তাইওয়ান মিরাকল: তাইওয়ানের অর্থনীতি পাল্টে গেল যেভাবে | পর্ব-০২

[প্রথম পর্ব পড়ুন]

চীন থেকে পালিয়ে তাইওয়ানে এসে ‘রিপাবলিক অব চায়না’ সরকার প্রতিষ্ঠার করা চিয়াং কাই শেকের নেতৃত্বাধীন কুয়োমিনতাং সরকার দেখতে পেল, দেশটির অর্থনৈতিক অবকাঠামো বলতে কিছুই নেই। ঐতিহাসিক কারণেই দেশটিতে খুব বেশি উন্নয়ন হয়নি। তার উপর দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কবলে পরে যেটুকু ছিল সেটাও ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে চলে গিয়েছে। হিরোশিমা ও নাগাসাকিতে বোমাবর্ষণের মাধ্যমে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হয় ১৯৪৫ সালে, অপরদিকে চীনের নানকিংয়ের জাতীয়তাবাদী সরকার তাইওয়ানের শাসনক্ষমতা দখল করে ১৯৪৯ সালে। তাহলে মাঝখানে চার বছর তাইওয়ানের অর্থনীতির ভাগ্যে কী ঘটেছিল?

উত্তর হচ্ছে, এই চার বছরে তাইওয়ানের অর্থনীতিতে দৃশ্যমান কোনো উন্নয়ন তো ঘটেইনি, বরং উল্টোপথে হাঁটতে হয়। বৈদেশিক বাণিজ্য প্রায় বন্ধ হয়ে গিয়েছিল, অভ্যন্তরীণ উৎপাদন একেবারে কমে দুর্ভিক্ষের মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়। চিয়াং কাই শেক সরকার দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ফলে তাইওয়ানের এই দুর্দশা সম্পর্কে অবগত ছিল। যদিও তারা চীনের মূল ভূখণ্ড থেকে এসেছিল, তারপরও তাইওয়ানকে ‘মাতৃভূমি’ হিসেবে ভেবেই তারা উন্নয়ন পরিকল্পনা প্রণয়ন ও সেগুলোর বাস্তবায়ন শুরু করে।

হডজতওত
জাতীয়তাবাদী নেতা চিয়াং কাই শেক চীন থেকে পালিয়ে তাইওয়ানে চলে আসেন; image source: kotte-autographs.com

শুধু ধান উৎপাদন বাদ দিয়ে তাইওয়ানের সমস্ত অর্থনৈতিক খাতেই জাপানিরা বিনিয়োগ করেছিল। উল্লেখযোগ্য বিষয় হচ্ছে, চিং রাজবংশের হাত থেকে তাইওয়ানের ক্ষমতা গ্রহণের পর জাপানিরা কেন্দ্রীয় সরকারের মাধ্যমে সমস্ত অর্থনৈতিক পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে শুরু করে। জাপানিরা যখন তাইওয়ান ছেড়ে চলে যায়, তখন তাদের ফেলে যাওয়া পুঁজি সরকারি অধিগ্রহণ করা ছিল চিয়াং কাই শেক সরকারের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ। তবে সব বাধা ডিঙিয়ে শক্ত হাতেই রিপাবলিক অব চায়না সরকার জাপানিদের ফেলে যাওয়া পুঁজির বিরাট অংশ অধিগ্রহণ করে।

এরপর দ্বীপটিকে বিশ্বযুদ্ধের পূর্বের অর্থনৈতিক অবকাঠামো কীভাবে ফিরিয়ে আনা যায়, সেই সম্পর্কে ব্যাপক পরিকল্পনা প্রণয়ন করা হয়। জাপানিদের ফেলে যাওয়া পুঁজি থেকেই পরবর্তীতে অবকাঠামোগত উন্নয়ন খাতে বিনিয়োগ করা হয়। অবকাঠামোগত উন্নয়নের পর বিভিন্ন শিল্পের কীভাবে আরও প্রসার ঘটানো যায়, সেগুলো নিয়ে চিন্তাভাবনা শুরু হয়। আর অবকাঠামো পুনর্নির্মাণ নিশ্চিত করা হয় দ্রুততম সময়ের মধ্যে, যেটি তাইওয়ানের জন্য ছিল বিশাল ভাগ্যের ব্যাপার।

চিয়াং কাই শেক সরকার দেখতে পায়, তাইওয়ানের জমির একটি বিরাট অংশ চাষাবাদের বাইরেই থেকে যাচ্ছে। এর পেছনে মূল কারণ ছিল তখনকার জমিদারি ব্যবস্থা। তাইওয়ানের সামাজিক পরিমন্ডলে জমিদাররা উৎপাদন বৃদ্ধির প্রতি খুব বেশি নজরদারি করতেন না, সময়মতো প্রজাদের কাছ থেকে খাজনা পেলেই তারা খুশি থাকতেন। ১৯৫৩ সালে জমি সংস্কার আইনের মাধ্যমে জমিদারিব্যবস্থা উচ্ছেদ করা হয়। এর মূল উদ্দেশ্য ছিল পড়ে থাকা যেসব জায়গা ক্ষুদ্র সংস্কারের মাধ্যমেই চাষাবাদের অধীনে আনা সম্ভব, সেগুলো প্রয়োজনীয় সংস্কারের মাধ্যমে চাষাবাদের অধীনে নিয়ে আসা। দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা জমিদারিব্যবস্থা বিলুপ্তির পর তাইওয়ানের চিয়াং কাই শেক সরকার জমিগুলো অধিগ্রহণ করে ও পরবর্তীতে নির্দিষ্ট সময়ে স্বল্প পরিমাণ খাজনার বিনিময়ে ব্যক্তিমালিকানায় সেগুলো ছেড়ে দেয়া হয়। তাইওয়ানের ইতিহাসে দুর্বল কৃষিশিল্পের সময়ের ব্যবধানে শক্ত ভিত্তি পাওয়ার পেছনে এই ঐতিহাসিক ‘জমি সংস্কার আইন’ প্রণয়নের মাধ্যমে জমিদারও ব্যবস্থা বিলুপ্তির বড় ভূমিকা ছিল।

িতওতওগওগপ
জমি সংস্কারের বিধানের মাধ্যমে জমিদারি ব্যবস্থার বিলুপ্তি সাধন করা হয়; image source: taiwantoday.tw

তাইওয়ানে জমিদারি ব্যবস্থা বিলুপ্তি একটি অর্থনৈতিক উদ্যোগ হলেও এটি দেশের সামাজিক অবস্থানে ব্যাপক পরিবর্তন নিয়ে আসে। পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ১৯৫২ সালে জমিদারি ব্যবস্থা বিলুপ্তির এক বছর আগে দেশে মাত্র ৩৮ শতাংশ মানুষ সমস্ত জমির মালিক ছিল। যে বছর এটি বিলুপ্ত করা হয়, অর্থাৎ ১৯৫৩ সালে, জমির মালিকের সংখ্যা গিয়ে দাঁড়ায় ৬৭ শতাংশে! দেখা যাচ্ছে, মাত্র এক বছরের মধ্যে জমির মালিকের সংখ্যা প্রায় দ্বিগুণ হয়ে যায়। তবে এর ফলে মাথাপিছু জমির পরিমাণ কমে আসে। ১৯৫২ সালে মাথাপিছু গড় আবাদি জমির পরিমাণ ছিল ০.২১ হেক্টর। ১৯৬৫ সালে তাইওয়ানে মাথাপিছু গড় আবাদি জমির পরিমাণ দাঁড়ায় ০.১৬ হেক্টরে। তবে যেহেতু জমিদারি ব্যবস্থা বিলুপ্তির পর জমির মালিকের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পায়। তাই এটি প্রত্যাশিত ছিল যে মাথাপিছু গড় জমির সংখ্যা কমে আসবে।

ইতিহাস ঘাঁটলে আপনি দেখতে পাবেন, প্রতিটি দেশে শিল্পবিপ্লব হওয়ার আগে কৃষিখাতে বৈপ্লবিক পরিবর্তন এসেছে। কৃষিতে যখন উৎপাদন বেড়ে যায়, তখন জমির মালিকদের হাতে বাড়তি পুঁজি জমা হয় এবং পরবর্তীতে শিল্পখাতে সেই পুঁজি বিনিয়োগ করা হয়। তাইওয়ানের জমিদারিব্যবস্থার বিলুপ্তি দেশটির কৃষিখাতে রীতিমতো বিপ্লব ঘটিয়ে দেয়। একসময়ে যারা মানুষের জমিতে চাষবাস করে কোনোমতে দিনাতিপাত করতো, তারা পরবর্তীতে জমির মালিকানা লাভ করে। তাইওয়ান সমাজে উৎপাদন বাড়ানোর তীব্র প্রতিযোগিতা শুরু হয় এবং জাতীয় উৎপাদন বেড়ে যায়। ১৯৫২ সালে তাইওয়ানে মোট ধান উৎপাদিত হয় ১৫ লক্ষ ৭০ হাজার টন। ১৯৬৫ সালে ধান উৎপাদন বেড়ে গিয়ে দাঁড়ায় ২০ লক্ষ ৩৫ হাজার টনে। একজন মালিক যত বেশি ফসল উৎপাদন করত, সে তত বেশি অর্থের মালিক হতো। আর আয়কৃত অর্থের মাধ্যমেই সেসময়ে সামাজিক অবস্থান নির্ধারণ করা হতো। যেহেতু ব্যাপক আকারে চাষবাস শুরু হয়েছিল, তাই তাইওয়ানে খুব দ্রুত সার ও কীটনাশকশিল্পের প্রসার ঘটে। দেশের পুঁজিপতিরা এই খাতে বিনিয়োগ শুরু করেন, যেহেতু এটি ছিল সেসময়ের অন্যতম প্রধান লাভজনক শিল্পখাত।

িডওতওতও
জমিদারি ব্যবস্থার বিলুপ্তির মাধ্যমে তাইওয়ানের অসংখ্য পতিত জমি চাষাবাদের আওতায় চলে আসে; image source: jstor.org

১৯৫০ সালের দিকে পৃথিবীর অনেক উন্নয়নশীল দেশই উন্নত দেশগুলোর উপর থেকে নির্ভরশীলতা কমিয়ে আনার উপর গুরুত্বারোপ করে। দেখা যাচ্ছিল, উন্নয়নশীল দেশগুলোর বাজার দখল করে রেখেছে উন্নত দেশের বিভিন্ন বহুজাতিক কোম্পানি। এতে বিশাল পরিমাণ মুনাফা বিদেশে চলে যাচ্ছিল, যেটি আসলে দেশেই থাকার কথা ছিল। অর্থনীতির নিয়মানুযায়ী, মুনাফার একটি অংশ থেকে পরবর্তীতে আবার বিনিয়োগ করা হয়। মুনাফা নিজ দেশে থাকলে দিনশেষে নিজের দেশেরই উপকার হয়। তাইওয়ানের কথাই ধরা যাক। যদি তাইওয়ানের কোনো বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান নিজ দেশের বাজারে শক্ত অবস্থান তৈরি করতে পারে, তাহলে প্রচুর মুনাফা আসবে। মুনাফার একটি অংশ দিয়ে হয়তো ভবিষ্যতে বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের মালিক তার প্রতিষ্ঠানের সম্প্রসারণ ঘটাবে কিংবা নতুন প্রতিষ্ঠান গঠন করবে। এসব প্রতিষ্ঠান চালাতে নতুন নতুন কর্মীর দরকার হবে। ফলে তাইওয়ানের কিছু নাগরিকের কর্মসংস্থান হবে। যেহেতু প্রতিষ্ঠান সম্প্রসারণ করলে উৎপাদনও বেড়ে যাবে, সরকারও আগের চেয়ে বেশি ট্যাক্স পাবে।

জতওতপগপগ
যেকোনো দেশে শিল্পবিপ্লবের আগে কৃষিবিপ্লব হওয়া অপরিহার্য; image source: history.com

অর্থনীতির ভাষায়- কোনো দেশ যখন নিজ দেশের বাজারে স্বদেশি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে সুবিধা করে দেয়ার জন্য কিছু কৌশল অবলম্বন করে, তখন তাকে ‘ইমপোর্ট সাবস্টিটিউশন ইন্ডাস্ট্রিয়ালাইজেশন’ বলা হয়। সাধারণত উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলো বৈদেশিক বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর উপর নির্ভরতা কমিয়ে আনার জন্য এই ধরনের কৌশল অবলম্বন করে। স্বদেশি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে সুবিধা করে দেয়ার জন্য যেসব কৌশল অবলম্বন রয়েছে, সেগুলোর মধ্যে বিদেশি পণ্যের উপর শুল্ক বৃদ্ধি, বিদেশি পণ্যের আমদানির পরিমাণ নির্ধারণ করে দেয়া কিংবা স্বদেশি কোম্পানিগুলোকে ভর্তুকির পাশাপাশি ঋণ প্রদান করা- এই কৌশল অবলম্বন করে পরবর্তীতে অনেক দেশই সফলতা লাভ করেছে। সাধারণত যেসব দেশে অনেক পরে শিল্পবিপ্লব হয়েছে, সেসব দেশই এই ধরনের কৌশল অবলম্বন করেছিল। ১৯৮০-র দশক পর্যন্ত এই কৌশল পৃথিবীর অনেক দেশে গৃহীত হলেও পরবর্তীতে বিশ্বব্যাংক ও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল অর্থনীতির বিশ্বায়ন ও উদারনীতিকরণের উপর জোর দেয়ায় এই অর্থনৈতিক নীতি থেকে সরে আসতে বাধ্য হয় অনেক দেশ।

Related Articles