এই লেখাটি লিখেছেন একজন কন্ট্রিবিউটর।চাইলে আপনিও লিখতে পারেন আমাদের কন্ট্রিবিউটর প্ল্যাটফর্মে।

হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টাল, ঢাকার বুকে চোখধাঁধানো এক পাশ্চাত্যের জৌলুস। সারা পৃথিবীর সাংবাদিক, শিল্পী, সরকারি ও বেসরকারি প্রতিনিধিদের ভিড় লেগে আছে হামেশাই। পূর্ববাংলায় আন্তর্জাতিক কর্মপরিকল্পনার কেন্দ্র বললেও ভুল বলা হবে না। বাংলার বিদ্রোহ ও সংগ্রামকে বিশ্বের সামনে আনতে প্রয়োজন এরকম একটা জায়গাতে আক্রমণ। আর সেই পথটাই বেছে নিলো কয়েকজন দুঃসাহসী তরুণ। জুন মাসের ৯ তারিখ বিশ্বব্যাংকের প্রতিনিধি আসলে পরপর তিনটি গ্রেনেড ছুড়ে জানান দিলো নিজেদের অস্তিত্ব। দ্বিতীয় দফায় বিস্তৃতভাবে আক্রমণ চালানো হয় ১১ আগস্ট বিকেলে। হোটেলের বাথরুমে ২৮ পাউন্ড প্লাস্টিকের বিস্ফোরণে নড়ে উঠে গোটা ভবন।

ক্র্যাক প্লাটুন: ‍মুক্তিযুদ্ধের তারুণ্য ভরা এক অধ্যায়; © Shumon Ahmed/ Bangladesh Old Photo Archive.

গল্পের নায়ক সামাদ ও বকর অনেক আগে থেকেই যে প্ল্যান করে ঢুকেছিলেন ভেতরে। সাথে ছিল মায়া, আলম, জিয়াউদ্দীনসহ আরো কয়েকজন। বিস্ফোরণে ভেঙে পড়লো ভেতর এবং লাউঞ্জে লাগানো দরজা। টুকরো টুকরো হয়ে গেলো লাউঞ্জ এবং আশেপাশের কাচ। আহত বেশ কয়েকজন। পরের দিনই আন্তর্জাতিক মিডিয়াতে মুক্তিবাহিনীর তৎপরতা সচিত্র প্রকাশিত হলো গুরুত্বের সাথে। অর্থাৎ মিশন সফল। এমন অনেক রোমাঞ্চকর গল্পের জন্ম দিয়েছে গেরিলারা। ঢাকার একঝাঁক মেধাবী আর দুঃসাহসী ছেলে নিয়ে গঠিত এই গেরিলা দলের নাম ‘ক্র্যাক প্লাটুন’। 

জন্মকথা

১৯৭১ সাল। পাকিস্তান সরকার মুক্তিযোদ্ধাদের দুষ্কৃতিকারী বলে প্রচার করে যাচ্ছে রাত-দিন। বহির্বিশ্ব কোনোভাবেই যেন বাংলার স্বাধীনতা সংগ্রাম টের না পায়। ঢাকা ছিল বাড়তি নিরাপত্তার চাদরে বেষ্টিত। মুক্তিযুদ্ধে ২নং সেক্টর এবং কে ফোর্সের প্রধান মেজর খালেদ মোশাররফ বিষয়টি গুরুত্বের সাথে নিলেন। অন্তত পাক সরকারের এই মিথ্যাচার সমগ্র বিশ্বের জানা দরকার। দেশে বা বিদেশের বাঙালিরা এবং বাঙালির মিত্ররা যেন যুদ্ধটাকে সমগ্র বাঙালির লড়াই বলেই গণ্য করে। আর তাই প্রচণ্ড আত্মবিশ্বাসী ও মেধাবী তরুণদের নিয়ে তৈরি করলেন এক দুর্ধর্ষ গেরিলা দল। তাকে সহযোগিতা করেছেন এটিএম হায়দার।

ঢাকায় গেরিলা গঠনের চিন্তাটা খালেদ মোশাররফের মস্তিষ্কপ্রসূত; © kforcebd.com

এটিএম হায়দারের নেতৃত্বেই ভারতের মেঘালয়ে ‘মেলাঘর’ ক্যাম্পে প্রশিক্ষণ নেয় দলটি। গ্রেনেড ছোড়া থেকে শুরু করে ঝটিকা আক্রমণ, অতর্কিত ত্রাস সৃষ্টি করা এবং ‘হিট এন্ড রান’। আরবান গেরিলা যুদ্ধের সব কৌশলই ভালোভাবে রপ্ত করানো হয়। হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে অপারেশনের খবর খালেদ মোশাররফের কাছে পৌঁছালে গর্ব করে তিনি বলেছিলেন, “These are Crack People.”। সেই থেকেই প্লাটুনের নাম করা হয় ‘ক্র্যাক প্লাটুন’।

দুঃসাহসী মুখগুলো

ক্র্যাক প্লাটুনের প্রায় সবাই ছিল ঢাকার সম্ভ্রান্ত ঘরের মেধাবী তরুণ। অনেকেই উচ্চশিক্ষার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছেন; অনেকে উচ্চশিক্ষা অসমাপ্ত ফেলে চলে এসেছেন মাতৃভূমিকে রক্ষা করার জন্য। সংখ্যার সঠিক হিসাব পাওয়া কঠিন। মেলাঘর থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে প্রাথমিকভাবে ১৭ জন ঢাকা আসেন। সময়ের সাথে সাথে দাঁড়ায় শতাধিকে। সেই সব ত্যাগী ও প্রিয়মুখের অনেকগুলোই এখনো অচেনা।

শহীদ রুমী ইমাম

কথা ছিল আমেরিকায় ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে পড়তে যাবেন। তার পরিবর্তে চলে গেলেন ‘মেলাঘর’ ক্যাম্পে মুক্তিযুদ্ধের গেরিলা প্রশিক্ষণ নেবার জন্য। মা জাহানারা ইমামকে রাজি করাবার সময় বলেছিলেন, “আম্মা, দেশের এই রকম অবস্থায় তুমি যদি আমাকে জোর করে আমেরিকায় পাঠিয়ে দাও; হয়তো আমি যাবো শেষ পর্যন্ত। কিন্তু আমার বিবেক চিরকালের মতো অপরাধী করে রাখবে আমাকে”। 

ইঞ্জিনিয়ার না হয়ে মাতৃভূমির সার্বভৌমত্বের জন্যই লড়াইকেই বেছে নিলেন রুমী; © Facebook/ Guerrilla 1971

শেষ অব্দি জুনের ১৪ তারিখ রুমী প্রশিক্ষণের জন্য মেলাঘরে গেলেন। ঢাকা আসার অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য ছিল সিদ্ধিরগঞ্জ পাওয়ার স্টেশনে হামলা। তার পরিচালনায় বেশ ঝুঁকিপূর্ণ কিছু আক্রমণের মধ্যে ধানমন্ডি রোডের আক্রমণ অন্যতম। ১৯৭১ সালের ২৯শে আগস্ট নিজের বাড়িতে কাটান। সেই রাতেই বেশ কয়েকজন গেরিলা যোদ্ধাসহ ধরা পড়ে যান পাকিস্তানি বাহিনীর হাতে। চরম অত্যাচারের পরেও রুমীর থেকে কোনো তথ্য বা কারো নাম বের করা যায়নি। দুই দিন নির্যাতনের পর পরিবারের অন্যদের ছেড়ে দেয়া হলেও ছাড়া হয়নি রুমীকে। বাবা শরীফ ইমাম জানতে চাইলে কর্নেল জানায়, পরের দিন রুমী ফিরবে। সেই পরের দিনটি আর আসেনি।

শহীদ আজাদ

গোপন সূত্রে পাকিস্তানিরা জানতে পারে ঢাকার এক বাড়িতে গেরিলাদের অবস্থান। ৩০শে আগস্ট হামলা চালালে ধরা পড়ে যায় ক্র্যাক প্লাটুনের একদল তেজস্বী যোদ্ধা। তাদের মধ্যে মাগফার উদ্দিন চৌধুরী আজাদ একজন। ইস্কাটনে কয়েক বিঘা জমিতে তাদের রাজকীয় বাড়ি। বাবা-মায়ের একমাত্র ছেলে আজাদ। বাবা দ্বিতীয় বিয়ে করলে বাড়ি ত্যাগ করে মা-ছেলে। যুদ্ধ চলাকালে আজাদ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ থেকে সবে মাস্টার্স শেষ করেছে। মায়ের অনুমতি নিয়েই নাম লেখালো ‘ক্র্যাক প্লাটুন’-এ। আস্তে আস্তে তার বাড়ি হয়ে উঠলো অস্ত্র আর গোলাবারুদে পূর্ণ গেরিলাদের ক্যাম্প। 

আর কোনো দিন ফিরে আসেনি আজাদ; © bangalianaa.com

আজাদকে ধরে নিয়ে যাওয়া হলে মা সাফিয়া বেগম রমনা থানায় দেখা করতে যান। ছেলের অবস্থা দেখে নিজেকে সামলে নিয়ে বলেছেন, “শক্ত হয়ে থেকো বাবা। কোনো কিছু স্বীকার করবে না।” মিলিটারিদের নির্যাতনে ক্লান্ত আজাদ মায়ের কাছে ভাত খেতে চেয়েছিল। মা ভাত নিয়ে এসে আর পাননি ছেলেকে। আর কোনোদিনই ফিরে আসেনি বাবা-মায়ের সেই আদরের ছেলেটি।

১৯৮৫ সাল অব্দি বেঁচে ছিলেন আজাদের মা। ঠিক ১৪ বছর পর আরেক ৩০ আগস্ট মৃত্যু ঘটে। এই দীর্ঘ সময়ে কখনো ভাত খাননি এই মহীয়সী নারী; কেবল থেকেছেন একবেলা রুটি খেয়ে। কারণ একমাত্র ছেলে আজাদ ভাত চেয়েও খেতে পারেনি। চৌদ্দটা বছর কোনো বিছানাতেও ঠেকাননি পিঠ; মেঝেতে শুয়েছেন। কারণ তার ছেলে নাখালপাড়া ড্রাম ফ্যাক্টরি সংলগ্ন এমপি হোস্টেলের মিলিটারি টর্চার সেলে বিছানা পায়নি।      

শহীদ আবু বকর

১৯৫৩ সালে সৈয়দপুরে জন্ম নেয়া আবু বকর ছিল বাবা মায়ের পঞ্চম সন্তান। ১৯৭১ সালে কায়েদ-ই আজম (বর্তমানে সোহরাওয়ার্দী কলেজ) কলেজ থেকে ইন্টার পাশ করে ভর্তি হলো বিএসসিতে। পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর অফিসার্স কোর্সে অপেক্ষাতেও ছিলেন। ২৫শে মার্চে পাক বাহিনীর বর্বরতার ঘটনা বদলে দেয় জীবনের গতিপথ। মাত্র আঠারো বছর বয়সেই সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললো ‘ক্র্যাক প্লাটুন’-এ যোগ দিতে। হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে দ্বিতীয় দফার অপারেশনে বকরই ছিলো প্রধান নায়ক। থেকেছে আরো সফল কিছু হামলায়। আগস্টের ৩০ তারিখে পাকিস্তানি বাহিনীর হাতে ধরা পড়ে যাওয়া মুখগুলোর মধ্যে বকরও একজন।

শহীদ জুয়েল

আব্দুল হালিম চৌধুরী জুয়েল বিখ্যাত ছিলেন ক্রিকেটার হিসাবে। জন্ম ১৯৫০ সালের ১৮ জানুয়ারি মুন্সিগঞ্জ জেলায় শ্রীনগর উপজেলার পাইকশা গ্রামে। ১৯৬৭ সালে জগন্নাথ কলেজ থেকে পড়াশোনা শেষ করে একটি কেমিক্যাল কোম্পানিতে যোগ দেন। পাশাপাশি চলতো ক্রিকেট। প্রথম শ্রেণীর ক্রিকেটার হিসেবে খেলেছেন মোহামেডান স্পোর্টিং এবং আজাদ বয়েজ ক্লাবের হয়ে। দুর্দান্ত উইকেটকিপার এবং চৌকস ব্যাটসম্যান হিসেবে তার খ্যাতি তখন তুঙ্গে। পাকিস্তানের জাতীয় দলে ডাক পেলেও গেলেন না। ৩১ মে গেরিলা প্রশিক্ষণে যাবার আগে মাকে একটা ছবি হাতে দিয়ে বলেছিলেন, “আমি যখন থাকবো না; এই ছবিতেই আমাকে পাবে।”

মাতৃভূমির জন্য ব্যাট ছেড়ে দিয়ে হাতে তুলে নেন অস্ত্র; ©  Bhorer kagoj

ট্রেনিং শেষে ঢাকায় ক্র্যাক প্লাটুনের একজন হিসেবে যুদ্ধে নামেন। সাহসিকতার পরিচয় দেন ফার্মগেট, এলিফ্যান্ট রোড পাওয়ার স্টেশন, যাত্রাবাড়ী ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আশুগঞ্জ পাওয়ার স্টেশনের গেরিলা অপারেশনে। ১৯ আগস্ট সিদ্ধিরগঞ্জ পাওয়ার স্টেশন অপারেশনের সময় শত্রুপক্ষের আঘাতে আহত হন জুয়েল। নেয়া হয় মগবাজারের প্রখ্যাত সুরকার আলতাফ মাহমুদের বাসায় চিকিৎসার জন্য। আল-বদর নেতার সহযোগিতায় পাক বাহিনীর হাতে ধরা পড়ে যান তিনি। নির্মম অত্যাচার চালানো হয় ক্র্যাক প্লাটুনের নানা তথ্য এবং সদস্যদের পরিচয় জানার জন্য। চরম নিষ্ঠুরতায় কেটে ফেলা হয় হাতের আঙুল; যা দিয়ে স্বাধীন বাংলাদেশের ওপেনিং ব্যাট ধরতে চেয়েছিলেন জুয়েল। ৩১ আগস্টের পরে তার আর কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি।

শহীদ বদি

ফৌজদারহাট ক্যাডেট কলেজের সপ্তম ব্যাচের ছাত্র বদিউল আলম। ঢাকার ৫৭, মনিপুরী পাড়ার বাসিন্দা আব্দুল বারী ও রওশন আরা বেগমের বড় সন্তান। মাধ্যমিক পরীক্ষায় স্টার মার্কস নিয়ে প্রথম শ্রেণী আর উচ্চ মাধ্যমিকে মানবিক বিভাগে মেধা তালিকায় চতুর্থ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে অনার্স ও করাচি থেকে মাস্টার্স শেষ করার পর নিজেকে সময় দেয়া হয়নি। জড়িয়ে যান মাতৃভূমির সার্বভৌমত্ব আনার দায়িত্বে। ক্র্যাক প্লাটুনের সদস্য হিসাবে ৮ আগস্ট ফার্মগেট চেকপোস্ট অপারেশন, ১১ আগস্ট হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালের ভেতরে বিস্ফোরণ, ১৪ আগস্ট ঢাকা শহরের আকাশে গ্যাস বেলুনের মাধ্যমে বাংলাদেশের পতাকা উড়ানো, ১৯ আগস্ট সিদ্ধিরগঞ্জ পাওয়ার স্টেশন অপারেশন, ধানমন্ডির ১৮ এবং ২০ নম্বর রোডের অপারেশন প্রভৃতি তার বীরত্ব ও সাহসিকতার অত্যুজ্জ্বল উদাহরণ।

বদি ও হেলালের তারাইল থানা অপারেশনের মতো কিছু ঘটনায় মুক্তিযোদ্ধাদের হাতে অস্ত্র আসে। নানার বাড়ির উদ্দেশ্যে পাকুন্দিয়া গেলে বদির মা হেলালকে বলেন, “তোরা অসংঘবদ্ধ অবস্থায় বিচ্ছিন্ন ও বিক্ষিপ্তভাবে যা করছিস; এতে একদিন ঠিকানাবিহীন তোদের মৃতদেহ পড়ে থাকার আশঙ্কা আছে। তার চেয়ে তোরা যা; প্রশিক্ষণ নিয়ে এসে মোকাবেলা কর। এভাবে যদি আমার ছেলে মারাও যায়; আমি গর্ববোধ করবো মা হিসাবে।”  ২৯ আগস্ট ধানমন্ডিতে ঢাকা কলেজের অধ্যক্ষ প্রফেসর জালাল উদ্দিন সাহেবের বাসায় ছিলেন বদি। বেলা সাড়ে এগারোটার দিকে হঠাৎ বাড়ি ঘেরাও করলো পাক বাহিনী। পালাতে চেষ্টা করেও ধরা পড়লেন। তারপর আর তাকে পাওয়া যায়নি।

শহীদ আলতাফ মাহমুদ

৩৭০ নম্বর আউটার সার্কুলার রোডের বাসাতেই থাকতেন আলতাফ মাহমুদ। মুক্তিযুদ্ধে নিবেদিত প্রাণ গেরিলাদের দুর্গ ছিল বাড়িটি। ‘জাগো হুয়া সাভেরা’- এর পর থেকেই চলচ্চিত্রে সংগীত পরিচালক হিসাবে তার খ্যাতি ছড়িয়ে ছিল। জহির রায়হানের নির্মিত চলচ্চিত্র ‘বেহুলা’তেও কাজ করেছেন তিনি। তার সংগীত পরিচালনায় উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্র ক খ গ ঘ, অবুঝ মন, এই নিয়ে পৃথিবী, আঁকাবাঁকা, কার বউ, আগুন নিয়ে খেলা, নয়নতারা, দুই ভাই, সংসার, আপন দুলাল, প্রতিশোধ প্রভৃতি। যুদ্ধের সময় দরজা-জানালা বন্ধ করে শুরু করে নতুন আন্দোলন। আবদুল লতিফ গান লিখেছেন আর আলতাফ মাহমুদ করেছেন সুর। ভীতিকর পরিস্থিতির জন্য গলা খুলে গাইতে পারতেন না; কোনো কোনো গান রেকর্ড করতে হতো দুই বা ততোধিক বার। 

অস্ত্র ও সুর দুটো দিয়েই যুদ্ধ করেছেন আলতাফ মাহমুদ; © prothom alo

হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে অপারেশনের অন্যতম সদস্য ছিলেন আলতাফ মাহমুদ। প্রচুর গোলাবারুদ বয়ে বেড়ানো সমস্যা বলে নিজ দায়িত্বে মাটিতে পুঁতে রাখেন আলতাফ। আগস্টের ৩০ তারিখ ট্রাংক-ভর্তি অস্ত্রসহ ধরে নিয়ে যাওয়া হয় তাকে। তারপর তার কথা কেউ বলতে পারেনি।

শহীদ হাফিজ

ভালো বেহালা বাজাতেন হাফিজ। আলতাফ মাহমুদের সাথে সেই সূত্রে সম্পর্ক ভালো ছিল বহু দিন ধরেই। ডাকাই হতো আলতাফের ছায়াসঙ্গী বলে। অপারেশনের সময়েও একসঙ্গে থাকতেন দুজন। ৩০ আগস্ট পাকসেনাদের হাতেও ধরা পড়েন একসাথে। অত্যাচারের মাত্রা এত বেশি ছিল যে, হাফিজ টর্চার সেলেই মৃত্যুবরণ করেন ৩১ তারিখ।

এছাড়া আরো অনেক মুখই ছিলেন ক্র্যাক প্লাটুনের সদস্য হিসেবে। পপ সম্রাট আজম খান, আমিনুল ইসলাম নসু, আলী আহমেদ জিয়াউদ্দিন, ইশতিয়াক আজিজ উলফাত, কাজী কামাল উদ্দিন, কামরুল হক, গোলাম দস্তগীর গাজী, চুন্নু, জহির উদ্দিন জালাল, জহিরুল ইসলাম, নাসির উদ্দিন ইউসুফ বাচ্চু, নীলু, পুলু, ফতেহ চৌধুরী, মাহবুব, মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া, শহীদুল্লাহ খান বাদল, সামাদ, হাবিবুল আলম, হিউবার্ট রোজারিও প্রমুখ।

সেসব অপারেশন

তরুণ প্রাণগুলো মৃত্যুর পরোয়া না করে ঝাঁপিয়ে পড়ে গেরিলা আক্রমণে। তাদের মুহুর্মুহু আঘাতে আতঙ্ক ঢুকে গিয়েছিল পাক শিবিরে। ছোট-বড় মিলিয়ে মোট ৮২টি দুঃসাহসিক গেরিলা অপারেশন চালায় তারা। বের হতো পাঁচ থেকে ছয়জন করে। মেধা, ক্ষিপ্ততা আর বুদ্ধিমত্তা নিয়ে সফল হয়েছে তাতেই। প্রথম দফায় হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালের সামনে, ওয়াপদা গেট, পুরানা পল্টন এবং বিভিন্ন সিনেমা হলের সামনে হাতবোমা নিক্ষেপ করা হয়। দ্বিতীয় দফায় সাথে আনে উন্নততর অস্ত্রশস্ত্র। এবারের মিশন ঢাকার গুরুত্বপূর্ণ পাওয়ার স্টেশনগুলো বিস্ফোরণে উড়িয়ে দেয়া; যেন অন্ধকারে ডুবে যায় সমগ্র নগরী। এক্ষেত্রে গেরিলাদের সাহায্য করে দুজন ইঞ্জিনিয়ার। তারাই ট্রান্সফর্মারের ছবি এবং কীভাবে তা নষ্ট করা যায়, তার ডায়াগ্রাম এঁকে গেরিলাদের হাতে দেন। 

ক্র্যাক প্লাটুনের মুহুর্মুহু আক্রমণে আতঙ্ক ঢুকে যায় পাক শিবিরে; © jonmojuddho.com/crack-platoon

এভাবে অপারেশন হোটেল ইন্টারকন্টিনেপল, অপারেশন এলিফ্যান্ট রোড পাওয়ার স্টেশন, অপারেশন যাত্রাবাড়ি পাওয়ার স্টেশন, অপারেশন ফার্মগেট চেক পয়েন্ট, অ্যাটাক অন দ্য মুভ, ডেসটিনেশন আননোন প্রভৃতির মতো বহু অভিযান চলতে থাকে একের পর এক। পাক বাহিনী ও তার এদেশীয় দোসররা হয়ে পড়ে তটস্থ। বিশ্ববাসী জানতে পারে পূর্ববাংলার মানুষ ভালো নেই। পাকিস্তান সরকারের দীর্ঘদিনের মিথ্যাচার নিন্দিত হয় আন্তর্জাতিক অঙ্গনে। আর দেশের নানা প্রান্তে অবস্থিত মুক্তিযোদ্ধারা পায় নতুন উদ্যমে এগিয়ে চলার শক্তি।  

মৃত্যু থেকে পুনর্জন্ম

পাক বাহিনী পাগল হয়ে গিয়েছিল ঢাকার বিপ্লবীদের আটক করার জন্য। তামাম শহর কেবল চষেই বেড়ানি; ধরিয়ে দেবার জন্য ঘোষণা করা হয়েছে দুই হাজার টাকা পুরস্কারের। ১১ই আগস্ট হামলার পর পাক বাহিনী তাদের এদেশীয় দোসরদের সহযোগিতায় ‘ক্র্যাক প্লাটুন’-এর কয়েকজনকে ধরে ফেলে। ২৯ আগস্ট অভিযান চালিয়ে আটক করা হয় প্রায় ১৫ জন গেরিলা যোদ্ধাকে। টর্চার সেলে নিয়ে চালানো হয় অবর্ণনীয় অত্যাচার। দাঁতে দাঁত কামড়ে থেকে তারা সহ্য করেছে অত্যাচার; তবু তথ্য ফাঁস করেনি। নয়জনের আর কোনো খোঁজই পাওয়া যায়নি কোনোদিন।

কিন্তু থেমে যায়নি ক্র্যাক প্লাটুন। সেপ্টেম্বরের দিকেই আবার দ্বিতীয় পর্যায়ের অভিযাত্রা শুরু হয়। জ্যেষ্ঠদের পদচিহ্ন ধরে এগিয়ে চললো কনিষ্ঠের মিছিল। মাতৃভূমির জন্য বাড়তে থাকলো নিখোঁজের তালিকা। আবারো সেই দুঃসাহসিক অভিযানে কেঁপে উঠলো বাসাবো, মানিক নগর, বাড্ডা, উত্তরখানসহ ঢাকার মাটি। বিজয়ের আগের দিন অব্দি তাদের তৎপরতা অব্যাহত ছিল।

এবং তারপর

বাংলা সংস্কৃতিতে ক্র্যাক প্লাটুন এক অন্য অধ্যায়ের সূচনা করে। শহীদ জননী জাহানারা ইমাম তার ‘একাত্তরের দিনগুলি’ গ্রন্থে ক্র্যাক প্লাটুনের সদস্যের ঘটনাবহুল দিনগুলো ফুটে উঠেছে। আজাদ আর তার মাকে কেন্দ্র করে প্রখ্যাত সাহিত্যিক আনিসুল লিখেছেন হৃদয়স্পর্শী জনপ্রিয় উপন্যাস ‘মা’। এশিয়াটিক সোসাইটি এই গেরিলা বাহিনীর দুঃসাহসিক গল্পগুলো নিয়ে প্রকাশ করে ‘ঢাকায় গেরিলা যুদ্ধ ১৯৭১’ বই। ক্র্যাক প্লাটুনের সদস্য হাবিবুল আলম বীর প্রতীকের লেখা ‘ব্রেভ অব হার্ট’ বইটি ক্র্যাক প্লাটুনের আদ্যোপান্ত জানার প্রামাণ্য দলিল। শহীদ বদিউল আলম বদিকে নিয়ে প্রখ্যাত সাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদ নির্মাণ করেছেন ‘আগুনের পরশমণি’। সিনেমাটি ১৯তম জাতীয় চলচ্চিত্র পুরষ্কার লাভ করে।

আজাদ, রুমী, জুয়েল কিংবা বদির মায়েরা কখনো তাদের সন্তানদের ফিরে পায়নি। স্বাধীন বাংলাদেশের মাটিতে দাঁড়িয়ে তাকাতে পারেনি মুক্ত আকাশে উড়তে থাকা পতাকার দিকে। চাইলেই হয়তো পশ্চিমা পৃথিবীতে গিয়ে নির্বিঘ্ন জীবন বেছে নিতে পারতেন তারা। কিন্তু বুঝতে পেরেছিলেন মাতৃভূমির ভাষা। নিজের মায়ের কোল থেকে ফসকে তাই মুক্ত করে গেলো কোটি মায়ের কোলের সন্তান। যতদিন বিশ্ব মানচিত্রে বাংলাদেশের অস্তিত্ব থাকবে; ততদিন বাংলাদের তাদের কাছে ঋণী।

This Bengali article is about Crack Platoon. This was a special commando team of the Mukti Bahini which was formed in 1971 during the Bangladesh Liberation War. 

Featured Image: The Daily Star