ছিল না, তারপরেও বাংলা অঞ্চলের রাজনৈতিক ইতিহাসের পট পরিবর্তনের সাথে পাল বংশের ইতিহাস অঙ্গাঅঙ্গিভাবে জড়িত।

সুদীর্ঘ চারশ বছর ধরে কখনও প্রবল প্রতাপে, আবার কখনো খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে টিকে থাকা পাল শাসন কীভাবে হারিয়ে ফেলেছিল তাদের চারশ' বছরের সাম্রাজ্য? এই লেখায় দৃষ্টিপাত করা হবে সেদিকেই।

পাল আমলের তাম্রলিপি; Image Source: ullashtv.com

পাল শাসনের বিভিন্ন পর্ব

পাল শাসন প্রতিষ্ঠা পেয়েছিল গোপালের হাত ধরে। জনগণ কিংবা নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিবর্গ কর্তৃক রাজা নির্বাচিত হয়েছিলেন গোপাল, এমনটাই ধারণা পাওয়া যায় ইতিহাস থেকে। গোপাল রাজ্য প্রতিষ্ঠার সূচনা করলেও পাল সাম্রাজ্যকে সুসংহত করেন গোপালের পুত্র ধর্মপাল।

চারশ' বছর শাসনামলের পুরোটা সময় পালদের সুসময় হিসেবে থাকেনি। কখনো উত্থান, কখনো পতন কিংবা কখনো কেটেছে স্থবিরতার মধ্য দিয়ে। তারপরেও চারশ' বছর ধরা যায় একটি সুদীর্ঘ সময় হিসেবেই। কারণ পৃথিবীর ইতিহাসে খুব কম রাজবংশই এতটা সময় ধরে রাজত্ব ধরে রাখতে পেরেছিল।

যা-ই হোক, পাল শাসনের সময়কালকে বিশ্লেষণ করে মোটামুটি তিনটি পর্যায়ে পর্যায়ে ভাগ করা যায়। প্রথমত, সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা ও প্রতিপত্তি লাভের সময়কাল, দ্বিতীয়ত, অবনতির সময়কাল, ও তৃতীয়ত, পাল সাম্রাজ্যের চূড়ান্ত পতনের সময়কাল।

অন্য অনেক রাজ বংশের মতো পাল বংশের সূচনা ও শেষ হঠাৎ করে হয়নি, বরং ধীরে ধীরে অনেকটা স্বাভাবিকভাবে উত্থান ঘটেছে, আর পৃথিবীর অমোঘ নিয়মে ধীরে ধীরেই হারিয়ে গেছে সময়ের অতলে। এবার নজর দেওয়া যাক পাল শাসনের ইতিবৃত্তে।

প্রতিপত্তি ও প্রতিষ্ঠার সময়কাল 

বপ্যটপুত্র গোপাল রাজা নির্বাচিত হওয়ার মাধ্যমে সূচনা হয়েছিল পাল শাসনের। গোপালের রাজত্বকাল ছিল মোটামুটি ৭৫০ থেকে ৭৮১ কিংবা ৭৯৫ খ্রিস্টাব্দ। তবে পাল বংশের শাসনকে প্রকৃত সাম্রাজ্যে উন্নীত করেছিলেন গোপালের পুত্র ধর্মপাল। তার সময়েই পালরা উত্তর ভারতীয় রাজনীতি পর্যন্ত প্রভাব বিস্তার করতে সমর্থ হয়েছিল।

পাল বংশের সুদীর্ঘ শাসনের ইতিহাসে ক্ষমতার মসনদে যত জন শাসক এসেছিলেন, তার মধ্যে ধর্মপালের শাসনামলই ছিল সর্বাপেক্ষা উজ্জ্বল। ইতিহাসবিখ্যাত ত্রি-পক্ষীয় সংঘর্ষের অন্যতম নায়ক ছিলেন তিনিই। বর্তমান বাংলা ও বিহার অঞ্চলের একটি অংশে গোপাল যে সাম্রাজ্যের সূচনা করেছিলেন, ধর্মপাল তাকে শক্তিশালী কাঠামোর উপর দাঁড় করান।

তিনি গৌড়, মগধ এবং উত্তর ভারতের অংশবিশেষের ওপর তার নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে সমর্থ হয়েছিলেন এবং এর মাধ্যমে একটি আঞ্চলিক রাজবংশকে উত্তর ভারতের বৃহৎ সাম্রাজ্যে পরিণত করতেও সমর্থ  হয়েছিলেন। ধর্মপাল আনুমানিক চল্লিশ বছর ক্ষমতায় আসীন থেকে ৮১০ খ্রিস্টাব্দের দিকে মৃত্যুবরণ করেন।

পাল শাসক ধর্মপালের মুদ্রা; Image Source: wikimedia commons

ধর্মপালের মৃত্যুর পর তার পুত্র দেবপাল পাল সাম্রাজ্যের হাল ধরেন। দেবপালের শাসনামলও পাল শাসনের সুবর্ণ সময় ছিল। তিনি তার পিতার রাজ্যসীমা আরো বৃ্দ্ধি করে পাল সাম্রাজ্যকে উচ্চতর অবস্থানে নিয়ে যেতে সমর্থ হয়েছিলেন।

ড. নীহাররঞ্চন রায়ের মতে, দেবপাল পাল সাম্রাজ্যের সীমা উত্তর পশ্চিমে কম্বোজ ও দক্ষিণে বিন্ধ্য পর্বত বৃদ্ধি করতে সমর্থ হয়েছিলেন। তিনি আসাম ও উড়িষ্যা অভিযানেও সাফল্য লাভ করেছিলেন।

আনুমানিক ৮৬১ খ্রিস্টাব্দে দেবপাল মৃত্যুবরণ করার মাধ্যমেই মূলত পাল শাসনের অগ্রগতি স্থবির হয়ে যায়। এ অবস্থানে আর কখনো ফিরতে পারেনি পালরা। এ হিসেবে ৮৬১ সাল পর্যন্ত সময়কেই পালদের প্রতিষ্ঠা, প্রভাব ও প্রতিপত্তি লাভের সময় হিসেবে উল্লেখ করা যায়।

অবনতির সময়কাল

দেবপালের পরেও যদিও পাল শাসন টিকে ছিলো আরো প্রায় তিনশ' বছর, কিন্তু সেটির বেশিরভাগ সময়ই ছিল, কোনোমতে টিকে থাকা। এই সময়ের মধ্যে কয়েকজন শাসক তাদের নৈপুণ্য দেখাতে সমর্থ হলেও তা পাল বংশের গৌরব ধরে রাখার জন্য অবশ্যই যথেষ্ট ছিল না। তাই নানা প্রতিকূল পরিবেশে পাল সাম্রাজ্য ধীরে ধীরে পতনের দিকে ধাবিত হতে থাকে।

দেবপালের মৃত্যুর পর কে পাল বংশের রাজ্য ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়েছিল, তা নিয়ে ধোঁয়াশা আছে। বেশ কয়েকজন শাসক এর মধ্যে ক্ষমতাসীন হলেও পালদের অবস্থা তখন একেবারেই শোচনীয় হয়ে পড়ে।

কম্বোজরা পালদের পিতৃভূমি বরেন্দ্র অঞ্চল ও এর সংলগ্ন পশ্চিমবঙ্গ অঞ্চলও নিজেদের দখলে নিয়ে নেয়। তবে ৯৯৫ খ্রিস্টাব্দের দিকে আরেকজন পাল রাজা এই বংশের হৃত গৌরব কিছুটা ফিরিয়ে আনার প্রচেষ্টা চালান। তিনি প্রথম মহীপাল।

সুলতান মাহমুদের ভারত অভিযানের সময় হিন্দুজোটে যাননি দ্বিতীয় মহীপাল; Image Source; wikimedia commons

প্রথম মহীপাল ও পালদের নিভে যাওয়ার আগে জ্বলে ওঠা

মোটামুটিভাবে ৯৯৫ থেকে ১০৪৩ খ্রিস্টাব্দ ছিল মহীপালের শাসনকাল। দেবপালের মৃত্যুর পর পালরা যখন ধীরে ধীরে নিশ্চিহ্ন হওয়ার পথে তখন পালদের হাল ধরেন প্রথম মহীপাল। পাল সাম্রাজ্যে তার শাসনকাল ছিল, ঠিক যেন নিভে যাওয়ার আগে দপ করে জ্বলে ওঠার মতো।

মহীপাল ছিলেন পাল শাসক দ্বিতীয় বিগ্রহপালের পুত্র। পালদের সংকটের মুহুর্তে মহীপালের অনবদ্য ভূমিকার জন্য অনেক ঐতিহাসিক তাকে পালদের দ্বিতীয় প্রতিষ্ঠাতা হিসেবেও উল্লেখ করে থাকেন।

যা-ই হোক, মহীপাল তার পূর্বসূরীদের হারানো সীমানার কিছুটা পুনরুদ্ধার করতেও সমর্থ হন। কম্বোজদের হাত থেকে পালদের পুরনো পিতৃভূমিও অধিকার করে পালদের হৃত গৌরব পুনরুদ্ধারে তিনি সচেষ্ট হয়েছিলেন।

সে সময় গজনীর সুলতান মাহমুদ ভারত অভিযান চালাচ্ছিলেন। সে সময় সকল হিন্দুরাজ্যগুলো একে ধর্মীয় রুপ দিয়ে জোট গঠন করলেও মহীপাল সেই জোটে যোগ না দিয়ে নিজের সাম্রাজ্য পুনর্গঠনে মনোযোগী হয়েছিলেন। তার এ কৌশলগত সিদ্ধান্ত পাল সাম্রাজ্যের অবস্থান আরো একটু সুসংহত করতে সহায়তা করে।

তিনি উত্তর বিহার, সারনাথ, বারানসী ইত্যাদি স্থানে আধিপত্য স্থাপন করতে সমর্থ হয়েছিলেন বলে জানা গেলেও, দাক্ষিণাত্যের রাজা রাজেন্দ্রচোলের নিকট পরাজিত হয়েছিলেন বলে জানা যায়। তবে পরাজিত হওয়ার পরেও তিনি তার সাম্রাজ্য ধরে রাখতে সমর্থ হন। 

পতনের সময়কাল 

মহীপালের পর তার পুত্র নয়পাল পালদের শাসক হিসেবে আসেন। তিনি কলচুরির রাজা কর্ণের আক্রমণ ঠেকিয়ে তার পিতৃরাজ্য কিছুটা হলেও ধরে রাখতে পেরেছিলেন। নয়পালের পর তৃতীয় বিগ্রহপালের সময়ও কর্ণ পাল সাম্রাজ্য আক্রমণ করেন, তবে তৃতীয় বিগ্রহপাল তাকে পরাজিত করেন।

কিন্তু তৃতীয় বিগ্রহপাল চালুক্যরাজা বিক্রমাদিত্যের কাছে পরাজিত হন। তৃতীয় বিগ্রহপাল এরপর আরো বেশ কয়েকটি আক্রমণে দিশেহারা হয়ে পড়েন এবং পাল সাম্রাজ্যের দ্রুত অবনতি ঘটতে থাকে। এসময় পূর্ব বাংলার দখল নিয়ে নেয় বর্মণরা।

নওগাঁর দিবর দিঘী, যা অম্লান করে রেখেছে দিব্যের স্মৃতি; Image Source: NH Emon, maps.google.com

পালদের বিরুদ্ধে বাংলা অঞ্চলের প্রথম সফল জনবিদ্রোহ

ইতিহাস কখনো কখনো উল্টো পথে হাঁটে। একসময় অরাজকতা, বিশৃঙ্খলা আর অত্যাচার থেকে পরিত্রাণ পেতে প্রথম পাল রাজা গোপালকে রাজা নির্বাচিত করা হয়েছিল। কিছু কালের ব্যবধানে সেই পালদের অধীনেই একটা সময় শুরু হলো বিশৃঙ্খল এক অধ্যায়।

পালদের ক্ষমতার মসনদে তখন দ্বিতীয় মহীপাল। পালরা বৌদ্ধ ধর্মের অনুসারী হওয়ায়, 'জীব হত্যা মহাপাপ'-এ মন্ত্রে, সে সময় মাছ ভক্ষণের উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। এবং এ কারণে অত্যাচারও শুরু করে।

কিন্তু এই অঞ্চলের মানুষ প্রাকৃতিক কারণেই ছিল মৎস্যভোজী। কাজেই জনরোষ বিদ্রোহের রুপ নেয় দ্রুতই। ১০৮০ সালের দিকে সংঘটিত এই বিদ্রোহ পরিচিত কৈবর্ত বিদ্রোহ নামে। কৈবর্তরা ছিলেন মূলত জেলে সম্প্রদায়। তবে এ বিদ্রোহে শুধু জেলেরা নয়, বরং বরেন্দ্র অঞ্চলের আপামর মানুষ সমর্থন দিয়েছিল বলে প্রতীয়মান হয়। 

কৈবর্তদের নেতা ছিলেন দিব্য। দিব্য অবশ্য একসময় পালদের অধীনে রাজ কর্মচারী ছিলেন। দ্বিতীয় মহীপাল এদের দমন করতে গিয়ে পরাজিত ও নিহত হন। এই বিদ্রোহকেই বাংলা অঞ্চলের প্রথম সফল জনবিদ্রোহ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়ে থাকে। 

পাল বংশের চূড়ান্ত পতন

দ্বিতীয় মহীপালের পতনের পর পালদের হাল ধরেন শুরপাল। আর শুরপালের পর পালদের আকাশে আরো একটু আলো ছড়িয়েছিলেন রামপাল। অপরদিকে বরেন্দ্র অঞ্চলে দিব্যের পর রুদ্রোক এবং তারপর ক্ষমতা গ্রহণ করেন ভীম। রুদ্রোক এবং ভীম দুজনই সুশাসক ছিলেন।

তাদের জনপ্রিয়তায় রামপাল শংকিত হয়ে পড়েন এবং তিনি আরো কয়েকজন সামন্তরাজার সাহায্য নিয়ে ভীমকে আক্রমণ করেন। প্রচণ্ড যুদ্ধে ভীম বন্দী হলে রামপাল তাকে নিষ্ঠুরভাবে সপরিবারে হত্যা করেন।

ভীমের মৃত্যুতে বরেন্দ্র অঞ্চল আবার পালদের অধীনে আসে। রামপাল বাংলা অঞ্চলের অধিকাংশ স্থান পুনরুদ্ধারসহ উড়িষ্যা, কামরুপেও আধিপত্য বিস্তার করতে সমর্থ হয়েছিলেন।

রাজা ভীমের নির্মিত দিব্যক জয়স্তম্ভ; Image Source: maps.google.com/Al-Amin Sarker

রামপালের মৃত্যুর পর আর কোনো শক্তিশালী শাসককে পালদের মসনদে দেখা যায়নি। রামপালের পর ক্ষমতা গ্রহণ করেন তার পুত্র কুমারপাল। তার সময়ে পালদের সীমানা ধীরে ধীরে সংকুচিত হয়ে আসতে থাকে। এসময়ই রাঢ় অঞ্চলে সেনদের উত্থান ঘটে। 

গোপালে শুরু, গোপালে শেষ!

প্রায় চারশ' বছর আগে একজন গোপালের রাজা নির্বাচিত হওয়ার মাধ্যমে যে পাল বংশের উত্থান, তার প্রায় চারশত বছর পর সেই পাল বংশের শাসনের চূড়ান্ত পতনপূর্ব ধারা পৌঁছেছিল আরেকজন গোপাল পর্যন্ত। তিনি পাল রাজা চতুর্থ গোপাল।

ধারণা করা হয়, শত্রুর হাতে নিহত হয়েছিলেন তিনি। তার পরবর্তী শাসকের সময়ই পাল সাম্রাজ্য চূড়ান্তরুপে ভেঙে পড়ে। এসময় যিনি পালদের সিংহাসনে ছিলেন তিনি মদনপাল। ১১৬১ সালে মদনপালের মাধ্যমে পালদের তিলে তিলে গড়ে তোলা সাম্রাজ্যর চূড়ান্ত পতন ঘটে। পালদের পতনের মাধ্যমে বাংলা অঞ্চলে নতুন শাসনের সূচনা ঘটে। 

রাজবংশের উত্থান-পতন যদিও ইতিহাসে খুবই স্বাভাবিক ও সাধারণ ঘটনা, তবে পালদের ইতিহাস একটু ব্যতিক্রম। পৃথিবীর ইতিহাস পর্যালোচনা করে দার্শনিক ইবনে খালদুন একটি সরলীকরণে উপনীত হয়ে বলেছিলেন, একটি রাজবংশ সাধারণত একশত বছর শাসন ক্ষমতায় টিকতে পারে।

যদিও সরলীকরণ সাধারণত ত্রুটিপূর্ণই হয়ে থাকে, তারপরও কোনো রাজবংশের একশ' বছরের বেশি টিকে থাকার ঘটনা পৃথিবীর ইতিহাসে হাতেগোনা। দীর্ঘসময় রাজত্ব করা এই হাতেগোনা কিছু রাজবংশের শাসনকালের মধ্যে ইতিহাসে অনন্য জায়গা দখল করে আছে পাল বংশের শাসনকালও!

ভারতবর্ষ সম্পর্কে আরও জানতে পড়ুন এই বইগুলো

১) ভারতবর্ষ এবং বাঙালির স্বশাসন ১ম খণ্ড
২) ভারতবর্ষ এবং বাঙালির স্বশাসন -২য় খন্ড

This is an article about fall of anceient pala dynasty. All references are hyperlinked inside the article.

Feature Image- Adivaraha, twitter.com