ব্রিটেন ও ফ্রান্সের যৌথ প্রচেষ্টায় নির্মিত বিশ্ববিখ্যাত কনকর্ড বিমানের কথা জানে অনেকেই। শব্দের চেয়েও দ্বিগুণ গতিবেগে ৯০ থেকে ১০০ জন যাত্রী পরিবহনে সক্ষম ছিল এই বিমান। ১৯৭৬ সাল থেকে ২০০৩ সাল পর্যন্ত কনকর্ড বিমান সুপারসনিক গতিবেগে যাত্রী পরিবহন করে গিয়েছে। প্রচণ্ড শব্দদূষণ, উচ্চ রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় এবং কয়েকটি দুর্ঘটনা, বিশেষ করে ২০০০ সালে এয়ার ফ্রান্স ফ্লাইট ৪৫৯০ বিদ্ধস্ত হয়ে ১১৩ জন মানুষ মারা গেলে কনকর্ড বিমানের জনপ্রিয়তা কমে যায়। অবশেষে ২০০৩ সালে এর ব্যবহার বন্ধ করে দেওয়া হয়।

কনকর্ড প্রথম আকাশে উড়েছিল ১৯৭৬ সালে। তখন স্নায়ুযুদ্ধের সময়। রাজনীতির ময়দানে ব্রিটেন আর ফ্রান্স বরাবরই যুক্তরাষ্ট্রপন্থী। পশ্চিমা নাগরিকেরা সুপারসনিক বিমানে চেপে লম্বা দূরত্ব এক লহমায় পাড়ি জমাবে এটা সোভিয়েত ইউনিয়নের নেতারা সহ্য করেন কীভাবে? কাজেই সোভিয়েত ইউনিয়নের শিবির থেকে এলো কনকর্ডের পালটা জবাব- তুপোলেভ তু-১৪৪। এটিও সুপারসনিক বিমান, এটিও বেসামরিক উদ্দেশ্যেই ব্যবহৃত হতো। বস্তুত কনকর্ড আর তুপোলেভ-১৪৪-ই হলো বেসামরিক কাজে ব্যবহৃত একমাত্র সুপারসনিক বিমান। তবে কনকর্ডের তুলনায় সোভিয়েত তু-১৪৪ এর পরিণতি হয়েছিল আরও করুণ। কী ছিল সেই করুণ কাহিনী?

ওপরে তু-১৪৪, নীচে কনকর্ড; Source: arthur-a-motor.blogspot.com

ডিজাইন এবং অন্যান্য

ষাটের দশকে সোভিয়েত সরকার একটি সুপারসনিক যাত্রীবাহী বিমানের কথা চিন্তা করা শুরু করে। সোভিয়েত সরকারের অধীনে অনেকগুলো ডিজাইন ব্যুরো কাজ করতো। এদের মাঝে একটি ব্যুরো, তুপোলেভ ওকেবিকে দায়িত্ব দেওয়া হয় পাচঁটি পরীক্ষামূলক বিমান তৈরি করতে। উল্লেখ্য, তুপোলেভ ডিজাইন ব্যুরো বিরাটকার সব বোমারু এবং বেসামরিক বিমান নির্মাণের জন্য বিখ্যাত ছিল।

১৯৬৩ সালে তুপোলেভ-১৪৪ এর নির্মাণ কাজ শুরু হয়। ব্রিটেন ও ফ্রান্সের কনকর্ড বিমানের সাথে এর অনেক সাদৃশ্য রয়েছে। যেমন, উভয় বিমানই ত্রিকোণাকৃতির ডেলটা উইং ব্যবহার করে। তবে ইঞ্জিনের নিয়ন্ত্রণ আর ব্রেকিংয়ের ওপর কনকর্ডের দখল ছিল বেশি। এসব কাজের জন্য যে সূক্ষ্ম যন্ত্রপাতি প্রয়োজন হয় তা সোভিয়েত ইউনিয়নে ছিল না। আবার পশ্চিমা বিশ্ব এসব যন্ত্র সেখানে রপ্তানিও করতো না। তু-১৪৪ এর ককপিটের দিকে দুটি মুশটাশড কানার্ড বা ছোট ডানা বসানো ছিল। কনকর্ডে এটি ছিল না। তু-১৪৪-এর কেবিনের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থাও বলতে হবে বেশ খারাপই ছিল। এই ছোটখাট সমস্যাগুলোই পরবর্তীতে তু-১৪৪ এর উপযোগিতা নষ্ট করবে।

তু-১৪৪; Source: airliners.net

২১৫ ফুট লম্বা তু-১৪৪ এর গতিবেগ ছিল ম্যাক ২.১ এর সামান্য বেশি। অর্থাৎ শব্দের বেগের দ্বিগুণের চেয়েও বেশি। কনকর্ড এক্ষেত্রে কিছুটা পিছিয়ে ছিল। তু-১৪৪ প্রায় ২৬ হাজার কেজি ওজন নিয়ে ৪ হাজার মাইল পথ পাড়ি দিতে পারতো। যাত্রী পরিবহন ক্ষমতা ছিল ১৪০ জন। চারটি প্রকাণ্ড কলোসভ আরডি-৩৬-৫১ বিরাট এই বিমানটিকে আকাশে উড়িয়ে নিয়ে যেত। কোনো কোনো তু-১৪৪ এর ইঞ্জিনে আবার আফটার বার্নার থাকতো। আফটার বার্নার হলো এমন এক প্রযুক্তি যার মাধ্যমে ইঞ্জিনে বাড়তি জ্বালানী প্রবেশ করানোর মাধ্যমে অত্যন্ত দ্রুত বিমানের গতি বৃদ্ধি করা যায়। তবে স্বল্প সময়ে গতি বাড়লেও এতে প্রচুর জ্বালানীর অপচয় হয়।

সে সময়কার অনেক বিমানের মতোই তু-১৪৪-এও অবতরণের সময় ব্রেকিং প্যারাশুট ব্যবহার করা হতো। দ্রুতগতির বিমানের অবতরণের সময় গতি কমানোর জন্য লেজের দিকে একটি বিশেষ প্যারাশুট বসানো থাকে। বর্তমানে অবশ্য যুদ্ধবিমান ছাড়া এগুলি আর ব্যবহৃত হয় না। মোট ১৬টি তু-১৪৪ বানানো হয়েছিল। কনকর্ডের মতো এই বিমানেরও নাকের ডগার অংশটুকু ওঠানামা করানো যেত। অবতরণ বা উড্ডয়নের সুবিধার জন্যেই বিশেষভাবে বানানো হয়েছিল বিমানটি।

সোভিয়েত কনকর্ড

তু-১৪৪ এর উড্ডয়ন রেকর্ড খুব একটা ভাল ছিল না। ১৯৭৭ সালে প্রথম বেসামরিক কাজে তু-১৪৪ ব্যবহার করা শুরু হয়। ১৯৭৮ সাল পর্যন্ত ৫৫টি যাত্রী পরিবহন ফ্লাইটসহ মোট ১০২ বার উড়েছে এই সোভিয়েত কনকর্ড। বিস্ময়কর গতি এবং অত্যাধুনিক ডিজাইন থাকলেও বিমানটির কিছু মারাত্মক ত্রুটি ছিল। এর ব্যবহার বন্ধ হয়ে যাওয়ার পেছনে অন্যতম বড় নিয়ামক হিসেবে কাজ করে সেগুলো।

তুপোলেভের ককপিট; Source: Wikimedia commons

গতির কারণে বিমানটির গোটা দেহ খুব দ্রুত গরম হয়ে যেত। তাই কেবিনের তাপমাত্রা ঠিক রাখার জন্য ব্যবহার করা হতো বিরাট সব শীতাতপনিয়ন্ত্রণ যন্ত্র। যন্ত্রগুলো থেকে খুব বেশি শব্দ হতো। তাছাড়া ৪টি প্রকাণ্ড ইঞ্জিন থেকেও বিকট শব্দ হতো। তুপোলেভ-১৪৪ এর যাত্রীরা নিজেদের মধ্যে স্পষ্টভাবে কথাও বলতে পারতো না তীব্র এই শব্দের কারণে।

তু-১৪৪ এর ভেতরে; Source: airliners.net

১৯৭৩ সালে অনুষ্ঠিত প্যারিস এয়ার শো-তে মারাত্মক এক দুর্ঘটনায় পড়বার কারণে তু-১৪৪ এর ব্যাপারে সোভিয়েতদের আগ্রহ কমে আসে। সে সময় কনকর্ড আর তু-১৪৪ এর প্রতিযোগিতা দেখবার আশায় প্যারিস এয়ার শোতে মানুষ, পর্যবেক্ষক, সামরিক  কর্তা থেকে শুরু করে পশ্চিমের বাঘা বাঘা লোকেরা জড়ো হয়েছিলেন। অন্যদিকে পরিস্থিতি আরো উত্তপ্ত হয়ে পড়ে যখন সোভিয়েত পাইলট মিখাইল কজলভ দম্ভভরে বলে বসেন, “একবার তু-১৪৪ আকাশে উড়ুক, তখন দেখবেন কি বিমান আমাদের হাতে এসেছে”। প্যারিস এয়ার শো’য়ের শেষ দিন কনকর্ড আকাশে উড়ে। বিমানটির পারফরম্যান্স আহামরি কিছু ছিল না। পরে যখন সোভিয়েত বিমানটি আকাশে উড়ে, এর গতি আর নিয়ন্ত্রণ দেখে সবাই উল্লাসে ফেটে পড়ে। কিন্তু হঠাৎ করেই বিমানটি মধ্য আকাশে টুকরো টুকরো হয়ে যায়, ধ্বংসাবশেষগুলো তীব্র বেগে মাটিতে আঘাত হানে। তু-১৪৪ এর পাইলটসহ সবাইতো বটেই, ভূমিতেও ১৫টি বাড়ি ধ্বংস হয় এবং ছয়জন মানুষ মারা যায়। আহত হয় প্রায় ৬০ জন।

এই বিমানটি প্যারিসে ধ্বংস হয়ে যায়; Source: wikimedia commons

পরবর্তীতে তদন্ত চালিয়ে বেশ কিছু কারণ দেখানো হয় এ দুর্ঘটনার পেছনে। অনেকের ধারণা তু-১৪৪ আকাশে উড়বার পর পরই একটি ফরাসী মিরেজ বিমান আকাশে উড়ে এবং গোপনে বিমানটির খুব কাছ থেকে ছবি তোলার চেষ্টা চালায়। তু-১৪৪ এর পাইলট এই ফরাসী বিমানটিকে ধোঁকা দিতে গিয়ে একসময় নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেন। অনেকে আবার ধারণা করেন তু-১৪৪ এত অসাধারণ বিমান ছিল না যতটা তার পাইলট ভেবেছিলেন। অতিরিক্ত কারসাজি দেখাতে গিয়েই বিমানের নিয়ন্ত্রণ হারান তিনি। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এমন একটি মারাত্মক দুর্ঘটনা সোভিয়েতদেরকে তু-১৪৪ এর ব্যাপারে প্রচণ্ড নিরাশ করে তোলে। ১৯৭৮ সালের পর আর কোনো সোভিয়েত তু-১৪৪ আকাশে ওড়েনি। ১৯৮৩ সালে পুরো প্রজেক্টটিই বাতিল করে দেওয়া হয়।

কেন তু-১৪৪ বাতিল হয়ে গেল

তু-১৪৪ এর বেশ আগে, তু-১০৪ বানানো হয়। পশ্চিমা বিশ্বের কাছে এটি ছিল এক বিস্ময়। কারণ সে সময় বিশ্বে আর কোনো জেট ইঞ্জিনযুক্ত বেসামরিক বিমান ছিল না। তু-১৪৪ বানাবার সময় সোভিয়েতরা চাইতেন এই বিমানটিও তু-১০৪ এর মতোই বিখ্যাত হোক। কাজেই অত্যাধুনিক সব প্রযুক্তি খুব তাড়াহুড়ো করে, ঠিকভাবে পরীক্ষা না করেই ব্যবহার করা শুরু হয়ে যায়।

সত্তরের দশকে তেলের দাম বিশ্বজোড়া অনেক বেড়ে যায়। তু-১৪৪ প্রচুর তেল খরচ করতো। ফলে সোভিয়েত বেসামরিক বিমান কর্তৃপক্ষ ‘এরোফ্লোট’ এই বিমান নিয়ে বিশেষ উৎসাহী ছিল না। বিমানটি যারা বানিয়েছিল, সেই তুপোলেভ ওকেবি ততদিনে মেতে উঠেছে তু-২৬ নামের একটি দূরপাল্লার বোম্বার এবং তু-১৫৪ নামের একটি প্যাসেঞ্জার জেট নিয়ে। বিশালকায় এবং ব্যয়বহুল বিমানটির পেছনে অর্থ ঢালতে কেউ রাজি ছিল না। সোভিয়েত কর্তারা কিছুদিন সামরিক কাজে বিমানটি ব্যবহারের কথা চিন্তা করলেও পরে সেখান থেকে সরে আসে। নব্বইয়ের দশকে নাসা একটি তু-১৪৪ কিনে বেশ কিছু পরীক্ষা নিরীক্ষা চালায়।

নাসা কিছুদিন ব্যবহার করেছিল তু-১৪৪; Source: nasa.gov

তু-১৪৪ কিংবা কনকর্ড তাদের সময়ের তুলনায় কতটা এগিয়ে ছিল তা একটা উপাত্ত দিলেই বোঝা যায়। সত্তরের দশকের এই বিমান দুটি ছাড়া আজতক সুপারসনিক গতিবেগের কোনো যাত্রীবাহী বিমান আকাশে ওড়েনি। তবে সে যাই হোক, বিমানটি হয়তো পরিবহন বা যাত্রীবাহী বিমান হিসেবে তেমন সফলতা পায়নি, কিন্তু সোভিয়েত বিমানবিদ্যার একটা চমৎকার নিদর্শন হয়ে ইতিহাসে টিকে আছে তুপোলেভ-১৪৪

ফিচার ইমেজ – cnn.com