প্রতিবারই বছরের শেষ দিনে আমরা আফসোস করি, “আহারে, এই বছরটা বেগার চলে গেলো। কিছুই করলাম না।” এরকম করে পার হয় বছরের পর বছর। সমানুপাতিক হারে বাড়ে দীর্ঘশ্বাসের পাল্লাও। কিছু খুব সাধারণ বিষয় আছে যেগুলো মেনে চললে আপনার এই দীর্ঘশ্বাস পুরোপুরিভাবে লাঘব না হলেও কমে যাবে অনেকখানিই। এমন নয় যে, ব্যাপারগুলো আমরা জানি না, তবে খেয়াল করে মানি না শুধু। আসুন জেনে নিই এমন কিছু বিষয় যা আপনার বয়স ২৫ এর কোঠায় পৌঁছানোর আগে অবশ্যই জানা উচিত।

১. আপনাকে কেউ কিছু দেওয়ার জন্য বাধ্য নয়

একটা সময় পর্যন্ত আমরা মনে করি আমাদের সবকিছুই বোধহয় অন্য কেউ করে দেবে কিংবা কোনো না কোনোভাবে হয়ে যাবে। কিন্তু আসল সত্যটা আমরা টের পাই ২০ পার হয়ে। এই পৃথিবীর কেউ নিজ থেকে আপনাকে কোনো কিছুই করে দেবে না। প্রয়োজনে কাছের মানুষদের সাহায্য চাইতে পারেন। কিন্তু যা কিছু আপনি চান আপনাকেই অর্জন করে নিতে হবে।

২. সেই জিনিস আপনি অন্য কাউকে দিতে পারবেন না যা আপনার নিজেরই নেই

ব্যাপারটা হলো নিজেকে আগে ভালোবাসুন। আমরা অন্য কাউকে অন্ধভাবে ভালোবাসতে গিয়ে নিজেকে ভালোবাসতেই ভুলে যাই। তাই ভালোবাসাটা শুরু হোক নিজের থেকে। নিজেকে দেওয়ার মত একান্ত কিছু সময় বের করুন। নিজের ভালোলাগা, ভালোবাসা আর শখের জায়গাগুলোর যত্ন নিন মাঝে মাঝেই।

৩. আপনার ভুল নিয়ে কেউ মাথা ঘামাবে না

আপনি যদি কখনো কোনো ভুল করেন, তখন কেউ সেটা মনে রাখবে না যদি সেটা থেকে আপনি বের হয়ে আসতে পারেন। বরং ভুল ভেঙ্গে এগিয়ে যেতে পারলেন কিনা সেটাই দেখার বিষয়। তাই ভুলকে দুর্বলতা বা হার নয়, বরং শেখার সুযোগ হিসেবে নিন।

ভুল হোক শেখার সুযোগ; Source: Wikihow

৪. দুশ্চিন্তা করে আসলেই কোন লাভ নেই

দুশ্চিন্তা অনেকটা রকিং চেয়ারের মতন। আপনি চিন্তাগ্রস্ত হয়ে ভীত হবেন, কিন্তু আসলে এগিয়ে যেতে পারবেন না একটুও। তার চেয়ে দুশ্চিন্তা ছেড়ে কাজ ধরুন। খুব সহজ আর ছোট্ট একটা উদাহরণ দিই। ধরুন, কাল আপনার ৬০ পৃষ্ঠার অ্যাসাইনমেন্ট লিখে জমা দিতে হবে। এখন আপনি ‘কীভাবে এই অল্প সময়ে এত লেখা লিখবো’ এই ভেবে ভেবে কাহিল হতেই পারেন। আদৌ কি এতে কোনো লাভ হবে? না। বরং যতক্ষণ বসে দুশ্চিন্তা করলেন ততক্ষণে হয়তো বেশ কয়েকটা পৃষ্ঠা লিখে ফেলতে পারতেন।

৫. বয়স হচ্ছে! ব্যাপারটা নেহাৎ মন্দ নয়

আমরা প্রায়ই আক্ষেপ করি, “‘আহারে। বুড়ো হয়ে যাচ্ছি।” বয়স বাড়ছে বলে দুঃখ করার কি আছে? আপনার বয়স বাড়ছে তার মানে আপনি বেশিদিন বেঁচে আছেন। ক’জন এই সুযোগটা পাচ্ছে ভাবুন তো একবার!

৬. ভিন্ন মতামত ও সংস্কৃতিকে সম্মান করলে বাড়ে শেখার সুযোগ

ভিন্নতা সবসময়ই আপনার শেখার জায়গাকে দেয় নতুন মাত্রা। আমরা প্রায় সময়ই ভিন্ন চিন্তা বা ভিন্ন সংস্কৃতিকে সহজভাবে গ্রহণ করতে পারি না। এতে করে লাভ আসলে কিছুই হয় না, উপরন্তু আমরা দারুণ কিছু শেখার আর জানার সুযোগ হারাই শুধু।

৭. যোগাযোগ দক্ষতা খুবই গুরুত্বপূর্ণ

আজকাল কার্যকরী যোগাযোগ দক্ষতা না থাকলে আপনি অনেক সুযোগ থেকে বঞ্চিত হবেন। যোগাযোগের ক্ষেত্রে খুব গুরুত্বপূর্ণ হলো যোগাযোগের আগে কয়েকবার ভাবা। কাউকে মেইল বা টেক্সট করার ক্ষেত্রে একবার ভাবুন, একবার চোখ বুলিয়ে নিন কোনো অসংগতি আছে কিনা। কোনো মিটিংয়ে কোনো কথা বলার আগে ভাবুন আপনার কথাটা এখানে কতটা সংগতিপূর্ণ, আপনার কথা সত্যিই প্রয়োজনীয় কিনা কিংবা কথা বললেও তার প্রকাশভঙ্গি কেমন হবে?

কার্যকরী যোগাযোগ দক্ষতা আপনার পেশাগত জীবনে ভিন্নমাত্রা যোগ করবে; source: Womenworking

৮. সময় এবং টাকার ব্যবহারে বুদ্ধিমত্তার পরিচয়

আপনার টাকা যতটা মূল্যবান, সময় তার চাইতে কোনো অংশে কম নয়। আমরা অকারণে টাকা তো খরচ করেই ফেলি, পাশাপাশি খামখেয়ালে নষ্ট করি প্রচুর সময়। কোনোদিন কি ভেবে দেখেছেন, যে মুহূর্তটা আপনার জীবন থেকে চলে গেছে সেই মুহূর্ত আপনি চাইলেও আর ফিরে পাবেন না? তাই সময় আর টাকার ব্যবহারে হন মিতব্যয়ী।

৯. প্রাণোচ্ছলতাই জীবন

আপনার পরিকল্পনা মতো অনেক কিছুই হবে আবার অনেক কিছুই হবে না। ভেঙ্গে পড়ার কিছু নেই। কারণ ঠিক যতক্ষণ পর্যন্ত আপনি বেঁচে আছেন ততক্ষণ পর্যন্ত শেষ হয় না কিছুই। আপনার প্রাণোচ্ছলতা আর উদ্যম আপনাকে দেবে বেঁচে থাকার অণুপ্রেরণা। তাই থাকুন হাসিখুশি আর প্রাণোচ্ছল। দুঃখ তো আসবেই জীবনে। তাই বলে আপনি আনন্দ করতে ভুলে যাবেন? কষ্ট আর হতাশাকে গ্রহণ করুন শেখার সুযোগ হিসেবে।

মনোবিজ্ঞানীরা মনে করেন হাসিখুশি থাকাটাই সুস্থ জীবনযাপনের মূলমন্ত্র; Source: juan-rocha

১১. প্রতিভা নয়, বরং কঠোর পরিশ্রমই আপনাকে সাফল্য এনে দেবে

সত্যি বলতে কি, একজন প্রতিভাবান ব্যক্তি কঠোর পরিশ্রম ছাড়া কখনোই সফল হতে পারেন না। দিন শেষে সফল হয় তারাই যারা ধৈর্য্য নিয়ে কোনো কিছুর পেছনে লেগে ছিলেন। তাই আমি এটা পারি না ভেবে দুঃখ না করে বরং সেটি শিখে নিন।

১২. আপনার প্রয়োজনের কথা জানান

আমরা অনেক সময় বিভিন্ন আগপাছ ভেবে নিজের প্রয়োজন কিংবা চাহিদার কথা প্রকাশ করতে দ্বিধা বোধ করি। কী হবে না হবে সেটা অনেক পরের ব্যাপার। কিন্তু আপনি যদি আপনার প্রয়োজনের কথাটি না-ই জানাতে পারেন, তাহলে তা পূরণ হওয়ার আশা করা নিতান্তই বোকামি।

১৩. কমপক্ষে একটি বিদেশি ভাষায় দক্ষ হন

ভাষা শেখা আপাতদৃষ্টিতে খুব কঠিন মনে হলেও আপনি যদি নিয়ম করে ছ’মাস সময় দেন, তাহলে আপনি খুব সহজেই মোটামুটি চালিয়ে নেওয়ার মতো একটি বিদেশী ভাষা রপ্ত করে ফেলতে পারবেন। এ যুগে নিজের ভাষার বাইরে বেশ কিছু বিদেশী ভাষা জানা থাকলে তা চাকরি, পড়াশোনা সবখানেই আপনাকে এগিয়ে রাখবে। বেশী শিখতে না পারলে অন্তত পক্ষে ইংরেজীটা অবশ্যই শিখে ফেলুন।

একুশ শতকের এই জীবনধারার সাথে মানিয়ে নিতে কমপক্ষে একটি হলেও বিদেশি ভাষা আপনাকে জানতেই হবে; Source: Fluent-in-3-months

১৪. মানুষকে সম্মান করুন

বয়স কিংবা পদমর্যাদায় বড়-ছোট সব মানুষকে সম্মান করুন। এমনকি সে যদি সম্মান পাওয়ার যোগ্য না হয় তবুও। আপনি যদি অন্যকে সম্মান না করেন, তবে অন্য কারোর কাছ থেকে সম্মান আশা করাটা বোকামি নিঃসন্দেহে।

১৫. প্যাশন খুঁজে পাওয়া যায় না

আলাদা করে প্যাশন খুঁজতে যাবেন না। আসলে আপনি যা করতে ভালোবাসেন তাই আপনার প্যাশন। নিজের প্যাশন খু্ঁজে পেলে কাজ শুরু করবো- এমন ভাবনা ছেড়ে দিন। কাজ করতে গিয়েই বুঝে যাবেন কোনটা আপনার প্যাশন।

১৬. আপনার কাজকে ভালোবাসুন

যদি সত্যিই অর্থপূর্ণ কিছু করতে চান, বিশেষ কিছু তৈরি করতে চান কিংবা সম্পর্ককে টিকিয়ে রাখতে চান, তবে তাকে ভালোবাসুন, যত্ন নিন। ব্যাপারটা আপনার কাছে ঠিক কতটা গুরুত্বপূর্ণ সেটা আপনার কাজ দেখেই বোঝা যাবে। সেটা হোক ব্যক্তিগত কিংবা পেশাগত।

কাজটাকে ভালোবাসুন; Source: JobDescription

১৭. অল্প অল্প করেই অনেকদূর

আজকে আপনার কাছে যেটা খুব ছোট কিছু মনে হচ্ছে সেটাই একদিন হতে পারে বিশাল কিছু। সেটা ভালো খারাপ দু’রকমই হতে পারে। ধরুন, আপনি নিয়ম করে প্রতি সপ্তাহে একটি করে বই পড়েন। আপাতদৃষ্টিতে খুব ছোট মনে হলেও দেখবেন বছর শেষে ৫২টি বই পড়া হয়ে গেছে! আবার এরকম অল্প অল্প করে গড়ে উঠতে পারে কোনো বদভ্যাস।

১৮. টুকিটাকি ঘরের কাজ জানাটা জরুরী

রান্না করা, ঘর পরিস্কার করা, ছোটখাট সারাইয়ের কাজ জানা, কাপড় ধোয়ার মতো কাজগুলো জানাটা ছেলে-মেয়ে নির্বিশেষে সবার জন্য দরকার। বিপদে আপদে এই জ্ঞানটাই করবে অনেকখানি সাহায্য।

তথ্যসূত্র: Quora, Inc এবং Business Insider অবলম্বনে

ফিচার ইমেজ- Huffington Post