বুদ্ধিমান ব্যক্তিদের ১০টি বৈশিষ্ট্য

বুদ্ধিমত্তা স্রষ্টা প্রদত্ত এক অনন্য উপহার। উন্নত বুদ্ধিমত্তার কারণেই মানুষ সৃষ্টির সেরা জীব হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে। মানুষের মধ্যে যাদের বুদ্ধিমত্তা স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি তাদেরকে আমরা ‘বুদ্ধিমান’ বলি। সাধারণত বুদ্ধিমত্তা বলতে বোঝায় কোনো কিছু শেখার ক্ষমতা এবং নতুন বা বৈরী পরিবেশে খাপ খাওয়ানোর ক্ষমতা। তাহলে বলতে হয়, যারা বুদ্ধিমান তাদের এই ক্ষমতাগুলো একটু বেশি।

প্রতীকী ছবি; Source: purple centre

তাদের কোনো বিষয় বোঝার ক্ষমতা, সৃষ্টিশীলতা, সমস্যা সমাধানের ক্ষমতা প্রভৃতি অন্যদের চেয়ে বেশি হয়ে থাকে। তাই আপনি যখন কাউকে বুদ্ধিমান বলছেন মানে তার মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতা এবং আচার-ব্যবহারের বিবেচনায় তিনি ‘বিশেষ’ কেউ। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, কোন ব্যাপারগুলো একজন মানুষকে বুদ্ধিমান হিসেবে পরিচিত করে? বুদ্ধিমান মানুষের কিছু সাধারণ বৈশিষ্ট্য আছে যা তাদেরকে নিয়ে যায় অনন্য উচ্চতায়। বুদ্ধিমান মানুষের এমনই কিছু বৈশিষ্ট্য নিয়েই আজকের আয়োজন। দেখুন তো, এগুলোর কোন কোন বৈশিষ্ট্য আপনার মাঝে আছে?

১. বুদ্ধিমানরা শিখতে ভালবাসেন

বুদ্ধিমান মানুষ কোনো কারণ বা উদ্দেশ্য ছাড়াই শেখেন। আমরা সাধারণত কোনো উদ্দেশ্য থাকলে তা গভীর মনোযোগ সহকারে শিখি। এমনকি আমরা যে স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ে এত কষ্ট করে পড়াশোনা করি তার পেছনেও কারণ থাকে। তা সেটা ভালো ফলাফল, সার্টিফিকেট, সম্মান, সুখ্যাতি, বাবা-মায়ের স্বপ্নপূরণ বা ভালো বিয়ে যা-ই হোক না কেন। কিন্তু যারা বুদ্ধিমান তারা এরকম কোনো উদ্দেশ্য ছাড়াই শেখেন। কারণ তারা জানেন, নতুন কিছু শেখা নতুন ধারণার জন্ম দিতে পারে এবং উপলব্ধিতে বৈপ্লবিক পরিবর্তন নিয়ে আসতে পারে।

স্টিভ জবস; Source:CNBC.com

বিখ্যাত প্রযুক্তিনির্মাতা প্রতিষ্ঠান অ্যাপলের সহ প্রতিষ্ঠাতা স্টিভ জবসকে সকলে বুদ্ধিমান হিসেবেই জানেন। অনেকেরই জানা আছে যে, তিনি কলেজের গণ্ডিও পেরোতে পারেননি। তারপরও তার দারুণ দারুণ সব আইডিয়া দিয়ে অ্যাপলকে প্রযুক্তি জগতে অন্যতম মোড়লের ভূমিকায় অধিষ্ঠিত করেছেন। কারণ কী? স্টিভ জবস শিখতে পছন্দ করতেন। তিনি বলতেন, জীবনে সফল হতে হলে ক্লাসরুমের বাইরেও শিখতে হবে। বুদ্ধিমানরা জানেন, কোনো মানুষের পক্ষে সবকিছু জানা সম্ভব নয়। তাই কোনো ব্যাপারে না জানলে তারা সহজেই বলতে পারেন, “আমি জানি না”। এতে অনেক অজানা ও নতুন তথ্য জানতে পারেন তারা।

২. বুদ্ধিমান মানুষ আত্মনিয়ন্ত্রণ করতে পারেন

আত্মনিয়ন্ত্রণ সহজ নয়; Source: huffington post

নিজের আবেগ-অনুভূতি এবং আচার-আচরণকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারাকেই সাধারণভাবে আত্মনিয়ন্ত্রণ বলা হয়। আত্মনিয়ন্ত্রণ খুব কঠিন একটি কাজ। সবাই পারেন না। বুদ্ধিমানদের এই গুণটি থাকে। বিশেষজ্ঞদের মতে, বুদ্ধিমান মানুষ লক্ষ্য অর্জনের প্রয়োজনীয়তা, পরিকল্পনা, বিকল্প কৌশল এবং পরবর্তী ফলাফল মাথায় রেখে নিজেদের আবেগকে বাগে আনতে পারেন। এক গবেষণায় অংশগ্রহণকারীদের জন্য দুই ধরনের আর্থিক পুরষ্কারের ব্যবস্থা রাখা হয়েছিল। একটি হলো তাৎক্ষণিকভাবে কম অর্থ প্রদান করা হবে আর আরেকটি হলো কিছুদিন পর বেশি অর্থ প্রদান করা হবে। যারা কিছু সময় অপেক্ষা করে বেশি অর্থ গ্রহণ করার পক্ষপাতী ছিলেন, দেখা গেছে, তাদের বুদ্ধিমত্তা বেশি। এভাবে বুদ্ধিমানরা সাময়িক লাভকে পাত্তা না দিয়ে বৃহত্তর লাভকে অগ্রাধিকার দেন।

৩. বুদ্ধিমানরা মুক্ত মনের হয়ে থাকেন

বুদ্ধিমান মানুষ সব ধরনের ধারণার প্রতি ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি দেখান; Source:big think

বুদ্ধিমান মানুষেরা সবসময় নতুন ধ্যানধারণা এবং বিকল্প কৌশলকে স্বাগত জানান। আপনার মাথায় যদি সত্যিই দারুণ কোনো সৃজনশীল আইডিয়া থেকে থাকে এবং আপনি বুদ্ধিমান কাউকে তা বলতে চান, তিনি তা মনোযোগ দিয়ে শুনবেন। এমনকি যদি আপনার আইডিয়া তার মতামতের সাথে সাংঘর্ষিকও হয়। তারা জাতি, ধর্ম, বর্ণ বা লিঙ্গ দিয়ে কাউকে বিচার করেন না। তারা ভিন্নমতের প্রতি সহনশীল হয়ে থাকেন। তারা মানবাধিকারের প্রতি শ্রদ্ধাশীল।

৪. বুদ্ধিমানদের অভিযোজন ক্ষমতা বেশি

নতুন পরিবেশের সাথে খাপ খাওয়ানোর জন্য নিজের আচার-ব্যবহার পরিবর্তন করতে পারার ক্ষমতাই হচ্ছে অভিযোজন ক্ষমতা। পরিবেশের সাথে কার্যকরভাবে মানিয়ে চলার ক্ষমতা বুদ্ধিমত্তার অন্যতম শর্ত। বুদ্ধিমান মানুষ সহজেই নতুন পরিবেশে নিজেকে বদলাতে পারেন এবং সেই পরিবেশেও পরিবর্তন আনেন। তারা এক্ষেত্রে তাদের চিন্তা-চেতনা এবং মূল্যবোধকে বদলে নতুন রূপ দিতে পারেন।

৫. বুদ্ধিমানরা ভালো অনুমান করতে পারেন

বুদ্ধিমানদের অনুমান ক্ষমতা ভালো হয়। তার মানে এই নয় যে, তারা মানুষের মন পড়তে পারার মতো কোনো অতিপ্রাকৃতিক ক্ষমতার অধিকারী। তবে তারা তাদের আশেপাশের মানুষের আবেগের অবস্থা এবং উদ্দেশ্য আঁচ করতে পারেন। কারো মানসিক অবস্থার হঠাৎ পরিবর্তন তারা ধরে ফেলতে পারেন।

বুদ্ধিমান মানুষ প্রিয়জনের মনের অবস্থা বোঝেন; Source:shutterstock

এই বিশেষ গুণের কারণে তারা বন্ধু এবং প্রিয়জনের খারাপ সময়ে তাদেরকে বুঝতে পারেন। তাদের প্রয়োজনীয় সহায়তা করতে পারেন এবং তাদের সমস্যা সমাধান করতে পারেন।

৬. বুদ্ধিমানরা একাকীত্ব পছন্দ করেন

নিজেতে হারিয়ে যাওয়া; Source: wordpress

বুদ্ধিমানরা একা থাকতে ভালবাসেন। তার মানে এই নয় যে, পৃথিবীর তাবৎ বহির্মুখী স্বভাবের লোকজন বোকাসোকা প্রকৃতির। বুদ্ধিমানরা একাকীত্ব পছন্দ করেন এর অর্থ হচ্ছে তারা তাদের একাকী থাকার সময়টুকুকে কাজে লাগান এবং নিজের সঙ্গ উপভোগ করেন। অনেক মানুষের ভীড়ে তাদের কথার অত্যাচারে আমাদের চিন্তা বিঘ্নিত হয় এবং কাজকর্মে বাধা সৃষ্টি হয়। একা থাকলে কাজ করা অনেকটাই সহজ হয়ে যায়। পৃথিবীর বরেণ্য সব সাহিত্যিক, দার্শনিক বা বিজ্ঞানী একা কাজ করতেই ভালবাসতেন। তাদের যুগান্তকারী ধ্যানধারণা বা আবিষ্কার তাদের একাকীত্বেরই দান।

৭. বুদ্ধিমানরা পরিমিত ঝুঁকি নেন

ঝুঁকিহীন জীবন একঘেয়ে হয়ে থাকে। কিন্তু অতিরিক্ত ঝুঁকি নিয়ে সর্বস্ব হারানো কোনো কাজের কথা নয়। এরকম কাজ করা বুদ্ধিহীনতার পরিচয় দেয়। বুদ্ধিমানরা ঝুঁকি নেন, তবে অনেক হিসাব করে। এরপরও যদি তাদের ব্যর্থতার মুখ দেখতে হয়, তাহলে তাদের নিরন্তর অধ্যবসায় সেই ক্ষতি পূরণ করে দেয়

৮. বুদ্ধিমান ব্যক্তির কৌতুকবোধ আছে

হাস্যরস সম্পর্ককে গাঢ় করে; Source:Shutterstock

কথার মাধ্যমে যোগাযোগ করার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হচ্ছে হাস্যরস। হাস্যরসের মাধ্যমে সহজেই কোনো মানুষের কাছাকাছি চলে যাওয়া যায়। বুদ্ধিমান মানুষের পরিমিত কৌতুকবোধ রয়েছে। তাদের কৌতুক অবশ্য সবসময় গলা ফাটিয়ে হাসার মতো হয় না। তারা স্থান, কাল, পাত্রভেদে কথা বলেন। ভারী বর্ষণমুখর পরিবেশকে হালকা করতে তারা হাস্যরসের আশ্রয় নেন। এক গবেষণায় দেখা গেছে, যারা পত্রিকায় কার্টুনে মজার ক্যাপশন লেখেন তাদের বুদ্ধিমত্তা সাধারণ মানুষের চেয়ে বেশি হয়ে থাকে। আরেক গবেষণায় পাওয়া গেছে, পেশাদার জোকারদের বুদ্ধিমত্তাও বেশি হয়।

৯. তারা ভুল থেকে শিক্ষা নেন

মানুষ মাত্রই ভুল করে। কেউ যতই বুদ্ধিমান হোন না কেন, তিনি ভুলের ঊর্ধ্বে নয়। তবে সাধারণ মানুষের সাথে বুদ্ধিমান মানুষের পার্থক্য হচ্ছে তা তারা ভুলের মধ্যে বসবাস করেন না। তারা ভুলগুলো শুধরে নেন। ভুল থেকে শেখেন। পরবর্তীতে সেই ভুল এড়িয়ে চলেন।

১০. তারা সমস্যা সমাধান করেন

বুদ্ধিমান মানুষ সমস্যা সমাধানে পটু; Source:darren hunter

“সুযোগ ও প্রস্তুতির মুখোমুখি সাক্ষাৎ হলেই সফলতা এসে ধরা দেয়”– জেনে হোক বা না জেনে, প্রতিটি সফল মানুষের জীবনেই জিমি জনসনের এই উক্তির বাস্তব প্রতিফলন লক্ষ্য করা যায়। বুদ্ধিমানরা ভাগ্যের উপর ভরসা করে বসে না থেকে সুযোগ তৈরি করে নেন। এমনকি সমস্যা থেকেও তারা সুযোগ খুঁজে নিতে পারেন। তারা সমস্যা সমাধান করতে ভালবাসেন। সমস্যার প্রতি তাদের আকর্ষণ থাকে। কারণ সমস্যা মানেই মাথা খাটানোর সুযোগ। তারা প্রত্যেকটি পরিবেশের খুঁটিনাটি বিশ্লেষণ করেন এবং তাদের অর্জিত জ্ঞান প্রয়োগ করেন ।

সব মানুষই কম-বেশি বুদ্ধিমান। তবে বুদ্ধিমত্তার সঠিক প্রয়োগের অভাবে সকলকেই কম-বেশি নাকানিচুবানি খেতে হয়। তবে আশার কথা হচ্ছে, চেষ্টা করলে বুদ্ধিমত্তা বাড়ানো যায়।

ফিচার ইমেজ- topdoma.com

Related Articles