মহানবী হযরত মুহাম্মাদ (সা) পরলোকগমনের ২৫ বছর পর ভয়ংকর এক পরিস্থিতিতে পড়ে মুসলিম বিশ্ব; সে অবস্থাতেই খলিফার দায়িত্ব পান হযরত আলী (রা)। অনেকেরই ধারণা ছিল প্রথম খলিফাই হয়ত আলী (রা) হবেন যেহেতু তিনি নবীজীর সরাসরি আত্মীয়, চাচাতো ভাই। কিন্তু যোগ্যতর হিসেবে আবু বকর (রা), উমার (রা) ও উসমান (রা) প্রথম তিন খলিফার দায়িত্ব পালন করেন। অবশেষে যখন আলী (রা) এর পালা এলো, তখন তাঁর উপর এক খড়গ- তিনি কি উসমান (রা) এর হত্যাকারীদের শাস্তি দেবেন? না দিলে কেন নয়? ওদিকে এই অন্যায় ও জঘন্য হত্যার বিচার চেয়ে বিশিষ্ট সাহাবীদের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ থেকে আন্দোলনের দাবানল শুরু হয়ে গেলো, এবং সেই আন্দোলনে যারা যোগ দিলেন তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে হবে এমন কোনোদিনই কল্পনা করেননি আলী (রা)।

কেন হয়েছিল নবীর ভাই আলী (রা) আর নবীজীর স্ত্রী আইশা (রা) এর মাঝে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ? কী হয়েছিল মুসলিম ইতিহাসের রক্তাক্ততম গৃহযুদ্ধ ‘সিফফিনের যুদ্ধে’ যেখানে হযরত আলী (রা) তাঁর বাহিনী নিয়ে মুখোমুখি হন মুয়াবিয়া (রা) এর বিশাল বাহিনীর? অথচ দুজনেই কম-বেশি ছিলেন নবীর প্রিয়পাত্র, এমনকি দু’পক্ষের সাহাবীরাও ছিলেন নবীর চোখের মণি! কেন হযরত আলী (রা) এর বিশাল সমর্থক গোষ্ঠী তাঁকে ত্যাগ করে চলে যায়? কী ছিল উভয় পক্ষের দাবি? কীভাবে ও কাদের হাতে শেষমেশ আলী (রা) নিহত হন?

আলী (রা) এর বচনসমগ্র নাহজুল বালাগা থেকে একটি উক্তি। ছবিসূত্রঃ আলফাসাহাহ

ইসলামের ইতিহাসের ভয়াবহ এই অধ্যায় তুলে ধরবার জন্য আমরা শরণাপন্ন হয়েছি বিশুদ্ধতম ইতিহাসগ্রন্থগুলোর, যেন পাঠকদেরকে একটি নিরপেক্ষ ইতিহাস উপহার দেওয়া যায়। এ অধ্যায়ের কাহিনীগুলো বুঝবার জন্য পাঠকদেরকে পেছনের কিছু ঘটনা মনে করিয়ে দেওয়া হবে যেগুলো প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে প্রভাব ফেলেছিল আলী (রা) এর শাসনামলে। চলুন তবে ডুবে যাওয়া যাক ১৪০০ বছর আগের আরবে, একটি অস্থির সময়ে, যখন সবে মাত্র নির্মমভাবে মারা গেলেন মুসলিম বিশ্বের খলিফা উসমান (রা)।

২০০৬ সালে ভ্যাটিকানের একজন আর্চবিশপ জনপ্রিয় হলিউড মুভি ‘দ্য ডা ভিঞ্চি কোড’ বয়কট করবার আহ্বান জানান খ্রিস্টান বিশ্বকে; মুভিটি একই নামের বই থেকে নির্মিত যার লেখক ড্যান ব্রাউন। কেন এ আহ্বান? কারণ আর্চবিশপের মতে, এ মুভিটি “ঐতিহাসিক ভুলে ভরা এবং অবমাননাকর“। এ বইতে (বা মুভিতে) বলা হয়েছে যে, যীশু খ্রিস্ট ছিলেন মেরী ম্যাগডালিন নামের একজন সঙ্গিনীর সাথে বিবাহিত এবং তাদের বংশধারা পরবর্তীতে ইউরোপে রাজকীয় সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করে। ড্যান ব্রাউনের দাবিগুলো কতটা সঠিক সেটা আমরা অন্য পোস্টে আলোচনা করব, এখানে নয়; কেবল এটুকুই এখানে আমরা বলব যে, এ সুখপাঠ্য গল্পে আসলেই সত্যের সাথে মিশিয়ে ঐতিহাসিক ভুল তথ্য আছে। আপনি যখন উপন্যাস হিসেবেই পড়বেন, তখন কোনো আপত্তি নেই; আপত্তি তখনই যখন আপনি বিশ্বাস করে বসবেন ঘটনা সত্য। আপনি হয়ত ভাবছেন, আলী (রা) নিয়ে পড়তে এসে এ আমি কী পড়ছি।

ড্যান ব্রাউনের দ্য ডা ভিঞ্চি কোড বইয়ের প্রচ্ছদ। ছবিসূত্রঃ Amazon

এ কারণে বললাম যে, আমাদের দেশেও একটি প্রায় কাছাকাছি একটি ঘটনা আছে। বলছি বাংলার প্রথম মুসলিম ঔপন্যাসিক মীর মশাররফ হোসেনের (১৮৪৭-১৯১২) কথা। তাঁর সুখপাঠ্য উপন্যাস ‘বিষাদ সিন্ধু’ একটি অসাধারণ গল্প- এ ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু সমস্যা হলো এটাই যে আমাদের দেশে জনসাধারণের মাঝে ধারণা রয়েছে যে এ বইতে বর্ণিত ঘটনাগুলো ঐতিহাসিক সত্য। যেটা সম্পূর্ণ ভুল একটি ধারণা। যেহেতু তিনি শিয়া মতবাদে বিশ্বাসী পরিবারে বড় হয়ে উঠেছেন, তাই তাঁর লেখাতেও ‘ড্রামাটিক’ প্রভাব আনবার ব্যাপারে স্পষ্ট প্রভাব ছিল শিয়া উপকথা ও লোককাহিনীর, শিয়া ইতিহাসগ্রন্থের নয়। এ পোস্টটি পড়বার আগে পাঠকদের কাছে অনুরোধ থাকবে এ বই বা এ বইয়ের সাথে মিল থাকা পূর্বলব্ধ যেকোনো বদ্ধমূল ধারণা থেকে থাকলে সেটি মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলতে এবং ইতিহাস জানবার জন্য সত্যি সত্যি কোনো প্রামাণ্য ইতিহাস বই পাঠ করতে।

বিষাদ সিন্ধু উপন্যাসের একটি প্রচ্ছদ। ছবিসূত্রঃ অন্যধারা

আবু তালিবের ঔরসে জন্ম নেওয়া আলী (রা) ছিলেন হযরত মুহাম্মাদ (সা) এর আপন চাচাতো ভাই। তাঁর মা ছিলেন ফাতিমা বিনতে আসাদ। শিয়া মতবাদে বিশ্বাস করা হয় যে কাবা শরীফের ভেতরে তাঁর জন্ম হয় এবং ঐশ্বরিকভাবে তাঁর নাম রাখা হয় আলী। কিন্তু সুন্নি মতবাদে হাকিব ইবনে হিজাম-কেই ধরা হয় কাবার ভেতরে জন্মগ্রহণ করা একমাত্র ব্যক্তি, যিনি মহানবী (সা) এর মক্কা জীবনে তাঁর প্রতিবেশী ছিলেন।

আলী (রা) ছিলেন কম বয়সীদের মাঝে প্রথম ইসলাম গ্রহণকারী, তখন তাঁর বয়স প্রায় ১০। মদিনায় হিজরতের পর তিনি নবী কন্যা ফাতিমা (রা)-কে বিয়ে করেন। তাদের ঘরে জন্ম নেন হাসান (রা) ও হুসাইন (রা)। ফাতিমা (রা)-এর মাধ্যমে চলে আসা এ বংশধারাকে ‘আহলে বাইত’ বলা হয় যার অর্থ ‘(নবীর) ঘরের মানুষ’/’নবী-পরিবার’। উসমান (রা) এর নিহত হবার পর অনেক কাহিনীর পর খলিফা হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন আলী (রা)। সুন্নি মতবাদে এ ক্ষমতাগ্রহণ সঠিক হলেও, শিয়া মতবাদ অনুযায়ী পূর্বের তিন খলিফা অন্যায়ভাবে ক্ষমতা নিয়েছিলেন যেখানে ক্ষমতার অধিকার একমাত্র আলী (রা) ও আহলে বাইতের। এ ধারণার পার্থক্য থেকেই মূলত এ শ্রেণীবিভাগ সৃষ্টি হয়েছিল। ‘শিয়া’ শব্দটি ‘শিয়াতু-আলী’ শব্দের সংক্ষেপ যার অর্থ ‘আলীর সমর্থক’। আর সুন্নি বলতে বোঝায় যারা ‘সুন্নাহ’ অনুসরণ করে, সুন্নাহকে প্রাধান্য দেয়। কিন্তু এ বিভাগ পুরোপুরি বুঝবার জন্য আমাদের ফিরে তাকাতে হবে পেছনের কিছু কাহিনীর দিকে যেটা নিয়ে আমরা খুব সংক্ষেপে ধারণা দিয়ে যাব।

তাবীঈ থেকে বর্ণিত হাদিসে আছে যে, “জুলফিকারের মতো কোনো তলোয়ার নেই, আলীর মতো কোনো বীর নেই।” ইংল্যান্ডের উপকথা কিং আর্থারের কাহিনীতে ‘এক্সকালিবার’ নামের জাদুকরি তরবারির যত খ্যাতি ছিল, মুসলিম বিশ্বে তার চেয়েও অনেক বেশি খ্যাতি আলী (রা) এর তরবারি জুলফিকারের। ইতিহাস অনুযায়ী, বদর যুদ্ধে লব্ধ সম্পদের মাঝে এ তরবারি ছিল, যেটি রাসুল (সা) উপহার দেন আলী (রা)-কে। কিন্তু শিয়ারা বিশ্বাস করে থাকেন, জিবরাঈল (আ) বেহেশত থেকে এ তরবারি নিয়ে আসেন। এ তরবারির মাথা দু’ভাগ করা ছিল, এ কারণে এর নাম ছিল ‘জুলফিকার’ (‘দু ভাগে ফাঁড়া’), যদিও ভাবানুবাদে এর অর্থ ‘যা ফেড়ে দেয়’। ঐতিহাসিক তরবারি হলেও ইতিহাস থেকে হারিয়ে গেছে জুলফিকার, এর খোঁজ এখন পাওয়া যায় না। শিয়া মতবাদে বিশ্বাস করা হয়, দ্বাদশ ইমাম মাহদির কাছে এ তরবারি রক্ষিত আছে, তিনি নিয়ে আসবেন।

হারিয়ে যাওয়া জুলফিকার তরবারির একটি কাল্পনিক রূপায়ণ। ছবিসূত্রঃ Dream Interpretation

খায়বার অভিযানের আগে অসুস্থ থাকলেও, আলী (রা) দুর্গের দরজা নিজের হাতে তুলে নেন এবং সেটাকেই ঢাল হিসেবে ব্যবহার করতে করতে এগিয়ে যান। এ ঘটনা দেখে হতবাক সাহাবীরা পরে চেষ্টা করেন সেই দরজা নিজেরা তুলবার, কিন্তু সাতজন মিলেও তারা পারেননি। তিনি ‘আসাদুল্লাহ’ (আল্লাহ্‌র সিংহ) উপাধি পান। তাঁর আরেকটি উপাধি ছিল ‘আবু তোরাব’ (‘ধুলোবালির বাপ’), কারণ একদিন নবী (সা) মসজিদে গিয়ে দেখলেন আলী (রা) ধুলোবালি মাখা অবস্থায় মাটিতে শুয়ে আছেন। [মুসলিম শরিফ] তখন তিনি তাঁকে এ নাম দেন। তাছাড়া ‘আবুল হাসান’ (হাসানের বাবা) নামেও তাঁকে ডাকা হতো।

পেছনের যে ঘটনাগুলো জানা দরকার তার মাঝে প্রথম ঘটনা হলো ‘গাদির খুম’-এর ঘটনা। ‘গাদির’ অর্থ হ্রদ। খুম হ্রদের পাড়ে যে ঘটনা হয়েছিল সেটাই গাদির খুমের ঘটনা। বিদায় হজ্বের ভাষণ শেষ করে কাফেলা ৬৩২ সালের ১৫ মার্চ (১৮ জিলহজ্ব) রবিবার খুম হ্রদের তীরে এসে ভিড়ে। জায়গাটা মক্কা আর মদিনার মাঝামাঝি। ওদিকে একটি যুদ্ধ সেরে বিজয়ী আলী (রা) নিজেও এই জায়গায় এসে যোগ দিলেন। সহিহ মুসলিমের ২৪০৮ নং হাদিস থেকে এ ঘটনা জানা যায়। সেদিন আলী (রা) এর সাফল্যে খুশি হয়েছিলেন হযরত মুহাম্মাদ (সা)। তিনি বললেন, “আমি তোমাদের মাঝে দুটো গুরুত্বপূর্ণ জিনিস রেখে যাচ্ছি- কুরআন এবং আহলে বাইত। আল্লাহ্‌র বইকে তোমরা ধরে রেখো (বা মেনে চলো)। আর আমার পরিবারের ব্যাপারে আল্লাহ্‌কে ভয় করো (তিনবার বললেন)।” একই হাদিসে উল্লেখ করা হয়, নবীর স্ত্রীরাও তাঁর পরিবারের মানুষ এবং নবী পরিবারের কেউ যাকাত নিতে পারবেন না। [তবে অন্য এক হাদিসে যে দুটো জিনিস রেখে যাবার কথা বলা হয়েছে সেগুলো ছিলো কুরআন ও সুন্নাহ। (মুয়াত্তা ইমাম মালিক)]

গাদির খুম। ছবিসূত্রঃ ফিমাদানি

মানচিত্রে গাদির খুম। ছবিসূত্রঃ Ansar121

শিয়া ও সুন্নি উভয় মতবাদের মুসলিমরাই এক বাক্যে স্বীকার করে নেয় নবী পরিবারের সদস্যরা উচ্চ সম্মানের দাবিদার। নবী (সা) আরও বললেন, “তুমি আমার, আমি তোমার” (গাদির খুম ব্যতীত হয়ত অন্য এক সময় এটা বলে থাকতে পারেন) এবং “আমি যার মাওলা, আলীও তাঁর মাওলা” আরবি শব্দের বহু-অর্থ থাকবার কারণে এ বাক্য থেকে শিয়া ও সুন্নি মতবাদে ভিন্ন ব্যাখ্যা করা হয়। মাওলা অর্থ যেমন অভিভাবক হতে পারে, তেমন বন্ধুও হতে পারে। এ কথা থেকেই শিয়াগণ বলে থাকেন যে আলী (রা)-কে সেদিন নবী (সা) খলিফা নির্বাচিত করে যান। কিন্তু সুন্নিরা বিশ্বাস করে থাকেন যে, সেদিন হযরত মুহাম্মাদ (সা) আলী (রা)-কে সকল মুসলিমদের বন্ধু বলে সম্মানিত করেছিলেন। এটা মানতে কোনো সাহাবীরই আপত্তি ছিল না। সুন্নিরা বলে থাকেন, যদি আসলেই আলীকে হযরত মুহাম্মাদ (সা) নেতা নির্বাচন করে দিয়ে যান, তবে কি আবু বকর (রা), উমার (রা) বা উসমান (রা) এর মতো বড় সাহাবীরা জানতেন না সেটা? তাহলে তারা অবশ্যই শুরুতেই ক্ষমতা আলী (রা) এর হাতে সমর্পণ করতেন।

এরপর যে ঘটনা বলা প্রয়োজন সেটা হলো কাগজ-কলমের হাদিস। ঘটনাটা ঘটেছিল বৃহস্পতিবার, যখন মহানবী হযরত মুহাম্মাদ (সা) মৃত্যুশয্যায়। বুখারি (৬৯৩২) ও মুসলিম (১৬৩৭) [কিংবা সহি ইন্টারন্যাশনাল ভার্শন বুখারি 7:70:573] শরীফের হাদিস থেকে আমরা জানতে পারি, সেদিন নবীজী (সা) হঠাৎ বলে উঠলেন, “এসো, আমি তোমাদের জন্য লিখে দিয়ে যাই এমন কিছু যার পরে তোমরা কেউ বিপথগামী হবে না।” তখন উমার (রা) অসুস্থ নবী (সা)-কে দেখে বললেন, “দেখো সবাই, রাসুল (সা) কত ব্যথায় আছেন, আমাদের কাছে থাকা কুরআনই যথেষ্ট।” কেউ কেউ বললেন, না, রাসুল (সা) লিখে দিন। আবার কেউ কেউ বললেন, উমার (রা) ঠিক বলেছেন, রাসুল (সা) কষ্টে আছেন। যখন এই উচ্চবাচ্য তর্ক বিতর্ক বেশি হয়ে গেলো, তখন রাসুল (সা) আর সইতে না পেরে বললেন, “তোমরা সরে যাও এখান থেকে।” এ ঘটনা থেকে শিয়ারা দাবি করে থাকেন সেদিন উচ্চবাচ্য না হলে রাসুল (সা) তাঁর উত্তরাধিকারী হিসেবে আলী (রা) এর নাম লিখে দিয়ে যেতেন নিশ্চিতভাবে। সুন্নিরা বলে থাকেন, যদি সেটা এতই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে থাকতো, তবে আল্লাহ্‌ কখনো সেটা না লিখিয়ে নবী (সা)-কে পরলোকগমন করতে দিতেন না।

এখন যে পেছনের ঘটনাটার কথা বলব সেটি ইসলামি ইতিহাসে ‘নেকলেসের ঘটনা’ নামে পরিচিত। ঘটনাটি বুখারি শরীফে লিপিবদ্ধ রয়েছে। নবী (সা) বিভিন্ন অভিযানের সময় একজন স্ত্রীকে নিয়ে যেতেন লটারি করে বাছাই করে। মুস্তালিক অভিযানের সময় ওঠে স্ত্রী আইশা (রা) এর নাম। হিজাবের আয়াত এর আগেই চলে আসার কারণে আইশা (রা)-কে যে উটে করে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল তার পিঠে ছিল একটি হাওদা (পর্দা ঘেরা জায়গা যার ভেতরে তিনি বসতেন)। ফিরে আসার সময় মদিনার কাছাকাছি এক জায়গায় কাফেলা থামার পর প্রাকৃতিক ডাকে সারা দিতে আইশা (রা) কাছের ঝোপে গেলেন। যখন তিনি ফিরে এলেন, তখন দেখলেন তাঁর গলায় নবীজীর উপহার দেওয়া ইয়েমেনি নেকলেসটি নেই! তিনি আবার খুঁজতে গেলেন, গিয়ে পেয়ে গেলেন নেকলেসটা। কিন্তু কাফেলার জায়গায় ফিরে আসতেই তিনি দেখলেন কাফেলা নেই! তাঁকে না নিয়েই চলে গেছে! (তিনি খুব হালকা হওয়ায় কেউ বুঝতে পারেনি তিনি যে নেই উটের পিঠে। কেউ খেয়ালও করেনি যে তিনি চলে গিয়েছিলেন।)

পেছনে পেছনে সাফওয়ান নামের এক সাহাবী আসছিলেন কাফেলা কিছু ফেলে গেল কিনা দেখার জন্য। তিনি আবিষ্কার করলেন স্বয়ং আইশা (রা)-কে! আইশা (রা) ধরেই নিয়েছিলেন কেউ না কেউ তো টের পাবেই তিনি যে নেই, তখন তাঁকে উদ্ধার করতে আসবে, এই ভেবে ঘুমিয়ে পড়েছেন ওখানেই। সাফওয়ানের ডাকে ঘুম ভাঙে, তিনি তাঁকে তাঁর উটে উঠতে বলেন এবং বাকি পথ তাঁকে নিয়ে চলেন হেঁটে। অনেকদূর যাবার পর তারা সেনাবাহিনীর সান্নিধ্যে পৌঁছালেন।

বড় কাহিনী সংক্ষেপে বলতে গেলে, গুজব রটিয়ে দেওয়া হলো যে, দীর্ঘ পথ নবীপত্নী আইশা (রা) এক অনাত্মীয়ের সাথে কী না কী করে এসেছেন! নবী (সা) এর কানে এ গুজব পৌঁছালে তিনি বিশ্বাস না করলেও কষ্ট পেয়েছিলেন। আর যখন আইশা (রা) এর কানে পৌঁছাল, তখন তাঁর অবস্থা পুরো খারাপ হয়ে গেলো। তিনি নাওয়াখাওয়া ছেড়েই দিলেন, কাঁদতে কাঁদতে জান শেষ।

এ পর্যায়ে ইবনে হিশাম রচিত নবী (সা) এর জীবনীগ্রন্থ থেকে আমরা জানতে পারি, আলী (রা) তখন নবীজীকে পরামর্শ দিলেন, এসব অপবাদ শোনার চেয়ে তিনি যেন তাঁকে তালাক দিয়ে দেন, অন্য কোনো নারী তিনি পাবেন।

কিন্তু আল্লাহ্‌ তখন ওহী নাজিল করলেন, যা কুরআনের আয়াত হিসেবে এখনো পঠিত হয়ঃ তোমরা যখন একথা শুনলে, তখন বিশ্বাসী পুরুষ ও নারীগণ কেন নিজেদের মানুষ (আইশা) সম্পর্কে উত্তম ধারণা করোনি এবং বলোনি যে, এটা তো নির্জলা অপবাদ?” [সুরা নুর ২৪:১২] এবং আরো কিছু আয়াত। কুরআনের আয়াত দ্বারা অপবাদ মোচনের পর আইশা (রা) এর সম্মান আরো অনেক বেড়ে গেলো মদিনার মানুষদের মাঝে, কারণ স্বয়ং আল্লাহ্‌ তাঁকে নিয়ে কথা বলেছেন। আর যারা অপবাদ ছড়িয়েছিল তাদের শাস্তি দেওয়া হলো।

কিন্তু আলী (রা) এর সেই ‘পরামর্শ’ আইশা (রা) মনে রাখেন। অবশ্য আলী (রা) আইশা (রা)-এর প্রতি কিছুটা বিরূপ ধারণা রাখবারও হালকা কারণ ছিল। তরুণী স্ত্রী আইশা (রা) নবীর (সা) প্রয়াত স্ত্রী খাদিজা (রা) সম্পর্কে ঈর্ষা পোষণ করতেন। এ ব্যাপারটা আলী (রা) হয়তো ঠিক মতো মেনে নিতে পারেননি। কারণ দুর্ভিক্ষের সময় মুহাম্মাদ (সা) শিশু আলী (রা)-কে নিজের পরিবারে নিয়ে মানুষ করেছিলেন, তখন খাদিজা (রা) তাঁর কাছে মায়ের মতোই ছিলেন। তাই এরকম ঈর্ষান্বিত কথা তাঁর কাছে খারাপ লাগবে। শিয়া মতবাদে এই হালকা বিরূপতাকে সরাসরি ‘শত্রুতা’ বলে আখ্যা দেওয়া হয়।

আমাদের কেবল আর একটি পেছনের ঘটনা বলা বাকি রয়েছে। সেটি হলো ‘মুবাহালা’র ঘটনা। আইশা (রা)-এর সম্মান অনেক বেড়ে যাবার পর, আহলে বাইত বলে পরিচিত আলী (রা) বা ফাতিমা (রা) অনুভব করলেন তারা হয়ত কিছুটা কম প্রাধান্য পাচ্ছেন নবীর কাছে। আইশা (রা) তখন নবীজীর ‘প্রিয়তম স্ত্রী’ হিসেবে পরিচিত। ফাতিমা (রা) এর মৃদু এক অভিযোগ তখন নবী (সা) এর মনে থেকে যায়। প্রাসঙ্গিকভাবে ৬৩২ সালের মার্চ মাসে ইয়েমেন (তৎকালীন নাজরান) থেকে একদল খ্রিস্টান এলো মদিনাতে নবী মুহাম্মাদ (সা) এর সাথে ধর্মীয় বিতর্ক করতে। তারা যীশুর ঐশ্বরিকতা নিয়ে তর্ক করল, নবীও (সা) তাদের ইসলামের আহ্বান জানালেন। তারা নিজেদের তত্ত্বমাফিক তর্ক চালিয়ে গেলেন। তখন মুহাম্মাদ (সা) মুবাহালা (‘অভিসম্পাত প্রার্থনা’) করবার কথা বললেন। ব্যাপারটা এরকম- উভয় পক্ষ নিজেদের প্রিয়জন নিয়ে আসবে, এরপর ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করবে যে, যে পক্ষ মিথ্যেবাদী তাদের উপরে যেন তিনি অভিশাপ প্রেরণ করেন। “এসো, আমরা ডেকে নেই আমাদের পুত্রদের এবং তোমাদের পুত্রদের এবং আমাদের স্ত্রীদের ও তোমাদের স্ত্রীদের এবং আমাদের নিজেদের ও তোমাদের নিজেদের আর তারপর চল আমরা সবাই মিলে প্রার্থনা করি এবং তাদের প্রতি আল্লাহর অভিসম্পাত করি যারা মিথ্যাবাদী।” [আলে ইমরান ৩:৬১]

পরদিন নবী (সা) হাজির হলেন ফাতিমা (রা), আলী (রা), হাসান (রা) ও হুসাইন (রা)-কে নিয়ে। অর্থাৎ তাঁর আহলে বাইতকে নিয়ে। তাঁর কোনো স্ত্রী তাঁর অন্তর্ভুক্ত হলেন না, এমনকি প্রিয়তম আইশা (রা) পর্যন্ত না। একটি কালো চাদরে তিনি ঢেকে দিলেন আহলে বাইতকে। এ দৃশ্যটা দুটো কারণে খুব প্রভাব ফেলেছিল খ্রিস্টানদের উপর। কারণ আরব খ্রিস্টানদের মাঝে একটি কথা প্রচলিত ছিল যে, প্রথম নবী আদম (আ) এভাবে তাঁর পরিবারের উপর চাদর ঢেকে দিয়েছিলেন। এই একই দৃশ্য থেকে তাদের মনে পড়ে গেল আদম (আ) এর কথা; তবে কি তিনি আসলেই সত্য বলছেন? তার চেয়েও বড় ব্যাপার, মুহাম্মাদ (সা) নিজের সন্তান পৌত্রদের নিয়ে এসেছেন! তিনি সত্য বলছেন দেখেই তার মানে ভয় করছেন না যে কোনো অভিসম্পাত তাঁর বা আহলে বাইতের উপর পড়বে। কিন্তু একই নিশ্চয়তা খ্রিস্টানরা দিতে পারেনি। তারা পরামর্শ করে মুবাহালার প্রস্তাব থেকে সরে আসে এবং জানায় যে, মুহাম্মাদ (সা) যা বলবেন সেটাই মেনে নিবেন। [ইবনে সাদ, তাবারি, ইবনে ইসহাক, বুখারি] এই ঘটনা থেকেও শিয়াগণ আলী (রা)-কে প্রথম খলিফা হবার দাবিদার করে।

আমাদের পেছনের কাহিনী সব বলা শেষ। যদি পাঠকের মনে থাকে যে উসমান (রা) হত্যার সময় কী ভয়ংকর পরিস্থিতি ছিল মদিনাতে তবে এখনের ঘটনাগুলো বুঝতে সুবিধা হবে। আর মনে না থাকলে, আগের পোস্টগুলো পড়ে আসবার অনুরোধ থাকলো।

উসমান (রা) এর শাসনামলে যোগ্য শাসকের অভাব ছিল, যেমন জানা যায় যে একজন গভর্নর মদ্যপান করে জনগণের সামনে এসেছিলেন। কিন্তু শাস্তি দেওয়ার ব্যাপারে উসমান (রা) ছিলেন উমার (রা) এর সরাসরি বিপরীতে। অর্থাৎ তিনি এতই কোমল মনের ছিলেন যে তিনি শাস্তি দেননি। এসব রাষ্ট্র পরিচালনার হাঙ্গামার চেয়ে নীরবে কুরআন পড়তেই বেশি পছন্দ করেন বয়স্ক উসমান (রা)। তাছাড়া মিসরের গভর্নরের সীমাহীন দুর্নীতির জন্য মিসর থেকে শয়ে শয়ে মানুষ এসেছিল বিদ্রোহী হয়ে। এমনকি আইশা (রা) পর্যন্ত রাগে কথা শুনিয়েছিলেন উসমান (রা)-কে। আর এই উসমান (রা) এর বিরুদ্ধে বিদ্রোহের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন স্বয়ং আবু বকর (রা) এর পুত্র মুহাম্মাদ (রা)। কিন্তু তথাকথিত মারওয়ানের চিঠির পর ফিরে আসা বিদ্রোহীদের রক্তপিপাসা দেখে মুহাম্মাদ বিন আবু বকর (রা) তাঁর বিদ্রোহ ত্যাগ করেন। কিন্তু যা হবার হয়ে গেছে। উসমান (রা)-কে বিদ্রোহীরা হত্যা করে ফেলল। যদিও আমরা জানি না কে সেই মরণ-আঘাত হেনেছিল। কিন্তু বিদ্রোহীরা এবং বিদ্রোহের পক্ষের নবীর সাহাবীরা সত্যি সত্যি বিশ্বাস করতেন যে এই বিদ্রোহ সঠিক, এবং উসমান (রা) নাকি কুরআন মেনে শাসন করছেন না। এজন্য তারা তার পদত্যাগ চাইতো, কিন্তু মৃত্যু কেউ ঘুণাক্ষরেও সত্যি সত্যি চায়নি। একজনই কেবল নিজে এগিয়ে আসতে চেয়েছিলেন উসমান (রা)-কে রক্ষা করতে, তিনি ছিলেন মুয়াবিয়া (রা)।

আমরা যখন উভয় পক্ষের প্রতিদ্বন্দ্বী সাহাবীদের কথা বলব তখন চেষ্টা করব তাদের উচ্চ-ধার্মিকতা আর মহানবী হযরত মুহাম্মাদ (সা) এর আমলের একাগ্রতার কথা স্মরণ করিয়ে দিতে। যেমন মুহাম্মাদ বিন আবু বকর (রা) কেবল যে আবু বকর (রা) এর সন্তান ছিলেন তা-ই নয়, পাশাপাশি তিনি আলী (রা) এর সৎপুত্রও ছিলেন। কারণ আলী (রা) বিয়ে করেছিলেন আবু বকর (রা) এর বিধবা স্ত্রী আসমা (রা)-কে। আর এ কথা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, মুহাম্মাদ (রা) ছিলেন নবীপত্নী আইশা (রা) এর ভাই। পরবর্তীতে আলী (রা) এর বিশ্বস্ত জেনারেল।

[আলী (রা) এর ঘটনাগুলো বর্ণনার সময় আমরা ইবনে কাসিরের আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া (‘শুরু ও শেষ’) নামক প্রামাণ্যতম ইসলামি ইতিহাসগ্রন্থ থেকে বর্ণনা করা হবে। এ ঘটনাগুলো সঠিকভাবে উপস্থাপন করবার জন্য এ কয়দিনে আমরা অনেকগুলো গ্রন্থের সহায়তা নিয়েছি পাঠকদের বিশুদ্ধ ইতিহাস উপহার দেবার জন্য।]

উসমান (রা) শহীদ হবার পর মিসরীয় বিদ্রোহীরা আলী (রা)-কে খুঁজছিলেন। আর ইরাকের বসরার বিদ্রোহীরা খুঁজছিলেন তালহা (রা)-কে। আর কুফাবাসীরা (কুফী-রা) খুঁজছিল জুবাইর (রা)-কে। পাঁচদিন ধরে মদিনা নেতাশূন্য ছিল, তখন মদিনার আমির ছিলেন গাফেফী ইবনে হারব।

আলী (রা) চাননি খলিফা হতে, তিনি পালিয়ে বাগানবাড়িতে চলে যান। কিন্তু পরে তাঁকে অনেক বুঝিয়ে রাজি করা হয়। চাপের বশে তখন তিনি শাসনকাজ হাতে নিলেন। একে একে মানুষ এসে বাইয়াত (আনুগত্য) দিতে লাগল। কিন্তু সাতজন প্রধান সাহাবী বিরত থাকলেন। তারা এটা মানতে পারলেন না যে একদিকে উসমান (রা) মারা গেলেন, এমনকি ঠিকমত দাফন পেলেন না, আর এদিকে আলী (রা) ক্ষমতা নিয়ে বসে থাকবেন খুনিদের শাস্তি না দিয়েই? কিন্তু পরিতাপের বিষয় এটাই ছিল যে, সেই বিদ্রোহী বা খুনিরাই সবার আগে ছুটে যায় আলী (রা)-কে খলিফা করতে।

তালহা (রা) তাঁর অবশ হাতে বাইয়াত দিলেন আলী (রা)-কে। তারপর করলেন জুবাইর (রা)। কিন্তু তাঁরাই জোরপূর্বক অনুগত হলেন, তাদের মাথার উপর বিদ্রোহীদের তরবারি ঝুলছিল।

ওদিকে ঘটলো আরেক ঘটনা। নিহত উসমান (রা) এর রক্তমাখা জামা আর স্ত্রী নাইলার কাটা আঙুলগুলো নিয়ে নুমান বিন বশির মদিনা ত্যাগ করেন। তিনি উমার (রা) কর্তৃক নিয়োগ দেয়া সিরিয়ার গভর্নর হযরত মুয়াবিয়া (রা) এর নিকট উপস্থিত করেন ওগুলো। মুয়াবিয়া তখন সেগুলো সবাইকে দেখাতে মিম্বরে স্থাপন করলেন। সে জামা আর আঙুলগুলো দেখে কান্নাকাটি আর প্রতিশোধের আগুন জেগে ওঠে। উল্লেখ্য উসমান (রা) আর মুয়াবিয়া (রা) ছিলেন আত্মীয়। পুরো এক বছর ধরে ‘স্ত্রীশয্যায় যাবেন না প্রতিশোধ না নিয়ে’- এরকম শপথ করে সেনারা।

খলিফা হবার পর হযরত আলী (রা)-কে বড় বড় সাহাবীরা এসে অনুরোধ করলেন খুনিদের মৃত্যুদণ্ড দেবার। কিন্তু আলী (রা) সেটা করতে অস্বীকৃতি জানালেন, বললেন সন্ত্রাসীদের সাঙ্গপাঙ্গ আছে, আছে তাদের সহায়তাকারী। আপাতত তিনি এটা করতে পারবেন না। তখন মুগিরা (রা), তালহা (রা) ও জুবাইর (রা) মদিনা ত্যাগ করে মক্কা চলে গেলেন।

রাসুল (সা)-এর চাচাতো ভাই ইবনে আব্বাস (রা) আলী (রা)-কে পরামর্শ দিলেন, তিনি যেন মুয়াবিয়া (রা)-কে অপসারণ না করেন। তাছাড়া আলী (রা) এর বিরুদ্ধে তালহা (রা) ও জুবাইর (রা) উঠে পড়ে লাগতে পারে। কিন্তু আলী (রা) আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা)-কেই সিরিয়ার গভর্নর করার কথা বললেন মুয়াবিয়াকে সরিয়ে। কিন্তু ইবনে আব্বাস (রা) সেটা মানতে রাজি হলেন না। ইবনে আব্বাস (রা) এর কোনো পরামর্শ আলী (রা) শুনলেন না, বরং আগত বিদ্রোহী খারেজি নেতাদের পরামর্শ মেনে নিলেন।

মুয়াবিয়া (রা) এর দূত যখন আলি (রা) এর দরবারে এসে সিরিয়ার মানুষের প্রতিশোধ পিপাসা নিয়ে জানালেন, তখন আলী (রা) বললেন, উসমান (রা) এর রক্ত ঝরানোতে তিনি দায়ী নন। তখন বিদ্রোহীরা মুয়াবিয়ার দূতকে খুন করে ফেলতে চাইলো। অনেক কষ্ট করে সেই দূত পালিয়ে যেতে সক্ষম হন। আলী (রা) তখন সিরিয়াবাসীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবার চিন্তা করলেন, না করলে মুসলিম বিশ্ব দু’ভাগে ভাগ হয়ে থাকবে। তিনি সেজন্য মিসর আর কুফা থেকে সেনা চাইলেন।

পুত্র হাসান (রা) এসে তাঁর কাছে বললেন, “বাবা! এ পরিকল্পনা বাদ দিন। এতে মুসলিমদের মাঝে রক্তপাত হবে। মতভেদ হবে।” আলী (রা) তাঁর কথা শুনলেন না। কিন্তু সিরিয়ার জন্য তিনি বের হয়ে গেলেও পথিমধ্যে এমন কিছু হলো যা সিরিয়া অভিযানকে পিছিয়ে দিল। আর সেটি ছিল কুখ্যাত জামাল যুদ্ধ (Battle of the Camel) (‘জামাল’ অর্থ ‘উট’) যা সংঘটিত হয় আইশা (রা) ও আলী (রা) এর মাঝে- এটি ছিল মুসলিমদের প্রথম গৃহযুদ্ধ (প্রথম ফিতনা)।

আলী (রা) সিরিয়াবাসীদের সাথে যুদ্ধ করার জন্য মদিনাবাসীদের আহবান করেন, কিন্তু তারা মানা করে দেয়। ওদিকে আইশা (রা), তালহা (রা), জুবাইর (রা) প্রমুখ মক্কা থেকে সিদ্ধান্ত নিলেন উসমানের (রা) রক্তের বদলা নেয়ার ব্যাপারে জানাতে একসাথে মদিনা যাবেন আলী (রা) এর কাছে। কিন্তু কেউ কেউ বলল ইরাকের বসরায় গিয়ে সেনা যোগাড় করতে এবং বসরার বিদ্রোহীদের দমন করতে আগে। অন্যান্য নবীপত্নীগণ মদিনা ফিরে যান। কিন্তু আইশা (রা) বসরা যেতে রাজি হন। আলী (রা) মুয়াবিয়া (রা)-কে হারিয়ে উসমান (রা) হত্যার বিচার পাবার রাস্তা বন্ধ করে দিচ্ছেন জানতে পেরে তারা সকলেই আলী (রা)-কে বোঝাতে রওনা দিয়ে দেন। তবে যুদ্ধ করার কোনো ইচ্ছা তখনো ছিল না, কিন্তু তাদের অবস্থান যে আলী (রা) এর বিরুদ্ধে সেটা পরিষ্কার ছিল।

মানচিত্রে বসরা। ছবিসূত্রঃ mopn map

রাতের বেলা ‘হাওয়াব’ নামের এক কুয়ার কাছে আসবার পর তারা কুকুরের আওয়াজ পেতে থাকলেন। আইশা (রা) জিজ্ঞেস করলেন, এ জায়গার নাম কী? তারা বলল, হাওয়াব। সাথে সাথে আইশা (রা) চিৎকার করে বললেন, ইন্নালিল্লাহ! আমি ফিরে যেতে চাই। রাসুল (সা) একবার তাঁর স্ত্রীদের নিয়ে বলছিলেন, “হায়! আমি যদি জানতাম তোমাদের মাঝে কার জন্য হাওয়াবের কুকুরগুলো ক্রন্দন করবে!” আমিই সেই স্ত্রী!

আইশা (রা) ফিরে গেলে উসমান (রা) এর হত্যার বদলা নেওয়া হবে না। আর বিদ্রোহীরা আলী (রা)-কে জেঁকে বসেই থাকবে, ক্ষমতার অপব্যবহার চলতে থাকবে। এগুলো প্রতিহত করবার জন্য আব্দুল্লাহ ইবনে জুবাইর (রা) লোক হাজির করে তাদের দিয়ে বলালেন যে, এটি হাওয়াব কুয়ো নয়। কারণ আইশা (রা) এর ভাগ্নে আব্দুল্লাহ ইবনে জুবাইর (রা)-এর কাছে এটাই সঠিক সিদ্ধান্ত মনে হয়েছিল (ইনি কিন্তু পূর্বে উল্লেখিত তালহা (রা) এর সাথের জুবাইর (রা) নন)। তিনি ছিলেন সেই সাহাবী যার জন্মের সময় মুসলিমরা খুশিতে ফেটে পড়ে। কারণ হিজরতের পর কোনো মুসলিম পরিবারে বহুদিন কোনো শিশু জন্মাচ্ছিল না। ইবনে জুবাইর (রা) এর জন্মের পর এজন্য মুসলিমরা আনন্দিত হয়। তাঁকে হযরত মুহাম্মাদ (সা) এর কাছে নিয়ে আসা হয়। নবী (সা) একটা খেজুর আনতে বললেন, আইশা (রা) অনেক খুঁজে খেজুর পেলেন না, ঘণ্টাখানেক পর কোথা থেকে যেন খেজুর নিয়ে আসলেন। এরপর মুহাম্মাদ (সা) সেই খেজুর মুখে চাবিয়ে নরম করে সেটা ইবনে জুবাইর (রা) এর মুখে পুরে দিলেন, যেন প্রথম যে জিনিস তাঁর মুখে প্রবেশ করে সেটি যেন হয় নবী (সা) এর লালা। তাঁকে তিনি নবীগৃহে বড় করবার আদেশ দিয়েছিলেন।

যা-ই হোক, আইশা (রা) পরে শান্ত হবার পর আবার বসরার উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু হলো। সেখানে গিয়ে তাঁর বাহিনী বসরার গভর্নরকে পরাজিত করে সেখানে অবস্থিত উসমান (রা) এর হত্যাকারী বা হত্যার সমর্থকদের হত্যা করে।

আলী (রা)-কে পুনরায় হাসান (রা) বললেন, “বাবা, আমি তোমাকে নিষেধ করেছি, কিন্তু তুমি শোনোনি!” উত্তরে আলী (রা) বললেন, “তুমি সব সময় দেখি মেয়েদের মতো মায়াকান্না কেঁদে থাকো!” তখন হাসান (রা) তাঁকে উসমান (রা) এর হত্যার সময় হওয়া কিছু ঘটনা স্মরণ করিয়ে দিলেন। তবে আলী (রা) এ কথা বলে বক্তব্য শেষ করলেন, “প্রিয় সন্তান, আমাকে আমার কর্তব্য পালন করতে দাও।

আলী (রা) ২০ হাজার সেনা নিয়ে বসরা আসলেন এবং দূত মারফত জানালেন, ৫০০ লোকের শাস্তি দিতে ৫০০০ মুসলিমের রক্তক্ষয় ঠিক নয়। আইশা (রা) রাজি হলেন আলোচনা করে পরিস্থিতি মেটাতে, তালহা (রা) ও জুবাইর (রা)-ও চাননি যুদ্ধ হোক। কিন্তু এতে বিদ্রোহীরা রেগে যায়, কারণ সালিশ হলে কিংবা শান্তিপূর্ণ উপায়ে ঘটনা মিটে গেলে তাদের ভয়াবহ শাস্তি পেতে হবে পরে এবং এদের মধ্যে একজন ছিলেন আব্দুল্লাহ ইবনে সাবা নামের এক নেতা। এর আগ পর্যন্ত কেবল হালকা প্রস্তর নিক্ষেপ পর্যন্ত সীমাবদ্ধ ছিল উভয় পক্ষের দ্বন্দ্ব।

আব্দুল্লাহ ইবনে সাবা আগে একজন ইয়েমেনি ইহুদী ছিলেন। পরে ইসলাম গ্রহণ করেন (তবে সুন্নি ও শিয়ারা তাকে মুনাফিক/hypocrite বলে থাকেন)। আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া গ্রন্থে আমরা শান্তিপ্রস্তাবে তার অনাস্থাজ্ঞাপন সম্পর্কে জানতে পারি। তাবারির গ্রন্থ অনুযায়ী, ইবনে সাবা আলী (রা) এর একনিষ্ঠ ভক্ত হিসেবে নিজেকে উপস্থাপন করেন এবং তিনি ও তাঁর অনুসারীরাই প্রথম আলীর ঐশ্বরিক গুণ এবং অন্যান্য নতুন বিশ্বাস প্রচলন করেন, যা বর্তমানে শিয়ারা বিশ্বাস করে থাকেন। স্বাভাবিকভাবেই ইবনে সাবা’র প্রভাব শিয়াগণ অস্বীকার করে থাকেন এবং বলে থাকেন যে আলী (রা) ইবনে সাবা-কে হত্যা করেন যখন তিনি প্রচার করা শুরু করেন যে আলী (রা)-ই হলেন ঈশ্বর। তবে অনেক ইতিহাসবেত্তা উটের যুদ্ধে ইবনে সাবা’র প্রভাব বর্ণনা করেছেন, আবার কেউ কেউ অস্বীকার করেছেন। মোট কথা শিয়া ও সুন্নি উভয় মতবাদেই ইবনে সাবা-কে নিকৃষ্ট মনে করা হয়।

বলা হয়েছে, শান্তিপ্রস্তাবের রাতে এই খারেজি বিদ্রোহীরা (কারো মতে, ইবনে সাবার নেতৃত্বে) লুকিয়ে আলী (রা) এর শিবির থেকে এসে আইশা (রা) এর শিবিরের তাঁবুগুলো পুড়িয়ে দেন। সবাই বুঝে নিলো যে আলী (রা) বিশ্বাস ভঙ্গ করেছেন। তারাও পাল্টা আক্রমণ চালালেন। আলী (রা) চেষ্টা করেও তাঁর নিজের মানুষদের থামাতে পারলেন না প্রতিপক্ষের রক্ত ঝরাতে। কিন্তু যুদ্ধ তো শুরু হয়ে গেলো। পাঠকদের মনে রাখতে হবে যে এক পক্ষে ছিলেন আলী (রা), ইবনে আব্বাস (রা), মুহাম্মাদ বিন আবু বকর (রা), আম্মার (রা) এবং অন্য পক্ষে ছিলেন আইশা (রা), তালহা (রা), জুবাইর (রা), মারওয়ান- এরা।

আলী (রা) এর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করছিলেন বলেই যে প্রতিপক্ষের সকলে খারাপ ছিলেন এমনটি নয়। আইশা (রা) সম্পর্কে নতুন করে বলবার কিছু নেই। তালহা (রা)-কে পরিচয় করিয়ে দেওয়া জরুরি। তিনি এত সফল ব্যবসায়ী ছিলেন যে তাঁর কাপড়ের ব্যবসা থেকে আয় হবার পর ক্রয় করা জমির দাম ছিল ৩ কোটি দিরহাম! তাঁকে জাওয়াদ (‘দানশীল’) উপাধি দেয়া হয়েছিল। নবুয়তের শুরুতেই যারা ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন, তালহা (রা) ছিলেন তাদের মাঝে প্রথম আট জনের একজন। তিনি বদর যুদ্ধে অংশ নিতে না পারলেও তাঁকে নবী (সা) এমনভাবে গণনা করেছিলেন যেন তিনিও অংশ নিয়েছিলেন। উহুদ যুদ্ধে গুজব রটে যায় যে হযরত মুহাম্মাদ (সা) মারা গেছেন, তখন মুসলিম বাহিনী ছন্নছাড়া হয়ে পালাতে থাকে। তালহা (রা) পালিয়ে যাননি, তিনি মুহাম্মাদ (সা) এর দেহরক্ষী হয়ে যান। একটি তীর সরাসরি মুহাম্মাদ (সা) এর মুখ বরাবর এগিয়ে আসতে দেখে তিনি সেটি হাত দিয়ে ঠেকিয়ে দেন, ফলে তাঁর সে হাতের দুই আঙুল বাকি জীবনের জন্য অবশ হয়ে পড়ে। তাঁর মাথায় দু’বার আঘাত করে কুরাইশ-বাহিনী। কিন্তু তারপরেও তিনি মুহাম্মাদ (সা)-কে আড়াল করে রাখতে থাকেন। মোট ৭৫টি আঘাত তাঁর দেহে পাওয়া যায় এ কাজ করতে গিয়ে। তাঁর কন্যাকে বিয়ে করেন হাসান (রা)। যখন হাসান (রা) মারা যান, তখন হুসাইন (রা)-ও তাঁর কন্যাকে বিয়ে করেন। মুহাম্মাদ (সা) এর কাছে জিবরাঈল (আ) ১০ জনকে জীবিত অবস্থাতেই বেহেশতের সুসংবাদ দিতে বলেন আল্লাহ্‌র পক্ষ থেকে, যে ১০ জনের মাঝে ছিলেন হযরত তালহা (রা)।

আর জুবাইর ইবনে আলআওয়াম (রা) সম্পর্কে নবী (সা) বলেছিলেন, “প্রত্যেক নবীর একজন শিষ্য থাকে, আমার ক্ষেত্রে সেটা জুবাইর।” তিনি তালহা (রা)-এরও আগে ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন (৪র্থ/৫ম জন)। উহুদ যুদ্ধের সময় হাতে গোনা যে কজন মুহাম্মাদ (সা) এর নিরাপত্তার জন্য থেকে গিয়েছিলেন, তাঁদের মাঝে ছিলেন তালহা (রা) ও জুবাইর (রা)। তালহা (রা) ও জুবাইর (রা) দুজনেই জীবিতাবস্থায় নিশ্চিত বেহেশতের সুসংবাদ পাওয়া ১০ সাহাবীর মধ্যে ছিলেন।

এ গৃহযুদ্ধের সময় সাহাবী আবু মুসা (রা) বলেছিলেন, “চলমান সংকটে ঘুমন্ত ব্যক্তি জাগ্রত ব্যক্তির চেয়ে উত্তম, বসে থাকা ব্যক্তি দাঁড়িয়ে থাকা ব্যক্তি থেকে উত্তম, দাঁড়িয়ে থাকা ব্যক্তি আরোহীর থেকে উত্তম…।” কেবল হেজাযে (মক্কা-মদিনা) থাকা মানুষগুলো নিরপেক্ষ ছিল। ওদিকে যুদ্ধ দেখে আলী (রা) হাসান (রা)-কে বললেন, “আমি যদি ২০ বছর আগেই মারা যেতে পারতাম!” হাসান (রা) তখন বললেন, “আমি তো আগেই আপনাকে নিষেধ করেছিলাম।

যুদ্ধক্ষেত্রের একদম মাঝে এসে আলী (রা) ঘোড়ার পিঠে চড়ে প্রতিপক্ষ জুবাইর (রা) এর সাথে কথা বললেন। আলী (রা) তাঁকে জানালেন, “তোমার কি মনে আছে সেদিনের কথা যখন রাসুল (সা) তোমাকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, জুবাইর! তুমি কি আলীকে ভালোবাসো? তুমি বলেছিলে, হ্যাঁ। তখন রাসুল (সা) বলেছিলেন, সেদিন তোমার অবস্থা কেমন হবে যেদিন তুমি ওর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে জুলুমকারী হবে?

সাথে সাথে জুবাইর (রা) বললেন, “আল্লাহ্‌র কসম! আমার এইমাত্র মনে পড়ল! ভুলে গিয়েছিলাম। আমি তোমার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করব না।” এই বলে তিনি যুদ্ধ ময়দান ত্যাগ করলেন। অথচ ওদিকে তুমুল যুদ্ধ চলছে। আমর ইবনে জুরমুজ নামের এক লোক তাঁর পিছু পিছু গেল। এক মাঠের কাছে পৌঁছালে, নামাজের সময় হয়ে গেলো। তখন জুবাইর (রা) লোকটির সাথে কথা বললেন। তারপর দুজনে নামাজ পড়তে দাঁড়ালেন। জুবাইর (রা) সিজদায় উবু হতেই আমর ইবনে জুরমুজ তাঁকে কাঁধে আঘাত করে হত্যা করে ফেলল। আলী (রা) এ খবর জানবার পর বললেন, লোকে যেন আমর ইবনে জুরমুজকে জাহান্নামের সুসংবাদ দেয়। কথিত আছে, আলী (রা) ক্ষমতায় থাকতে থাকতেই আত্মহত্যা করে ইবনে জুরমুজ।

আর তালহা (রা) যুদ্ধ করা অবস্থায় আহত হন একটা তীরের আঘাতে, যেটি উরুতে বিদ্ধ হয়। সুন্নি সোর্সে বলা হয়, তীর লেগেছিলো একই পক্ষের মারওয়ানের নিশানা ভুল হবার কারণে। মারওয়ান তখন বলেছিলেন, “আমি আর কোনোদিন উসমান (রা) এর হত্যাকারী খুঁজতে ছুটব না।” তালহা (রা) ঘোড়ায় করে যুদ্ধক্ষেত্রের বাহিরে গিয়ে পাথরে ঠেস দিয়ে শুয়ে পড়লেন। সাথের লোকেরা তাঁর ক্ষতে চাপ দিয়ে রক্তপ্রবাহ বন্ধ করতে চেষ্টা করলো। কিন্তু চাপ ছেড়ে দিতেই রক্ত প্রবাহিত হচ্ছিল। তালহা শেষে বললেন, “থাক। এ তীর আল্লাহ্‌র ইচ্ছাতেই এসেছে।” বসরাতে আহত অবস্থায় তিনি মারা যান ৬৪ বছর বয়সে। শিয়া মতবাদে একই ঘটনা থেকেই বলা হয়, তীরটা ইচ্ছা করেই মারওয়ান ছুড়েছিলেন।

তালহা (রা) ও জুবাইর (রা) দুজনেই চলে গেলে একমাত্র আইশা (রা) বাকি থাকেন নেতৃত্ব দেবার জন্য। বসরার কাযি কাব ইবনে সুর কুরআন মাথায় করে গিয়ে আইশা (রা)-কে বলেন তিনি যেন উটের উপর থেকে যুদ্ধ থামাতে বলেন সবাইকে, কিন্তু কাব মারা যান তখন আলী (রা) এর বাহিনীর তীরের আঘাতে। আইশা (রা) উটের পিঠের ভেতর হাওদা থেকে যুদ্ধ চালাতে থাকেন। তাঁর উটের হাল ধরে ছিলেন অনেক সাহাবী। একে একে সবার হাত কেটে ফেলতে থাকে প্রতিপক্ষ সেনারা, প্রায় ৭০ জনের এ অবস্থা হয় আইশা (রা) এর উটের হাল ধরতে গিয়ে। এরপর সকল তীরন্দাজ উটের উপরের হাওদা লক্ষ্য করে তীর ছুঁড়ে মারতে থাকেন, কারণ হাওদার পতন হলেই যুদ্ধ শেষ হবে। এত তীর সেখানে গিয়ে লাগলো যে মনে হচ্ছিল উটের পিঠে সজারু।

শেষ নাগাদ আলী (রা) এর সেনারা উটের কাছে এগুতে লাগলেন, কিন্তু লাশের স্তূপের কারণে পারছিলেন না। শেষমেশ তারা যখন উটের পাগুলো কেটে ফেললেন তখন উট উপুড় হয়ে পড়ে গেল আর্তনাদ করে এবং যুদ্ধ শেষ হলো।

আইশা (রা) এর ভাই মুহাম্মাদ বিন আবু বকর (রা) আলী (রা) এর পক্ষ থেকে গিয়ে তাঁকে হাওদা থেকে বের করে আনলেন। তিনি তাঁকে জিজ্ঞেস করলেন তাঁর আঘাত লেগেছে কিনা, তিনি বললেন, না। (অন্য এক জায়গায় বলা হয়েছে, হাতে একটি তীর লেগেছিল যেটা মুহাম্মাদ (রা) বের করে আনেন)

আলী (রা) এর পক্ষ থেকে আম্মার (রা) এসে তাঁকে সালাম করে বললেন, “মা, কেমন আছেন আপনি?” তিনি উত্তর দিলেন, “আমি তোমার মা নই।” আম্মার (রা) বললেন, “অবশ্যই আপনি মা, আপনার অপছন্দ হলেও।” আলী (রা) এসেও তাঁর খোঁজ নিলেন।

রাত হয়ে এলে আইশা (রা) বসরাতে ঢুকলেন। আর আলী (রা) পড়ে থাকা লাশগুলো দেখছিলেন, পক্ষ বিপক্ষ উভয়ের লাশের সামনে এসেই তিনি দুয়া করতে লাগলেন। আইশা (রা) নিজেও দুয়া করেছিলেন। আলী (রা) ঘোষণা দিলেন, এ যুদ্ধলব্ধ কোনো সম্পদ কেউ পাবে না। তখন সাবায়ীরা এর সমালোচনা করল (সাবায়ী হলো ইবনে সাবা’র অনুসারীরা)। আলী (রা) বসরায় ঢুকে সরকারি কোষাগার থেকে সবাইকে ৫০০ মুদ্রা করে দিলেন। এটাতেও সাবায়ীরা সমালোচনা করলো বলে আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া গ্রন্থ থেকে জানা যায়।

আইশা (রা) যে বাড়িতে ছিলেন, সেই বাড়ির মা এর দুই সন্তান মারা গিয়েছিলেন- আব্দুল্লাহ ও উসমান। আব্দুল্লাহ মারা যান আইশা (রা) এর পক্ষে যুদ্ধ করতে গিয়ে, আর উসমান আলী (রা) এর পক্ষে। আলী (রা) বাড়িতে ঢুকতেই মৃত আব্দুল্লাহর শাশুড়ি বললেন, তুমি যেভাবে আমার সন্তানদের পিতৃহারা করছ, তোমার সন্তানদেরও আল্লাহ্‌ সেরূপে পিতৃহারা করুন। আলী (রা) নীরব রইলেন। বের হবার সময়ও তাঁকে একই কথা বলা হলো। এবারও তিনি কিছু বলতে পারলেন না। তিনি যখন জানলেন দরজার কাছে দুই লোক আইশা (রা)-কে গালি দিয়েছে, তখন তিনি ওদের দুজনকেই ১০০ বেত্রাঘাতের আদেশ দিলেন।

আইশা (রা) যখন বসরা ত্যাগ করবেন, তখন আলী (রা) তাঁর সাথে প্রয়োজনীয় জিনিসপাতি দিয়ে দিলেন। মুহাম্মাদ বিন আবু বকর (রা)-কে তাঁর সাথে সফরসঙ্গী হিসেবে দিলেন। আলী (রা) নিজেও তাঁকে কয়েক মাইল পর্যন্ত এগিয়ে দিয়ে আসলেন। আইশা (রা) যাবার আগে মানুষদের বলে গেলেন, “কেউ একে অন্যকে দোষারোপ করো না। আমার আর আলীর মাঝে যা কিছু হয়েছে তা এরকমই যেমনটা হয়ে থাকে কোনো বউ আর শ্বশুরবাড়ির আত্মীয়দের মধ্যে। আলী অবশ্যই কল্যাণকামী।” পাঠকদের হয়ত মনে থাকবে নেকলেসের ঘটনায় আলী (রা) ও আইশা (রা) এর মনোমালিন্যের কথা। আলী (রা) তখন বললেন, “আইশা সত্য বলেছেন। তাঁর আমার ব্যাপারটা এমনই ছিল। উনি দুনিয়া আর আখিরাতে অবশ্যই তোমাদের নবী (সা) এর স্ত্রী।

এই মর্মান্তিক যুদ্ধটা হয়েছিল ৬৫৬ সালের ৭ নভেম্বর। একে বসরা যুদ্ধও বলা হয়। এ যুদ্ধের মধ্য দিয়ে শিয়া সুন্নি বিভেদ স্পষ্ট হয়ে দেখা দেয়। যদিও এমন নয় যে আইশার (রা) পক্ষের তাঁরাই সুন্নি, আর বাকিরা শিয়া ছিলেন। আলী (রা) এর প্রতিপক্ষরা পরিচিত ছিলেন ‘উসমানি’ নামে, যারা হযরত উসমান (রা) এর হত্যার বিচার চাইতেন; ইতিহাস অনুযায়ী তাদের দাবি অমূলক ছিল না, আলী (রা) পারলে হয়ত সে দাবি পূরণ করতেন, কিন্তু যখন অধিকাংশ অনুসারীই যেখানে উসমানিদের বিরুদ্ধে ছিল (এবং ক্ষেত্রবিশেষে উসমান (রা) এর প্রত্যক্ষ্য বা পরোক্ষ হত্যাকারী/উস্কানিদাতা), তখন আলী (রা) কী-ই বা করতে পারতেন?

উভয় পক্ষ থেকে ৫ হাজার করে মোট ১০ হাজার মুসলিম এ যুদ্ধে মারা যান। এ যুদ্ধের খবর মদিনাতে কোনো দূত নিয়ে যাবার আগেই মক্কা-মদিনার মানুষ টের পেয়ে যায়। এ অঞ্চলের লাশগুলো মুখে নিয়ে শকুনেরা উড়ে যাচ্ছিল। যেমন এরকমই কোনো শকুনের মুখ থেকে একটি অঙ্গ মদিনায় পড়ে যায় উপর দিয়ে উড়ে যাবার সময়, সেখানে আংটি লাগানো ছিল, আর খোদিত ছিল আব্দুর রহমান ইবনে আত্তাব, যিনি শহীদ হয়েছিলেন।

কিন্তু এই জামাল যুদ্ধ সবার মনে এক বিভীষিকা সৃষ্টি করলেও তখনো কেউ জানতেন না এর চেয়েও রক্তক্ষয়ী গৃহযুদ্ধ এগিয়ে আসছে- সিফফিনের যুদ্ধ। ভয়াবহতম মুসলিম গৃহযুদ্ধ।

পাঠকদের জন্য সেই ঐতিহাসিক বসরা নগরীর বর্তমান কিছু ছবি তুলে দেওয়া হচ্ছেঃ

ছবিসূত্রঃ bot.gov.krd

আলী (রা) বসরার গভর্নর বানালেন চাচাতো ভাই আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা)-কে। পাঠকদের জানা প্রয়োজন যে, শত বছর ধরে চলে আসা ইরাক-সিরিয়া যুদ্ধে ইরাক ছিল পারস্যের সাসানীয় সাম্রাজ্যের অধীনে আর সিরিয়া ছিল বাইজান্টিন (রোমান) সাম্রাজ্যের অধীনে। এই দু’অঞ্চলের মানুষ জামাল যুদ্ধের সময় ইসলামি রাজ্যের অন্তর্ভুক্তই ছিল। কিন্তু যুগ যুগ ধরে চলে আসা শত্রুতা যায়নি। তার উপর এখন মুয়াবিয়া (রা) সিরিয়ার উসমানিদের নেতা, আর এখানে ইরাকের কুফা আলী (রা) এর সমর্থকে ভর্তি। তাই ইসলামি রাজ্যের অধীনে থেকেও ইরাক-সিরিয়ার শত্রুতা গেলো না। কুফীদের পরামর্শে আলী (রা) ইসলামি রাজ্যের রাজধানী মদিনা থেকে সরিয়ে কুফা-তে নিয়ে এলেন। কুফা তখন ছিল ‘Garrison city’; নতুন ইসলাম গ্রহণ করা স্থানীয়দের মাঝে পুরনো মুসলিম সেনাদের নিরাপত্তার জন্য নতুন এক সেনাশহর বলা যায়।

মানচিত্রে দেখে নিন কুফা কোথায়, বাগদাদের দক্ষিণে, হেজাজ থেকে উত্তরে। সিরিয়া থেকে পূর্বে। ছবিসূত্রঃ Wikiwand

আইশা (রা), তালহা (রা) ও জুবাইর (রা) এর পর এবার আলী (রা) এর প্রধান প্রতিপক্ষ মুয়াবিয়া (রা)। তাই এবার মুয়াবিয়া (রা) সম্পর্কেও কিছু ব্যাপার জানা জরুরি। শিয়া মতবাদ প্রভাবান্বিত বইগুলোতে, সাহাবী মুয়াবিয়া (রা)-কে নিয়ে গর্হিত মিথ্যে বলা হয়। কিন্তু সুন্নি সোর্সগুলো মুয়াবিয়া (রা) এর গুণাবলি তুলে ধরে।

আলী (রা) এর চাচাতো ভাই আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা) বলেছিলেন, “রাষ্ট্র পরিচালনায় আমি মুয়াবিয়ার চেয়ে যোগ্য আর কাউকে দেখিনি।” আব্দুল্লাহ ইবনে উমর (রা) বলেছিলেন, “রাসুল (সা) এর পর নেতৃত্বদানে মুয়াবিয়ার চেয়ে যোগ্য কাউকে দেখিনি। আবু বকর (রা), উমার (রা), উসমান (রা) ও আলী (রা) মুয়াবিয়ার চেয়ে উত্তম ও শ্রেষ্ঠ ছিলেন বটে, কিন্তু নেতৃত্ব দেবার ব্যাপারে মুয়াবিয়া অধিক যোগ্য।

একদিন রাসুল (সা) কী যেন খুঁজবার জন্য এদিক-ওদিক তাকাচ্ছিলেন, তখন মুয়াবিয়া (রা) বুঝতে পেরে সাথে সাথে রাসুল (সা) এর জন্য ওজুর পানি নিয়ে আসলেন। রাসুল (সা) তাঁর বুদ্ধিতে খুশি হয়ে গেলেন। তাঁকে বললেন, “শোনো, তুমি শাসক হলে আল্লাহ্‌কে ভয় করে চলবে। ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করবে।” মুয়াবিয়া (রা) পরে বলেছিলেন, রাসুল (সা) যেদিন এ কথা বলেছিলেন, সেদিন বুঝতে পেরেছিলাম আমি অবশ্যই একদিন শাসক হব।

চার খলিফার পর একমাত্র উমার বিন আব্দুল আজিজ (রহঃ)-কে বলা হয় প্রায় আসল যুগের খলিফাদের মতো রাজ্য চালনা করতেন। তিনি একবার এক লোককে চাবুক মারার নির্দেশ দিয়েছিলেন এই অপরাধে যে সে সাহাবী মুয়াবিয়া (রা) এর নামে মিথ্যে অপবাদ বা সমালোচনা করেছিল। নবী (সা)-কে মুয়াবিয়া এতটা ভালোবাসতেন যে বহু বছর পর একদিন তিনি হঠাৎ শুনেছিলেন যে বসরাতে এক সাহাবী আছেন কারেস নামের, উনাকে দেখতে নাকি আকৃতিতে অনেকটা নবীজী (সা) এর মতো লাগে। এটা জানা মাত্র তিনি কায়েস (রা)-কে দামেস্ক নিয়ে আসলেন এবং তাঁকে জড়িয়ে ধরে কপালে চুমু খেলেন। তাঁকে মূল্যবান উপঢৌকন দিলেন।

একদিন রাসুল (সা) আবু বকর (রা) ও উমার (রা) এর সাথে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আলোচনা করছিলেন, কিন্তু মাঝখানে তিনি মুয়াবিয়া (রা)-কে ডেকে আনলেন। তিনি আসলে পরে রাসুল (সা) বললেন, “নিশ্চয়ই মুয়াবিয়া পরামর্শ দানে সক্ষম ও বিশ্বস্ত।” মুয়াবিয়া সব সময় চেষ্টা করতেন মুহাম্মাদ (সা) এর পাশে পাশে থাকতে। একদিন তিনি দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে আছেন, ভেতরে রাসুল (সা) স্ত্রী উম্মে হাবিবা (রা) এর সাথে বসে ছিলেন (উম্মে হাবিবা মুয়াবিয়ারই বোন)। তিনি তাঁকে ঢুকতে বললেন। মুয়াবিয়া (রা) ঢুকতেই রাসুল (সা) বললেন,”তোমার কানে কলম রেখেছ কেন?” মুয়াবিয়া (রা) উত্তর দিলেন, “আল্লাহ্‌ ও রাসুলের সেবার জন্য।” [উল্লেখ্য, মুয়াবিয়া (রা) ছিলেন কুরআনের সম্মানিত একজন ওহী লেখক, তিনি কুরআনের আয়াত নাজিলের সাথে সাথে লিপিবদ্ধ করতেন।] মহানবী (সা) মুগ্ধ হলেন, বললেন, “আল্লাহ্‌ তোমাকে নবীর পক্ষ থেকে উত্তম বিনিময় দান করুন। তোমাকে ওহীর ইশারাতেই ওহীলেখক বানিয়েছি। আচ্ছা, এবার বলো তো, আল্লাহ্‌ যদি তোমাকে খেলাফতের জামা পরিধান করান তবে তোমার অবস্থা কেমন হবে?” এ কথা শুনে মুয়াবিয়ার বোন উম্মে হাবিবা (রা) বিস্মিত হয়ে গেলেন, “রাসুল (সা)! আল্লাহ্‌ তাঁকে খেলাফতের জামা পরাবেন?” কিছুক্ষণ চুপ থেকে তিনি বললেন, “হ্যাঁ। তবে সে পথে অনেক বাধাবিপত্তি আর বিপদ আছে। হে আল্লাহ্‌! একে হিদায়াত দান করুন। তার থেকে বিপদ দূরে রাখুন। ইহকাল ও পরকালে ক্ষমা করে দিন তাঁকে।” (সহিহ) বুখারি ও তিরমিজির বিশুদ্ধ বর্ণনা মতে, রাসুল (সা) প্রার্থনা করেন, “হে আল্লাহ্‌! মুয়াবিয়াকে সঠিক পথে রাখো, তাঁকে পথপ্রদর্শক কর এবং লোকে যেন তাঁর সাহায্যে পথ খুঁজে পায়।”

মুহাম্মাদ (সা) এর হাদিস অনুযায়ী মুয়াবিয়া (রা) নিশ্চিত বেহেশতবাসীদের একজন। বুখারির হাদিসে বলা রয়েছে, রাসুল (সা) বলেছেন, “মুসলিমদের মাঝে প্রথম যে দল নৌ অভিযানে অংশ নেবে তারা সকলে বেহেশতবাসী।” মুয়াবিয়া (রা) কেবল সেই প্রথম নৌ অভিযানে অংশই নেননি, তিনি স্বয়ং সেই অভিযানের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন।

৭৮ বছর বয়সে যখন মুয়াবিয়া (রা) মারা যাচ্ছিলেন তখন তিনি পরিবারের লোকদের ডেকে বললেন, “রাসুল (সা) আমাকে তাঁর নিজের একটি জামা উপহার দিয়েছিলেন। সেই জামাটা আমি আজকের দিনের জন্য রেখে দিয়েছিলাম যত্ন করে। তাঁর কেটে ফেলা কিছু নখও আমার কাছে রেখে দিয়েছিলাম। আমি মারা গেলে আমার কাফন ঐ জামা দিয়ে বানাবে আর আমার মুখ ও চোখে নখগুলো রেখে দেবে।” এ অবস্থাতেই মুয়াবিয়া (রা)-কে দাফন করা হয়েছিল।

এ কথাগুলো বলার কারণ ছিল যে, এমনটা ভাবার কারণ নেই আলী (রা) মুয়াবিয়া (রা) এর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছিলেন এ কারণে যে, তিনি খারাপ ছিলেন। ঠিক যেমন আইশা (রা) এর বিরুদ্ধে লড়ার কারণ এমন ছিল না যে আইশা (রা) খারাপ ছিলেন। আলী (রা) সম্পর্কে মানুষ অনেক জানলেও, মুয়াবিয়া (রা) সম্পর্কে বেশি জানে না। তাই এই দুই প্রতিপক্ষ সাহাবীর দুজনের গুরুত্ব সম্পর্কেই ধারণা দিয়ে দেওয়া জরুরি ছিল। এমনকি প্রতিপক্ষ হলেও আলী (রা) ও মুয়াবিয়া (রা) পরস্পর ধর্মীয় ব্যাপার (মাসআলা মাসায়েল) নিয়ে চিঠি আদানপ্রদান করতেন। এবং এটাও সত্য যে, সিরিয়াতে সকলে খুবই সন্তুষ্ট ছিল মুয়াবিয়া (রা) এর শাসনে। আর হত্যাকারীদের জায়গা দেওয়াতে অনেকেই আলী (রা) এর শিবির ত্যাগ করে উসমান (রা) এর রক্তের বদলা নিতে সিরিয়া ভীড় করেছিল আর আনুগত্য দিয়েছিল মুয়াবিয়া (রা)-কে।

সিরিয়ার দামেস্ক নগরী। এখানেই গভর্নর হিসেবে বাস করতেন মুয়াবিয়া (রা)। ছবিসূত্রঃ Flickr

তো, ফিরে যাই সিফফিনের যুদ্ধের পটভূমিতে। আলী (রা) মুয়াবিয়া (রা)-কে বাইয়াত দেবার কথা জানালেন। কিন্তু মুয়াবিয়া (রা) দূত মারফত জানালেন, তিনি বাইয়াত দেবেন না। তিনি আত্মীয় উসমান (রা) এর হত্যার বিচার চান। আলী (রা) আলোচনা চালিয়ে যেতে লাগলেন যেন এক পর্যায়ে মুয়াবিয়া (রা) রাজি হন বাইয়াত (আনুগত্য) দিতে।

আলী তখন তাঁর বাহিনীকে উত্তর দিকে নিয়ে গেলেন এবং আলী ও মুয়াবিয়া (রা) এর বাহিনী মিলিত হলো সিফফিন নামক জায়গায়। তবে তারা সাথে সাথে যুদ্ধ করলেন না। মুয়াবিয়া (রা) এর বাহিনী সুপেয় পানির উৎসের কাছে ক্যাম্প করায় আলী (রা) এর বাহিনী পানি পাচ্ছিল না। তারা আক্রমণ করে হটিয়ে দেয় মুয়াবিয়া (রা) এর বাহিনীকে এবং পানির উৎসের দখল করে নেয়। পরে উভয় বাহিনী পানি নিয়ে সমঝোতায় আসে যে, সবাই পানি পান করবে। এ ব্যাপারে মুয়াবিয়া (রা) এর পক্ষের আমর (রা) বলেছিলেন, “আমরা পানি পানে পরিতৃপ্ত হব আর তারা পিপাসার্ত থাকবে এটা ইসলামের কথা নয়।” কিন্তু যারা পানি দিতে চাননি তারা বলছিলেন যে, বিদ্রোহীরা উসমান (রা) এর পরিবারকে বহুদিন পর্যন্ত ঘেরাও দিয়ে পানি ও বাহিরের খাবার পাওয়া থেকে বিরত রেখেছিল।

এরপর মাসের পর মাস ধরে চিঠি চালাচালি চলল দু পক্ষের মাঝে। অনেক দীর্ঘ সময় ধরে তারা সেই জায়গায় ছিলো। এমন না যে তাদের মাঝে ছোটোখাটো যুদ্ধ হয়ে যায়নি, হয়েছে বটে। উল্লেখ্য, আলী (রা) এর বাহিনীতে বদর যুদ্ধে অংশ নেওয়া ৮০ জন সাহাবী ছিলেন। আর তাদের মাঝে মোট ৮৫ বার কথা চালাচালি হয়েছিল দূত মারফত। এত দীর্ঘ আলোচনা আর বাদানুবাদ এই এক পোস্টে উল্লেখ করা সম্ভব নয়।

আবু দারদা (রা) ও উসামা (রা) আলী (রা) এর পক্ষ থেকে মুয়াবিয়া (রা) এর কাছে গেলেন। গিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, “তোমার যুদ্ধ করবার কারণ কী মুয়াবিয়া? আলী তো তোমার ও তোমার পিতার চেয়ে এগিয়ে, আত্মীয়তার দিক দিয়ে রাসুল (সা) এর নিকটে এবং খেলাফতের বিষয়ে তোমার চেয়ে বেশি অগ্রাধিকারী।” তখন মুয়াবিয়া (রা) বললেন, “আমি উসমানের খুনের দাবিতে যুদ্ধ করছি এবং এ কারণে যে, আলী তাঁর হত্যাকারীদের আশ্রয় দিয়েছে। কাজেই, তোমরা দুজন ফিরে গিয়ে তাঁকে বলো, উসমানের হত্যাকারীদের বিরুদ্ধে প্রতিশোধ গ্রহণের সুযোগ দিক। তারপর সিরিয়াবাসীদের মাঝে আমি সবার আগে তাঁর হাতে বাইয়াত নেবো।” তারা দুজন আলী (রা) এর কাছে গিয়ে এটা জানালেন। তখন আলী (রা) তাঁর সমর্থকদের দেখিয়ে বললেন, “দেখো এ লোকদের (এরা সবাই উসমান হত্যার পক্ষধারী)।” তখন বিশাল সমর্থক জনতা এগিয়ে এসে বলতে লাগলো, “আমরা সকলেই উসমান হত্যাকারী, যার ইচ্ছা হয় সে আমাদের সঙ্গে বোঝাপোড়া করুক।

এ ভয়ংকর ব্যাপার দেখে আবু দারদা (রা) ও আবু উসামা (রা) দুজনেই চলে গেলেন, তারা আর যুদ্ধে অংশ নিলেনই না।

যুদ্ধ এড়াবার জন্য মুয়াবিয়া (রা) এমন ভাব করলেন যেন তিনি ফোরাতের স্রোত আলী (রা) এর বাহিনীর দিকে প্রবাহিত করবেন খনন করে। আলী (রা) চালাকিটা ধরতে পেরেছিলেন এবং বলেছিলেন, এটা কখনোই হবে না। কিন্তু লোকে ভীত হয়ে প্রস্থান শুরু করে দিল। সবার শেষে অনুসারীদের আহাম্মক আখ্যা দিয়ে সে জায়গা ত্যাগ করলেন আলী (রা)।

জিলহজ্ব মাস পর্যন্ত যাবার পর শুরু হলো আসল যুদ্ধ, ৬৫৭ সালে। একেকদিন আলী (রা) একেকজন সেনাপতি নিযুক্ত করতেন। কোনো কোনো দিন দু’বারও যুদ্ধ হতো। এমনও দেখা গিয়েছিল, দু’পক্ষের দু’জন মুখোমুখি হলো, অথচ তারা একই মায়ের পেটের ভাই। মূলত দ্বন্দ্বযুদ্ধের মাধ্যমে মীমাংসা করার চেষ্টা করা হচ্ছিল। আপোসে কাজ না হওয়ার পর মূল যুদ্ধটা চলেছিল টানা সাতদিন। প্রথম ছয়দিন চলল সমানে সমান। কিন্তু সপ্তম দিন এমন যুদ্ধ হলো যে সেটা মুসলিম ইতিহাসের রক্তক্ষয়ীতম দিন নামে পরিচিত হলো।

ফজরের পর আলী (রা) স্বয়ং যুদ্ধে নামলেন এবং প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতেই থাকলেন। তাঁর হাতে মারা গেলেন পাঁচশ জন। মুয়াবিয়া (রা) আলী (রা) এর সাথে দ্বন্দ্বযুদ্ধে নামতে অস্বীকার করলেন, কারণ তিনি জানতেন আলী (রা) এর সাথে যুদ্ধে কেউ কোনোদিন পারবে না। সিরিয়ার বাহিনীর উবাইদুল্লাহ ইবনে উমার (রা) এ দিনই মারা যান। এ যুদ্ধের বর্ণনা এত করুণ যে, পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠা পড়তে গিয়ে আতংকে শিউড়ে উঠতে হয়, কীভাবে মুসলিমে মুসলিমে রক্ত ঝরছিল।

এ যুদ্ধে আলী (রা) এর পক্ষের বয়স্ক সাহাবী আম্মার (রা) মারা যান। তাঁর সম্পর্কে রাসুল (সা) বলেছিলেন, আম্মার মারা যাবে বিদ্রোহী পক্ষের হাতে। এ জন্য মুয়াবিয়া (রা) অন্যায়ের পক্ষে ও আলী (রা) ন্যায়ের পক্ষে বলে দাবি করা হয়। কিন্তু এটা জানবার পর মুয়াবিয়া (রা) বললেন, হযরত আম্মার (রা) এর হত্যার জন্য দায়ী তাঁরাই যারা (তাদের অন্যায় হত্যা ও কুকর্মের দ্বারা) তাঁকে যুদ্ধের ময়দানে বের করে নিয়ে এসেছে।

সিরিয়া বাহিনীর প্রচুর রক্তক্ষয় হচ্ছে ও হেরে যাচ্ছে দেখে মুয়াবিয়া (রা) এর পক্ষের সাহাবী আমর ইবনুল আস (রা) একটা বুদ্ধি দিলেন। আমর (রা) এর বুদ্ধিতে সিরিয়ার বাহিনী তাদের অস্ত্রের সাথে কুরআনের কপি তুলে ধরে কুরআনের দিকে আহবান করল। ইরাকি সেনারা কুরআনের আহ্বান দেখে না করতে পারেনি।

আমর (রা) দূত পাঠালেন আলী (রা) এর কাছে এবং এ আয়াত শুনালেন- “আপনি কি তাদের দেখেননি, যারা কিতাবের কিছু অংশ পেয়েছে- আল্লাহর কিতাবের প্রতি তাদের আহবান করা হয়েছিল যাতে তাদের মধ্যে মীমাংসা করা যায়। অতঃপর তাদের মধ্যে একদল তা অমান্য করে মুখ ফিরিয়ে নেয়।” [সুরা আলে ইমরান ৩:২৩]

আলী (রা) এটা শুনে বললেন, “হ্যাঁ, আমি এর অধিক উপযোগী। আমাদের আর তোমাদের মাঝে আল্লাহ্‌র কিতাব ফয়সালা করবে।

কিন্তু আলী (রা) বুঝতে পেরেছিলেন, এটা একটা চালাকি। তবে ইরাকিরা বলল, আমাদেরকে কুরআনের আহবান করা হবে আর আমরা না করব সেটা হতে পারে না। আলী (রা) এর সমর্থক ‘কুররা’ (‘কুরআনবিদ’) নামে পরিচিত একদল সাবাঈ গোষ্ঠী (যারা পরে খারেজি নামে পরিচিত হয়) এসে তাঁকে বলল, “আপনি কুরআন এর আহ্বান না মানতে চাইলে, আমরা আপনাকে সেখানে ঠেলে দিব বা একই আচরণ করব যেমন আমরা করেছি উসমানের সাথে। আমরা তাঁকে হত্যা করেছি কারণ সে কুরআন ঠিকমতো মানত না। আপনার ক্ষেত্রেও তাই হবে যদি আপনি মেনে না নেন।

আলী (রা) ও মুয়াবিয়া (রা) উভয়ে মেনে নিলেন যে, দু’পক্ষের একজন করে বিচারক নিযুক্ত হবে যার বিচার মেনে নেওয়া হবে। আলী (রা) এর পক্ষ থেকে আবু মুসা (রা)-কে নিযুক্ত করা হলো। আর মুয়াবিয়া (রা) এর পক্ষে আমর (রা)

সাত মাস পর এ দুজন মিলিত হলেন বর্তমান জর্ডানে, সেটা ছিল ৬৫৮ সালের ফেব্রুয়ারি মাস। আমর (রা) এর যুক্তিতে আবু মুসা (রা) রাজি হলেন যে আলী (রা) ও মুয়াবিয়া (রা) দুজনেরই উচিৎ ক্ষমতা ত্যাগ করা এবং পরে শুরার পরামর্শে নতুন খলিফা নির্বাচিত হবেন। প্রতিদিন এরকম ‘মিটিং’ হতো।

যেদিন জনগণের সামনে রায় দেওয়া হবে সেদিন প্রথমে আবু মুসা (রা) উঠলেন এবং বললেন, আলী (রা) খেলাফতের দায়িত্ব থেকে পদত্যাগ করছেন এবং মুয়াবিয়া (রা)-ও খলিফা হবার দাবিদার নয়। সে মুহূর্তে আগের চুক্তি বাদ দিয়ে আমর (রা) মনে করলেন, এখন দুজনেই যদি না থাকেন তবে একটা শূন্যতা সৃষ্টি হবে নেতৃত্বে যেটা এ পরিস্থিতিতে বিপজ্জনক। তাই তিনি বললেন, আলী (রা) এখন আর ক্ষমতার দাবিদার নয় যেমনটা আবু মুসা (রা) রায় দিলেন, কিন্তু আমি মুয়াবিয়া (রা)-কে খলিফা ঘোষণা করছি কারণ তিনি উসমান (রা) এর হত্যার বিচারপ্রার্থী এবং এ পদের জন্য যোগ্য।

কথিত আছে, তখন আবু মুসা (রা) কঠিন ভাষায় সমালোচনা করেন তাঁকে। আমর (রা) মুয়াবিয়া (রা)-কে খেলাফতের মুকুট পরিয়ে দেন। আবু মুসা (রা) লজ্জায় মক্কায় চলে গেলেন।

আলী (রা) এ বিচার মেনে নিতে চাইলেন না অবশ্যই। কিন্তু যখন তিনি জানালেন তিনি মানতে চান না, তখন তাঁর পূর্বে সম্মত হওয়া “আমি বিচার মেনে নেব” কথার পরিপন্থী হয়ে গেলেন- এ কারণে তাঁর সমর্থক কমে গেল। তিনি নতুন এক বাহিনী গড়ার চেষ্টা করলেন। কিন্তু কেবল মদিনার আনসাররা, ‘কুররা’ অবশিষ্ট কয়েকজন আর নিজের গোত্রের কজন বাদে আর কেউ রইলো না।

বাগদাদ থেকে ১১০ কিমি দূরে কুফা শহরের গ্র্যান্ড মস্ক; এখানেই মরণআঘাত পান আলী (রা) এক খারেজীর হাতে। ছবিসূত্রঃ Wikimedia Commons

এর আগে একটা ভয়াবহ ঘটনা ঘটে যায়। ‘কুররা’ (কুরআনবিদ) নামের সে গোত্রের তারা কুরআনের বিচার মেনে নিতে চেয়েছিল, কিন্তু তারা দুজন ‘মানুষ’ এর করা সালিশ মানতে রাজি না। আলী (রা) কেন মানুষের বিচার মানতে রাজি হলেন, সে কারণে “হুকুমের মালিক কেবল আল্লাহ্‌” বলতে বলতে ১২ হাজার সমর্থক আলী (রা) এর বাহিনী থেকে খারিজ হয়ে গিয়েছিল। এদেরকে খারিজী/খারেজী সন্ত্রাসী বলা হয়।

খারেজীরা বিশ্বাস করত তারা ব্যতীত সকলেই ভুল পথে আছে, কেবল তারাই মুসলিম, আর বাকি সবাই কাফির, তারা তাই মুসলিম নিধন করত কুরআনের নাম দিয়েই। বর্তমান জঙ্গি সংগঠনগুলোকে এজন্য ‘স্কলার’গণ খারেজী বলে থাকেন।

ওদিকে মিসরে অশান্ত পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছিল। গভর্নর কায়েসকে প্রতিস্থাপন করা হয় মুহাম্মাদ বিন আবু বকর (রা)-কে দিয়ে। মুয়াবিয়ার অনুগত আমর (রা) মিসর জয় করে নেন, কারণ মুহাম্মাদ বিন আবু বকর (রা) এর কোনোই সমর্থন ছিল না মিসরে, সর্বসাকুল্যে মাত্র ২০০০ মানুষ তিনি জড়ো করে পেরেছিলেন যারা আবার লড়াই না করেই ভেগে যায়। পরের বছরগুলোতে আলী (রা) এর ইরাকের শহরগুলোতেই মানুষ আলী (রা) এর প্রতি সমর্থন দেওয়া বন্ধ করে দিতে লাগলো। ক্রমান্বয়ে মুয়াবিয়া (রা) এর বাহিনী অবস্থান নিতে লাগল ইরাকি শহরগুলোতে। অবশ্য হযরত আলী (রা) এর শেষ বছরে, কুফা আর বসরার লোকেরা আবার আলী (রা) এর প্রতি সমর্থন দিতে লাগলো।

কিন্তু আলী (রা) হয়ত জানতেন না তার উপর মরণছোবল আসবে সম্পূর্ণ ভিন্ন দিক থেকে এবং সেটি ছিল তাঁরই এক সময়ের তুমুল সমর্থক ও খলিফা পদে বসানো খারেজী বিদ্রোহীরা।

খারেজীরা ইসলামি সাম্রাজ্য জুড়ে তাণ্ডব শুরু করে দেয়। “আল্লাহ্‌ ছাড়া হুকুম দেওয়ার কেউ নেই” শ্লোগান দিতে দিতে তারা সন্ত্রাস ছড়িয়ে বেড়াতে লাগলো, মানবরচিত কোনো আইন বা সালিশ কিছুই তারা মানবে না। এমনকি আব্দুল্লাহ ইবনে খাব্বাব নামের একজনকে জীবিত জবাই দিয়ে দেবার পর তাঁর অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রীকে জবাই করে তারা, এরপর পেট ফেড়ে সন্তান বের করে ফেলে। এরকম ঘটনা ঘটতে থাকে রাষ্ট্র জুড়ে।

এদের দমন করতে ৬৫৯ সালে নাহরাওয়ানে যুদ্ধ হয়। যুদ্ধে আলী (রা) খারেজীদের পরাজিত করেন। কিন্তু বেঁচে যাওয়া খারেজীরা প্রতিশোধের আগুনে জ্বলতে থাকে।

আলী (রা) মৃত্যুর ব্যাপারে কথা হলে প্রায়ই বলতেন যে, রাসুল (সা) তাঁকে বলে গিয়েছিলেন, “এ যুগের হতভাগ্যতম ব্যক্তি হলো তোমার হত্যাকারী। সে তোমার মাথার তালুর আঘাত করবে এবং মাথার রক্তে তোমার দাড়ি ভিজে যাবে।” তাই আলী (রা) দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করতেন যে এরকম পরিস্থিতি না এলে তিনি মরবেন না। কিন্তু তিনি কি জানতেন তাঁর মৃত্যু নিকটেই?

পরাজিত, অপমানিত খারেজীদের মধ্যে (১) আব্দুর রহমান ইবনে মুলজিম আল-মিসরি (২) বারক ইবনে আব্দুল্লাহ তামিমি এবং (৩) আমর ইবনে বকর তামিমি একদিন একত্রিত হলেন। তারা আলোচনা করতে লাগলেন আলী (রা) এর হাতে নিহত হওয়া তাদের খারেজী ভাইদের নিয়ে। তারা বলল, “এরা যখন মারাই গেলো, তখন আমরা বেঁচে থেকে লাভ কী? আমরা যদি এখন জীবনের ঝুঁকি নিয়ে এই পথভ্রষ্ট নেতাদের হত্যা করি তবে দেশবাসী এদের অত্যাচার থেকে রেহাই পাবে।” তারা যথাক্রমে আলী (রা), মুয়াবিয়া (রা) ও আমর (রা)-কে হত্যার দায়িত্ব নিল। ঠিক হলো, একই দিনে একই সময়ে (ফজরের ওয়াক্তে) তারা তাদের লক্ষ্য পূরণ করবে।

আলী (রা) থাকতেন কুফাতে। সেখানে পৌঁছাল ইবনে মুলজিম। ইহুদী থেকে মুসলিম হওয়া ইবনে মুলজিমের চেহারা ছিল গোধূম বর্ণের, উজ্জ্বল, দুই কানের লতি পর্যন্ত লম্বা চুল, কপালে সিজদার চিহ্ন- কে দেখে বলবে সে সন্ত্রাসী?

কুফাতে কিছু খারেজীও বসবাস করত। তাদের এক বৈঠকে একদিন কিতাম নামের এক মহিলা হাজির হলো। তার সম্পর্কে বলা হয় “অপ্রতিদ্বন্দ্বী অনিন্দ্য সুন্দরী”। তখন তো মেয়েরা নিয়মিত মসজিদে যেত, সারাক্ষণ মসজিদে ইবাদত বন্দেগীতে নিমগ্ন থাকত মেয়েটি। তাঁর খারেজী বাবা ও ভাই নাহরাওয়ানের যুদ্ধে আলী (রা) এর বাহিনীর কাছে নিহত হয়।

ইবনে মুলজিম তাঁকে দেখতেই প্রেমে পড়ে গেল। সে তাকে বিয়ের প্রস্তাব দেয়। মেয়েটি জানত সে খারেজী। তাকে চার শর্তে বিয়ে করতে রাজি হবার কথা বলে- ১) ৩০০০ দিরহাম মোহর, (২) একজন খাদেম (৩) একজন দাসী ও (৪) আলী ইবনে আবু তালিব-কে হত্যা।

ইবনে মুলজিম প্রথম তিনটা প্রায় সাথে সাথেই আদায় করে। আর শেষেরটা বিষয়ে জানায়, এ উদ্দেশ্যেই তার এ শহরে আসা। তো, তাদের দুজনের বিয়ে হয়ে গেলো। আল বিদায়া গ্রন্থে বর্ণিত আছে, বাসর রাত্রে মেয়েটি তাকে বলল, তুমি আমাকে রঞ্জিত করলে, এখন যাও অন্যকে (আলীকে রক্তে) রঞ্জিত কর।

১৭ রমজান শুক্রবার ফজরের সময় আলী (রা)-কে হত্যা করার পরিকল্পনা করা হয়। একই তারিখে বাকি দুজনকেও হত্যা করা হবে। সহযোগীসহ ইবনে মুলজিম যে দরজা দিয়ে আলী (রা) বের হন, তার কাছে অবস্থান নিলো ফজরের সময়। লোকদের জাগাতে আলী (রা) “নামাজ নামাজ” বলে আহ্বান করতে করতে মসজিদে যেতেন। মসজিদে ঢুকবার সময় সহযোগী আততায়ী তলোয়ার দিয়ে আলী (রা)-কে আঘাত করতে যায়, কিন্তু সেটা প্রাচীরের তাকে লাগে।

এরপর ইবনে মুলজিম আলী (রা) এর মাথার উপর আঘাত করে। তখন মাথা থেকে রক্ত প্রবাহিত হয়ে দাড়ি ভিজে যেতে থাকে। হত্যা করবার সময় ইবনে মুলজিম বলতে থাকে, “আল্লাহ্‌ ছাড়া হুকুম করবার অধিকার কারো নেই, আলী! তোমারও নেই, তোমার অনুসারীদেরও নেই।” এরপর সে এ আয়াত পাঠ করেঃ “আর মানুষের মাঝে এক শ্রেণীর লোক রয়েছে যারা আল্লাহর সন্তুষ্টিকল্পে নিজেদের জানের বাজি রাখে। আল্লাহ হলেন তাঁর বান্দাদের প্রতি অত্যন্ত মেহেরবান।” [সুরা বাকারা ২:২০৭] অর্থাৎ কুরআনের আয়াত দিয়ে সে প্রমাণ করতে চেষ্টা করল যে, আল্লাহ্‌র সন্তুষ্টির জন্য সে এই হত্যা করবার ঝুঁকি নিয়েছে।

আলী (রা) চিৎকার করার পর লোকজন তাদের ধরে ফেলে। একজন সহযোগী পালিয়ে যায়, একজনকে হত্যা করা হয়। আলী (রা)-কে তাঁর ঘরে নিয়ে যাওয়া হলো। ইবনে মুলজিমকে তাঁর সামনে আনা হলে ইবনে মুলজিম তাঁকে জানালো, “আমি ৪০ দিন ধরে এ তরবারি ধার দিয়েছি আর আল্লাহ্‌র কাছে প্রার্থনা করেছি যেন সৃষ্টি জগতের সবচেয়ে নিকৃষ্ট লোক এ তরবারির আঘাতে নিহত হয়।

আলী (রা) বললেন, “আমি দেখছি, এটা দিয়ে তোমাকেই হত্যা করা হবে, তুমিই হবে নিকৃষ্টতম লোক।” তিনি জানালেন তিনি মারা গেলে একে যেন হত্যা করা হয়। আর বেঁচে গেলে তিনি নিজেই সিদ্ধান্ত নেবেন। [তরবারিটি ইবনে মুলজিম ১০০০ দিরহাম দিয়ে কিনেছিল এবং আরো এক হাজার দিরহাম খরচ করে বিষ মিশিয়ে শান দেয় বলে জানায়।]

মানুষজন জিজ্ঞেস করল, “আপনি মারা গেলে আমরা কি হাসান (রা) এর বাইয়াত নিব? জবাবে আলী (রা) বললেন, “আমি আদেশও করছি না, নিষেধও করছি না। তোমরাই ভালো জানো।

তিনি হাসান (রা) ও হুসাইন (রা)-কে ডেকে কথাবার্তা বলেন যা আল বিদায়া গ্রন্থে লিপিবদ্ধ আছে, তাঁর করে যাওয়া অসিওতও। এরপর তিনি “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ” পড়তে পড়তে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তাঁর দুই ছেলে তাঁকে গোসল দেন, হাসান (রা) জানাজাতে ইমামতি করেন।

এরপর হাসান (রা) ইবনে মুলজিমকে সামনে আনেন। ইবনে মুলজিম তাঁর কাছে একটা অনুরোধ করে। হাসান (রা) জিজ্ঞেস করেন, “কী অনুরোধ?” ইবনে মুলজিম জানায়, “আমি কাবার সামনে আল্লাহ্‌র কাছে কসম করেছিলাম, হয় আমি আলী ও মুয়াবিয়াকে হত্যা করব, না হয় নিজে মরব। আপনি আমাকে ছেড়ে দিন, আমি প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি, আমি যদি মুয়াবিয়াকে হত্যা করতে পারি ও জীবিত থাকি, তবে আপনার কাছে এসে ধরা দিব।

হাসান (রা) বললেন, “কখনো না! এখুনি তোমাকে জাহান্নামে পাঠাচ্ছি।

এরপর তরবারি দিয়ে তিনি তাঁকে মারলেন। আব্দুল্লাহ ইবনে জাফর তখন ইবনে মুলজিমের হাত পা কেটে দেয়, দু’চোখ উপড়ে ফেলে। এর মাঝেও ইবনে মুলজিম সম্পূর্ণ ‘সুরা আলাক’ (“ইকরা বিসমি রাব্বিকাল লাযি খালাক…”) তিলাওয়াত করে শেষ করে। এরপর তাঁর জিহ্বা কর্তন করতে গেলে, সে চিৎকার করে উঠে, “আমার জীবনের এমন একটা মুহূর্তও কাটাতে চাই না, যে মুহূর্তে আমি আল্লাহর যিকির করতে পারবো না।” এরপর তাঁকে পুড়িয়ে দেওয়া হয়।

কুফার রাজপ্রাসাদে ৬৩ বছর বয়সী আলী (রা)-কে দাফন করা হয়, কারণ আশঙ্কা ছিল বাইরে দাফন করলে খারেজীরা লাশ তুলে ফেলবে, কবরের অবস্থান গোপন রাখা হয়। শিয়া মতবাদে বিশ্বাস করা হয়, নাজাফে আলী (রা) এর কবর অবস্থিত। তবে সুন্নি মতবাদ অনুযায়ী এ দাবির কোনো ভিত্তি নেই, বরং বলা হয়, নাজাফের ঐ কবরটা মূলত মুগিরা (রা) এর কবর। আরো জানা যায় যে, পরে হাসান (রা) ও হুসাইন (রা) আলী (রা) এর লাশ স্থানান্তরিত করে মদিনাতে জান্নাতুল বাকি কবরস্থানে দাফন করেন। (আবু নাইম ফাজল)

নাজাফে শিয়া অনুসারীগণ হযরত আলী (রা) এর মাজার জিয়ারত করছে। ছবিসূত্রঃ Davis Hunter

অন্য দুজন আততায়ীর মিশনের কী হয়েছিল সেটা এ পোস্টের আলোচ্য বিষয় নয়, সে অন্য কাহিনী। তবে এটুকু উল্লেখ্য, এ খবর যখন সিরিয়া পৌঁছে তখন মুয়াবিয়া (রা) কান্নায় ভেঙে পড়েন। তাঁর স্ত্রী অবাক হয়ে যান, বলেন, “তুমি কাঁদছ! অথচ তাঁর সাথে তোমার লড়াই ছিল!” জবাবে তিনি বললেন, “পোড়ামুখী! তুমি জানো না- মহত্ত্ব, ফিকাহ ও জ্ঞানের কী অমূল্য ধন মানুষ হারালো।

শিয়া মতবাদে হযরত মুহাম্মাদ (সা) এর পরেই সবচেয়ে গুরুত্ব বহন করেন হযরত আলী (রা)। তাদের অনেক ভাগ-উপবিভাগ থাকলেও সবচেয়ে বিচ্যুত ‘Sect’ হলো আলাভী উপদল। তুরস্কের প্রধান দুটো ‘মুসলিম’ উপদল হলো- সুন্নি ও আলাভী। আলাভীরা বিশ্বাস করে আল্লাহ্‌, হযরত মুহাম্মাদ (সা) ও হযরত আলী (রা) এর ঐশ্বরিক একত্বে; মুহাম্মাদ (সা) ও আলী (রা) হলেন আল্লাহ্‌র নূরের বহিঃপ্রকাশ, এটাই তাদের বিশ্বাস। তবে অন্যান্য মুসলিমদের সাথে তাদের পার্থক্য হলো- তারা আহলে বাইত, আশুরা বা মহরম/কারবালাকে অনেক গুরুত্ব দিলেও তাদের ধর্মীয় উৎসবে মদ ব্যবহৃত হয়, তারা পাঁচ বার নামাজ আদায় থেকে বিরত থাকে এবং রমজান, হজ্ব ও মসজিদে উপস্থিত হওয়া থেকে বিরত থাকে; তারা শিয়া ধর্মীয় নেতা ‘আয়াতুল্লাহ’-কেও অনুসরণ করে না।

আলী (রা) ও ফাতিমা (রা) এর পুত্র হাসান (রা) ও হুসাইন (রা) এর বংশধরদের বলা হয় সায়িদ/সৈয়দ (পুরুষ) ও সায়িদা/সৈয়দা (নারী)। তবে বর্তমান যুগে হাসান (রা) এর বংশধরদের শরিফ আর হুসাইন (রা) এর বংশধরদের বলা হয় সায়িদ। সায়িদ বলতে মূলত কুরাইশ বংশের হাশিম গোত্রের একটি শাখাকে বোঝায়। আলী (রা) এর অন্য স্ত্রী এর মাধ্যমে বংশধরদের আলভী/শাহ ইত্যাদি বলা হয়। উপমহাদেশীয় সৈয়দদের ইতিহাস লিখতে গেলে আলাদা পোস্ট হয়ে যাবে, তাই সেদিকে আমরা না গেলাম। তবে সৈয়দ হিসেব নিকেশ যত্ন সহকারে করা হয়, কারণ ধর্মীয় অনুশাসন অনুযায়ী কোনো সৈয়দ যাকাত নিতে পারে না। এজন্য এটা খেয়াল রাখতে হয় মুসলিম নীতিতে।

ইমাম হুসাইন (রা) এর ভাই আব্বাস ইবনে আলী (রা) এর মাজার, কারবালা থেকে তোলা ছবি। ছবিসূত্রঃ AFP

ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে হয়ত আলী (রা) সঠিক ছিলেন, তবে অনেক ইতিহাসবেত্তা মন্তব্য করে থাকেন যে, তাঁর খেলাফত অনেকটা বিদ্রোহীদের উপহার ছিল। যদি আলী (রা) আরো আগে ক্ষমতা পেতেন হাতে, এই অশান্ত পরিস্থিতি মোকাবেলা করতে না হতো তবে হয়ত এত রক্তক্ষয় হতো না, হতো না এই মুসলিম গৃহযুদ্ধ। সম্পূর্ণ ভিন্ন রকমের এক ইসলামি সাম্রাজ্য হয়ত দেখা যেত। যদি আলী (রা) হাসান (রা) এর কথা শুনে যুদ্ধে না যেতেন তবে কেমন হতো? কিংবা, আরো আগে, যদি উসমান (রা) এর নাম করে চিঠিটা যদি না পাঠানো হতো তবে? অথবা উসমান (রা) যদি প্রতিবাদকারীদের কথা মেনে নিয়ে পদচ্যুত করতেন গভর্নরদের? হয়ত আমরা একটি সমান্তরাল ইতিহাস পেতাম তখন। কিন্তু যা হবার তা হয়েছেই।

আলী (রা) এর মৃত্যুর মধ্য দিয়ে শেষ হয়ে যায় প্রথম চার খলিফার শাসনামল। এরপর হাসান (রা) খলিফা হন, কিন্তু রাজনৈতিক অস্থিরতা থেকেই যায়, ওদিকে মুয়াবিয়া (রা) রয়েছেন। তবে খুলাফায়ে রাশেদিন অর্থাৎ রাশেদি খলিফাদের জীবনী সিরিজে এটা আমাদের শেষ পোস্ট। এ পোস্টে অনেক বেশি কাহিনী সংক্ষেপে লিখতে হওয়াতে অনেক কিছুই বাদ পড়ে গেছে হয়ত, যা ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে পাঠকরা দেখবেন। এর পরে যা যা ঘটেছিল তার পরিক্রমায় বহু বছর পর ঘটে ‘বিষাদ সিন্ধু’ থেকে ভিন্ন কিন্তু অসম্ভব মর্মান্তিক কারবালার ঘটনা, যা আজও সকলের হৃদয়ে নাড়া দেয়।

বর্তমান কারবালা, বাগদাদ থেকে ৮০ কিমি দক্ষিণে। ছবিসূত্রঃ আশুরা

ফিচার ইমেজঃ ওয়ালপেপার কেইভ