জেলজাভা: ধ্বংসপ্রাপ্ত এক ভূগর্ভস্থ বিমানঘাঁটি

সায়েন্স ফিকশন সিনেমায় প্রায়ই আমরা দেখে থাকি অত্যাধুনিক মহাকাশযানের জন্য থাকে ভূগর্ভস্থ ঘাঁটি। কল্পকাহিনীতে দেখা এরকম ঘাঁটি পৃথিবীতে বিরল হলেও একবারে কোথাও যে নেই, তা কিন্তু নয়। শুধু এক জায়গাতেই কল্পকাহিনীর মতো এরকম মাটির নিচে বিমান ঘাঁটি ছিল, সেটি হলো সাবেক যুগোশ্লাভিয়ার জেলজাভা বিমান ঘাঁটি। ‘Objekat 505’ সাংকেতিক নামের এই বিমান ঘাঁটি হচ্ছে এযাবৎ কালের মধ্যে সবচেয়ে ব্যয়বহুল সামরিক প্রকল্পের ভেতর একটি।

রানওয়েতে যাওয়ার আগে ভূগর্ভস্থ টানেলের ভিতরে সারিবদ্ধ যুদ্ধবিমান; source: zeljava-lybi

১৯৪৮ সালের দীর্ঘ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষে মার্শাল টিটোর নেতৃত্বাধীন যুগোশ্লাভিয়ায় (বর্তমান বসনিয়ার বিহাক শহর) নির্মাণকাজ শুরু হয় এই বৃহৎ সামরিক প্রকল্পের, যেটাকে ‘মডার্ন মারভেল’ বললে মোটেও অত্যুক্তি করা হয় না। ‘৪৮ সালে শুরু হয়ে এর নির্মাণ কাজ শেষ হয় ১৯৬৮ সালে। বলে রাখা দরকার, এই বিমান ঘাঁটিটি নির্মাণ করা হয়েছিলো সুইডেনের ‘এফ৯-সেভ’ এর অনুকরণে, যেটিতে বিমানের হ্যাঙ্গার হিসেবে পাহাড় কেটে ভূগর্ভস্থ কক্ষ ব্যবহার করে হয়েছিলো, সুইডেনের সেই ঘাঁটিটি এখন একটি জাদুঘর

সমগ্র কমপ্লেক্সের নকশা; Source: warhistoryonline

যুগোশ্লাভ সরকার এটি তৈরিতে ৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার খরচ করেছিলো, যা ছিল দেশটির মোট এক বছরের সামরিক বাজেটের তিন গুণ। মূলত যুগোশ্লাভিয়া ছিল ক্রোয়েশিয়া, স্লোভেনিয়া, মেসিডোনিয়া আর বসনিয়া-হারজেগোভিনা এই চার দেশের সমন্বয়ে গঠিত একটি ফেডারেশন ভিত্তিক সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র, যেটির নেতৃত্বে ছিলেন মার্শাল টিটো। বিশ্বযুদ্ধের পরের পুঁজিবাদ ও সমাজতন্ত্রে বিভক্ত বিশ্বে যে স্নায়ু যুদ্ধ চলছিলো, এই বিমান ঘাঁটি ছিলো সেই যুদ্ধেরই একটি অংশ। ইউরোপের পুঁজিবাদী সমর্থক শত্রুরাষ্ট্রের সম্ভাব্য আক্রমণ প্রতিহত করাই ছিল এর উদ্দেশ্য।

প্রবেশমুখ থেকে শুরু হওয়া রানওয়ে, উপরে পাহাড়ের চূড়ায় রয়েছে রাডার; source: warhistoryonline

এই ঘাঁটিটির রয়েছে খুবই শক্তিশালী কৌশলগত অবস্থান। যুগোশ্লাভিয়ার গভীরে অসংখ্য সামরিক ঘাঁটি ও রাডারের আওতা পার হয়ে এর অবস্থান, তার উপরে আবার চারিদিকে সমান ব্যাসার্ধের দূরত্বে আরো পাঁচটি বিমান ঘাঁটি দ্বারা এটি পরিবেষ্টিত। ফলাফল হলো এমন এক অভেদ্য সামরিক বিমান ঘাঁটি, যার নাগাল পাওয়া শত্রুপক্ষের জন্যে দুঃসাধ্য।

বিমান ঘাঁটির সুবিধা সমূহ

১) ভূগর্ভস্থ ঘাঁটি যার সাংকেতিক নাম ‘অবজেক্ট ৫০৫’
২) পাঁচটি রানওয়ে
৩) সৈন্যদের থাকার জন্য একটি ব্যারাক
৪) পাহাড়ের চূড়ায় একটি রাডার
৫) মাটির উপরে বিভিন্ন কাজে ব্যবহারের জন্যে ৩৪টি ভবন

‘অবজেক্ট ৫০৫’ হলো ভূগর্ভস্থ ঘাঁটির মূল অংশ যেটা অনেকটা ইংরেজি অক্ষর M এর মতো। এতে তিনটি বড় হলঘর পরস্পরের সাথে সংযুক্ত, পাহাড় কেটে সুড়ঙ্গ আকারে তৈরি এসব হলঘর ও করিডোরের দেয়াল আবার কংক্রিট দ্বারা আস্তরণ দেওয়া, যাতে বাইরের আক্রমণের বিস্ফোরণের ধাক্কা প্রতিহত করতে পারে। পুরো কমপ্লেক্সটি মোট ৫৬টি দরজা দ্বারা সুরক্ষিত, তবে মূল প্রবেশমুখ চারটি । এই চারটি প্রবেশমুখের তিনটি ফটক ছিল ১০০ টন ওজনের, ৬০ সে.মি. পুরু, ২০মি. চওড়া ও ৪ মি. লম্বা। ফটক তিনটি বৈদ্যুতিক ব্যবস্থায় খোলে। বাকি একটি ফটক ৮০ সে.মি. পুরু, ২০ মি. চওড়া আর ৯ মি. লম্বা, এটি চলে হাইড্রোলিক ব্যবস্থায়। প্রাপ্ত তথ্যে যতটুকু জানা যায়, এই চারটি ফটক দ্বারা সুরক্ষিত ‘অবজেক্ট ৫০৫’ মোট ২০ কিলোটন পারমাণবিক বিস্ফোরণেও টিকে থাকতে পারে, যেটি নাগাসাকিতে বিস্ফোরিত বোমার সমান।

শ্রেণীকক্ষ ও দাপ্তরিক রুম সমূহ; source: warhistoryonline

ভূঅভ্যন্তরের তিনটি হলঘরে রাখা যেত মোট তিন স্কোয়াড্রন (৬০টি) মিগ ২১ জঙ্গীবিমান। ভেতরকার টানেলগুলোর মোট দৈর্ঘ্য প্রায় ৩,৫০০ মিটার। কমপ্লেক্সের ভেতরে আছে যোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কক্ষ, অপারেশন নিয়ন্ত্রণ কক্ষ, কন্ট্রোল টাওয়ার, ক্ষেপণাস্ত্র ও বোমার মজুদ কক্ষ, বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র, শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা, শ্রেণীকক্ষ ইত্যাদি। এতে আছে বড় একটি ডাইনিং হল ও রান্নাঘর, যেটি চলমানভাবে ১,০০০ লোকের খাবারের ব্যবস্থা করতে পারে; কমপ্লেক্সের রসদ ব্যবস্থাপনায় খাদ্য, জ্বালানী, গোলাবারুদ ইত্যাদি টানা ৩০ দিন চলার মতো মজুদ রাখতে পারে। জ্বালানী তেল সরবরাহ করা হয় একটি ভূগর্ভস্থ পাইপলাইনের মাধ্যমে, যেটি ২০ কিলোমিটার দূরের ‘পকোজ’ নামক পাহাড়ের নিকটের একটি সামরিক গুদাম।

বাংকার থেকে বেরিয়ে আসছে একটি Mig-21; source: atlasobscura

মাটির উপরে রয়েছে মোট পাঁচটি রানওয়ে, রানওয়ের সবকটিই ভূগর্ভস্থ বাংকারের প্রবেশ মুখ থেকেই শুরু হয়েছে। ফলে ঘাঁটির অভ্যন্তরের জঙ্গীবিমানগুলো বের হওয়ার সাথে সাথেই উড্ডয়নের জন্যে রানওয়েতে অবস্থান নিতে পারে। অবশ্য এছাড়াও মাটির উপরে রানওয়ের উপর দুটি জঙ্গীবিমান সর্বদা প্রস্তুত রাখা হয় তাৎক্ষনিক হামলা প্রতিহত করার জন্য।

ভ্রাম্যমাণ ক্ষেপনাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা; source: warhistoryonline

মাটির উপরে পুরো এলাকা জুড়ে ছড়িয়ে থাকত অসংখ্য স্বল্প পাল্লার 2K12’kub’ নামক ভ্রাম্যমাণ ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা, ট্র্যাকিং ও টার্গেটিং রাডার, ক্ষেপণাস্ত্র বিধ্বংসী ব্যবস্থা ইত্যাদি। রাডার ও যোগাযোগ কেন্দ্র ছিল ‘পিয়েসেভিসা’ পাহাড়ের চূড়ায়। সৈন্যদের ব্যারাক, গ্যারেজ, ওয়ার্কশপ ইত্যাদি ছিল ঘাঁটির ৩ কি.মি. দূরেই। এছাড়াও ছিল মিলিটারি পুলিশ স্টেশন আর একটি শিকার ও অবকাশযাপন কেন্দ্র, যেটি মাঝে মধ্যে সামরিক ও রাজনৈতিক নেতাদের অবসর কাটানোর জন্যে ব্যবহৃত হতো।

বিমান রক্ষণাবেক্ষণের ওয়ার্কশপ; source: atlasobscura

সামরিক কৌশলগত অবস্থান

অভিযান শেষে ফেরা জঙ্গীবিমানগুলোকে ঢুকিয়ে নেয়া হচ্ছে বাংকারে; source: balkanwarhistory

এই ঘাঁটির মূল সুবিধা হলো এর কৌশলগত অবস্থান। এটি যুগোশ্লভিয়ার গভীরে এবং বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ও অন্যান্য ঘাঁটি থেকে সমদূরত্বে অবস্থিত হওয়ায় যেকোনো পরিস্থিতিতে দেশের বিভিন্ন জায়গায় আক্রমণ প্রতিহত করার ক্ষমতা যেমন রয়েছে, তেমনি এই ঘাঁটি নিজে আক্রান্ত হলে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা অন্যান্য ঘাঁটি থেকে তাৎক্ষণিক সাহায্য পাওয়া যায়। পাহাড়ের চূড়ায় আছে ‘Celopek’ নামক রাডার ব্যবস্থা, যা ছিল সমগ্র যুগোশ্লাভিয়ার আকাশসীমা ও বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার মূল কেন্দ্র এবং নিরাপদ সামরিক যোগাযোগের নিয়ন্ত্রণ কক্ষ। ঘাঁটিটি নিয়ে সেসময় বিশ্বের গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর ছিল নানা জল্পনা-কল্পনা। সাম্প্রতিক সিআইএ এর প্রকাশ করা গোপন নথিতে দেখা যায় প্রকল্পটির নির্মাণ কাজ শুরু থেকেই এটিকে তদারকিতে রেখেছিলো তারা।

ঘাঁটিতে ছিল এরকম মোট চারটি প্রবেশমুখ; source:PVZ

অতঃপর ধ্বংস…

ঘাঁটিটি তৈরি করা হয়েছিলো বহিঃশত্রুর আক্রমণ থেকে দেশকে রক্ষা করার জন্য, কিন্তু পরিহাসের বিষয় হলো এর পরিকল্পনাকারীদের মাথায় বোধহয় গৃহযুদ্ধের সম্ভাবনার কথা মাথায় ছিল না। জেলজাভা বিমানঘাঁটিটি ধ্বংস করতে কোনো বিদেশী আক্রমণের দরকার হয়নি। ১৯৯১ সালে যুগোশ্লাভ যুদ্ধ শুরু হলে সার্ব, ক্রোয়েশীয়, বসনিয়ান এসব জনগোষ্ঠী নিজেদের ভেতর জাতিগত দ্বন্দ্বের কারণে গৃহযুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে। ১৯৯১ সালে যুগোশ্লাভ সেনাবাহিনী ঘাঁটি থেকে যুদ্ধবিমান, সরঞ্জাম ও সেনা প্রত্যাহার করা সিদ্ধান্ত নেয়। পড়ে থাকা ফাঁকা ঘাঁটি যেন শত্রুবাহিনী ব্যবহার করতে না পারে সেজন্যে রানওয়ে বোমা বিস্ফোরণ ঘটিয়ে ধ্বংস করে দেওয়া হয়। বিস্ফোরণটি করা হয়েছিল রানওয়ের নিচের ফাঁকা জায়গায় বিস্ফোরক ভর্তি করে (রানওয়ে তৈরির সময় উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে নকশায় এরকম ব্যবস্থা রাখা হয়েছিলো ভবিষ্যৎ প্রয়োজনের কথা মাথায় রেখে)।

পরিত্যাক্ত অবস্থায় এখন আগাছায় প্রবেশপথের অস্তিত্বই বোঝা মুশকিল; source: atlasobscura

যুদ্ধ বিমান প্রবেশপথের বর্তমান অবস্থা; source: atlasobscura

এর ঠিক এক বছর পর যুদ্ধরত আরেক পক্ষ সার্বিয়ান সেনাবাহিনী ১৯৯২ সালের ১৬ মে ভূগর্ভস্থ পুরো কমপ্লেক্স প্রায় ৫৬ টন বিস্ফোরক ভর্তি করে আরেকটি বিস্ফোরণ ঘটায়। বিস্ফোরণটি এতো শক্তিশালী ছিলো যে, নিকটবর্তী বিহাক শহর কেঁপে উঠেছিলো, বিস্ফোরণের ছয় মাস পরও ধোঁয়া বের হচ্ছিলো। এই বিস্ফোরণের ফলে কমপ্লেক্সটি পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে যায়।

বিস্ফোরণে ধ্বংস হয়ে যাওয়া নিউক্লিয়ার ব্লাস্টডোর; source: Ballot

শতাব্দীর অন্যতম ব্যয়বহুল ও সুরক্ষিত সামরিক ঘাঁটিটি এখন এক ধ্বংসস্তুপ, জায়গাটি কৌতুহলী গবেষকদের জন্যে অত্যন্ত আগ্রহের জায়গা, এটি এখনো অবিস্ফোরিত মাইন দ্বারা পূর্ণ থাকায় ব্যাপক সতর্কতা নিয়ে এতে প্রবেশ করতে হয়। অত্যন্ত বিপদজনক এই এলাকাটি এখন সামরিক বাহিনীর সৈন্যদের বোমা ও মাইন অপসারণ করার প্রশিক্ষণ দেওয়ার কাজে ব্যবহৃত হয়।

ফিচার ইমেজ- warhistoryonline

Related Articles