পশ্চিম সাহারা: একটি অঞ্চলের পরাধীনতার দুঃখগাথা

আফ্রিকা মহাদেশের উত্তর প্রান্তে আটলান্টিক মহাসাগরের তীর ঘেঁষে অবস্থিত একটি স্বাধীনতাকামী অঞ্চল পশ্চিম সাহারা। বর্তমানে অঞ্চলটির অধিকাংশ এলাকা মরক্কোর নিয়ন্ত্রণে থাকলেও পশ্চিম সাহারার স্বাধীনতাকামী সংগঠন ‘পোলিসারিও ফ্রন্ট’-এর গেরিলাদের সাথে দেশটির সশস্ত্র সংঘাতের ঘটনা চলমান রয়েছে।

বৈশ্বিক মানচিত্রে পশ্চিম সাহারা; image source : britannica.com

প্রায় ২,৬৬,০০০ বর্গ কিলোমিটার আয়তনের পশ্চিম সাহারা অঞ্চলটির বর্তমান জনসংখ্যা প্রায় ছয় লক্ষ। অঞ্চলটির জনসংখ্যার প্রায় চল্লিশ শতাংশ মানুষ বৃহত্তম শহর লাইয়ুনে বসবাস করে থাকে। অঞ্চলটির প্রায় আশি ভাগ এলাকা বর্তমানে মরক্কোর নিয়ন্ত্রণাধীন, যেটিকে মরক্কো দক্ষিণাঞ্চলীয় প্রদেশসমূহ হিসেবে দাবি করে থাকে এবং বাকি বিশ শতাংশ এলাকা পোলিসারিও ফ্রন্ট নিয়ন্ত্রিত, যেটি মুক্তাঞ্চল নামে পরিচিত। পোলিসারিও ফ্রন্ট পুরো অঞ্চলটি নিজেদের নিয়ন্ত্রণে এনে সেখানে ‘সাহরাউয়ি আরব গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র’ নামে একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে।

পশ্চিম সাহারা অঞ্চলটি ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত স্পেনের ঔপনিবেশিক শাসন ব্যবস্থার অধীনে ছিল। শুরুর দিকে স্পেন সরকার পশ্চিম সাহারা অঞ্চলটিকে আন্তর্জাতিক দাস বাণিজ্যের একটি বন্দর হিসেবে ব্যবহার করার জন্য সেখানে কিছু নাগরিক নিয়ে বসতি স্থাপন শুরু করেছিল। ১৭০০ সালের দিকে স্পেন সরকার কর্তৃক বাণিজ্যিকভাবে মৎস্য আহরণের মধ্য দিয়ে সেখানে তাদের অর্থনৈতিক কার্যক্রম শুরু করেছিল। এরপর আফ্রিকা মহাদেশে বাণিজ্য করা ঔপনিবেশিক শক্তিগুলোর মধ্যে ১৮৮৪ সালে জার্মানির বার্লিনে একটি সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। সে সম্মেলনের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, স্পেন সরকার পশ্চিম সাহারা অঞ্চলটি নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেয়। এভাবে পশ্চিম সাহারা অঞ্চলটিতে স্পেনের উপনিবেশ গড়ে ওঠে।

১৯৪৫ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সমাপ্তির পর থেকে বিভিন্ন ঔপনিবেশিক শক্তি উপনিবেশগুলো থেকে তাদেরকে গুটিয়ে নিতে শুরু করে। এভাবে বিভিন্ন অঞ্চল ঔপনিবেশিকতার শৃঙ্খল থেকে মুক্ত হয়। ১৯৬৫ সালে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ পশ্চিম সাহারা অঞ্চলে ঔপনিবেশিক শাসনের অবসান ঘটাতে স্পেন সরকারের কাছে আহবান জানায়। অন্যদিকে, পোলিসারিও ফ্রন্ট ১৯৭৩ সালের দিক থেকে স্পেনের ঔপনিবেশিক অপশাসনের অবসানের জন্য সংগ্রাম শুরু করেছিল। ফসফেট খনি, সমুদ্রবন্দর এবং ভৌগোলিক অবস্থানগত সুবিধার কারণে স্পেনের উপনিবেশ থাকা অবস্থায় আলজেরিয়া, মরক্কো এবং মৌরিতানিয়া- এই তিনটি দেশ পশ্চিম সাহারা অঞ্চলটিকে ঐতিহাসিকভাবে নিজেদের ভূখণ্ড দাবি করে সেটির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে পরস্পরের মধ্যে তীব্র বিরোধে জড়িয়ে পড়ে।

১৯৭৫ সালের শেষের দিকে, স্পেনের সামরিক শাসক ফ্রান্সিসকো ফ্রাঙ্কো নিজ দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক সংকটে পড়ে পশ্চিম সাহারা অঞ্চলটি থেকে উপনিবেশ সরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। আফ্রিকা মহাদেশের সর্বশেষ ইউরোপীয় উপনিবেশগুলোর মধ্যে একটি ছিল পশ্চিম সাহারা। সে বছরের ৬ নভেম্বর, মরক্কোর তৎকালীন বাদশাহ দ্বিতীয় হাসানের নির্দেশে প্রায় সাড়ে তিন লক্ষ মরক্কোর নাগরিক আকস্মিকভাবে জাতীয় পতাকা হাতে নিয়ে নিরস্ত্র অবস্থায় পশ্চিম সাহারা অঞ্চলটিতে প্রবেশ করেছিল। ঘটনাটি ঐতিহাসিক গ্রিন মার্চ নামে পরিচিত। মূলত পশ্চিম সাহারার বাসিন্দাদের মতামতের তোয়াক্কা না করে অঞ্চলটির নিয়ন্ত্রণ মরক্কোর হাতে নেওয়ার জন্য এটি করা হয়েছিল।

বাদশাহর নির্দেশে জাতীয় পতাকা হাতে নিয়ে পশ্চিম সাহারা অভিমুখে মরক্কোর নাগরিকদের পদযাত্রা; image source : steemit.com

এরপর ১৯৭৫ সালের ১৪ নভেম্বর, স্পেনের রাজধানী মাদ্রিদে পশ্চিম সাহারার ঔপনিবেশিক শাসনের অবসানে স্পেন, মরক্কো এবং মৌরিতানিয়া- এই তিন দেশের মধ্যে একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। চুক্তির শর্তানুযায়ী, পশ্চিম সাহারা অঞ্চলটির উত্তরাংশ মরক্কো এবং দক্ষিণাংশ মৌরিতানিয়ার মধ্যে ভাগ করে দেওয়া হয়। এই মাদ্রিদ চুক্তি পশ্চিম সাহারার স্বাধীনতাকামী সংগঠন পোলিসারিও ফ্রন্ট পুরোপুরি প্রত্যাখ্যান করে।

এরপর পোলিসারিও ফ্রন্ট আলজেরিয়ার সহায়তা নিয়ে ১৯৭৬ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি ‘সাহরাউয়ি আরব গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র’ নামে একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের ঘোষণা দিয়েছ। পোলিসারিও ফ্রন্ট আলজেরিয়ার টিনডুফ শহরে একটি প্রবাসী সরকার গঠন করে পশ্চিম সাহারা অঞ্চলে স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করার লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছে। আলজেরিয়া পোলিসারিও ফ্রন্টের গেরিলাদের সামরিক সহায়তা প্রদান করে থাকে। ১৯৮৪ সালে আফ্রিকা মহাদেশের দেশগুলোর সর্ববৃহৎ সহযোগিতা সংস্থা আফ্রিকান ইউনিয়নের পূর্ণাঙ্গ সদস্যপদ অর্জন করে, এ ঘটনার প্রতিক্রিয়ায় মরক্কো আফ্রিকান ইউনিয়ন থেকে পদত্যাগ করেছিল। যদিও প্রায় ৩৩ বছর পর ২০১৭ সালের ৩০ জানুয়ারি, মরক্কো আবারও আফ্রিকান ইউনিয়নে ফিরে এসেছে।

পোলিসারিও ফ্রন্টের গেরিলাদের প্রতিরোধ আক্রমণের কারণে মৌরিতানিয়ার সৈন্যদের ব্যাপক হতাহতের ঘটনা ঘটেছিল। ফলে মৌরিতানিয়া ১৯৭৯ সালের দিকে এসে পশ্চিম সাহারা অঞ্চলটির উপর নিজেদের দাবি প্রত্যাহার করে নিতে বাধ্য হয়েছিল। কিন্তু, মরক্কো পোলিসারিও ফ্রন্টের গেরিলাদের প্রতিরোধের মুখোমুখি হলেও কখনোই অঞ্চলটি থেকে নিজেদের সরিয়ে নিতে ইতিবাচক মনোভাব প্রকাশ করেনি। মরক্কো যেকোনো মূল্যে পশ্চিম সাহারা অঞ্চল নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে বদ্ধপরিকর।

ফলে পোলিসারিও ফ্রন্টের গেরিলাদের সাথে মরক্কোর সামরিক সংঘাত অব্যাহত থাকে। দু’পক্ষে বিপুল সংখ্যক হতাহতের ঘটনা ঘটে এবং ব্যাপক অবকাঠামোগত ক্ষয়ক্ষতি হয়। সংঘাতের কবল থেকে রক্ষা পেতে পশ্চিম সাহারা অঞ্চলের প্রায় লক্ষাধিক বাসিন্দা আলজেরিয়ার টিনডুফ শহরে স্থাপিত শরণার্থী শিবিরে বসবাস করতে বাধ্য হয়েছে।

স্বাধীনতাকামী সংগঠন পোলিসারিও ফ্রন্টের গেরিলা; image source : mei.edu

পোলিসারিও ফ্রন্টের গেরিলাদের আক্রমণ প্রতিহত করার জন্য মরক্কো সরকার ১৯৮০ সালে একটি নিরাপত্তা বেষ্টনী তৈরি করার কাজ শুরু করে, যেটি মরোক্কান পশ্চিম সাহারা দেয়াল নামে পরিচিত। ১৯৮৭ সালের ১৬ এপ্রিল, ছয় পর্যায়ে তৈরি ১,৭০০ মাইল দীর্ঘ এই বেলে প্রাচীরটির নির্মাণ কাজ শেষ করা হয়েছিল। কৌশলগতভাবে এই নিরাপত্তা বেষ্টনীটি মরক্কোর জন্য খু্বই গুরুত্বপূর্ণ। এর মাধ্যমে মরক্কোর সামরিক বাহিনী পোলিসারিও ফ্রন্ট নিয়ন্ত্রিত মুক্তাঞ্চল থেকে মরক্কোর দাবিকৃত দক্ষিণাঞ্চলীয় প্রদেশসমূহ পৃথক করেছে।

জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় ১৯৯১ সালে বিবাদমান দু’পক্ষের মধ্যে যুদ্ধবিরতি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। যদিও সে যুদ্ধবিরতি ভেঙে বিভিন্ন সময়ে দু’পক্ষ সংঘর্ষে লিপ্ত হয়েছে। সেই চুক্তিতে শান্তিপূর্ণভাবে সংকটের সমাধানের কথা বলা হয়েছিল, এমনকি একটি গণভোট আয়োজনের প্রতিশ্রুতিও এতে ছিল। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র ও ফ্রান্স সরকারের সমর্থনপুষ্ট মরক্কোর অসহযোগিতার কারণে গণভোট আয়োজন সম্ভব হয়নি। এ সংকটে রাশিয়া এখন পর্যন্ত নিরপেক্ষ অবস্থান বজায় রেখেছে, দেশটি দু’পক্ষের মধ্যে একটি শান্তিপূর্ণ সমাধান প্রত্যাশা করে। মরক্কো সরকার বারবার ভোটার তালিকাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে গণভোট আয়োজনে বাধা সৃষ্টি করে আসছে। গণভোটের আয়োজন ব্যাহত করে মরক্কো জাতিসংঘ স্বীকৃত পশ্চিম সাহারা অঞ্চলের বাসিন্দাদের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করে আসছে।

পশ্চিম সাহারার কণ্ঠস্বর আমিনাতু হায়দার; image source : elmundo.es

বর্তমান সময়ে আমিনাতু আলি আহমেদ হায়দার নামে এক মানবাধিকার কর্মী পশ্চিম সাহারা অঞ্চলের মানুষের কণ্ঠস্বরে পরিণত হয়েছেন। ১৯৬৬ সালের ২৪ জুলাই জন্মগ্রহণ করা এই মানবাধিকার কর্মী ‘কালেক্টিভ অভ সাহরাই হিউম্যান রাইটস ডিফেন্ডারস’ নামে একটি সংগঠনের মাধ্যমে সারা বিশ্বের মানুষের কাছে পশ্চিম সাহারা অঞ্চলে মরক্কোর দমন-পীড়ন এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিষয়গুলো তুলে ধরেছেন। এজন্য তাকে কয়েক দফা কারাবরণও করতে হয়। তিনি ২০০৯ সালে স্পেনের ল্যাঞ্জারোট বিমানবন্দরে অনশন ধর্মঘট করে পৃথিবী জুড়ে আলোচিত হন। ২০১৯ সালে সুইডেনের বার্ষিক রাইট লাইভলিহুড অ্যাওয়ার্ডসসহ বেশ কিছু আন্তর্জাতিক পুরস্কার লাভ করেছেন তিনি। আমিনাতু হায়দার তার অহিংস সংগ্রামের কারণে ‘পশ্চিম সাহারার গান্ধী’ নামেও পরিচিতি পেয়েছেন।

২০২০ সালের নভেম্বর মাসে পশ্চিম সাহারা অঞ্চলের পোলিসারিও ফ্রন্টের নিয়ন্ত্রিত গুয়েরগুয়েরাত এলাকাটির নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার জন্য মরক্কো সরকার আবারও সামরিক অভিযান শুরু করেছে। এই সামরিক অভিযান নিঃসন্দেহে শান্তিপূর্ণভাবে সংকট নিরসনের পথে বাধা তৈরি করবে। বিভিন্ন সময়ে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো পশ্চিম সাহারা অঞ্চলে মরক্কোর বিরুদ্ধে গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ তুলে সংঘাত বন্ধের জন্য আহবান জানিয়ে আসছে।

আলজেরিয়ার টিনডুফে অবস্থিত সংঘাতপূর্ণ পশ্চিম সাহারা অঞ্চল থেকে যাওয়া শরণার্থীদের আশ্রয়কেন্দ্র; image source : Reuters/Zohra Bensemra

দীর্ঘ সময় ধরে গোপন মিত্রতা বজায় রাখার পর বিদায়ী মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মধ্যস্থতায় গত ১০ ডিসেম্বর মরক্কো ইসরায়েলের সাথে সম্পর্ক ‘স্বাভাবিকীকরণ’-এর ঘোষণা দিয়েছে। এ ঘোষণার পর পরই যুক্তরাষ্ট্র একটি নতুন মানচিত্র প্রকাশ করেছে, যেখানে পশ্চিম সাহারা অঞ্চলকে মরক্কোর অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এমনকি যুক্তরাষ্ট্র মরক্কোর কাছে একশো কোটি ডলারের অস্ত্র বিক্রি করার পরিকল্পনা করছে। যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃক পশ্চিম সাহারা অঞ্চলে মরক্কোর অধিকারের ঘোষণা স্বাভাবিকভাবেই স্বাধীনতাকামী সংগঠন পোলিসারিও ফ্রন্টের কাছে অস্বস্তির কারণ হয়েছে। নতুন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের প্রশাসন পশ্চিম সাহারা ইস্যুতে বর্তমান অবস্থান থেকে সরে আসবে কি না, এটাই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হিসেবে দেখা দিচ্ছে।

Related Articles