আজারবাইজানে বলশেভিক শাসন প্রতিষ্ঠায় তুরস্কের ভূমিকা

১৯২০ সালের ২৭–২৮ এপ্রিল আজারবাইজান গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্রে স্থানীয় বলশেভিকরা একটি অভ্যুত্থান ঘটায় এবং তাদের ‘আমন্ত্রণে’ সোভিয়েত রুশ লাল ফৌজ আজারবাইজানের অভ্যন্তরে প্রবেশ করে রাষ্ট্রটির নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করে। ২৮ এপ্রিল আজারবাইজানি সরকার পদত্যাগ করে এবং স্থানীয় বলশেভিকদের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করে। এর মধ্য দিয়ে প্রতিষ্ঠিত হয় আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাধীন কিন্তু কার্যত সোভিয়েত রাশিয়ার সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সংযুক্ত ‘আজারবাইজান সোভিয়েত সমাজতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র’।

আজারবাইজানিরা জাতিগতভাবে বৃহত্তর তুর্কি জাতির অন্তর্ভুক্ত এবং জাতিগত, ভাষাগত ও সংস্কৃতিগত দিক থেকে তাদের সঙ্গে আনাতোলীয় তুর্কিদের সাদৃশ্য রয়েছে। বস্তুত ১৯১৮ সালের আগে আজারবাইজানিদের ‘ককেশিয়ান তাতার’ বা ‘ককেশিয়ান তুর্কি’ হিসেবেই অভিহিত করা হতো। বৃহত্তর তুর্কি জাতীয়তাবাদীরা বরাবরই তুর্কি ও আজারবাইজানি জাতিকে পরস্পরের অতি নিকট হিসেবে দাবি করে এসেছে, এবং প্রথম বিশ্বযুদ্ধে ওসমানীয় রাষ্ট্রের অংশগ্রহণের অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য ছিল ককেশাস ও মধ্য এশিয়ার জাতিগত তুর্কি–অধ্যুষিত অঞ্চলগুলোকে ওসমানীয় শাসনাধীনে নিয়ে আসা। কৌতূহলের বিষয় এই যে, বলশেভিকরা যখন তেলসমৃদ্ধ আজারবাইজানে নিজেদের কর্তৃত্ব স্থাপন করল এবং এর মধ্য দিয়ে সোভিয়েত রাশিয়ার সঙ্গে আজারবাইজানের ভাগ্যকে গেথে ফেলল, সেসময় এই ঘটনার প্রতি তুর্কিদের প্রতিক্রিয়া কী ছিল?

প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, ১৯১৭ সালে রুশ সাম্রাজ্যের পতনের পর আজারবাইজানিরা জর্জীয় ও আর্মেনীয়দের সঙ্গে মিলে ট্রান্সককেশিয়ান ফেডারেশন নামক একটি যুক্তরাষ্ট্র গঠন করেছিল। কিন্তু জাতি তিনটির মধ্যে তীব্র মতবিরোধের কারণে এই ব্যবস্থাটি পরিত্যক্ত হয় এবং ১৯১৮ সালের ২৮ মে আজারবাইজানিরা বৃহত্তর তুর্কি জাতীয়তাবাদী মুসাভাৎ দলের নেতৃত্বে স্বাধীন ‘আজারবাইজান গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র’ রাষ্ট্রটি প্রতিষ্ঠা করে। রাষ্ট্রটি ওসমানীয় সাম্রাজ্যের সঙ্গে মৈত্রী স্থাপন করে এবং ওসমানীয়দের একটি আশ্রিত রাষ্ট্রে পরিণত হয়। ১৯১৮ সালের সেপ্টেম্বরে ওসমানীয়, আজারবাইজানি ও অন্যান্য ককেশিয়ান মুসলিম জাতির সদস্যদের সমন্বয়ে গঠিত ‘ককেশিয়ান ইসলামি সৈন্যবাহিনী’ বাকু দখল করে নেয় এবং তেলসমৃদ্ধ শহরটিকে আজারবাইজানের নিয়ন্ত্রণাধীনে নিয়ে আসে।

বাকুর যুদ্ধে নিহত ওসমানীয় সৈন্যদের স্মরণে আজারবাইজানের বাকুতে নির্মিত স্মৃতিস্তম্ভ; Source: Wikimedia Commons

কিন্তু ১৯১৮ সালের অক্টোবরে ওসমানীয় সাম্রাজ্য প্রথম বিশ্বযুদ্ধে পরাজিত হয় এবং মিত্রশক্তির কাছে আত্মসমর্পণ করে। এ সময় ব্রিটিশ সৈন্যরা বাকু দখল করে নেয়। তারা আজারবাইজানি সরকারের সঙ্গে সহযোগিতা করে এবং ওসমানীয় রাষ্ট্রের পতনের প্রেক্ষাপটে আজারবাইজানি সরকার ব্রিটেনসহ মিত্রশক্তির সঙ্গে সুসম্পর্ক গড়ে তোলার উদ্যোগ নেয়। ১৯১৯ সালের আগস্টে ব্রিটিশ সৈন্যরা বাকু ত্যাগ করে, কিন্তু আজারবাইজান ও মিত্রশক্তির মধ্যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় থাকে।

এদিকে এসময় রুশ সাম্রাজ্যের ধ্বংসাবশেষের ওপরে প্রতিষ্ঠিত বলশেভিক–নিয়ন্ত্রিত সোভিয়েত রাশিয়া বলশেভিকবিরোধী বিভিন্ন শক্তি এবং মিত্রশক্তির বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত ছিল। অন্যদিকে, এ সময় ওসমানীয় রাষ্ট্রের কঙ্কালের ওপরে তুর্কি জাতীয়তাবাদী–নিয়ন্ত্রিত ‘গ্র‍্যান্ড ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলির সরকার’ বা ‘আঙ্কারা সরকার’ তুরস্কের স্বাধীনতা রক্ষার জন্য মিত্রশক্তির বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত ছিল। অর্থাৎ, রুশ বলশেভিক ও তুর্কি জাতীয়তাবাদীদের মধ্যে আদর্শিক দিক থেকে পার্থক্য থাকলেও তারা কার্যত একই শত্রুর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করছিল, এবং এই প্রেক্ষাপটে তাদের মধ্যে এক ধরনের বিনিময়ভিত্তিক মৈত্রী স্থাপিত হয়।

কিন্তু রুশ বলশেভিক বা তুর্কি জাতীয়তাবাদীদের পক্ষে সরাসরি একে অপরকে সহায়তা করা সম্ভব ছিল না, কারণ এ সময় সোভিয়েত রাশিয়া ও তুরস্কের মধ্যে কোনো সাধারণ সীমান্ত ছিল না। উত্তর ককেশাস অঞ্চলে তখনো বলশেভিক শাসনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ চলছিল, এবং ট্রান্সককেশাসে তিনটি স্বাধীন রাষ্ট্র (আজারবাইজান, জর্জিয়া, আর্মেনিয়া) অবস্থান করছিল। মিত্রশক্তি, বিশেষ করে ব্রিটিশরা, চাচ্ছিল ট্রান্সককেশিয়ান রাষ্ট্রগুলোকে রুশ বলশেভিক ও তুর্কি জাতীয়তাবাদীদের মধ্যবর্তী ‘কর্ডন’ বা ‘বেড়া’ হিসেবে ব্যবহার করতে। এর মধ্য দিয়ে তারা রুশ বলশেভিকদের পতন ঘটাতে এবং নিজেদের মধ্যে তুরস্কের বিভাজন করতে ইচ্ছুক ছিল।

আজারবাইজান গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্রের পতাকা। বর্তমানে এটিকে আজারবাইজানের জাতীয় পতাকা হিসেবে গ্রহণ করা হয়েছে; Source: Wikimedia Commons

এক্ষেত্রে আজারবাইজানের ব্রিটিশপন্থী মুসাভাৎ সরকারও সোভিয়েত রাশিয়া ও তুরস্কের মধ্যে সরাসরি সংযোগ স্থাপনের ক্ষেত্রে একটি বড় প্রতিবন্ধকতা হিসেবে কাজ করছিল। মাম্মাদ আমিন রাসুলজাদে এবং ফাতালি খান খোয়স্কির মতো আজারবাইজানি রাষ্ট্রনায়করা আজারবাইজানকে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে বজায় রাখতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ছিলেন এবং এজন্য আজারবাইজানি ভূখণ্ড দিয়ে বলশেভিক সৈন্যদের যাতায়াত করা সম্ভব ছিল না। ফলে রুশ বলশেভিকদের পক্ষে তুর্কি জাতীয়তাবাদীদের সরাসরি সহায়তা প্রদান করা সম্ভব হচ্ছিল না। এজন্য রুশ ও আজারবাইজানি বলশেভিকদের পাশাপাশি তুর্কি জাতীয়তাবাদীরাও আজারবাইজানের ব্রিটিশপন্থী মুসাভাৎ সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করার পক্ষপাতী ছিল।

প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, মিত্রশক্তির নিকট ওসমানীয় রাষ্ট্রের আত্মসমর্পণের পর আজারবাইজান ওসমানীয় সুরক্ষা হারায়, কিন্তু আঙ্কারা সরকার প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর তারা আঙ্কারার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তোলে। আঙ্কারা সরকার এসময় নিজেরাই শত্রুবেষ্টিত ও যুদ্ধরত অবস্থায় ছিল, ফলে আজারবাইজানকে কার্যকরী সুরক্ষা প্রদান করা তাদের পক্ষে সম্ভব ছিল না। কিন্তু তারপরেও ১৯১৯ সালের নভেম্বরে তুরস্ক ও আজারবাইজানের মধ্যে একটি গোপন চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এই চুক্তি অনুসারে বহুসংখ্যক তুর্কি সামরিক কর্মকর্তা আজারবাইজানের মাটিতে উপস্থিত ছিল এবং আজারবাইজানি সেনাবাহিনীতে অফিসার, প্রশিক্ষক ও সামরিক উপদেষ্টা হিসেবে কাজ করছিল। অর্থাৎ, আজারবাইজানে বিস্তৃত তুর্কি সামরিক উপস্থিতি ছিল এবং একে তুর্কি জাতীয়তাবাদীরা নিজেদের ও বলশেভিকদের লক্ষ্য পূরণে ব্যবহার করে।

১৯১৯ সালের নভেম্বরে আজারবাইজানে অবস্থানরত তুর্কি সামরিক কর্মকর্তারা একটি গোপন ও বেআইনি বৈঠকে জমায়েত হন। এই বৈঠকে তারা সর্বশক্তি দিয়ে মুসাভাৎ সরকারের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে আজারবাইজানি বলশেভিকদের সহায়তা করার জন্য প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হন এবং সেই মোতাবেক কাজ শুরু করে দেন। উদাহরণস্বরূপ, তুর্কি সামরিক কর্মকর্তা হুলুসি মামেদজাদে আজারবাইজানি সেনাবাহিনীর শিরভান রেজিমেন্টে কর্মরত ছিলেন। ১৯১৯ সালের শেষভাগ থেকে ১৯২০ সালের প্রথম ভাগ পর্যন্ত এই রেজিমেন্টটি লাঙ্কারান গ্যারিসনের প্রধান অংশ ছিল। মামেদজাদে আজারবাইজানি সৈন্যদের মধ্যে আজারবাইজানি বলশেভিকদের পক্ষে প্রচারণা চালান।

১৯২০ সালে প্রবর্তিত আজারবাইজান সোভিয়েত সমাজতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্রের পতাকা; Source: Wikimedia Commons

১৯২০ সালের প্রথম দিক নাগাদ এটি স্পষ্ট হয়ে উঠছিল যে, ব্রিটেন আজারবাইজানকে কূটনৈতিক সমর্থন দিচ্ছে ঠিকই, কিন্তু ট্রান্সককেশাসে সোভিয়েত রাশিয়া ও তুরস্কের মধ্যকার প্রাচীর টিকিয়ে রাখার জন্য এই অঞ্চলে সৈন্য প্রেরণ করতে তারা প্রস্তুত নয়। এর ফলে তুর্কি জাতীয়তাবাদী নেতারা প্রকাশ্যে ও স্পষ্টভাবে রুশ বলশেভিকদের সঙ্গে মৈত্রী স্থাপনের পক্ষে মত প্রকাশ করেন। ১৯২০ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি আঙ্কারা সরকারের নিয়ন্ত্রণ মুস্তফা কামাল পাশা (কামাল আতাতুর্ক) তুর্কি সেনাবাহিনীর পূর্বাঞ্চলীয় রণাঙ্গনের কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল কাজিম কারাবেকিরকে একটি সাঙ্কেতিক বার্তা প্রেরণ করেন। তিনি মন্তব্য করেন যে, মিত্রশক্তি তুরস্ককে ধ্বংস করার প্রচেষ্টা চালাচ্ছে এবং এটি এড়ানোর জন্য চরম পদক্ষেপ নিতে তারা বাধ্য হচ্ছেন।

আতাতুর্ক কারাবেকিরকে সৈন্য সমাবেশ করে ‘ট্রান্সককেশাস প্রাচীর’ ভেঙে ফেলার তোড়জোড় শুরু করতে নির্দেশ দেন। তিনি নির্দেশ দেন, কারাবেকির যেন জরুরি ভিত্তিতে ককেশিয়ান রাষ্ট্রগুলোর এবং বিশেষত আজারবাইজান ও দাগেস্তানের মতো মুসলিম রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করেন, এবং মিত্রশক্তির পরিকল্পনা সম্পর্কে তাদের মনোভাব পর্যবেক্ষণ করেন। তিনি আরো নির্দেশ দেন যে, ককেশিয়ান রাষ্ট্রগুলো যদি সোভিয়েত রাশিয়া ও তুরস্কের মধ্যে সরাসরি সংযোগ স্থাপনের ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টির সিদ্ধান্ত নেয়, সেক্ষেত্রে কারাবেকির যেন রুশ বলশেভিকদের সঙ্গে মিলে এই রাষ্ট্রগুলোর ওপর যৌথ আক্রমণ পরিচালনার ব্যাপারে সম্মতি প্রদান করেন।

১৯২০ সালের ১৭ মার্চ কাজিম কারাবেকির ওসমানীয় সমরনায়ক হালিল পাশা এবং নূরী পাশার কাছে একটি চিঠি প্রেরণ করেন। উল্লেখ্য, হালিল পাশা কুত-আল-আমারার যুদ্ধে ব্রিটিশদের পরাজিত করেছিলেন এবং নূরী পাশা বাকুর যুদ্ধে আর্মেনীয়দের পরাজিত করেছিলেন। তাঁদের কাছে প্রেরিত চিঠিতে কারাবেকির মন্তব্য করেন যে, তুর্কি সীমান্তে উপস্থিত হতে হলে রুশ বলশেভিকদের অবশ্যই তাৎক্ষণিকভাবে সমগ্র ককেশাস অঞ্চল দখল করে নিতে হবে। তিনি মত প্রকাশ করেন যে, রুশ বলশেভিকরা যদি ক্ষুদ্র একটি সৈন্যদল নিয়েও আজারবাইজানে আসে এবং আজারবাইজানি সৈন্যদের নিয়ে তুর্কি সীমান্তে পৌঁছায়, সেটিও তুর্কিদের স্বার্থে কাজ করবে। কারণ তুর্কি সীমান্তে বলশেভিক সৈন্যদের উপস্থিতি তুরস্কে মিত্রশক্তির গোটা সমীকরণই পাল্টে দিতে পারত। একই সঙ্গে কারাবেকির এটিও মন্তব্য করেন যে, আজারবাইজান, দাগেস্তান ও জর্জিয়ায় বলশেভিকরা ক্ষমতা দখল করতে পারলে সেটি তুরস্কের জন্য লাভজনক হবে।

১৯২০ সালে বলশেভিক আক্রমণের প্রাক্কালে আজারবাইজানি উপপ্রতিরক্ষামন্ত্রী আলী–আগা শিখলিনস্কি তুর্কিদের সঙ্গে একটি গোপন সামরিক চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন, কিন্তু তুর্কিরা চুক্তির শর্ত পালন করেনি; Source: Wikimedia Commons

তুর্কি প্রতিনিধিরা রুশ বলশেভিকদের কাছে প্রস্তাব করেন যে, আজারবাইজান দখল করার জন্য হালিল পাশার সৈন্যদলকে ব্যবহার করা হোক। হালিল পাশা দাগেস্তানে স্থানীয় মুসলিমদের সমন্বয়ে একটি সৈন্যদল গঠন করেছিলেন। রুশ বলশেভিকদের দ্বারা গঠিত ককেশিয়ান আঞ্চলিক কমিটি এই প্রসঙ্গে মন্তব্য করে যে, আজারবাইজান অভিযানের সময় সোভিয়েত রুশ লাল ফৌজের ইউনিটগুলোর সম্মুখভাগে হালিল পাশার মুসলিম সৈন্যদলকে রাখা উচিত, কারণ আজারবাইজানি সরকারি কর্মকর্তাদের মধ্যে হালিল পাশা ব্যাপক জনপ্রিয় ও প্রভাবশালী। এই অভিযানে তার অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে বাকুর তেলক্ষেত্র ও তেলের মজুদ ধ্বংস করে দেয়া থেকে আজারবাইজানি সরকারকে বিরত রাখা যাবে। উল্লেখ্য, একই সময়ে আঙ্কারা সরকার বাকুতে অবস্থানরত সকল তুর্কি নাগরিককে রুশ বলশেভিক–নিয়ন্ত্রিত ককেশিয়ান আঞ্চলিক কমিটির সকল নির্দেশ মেনে চলার জন্য নির্দেশনা প্রদান করে।

১৯২০ সালের ১৫ এপ্রিল কাজিম কারাবেকির এবং আজারবাইজানি উপপ্রতিরক্ষামন্ত্রী জেনারেল আলী–আগা শিখলিনস্কি ১৯১৯ সালের নভেম্বরে স্বাক্ষরিত গোপন তুর্কি–আজারবাইজানি চুক্তিতে একটি অতিরিক্ত গোপন সামরিক প্রোটোকল সংযোজন করেন। এই ধারা অনুযায়ী, তুরস্ক ও আজারবাইজানের মধ্যে কেউ তৃতীয় কোনো পক্ষ দ্বারা আক্রান্ত হলে রাষ্ট্রদ্বয় একে অপরকে সামরিক সহায়তা প্রদান করবে বলে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হয়। কিন্তু বাস্তবে এই চুক্তি আজারবাইজানের কোনো কাজে আসেনি, কারণ তুর্কিরা নিজেরাই আজারবাইজানে বলশেভিক আক্রমণের বন্দোবস্ত করে দিচ্ছিল।

হালিল পাশার নেতৃত্বাধীনে একদল তুর্কি সামরিক কর্মকর্তা সক্রিয়ভাবে আজারবাইজানের অভ্যন্তরে লাল ফৌজের অগ্রযাত্রায় সহায়তা করে। তারা স্থানীয় জনসাধারণের মধ্যে প্রচারণা চালায় এবং বলশেভিকদের বাধা প্রদান থেকে বিরত থাকার জন্য তাদের প্রতি আহ্বান জানায়। তাদের প্রচারণা আজারবাইজানের অ–বলশেভিক রাজনৈতিক শ্রেণির বড় একটি অংশ প্রভাবিত হয়। বিশেষত তুর্কি সামরিক কর্মকর্তা ও গুপ্তচররা আজারবাইজানের মধ্য দিয়ে সোভিয়েত রাশিয়া ও তুরস্কের মধ্যে একটি করিডোর নির্মাণের প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে যে প্রচারণা চালাচ্ছিল, তাতে ইত্তিহাদ দল এবং মুসাভাৎ দলের বামপন্থী অংশ বিশেষভাবে প্রভাবিত হয়।

আজারবাইজানের রাজধানী বাকুতে কামাল আতাতুর্ক স্মৃতিসৌধ। আজারবাইজানে বলশেভিক শাসন প্রতিষ্ঠায় আতাতুর্কের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল; Source: Wikimedia Commons

পরবর্তীতে আজারবাইজানি রাষ্ট্রনায়ক মাম্মাদ আমিন রাসুলজাদে বাকুতে তুর্কি গুপ্তচরদের বলশেভিকপন্থী প্রচারণার নমুনা উল্লেখ করেছেন। তার মতে, তুর্কিরা ইচ্ছাকৃতভাবে আজারবাইজানি জনসাধারণকে বিভ্রান্ত করছিল। তারা প্রচার করছিল, লাল ফৌজের যে সৈন্যদলটি আজারবাইজানের দিকে অগ্রসর হচ্ছে, সেটির কমান্ডার নিজাত–বেক নামক একজন তুর্কি, এই সৈন্যদলটির রেজিমেন্টগুলো তুর্কি সৈন্যদের দ্বারা গঠিত এবং এদের বড় একটি অংশ ভোলগা তুর্কিদের মধ্য থেকে এসেছে। তারা আরো প্রচার করছিল যে, অগ্রসরমান লাল ফৌজ আনাতোলিয়াকে সাহায্য করার জন্য যাচ্ছে, যারা ভয়ানক শত্রুদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করছে। তাই এই বাহিনীকে প্রতিরোধ করা তুরস্কের মুক্তিতে বাধা দেয়ার শামিল এবং বৃহত্তর তুর্কি ঐক্য ও মুসলিম উম্মাহর দৃষ্টিকোণ থেকে এটি বিশ্বাসঘাতকতার শামিল!

বলা বাহুল্য, আজারবাইজানি জনসাধারণের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ তুর্কি গুপ্তচরদের এই ধরনের প্রচারণায় প্রভাবিত হয়েছিল। এমনিভাবে সক্রিয় তুর্কি সহায়তায় বলশেভিক লাল ফৌজ ১৯২০ সালের ২৭–২৮ এপ্রিল আজারবাইজানের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে এবং সেখানে বলশেভিক শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়। ৩ মে ‘তুর্কি বলশেভিকদের পক্ষ থেকে আজারবাইজানি জনসাধারণের নিকট’ শিরোনামে একটি ঘোষণা আজারবাইজানে প্রচারিত হয়, এবং এই ঘোষণায় আজারবাইজানিদেরকে নতুন বলশেভিক সরকারকে সমর্থন প্রদানের জন্য আহ্বান জানানো হয়।

১৯২০ সালের ১৪ আগস্ট কামাল আতাতুর্ক তুরস্কের গ্র‍্যান্ড ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলিতে একটি ভাষণ প্রদান করেন এবং একটি বাক্যের মধ্য দিয়ে আজারবাইজানে বলশেভিক শাসন প্রতিষ্ঠায় তুর্কিদের ভূমিকাকে স্পষ্টভাবে তুলে ধরেন – “পূর্ব রণাঙ্গনে লাল ফৌজের সাফল্য, উত্তর ককেশাসে তাদের অপ্রতিরোধ্য অগ্রযাত্রা এবং আজারবাইজানে তাদের নিয়ন্ত্রণএগুলো ছিল আমাদের লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণ, আমাদের প্রভাব এবং আমাদের যোগ্যতার ফল!”

Related Articles