কর্মক্ষেত্রে সর্বোচ্চ সাফল্যের জন্য যে বৈশিষ্ট্যগুলো থাকা আবশ্যক

জেরিন ইসলাম (ছদ্মনাম) একটি বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে কর্মরত। প্রচলিত হিসেবে পদের সাথে বয়সটা ততটা সঙ্গতিপূর্ণ না হলেও নিজস্ব যোগ্যতার কারণেই প্রতিষ্ঠানের ইতিহাসে সবচেয়ে কম বয়সে গুরুত্বপূর্ণ এই পদটিতে নিয়োগপ্রাপ্ত হয়েছেন। দেশের বহুল প্রচারিত একটি দৈনিকে তার সাক্ষাৎকার প্রকাশিত হলে তাতে তিনি ব্যবস্থাপক হিসেবে, কর্মক্ষেত্রে কিছু সুনির্দিষ্ট দক্ষতার কথা উল্লেখ করেন। গত বছরের শেষের দিকে, বাৎসরিক ছুটিতে তিনি বৈদেশিক একটি ব্যক্তিগত উন্নয়ন বিষয়ক প্রতিষ্ঠান থেকে সম্পর্কিত একটি কোর্স সম্পন্ন করে এসেছিলেন। কোর্সটির অভিজ্ঞতা সম্পর্কে তাকে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন,

প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত উন্নয়ন, সফট স্কিলসহ নানাবিধ প্রশিক্ষণ কিংবা কোর্স করার খুব একটা চল আমাদের দেশে এখনও গড়ে ওঠেনি। আপনার পড়াশোনা, সাংগঠনিক দক্ষতা, চাকরির অভিজ্ঞতা এই বিষয়গুলো অর্জিত হয় নানাবিধ ঘটনার মধ্য দিয়ে। অবশ্যই এসবের গুরুত্ব আছে, তবে ব্যবস্থাপনাগত দক্ষতা বা ম্যানেজারিয়াল এক্সিলেন্স বৃদ্ধির জন্য আপনাকে অবশ্যই কিছু না কিছু আনুষঙ্গিক দক্ষতা থাকতে হবে, যেগুলো পেতে পারেন বিভিন্ন কোর্স করার মাধ্যমে। এসব বিষয় সে অর্থে ততটা প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার মতো নয়। একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, উচ্চ দক্ষতাসম্পন্ন একজন কর্পোরেট ব্যক্তিত্ব হওয়ার জন্য আপনার কিছু গুণ থাকা আবশ্যক।

কর্মক্ষেত্রে সবসময় থাকা চাই আত্মবিশ্বাসী; Image Source: Bookboon

সুপ্রিয় পাঠক, জেরিন ইসলাম যেসব দক্ষতার কথা উল্লেখ করেছেন, সেগুলোকে প্রাতিষ্ঠানিক মনোবিজ্ঞানের ভাষায় বলা হয় ‘হাই পটেনশিয়াল পার্সোনালিটি ট্রেইট’। কর্পোরেট জগতে আপনি শুধু অভিজ্ঞতার দরুন বা অফিস রাজনীতির বদৌলতে অনন্যসাধারণ কিছু অর্জন করার কথা ভাবতে পারেন না। দৈবক্রমে যদি দুয়ে দুয়ে চার মিলিয়ে উচ্চ পদে আসীন হতে পারেনও, সেটি স্থায়ী হবে না; কেননা, কর্মপরম্পরা নিয়ন্ত্রণ করার জন্য যে অসংখ্য সূক্ষ্ম গুণাবলীর দরকার, সেটি আপনার থাকবে না।

কর্মক্ষেত্রে আপনার লক্ষ্য যদি হয় মইয়ের প্রতিটি সিঁড়ি বেয়ে বেয়ে সর্বোচ্চ পর্যায়ে আরোহণ করা; তাহলে প্রতিটি ধাপেই আপনাকে কিছু না কিছু শিক্ষা নিতে হবে, যেটি আপনার অব্যবহিত পরবর্তী ধাপের পাথেয় হবে। হাই পটেনশিয়াল পার্সোনালিটি ট্রেইট বলতে ছয়টি বিশেষ দক্ষতার সর্বোত্তম মিশেলকে বোঝানো হয়ে থাকে। অর্থাৎ, এই ছয়টি গুণের কোনো একটিকে যদি অতি গুরুত্বের সাথে একেবারে মেপে মেপে প্রয়োগ করতে চান, তাহলে পুরো ব্যবস্থাটি ব্যর্থতায় পর্যবসিত হবে। এই ছয়টি গুণের কোনো একটিকেই অন্যগুলোর চেয়ে বেশি বা কম দরকারি ভাবার অবকাশ নেই।

প্রতিযোগিতামূলক মনোভাব

এই বিষয়টি নিয়ে আলোচনার শুরুতে জানা দরকার যে, স্বার্থপরতা বলতে কী বুঝি আমরা? ধরুন, আপনি প্রতিনিয়ত নিজের সাথে একটি দ্বন্দ্বমুখর জীবন কাটাচ্ছেন; নিজের যোগ্যতা, দক্ষতা, অর্জন ইত্যাদিকে আরও নৈপুণ্যের সাথে কর্মক্ষেত্রে প্রয়োগ করতে চাচ্ছেন। সবার চেয়ে কিছুটা ব্যতিক্রমধর্মী হিসেবে আপনি নিজেকে দেখতে চান, কর্মক্ষেত্রে বসের সামনে, সহকর্মীদের কাছে নিজেকে একজন দৃষ্টান্তমূলক ব্যক্তিত্ব হিসেবে উপস্থাপন করার সুতীব্র মনোবাঞ্ছা আপনার রক্তে। এসবের কোনোটির মাঝেই লেশমাত্র ভুল বা অনৈতিকতা বা স্বার্থপরতা নেই।

সমস্যাটি তখনই হবে, যখন এসব অর্জনের জন্য বা অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছানোর পথে আপনি অন্যকে ঠেলে এগোবেন। কিছুটা কর্কশ শোনালেও যাকে আমরা আড্ডার ছলে বলে থাকি ‘কনুই মারা’। এবার আপনি বলতে বাধ্য যে, আপনার মাঝে স্বার্থপরতার প্রবেশ ঘটেছে। এগিয়ে যান, নিজেকে বা সহকর্মীদেরকে ছাড়িয়ে যান, চূড়ায় পৌঁছে যান- কোনো সমস্যা নেই তাতে। তবে এই যাত্রাটা যাতে অন্যের ক্ষতিসাধনের মাধ্যমে না হয়। প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে ‘আমার আমি’র সাথে, আর এ যাত্রায় পাশের মানুষগুলোর সাহায্যটা যেমন দরকার হয়, তেমনি আপনারও কর্তব্য সময়ানুযায়ী সহমর্মিতার হাত বাড়িয়ে দেওয়া।

সাহসিকতা

জীবন সবসময় আপনার অনুকূলে থাকবে না। ঢেউহীন সমুদ্র কখনও দক্ষ নাবিক তৈরি করে না। আপনার ভেতরের সুপ্ত প্রতিভাটুকু বের করে নিয়ে আসার জন্য উত্তাল পরিস্থিতির প্রয়োজন আছে বৈকি। বিরুদ্ধভাবাপন্ন অবস্থাই আপনার সর্বোচ্চ নৈপুণ্যের যোগ্যতম দাবিদার।

প্রতিষ্ঠানের স্বার্থে একজন দায়িত্বশীল কর্মী হিসেবে আপনার সাহসী হওয়ার কোনো ব্যতিক্রম নেই; Image Source: peoplemattersglobal.com

সংকটময় মুহূর্তে, সহকর্মীদের বিপরীতে দাঁড়িয়ে কখনও কখনও আপনাকে প্রতিষ্ঠানের মূল লক্ষ্যের দিকে নিশানা করে সাহসী সিদ্ধান্ত নিতে হবে। বাজার ব্যবস্থা যখন একেবারেই ধ্বংসের মুখে কিংবা বিপণনে যখন একের পর এক শূন্য ফলাফল- তখন আত্মবিশ্বাসী নাবিকের মতো ঝুঁকি নেওয়ার মানসিকতাই হয়তো আপনাকে সঠিক গন্তব্যে পৌঁছে দেবে। 

সতর্কতা

কর্মক্ষেত্রে আপনার ওপর অর্পিত দায়িত্বের প্রতি আপনার সর্বোচ্চ নিবেদিতপ্রাণ থাকা দরকার। অর্থাৎ, আপনি একটি পরিকল্পনা গ্রহণ করলেন আপনার দায়িত্ব ও কর্তব্য সঠিকভাবে সম্পন্ন করার জন্য। এই পরিকল্পনার সুচারু বাস্তবায়নের পথে আপনি অবশ্যই একাধিক বাধার সম্মুখীন হবেন। কখনও আপনার কর্মপদ্ধতিতে গলদ খুঁজে পাবেন, কখনও সহকর্মীর আচরণে আপনার কাজের গতি ব্যাহত হবে, কখনও অন্য কোনো অতি জরুরি কাজের প্রতি মনোযোগ দিতে বাধ্য হবেন।

এসবের প্রতিটি ক্ষেত্রেই আপনার আবেগকে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। এক্ষেত্রে অবশ্যই মনে রাখা উচিত, মানুষ মাত্রই আবেগ-অনুভূতি সম্পন্ন প্রাণী, জন্মগতভাবেই সে শতভাগ যৌক্তিক প্রাণী নয়। অর্থাৎ, আবেগহীন হওয়া যাবে না, বরং চিন্তন-দক্ষতা ও যুক্তির যথাযথ ব্যবহারের মাধ্যমে আবেগকে নিয়ন্ত্রণ করা শিখতে হবে। ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র বিষয়ে আবেগকে মূল কাজের চেয়ে প্রাধান্য দিলে সেটি কোনোভাবেই দায়িত্বের প্রতি সুবিচারকে সমর্থন করে না। কাজের প্রতি সবসময় তাই থাকা চাই সর্বোচ্চ সতর্ক

অদম্য কৌতূহল

কাজের প্রতি আপনার ত্যাগের পূর্ণতা আসবে, যদি আপনার দায়িত্ব সম্পর্কে আপনি যথেষ্ট পরিমাণে কৌতূহলী হন। যেকোনো একটি প্রজেক্ট কীভাবে কাজ করে, ব্যবস্থাপনা পরিচালকের দায়িত্ব কী, ক্রমবর্ধমান চাহিদার প্রতি আপনার প্রতিষ্ঠানের অবস্থান কীরকম ইত্যাদি নানা বিষয়ের অভ্যন্তরীণ খুঁটিনাটি সম্পর্কে আপনার সত্যিকারের আগ্রহ থাকলে কাজটি সম্পর্কে আপনি অনেক বেশি ওয়াকিবহাল হবেন, যাতে করে যেকোনো বিষয় দ্রুততার সাথে শিখে নেওয়া আপনার জন্য সহজ হবে। কৌতূহল শুধু একমুখী, নয় বরং বহুমুখী সুযোগ-সুবিধার দ্বার উন্মুক্ত করে দেয়। 

সমন্বয়

প্রতিটি মানুষ সম্পূর্ণ আলাদা ধরনের। কাজের ধরন, চিন্তা-ভাবনা, কাজের গতি, দূরদর্শিতা- কর্মক্ষেত্রের সকল মাপকাঠিতেই প্রতিটি মানুষ একে অন্যের চেয়ে হয় এগিয়ে অথবা পিছিয়ে। একটি প্রতিষ্ঠানের কর্মরত সকল ব্যক্তিই আবশ্যিক গুণাবলীর আদর্শ প্রতিনিধিত্ব করেন না। অর্থাৎ, আপনার দুর্বলতা হয়তো বা আপনার কোনো একজন সহকর্মীর শক্তির জায়গা। ঠিক একইভাবে আপনার একটি অত্যন্ত প্রশংসনীয় দিক হয়তো অন্য কারও মাঝে অনুপস্থিত।

সহকর্মীদের সাথে যথাসাধ্য চেষ্টা করতে হবে সমন্বয় সাধনের; Image Source: bbc.com

এসবের ওপর ভিত্তি করেই অভিযোজনের মতো অবধারিত প্রসঙ্গটি চলে আসে। সমন্বয় সাধনের সবচেয়ে ইতিবাচক দিকটি কী হতে পারে? একসাথে, একই পরিবেশে, একই লক্ষ্যে কাজ করে প্রত্যেকের ব্যক্তিগত উন্নয়ন সাধন। আপনি আপনার সকল সহকর্মীর সাথে কাজ করছেন, আপনারা প্রতি মুহূর্তে নিজেদেরকে ছাড়িয়ে যাচ্ছেন- এর চেয়ে চমৎকার কাজের পরিবেশ আর কী-ই বা হতে পারে? আর সেজন্যই ছাড় দেওয়ার মানসিকতা, অন্যের পক্ষে কথা বলা এবং এসবের সামগ্রিক ফলাফল হিসেবে সমন্বয় সাধন করতে পারাটা খুবই জরুরি।

দ্ব্যর্থতার স্বীকৃতি

প্রতিটি প্রজেক্টেরই একটি মূলনীতি থাকে। মূলনীতিগুলোকে একেবারে তুচ্ছ জ্ঞান করে উড়িয়ে দেওয়া যেমন যায় না, ঠিক তেমনি নীতিকে সর্বদা আঁকড়ে ধরে বসে থাকলেও কাজের অগ্রগতি নিশ্চিত হয় না। আপনি যদি একজন আস্থাভাজন, সর্বজনস্বীকৃত, বিচক্ষণ অধিনায়ক হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করতে চান, তাহলে যেকোনো অস্পষ্টতা, সন্দেহ, ব্যতিক্রম, বিচ্যুতির প্রতি উদারপন্থী মনোভাব পোষণের কোনো বিকল্প নেই। কাজের ক্ষেত্রে কিছু নিয়ম অবশ্যই থাকবে।

তবে নিয়মানুবর্তিতা যেন কোনোভাবেই কট্টরপন্থী চিন্তাধারার সমার্থক না হয়ে দাঁড়ায়। একজন দলনায়ক হিসেবে আপনাকে সকলের মত শোনার প্রতি উন্মুক্ত হতে হবে। নিয়মের বেড়াজালে আটকে গেলে একজন মানুষ একটি নির্দিষ্ট সমস্যাকে নানামুখী দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করতে ব্যর্থ হয়। যেকোনো ব্যতিক্রমধর্মিতা বা অস্পষ্টতার প্রতি উদারপন্থী মনোভাব তাকে সর্বোত্তম সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করে। 

সবাইকে সাথে নিয়েই হোক কাজ; Image Source: IT Brief

আপনি যদি কোনো প্রতিষ্ঠানের কর্তাব্যক্তি হয়ে থাকেন আর এ আলোচনার মাধ্যমে উৎসাহী বোধ করে থাকেন, তাহলে অভিনন্দন। কিন্তু কথা শেষেও কথা থেকে যায় তো! ইতোমধ্যে কি এই সিদ্ধান্তেও উপনীত হয়েছেন যে, প্রতিষ্ঠানের পরবর্তী নিয়োগে এসব বৈশিষ্ট্যের সন্তোষজনক উপস্থিতি যাদের মাঝে পাবেন, শুধু তারাই কাজের সুযোগ পাবে? তাহলে বলতেই হচ্ছে, এবারে বিষয়টির মৌলিকত্ব আপনাকে স্পর্শ করতে পারেনি।

হাই পটেনশিয়াল পার্সোনালিটি ট্রেইটের সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিকটি হলো দলগত কাজ। কোনো ব্যক্তির মাঝেই এসব দক্ষতার অত্যানুকূল মিশেল আপনি পাবেন না (ব্যতিক্রম অবশ্যই উদাহরণ নয়)। নিয়োগের ক্ষেত্রে ভিন্ন ভিন্ন ব্যক্তির মাঝে আপনি একেকটি দক্ষতার সন্ধান পাবেন। ভিন্ন ভিন্ন ব্যক্তির সুষম অংশগ্রহণেই শুধুমাত্র সম্ভব একটি উচ্চ দক্ষতাসম্পন্ন প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করা।

This article is about the features of a high potential person and is written in the Bengali language.

All the necessary references are hyperlinked within the article.

Featured Image: hrreview.co.uk

Related Articles