কভার লেটার লেখার যে বিষয়গুলো না জানলেই নয়

চাকরির আবেদনে রেজিউমির পাশাপাশি যে জিনিসটার গুরুত্ব কোনো অংশেই কম নয়, তা হলো কভার লেটার। কভার লেটারের কাজটি অনেকটা তার নামের মতোই। কভার করা অর্থাৎ ঢেকে দেওয়া। আপনার রেজিউমির স্বল্প জায়গাটিতে যে প্রয়োজনীয় কথাগুলো তুলে ধরা সম্ভব হয় না, তা কভার করবে কভার লেটার। আজকাল বেশিরভাগ আবেদনেই রেজিউমির সাথে কভার লেটার চাওয়া হয়। তাই গুছিয়ে কভার লেটার লিখতে জানাটা খুব জরুরি।

কভার লেটার লেখার সময় ক্রমান্বয়ে কিছু ধাপ অনুসরণ করতে হয়। ইন্টারনেট ঘাঁটলে এমন বহু টেমপ্লেট খুঁজে পাবেন যেগুলো আপনাকে একটি আকর্ষণীয় কভার লেটারের ফরম্যাট গঠনে সাহায্য করবে। তেমনই একটি জুতসই আর পছন্দমতো ফরম্যাট খুঁজে নিন।

একটি সঠিক কভার লেটার ইন্টারভিউ পর্যন্ত যাওয়ার জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ; Source: stutteringhelp.org

প্রথমেই আসা যাক সম্বোধন বা অভিবাদনের অংশটিতে। যদি জানেন কার কাছে লিখছেন, তবে তার নাম অথবা পদের নাম যেমন, Dear Human Resource Manager কিংবা Dear Deputy Manger উল্লেখ করতে পারেন। আর যদি না জানেন, তবে সবচেয়ে নিরাপদ এবং উত্তম উপায় হবে Dear Sir/Madam লেখা।

এবারে কোথায়, কোন পদে আবেদন করছেন তা লিখুন। কোথা থেকে নিয়োগের কথা জানলেন, তা-ও উল্লেখ করুন। এই অংশটি চেষ্টা করুন ১/২ লাইনে শেষ করতে। এর পরের অংশটিতে তুলে ধরুন, কেন আপনি এই পদের যোগ্য। তুলে ধরুন পূর্বের এমন সব অভিজ্ঞতা, যা আপনার মাঝে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে চাওয়া দক্ষতাগুলো গড়ে তুলেছে। এই অংশটিতে আরেকটি জিনিস উল্লেখ করতে ভুলবেন না। আর তা হলো কেন আপনি এই প্রতিষ্ঠানের সাথেই কাজ করতে চান। এই ধাপে উল্লেখ করুন প্রতিষ্ঠানের লক্ষ্য এবং উদ্দেশ্যের সাথে আপনার আগ্রহ কীভাবে সঙ্গতিপূর্ণ।

কভার লেটারে আপনার দক্ষতাগুলোকে ফুটিয়ে তুলুন; Source: pexels.com

শেষের অংশে তুলে ধরুন আপনার মধ্যকার দক্ষতার কথাগুলো এবং সেগুলো কীভাবে প্রতিষ্ঠানটিকে লক্ষ্য অর্জনের পথে এগিয়ে নিতে সাহায্য করবে। নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে যদি বেতনের কথা উল্লেখ করতে বলে অবশ্যই তা উল্লেখ করতে ভুলবেন না। কভার লেটারের সাথে রেজিউমি সংযুক্ত করে থাকলে তা উল্লেখ করুন। যিনি পড়ছেন, তাকে ধন্যবাদ জানিয়ে উপসংহার টানুন। আর হ্যাঁ, সবশেষে নিজের নাম উল্লেখ করার সময় সেখানে আপনার ফোন নাম্বার ও ইমেইল অ্যাড্রেস দিতে ভুলবেন না। এতে করে পরবর্তীতে আপনার সাথে যোগাযোগ সহজ হবে।

কভার লেটার লেখার সময় কিছু বিষয় মাথায় না রাখলেই নয়। এবারে সেগুলোই তুলে ধরা হলো পাঠকদের জন্য।

শুরুটা হতে হবে আকর্ষণীয়

শুরুটা হওয়া চাই সেরা। শুরুর লেখাটিকে একটু আকর্ষণীয় আর ভিন্নভাবে উপস্থাপন করতে পারলে খুব সহজেই নিয়োগকর্তার মাঝে দারুণ ইম্প্রেশন তৈরি করতে পারবেন।

শুধুই রেজিউমির পুনরাবৃত্তি নয়

খেয়াল রাখবেন আপনার কভার লেটার যেন শুধুই রেজিউমির পুনরাবৃত্তি না হয়। সুন্দর আর প্রাঞ্জল লেখনী দিয়ে গল্প আকারে বলুন আপনার কাজের অভিজ্ঞতাগুলো।

নিছক রেজিউমির পুনরাবৃত্তি নয়, বরং কভার লেটারে ফুটে উঠুক আপনার অভিজ্ঞতা এবং দক্ষতার গল্প; Source: psychologydictionary.org

দৈর্ঘ্য এবং ভাষার ব্যবহার

কভার লেটারের দৈর্ঘ্য এক পৃষ্ঠা হওয়া বাঞ্ছনীয়। দীর্ঘ কভার লেটার অনেক সময় পাঠকের পড়ার আগ্রহ কমিয়ে দেয়। তাই এই ছোট্ট জায়গাটির সর্বোচ্চ ব্যবহার চাইলে অল্প কথায় এবং স্পষ্ট ভাষায় ফুটিয়ে তুলতে হবে অভিজ্ঞতা আর দক্ষতাগুলো।

বাক্য ও শব্দ গঠনে সচেতনতা

কী ধরনের শব্দ ও বাক্য ব্যবহার করবেন, সে ব্যাপারে সচেতন ও কৌশলী হতে হবে। ‘কোনো কাজ করা হয়েছে’ না বলে বলুন ‘আমি কাজটি করেছি’। শক্তিশালী ক্রিয়াপদগুলো ব্যবহার করুন। যেমন: Accomplished, Balanced, Coordinated, Developed, Innovated, Managed ইত্যাদি। ইন্টারনেটে খুঁজলে এমন অনেক শব্দ পাওয়া যাবে। উপযুক্ত শব্দটি খুঁজে ব্যবহার করতে পারেন কভার লেটারে।

শক্তিশালী শব্দের ব্যবহার কভার লেটারকে দেবে ভিন্নমাত্রা; Source: rustyflemingconsulting

অপ্রয়োজনীয় তথ্য পরিহার

কভার লেটারের এই স্বল্প জায়গাটিতে অপ্রয়োজনীয় তথ্য দিয়ে নষ্ট করা বোকামি ছাড়া কিছুই নয়। অনেকে লেটারের প্রথমদিকে নিজের ঠিকানা, পরিচয় লিখে অহেতুক জায়গা নষ্ট করে ফেলেন। এটা শুধু কভার লেটারের জায়গাই নষ্ট করে না, বরং আপনার লেটারটির মানও কমিয়ে দেয়।

বানান ও ব্যাকরণগত ভুল পরিহার

কভার লেটার লেখার সময় খেয়াল রাখুন যেন বানান বা ব্যাকরণগত কোনো ভুল না থাকে। এটি পাঠকের মনে বিরক্তির সৃষ্টি করে। অনেক সময় এ ধরনের ভুলের কারণে নিয়োগকর্তা পুরো কভার লেটারটি পড়ার আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন।

সব জায়গায় এক কভার লেটার নয়

আমরা সাধারণত পুরনো কভার লেটারটিকে একটু প্রতিষ্ঠানের নাম, পদের নাম আর তারিখ বদলে নতুন করে চালিয়ে দিই। এটি খুব বাজে ব্যাপার আর এই ভুলটি কম-বেশি সবারই হয়। প্রতিটি নিয়োগের চাওয়াটা ভিন্ন। আর কভার লেটারটি যেহেতু নিয়োগ বিজ্ঞপ্তির চাওয়ার সাথে মিল রেখেই করা উচিত, তাই প্রতিটি আবেদনে কভার লেটার হওয়া চাই আলাদা।

নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিটি ভালো করে পড়তে হবে

নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিটি ভালোমতন পড়লে আপনি রেজিউমি আর কভার লেটার দুই-ই লেখার আইডিয়া পাবেন। বুঝতে পারবেন কোন অভিজ্ঞতা আর দক্ষতা আপনার হাইলাইট করতে হবে।

জব ডেসক্রিপশন বা নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিটি অবশ্যই ভালোমতন পড়তে হবে; Source: analyst2hire

প্রতিষ্ঠানের নাম সঠিকভাবে লেখা

অনেক সময় আমরা পদের নাম বা প্রতিষ্ঠানের নাম সঠিকভাবে লিখতে ভুলে যাই। বিশেষ করে একই কভার লেটার বারবার ব্যবহার করলে এই সমস্যাটি হয়। এটি নিয়োগকর্তার কাছে আপনার খুবই হালকা এবং অপেশাদার ইমেজ তুলে ধরে। তাই এ ব্যাপারে সতর্ক হোন।

মিথ্যা তথ্য পরিহার

দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য বাড়িয়ে মিথ্যা কোনো অভিজ্ঞতা বা দক্ষতা উল্লেখ করতে যাবেন না। এ ধরনের মিথ্যা অভিজ্ঞ নিয়োগকর্তা সহজেই ধরে ফেলেন।

কপি-পেস্টকে না বলুন

আজকাল ইন্টারনেটে অনেক কভার লেটারের স্যাম্পল পাওয়া যায়। অনেকে সেখান থেকে কপি-পেস্ট করে কোনোরকম জোড়াতালি দিয়ে কাজটি শেষ করেন। এই কপি-পেস্ট নিয়োগকর্তার চোখ এড়ায় না কখনোই।

নিজের দুর্বলতা প্রকাশ নয় একদমই

নিজের সম্পর্কে যেমন বানিয়ে কিছু বলার দরকার নেই, তেমনি দুর্বলতা প্রকাশেরও দরকার নেই। ‘আমি এই কাজটি পারি না কিংবা নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে চাওয়া দক্ষতাগুলো আমার নেই’, এ ধরনের লেখা নিমেষেই আপনার কভার লেটারকে মূল্যহীন করে দিতে পারে।

নিজের দুর্বলতা কভার লেটারে প্রকাশ করা পরিহার করুন; Source: dijitalsignageblog.com

চাকুরির পাবার জন্য অনুরোধ নয়, বরং তুলে ধরুন যোগ্যতা

অনেকে কভার লেটারে লিখে থাকেন যে এই চাকুরিটি পেলে তিনি ধন্য হবেন বা তার চাকুরিটি ভীষণ প্রয়োজন। নিয়োগকর্তা এসব নয়, বরং জানতে চান কেন আপনি ঐ কাজের জন্য যোগ্য। তাই সেই কথাটিকেই সংক্ষিপ্ত অথচ কার্যকরভাবে তুলে ধরুন।

পিডিএফ আকারে কভার লেটার পাঠান

মেইলে কভার লেটার পাঠালে অবশ্যই তা পিডিএফ আকারে পাঠান। ডক ফাইলে পাঠালে অনেক সময় ফন্ট বা লেখা নষ্ট হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। তাই পিডিএফ হলো সবচেয়ে নিরাপদ মাধ্যম।

স্বাক্ষর এবং লেখার ধরণ

কভার লেটারের শেষে অবশ্যই আপনার স্বাক্ষর দিতে ভুলবেন না। স্বাক্ষর ছাড়া আপনার কভার লেটারটি অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। শুধুমাত্র নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে চাওয়া হলেই কভার লেটারটি হাতে লিখবেন। তা না হলে টাইপ করাটাই উত্তম।

রিভিশন এবং রিভিশন

লেখা শেষে কমপক্ষে দু’বার রিভিশন দিতেই হবে। কোনো বন্ধুকে দিয়ে চেক করাতে পারেন। চাইলে লেখাটি জোরে জোরে পড়ে দেখতে পারেন। রিভিশনে অনেক ছোট ছোট ভুল উঠে আসে। আরেকটা ব্যাপার খুব কাজে দেয়, তা হলো পাঠক হিসেবে লেটারটি একবার পড়ে দেখুন কেমন লাগছে। প্রয়োজনে পরিবর্তন, পরিমার্জন, সংশোধন কিংবা সংযোজন করতে পারেন।

রিভিশনের কোনো বিকল্প নেই; Source: 64ouncegames.coms

খামের ব্যবহার

অনেক সময় ডাকযোগে বা খামে করে কভার লেটার সহ যাবতীয় কাগজপত্র পাঠাতে হয়। এক্ষেত্রে খেয়াল রাখবেন কভার লেটার এবং খামে ব্যবহৃত ঠিকানা যেন একই হয়। অবশ্যই যেন খামটি পরিচ্ছন্ন ও দাগমুক্ত হয়। খাবার বা কিছুর দাগ খামে লেগে থাকলে তা খুবই দৃষ্টিকটু লাগে।

ফিচার ইমেজ- the-balance.com

Related Articles