“আমি নিশিদিন তোমায় ভালোবাসি/ তুমি অবসরমতো বাসিও, নিশিদিন হেথায় বসে আছি/ তোমার যখন মনে পড়ে আসিও”

কী? একটু চেনা লাগছে কি? অনেকেই বলবেন যে- “হ্যাঁ খুব সহজেই যাচ্ছে চেনা, এ তো রবীন্দ্রসঙ্গীত!” কিন্তু আপনি যদি হয়ে থাকেন  বাংলা উপন্যাসপ্রেমী কোনো পাঠক, তাহলে খুব সহজেই এর যোগসূত্র স্থাপন করতে পারবেন আপনার পড়া বেশ কয়েকটি উপন্যাসের সাথে, আর সেই সাথে মনের মধ্যে ভেসে উঠবে বুদ্ধদেব গুহের ছবি! কেন যেন এই গানের মুগ্ধতা কাটিয়ে উঠতে পারেননি বুদ্ধদেব, তার প্রায় উপন্যাসেই যেন কথাচ্ছলে চলে আসে এই কথাগুলো, তা সে হোক সবিনয় নিবেদন, একটু উষ্ণতার জন্য বা বাসনাকুসুম!

বুদ্ধদেব গুহ, junglekey.com

ব্যক্তি বুদ্ধদেব গুহ সম্পর্কিত কিছু তথ্য

ঋতু গুহ, www.anandabazar.com

ভারতীয় বাঙালি লেখক বুদ্ধদেব গুহ ১৯৩৬ সালের ২৯শে জুন কলকাতায় জন্মগ্রহণ করেন এবং কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে সুপরিচিত সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজিয়েট স্কুল ও স্কটিশ চার্চ কলেজে পড়াশুনা করেন। তার স্ত্রী প্রখ্যাত রবীন্দ্রসঙ্গীত গায়িকা ঋতু গুহ। বুদ্ধদেব নিজেও একসময় ভালো রবীন্দ্রসঙ্গীত গাইতেন এবং তিনি পুরাতনী টপ্পা গান গাওয়াতে বেশ পারদর্শী।

পেশায় তিনি একজন সফল চার্টার্ড একাউন্ট্যান্ট, জীবনযাপনের ধরনে খুবই শহুরে। কিন্তু ভেতরকার যে আদিম আরণ্যক ডাক, তা যেন তার লেখায়ই ধরা পড়ে তার জীবনচিত্রের চাইতে অনেকগুণ স্পষ্ট হয়ে।

বুদ্ধদেবের লিখনশৈলী ঠিক কেমন?

বুদ্ধদেবকে বলা চলে আরণ্যক এক ঔপন্যাসিক। তার উপন্যাস যেন পরিপূর্ণই হয়ে ওঠে না যতক্ষণ পর্যন্ত না তার গল্পের প্লটজুড়ে ভেসে উঠছে নাগরিক-ক্লেশমুক্ত এক অরণ্যময় প্রকৃতি! পালামৌর বুনো হাতি, পৌরুষ মাখানো বাঘিনী অথবা পাকদন্ডীর কুয়াশার রাস্তা, ম্যাকলাস্কিগঞ্জের সেই সকালের আগমন- এই তো বুদ্ধদেবের উপন্যাস। তাতে থাকতেই হবে নগরবিদ্বেষী এক নায়ক যে অরণ্যে এসে খুঁজে পেয়েছে অপার স্বস্তি ও সারল্যের জীবন। তুলনা নয়, বরং বিভূতিভূষণ বন্দোপাধ্যায়ের ‘আরণ্যক’ উপন্যাসটির সাথে সাদৃশ্য বলা চলে বুদ্ধদেবের ক্ষেত্রে। তবে ব্যাপার হচ্ছে এই যে, বুদ্ধদেব গুহের উপন্যাসের সফল প্লট কিংবা কাহিনীছন্দ যা-ই বলা হোক না কেন, তা আরণ্যক হয়েই সুর তোলে।

চিঠির প্রতিও বুদ্ধদেবের একটা গভীর আকর্ষণ দেখা যায়। প্রায় উপন্যাসেই এ ওকে চিঠি পাঠায়, সেই চিঠি পুরো সময় জুড়ে একটা সুরেলা গান হয়ে বাজতে থাকে। বুদ্ধদেব খুব সুন্দর করে চিঠি লিখতে পারেন, তার যেকোনো উপন্যাস পড়লেই তা বোঝা যায়! ‘সবিনয় নিবেদন’ উপন্যাসটি তো পুরোটাই চিঠিপোন্যাস! ঋতি ও রাজর্ষি একজন আরেকজনকে না দেখে না শুনে চিঠির এক অদ্ভুত ব্যাকরণে বুনতে থাকে তাদের সম্পর্ককাব্য। অদেখাকেও যে চিঠি লিখে প্রিয় ব্যক্তিতে রূপ দেওয়া যায়, তার সাথে খুনসুটি করা যায়, করা যায় অভিমানী অভিযোগ, চিঠি লিখে যে কাউকে ভালোবাসাও যায়- তার এক অনবদ্য প্রমাণ ‘সবিনয় নিবেদন’।

সবিনয় নিবেদন- এক অপূর্ব চিঠিপোন্যাস, amarboi.com

তার ছোট গল্প ও উপন্যাসে পাঠক পায় এক্স স্বপ্নালু বিমূর্ততা আর রোমান্টিক আবেদন। গল্পের চরিত্রগুলোর জায়গায় নিজেকে কল্পনা করে পাঠক তাই খুব সহজেই যখন-তখন ডুব দিতে পারে বুদ্ধদেবের লেখায়।

প্রথমদিকের লেখাগুলোয় তার লেখক-ইমেজটুকু প্রতিষ্ঠিত করবার জন্য বুদ্ধদেব গুহ এমন কিছু চরিত্রই বেছে নিয়েছিলেন যাদের সাথে পাঠক পড়ামাত্র নিজেকে যুক্ত করতে পারে। কারণ তিনি বুঝেছিলেন মানুষ নিজের প্রতিফলন দেখতে ভালোবাসে। তার এই শৈলী যে পরে যে খুব বেশি পরিবর্তিত হয়ে গিয়েছে তা নয়, তিনি এক প্রকৃত অনুসন্ধানকারী, প্রকৃতি ও মানবমনের আদিম যে বেষ্টনী আছে তাকে যেন নিজের অভ্যন্তর থেকে টেন বের করে আনেন বুদ্ধদেব। এ বেষ্টনী এমন এক চির-সম্পর্ক যার উপস্থিতি আমরা প্রতিনিয়ত টের পাই, কিন্তু তা স্বীকার করতে পারি না। হয়তো বুদ্ধদেবের লেখা পড়ে সেই অস্বীকৃতিটাই বুক চিরে বের হয় ছোট্ট একটা দীর্ঘশ্বাস হয়ে। কখনও কখনও পাঠকের এমন দীর্ঘশ্বাসই লেখকের সফলতা, আর বুদ্ধদেব এদিক দিয়ে প্রচন্ড সফল লেখক!

উপন্যাসের অনুপ্রেরণা যখন এক বিচিত্র জীবন অভিজ্ঞতা

বুদ্ধদেবের কিছু উপন্যাস, amarboi.com

একজন লেখকের প্রিয়-অপ্রিয়, ঘটমান-বিচ্ছেদ্য সবকিছুই ছাপ ফেলে তার লেখনীতে। আর জীবনের সঙ্গে যখন মিল দেখা দিতে থাকে, তখনই একজন লেখক সর্বোচ্চ স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন যেকোনো রচনার ক্ষেত্রে। বুদ্ধদেব গুহের ক্ষেত্রেও ব্যত্যয় ঘটেনি লেখালেখির জগতে খুব পরিচিত এই নিয়মটির। ইংল্যান্ড, ইউরোপের প্রায় সমস্ত দেশ, কানাডা, আমেরিকা, হাওয়াই, জাপান, থাইল্যান্ড ও পূর্ব আফ্রিকাসহ বহু জায়গায় ঘুরেছেন এই মানুষটি। বারবার প্রকৃতির নেশায় বুঁদ হয়ে রয়েছেন তিনি। বিভিন্ন জায়গা, তাতে বাস করা মানুষের ভিন্ন জীবনের বিপরীতমুখী মাত্রা- সবকিছুর স্বাদই গ্রহণ করেছেন বুদ্ধদেব। তার এই সম্পর্কগুলোকে আমরা বারবার তার গল্প-উপন্যাসের নায়কের সম্পর্কগুলোর মধ্যে দেখি। পূর্ব বাংলার (বর্তমান বাংলাদেশ) জয়পুরহাট, বরিশাল ও রংপুরে কাটানো তার দিনগুলোর ছায়া পড়েছে ‘ঋভু’ সিরিজের বইগুলোতে। তাই ‘ঋভু’র বেশ কিছু বইয়ের উৎসর্গপত্রে লেখা আছে বুদ্ধদেবের পুরাতন বাংলাদেশী কিছু বন্ধুর নাম।

ভ্রমণপ্রেমী বুদ্ধদেব গুহ, flickr

আত্মজীবনী লেখলে একবার নিজের কথা লেখা যায়, বুদ্ধদেব তার প্রতিটি উপন্যাসের মধ্য দিয়ে বারবার নিজের কথা লিখতে পেরেছেন, কেননা ভ্রমণ তার জীবনে এনে দিয়েছে বহুমাত্রিকতা। তিনি যতবারই লিখতে চেয়েছেন, নতুন করে লিখেছেন, গ্রীক দার্শনিক হেরাক্লিটাসের ধারণামতো বুদ্ধদেবও কখনো একই নদীতে পা ডোবাননি। বিচিত্র জীবন তাকে উপহার দিয়েছে বহুমোহনায় ডুব দেবার, বহুমাত্রিক কাহিনী রচবার উপাদান ও উপকরণ।

পূর্বভারতের বনজঙ্গল-পশুপাখি ও বনের মানুষের সঙ্গেও সুদীর্ঘকালের নিবিড় ও অন্তরঙ্গ পরিচয় তার। ভ্রমণের একটি হতাশাজনক দিক এই যে কোনো জায়গায় থিতু হওয়া যায় না, গতির মধ্যে থাকতে হয়। যেমন আজ এখানে তো কয়েকদিন পর অন্য কোথাও যেতেই হবে। এজন্যই হয়তো এর নাম- ‘ভ্রমণ’! বুদ্ধদেব গুহ এই ভ্রমণকে, তার সাথে জড়িয়ে থাকা তাৎক্ষণিক কিংবা দীর্ঘস্থায়ী অনুভূতিগুলোকে একেকটা ফ্রেমে আবদ্ধ করেছেন। আমরা সেই ফ্রেমগুলোকে বলি- ‘বই’!

বুদ্ধদেব ‘ঋজুদা’ বলে একটি চরিত্রের স্রষ্টা। এই ঋজুদা যখন-তখন রুদ্রকে সাথে নিয়ে চলে যান জঙ্গলে! বুদ্ধদেবের ভ্রমণগুলো ঋজুদা ও রুদ্রের ছলেই পাঠক গোগ্রাসে গিলতে থাকে। ঋজুদা নিয়ে একটি বই হলো ‘ঋজুদার সঙ্গে জঙ্গলে’।

কিছু প্রাপ্তির গল্প

বুদ্ধদেব গুহের সবচাইতে জনপ্রিয় উপন্যাস, www.upoharBD.com

বুদ্ধদেবের উপন্যাস ‘মাধুকরী’ বাংলা সাহিত্যের জগতে সত্যিকার অর্থেই একটি মাইলফলক হয়ে বিরাজ করছে। পৃথু, কুর্চি, রুষা, মগনলাল, ঠুঠা- এ সকল চরিত্রের মধ্যে কিছু একটা জাদু ছড়িয়ে আছে যা এড়ানো সম্ভব নয় কোনো পাঠকের পক্ষেই। এই উপন্যাসে কেউ কারো পক্ষে বা বিপক্ষে অবস্থান করে না, এত সমান্তরালভাবে চরিত্রগুলোকে সম্পৃক্ত রেখেও বয়ে যেতে দিতে বুদ্ধদেবই পারেন! তাই তো বহুদিন ধরেই বেস্টসেলার হয়ে আছে তার ‘মাধুকরী’ বইটি। ১৯৭৬ সালে আনন্দ পুরষ্কার ছাড়াও বুদ্ধদেব পেয়েছেন শিরোমণি ও শরৎ পুরষ্কার।

শহুরে জীবনের এই আরণ্যক ঔপন্যাসিক পাঠককে যে স্বাদ উপহার দিয়েছেন তা তার পাঠকদের মনে বন্ধন-মুক্তির এক গাঢ় ছাপ ফেলে যাবে আজীবন।

তথ্যসূত্র

bn.wikipedia.org/wiki/বুদ্ধদেব_গুহ