মসনদ-ই-আলা ঈশা খান: উত্থান

৮৯৯ হিজরী অর্থাৎ, ১৪৯৩ খ্রিস্টাব্দের কথা বলছি।

হাবশী দাস সুলতানদের শাসনের ফলে বাংলা রাজনৈতিক অবস্থা তখন বেশ টালমাটাল এক পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল। ১৪৮৭ খ্রিস্টাব্দে মাহমুদ শাহী বংশের শেষ সুলতান ফতেহ শাহকে হত্যা করে বাংলার মসনদে বসে পড়েন তারই হাবশী দেহরক্ষী সুলতান শাহজাদা বারবক। পরবর্তী ছয় বছরে মোট চারজন হাবশী সুলতান বাংলা শাসন করেন। যদিও মাঝে দুই/একজন সুলতান বেশ যোগ্যতাসম্পন্ন ছিলেন, তারপরেও হাবশী শাসনামলে বাংলার রাজদরবার ষড়যন্ত্র, বিশ্বাসঘাতকতা আর সুলতান হত্যার এক ঘূর্ণিপাকে আবর্তিত হচ্ছিল, যার প্রভাব পড়ে পুরো সাম্রাজ্যের উপর।

বাংলার চরম এই রাজনৈতিক ক্রান্তিলগ্নে মশালের আলো হয়ে দেখা দিলেন একজন ব্যক্তি। হাবশী দুঃশাসন বিতারিত করে তিনি বাংলায় শান্তি কায়েম করলেন। তিনি হোসেন শাহী বংশের প্রথম সুলতান আলা-উদ-দুনিয়া ওয়াল-দীন আবুল মুজাফফর হোসেন শাহ। তার সুদক্ষ শাসনব্যবস্থা, বিচক্ষণতা আর দূরদৃষ্টির ফলে অল্প কয়েক দিনেই বাংলায় শান্তি নেমে এলো। ন্যয়বিচার প্রতিষ্ঠা, জনকল্যাণমূলক কার্যক্রম, পরমতসহিঞ্চুতা, শাসনব্যাবস্থা ঢেলে সাজানো আর পরধর্মসহিঞ্চুতার সাহায্যে তিনি খুব সহজেই প্রজাদের মন জয় করে নেন। তার শাসনামলে অনেক হিন্দু ধর্মাবলম্বী রাজ দরবারে উচ্চ পদমর্যাদা লাভ করেন।

চাঁপাইনবাবগঞ্জের ছোট সোনা মসজিদ সুলতান আলাউদ্দিন হোসেন শাহের শাসনামলে নির্মিত হয়; Image Source: Wikimedia Commons

বাংলায় প্রাচুর্য্য আর ন্যায়ের শাসন বজায় থাকার কারনে ভাগ্যের অন্বেষণে সেই সময় হিন্দুস্তানের বিভিন্ন অংশ থেকে ভাগ্যান্বেষীরা বাংলায় আসতো। তেমনই একজন ছিলেন ভগীরথ নামের এক ব্যক্তি। তার পিতার নাম ছিল ধনপত সিংহ। ধনপত সিংহের পূর্বপুরুষদের আদি ভিটা ছিল রাজস্থানে। রাজস্থান থেকে উত্তর প্রদেশের অযোধ্যার এসে তারা বসতি স্থাপন করে। রাজস্থান থেকে সম্ভবত মোট বাইশটি গোত্র অযোধ্যায় এসেছিল সেবার। এ কারণে অঞ্চলটির নামই একসময় হয়ে যায় ‘বাইশওয়ারা’।

সে যা-ই হোক, ভগীরথ সুলতান আলাউদ্দিন হুসেন শাহের দরবারে গেলেন কাজের আশায়। বাংলার সুলতান ভগীরথকে নিরাশ করলেন না। তাকে তিনি দিউয়ান হিসেবে নিযুক্ত করলেন। ভগীরথের মৃত্যুর পর তার পুত্র কালীদাসও দিউয়ানি লাভ করলেন।

১৫১৯ সালে মৃত্যুবরণ করলেন সুলতান আলাউদ্দিন হোসেন শাহ। মসনদে বসলেন তার পুত্র নসরত শাহ। ১৫৩১ সালে নসরত শাহ মৃত্যুবরণ করলে তার পুত্র আলাউদ্দিন ফিরোজ শাহ বাংলার মসনদে বসলেন। আলাউদ্দিন ফিরোজ শাহ বাংলার সুলতান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন খুবই অল্প সময়ের জন্য। ক্ষমতা লাভের মাত্র ৯ মাসের মাথাতেই তিনি খুন হলেন। হত্যাকারী তার নিজেরই চাচা, নসরত শাহের ভাই আর সুলতান আলাউদ্দিন হোসেন শাহের পুত্র- গিয়াসউদ্দিন মাহমুদ শাহ।

এদিকে ভাগ্যন্বেষণে বাংলায় আসা ভগীরথের মৃত্যুর পর তার পুত্র কালিদাস ইসলাম গ্রহণ করলেন এবং সুলতান গিয়াসউদ্দিন মাহমুদ শাহের এক কন্যাকে বিয়ে করে রাজবংশের সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক স্থাপন করলেন। ইসলাম গ্রহণের পর কালিদাস তার নাম পরিবর্তন করে হয়ে গেলেন সোলায়মান খান।

১৫৩৮ সালের ৬ এপ্রিল বাংলার নতুন এই সুলতান গিয়াসউদ্দিন মাহমুদ শাহ পরাজিত হলেন শের শাহের হাতে। মহান মুঘল সাম্রাজ্যের মসনদে তখন সম্রাট হুমায়ুনের। তিনি শের শাহকে পরাজিত করে গৌড়কে মুঘল সাম্রাজ্যভুক্ত করলেন। কিন্তু ভাগ্যের লিখন না যায় খন্ডন! সম্রাট হুমায়ুন স্বয়ং পর পর দুবার শের শাহের কাছে পরাজিত হয়ে একে একে দিল্লি, আগ্রার নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে পারস্যে চলে গেলেন। কিছুদিনের জন্য হিন্দুস্তান আর বাংলার খেলার মঞ্চ থেকে সম্রাট হুমায়ুন অর্থাৎ, মুঘলরা বিদায় নিলেন। শের শাহ তখন হিন্দুস্তানের একচ্ছত্র অধিপতি।

বাংলার প্রাচীন রাজধানী গৌড় দুর্গের অভ্যন্তরের দৃশ্য; Image Source: mouthshut.com

এদিকে হোসেন শাহী বংশের কন্যাকে বিয়ে করার সুবাদে সোলায়মান খান (পূর্ব নাম কালিদাস) নিজেকে এবার বাংলা সালতানাতের উত্তরাধিকারী ভাবতে শুরু করলেন। সেই দাবী থেকেই তিনি বারংবার শের শাহের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করছিলেন। শের শাহের শাসনামলে তাকে পুরোপুরি দমন করা যায়নি।

১৫৪৫ সালে সুরি বংশের মসনদের দায়িত্ব পেলেন জালাল খান। ইসলাম শাহ উপাধী নিয়ে তিনি মসনদে বসলেন। ইসলাম শাহের সময়ও সোলায়মান খান বিদ্রোহ করলেন। ইসলাম শাহ এবার এই বিদ্রোহ দমনে তার সেনাপতি তাজ খান আর দরিয়া খানকে প্রেরণ করলেন। এই দুই জেনারেলের হাতে সোলায়মান খান পরাজিত ও নিহত হলেন। তার দুই পুত্র ঈশা ও ইসমাইলকে তুরানের বণিকদের কাছে বিক্রি করে দেয়া হলো! মধ্য এশিয়ার তুর্কমেনিয়া বা তুর্কিস্তানই হলো তুরান।

সম্রাট শের শাহ; Image Source: thefamouspeople.com

কনৌজের যুদ্ধে তাজ খান কররানি আর তার ভাই সোলায়মান খান কররানি বেশ সাহসী ভূমিকা রেখেছিলেন। তাদের সাহসিকতা আর কৌশলের কারণে খুব সহজেই শক্তিশালী মুঘল সেনাবাহিনীকে পরাজিত করতে সক্ষম হন শের শাহ সুরি। সেই কৃতজ্ঞতা থেকে সম্রাট শের শাহ এই দুই ভাইকে বাংলা আর বিহারের গভর্নরের দায়িত্ব দেন।

এদিকে বাংলার দরবারের বেশ উচ্চপদস্থ একজন কর্মকর্তা ছিলেন কুতুবুদ্দিন। সম্পর্কের দিক দিয়ে তিনি ছিলেন সোলায়মান খানের (কালিদাস গজদানি) ভাই। কুতুবুদ্দিন নিজ চেষ্টায় ১৫৬৩ সালে তুরান থেকে তার দুই ভ্রাতুষ্পুত্র ঈশা আর ইসমাইলকে উদ্ধার করলেন। উদ্ধার করে তাদের গৌড়ের দরবারে কিছুদিন রাখলেন। গৌড়ে অবস্থান করে তারা প্রশাসনিক কাজে দক্ষতা অর্জন করলেন। একই সাথে বাংলার দরবারের বিশ্বস্ততাও অর্জন করলেন। ১৫৬৪ সালের শেষ দিকে তাদের সরাইল পাঠিয়ে দেওয়া হলো।

সরাইলে পাঠানোর সময় ঈশা খানকে তার পিতার উত্তরাধিকারী হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হলো। ঈশা খান এখন সরাইলের জমিদার, অথচ কিছুদিন আগেও তিনি একেবারে নিঃস্ব ছিলেন!

বুদ্ধিমান ঈশা খান জমিদারি বুঝে পেয়েই নিজের ক্ষমতাকে সুসংহত করার কাজে হাত দিলেন। শক্তিশালী একটি সেনাবাহিনী গড়ে তুলতে উঠে-পড়ে লাগলেন তিনি। মূলত নৌ-শক্তির উপর বেশি গুরুত্বারোপ করেন তিনি। নদ-নদী বিধৌত এই বাংলায় ক্ষমতা ধরে রাখতে হলে এছাড়া উপায়ও নেই। ১৫৬৫ থেকে ১৫৭৮ সাল পর্যন্ত তিনি ধৈর্য্য ধরে এই কাজটি করে গেলেন।

ঈশা খান যে ভালো প্রশানসনিক দক্ষতা অর্জন করেছিলেন তা বেশ ভালো বোঝা যায় তার মিত্রতা স্থাপনের কৌশল দেখলে। তিনি তার জায়গীরের আশেপাশের অন্যান্য জায়গীরদার আর স্বাধীন রাজাদের সাথে মিত্রতা স্থাপন করতে শুরু করলেন। ত্রিপুরার রাজাদের সাথেও ঈশা খান বেশ সুসম্পর্ক বজায় রাখতেন।

সুরি সুলতান ইসলাম শাহের মৃত্যুর পর এদিকে বাংলায় তখন চলছিল মসনদ দখলের ইঁদুর-বিড়াল খেলা!

ইসলাম শাহের শাসনামলে তিনি বাংলার দায়িত্ব অর্পণ করেন তার আমির মুহাম্মদ খান সুরির উপর। সুশাসক এই গভর্নর সুরি সাম্রাজের একনিষ্ঠ অনুগত ছিলেন। সমস্যা তৈরি হলো ইসলাম শাহের মৃত্যুর পর থেকে। মাত্র ৯ বছর হিন্দুস্তান শাসন করে ১৫৫৩ সালের ৩০ অক্টোবর ইসলাম শাহ সুরি মৃত্যুবরণ করলেন। পেছনে রেখে গেলেন তার মাত্র ১২ বছর বয়স্ক পুত্র ফিরোজ শাহ সুরিকে।

অত্যন্ত উদ্ধত আর স্বাধীনচেতা আফগান আমিরদের মাত্র ১২ বছর বয়স্ক এক বালক সুলতানের পক্ষে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয়নি। দরবারের এই বিশৃঙ্খলার সুযোগে শের শাহেরই ভাই নিজাম খানের পুত্র মুবারিজ খান এই তরুণ সুলতান ফিরোজ শাহ সুরিকে হত্যা করেন। এরপর নিজেই মুহাম্মদ আদিল শাহ নাম নিয়ে মসনদে বসেন। সুলতান ফিরোজ শাহ সুরি শাসক হিসেবে মাত্র ৩ দিন স্থায়ী হয়েছিলেন!

আদিল শাহ মসনদে বসলেন নিজেরই সুলতানকে হত্যা করে। এর ফলে ইসলাম শাহ সুরির অনুগতরা গেলেন ক্ষেপে। এই বিদ্রোহী প্রশাসকদের একজন হলেন বাংলার গভর্নর মুহাম্মদ খান সুরি। নিজের সুলতান হত্যার প্রতিবাদে তিনি বিদ্রোহ করে স্বাধীনতার ঘোষণা দিলেন। এরপর চুনার, জৌনপুর আর কাল্পীকে নিজের অধিকারে আনার চেষ্টা করলেন।

আদিল শাহ তার বিশ্বস্ত হিন্দু সেনাপতি হিমুকে প্রেরণ করলেন এই বিদ্রোহ দমন করতে। কাল্পী থেকে কিছুটা দূরে চপরঘাটায় মুহাম্মদ খান সুরি আর হিমু মুখোমুখি হলেন। মুহাম্মদ খান সুরি সাহসিকতা আর বীরত্ব দেখিয়েও পরাজিত হলেন। মুহাম্মদ খান সুরিকে হত্যা করা হলো। শাহবাজ খান নামক একজন আমিরকে গৌড়ের গভর্নর নিযুক্ত করা হলো।

এদিকে মুহাম্মদ খান সুরির অনুগত আমির আর সেনাবাহিনীর বেঁচে যাওয়া যোদ্ধারা ঝাঁসিতে একত্রিত হলেন। তারা মুহাম্মদ খান সুরির পুত্র খিজির খানকে বাংলার সুলতান ঘোষণা করলেন। খিজির খান ‘গিয়াসউদ্দিন বাহাদুর শাহ’ নামধারণ করলেন।

শাসক হিসেবে দায়িত্বপ্রাপ্তির পর সুলতান গিয়াসউদ্দিন বাহাদুর শাহ প্রথমেই পিতৃহত্যার প্রতিশোধ নিতে ছুটলেন শাহবাজ খানের পেছনে। শাহবাজ খানকে পরাজিত করেই তিনি আদিল শাহকে আক্রমণ করার জন্য অভিযান শুরু করলেন। মুঙ্গেরে আদিল শাহ আর বাহাদুর শাহ একে অপরের মুখোমুখি হলেন। ১৫৫৭ সালে সংঘটিত এই যুদ্ধে আদিল শাহ পরাজিত ও নিহত হলেন। এই যুদ্ধে বাহাদুর শাহকে সাহায্য করেছিলেন তাজ খান কররানির ছোট ভাই সুলায়মান কররানি। তিনি শের শাহের সময় থেকেই দক্ষিণ বিহারের দায়িত্বে ছিলেন।

গিয়াসউদ্দিন বাহাদুর শাহ ১৫৬১ সাল পর্যন্ত বাংলা শাসন করলেন। তার মৃত্যুর পর তার ভাই জালাল শাহ বাংলার সুলতান হলেন। ১৫৬৩ সালে জালাল শাহ মৃত্যুবরণ করলে তার কোনো এক পুত্র বাংলার মসনদে বসেন। তবে গিয়াসউদ্দিন নামের এক ব্যক্তি এই সুলতানকে হত্যা করে নিজে ক্ষমতায় বসলেও বেশিদিন মসনদ ধরে রাখতে পারেননি। সম্ভলের গভর্নর তাজ খান কররানি গিয়াসউদ্দিনকে হত্যা করে বাংলার মসনদে বসলেন।

১৫৬৬ সালে মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত তাজ খান কররানি বাংলার সুলতান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। তার শাসনকাল ছিলো খুবই অল্প সময়ের জন্য। ১৫৬৪ সাল থেকে ১৫৬৬ সাল পর্যন্ত। তবে তার মৃত্যু তার ভাই সোলায়মান খান কররানির ভাগ্য খুলে দিলো। কারণ তিনিই তাজ খানের পর বাংলার মসনদে সমাসীন হলেন।

ভাইয়ের উত্তরাধিকারী হিসেবে সোলায়মান খান কররানি বিস্তীর্ণ ভূখন্ড পেয়েছিলেন। তার সাম্রাজ্যভুক্ত ছিলো বাংলা, বিহার আর ত্রিহুত। ১৫৬৮ সালে তিনি উড়িষ্যা জয় করে নেন। পরবর্তীতে কুচবিহার তার সাম্রাজ্যভুক্ত হয়।

এদিকে ততদিনে সম্রাট হুমায়ুনও পারস্য থেকে ফিরে এসে দিল্লি আগ্রা দখল করে নিলে বিশাল সুরি সাম্রাজ্যের পতন হলো। সুরি সাম্রাজ্যের পতনে সোলায়মান খান কররানি সতর্ক হয়ে গেলেন। তিনি মুঘলদের সাথে সরাসরি কোনো সংঘর্ষে জড়াতে ইচ্ছুক ছিলেন না। সুলতান বা বাদশাহ উপাধী ধারণ না করে তাই তিনি ‘হযরতে আলা’ বা ‘সর্বপ্রধান’ উপাধী নিলেন, যাতে মুঘলরা কখনোই তাকে হুমকি মনে না করে। মুঘল দরবারের সাথে সুসম্পর্ক বজায় রাখার জন্য তিনি প্রায়ই উপঢৌকনসহ শুভেচ্ছা প্রেরণ করতেন। মুঘলরাও তাকে কখনো ঘাটায়নি।

সম্রাট হুমায়ুন; Artist: Kailash Raj

১৫৭২ সালে সুলায়মান খান কররানির মৃত্যুর পর তার পুত্র বায়জীদ খান কররানি মসনদে বসলেন। এর এক মাসের মাথায় নিজের এক চাচাতো ভাই তাকে খুন করে মসনদ দখল করলেন। এর দুই/তিনদিন পর তাকেও হত্যা করা হলো। দৃশ্যপটে হাজির হলেন বায়জীদ খান কররানির ভাই দাউদ খান কররানি। আবুল মুজাফফর দাউদ শাহ উপাধী নিয়ে তিনি বাংলার মসনদে বসলেন।

মসনদে বসে দাউদ শাহ কররানি ১ লাখ ৪০ হাজার পদাতিক, ৪০ হাজার অশ্বারোহী, সাড়ে ৩ হাজার রণহস্তী আর বিপুল পরিমাণ আর্টিলারী সমৃদ্ধ এক টগবগে সেনাবাহিনী পেয়ে ছটফট করতে লাগলেন। সাম্রাজ্য বিস্তার নীতি অনুসরণ করে দখল করে নিলেন কামরুপ আর ত্রিপুরা। সমস্যা সেখানে না, সমস্যা হলো যখন তিনি মুঘল সীমান্তের জামানিয়া দুর্গে আক্রমণ চালালেন। মুঘল মসনদে তখন সম্রাট আকবর। আকবর বাধ্য হলেন বাংলা সীমান্তে নজর দিতে। হিন্দুস্তানের পরাক্রমশালী মুঘল সাম্রাজ্য ও শক্তিশালী বাংলা সালতানাত এবার সরাসরি সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়লো।

সংঘর্ষের প্রথমদিকে বাদশাহ দাউদ শাহ পরাজিত হয়ে মুঘলদের সাথে কটকের চুক্তি স্বাক্ষর করলেন। পরবর্তীতে সেই চুক্তি ভঙ্গ করে পুনরায় যুদ্ধে জড়িয়ে পড়লে ১৫৭৬ সালে রাজমহলের যুদ্ধে তিনি পরাজিত ও নিহত হন। বাংলায় আফগান রাজবংশের সমাপ্তি এখানেই। তবে আগেই বলা হয়েছে, আফগানদের পতনের পর পরই কিন্তু গোটা বাংলা মুঘল সাম্রাজ্যভুক্ত হয়ে যায়নি। ভাটি বাংলা থেকে মুঘলদের বিরুদ্ধে শক্ত প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিলেন মসনদ-ই-আলা ঈশা খান।

মুঘলদের সাথে আফগানদের দ্বন্দ্ব একেবারে শুরু থেকেই ছিল। হিন্দুস্তানে মুঘলদের বিজয় পতাকা উড়ানোই হয় আফগানদের কবরের উপর দিয়ে। পানিপথের প্রথম যুদ্ধে মুঘল বাঘ মহান সুলতান জহিরউদ্দিন মুহাম্মদ বাবরের প্রতিপক্ষই ছিল এই আফগানরা। মুঘল সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার পর আফগানরা প্রাণপণে মুঘলদের বিরোধিতা করতে লাগলো।

যাক সে কথা, লোদী সাম্রাজ্যের পতনের পর আফগানরা প্রথমবারের মতো আশা দেখতে পেয়েছিলো এককালে সম্রাট বাবরের সেনাবাহিনীতে কর্মরত একজন আফগান নেতার ভেতরে। আফগান সেই নেতা শের খান তাদের হতাশ করেননি। বিস্তৃত ও শক্তিশালী একটি সাম্রাজ্য তিনি তাদের উপহার দিয়েছিলেন। কিন্তু প্রচন্ড স্বাধীনচেতা আর উচ্ছৃঙ্খল আফগানরা সেই সাম্রাজ্য ধরে রাখতে পারেননি। তাদের অভ্যন্তরীণ দলাদলি সাম্রাজ্যকে ভেতর থেকে ধ্বংস করছিলো, আর বাইরে থেকে আক্রমণ চালিয়েছিলেন সম্রাট হুমায়ুন। কয়েক বছরের ভেতরেই বিশাল সুরি সাম্রাজ্য ভেঙে পড়েছিলো।

সম্রাট শের শাহের কর্মচারীদের হাতেই বাংলায় প্রতিষ্ঠা পায় বাংলার আফগান সালতানাত। সোলায়মান খান কররানির বিচক্ষণতায় এই সালতানাত টিকে গেলেও বাদশাহ দাউদ শাহ নিজের সামরিক শক্তির উপর ভর করে মুঘল সীমান্তে গোলযোগ করার সাহস দেখিয়েছিলেন। তার খেসারত তাকে দিতে হয়েছিলো রাজমহলে।

বাদশাহ দাউদ শাহের পরাজয় শুরু হওয়ার পর থেকেই আশ্রয়ের আশায় আফগান যোদ্ধারা বাংলার গভীরে প্রবেশ করতে থাকে। রাজমহলে বাদশাহ দাউদ শাহের চূড়ান্ত পরাজয়ের পর এই স্রোত আরও বৃদ্ধি পায়। দলছুট এসব আফগান যোদ্ধাদের আশ্রয় দিতে থাকেন মসনদ-ই-আলা ঈশা খান। বিশ্বস্ত আশ্রয়দাতা হিসেবে ঈশা খানের নামডাক চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে।

এদিকে মুঘল-আফগান এই দ্বন্দ্বে ঈশা খান নিজেকেও জড়িয়ে ফেলেছিলেন অনেক আগেই।

মীর-ই-বহর শাহ বারদীর নেতৃত্বে শক্তিশালী একটি মুঘল নৌবহর নোঙর ফেলেছিল সোনারগাঁয়ে। বাদশাহ দাউদ শাহ যখন কটকের চুক্তি ভঙ্গ করে যুদ্ধে এগিয়ে এলেন, তখন ঈশা খান তড়িৎগতিতে সোনারগাঁয়ে এই মুঘল নৌবহরে তীব্র হামলা চালালেন। অকস্মাৎ এই আক্রমণে মুঘল নৌবহর ছিন্নভিন্ন হয়ে গেলো।

মুঘল নৌবাহিনীর বিরুদ্ধে অভাবনীয় এই বিজয় ঈশা খানকে বিরল এক সম্মান এনে দিয়েছিলো। মুঘলদের বিরুদ্ধে তিনি নিজের যোগ্যতা প্রমাণের সুযোগ পেয়েছিলেন এই যুদ্ধে। ফলে যখন তিনি পরবর্তীতে মুঘলদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুললেন, তখন অন্যরা বিনা চ্যালেঞ্জে তার নেতৃত্ব গ্রহণ করে নিলো।

মসনদ-ই-আলা ঈশা খান; Image Source: Wikimedia Commons

১৫৭৬ সালটা একদিকে যেমন আফগানদের জন্য দুঃসময়ের ছিলো, ঈশা খানের জন্য দুঃসময়ের ছিলো। রাজমহলের যুদ্ধে একদিকে বাদশাহ দাউদ শাহ পরাজিত হলে আফগানরা বিক্ষিপ্ত হয়ে গেলো। অন্যদিকে মুঘল নৌবহরে আক্রমণের পরিণাম চিন্তা করে ঈশা খান মাথায় হাত দিলেন। মুঘলরা যে এই আক্রমণের প্রতিশোধ কড়ায় গন্ডায় আদায় করবে, এটা বোঝা তেমন জটিল কোনো বিষয় ছিলো না। ফলে জীবন রক্ষার তাগিদে ঈশা খান পালানোর সিদ্ধান্ত নিলেন। ঈশা খান পালিয়ে গিয়ে আশ্রয় নিলেন চট্টগ্রামে!

ঈশা খান এক বছরের মতো চট্টগ্রামে অবস্থান করলেন। এই সময় যে তিনি নিশ্চুপ হয়ে বসে ছিলেন তা না। আসন্ন যুদ্ধের জন্য তিনি প্রয়োজনীয় রসদ সংগ্রহ, সৈন্য সংগ্রহ আর প্রশিক্ষণে সময় ব্যয় করলেন। এরপর তিনি ফিরে এলেন নিজের জমিদারিতে। নিজের এলাকায় এসে তিনি প্রশাসনিক আর সামরিকভাবে নিজেকে গুছিয়ে নিলেন। এরপর নিজের এলাকার বিস্তৃতি বাড়ানোর দিকে মনোযোগ দিলেন। মেঘনার পশ্চিমে আর ব্রহ্মপুত্রের উত্তরে জোয়ানশাহী-খলিয়াজুরিতে নিজের প্রভাব বিস্তার করলেন।

৯৮৬ হিজরি (১৫৭৮ সাল)। বর্ষা চলছে সে সময়। মুঘল গভর্নর খান জাহান ভাটি বাংলা বিজয়ের উদ্দেশ্যে একটি নৌ অভিযানে বের হয়েছেন। যাত্রা শুরু হয় রাজধানী তান্ডা থেকে। ভাওয়াল পরগণার চৌরায় নোঙ্গর ফেলে এই নৌবহরটি। ঈশা খানও খবর পেয়েছেন এই নৌবহরটি সম্পর্কে। তিনি আর দেরি করলেন না। তাৎক্ষণিক সহযোগী ভূঁইয়াদের নিয়ে মুঘল নৌবহরের মোকাবেলা করতে এগিয়ে এলেন। মেঘনা নদীর পশ্চিমে কাস্তুলে (কাইথাল) এই দুই বাহিনী মুখোমুখি হলো। কাস্তুল বর্তমান কিশোরগঞ্জ জেলার অষ্টগ্রামের ৩/৪ কিলোমিটার উত্তর পশ্চিমের একটি স্থান।

প্রচন্ড যুদ্ধ শুরু হলো। নৌ যুদ্ধে তুলনামূলক কম অভিজ্ঞ হলেও মুঘল নৌবহর বেশ তৎপরতা দেখালো। মুঘল নৌযোদ্ধাদের আক্রমণে ঈশা খান ছিন্নভিন্ন হয়ে বাধ্য হলেন পিছু হটতে। যুদ্ধে মুঘল নৌবহরের বিজয় হলো। নৌ যোদ্ধারা বিজয় উপলক্ষ্যে আনন্দ-উল্লাস আর ঈশা খানের বাহিনীর ফেলে যাওয়া গণিমত সংগ্রহে ব্যস্ত হয়ে পড়লো। এদিকে আড়ালে যে তখন তাদের জন্য মৃত্যু ওত পেতে রয়েছিলো, তারা তা জানতেও পারলো না। জানলে হয়তো কিছু ঘটনা অন্যরকম হতে পারতো।

মুনিম খান; Image Source: Pinterest

ঈশা খানের অন্যতম বিশ্বস্ত সহযোগী ছিলেন জোয়ানশাহী পরগণার মজলিশ দিলাওয়ার আর খলিয়াজুরি পরগণার জমিদার মজলিশ প্রতাপ। প্রাথমিকভাবে মুঘল নৌবহরের সাথে যুদ্ধে পরাজিত হয়ে ঈশা খান পিছু হটে নিরাপদ দূরত্বে আশ্রয় নিলেন। তবে তিনি মুঘলদের গতিবিধির উপর নজর রাখছিলেন। যখন তিনি দেখলেন মুঘল যোদ্ধারা যুদ্ধক্ষেত্র সম্পর্কে অমনোযোগী হয়ে পড়েছে, তখনই মজলিশ দিলাওয়ার আর মজলিশ প্রতাপকে নিয়ে ক্ষিপ্র চিতার মতো মুঘলদের উপর ঝাপিয়ে পড়লেন। মুঘল নৌবাহিনী তীব্র এই আক্রমণ প্রতিহত করার মতো কৌশলগত ফর্মেশনেই আর ছিলো না। পরবর্তীতে কিছুক্ষণ যা হলো তা হচ্ছে স্রেফ কচুকাটা। হতাশ হয়ে খান জাহান পিছু হটার নির্দেশ দিলেন। নিশ্চিত একটি বিজয় এভাবে হাতছাড়া হয়ে যাবে, তা কখনও ভাবেননি তিনি।

কিছুদিন ধরে ঈশা খান বেশ ফুরফুরে মেজাজে রয়েছেন। পরাক্রমশালী মুঘল সাম্রাজ্যের নৌবাহিনীকে এভাবে ঘোল খাওয়ানোটা চাট্টিখানি কথা না। তিনি খবর পেয়েছেন খান জাহান পরাজিত হয়ে কোনো রকমে নিজের প্রাণ নিয়ে তান্ডা পৌঁছেছেন। তবে ঈশা খান নিশ্চিত মুঘল নৌবহরকে কয়েক মাসের মধ্যেই আবার ভাটি অঞ্চলে দেখা যাবে। শক্তিশালী মুঘল নৌবহরকে পরাজিত করতে হলে ঈশা খানের শক্তিশালী কারও সহযোগীতা দরকার। এই শক্তিশালী সহযোগী হিসেবে তিনি বেছে নিলেন ত্রিপুরার রাজাকে।

এদিকে সেই নৌযুদ্ধের পর ঈশা খানও দ্রুত তার বাহিনী পুনর্গঠনে হাত দিলেন। এমনই সময় পরপর আসা কয়েকটি সংবাদে ঈশা খান একই সাথে প্রচন্ড বিস্মিত, হতবাক ও উল্লসিত হলেন! এক, মুঘল সেনাবাহিনীর অন্যতম যোগ্য সেনাপতি খান জাহান মারা গিয়েছেন, দুই, মুজাফফর খান তুরবাতীকে নতুন গভর্নর করে বাংলায় পাঠানো হয়েছে। পরবর্তী সংবাদটিতে ঈশা খান চরম উল্লসিত হলেন। বাংলায় নিয়োজিত মুঘল সেনাবাহিনী সম্রাট আকবরের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে বসেছে!

ঈশা খান জানেন, এই অবস্থায় ভাটিতে অভিযান চালানোর তুলনায় বিদ্রোহ দমনই অগ্রাধিকার পাবে। কাজেই আগামী কয়েক বছরের জন্য ঈশা খান একেবারেই নিশ্চিন্ত!

[এই সিরিজের পূর্বে প্রকাশিত পর্বটি পড়ুন এখানে। সিরিজের সবগুলো লেখা পড়তে চাইলে ক্লিক করুন এখানে।]

This article is written in the Bengali language. It describes the rise of Masnad-I-Ala Isa Khan in Bhati Bengal against the Mughal Empire.

References:

1. বাংলার ইতিহাস (১২০০-১৮৫৭), আবদুল করিম, জাতীয় সাহিত্য প্রকাশ, আগস্ট ২০১২ (২য় মুদ্রণ)

2. বাংলার ইতিহাস (প্রাচীনকাল থেকে ১৭৬৫ সাল পর্যন্ত), ড সৈয়দ মাহমুদুল হাসান, নভেল পাবলিশিং হাউস, জুন ২০১৮ (তৃতীয় মুদ্রণ)

3. মসনদ-ই-আলা ঈশা খান, মাহবুব সিদ্দিকী, দিব্য প্রকাশ, ফেব্রুয়ারী ২০১৮

Featured Image (The Image Has Been Used Symbolically): Wallpaperaccess.com

Related Articles