জুঞ্জি ইতো: জাপানী হরর মাঙ্গার গ্র্যান্ড মাস্টার

কম-বেশি আমাদের সবারই বিনিদ্র রাত্রিযাপন হয়ে থাকে। বিছানায় শুয়ে এপাশ-ওপাশ করা, দিক পরিবর্তন করা, বিছানা থেকে উঠে পায়চারী করা, তারপর আবারো বিছানায় ফেরত আসা, অনিদ্রার ভীতিকে দূরে ঠেলে সরিয়ে দেয়া অথবা অনিদ্রাকে বন্দী করে নিদ্রায় মিলিয়ে যাওয়া। কিন্তু ব্যাপারটা যদি বিপরীত হয় তখন? যদি সমস্যাটা এমন হয় যে আপনি ঘুমাতে যেতে পারছেন না তা নয়, কিন্তু আপনি জেগে থাকতেও পারছেন না?

ধীরে ধীরে, আপনার স্বপ্ন দেখার যে সময়টা নির্ধারিত করা তা আপনার জাগ্রত থাকার সময়টাকে অনায়াসেই অতিক্রম করবে। এর প্রভাবগুলো কেবল মনস্ত্বাত্তিকই নয়, বরং শারীরিকও বটে; আপনার শরীর তখন ধীরে ধীরে অতিষ্ঠ হয়ে পরিবর্তনে বাধ্য হবে। আপনার অনুভূতিগুলো অন্তর্মুখী হয়ে উঠবে, আপনার ত্বক খসখসে আর স্বচ্ছ হয়ে যাবে, আপনার মাথা প্রসারিত হতে শুরু করবে, এবং আপনার নাক, কান ও চোখগুলো জীবিত, তা সত্ত্বেও সেগুলো সবেমাত্র মানবদেহে প্রবেশ করার মতো হয়ে যাবে। 

গল্পের বর্ণনা সাথে সামঞ্জস্য রাখা অঙ্কন; Image Source: reddit.com

যদি আপনি হাসপাতালের চিকিৎসকদের কাছেও যান, তবুও আপনার স্বপ্ন দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হবে। অথচ আপনার ঘুমানোর সময় কিন্তু একই থাকবে। এই দীর্ঘায়িত স্বপ্নগুলো বছর, যুগ, শতাব্দী, সহস্রাব্দ, এবং সবকিছু ছাড়িয়ে এক অমানবিক নিরন্তর সময়ে রূপান্তরিত হবে। আপনি আরো অবাক হবেন এই ভেবে যে, “একটা অসীম স্বপ্ন দেখে জেগে ওঠা মানুষের মনে কী চলে?” অবশেষে, আপনার এলিয়েন শরীরটি ধীরে ধীরে ভঙ্গুর হতে শুরু করবে, অদ্ভুত সব কার্যকলাপ শুরু হবে শরীরের মধ্যে, একদলা স্ফটিকস্বচ্ছ পড়ে থাকবে বিছানার উপর। এবং সবার শেষে তা নিঃশেষ হয়ে উড়ে হাওয়ায় মিলিয়ে যাবে। 

উপরের গল্পটুকু কেমন অদ্ভুত না? অর্থাৎ, পড়তে খারাপ লাগছে না, অথচ ভাবতে গেলেই একধরনের অস্বস্তিবোধ কাজ করছে। যদি আপনারও এমনটাই অনুভূতি হয়ে থাকে তাহলে আপনাকে হরর মাঙ্গা জগতের কিংবদন্তি জুঞ্জি ইতোর দুনিয়ায় স্বাগতম। উপরোক্ত গল্পটা ১৯৯৭ সালে প্রকাশ এবং পরবর্তীতে সিনেমাতে রূপান্তরিত হওয়া মাঙ্গা গল্প “দ্য লং ড্রিম” এর সারসংক্ষেপ। আজকের আলোচনায় গ্রেপ. জাপানকে দেয়া জুঞ্জি ইতোর সাক্ষাৎকার থাকছে, তবে তার আগে মাঙ্গা এবং জুঞ্জি ইতোর ব্যক্তি জীবন সম্পর্ক খানিকটা আলোচনা করা যাক।    

 এক পাঠকের তৈরি দ্য লং ড্রিম মাঙ্গার পোষ্টার; Image Source: mastodon.art

জাপানীরা তাদের মাঙ্গার জন্য বিশ্বব্যাপী পরিচিত। অন্যান্য যেকোনো দেশের তুলনায় মাঙ্গা কমিকস অথবা  জাপানী অ্যানিমেশন, তাদের নিজস্ব সাহিত্য এবং সংস্কৃতির একটা বিরাট অংশ জুড়ে জায়গা দখল করে আছে। একইসাথে বিশ্ব সাহিত্যের পাঠকদের কাছেও জাপানী মাঙ্গা তুমুল জনপ্রিয়তার আসনে অধিষ্ঠিত হয়ে আছে। জাপানী মাঙ্গার রূপান্তরিত সিনেমা, টিভি সিরিজ অথবা স্বয়ং জাপানী অ্যানিম- কোনোটারই কিন্তু জনপ্রিয়তার কমতি নেই। বর্তমানে হরর কমিকসের জন্য জাপানী মাঙ্গার বিকল্প পুরো বিশ্বজুড়ে খুঁজে পাওয়া মুশকিল। আর হরর মাঙ্গার এই বিশ্বব্যাপী জনপ্রিয়তার পেছনে যে মানুষটির কথা বলা যায় তিনি জুঞ্জি ইতো, যাকে হরর মাঙ্গার গ্রান্ড মাস্টার বলে আখ্যায়িত করা হয়। 

মাঙ্গা শব্দটির অনুবাদ করলে যা দাঁড়ায় তা হচ্ছে হাস্যরসাত্মক ছবি। বিশ শতকের মাঝামাঝি সময় থেকে জাপানে এই কমিকসের ধারাটি ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করে যখন এই ধরনের প্রকাশনা সংক্রান্ত আইনি জটিলতা তুলে নেয়া হয়। আর ঠিক তখন থেকেই এটি জাপানী সংস্কৃতির একটা অংশ বিশেষে পরিণত হয়েছে। এমনকি মাঙ্গার জনপ্রিয়তা নিজের দেশের গণ্ডি পেরিয়ে আমেরিকা এবং ইউরোপেও ব্যাপকতা লাভ করেছে। সাধারণত মাঙ্গাতে ঐতিহ্যবাহী জাপানী রীতিনীতি অনুসরণ করা হয়ে থাকে, যার জন্য এটি অন্যান্য কমিকস থেকে নিজেকে স্বতন্ত্র অবস্থানে রাখতে সক্ষম। জাপানী মাঙ্গা পড়ার সময় ডানদিক থেকে বাম দিকে যেতে হয়, যা সাধারণত আমাদের নিত্যদিনের পড়া বইয়ের বিপরীত। এমন নয় যে শুধুমাত্র ডান পাতা থেকে বাম পাতা পড়লেই হবে, বরং মূলপাঠও ডান দিক থেকে বাম দিক রীতি মেনে পড়তে হবে। 

জাপানী মাঙ্গার স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য; Image Source: japanese-manga-artist.com

গিফু প্রদেশে জন্মগ্রহণ করা জুঞ্জি ইতোর ছোটকাল থেকেই মাঙ্গার প্রতি একটা বিশেষ দুবর্লতা ছিল। সে সময়গুলোতে কাজুও উমেজু, যাকে হরর মাঙ্গার অন্য আরেকজন গ্রান্ড মাস্টার বলে অভিহিত করা হয়, তার হরর মাঙ্গাগুলো ম্যাগাজিনে ছাপা হতো। সেগুলো জুঞ্জি ইতোর বোন কিনে এনে পড়তো এবং এমনকি কমিকস আঁকারও চেষ্টা করতো আর সেখান থেকে জুঞ্জি ইতোর মাঙ্গার প্রতি ভালোলাগার শুরু। কাজুও উমেজু তখন সবেমাত্র শোগাকুকান মাঙ্গা অ্যাওয়ার্ড  পুরষ্কার জিতেছেন তার রচিত দ্য ড্রিফটিং ক্লাসরুম এর জন্যে; এছাড়াও, শিনেচি কোগা, হিদেশী হিনোসহ সে সময়কার মাঙ্গা লেখকরাই মূলত জুঞ্জি ইতোর মনের মধ্যে হরর মাঙ্গা কমিকসের বীজ বুনে দিয়েছিলেন। পরবর্তী জীবনে ইতো ডেন্টাল টেকশিয়ান কর্মের পাশাপাশি মাঙ্গার কমিকসের কাজ করে যান একইসাথে। এমনকি তার লেখা ও আঁকা প্রথম মাঙ্গা ইগইয়ো সেকাই বা গ্রোটেস্ক ওয়ার্ল্ড অল্প কিছুদিনের মধ্যে সবার নজর কাড়ে এবং তা মাঙ্গার সম্মানজনক পুরষ্কার উমেজু অ্যাওয়ার্ড জিতে নেয়। 

গ্রোটেস্ক ওয়ার্ল্ড মাঙ্গার আর্টবুক হাতে জুঞ্জি ইতো; Image Source: grapee.jp

বিশ্বব্যাপী প্রশংসিত মাঙ্গা শিল্পী জুঞ্জি ইতো নিজের মেধা আর কাজ দিয়েই জগতজোড়া হরর মাঙ্গার ভক্তদের হৃদয়ে স্থান করে নিয়েছেন। তার সবচাইতে প্রশংসিত কাজ হচ্ছে “তোমি” এবং “উজুমাকি”। জুঞ্জি ইতোর মাঙ্গাগুলো থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে প্রচুর সিনেমা এবং টিভি সিরিজ বানানো হয়েছে। বিগত প্রায় ত্রিশ বছর যাবত হরর মাঙ্গার লেখক এবং অঙ্কনশিল্পী হিসেবেই কাজ করছেন তিনি। এইচ.পি.লাভক্র্যাফট, ইয়াসুতাকা সুতসুই, হিদেশী হিনো এবং কাজিও উমেজুর লেখা থেকে অনুপ্রাণিত হয়েই মূলত জুঞ্জি ইতোর মাঙ্গা কমিকসে পথচলার শুরু। বিখ্যাত গ্রেপ.জাপান পত্রিকার সাংবাদিক বেক কে এবং নোবুশির নেয়া পূর্ণাঙ্গ সাক্ষাৎকার সংক্ষিপ্ত সংস্করণ তুলে ধরা হলো: 

জুঞ্জি ইতোর সবচেয়ে জনপ্রিয় উজুমাকি মাঙ্গার ভেতরের একটি পৃষ্ঠা; Image Source: amazon.com

বেন কে: আপনি এই হরর জগতে প্রবেশ করলেন কীভাবে? অর্থাৎ শুরুটা বা ভিত্তিমূলটা? 

জুঞ্জি ইতো: আমি যখন খুব ছোট ছিলাম, হয়তো ৪ বা ৫ বছর হবে, তখন আমার বড় দুই বোন ম্যাগাজিনে থাকা কাজুও উমেজু আর শিনিচি কোগার মাঙ্গাগুলো পড়ত এবং আমিও সেগুলো পড়তাম। ঐটাই আমার প্রথম অভিজ্ঞতা বলতে পারেন। আর তখন থেকেই আমি হররের প্রেমে পড়ি। তখন থেকেই হরর মাঙ্গা পড়া শুরু আমার। 

বেন কে: শুধুই কি হরর মাঙ্গা নাকি হরর মুভিও দেখতেন? 

জুঞ্জি ইতো: যখন আমি কিশোর ছিলাম টিভিতে প্রথমবারের মতো ফ্রাঙ্কেনস্টাইন আর ড্রাকুলা দেখেছিলাম। আমাদের বাসাটা খানিকটা গ্রামাঞ্চলের দিকে ছিল, সেখানে কোনো সিনেমা হল ছিল না। তাই একমাত্র ভরসা ছিল টিভি। ৭০ এর দশকে সর্বাধিক জনপ্রিয়তা অর্জন করা দ্য এক্সসোরসিস্টও আমি টিভিতেই দেখেছিলাম। এছাড়াও, প্রচুর অতিপ্রাকৃত সিনেমা আমি দেখেছি। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, দারিও আর্জেন্টোর সাসপিরিও এর কথা। 

মাঙ্গা কমিকস; Image Source: gqindia.com

বেন কে: তাহলে, আপনি মাঙ্গা আঁকা শুরু করলেন কবে থেকে? 

জুঞ্জি ইতো: আগেই বলেছি যে আমি ৪ বা ৫ বছর বয়স থেকেই মাঙ্গা পড়া শুরু করেছি, আর এর হয়তো ১/২ বছর পর থেকেই আমি আঁকা শুরু করেছিলাম। একটা পেন্সিল আর একটা কাগজ নিয়ে অথবা মাঝেমধ্যে ফেলে দেয়া কোনো কাগজের পেছন দিকে, যে মাঙ্গাগুলো পড়েছি সেগুলোই নতুন করে আঁকার চেষ্টা করতাম। বলা যায় যে, প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তির আগে থেকেই আমি আঁকা শুরু করেছিলাম। যদিও সেটা শুধুমাত্র খেলার ছলে করা, তবুও সেটাই ছিল শুরু। 

নোবুশি: একটা ব্যাপার নিয়ে আমি চিন্তিত। আপনি বললেন ৪ বা ৫ বছর বয়স থেকেই আপনি হরর মাঙ্গা পড়া শুরু করেছেন, কিন্তু যতদূর জানি ঐ বয়সের বাচ্চারা তো যেকোনো কিছুতেই অতি দ্রুত ভয় পায়?  

জুঞ্জি ইতো: আসলে আমি যে সমস্ত মাঙ্গাগুলো পড়তাম, সেগুলো মোটেও ভীতিকর কিছু ছিল না। বরং টিভি শো-তে কোনো ভূতুড়ে বাড়িতে যাওয়া কিংবা কোনো মাধ্যমে আত্মাকে ডেকে আনা- এসবই আমার কাছে বেশ ভয়ের মনে হতো। যদিও বেশ উপভোগ করতাম, তবে ভয়টাও বেশ ভালোভাবেই পেতাম। ভয়ের পরিমাণ এতটাই ছিল যে আমি একা বাথরুমে যেতে পারতাম না। কেননা, আমাদের বাসার নীচতলার একদম শেষপ্রান্তে ছিল বাথরুমটা। তো সেসব টিভিশোতে যখন ভূত আসার আবহ তৈরি করতো অন্ধকারাচ্ছন্ন করে তখন আমি বেশ ভয় পেতাম। আমার কাছে সেটাই বেশি ভয়ের মনে হতো যেটা আমার কাছে অনেকটাই বাস্তব বলে মনে হতো। তো সে হিসাবে, মাঙ্গা কমিকস কখনোই আমার কাছে ভীতিকর কিছু ছিল না। আর যতটুকু না ভয়ের ছিল তার চাইতেও বেশি আমি উপভোগ করতাম এবং মুগ্ধ হতাম। আসলে কাজুও উমেজুর অঙ্কনগুলোই আমাকে মুগ্ধ করতো বেশিরভাগ সময়। অদ্ভুত সব জন্তু-জানোয়ার, বিদঘুটে পরিস্থিতি। ঐগুলোই আমাকে মুগ্ধ করতো যার জন্য আমি মাঙ্গার প্রতি দুর্বল হয়ে পড়েছিলাম। কিন্তু বাথরুম যাওয়াটা সত্যিকার অর্থেই ভয়ের ছিল… 

কাজুও উমেজুর দ্য ড্রিফটিং ক্লাসরুম মাঙ্গা; Image Source: archive.is

নোবুশি: আচ্ছা। তাহলে তো আরেকটু খোলাসা করে বলতে গেলে, যখন আপনাকে নীচতলায় বাথরুমে যেতেই হতো তখন তো আবার বিভিন্ন ধরনের পোকামাকড় ভয়ের অন্যতম কারণেও পরিণত হতো, তাই না? 

জুঞ্জি ইতো: একদম ঠিক বলেছেন। আমাদের বাসার বাথরুমটার ছাদ ছিল মাটির তৈরি। যদিও এখন সেটা কনক্রিটের, কিন্তু সেটা তখনকার সময়ে মাটির তৈরিই ছিল। তো ঝিঁঝিঁ পোকার মতো দেখতে একধরনের পোকা সেখানে দেখা যেত। আমরা সেগুলোকে বাথরুমের ঝিঁঝিঁ বলে ডাকতাম। তার কারণ হচ্ছে, গ্রামাঞ্চল বেষ্টিত এলাকাগুলোতে বাথরুম ব্যতীত এই পোকাগুলোকে দেখা যায় না। গোলাকার দেহের মধ্যে ছোপ ছোপ দাগ এবং বিশাল লম্বা পা যেগুলোর মাধ্যমে ওরা লাফিয়ে বেশ দূরেও উড়ে যেতে পারতো। বাথরুমে ঢুকলেই সেগুলো লাফাতে শুরু করতো আর আমি তখন ভয়ে কুঁকড়ে যেতাম। 

বেন কে: বুঝতে পেরেছি। পরবর্তীতে এই ভয়গুলোই আপনার মাঙ্গার পাতায় পরিপূর্ণতা পেয়েছে। তাই তো? 

জুঞ্জি ইতো: হ্যাঁ, তা বলতে পারেন। 

নোবুশি: তাহলে আপনি বলতে চাচ্ছেন যে, আপনার বেশিরভাগ কাজই আপনার ব্যক্তিগত জীবনের অভিজ্ঞতা আর শৈশবের চিন্তাধারা নির্ভর? 

জুঞ্জি ইতো: সবগুলো না, তবে বেশিরভাগই। যেমন, দ্য হ্যাঙ্গি বেলুন আমার শৈশবের একটা স্বপ্নের উপর নির্ভর করে করা। 

নোবুশি: আহা, তাহলে তো এই স্বপ্নটা আপনাকে বেশ ভালোভাবেই ভুগিয়েছে…

জুঞ্জি ইতো: হ্যাঁ, নিঃসন্দেহে ছোটবেলার যেকোনো দুঃস্বপ্নই আপনাকে ভোগাবে এবং এমনও হতে পারে যে সেটা আপনার সারাজীবনের সঙ্গী হয়েও থেকে যেতে পারে। 

বেন কে: আচ্ছা, আপনার কি বেলুন নিয়ে নির্দিষ্ট কোনো অভিজ্ঞতা আছে নাকি? 

জুঞ্জি ইতো: আমি মফস্বলে থাকলেও প্রায় সময়ই শহরে যেতাম। তখন দেখতাম বিশাল বড় দালানগুলোকে পাশ কাটিয়ে বেলুনগুলো কীভাবে স্বাধীনভাবে উড়ে বেড়ায়। আমার কাছে মনে হতো যে যান্ত্রিক শহরে ঐটাই একমাত্র প্রাণের অস্তিত্ব। আর তাছাড়া, বাচ্চা বয়সে আকাশে স্পেসশিপ, ইউএফও অথবা অদ্ভুত দর্শন কোনো কিছু; তো ছোটবেলার ঐ বেলুন তত্ত্বের সাথে এগুলো মিলিয়ে-মিশিয়েই আর কী। এই তো… 

দ্য হ্যাঙিং বেলুন মাঙ্গা; Image Source: pinterest.com

বেন কে: ঠিক আছে। এবার তাহলে অন্য প্রসঙ্গে আসি। আপনি তো কারিগরি শিক্ষা নিয়েছেন এবং ডেন্টাল টেকনেশিয়ান হিসেবে কাজও করেন? 

জুঞ্জি ইতো: হ্যাঁ। 

বেন কে: আপনি তো ডেন্টাল টেকনিশিয়ান হিসেবে কর্মরত থাকা অবস্থাতেই মাঙ্গার কাজ শুরু করেছিলেন। অর্থাৎ, দুটো তো একসাথেই করতেন?

জুঞ্জি ইতো: হ্যাঁ। আমি ডেন্টাল টেকনিশিয়ান হিসাবে কাজ শুরু করেছিলাম ১৯৮৪ সালে। কিছুদিন পর থেকেই আমি মাঙ্গার কাজও শুরু করেছিলাম। দুটো কাজই একসাথে প্রায় তিন বছর চালিয়েছিলাম… 

বেন কে: তাহলে আমরা কি বলতে পারি যে আপনার ডেন্টাল টেকনিশিয়ান কাজের কোনো অভিজ্ঞতা আপনার মাঙ্গার দুনিয়ায় প্রভাব ফেলেছে? 

জুঞ্জি ইতো: হ্যাঁ, কেননা এটা একটা মেডিক্যাল স্কুল ছিল আর আমি অ্যানাটমির বেসিক কিছু ব্যাপারে জানতে পেরেছিলাম। আর তাছাড়া, একটা সচিত্র বইও কিনেছিলাম যেটাতে মানব শরীর সম্পর্কিত বেশ কিছু তত্ত্ব আর ড্রয়িংও পেয়েছিলাম। 

জুঞ্জি ইতো; Image Source: Grapee

বেন কে: সেখান থেকেই কি আপনার ব্ল্যাক প্যারাডক্সের পাইলোরাসের ধারণাটা পেয়েছেন? 

জুঞ্জি ইতো: আসলে পাইলোরাসের লিখিত জাপানিজ হচ্ছে ইউমোন, কাঞ্জিতে যেটার অর্থ দাঁড়ায় ভূত, তাই ব্যাপারটা আমাকে ভাবিয়েছে। 

বেন কে: আচ্ছা, তাহলে তো এটা বলাই যায় যে, মেডিক্যাল স্কুলের জ্ঞানও আপনার মাঙ্গার উপর বিশেষভাবে প্রভাব ফেলেছে?

জুঞ্জি ইতোঃ হ্যাঁ, তা-ও বলতে পারেন। 

বেন কে: আর তারপর আসে ফ্রাঙ্কেনস্টাইনের কথা… 

জুঞ্জি ইতো: ডেন্টালে থাকাকালীন আমি দেখেছিলাম এবং শিখেছিলাম বটে যে, কীভাবে অত্যন্ত দক্ষতার সাথে দাঁতগুলোকে কাটা হয়ে থাকে এবং সেসব গর্তকে কীভাবে পূর্ণ করা হয়ে থাকে। এই জ্ঞানগুলোই আমি আমার ফাঙ্কেনস্টাইন মাঙ্গায় ব্যবহার করেছি।

Image Source: animenewsnetwork.com

বেন কে: আপনার মাঙ্গা নিয়ে আরো কিছু কথা বলি। আপনার অন্যতম জনপ্রিয় এবং আপনার অভিষেকও বলা যায় বটে, টোমি মাঙ্গার বলছি। বাস্তব জীবনের কোনো অভিজ্ঞতার আলোকে করেছেন কি? 

জুঞ্জি ইতো: না। তবে, যখন আমি কলেজে ছিলাম, তখন রোড এক্সিডেন্টে আমার একজন সহপাঠী মারা গিয়েছিল। এই ব্যাপারটা আমাকে বেশ আহত করেছিল যে, একটা ছেলে যার পুরোটা জীবন বাকি পড়ে আছে আচমকাই সে এই দুনিয়া থেকে উধাও হয়ে গেল। এবং তখন আমার এমন একটা অনুভূতিও হয়েছিল যে, ছেলেটা হয়তো কোনো একদিন ফিরে আসবে। পরবর্তীতে এটা নিয়ে আমার কাজ করার ইচ্ছে ছিল। এই চিন্তাকেই আমি কাজে লাগিয়েছি আমার মাঙ্গায়। শুধুমাত্র ছেলেটার জায়গায় মেয়েটাকে বদল করেছি। একটা মেয়ে মারা গেছে কিন্তু হঠাৎ করেই দেখা গেল যে, মেয়েটা ফিরে এসেছে এবং এমনভাবে চলাফেরা করছে যেন কিছুই হয়নি। ব্যাপারটা কেমন অদ্ভুত না? 

বেন কে: আমি নিজেও টোমি পড়েছি। যেকোনোভাবেই মেয়েটা মারা যাক না কেন, মেয়েটা আবারো ফেরত আসে। টোমিকে তো তাহলে অমরত্ব দিয়েছেন আপনি? ভালো কথা, মেয়েরা এই চরিত্রকে কীভাবে নিয়েছে? 

জুঞ্জি ইতো: আমি মনে করি, প্রত্যেক মানুষেরই অমরত্বের দরকার। আর তাছাড়া, নারীদের দরকার সর্বোচ্চ স্বাধীনতা। আপনার কি মনে হয় না যে টোমি স্বাধীন। যখন ইচ্ছা মরছে, যখন ইচ্ছে ফেরত আসছে, যখন ইচ্ছে পুরুষদের ডাকছে, অর্থাৎ যা ইচ্ছে তা-ই কিন্তু করতে পারছে। আর হ্যাঁ, অনেক পাঠকেরই চিঠি পাই আমি যে তারা ধীরে ধীর টোমি হয়ে যাচ্ছে। হা হা হা। 

দ্য এনিগমা অফ আমিগারা ফল্ট মাঙ্গা; Image Source: villains.fandom.com

বেন কে: আপনার সবগুলো কাজের মধ্যে আপনার কাছে সেরা এবং পছন্দের কাজ কোনগুলো? 

জুঞ্জি ইতো: “লং ড্রিম” “দ্য হ্যাঙ্গিং বেলুন” এবং “দ্য এনিগমা অফ আমিগারা ফল্ট”। আসলে বড় রচনা লেখা আমার পক্ষে বেশ কষ্টসাধ্য; বরং ছোট রচনা লিখতে গেলে ভেতরে একধরনের আনন্দ পাই। তাই এই তিনটা আমার কাছে সেরা।

বেন কে: এতক্ষণ তো সব অতীত আর বর্তমান নিয়েই কথা হলো, কিন্তু ভবিষ্যৎ সম্পর্কে তো কিছুই জানা হলো না। মাঙ্গার উপর নির্ভর করে সিনেমা আর টিভি সিরিজ হয়ে গেছে; আচ্ছা, ধরুন মাঙ্গার কাহিনী নির্ভর ভিডিও গেমস নির্মাণ কিংবা থ্রিডি ভিউয়ার এক্সপেরিয়েন্স এই ধরনের কিছু? 

জুঞ্জি ইতো: মাঙ্গার ব্যাপারটা আসলে আমার কাছে ভিন্ন- মাঙ্গার জন্য আমি নিজেকে উজাড় করে দিতে পারি। তবে সামনে বেশ কিছু ছোট ছোট মাঙ্গা করার ইচ্ছে আছে। বড় বা সিরিজ করার কথা আপাতত ভাবছি না। কিছু আর্টবুকের কাজও করবো। হ্যাঁ অবশ্যই, ভিডিও গেমস হলে তো কোনো কিছু বলার অপেক্ষা রাখে না। আর থ্রিডি ভিউয়ারে আপনি সেই দৈত্যটার সাথেই হাঁটছেন যার গল্পটা আপনার হেডফোনে বাজছে। ভাবতে পারছেন ব্যাপারটা? 

জুঞ্জি ইতো অটোগ্রাফ দেয়ার সম;য়ে Image Source: grapee.jp

বেন কে: আগেই ভাবতে চাচ্ছি না- আশা করছি খুব দ্রুতই এসব নিয়ে আবারো আপনার সাথে কথা হবে। তবে আজকের শেষ প্রশ্নটা না করে থাকতে পারছি না। আপনার ব্যক্তিগত জীবনে কোনো কিছুর প্রতি কি ভয় আছে, থাকলে সেটা কী নিয়ে? 

জুঞ্জি ইতো: আমি কি আগে বলিনি? যা-ই হোক, এটা হচ্ছে যুদ্ধ। আমি জানি, আমি হয়তো আশানুরুপ উত্তর দিতে পারিনি। কিন্তু যুদ্ধটা সবসময়ই মৃত্যুর ভয়কে ফেরি করে সাথে নিয়ে ঘোরে। আপনি জানবেন যে, বিপদ আপনার দিকে তেড়ে আসছে। অদ্ভুত আর অসম্ভব যেকোনো কিছুই ঘটতে পারে। আপনি নিরাপত্তাহীনতায় ভুগবেন, মৃত্যুর গন্ধ টের পাবেন। এছাড়া, আমি ঝিঁঝিঁ পোকা, তেলাপোকা, মাকড়সা, অদ্ভুতদর্শন পোকামাকড় এগুলো ভয় পাই। 

নোবুশি: তাহলে তো বলতেই হয় যে, আপনি আপনার নিজের মাঙ্গা পড়েও মাঝেমধ্যে ভয়ে কেঁপে ওঠেন? 

জুঞ্জি ইতো: হ্যাঁ তা বলতে পারি। আমার একটা মাঙ্গার চরিত্র আছে যার ঘাড় বিচ্ছিন্ন। তো ওটাতে এমন একটা দৃশ্য আছে যেখানে ঐ কাটা অংশটার মধ্যে একটা তেলাপোকা ঢুকে পড়ে। হা হা হা!

কিছু মাঙ্গা কমিক্স পড়তে ক্লিক করুন নিচের লিঙ্কে:

১) Bleach Manga Comics (All volumes)
২) Blue Exorcist Manga Comics (All volumes)

This article is in Bangla language. It's about the Japanese horror Manga legend Junji Ito & his works. 

Necessary references have been hyperlinked inside the article. 

Feature Image: grapee.jp

Related Articles