দিনশেষে কখনও কি মনে হয় যে, আপনি আরো কাজ করতে পারতেন? সম্ভবত আরো লিখতে পারতেন কিংবা বই পড়তে পারতেন অথবা হাতে থাকা কাজগুলো ফেলে না রেখে আজকের দিনেই তা শেষ করতে পারতেন? দিনশেষে হয়তো মনে হয় আজকের দিন পুরোটাই নষ্ট হয়ে গেল? পরিচিত মনে হচ্ছে? এই গড়িমসি করার অভ্যাসটা আমাদের মজ্জাগত। ইংরেজিতে একে বলে ‘Procrastination’ বা দীর্ঘসূত্রিতা।

নতুন বছর এসেছে। প্রায় সবারই ইচ্ছা থাকে নতুন বছরে জীবনটাকে সুন্দর করে গুছিয়ে নেওয়ার। অতীতের ভুল শুধরে সামনের বছরে আরো বেশি সফল হতে প্রায় সকলেই থাকে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। কিন্ত সমস্যা শুরু হয় যখন কাজগুলো নিয়ে মানুষ গড়িমসি শুরু করে। নতুন বছরে যা যা অর্জন করার কথা ছিল সময়ের সাথে সাথে ফিকে হয়ে যেতে থাকে পরিকল্পনাগুলো। তাই জেনে নেওয়া যাক কিছু উপায় যার মাধ্যমে নতুন বছরে হওয়া যাবে আরো কর্মক্ষম, ফলে সাফল্য অর্জন হবে আরেকটু সহজ।

শুরুতেই জেনে নেওয়া দরকার, কোনো কাজ নিয়ে আপনি কেন গড়িমসি করেন? যেটা হয়তো আজকে করতে পারতেন তা দিনের পর দিন কেন ফেলে রাখছেন? টিম ফাইকিলের মতে, একজন শিক্ষার্থী দৈনিক গড়ে তার কর্মঘণ্টার এক-তৃতীয়াংশ সময় ‘Procrastinate’ করে বা হেলায় সময় কাটায়। অন্যদিকে সার্ভে নামক এক প্রতিষ্ঠানের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে দেখা যায়, ২৬ শতাংশ মানুষ অফিসে ২ বা তার বেশি ঘণ্টা অপচয় করে।

কোনো কাজ যখন আপনার কাছে বিরক্তিকর মনে হয় বা বেশ কঠিন লাগে অথবা কাজটা গুছাতে আপনাকে যদি বেশ বেগ পেতে হয় তখন স্বভাবতই কাজটির প্রতি অনীহা কাজ করে আপনার। তাহলে দেখা যাক, আপনার মস্তিষ্ক কী ধরনের প্রতিক্রিয়া দেখায় যখন আপনি কোনো কাজ নিয়ে আলসেমি করেন। যখন আপনি কোনো কাজ নিয়ে বেশিক্ষণ বসে থাকেন তখন মস্তিষ্কে এক প্রকার যুদ্ধ শুরু হয় বলা চলে। আপনার মস্তিষ্কের লিম্বিক সিস্টেম (যা আপনার অনুভূতি নিয়ন্ত্রণ করে) এবং প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্স (মস্তিষ্কের যুক্তি কেন্দ্র) এর মাঝে বিভ্রান্তি সৃষ্টি হয়। লিম্বিক সিস্টেম চায় কাজটি ফেলে রেখে সাময়িক আনন্দ পেতে আর অন্যদিকে প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্স আপনাকে দীর্ঘমেয়াদী লক্ষ্যের পথে ধরে রাখতে চায়। ভাবতেও অবাক লাগে, দিনে হয়তো হাজার বার এরকম যুদ্ধের মধ্য দিয়ে যেতে হয় আপনার মস্তিককে অথচ আপনি কিছুই টের পাচ্ছেন না। আপনি যদি সফল হতে চান তাহলে সস্তা অনুভুতির দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হলে চলবে না, বরং প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্সকে নিজের নিয়ন্ত্রণে আনতে হবে।

সহজ কথায় কার্যক্ষম হওয়া মানে নিজের সময়, মনোযোগ এবং শক্তি- এই ৩টি পুঁজি সর্বোত্তম উপায়ে কাজে লাগানো। তাহলেই আপনি হয়ে উঠবেন আরো কার্যক্ষম।

সময় + শক্তি + মনোযোগ = প্রোডাক্টিভিটি; Source: collegeinfogeek.com

এবার তাহলে জেনে নেওয়া যাক কার্যক্ষম হওয়ার ১০টি উপায় যা মেনে চললে আপনার জীবন ও ধীরে ধীরে বদলে যাবে।

১. রুল অফ থ্রি

আপনার দিনের সবচেয়ে মূল্যবান কাজ কোনটি তা আপনার জানা দরকার। এই নিয়মটি খুব সহজ। প্রতিদিন সকালে নিজেকে জিজ্ঞাসা করুন- ‘যখন দিনটি শেষ হবে তখন আমি কোন ৩টি জিনিস সম্পন্ন করতে চাই?’ কাজগুলো লিখে ফেলুন। সাথে নিজের জন্য একটি দীর্ঘমেয়াদী লক্ষ্য স্থির করুন- এই যেমন ৫ বছর পর কোথায় দেখতে চান নিজেকে। প্রতিদিন সকালে নিজেকে তা মনে করিয়ে দিন।

২. বায়োলজিকাল প্রাইম টাইম বা BPT

BPT হচ্ছে এমন একটি সময় যখন আপনার শরীরের সর্বোচ্চ শক্তি থাকে। শুধু সময়কে সঠিকভাবে ব্যবহারের নাম কর্মক্ষম হওয়া নয়। সাথে আপনার শক্তি কীভাবে ব্যবহার করবেন তা-ও জানা দরকার। প্রথমেই কোন কাজগুলো কঠিন তা নির্ধারণ করুন। একেকজনের BPT একেকরকম। কেউ হয়তো ঘুম থেকে ওঠার পর ভালো কাজ করে পারেন, আবার কেউ হয়তো দুপুরে ঘুমানোর পর বেশি শক্তি অনুভব করেন। আবার অনেকে আছেন গভীর রাতে সর্বোচ্চ মনোযোগ দিয়ে কাজ করতে পারেন। তাই আপনার BPT কোনটি তা আপনি নির্ধারণ করুন এবং এই সময়েই আপনার গুরুত্বপূর্ণ কাজটি সম্পন্ন করুন।

বায়োলজিকাল প্রাইম টাইম; Source: collegeinfogeek.com

৩. যেকোনো কাজের জন্য সময় নির্ধারণ করুন

কাজটিকে ছোট ছোট ভাগে ভাগ করুন এবং প্রতিটি ধাপের জন্য সময়সীমা নির্ধারণ করুন। যেমন- আপনার গবেষণার উপর একটি রিপোর্ট লিখতে হবে। আপনি আপনার কাজ এভাবে ভাগ করে নিতে পারেন-

সকাল ৯:০০ – ৯:১০ : আপনার সব সরঞ্জাম সেট আপ করুন, যেমন ব্রাউজার ট্যাব, ইমেইল, কফি, ইত্যাদি।

৯ঃ১০ – ১০:০০ : ইন্টারনেট ব্রাউজিং।

১০:০০ – ১০:৪৫ : বিদ্যমান ফাইলগুলো দেখুন।

১০:৪৫ – ১১:০০ : বিরতির সময়!

১১:০০ – ১২:০০ : রিপোর্টের ড্রাফট তৈরি করুন।

নিজেকে নিজেই সময় বেঁধে দিন। সময়ের মধ্যে কাজ শেষ না করতে পারলেও আপনি কাজ শেষ না করা পর্যন্ত চাপের মধ্যে থাকবেন নির্দিষ্ট করা সময়সীমার এর জন্য।

৪. পোমোডোরো কৌশল

Pomodoro একটি জনপ্রিয় সময় ব্যবস্থাপনা কৌশল। এটি সাধারণত ২৫ মিনিট লম্বা (pomodoro সেশন নামে পরিচিত), সাথে ৫ মিনিট বিরতি। এই সেশনে যখন কাজ করবেন, তখন পুরো মনোযোগ দিয়ে কাজ করবেন, আর বিরতির সময় যথাসম্ভব সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম থেকে দূরে থাকবেন। প্রতি ৪টি সেশনের পর লম্বা বিরতি নিন ১৫-৩০ মিনিটের জন্য। ফলশ্রুতিতে কর্মক্ষেত্রের সেশনের সময় কার্যক্ষমতা ব্যাপকভাবে উন্নত হয়। নিয়মিত বিরতি গ্রহণের মাধ্যমে কাজটি দক্ষতার সাথে পরিচালিত হতে পারে। গত শতকের আশির দশকের শেষের দিকে ফ্রান্সিস চেরিলো প্রথম এই কৌশলটি আবিষ্কার করেন। ইতালীয় শব্দ Pomodoro (টমেটো), টমেটো আকৃতির রান্নাঘরের টাইমার, যা চেরিলো বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র হিসেবে এই কাজে সর্বপ্রথম ব্যবহার করেছিলেন, তা থেকেই এই নামটি  এসেছে।

পোমোডোরো সেশন; Source: A Life of Productivity/ Pomodoro

৫. স্মার্টফোনের নোটিফিকেশন বন্ধ করে রাখুন

সম্পূর্ণরূপে আপনার স্মার্টফোনটি বন্ধ করা সবসময় কাজে না-ও দিতে পারে। তার চেয়ে বিভিন্ন অ্যাপসের পপ-আপ নোটিফিকেশন বন্ধ করে রাখুন। প্রায়ই পপ-আপগুলো আপনার মনোযোগ বিঘ্ন করে এবং কাজ থেকে দূরে সরিয়ে দেয়। তাই যেসব কাজ গভীর মনোযোগ দিয়ে করতে হবে সেসব ক্ষেত্রে এই পদ্ধতি আপনাকে নিরবচ্ছিন্নভাবে কাজ করতে সহায়তা করবে।

৬. আপনার সময় কীভাবে ব্যয় করছেন তা ট্র্যাক করুন

আপনি যদি আরো কার্যক্ষম হতে চান তাহলে শুরুতে আপনাকে জানতে হবে আপনি কীভাবে আপনার ২৪ ঘণ্টা সময় অতিবাহিত করছেন। আপনি হয়তো বলছেন আপনি অনেক ব্যস্ত বা আপনার আরো বেশি কাজ করতে হবে বা কাজ করার মতো আপনি পর্যাপ্ত সময় পাচ্ছেন না। কিন্তু আপনার সময় ট্র্যাক করলে দেখতে পারবেন দৈনিক হয়তো ১-২ ঘণ্টা আপনি ফেসবুকে ব্যয় করছেন। তখন আপনি নিজে থেকেই বুঝতে পারবেন, কোন কাজে অহেতুক বেশি সময় দিচ্ছেন। সময় ট্র্যাক করার জন্য বিভিন্ন ওয়েবসাইটে এক্সেল বা পিডিএফ ফরম্যাটে কিছু ফাইল পাবেন যেখানে দিনে ১৫ মিনিট বা ৩০ মিনিট পর পর কী করেছেন তা লিপিবদ্ধ করে রাখার সুযোগ আছে। এই কৌশল মেনে চললে আপনার সময় অপব্যয় করার অভ্যাস অনেক খানি কমে আসবে। toggl, Hours, Timely, Save my time এই ধরনের অ্যাপও ব্যবহার করতে পারেন।

৭. শুধুমাত্র একটি কাজে মনোযোগ দিন

একসাথে ১০টি কাজ করা বন্ধ করুন। প্রতিদিন ১০ বারের বেশি কাজ পরিবর্তন করলে আপনার মস্তিষ্কের আইকিউ গড়ে ১০ পয়েন্ট কমে যায়। যে কাজটি করবেন তা মনোযোগ দিয়ে শেষ করুন, দক্ষতার সাথে করুন। কর্মক্ষম মানে অনেক কাজ করতে পারা না, বরং কোনো কাজ কত কম সময়ে কত ভালোভাবে করতে পারছেন তা-ই হচ্ছে কর্মক্ষমতা।

৮. কাজটি শুরু করুন

হাতে থাকা যে কাজটি এতদিন ফেলে এসেছেন আর সময়ক্ষেপণ না করে কাজটি নিয়ে বসুন। শুরু করলেই দেখবেন কাজটিকে প্রথমে যতটা কঠিন মনে হয়েছিল তা মোটেও ততটা কঠিন নয়। অপ্রিয় হলেও সত্য যে, এই কঠিন কাজগুলোই আমাদের সাফল্যের জন্য প্রয়োজন। তাই আর দেরি না করে শুরু করুন। পুরানো বছরে যা যা করতে চেয়েছিলেন তার তালিকা আবার বানিয়ে ফেলুন। বলা হয়ে থাকে, ‘Time is money’। নতুন বছরে আপনি সময়ের গুরুত্ব আবার নতুন করে অনুভব করুন, সাথে আপনার শক্তি ও মনোযোগকেও সর্বোত্তম উপায়ে কাজে লাগানোর চেষ্টা করুন। তাহলে আপনি পৌঁছে যাবেন সাফল্য এবং অগ্রগতির পথে।

ফিচার ইমেজ: depositphotos.com