U-2 স্পাই প্লেন: স্নায়ুযুদ্ধ কালের যে বিমান আজও যুদ্ধ করে চলেছে

U-2 স্পাই প্লেন, স্নায়ুযুদ্ধের সময়কালের সেই টান টান উত্তেজনার দিনগুলো এখনো সমানে উপভোগ করে চলেছে সেই ১৯৫৫ সাল থেকে। মাঝে অবশ্য পেন্টাগনে কথাবার্তা চলছিলো যে বোধহয় সময় এসেছে U-2 কে অবসরে পাঠানোর। কিন্তু মার্কিন কংগ্রেস জানিয়ে দিয়েছে যে বিমানটি এখনো দরকারি! এবং আসলেই তাই, যে কারণে অনেক হালনাগাদকৃত বৈদ্যুতিক সেন্সরের শক্তিতে বলীয়ান নতুন মডেলের U-2 ব্যাপকভাবে দেখা গিয়েছে আফগান যুদ্ধের আকাশে।

এই বিমানের দায়িত্বের পরিধি অনেক, বিশ্বের এ মাথা থেকে অন্য মাথা পর্যন্ত কখনো পরমাণু ক্ষেপণাস্ত্রের সন্ধানে চষে বেড়ানো, কখনোবা পথের ধারে সাধারণ কোনো সেনা উপস্থিতির নজরদারি করা। দক্ষতায় যা যেকোনো মনুষ্যবিহীন ড্রোনকেও মাঝেমধ্যে ছাড়িয়ে যায়।

বিশ্বের সবথেকে চিত্তাকর্ষক চাকরির তালিকা করলে তার প্রথম দিকেই বোধহয় থাকবে U-2 বিমানের বৈমানিকের পদটি, এবং এটি একইসাথে অত্যন্ত কঠিন কাজও বটে। কারণ এই বিমানের রয়েছে মাত্র দুটি চাকা, যার উপরে অনেকটা সাইকেলের মতো ভারসাম্য রেখে ল্যান্ডিং আর টেক অফ করাতে হয় বিমানটিকে!

U-2 বিমানের পাশে বৈমানিক ফ্রান্সিস গ্রে পাওয়ারস; Source: doc-research.org

সেই পঞ্চাশের দশকে গোয়েন্দা তৎপরতার জন্যে তৈরি এই বিমানটির নাম নানাভাবে জড়িয়ে আছে ইতিহাসের পাতায়। কখনোবা প্রাক্তন সোভিয়েত ইউনিয়নের ভেতরে অনুপ্রবেশ করে ছবি তুলতে গিয়ে ভূপাতিত হওয়া, কখনো বিমানটি নিয়ে কূটনৈতিক ঝামেলা তৈরি হওয়া, আবার কখনো এরিয়া ৫১ এ পরীক্ষামূলক ফ্লাইট করতে গিয়ে এলিয়েন স্পেস ক্রাফট হিসেবে লোকচোখে ধরা পড়া- এ জাতীয় তুঘলকি ঘটনার শেষ নেই একে নিয়ে।

U-2 গোয়েন্দা বিমানের শুরুর কাহিনী

ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী উইন্সটন চার্চিলের একটি বিখ্যাত উক্তি ছিল যে, সোভিয়েত ইউনিয়ন পশ্চিম ইউরোপে ‘আয়রন কার্টেন’ বা লৌহ পর্দা তৈরি করেছে। বলাই বাহুল্য চার্চিল এটি মূলত রূপক অর্থে বলেছেন। সেসময় সোভিয়েত শাসন আসলেই ছিলো ব্যাপক গোপনীয়তার চাদরে ঢাকা। আর এই গোপনীয়তার চাদরের অপর পাশে আসলে কী চলছে তা জানতে মরিয়া ছিল প্রতিদ্বন্দ্বী মার্কিন সরকার।

সেসময় উপগ্রহের মাধ্যমে নজরদারির প্রযুক্তি ছিল না, এই কাজ করার একটাই রাস্তা ছিল, তা হলো ছবি তোলার প্রযুক্তিসম্পন্ন নজরদারি বিমানের মাধ্যমে গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ করা। এবং সেটাই বহু বছর যাবৎ চলে আসছিলো। কিন্তু সমস্যা হলো, সোভিয়েত ইউনিয়নের বিশাল ভূখণ্ডে এসব সাধারণ বিমান দিয়ে নজরদারি সম্ভব না। কারণ, সোভিয়েত মিগ যুদ্ধ বিমান আর তাদের উন্নত রাডার ব্যবস্থা এড়ানো তখন একেবারেই অসম্ভব ছিল। সোভিয়েত ইউনিয়নের গভীরে প্রবেশ করলে তা রাডারে ধরা পড়বেই, আর দ্রুতগতি সম্পন্ন মিগ বিমান সহজেই ধাওয়া করে পৌঁছে যাবে, ফলে যা দাঁড়াবে একটা আত্মঘাতী অভিযানে।

প্রকৌশলী কেলির সাথে বৈমানিক ফ্রান্সিস গ্রে; Source: U.S. Air Force

এই সীমাবদ্ধতা ঢাকতে সোভিয়েত সক্ষমতা নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি করে মার্কিনীরা দেখে যে, সোভিয়েতদের মিগ জঙ্গী বিমানগুলো সর্বোচ্চ ৪৫,০০০ ফুট উচ্চতায় পৌঁছাতে পারে। আর সোভিয়েতদের রাডার ব্যবস্থা (যেটি কিনা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে মার্কিনীরাই মিত্রশক্তি হিসেবে প্রদান করেছিলো) সর্বোচ্চ ৬৫,০০০ ফুট উচ্চতা পর্যন্ত নজরদারি করতে পারে।

প্রাথমিকভাবে পরিকল্পনা করা হয় যে, এমন কোনো বিমান দরকার যেটি অনেক উচ্চতা দিয়ে উড়তে সক্ষম। এতে বিমানটি রাডারে ধরা পড়বে না, কোনো প্রথাগত যুদ্ধবিমান যার নিকটে পৌঁছাতে পারবে না এবং কোনো বিমান বিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্রও ঐ উচ্চতায় গিয়ে আঘাত হানতে পারবে না।

ফলে তৎকালীন মার্কিন রাষ্ট্রপতি ডোয়াইট ডি. আইজেনহাওয়ারের নির্দেশে এই সমস্ত চাহিদা আর প্রয়োজনীয়তা মাথায় নিয়ে কাজে নেমে পড়লেন বিমান নির্মাণ প্রতিষ্ঠান লকহিড মার্টিনের প্রকৌশলীরা। ১৯৫৩ সালে লকহিডের বিখ্যাত প্রকৌশলী কেলি জনসন প্রথমে CL-282 নামে একটা গোয়েন্দা বিমানের নকশা করেন, যেটাতে ছিলো দীর্ঘ কাঠামো আর লম্বা ডানা, অর্থাৎ অনেকটা ‘গ্লাইডার’ হিসেবে বাতাসে ভেসে থাকার মতো সক্ষমতা ছিলো সেটির।

নিজের নকশা করা U-2 বিমানের পাশে প্রকৌশলী কেলি জনসন; Source: US Air Force

বিমানটিকে অতি উচ্চতায় উড্ডয়নের সক্ষমতা দানে হালকা হওয়া দরকার ছিলো, ফলে এতে কোনো অস্ত্র-গোলাবারুদ তো দূরের কথা, ল্যান্ডিং গিয়ার অর্থাৎ চাকা পর্যন্ত ছিলো না। এটিকে ‘বেলি ল্যান্ডিং’ বা ছেচড়িয়ে চলে অবতরণ করতে হতো। কিন্তু মার্কিন বিমান বাহিনী এই জাতীয় সেকেলে ব্যাপার নাকচ করে দেয়। কিন্তু সিআইএ প্রকৌশলীদের এ নিয়ে গবেষণা চালিয়ে যেতে বলে।

এরপর অনেক গবেষণা আর আমলাতান্ত্রিক ফাইল চালাচালির পর এই Cl-282  নামক বিমানের নকশা দিয়ে ১৯৫৫ সালে U-2 গোয়েন্দা বিমান তৈরি করা হয়। পুরো প্রকল্পটি ছিলো কঠোর গোপনীয় ব্যাপার, বিমানটি U দ্বারা নামকরণ করার কারণ হলো, U দিয়ে বোঝায় Utility অর্থাৎ পরিবহন বিমান। এটা যে গোয়েন্দা বিমান তা এই পরিবহন বিমান হিসেবে চিহ্নিতকরণের আড়ালে গোপন রাখা হয়।

বিমানের কাঠামো

পুরো বিমানের কাঠামো হালকা ধাতু দিয়ে তৈরি, বিমানের প্রকাণ্ড ১০৩ ফুট ডানা (গ্লাইড রেশিও ২৩:১) একে ‘গ্লাইডার’ এর মতো ভেসে থাকতে সাহায্য করে। বিমানটি একটি ‘প্রাট এন্ড হুইটনি জে৫৭’ টার্বো জেট ইঞ্জিন দ্বারা চালিত। সাধারণ জ্বালানী তেল অতি উচ্চতায় বাষ্পীভূত হয়ে যায়। এজন্য এই বিমানে বিশেষভাবে তৈরি নিম্ন হিমাঙ্কের জ্বালানী ব্যবহার করা হয়।

নকশায় দেখানো হচ্ছে বিমানের বিভিন্ন অংশ; Source: china defense forum

এতে কোনো অস্ত্র, সুরক্ষা সরঞ্জাম থাকে না। তার বদলে থাকে ক্যামেরা, ইলেক্ট্রো-অপটিক্যাল সেন্সর, ASARS-2 SAR রাডার, ডাটা আপলিংকের ব্যবস্থা ইত্যাদি সহ নানা রকম পর্যবেক্ষণ যন্ত্রপাতি। বিমানটি ৭০,০০০ ফুট উপর থেকেই স্থলভাগের হাই রেজুল্যুশন ছবি তুলতে পারে, এমনকি কোনো দেশের আকাশসীমা লঙ্ঘন না করেই। আপনি যখন এই লেখা পড়ছেন, তখন বিশ্বের কোথাও না কোথাও, একজন U-2 বৈমানিক উপর থেকে নজরদারি করে চলেছে, দিন-রাত ২৪ ঘণ্টাই।

উড্ডয়নের আগে ‘পোগোজ’ নামক চাকা লাগাচ্ছে এক কর্মী; Source: foxtort

বিমানের চাকা রয়েছে মাত্র দুটি, কারণ প্রচলিত তিন চাকা দেওয়ার জায়গা এখানে নেই। তার বদলে যেটি করা হয় তা হলো, দুই ডানার নিচে একটি করে ‘পোগোজ’ নামে দুটি চাকা, টেক অফ করার আগে লাগিয়ে দেয়া হয়। বিমান মাটি ছেড়ে ঠিক ওড়ার সময় চাকা দুটি রানওয়েতে খুলে পড়ে যায় যেগুলো সাথে সাথে কর্মীরা কুড়িয়ে আনে।

U-2 বিমানকে উড্ডয়নে সাহায্য করছে গাড়িতে থাকা কো পাইলট। কো পাইলট বাইরে থেকে কোনো সমস্যা দেখলে সাথে সাথে বেতার মারফত তা জানিয়ে দেয়; Source: auto blog

অবতরণেও বিমানের এই দুই চাকাই ভরসা! মাটি স্পর্শ করা পর বেশ কিছুক্ষণ বিমানটিকে সাইকেলের মতো ভারসাম্য রক্ষা করে রানওয়েতে চলতে হয়। টেক অফ এবং ল্যান্ডিং উভয় ক্ষেত্রেই পাইলটকে সাহায্য করেন আরেকজন কো-পাইলট, যিনি সাধারণত একটা সেডান গাড়ি নিয়ে রানওয়েতে বিমানের পাশাপাশি দ্রুত গতিতে চলতে চলতে রেডিওতে দরকারি নির্দেশনা দিয়ে সাহায্য করেন। টেক অফ আর ল্যান্ডিং এর পুরো ব্যাপারটি দেখতে পারেন দু’মিনিটের এই ক্লিপে।

U-2 বিমানকে ঘিরে নানা ঘটনা

১৯৫৫ সালে মার্কিন U-2 বিমান অসংখ্য বার সোভিয়েত অঞ্চলে অনুপ্রবেশ করেছে, এ নিয়ে সোভিয়েত আর মার্কিনীদের মধ্যকার দ্বৈরথ আর কূটনৈতিক টানাপোড়েন চলেছে অনেক দিন। এরপর ১৯৬০ সালের ১ মে সোভিয়েত ইউনিয়নের রাডারে একটি U-2 ধরা পড়লে তারা সেটি ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়ে ধ্বংস করে দেয়। বিমানের পাইলট ফ্রান্সিস গ্রে পাওয়ারস প্যারাসুট দিয়ে নেমে আসলে তাকে বন্দী করা হয়। পরবর্তীতে তাকে আমেরিকায় বন্দী এক সোভিয়েত গুপ্তচরের বিনিময়ে মুক্তি দেওয়া হয়। এই ঘটনা নিয়ে ২০১৫ সালে তৈরি হয় টম হ্যাংকস অভিনীত চমৎকার এক সিনেমা ‘ব্রিজ অব স্পাইজ’।

১৯৬০ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নে বিধ্বস্ত U-2 বিমান; Source: Getty

ঠিক ঐ সময়েই অনুষ্ঠিত হওয়া প্যারিসে আন্তর্জাতিক সম্মেলনে এ ঘটনা নিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আর সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যে উত্তপ্ত পরিস্থিতি তৈরি হয়, ফলে সম্মেলন আগেভাগেই শেষ হয়ে যায়। একইভাবে ১৯৬২ সালে আরেকটি U-2 বিমান কিউবায় মিশনে গেলে সেখানে অবস্থান নেওয়া সোভিয়েত বাহিনীর ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় বিধ্বস্ত হয়। এর ফলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আর সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যে পরমাণু যুদ্ধ বেঁধে যাওয়ার উপক্রম হয়।

ধ্বংসপ্রাপ্ত U-2 পরিদর্শনের পর সম্মেলনে আকাশসীমা লঙ্ঘনের অভিযোগ করছেন সোভিয়েত প্রেসিডেন্ট ক্রুশ্চেভ; Source: history, intelijen

U-2  গোয়েন্দা বিমান আর এরিয়া ৫১ দুটো অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। ষাটের দশক থেকেই এলিয়েন নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি করেন এমন মানুষেরা এরিয়া ৫১ এর আশেপাশে অদ্ভুত আকাশযান দেখতে পাওয়ার দাবি করে আসছেন। সম্প্রতি সিআইএ এক রিপোর্টে স্বীকার করেছে যে, এরিয়া ৫১ জায়গাটি তারা বিশেষভাবে প্রস্তুত করেছিলো U-2 গোয়েন্দা বিমানের পরীক্ষা চালানোর জন্যে।

এরিয়া ৫১ তে U-2 বিমানের পরীক্ষামূলক উড্ডয়নের প্রস্তুতি; Source: CIA

কেন U-2 বিমানটি এখনো প্রাসঙ্গিক?

স্যাটেলাইটের এই যুগে যেখানে স্যাটেলাইট দিয়েই সরাসরি নজরদারি করা যাচ্ছে, তার উপর ড্রোন প্রযুক্তি আছে। এখনো কেন ৬০ বছর আগের এই বিমান কাজ করে যাচ্ছে? কারণ স্যাটেলাইটের কিছু সীমাবদ্ধতা আছে, প্রতিনিয়ত কক্ষপথের পরিবর্তনের কারণে স্যাটেলাইট সবসময় সব জায়গার ছবি নিতে পারে না, তার উপর মেঘের কারণে কিছু জায়গা দৃশ্যমান থাকে না। সেখানে U-2 বিমান এসব ঝামেলা থেকে মুক্ত। ড্রোন দিয়ে নজরদারি ভালোভাবে করা গেলেও শত্রুর আক্রমণের নাগালের বাইরে থাকা, কম অপারেশনাল খরচ, সামরিক কৌশলগত সুবিধা ইত্যাদি নানা কারণে ড্রোনের পাশাপাশি U-2 গোয়েন্দা বিমানের ব্যবহার আজও চালু রয়েছে অত্যন্ত কার্যকারীতার সাথে।

মহাকাশচারীদের পরে, U-2 বৈমানিকরাই সর্বোচ্চ উচ্চতায় থাকেন; Source: defensemedianetwork

বাণিজ্যিক বিমানের দ্বিগুণ উচ্চতায় স্ট্রাটোস্ফিয়ার স্তর দিয়ে চলা এই বিমানের বৈমানিকদের বলা হয় ‘আধা মহাকাশচারী’। সেই ১৯৫৫ সাল থেকে দিন-রাতে সর্বদা এই পৃথিবী গ্রহের নানা প্রান্তে কোনো না কোনো আধা মহাকাশচারী নজর রেখে চলেছে মার্কিন সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব টিকিয়ে রাখতে।

ফিচার ছবি- live science

Related Articles