সংখ্যা নিয়ে খেলুন, নিয়ন্ত্রণ করুন গ্রাহকের মনস্তত্ত্ব!

কখনও ভেবে দেখেছেন, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান কেন তাদের পণ্যের মূল্য পূর্ণ সংখ্যায় নির্ধারণ না করে দশমিকে নির্ধারণ করে? ২ ডলারের একটি পণ্যের মূল্য কেন ২ ডলার না রেখে ১.৯৯ ডলার রাখে? এর পেছনে আছে মানুষের মনস্তাত্ত্বিক গঠন। মনোবিজ্ঞানীরা প্রতিনিয়তই মানুষের মনস্তাত্ত্বিক গঠন নিয়ে গবেষণা করে যাচ্ছেন। আর তাদের গবেষণা থেকে প্রাপ্ত ফলাফলকে সঠিকভাবে ব্যবহার করে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান তাদের পণ্য এবং পণ্যের মূল্যকে এমনভাবে আমাদের সামনে উপস্থাপন করছে যে, আমরা নিজেদের অজান্তেই তাদের কৌশলে ধরা দিয়ে তাদের পণ্য ক্রয় করছি প্রয়োজনের চেয়েও অতিরিক্ত পরিমাণে।

রবার্ট বেনো চাল্ডিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অ্যারিজোনা স্টেট ইউনিভার্সিটির মনস্তত্ত্ব এবং বিপণন বিভাগের অধ্যাপক। মানুষের মনস্তাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্যকে কাজে লাগিয়ে কিভাবে তাদের কাছে সফলভাবে পণ্য পৌঁছে দেওয়া যায়, তা নিয়ে তার একাধিক বই আছে। তার ‘দ্য স্মল বিগ’ বইয়ে তিনি এমন কিছু ছোট ছোট বিষয়ের কথা বলেছেন, যেগুলো ব্যবসার ক্ষেত্রে বিশাল প্রভাব ফেলতে পারে। চলুন জেনে নিই তার দেওয়া কিছু টিপস, যার মাধ্যমে শুধুমাত্র কিছু সংখ্যাকে কৌশলের সাথে ব্যবহার করে আপনি সহজেই আপনার পণ্যকে গ্রাহকের আরও বেশি কাছে পৌঁছে দিতে পারবেন।

রবার্ট চাল্ডিনি; Source: fameable.com

১) অনলাইন নিলামের ক্ষেত্রে প্রাথমিক মূল্য যথাসম্ভব কম রাখুন

যদি আপনি কোনো পণ্য অনলাইনে নিলামে বিক্রি করতে চান, তাহলে প্রাথমিক মূল্য যথাসম্ভব কম নির্ধারণ করুন। গবেষণায় দেখা গেছে, প্রাথমিক মূল্য যত কম হয়, চূড়ান্ত বিক্রয়মূল্য তত বেশি হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। রবার্ট চাল্ডিনি ব্যাপারটিকে ব্যাখ্যা করেন এভাবে, যদি প্রাথমিক মূল্য বেশি হয়, তাহলে তা ক্রেতাদের নিলামে প্রবেশের ক্ষেত্রে একধরনের প্রতিবন্ধকের মতো কাজ করে। ফলে কম ক্রেতার উপস্থিতির কারণে চূড়ান্ত মূল্যও কম হয়।

অন্যদিকে প্রাথমিক নিম্ন মূল্য সহজেই ক্রেতাদেরকে আকর্ষণ করে। আর একবার যদি কেউ নিলাম ডাকতে শুরু করে, তাহলে তার মধ্যে পণ্যটি পাওয়ার জন্য একধরনের জেদ কাজ করে। অধিক সংখ্যক ক্রেতার মধ্যে প্রতিযোগিতার ফলে সহজেই পণ্যটি আকাঙ্ক্ষিত মূল্যের চেয়ে অনেক বেশি উচ্চমূল্যে বিক্রয় করা সম্ভব হয়।

২) প্যাকেজ সুবিধা দেওয়ার সময় সুবিধাটি মূল্যের আগে উল্লেখ করুন

পণ্যের নাম বা সুবিধা মূল্যের আগে উল্লেখ করুন; Source: nickkolenda.com

আপনি যদি আপনার পণ্য বিক্রির জন্য কোনো প্যাকেজ সুবিধার ঘোষণা দেন, যেমন এতটা কিনলে এত টাকা, সেক্ষেত্রে আপনি ঘোষণা কিভাবে দিচ্ছেন, তার উপর ভিত্তি করে আপনার পণ্যের বিক্রয়ের পরিমাণ কম-বেশি হতে পারে। খুব সহজ শর্তের সুবিধার ক্ষেত্রে অবশ্য ক্রমের কারণে কোনো প্রভাব পড়ে না। যেমন ‘১০টি গানের মূল্য ১০ ডলার’ অথবা ‘১০ ডলারে ১০টি গান’ যেভাবেই ঘোষণা দেন না কেন, ফলাফল একই হবে।

কিন্তু আপনার প্যাকেজ সুবিধা যদি একটু জটিল হয়, তাহলে ফলাফল ভিন্ন হতে পারে। যেমন ‘৩৫টি গানের মূল্য ২৯.৯৯ ডলার’ এবং ‘২৯.৯৯ ডলারে ৩৫টি গান’ বাক্য দুইটির অর্থ একই হলেও ক্রেতাদেরকে তা সমানভাবে আকর্ষণ করবে না। চাল্ডিনির মতে, মানুষ ‘৩৫টি গানের মূল্য ২৯.৯৯ ডলার’ শুনলে বেশি আকৃষ্ট হয়। কারণ হিসেবে তিনি ব্যাখ্যা করেন, যখন হিসেব একটু জটিল হয়ে যায়, তখন মানুষ বেশি কিছু চিন্তা না করে দামের পরিবর্তে সুবিধার কথা আগে শুনতে চায়।

৩) তুলনামূলক দামের ক্ষেত্রে কৌশল অবলম্বন করুন

আপনি যদি অনেক পণ্যের ভীড়ে নির্দিষ্ট একটি পণ্য বিক্রি করতে চান, তাহলে ক্রেতার সামনে সেটি উপস্থাপনের সময় তার মূল্য উল্লেখের ব্যাপারে আপনাকে কৌশলী হতে হবে। কারণ মানুষ সাধারণত পারিপার্শ্বিকতার সাপেক্ষেই কোনো বস্তুকে মূল্যায়ন করে থাকে। ধরুন, আপনি রেস্টুরেন্টে ৩৫ ডলারের একটি ওয়াইনের বোতল বিক্রি করতে চান। তাহলে যদি দর্শকদের সামনে সেটি উপস্থাপন করার সময় আপনি আরেকটি বোতল উপস্থাপন করেন যার মূল্য ৬০ ডলার, তাহলে ৩৫ ডলারের বোতলটি বেশি বিক্রি হবে। কিন্তু আপনি যদি ৩৫ ডলারের বোতলের পাশে ১৫ ডলার মূল্যের একটি বোতল রাখেন, তাহলে গ্রাহকের কাছে ৩৫ ডলারের বোতলটিকে অনেক বেশি ব্যয়বহুল মনে হবে, ফলে আপনার বিক্রি কমে যাবে।

মূল পণ্যের পাশে তুলনামূলক বেশি মূল্য বিশিষ্ট পণ্য উপস্থাপন করুন; Source: nickkolenda.com

৪) পণ্যের মূল্য সব সময় .৯৯ দিয়ে শেষ করুন

আপনি যদি ২০ ডলারে কোনো পণ্য বিক্রি করতে চান, তাহলে সেটির মূল্য ২০ ডলার উল্লেখ না করে ১৯.৯৯ ডলার উল্লেখ করুন। যদিও এদের মধ্যে পার্থক্য মাত্র ১ সেন্ট, কিন্তু ক্রেতাদের কাছে সেটিই বিশাল একটা ব্যাপার। জেসি পেনি একবার তাদের সব পণ্যের মূল্য .৯৯ থেকে ১ সেন্ট বাড়িয়ে দিয়েছিল। অর্থাৎ ১৮.৯৯ ডলারের পণ্যকে ১৯ ডলার, ১৯.৯৯ ডলারের পণ্যকে ২০ ডলার হিসেবে নির্ধারণ করে দিয়েছিল। সাধারণ হিসেব অনুযায়ী তাদের সামান্য লাভ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেছে, তাদের পণ্যের বিক্রি ৩০ শতাংশ হ্রাস পেয়েছিল।

এর কারণ হিসেবে চাল্ডিনি বলেন, আমরা সাধারণত দশমিকের বামের অঙ্কগুলোকেই বেশি গুরুত্ব দিয়ে থাকি। তাই যদিও ১৯ এবং ১৯.৯৯ এর মধ্যকার পার্থক্য প্রায় ১ ডলারের কাছাকাছি, কিন্তু তা আমাদের কাছে খুব বেশি মনে হয় না। কিন্তু অপরদিকে ১৯ এর সাথে ১৮.৯৯ এর মধ্যকার পার্থক্য মাত্র ১ সেন্ট হওয়া সত্ত্বেও আমাদের কাছে সেই পার্থক্য অনেক বেশি মনে হয়। তাই ১৯ ডলার মূল্যের কোনো পণ্যের দাম সামান্য একটু বাড়াতে চাইলে ১৯.৯৯ ডলার করা ভালো, কিন্তু কমাতে চাইলে ১৮.৯৯ ডলারই যথেষ্ট।

পণ্যের মূল্য .৯৯ দিয়ে শেষ করুন; Source: nickkolenda.com

৫) বিজোড় এবং অপূর্ণ সংখ্যা ব্যবহার করুন

আপনাকে যদি বলা হয় একটি দেশের রেলওয়ে স্টেশনের ট্রেনগুলোর রাত্রিকালীন সময়সূচী যথাক্রমে ৮:০০, ১০:০০ এবং ১২:০০টায়, আর অন্য একটি দেশের রেলওয়ে স্টেশনের ট্রেনগুলোর সময়সূচী যথাক্রমে ৭:৫৫, ১০:০৭, এবং ১১:৫৩টায়, আপনার কাছে কোন দেশের সময়সূচীকে বেশি কার্যকর বলে মনে হবে? নিশ্চয়ই দ্বিতীয়টির! একইভাবে, আপনাকে ৩০ মিনিটের মিটিংয়ের চেয়ে ২৯ মিনিটের কথা বললে আপনি বেশি আগ্রহী হবেন। ২ ঘন্টার ট্রেনিং সেশনের চেয়ে ১ ঘন্টা ৫৫ মিনিটের ট্রেনিং সেশনের কথা বললে আপনি যেতে বেশি আগ্রহ বোধ করবেন।

আমাদের মধ্যে বিজোড় এবং অপূর্ণ সংখ্যাকে বেশি বিশ্বাস করার এবং গুরুত্ব দেওয়ার একটি সহজাত প্রবণতা আছে। যদিও পার্থক্য খুবই সামান্য, কিন্তু এই ধরনের সংখ্যা ব্যবহার করে আপনি সহজেই ক্রেতাদেরকে আকৃষ্ট করতে পারবেন এবং আপনার পণ্যকে আরও বেশি মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে পারবেন।

৬) লক্ষ্যমাত্রার জন্য নির্দিষ্ট মানের পরিবর্তে ব্যাপ্তি নির্ধারণ করুন

মানুষ একটি নির্দিষ্ট সংখ্যার চেয়ে সর্বোচ্চ এবং সর্বনিম্ন পাল্লা বিশিষ্ট লক্ষ্যমাত্রার প্রতি বেশি আকৃষ্ট হয়। যেমন যদি বলা হয়, আপনাকে আগামী এক সপ্তাহে আপনাকে ২ পাউন্ড ওজন কমাতে হবে, অথবা ১ থেকে ৩ পাউন্ডের মধ্যে ওজন কমাতে হবে, আপনি কোনটাকে বেশি অর্জনযোগ্য মনে করবেন? চাল্ডিনি বলেন, ওজম কমানোর একটি সমীক্ষায় দেখা গেছে, যাদেরকে ১ থেকে ৩ পাউন্ড ওজন কমানোর লক্ষ্যমাত্রা দেওয়া হয়েছিল, তারা বাস্তবে ২.৬৭ পাউন্ড কমাতে পেরেছিল। অন্যদিকে যাদেরকে ২ পাউন্ড ওজন কমাতে বলা হয়েছিল, তারা ২.২ পাউন্ড কমাতে পেরেছিল।

চাল্ডিনি ব্যাপারটিকে ব্যাখ্যা করেন এভাবে, একটি নির্দিষ্ট লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে দিলে অনেকেই সেটাকে অসম্ভব মনে করে শুরুতেই হাল ছেড়ে দেয়। কিন্তু একটি ব্যাপ্তি নির্ধারণ করে দিলে অধিকাংশ মানুষই সেটাকে অর্জনযোগ্য মনে করে, এবং বাস্তবে দেখা যায় কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যমাত্রার চেয়েও বেশি অর্জন করা সম্ভব হয়। মানুষের মনস্তাত্ত্বিক এই বৈশিষ্ট্যকে ব্যবসায়িক ক্ষেত্রেও কাজে লাগানো যেতে পারে। সেলস এজেন্টদেরকে একটি নির্দিষ্ট লক্ষ্যমাত্রা না দিয়ে সর্বোচ্চ এবং সর্বনিম্ন সীমা নির্ধারণ করে দেওয়ার মাধ্যমে পণ্যের বিক্রয় কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যমাত্রার চেয়েও বৃদ্ধি করা সম্ভব।

ফিচার ইমেজ- marketingmind.in

Related Articles