দৃষ্টিশক্তি হারিয়েও নিজের প্রতিভাকে হারাতে দেননি যারা

আমরা কত সৌভাগ্যবান, তাই না? চোখ ভরে প্রকৃতির সবুজ দেখতে পাই। দেখতে পাই পাখির উড়ে যাওয়ার সৌন্দর্য। বিচিত্র রকমের মানুষের ভীড়ে হারিয়ে যেতে ভালবাসি। কিন্তু একজন দৃষ্টি প্রতিবন্ধী তার কিছুই দেখতে পান না। এমতাবস্থায় তার কাছে জীবনটা অভিশাপ মনে হতেই পারে। কিন্তু এমনও মানুষ আছেন যারা তাদের এই সীমাবদ্ধতাকে জয় করে আমাদের মতো আমজনতাকে পেরিয়ে গেছেন, পৌঁছে গেছেন সাফল্যের অন্য উচ্চতায়। আজ এমনই কয়েকজন অসাধারণ মানুষদের গল্প জানাবো আপনাদের।

আন্দ্রে বচেল্লি

আন্দ্রে বচেল্লি একজন বিখ্যাত ইতালিয়ান গায়ক ও গীতিকার। তিনি ১৯৫৮ সালের ২২ সেপ্টেম্বর ইতালির লাটাজিওতে জন্মগ্রহণ করেন। জন্মের পরপর চোখের কনজেনিটাল গ্লুকোমা নামক রোগে আক্রান্ত হন আন্দ্রে বচেল্লি। ছোটবেলা থেকেই সংগীতের প্রতি তার প্রবল ঝোঁক ছিল। ছয় বছর বয়সে পিয়ানো বাজানো শেখা শুরু করেন। পরে বাঁশি ও সেক্সোফোন বাজানোও শিখে ফেলেন। কিন্তু তার এই সুখের সময় বেশিদিন স্থায়ী হলো না। ১২ বছর বয়সে সকার খেলতে গিয়ে মাথায় আঘাত পেলেন। আর তখনই পুরোপুরি দৃষ্টি শক্তি হারিয়ে ফেলেন বচেল্লি।

কিন্তু তিনি এতে থেমে থাকলেন না। পড়াশোনা চালিয়ে গেলেন। তার বাবা মা চাইতেন তিনি আইনজীবী হবেন। বচেল্লি তখন ইউনিভার্সিটি অব পিসা থেকে আইন বিষয়ে স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন এবং আইনচর্চা শুরু করেন। কিন্তু পড়াশোনার পাশাপাশি সংগীতচর্চা করতে ভোলেননি। আরেক সংগীতশিল্পী ফ্রাংকো কোরেলির সাথে গান শিখতেন। আর পড়াশোনার খরচ যোগানোর জন্য পানশালায় পিয়ানো বাজাতেন।

আন্দ্রে বচেল্লি; Image Source: billboard.com

১৯৯২ সালে বচেল্লির জীবনের মোড় বদলে যায়। এসময় ইতালিয়ান পপতারকা জুকারো ফরনাসিয়ারি তাকে ‘মিসেরারি’ গানটির একটি ডেমো ভার্সন দিতে বলেন যেটা আরেক সংগীত তারকা লুসিয়ানো পাভারোত্তির গাওয়ার কথা ছিল। পাভারোত্তি বচেল্লির গলা শুনে খুবই খুশি হন। এভাবেই তাদের বন্ধুত্বের শুরু হয়। এরপরই ১৯৯৪ সালে আসে তার প্রথম অ্যালবাম ‘ইল মারে কামো ডেল্লা সেরা’। এটি তাকে ইউরোপ জোড়া খ্যাতি এনে দেয়।

১৯৯৫ সালে নিজের নামে অ্যালবাম প্রকাশ করেন বচেল্লি। এর একটি গান ছিল কন তে পারতিরো। পরে ১৯৯৭ সালে এই গানের ইংরেজি সংস্করণ টাইম টু সে গুডবাই গানটি সারাহ ব্রাইটম্যান এর সাথে দ্বৈত সংগীত হিসাবে রোমানাজা এলবামে প্রকাশ করেন। দুই সংস্করণই তুমুল জনপ্রিয়তা পায়। গানের জগতে তার সবচেয়ে প্রিয় জায়গাটি ছিল অপেরা। টাইটানিক খ্যাত সেলিন ডিওনের সাথে গাওয়া দ্য প্রেয়ার গানটিও বেশ জনপ্রিয়তা পায়। এছাড়া আরো উল্লেখযোগ্য অ্যালবামের মধ্যে আচ্ছে আমোর (২০০৬), প্যাশন (২০১৩), সিনেমা (২০১৫), সি (২০১৮)। আমোর অ্যালবামে ক্রিস্টিনা আগুয়েরোর সাথে এবং প্যাশোন অ্যালবামে জেনিফার লোপেজের সাথে দ্বৈত গান করেন। তিনি এখন পর্যন্ত চার বার গ্র্যামি অ্যাওয়ার্ড মনোনয়ন পান।

মারলা রানইয়ান

মারলা রানইয়ান একজন বিশ্বমানের সাবেক আমেরিকান অ্যাথলেট এবং ম্যারাথন দৌড়বিদ। তিনিও ছোটবেলা থেকে দৃষ্টি প্রতিবন্ধী। ১৯৬৯ সালে ক্যালিফোর্নিয়ার সান্তা মারিয়ায় জন্ম তার। নয় বছর বয়সে তার ‘স্টারগার্ডটস ডিজিস’ নামে একটি রোগে আক্রান্ত হয়ে দৃষ্টি হারান তিনি। তিনি ১৯৮৭ সালে এডোলফো ক্যামারিল্লো হাই স্কুল থেকে স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন। পরে তিনি স্যান ডিয়াগোতে চলে যান। সেখানে কমুনিকেটিভ ডিজঅর্ডারে ১৯৯৪ সালে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন।

স্যান ডিয়াগোতে থাকাকালীন তিনি বিভিন্ন অ্যাথলেটিক ইভেন্টে অংশ নেয়া শুরু করেন। ২০০ মিটার দৌড়, হাইজাম্প, হেপ্টাথলোন (এক সাথে ৭টি ইভেন্টের প্রতিযোগিতা), ৮০০ মিটার দৌড় এসব প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে থাকেন। ১৯৯৬ সালে অলিম্পিকে হেপ্টাথলোন ক্যাটাগরিতে প্রথম বাছাইয়ে সুযোগ পান। কিন্তু অলিম্পিক দলে জায়গা করে নিতে পারেননি।

 
মারলা রানইয়ান; Image Source: limitlesspursuits.com
 

১৯৯২ সালে তিনি প্রথম প্যারা অলিম্পিকে অংশ নেন। ১৯৯৬ সালেও অংশ নেন। তিনি প্যারা অলিম্পিকে মোট পাঁচটি স্বর্ণপদক জিতেছেন। ১৯৯৯ সালে প্যান আমেরিকান গেমসে ১৫০০ মিটার দৌড়ে স্বর্ণপদক জেতেন। ২০০০ সালে তিনি প্রথম দৃষ্টি প্রতিবন্ধী অ্যাথলেট হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের অলিম্পিক দলে জায়গা করে নেন। ১৫০০ মিটার দৌড়ে অংশ নিয়ে অষ্টম স্থানে থাকেন। পরে ২০০৪ এর অলিম্পিকেও অংশ নেন।

তিনি নিউ ইয়র্ক সিটি ম্যারাথনে অংশ নিয়ে অভিষেকে নারীদের মধ্যে দ্বিতীয় দ্রুততম হন। তিনি ২০০৩ এর বোস্টন ম্যারাথনে পঞ্চম, ২০০৪ এ শিকাগো ম্যারাথনে সপ্তম এবং ২০০৬ এ টুইন সিটিজ ম্যারাথনে প্রথম হন। এছাড়াও আরো অনেক পুরষ্কার পান অ্যাথলেটিকসের জন্য। ২০০১ সালে তার আত্মজীবনীমূলক বই নো ফিনিশ লাইন মাই লাইফ: এজ আই সি ইট প্রকাশ করেন।

এরপর ২০০২ সালে তার কোচ ম্যাট লোনেরগানকে বিয়ে করেন। ২০০৮ অলিম্পিকেও অংশ নিতে চেয়েছিলেন। কিন্তু পিঠের সমস্যার কারণে আর অংশ নেয়া হয়নি। ২০১৩ সাল পর্যন্ত তিনি ম্যাসাচুসেটসের দৃষ্টি প্রতিবন্ধীদের পারকিন্স স্কুলে শিক্ষকতা করেছেন এবং এর দূত হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। এই স্কুলে আরেক বিখ্যাত দৃষ্টি প্রতিবন্ধী ব্যক্তিত্ব হেলেন কেলারও পড়াশোনা করেছিলেন। ২০১৪ সালে স্বামীর সাথে নর্থ ইস্টার্ন ইউনিভার্সিটিতে কোচ হিসেবে যোগ দেন।

ডেভিড এ. প্যাটারসন

ডেভিড এ. প্যাটারসন নিউইয়র্ক স্টেটের প্রথম আফ্রিকান-আমেরিকান গভর্নর। তিনি ১৯৫৪ সালের ২০ মে নিউইয়র্কের ব্রুকলিনে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবা বাসিল প্যাটারসন ছিলেন শ্রমিকদের আইনজীবী এবং মা পোরশিয়া প্যাটারসন ছিলেন গৃহিণী। তারা পারিবারিকভাবেই রাজনীতির সাথে জড়িত ছিলেন। বাবা বাসিল প্যাটারসন ছিলেন নিউইয়র্কের প্রথম আফ্রিকান-আমেরিকান সেক্রেটারি অব স্টেট এবং ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক পার্টির প্রথম আফ্রিকান-আমেরিকান ভাইস চেয়ারম্যান।

 
ডেভিড প্যাটারসন; Image Source: libn.com
 

জন্মের কিছুদিন পরেই প্যাটারসনের কানে একটি জটিল ইনফেকশন দেখা দেয়, যেটা তার অপটিক নার্ভে ছড়িয়ে পড়ে। এ কারণে তার বাম চোখের দৃষ্টি পুরোপুরি চলে যায় এবং ডান চোখের দৃষ্টিশক্তিও ক্ষীণ হয়ে আসে। তার দৃষ্টিহীনতা ও নিউইয়র্ক পাবলিক স্কুলের নিয়মের কারণে স্কুলে পড়ালেখা করা কঠিন হয়ে পড়ে। প্যাটারসনকে স্পেশাল ক্লাসে পড়তে বলা হয়। কিন্তু প্যাটারসন চাইতেন স্কুলের অন্যান্য স্বাভাবিক ছাত্রদের মতো ক্লাস করতে।

প্যাটারসনের ইচ্ছা পূরণের জন্য তার বাবা মা হেম্পস্টিডে একটি বাড়ি কেনেন এবং তাকে হেম্পস্টিড পাবলিক স্কুলে ভর্তি করেন। তিনি ছিলেন সেই স্কুলের প্রথম দৃষ্টি প্রতিবন্ধী ছাত্র। তিনি ১৯৭১ সালে স্কুল থেকে গ্র্যাজুয়েশন সম্পন্ন করেন। পরের বছর তিনি কলম্বিয়া ইউনিভার্সিটিতে সেরা ছাত্র হিসেবে ভর্তি হন এবং প্রথম সেমিস্টারে ডিন লিস্টে জায়গা করে নেন। কিন্তু পরের সেমিস্টারে ডিন লিস্ট থেকে বের হয়ে যান।

তখন এক প্রফেসরের কথায় পড়াশোনা থেকে সাময়িক বিরতি নেন। এ সময় তিনি চাকরি নেন। তারপর আবার কলাম্বিয়ায় ফিরে যান। হফস্ট্রা ইউনিভার্সিটির ল স্কুলে পড়া শোনা শুরু করেন। ১৯৮২ সালে সেখানের পাট শেষ করে কুইনস ডিস্ট্রিক্ট অ্যাটর্নি অফিসে সহকারী আইনজীবী হিসেবে কাজ করা শুরু করেন। এরপর জড়িয়ে পড়েন রাজনীতিতে।

১৯৮৫ সালে মাত্র ৩১ বছর বয়সে নিউইয়র্কের ইতিহাসে সবচেয়ে কম বয়সী সিনেটর নির্বাচিত হন। ২০০৭ সালে তিনি নিউইয়র্কের প্রথম আফ্রিকান-আমেরিকান লেফটেনেন্ট গভর্নর হন। ২০০৮ সালে নিউইয়র্কের প্রথম আফ্রিকান-আমেরিকান গভর্নর হন। তিনি বর্তমানে ডেমোক্রেটিক ন্যাশনাল কমিটির সদস্য এবং ডেমোক্রেটিক লেজিস্লেটিভ ক্যাম্পেইন কমিটির বোর্ড সদস্য। তিনি এবং তার স্ত্রী মিশেল পেইজ প্যাটারসন নিউইয়র্ক সিটিতে থাকেন। তাদের দুইটি সন্তান রয়েছে।

আশরাফ আরমাগন

আশরাফ আরমাগন তুরস্কের একজন বিখ্যাত চিত্রশিল্পী। তিনিও একজন জন্মান্ধ। ১৯৫৩ সালে তুরস্কের ইস্তাম্বুলে জন্ম তার। ছোটবেলায় তিনি নখ দিয়ে কার্ডবোর্ডের মাঝে বিভিন্ন ধরনের প্যাটার্ন আঁকার চেষ্টা করতেন। এরপর তা পেন্সিল দিয়ে কাগজে আঁকতেন। তখনো চিত্রশিল্পী হওয়ার আকাঙ্ক্ষা জাগেনি। আট বছর বয়সে তিনি রঙ পেন্সিল দিয়ে একটি প্রজাপতি আঁকেন। এটিই ছিল তার প্রথম ছবি আঁকা। ১৮ বছর বয়সে তিনি তৈলচিত্র আঁকা শুরু করেন। তখন থেকেই ছবি আঁকাটা তার আবেগের সাথে মিশে যায়।

 
আশরাফ আরমাগন; Image Source: esrefarmagan.com

ধীরে ধীরে তিনি আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও পরিচিত হতে থাকলেন তার চিত্রশিল্পের মাধ্যমে। তার প্রতিভায় মুগ্ধ হয়ে ২০০৪ সালে হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় তাকে আমন্ত্রণ জানায় তার মস্তিষ্ক এবং চোখ পরীক্ষা করে গবেষণার জন্য। এরপর নিউ সায়েন্টিস্ট ম্যাগাজিনে তাকে নিয়ে একটি ফিচার প্রকাশিত হয়। এছাড়া ডিসকভারি চ্যানেলেও তাকে নিয়ে একটি ডকুমেন্টারি প্রচারিত হয়।

আশরাফ আরমাগনের আঁকা একটি ছবি; Image Source: Eşref Armağan

তিনি প্রথমে পুরো ছবিটি নিজের মাথায় কল্পনা করেন। এরপর ঠিক করেন কোন রঙ ব্যবহার করবেন। তিনি সাদা কালোসহ আরো পাঁচটি রঙ ব্যবহার করে ছবি আঁকেন। পাহাড়, বাড়ি, মানুষ, প্রজাপতি সবই আঁকেন, কিন্তু এসব জিনিস কখনো নিজ চোখে দেখেননি এই প্রতিভাধর মানুষটি। 

This is a Bangla article about some extraordinary blind people.Its about how they overcame their barriers. All the information sources are hyperlinked inside the article. 

Featured Image: Chris Hondros/Getty Images

Related Articles