ডাইনি বুড়ি নামক চরিত্রটার সাথে আমাদের বিলক্ষণ পরিচয় আছে। ছোটবেলা থেকেই আমরা ডাইনিদের গল্প শুনি। ওরা কামরুপ কামাক্ষা থেকে মন্ত্র তন্ত্র শিখে এসেছে, বিবস্ত্র হয়ে গোটা একেকটা গাছ নিয়ে বাতাসে উড়ে বেড়ায় এমনতর আজগুবি কাহিনী নিয়ে চমৎকার সব গল্প বাংলা সাহিত্যে অনেক আছে। তারাশংকর বন্দোপাধ্যায় তো ডাইনিদের নিয়ে দু’টি খাসা গল্প লিখে গিয়েছেন। তারাবাবুর ডাইনিরা স্রেফ চোখের দৃষ্টি দিয়েই মানুষের ভবলীলা সাঙ্গ করে দিতে পারতেন।

তা ডাইনি ব্যাপারটা আমাদের একচ্ছত্র সম্পত্তি নয়। পৃথিবীর সব নৃগোষ্ঠী্র লোককথাতেই এরকম চরিত্রের দেখা মেলে। এমনই একটি চরিত্র হচ্ছে বাবা ইয়াগা।

বাবা ইয়াগার আবাস

কোথায় থাকেন বাবা ইয়াগা? সেক্ষেত্রে আমাদের নজর ফেরাতে হবে উত্তর দিকে। আমাদের পরিচিত পরিমণ্ডল ছেড়ে আরো বহু মাইল দূরে।

পূর্ব ইউরোপ। বিস্তীর্ণ অঞ্চল জুড়ে এখানে থাকে স্লাভিক জনগোষ্ঠীর মানুষ। এই স্লাভরা আবার পূর্ব স্লাভ, পশ্চিম স্লাভ, দক্ষিণ স্লাভ- এমন নানা ভাগে বিভক্ত। এর মধ্যে রুশ জাতির লোকেরা পড়েছে পূর্ব স্লাভ জনগোষ্ঠীর মধ্যে। আমাদের বাবা ইয়াগা থাকেন এই রুশ জাতির সুবিশাল আবাস ভূমিতে ছড়িয়ে থাকা গহীন সব বনের মধ্যে। যদিও পোলিশ এবং বুলগেরীয়সহ অন্যান্য স্লাভ দেশীয় লোককথাগুলোতেও তার কথা পাওয়া যায়।

বাবা ইয়াগা; Source: Myth & Moor

কেন এই নাম?

বাবা ইয়াগার নাম শুনলে বাংলাভাষীদের ধন্দে পড়ে যাওয়া স্বাভাবিক। ‘বাবা’ শব্দটার তো আলাদা অর্থ আছে বাংলা ভাষায়। তবে রুশী বুড়ি বাবা ইয়াগার নামের অর্থ পুরোটাই আলাদা। হরেক রকমের স্লাভ ভাষায় হরেক রকমের অর্থ করা যায় বলে আমরা প্রধানত রুশ ভাষাতেই আমাদের দৃষ্টি সীমাবদ্ধ রাখবো।

কিছু কিছু শব্দ আছে না যেগুলো শুনলে পুংলিঙ্গ আর স্ত্রী লিঙ্গ আলাদা করা যায় না? এই যেমন শিশু। শিশু বললে ছেলে ও মেয়ে উভয়ের কথাই মনে হতে পারে। বাবা ইয়াগার ‘বাবা’ এমনই একটি লিঙ্গহীন শব্দ। তবে খাস রুশীতে ‘বাবা’ শব্দটার আক্ষরিক অর্থ করা যেতে পারে দিদিমা বা দাদী।

আর ইয়াগা অর্থ? নানা ভাষায় ইয়াগার নানা অর্থ আছে। তবে মোটামুটিভাবে বলা যেতে পারে- রাগ, নৃশংসতা, আতংক ইত্যাদি যেকোনো কিছু বোঝাতেই ইয়াগা শব্দটা পারঙ্গম। এর আরেকটা অর্থ হতে পারে সাপ। সে যা-ই হোক, ভাষাতত্ত্ববিদদের কচকচানি এড়িয়ে আমরা বলতে পারি, বাবা ইয়াগার মানে হচ্ছে ‘রাগী দিদিমা’। প্রধানত পূর্ব আর দক্ষিণী স্লাভদের মধ্যেই বাবা ইয়াগার কথা শোনা যায়। পশ্চিমী স্লাভদের জেজিবাবা নামের আরেকটি নিজস্ব দিদিমা আছেন। তিনিও অনেকটা বাবা ইয়াগার মতোই। হতে পারে প্রাচীনকালে দুজনে একই চরিত্র ছিলেন। অন্যান্য স্লাভ জাতিদেরও বাবা ইয়াগা সদৃশ দিদিমা আছেন। বুলগেরিয়ার গোর্শকা মাজকা (বনের মা), সার্বিয়ার বাবা করিজমা, ক্রোয়েশিয়ার বাবা রোগা, হাঙ্গেরির ভাসোরু বাবা এবং রোমানিয়ার মুমা পাদুরি অনেকটা একই চরিত্র বলা চলে। ১৭৫৫ সালের রুশী ব্যাকরণ বইয়ে প্রথম প্রাতিষ্ঠানিকভাবে বাবা ইয়াগার অস্তিত্ব স্বীকার করে নেওয়া হয়, যদিও তার বিষয়ে বহু শত বছর ধরেই গল্পগাথা প্রচলিত আছে।

বাবা ইয়াগার হালচাল

প্রাচীন রুশ বর্ণনা ঘেটে দেখা যাচ্ছে, আমাদের বাবা ইয়াগার বাস গহীন বনে। লোকালয় থেকে অনেক দূরে। সেখানে সচরাচর মানুষের পা পড়ে না। ঘুরে বেড়ায় যতসব মস্ত মস্ত ভাল্লুক আর নেকড়ের দল। এহেন ভয়াল জঙ্গলের মাঝে একটু ফাঁকা জায়গায় বাবা ইয়াগার বাড়ি। তা সেটাও বড়ই বিদঘুটে। স্রেফ একটা মুরগীর পা। আর সেই মুরগীর পায়ের ওপরে লাট্টুর মত বনবন করে ঘুরে একটা কুড়েঘর। কুড়েতে কোনো দরজা-জানালার বালাই নেই। মেঝেতে লুকনো এক ফুটো দিয়েই কেবল প্রবেশ করা যায়। বাবা ইয়াগা সেই কুড়েঘরে থাকেন।

বাবা ইয়াগার কুড়ে; Source: youtube.com

বাবা ইয়াগা দেখতে কেমন? কেমন আবার। ডাইনি বুড়ি যেমন হয় তেমনই। শতচ্ছিন্ন জামাকাপড়, হদ্দ ময়লা, মাথায় শণের মতো চুল, প্যাকাটির মত হাত-পা, ইস্পাতের দাঁত। সব মিলিয়ে খুব একটা মনোরম নন। আর দশটা রুশী মানুষের মতো বাবা ইয়াগার বাসাতেও আছে প্রকান্ড এক চুল্লী। উনি সেটার ওপরে হাত-পা ছড়িয়ে শুয়ে থাকেন। লম্বা নাক গিয়ে ঠেকেছে বাড়ির ছাদে। পা গিয়ে পড়েছে চৌকাঠে। মাঝে মধ্যে একটু হাওয়া খাওয়ার শখ হলে বুড়ি বেরিয়ে পড়েন স্রেফ একটা হামানদিস্তা নিয়ে। তা সে হামানদিস্তাও আকারে বিশাল বড়। ইয়াগা তাতে চড়ে ঘুরে বেড়ান। কখনো কখনো আবার ঘরের ঝাঁটাতেো চড়ে বসেন। সংগে প্রায়ই দেখা যায় পোষা একটা দাঁড়কাককে। অনেক গল্পে দেখা যায়, বাবা ইয়াগার বাসার চারপাশে মানুষের হাড়ের বেড়া, তাতে মশাল জ্বলছে। এরই ফাঁকে ফাঁকে খুটিতে গাঁথা রয়েছে নরমুণ্ডু।

বেশ ভীতিপ্রদ চরিত্র এই বাবা ইয়াগা; Source: pinterest

বাবা ইয়াগার পরিবার পরিজন নিয়ে বিশেষ কিছু জানা যায় না। তবে অনেক গল্পে দেখা যায় তার দুটি বোন আছে। ভয়াল নাগপুত্র জমেই গরিনিচ সম্পর্কে তার বোনপো হয়। আবার এক গল্পে দেখা যায় আন্দ্রেই নামক জনৈক রুশীর সাথে বাবা ইয়াগার মেয়ের বিয়ে হয়েছে। কালো, লাল আর সাদা রঙ এর তিন রহস্যময় ঘোড়সওয়ার দিদিমাকে সাহায্য করে। এরা যথাক্রমে রাত, সূর্য আর দিনকে নির্দেশ করে। এছাড়া বাতাসে ভেসে থাকতে পারে এমন তিনজোড়া হাত তার কাজকর্ম করে দেয়। বলা হয়, তার কাছে আছে মৃতকে বাঁচিয়ে তুলতে পারার শক্তিশালী এক দাওয়াই- মন্ত্রপূত পানীয়।

বাবা ইয়াগা চরিত্র কেমন

বাবা ইয়াগাকে শুরুতেই ডাইনি বুড়ি গোত্রীয় বলে দেওয়ায় তার চরিত্র যে বিশেষ হিতকর হবে না, সেটা বোঝা যায়। তবে বাবা ইয়াগা কিন্তু সব সময়ই খারাপ বেশে আসেন না। হ্যাঁ, এটা ঠিক, কোনো পথভুলো রুশী আচমকা ওনার বাসাতে গেলে তিনি বঙ্গীয় ডাইনিদের মতোই হাউ মাউ খাউ জাতীয় হুংকার দিয়ে তেড়ে আসেন। তবে একবার বুড়িকে সামলে নিয়ে দরকারের কথাটা খুলে বললে অনেক সময় দেখা যায় তিনি অনাহূত অতিথিকে গোসল করিয়ে চর্ব্য-চোষ্য-লেহ্য-পেয় এর ব্যবস্থা করবার জন্য উতলা হয়ে পড়েছেন। শুধু তা-ই না, অতিথি কিসের সন্ধানে বন জঙ্গল ঢুড়ে বেড়াচ্ছে সেটারও যথাযথ খোঁজ নিয়ে কোনো না কোনো উপায় বাতলে দেন। অনেক সময় একটা সুতার বল দিয়ে দেন। সেটা গড়াতে গড়াতে অতিথিকে লক্ষ্যের দিকে নিয়ে যায়। সব মিলিয়ে তার মধ্যে দয়া-দাক্ষিণ্যের কমতি নেই। সাক্ষাত দিদিমা বলা চলে। এই যেমন সওদাগর পুত্র ইভানকে রাজার রোষ থেকে বাঁচানোর বুদ্ধি বাতলে দেওয়ায় বেচারা সে যাত্রা পার পেয়ে গিয়েছিলো, মার‍্যুশকা খোঁজ পেয়েছিলো নিজের স্বামীর। বিশুদ্ধ মনের মানুষ দেখলে বুড়ি সাহায্য না করে থাকতে পারেন না।

দিদিমা হাওয়া খেতে বেরিয়েছেন; Source: visitrussia.org.uk

তবে রেগে গেলে এই বাবা ইয়াগাই ভয়ংকর। মানুষের মাংসে তার অরুচি নেই। মন যদি হয় কলুষিত, যদি থাকে কোনো খারাপ উদ্দেশ্য- তাহলেই কর্ম সারা। অতিথিকে তৎক্ষণাত কেটেকুটে রান্না চড়িয়ে দেন গহীন বনের বাসিন্দা এই বিদঘুটে দিদিমা। অনেক সময় হামানদিস্তায় পিষে গুড়ো করে ফেলেন দুষ্টু পথিককে।

তবে দয়ালু বা নিষ্ঠুর যা-ই হন না কেন, বাবা ইয়াগা যে জ্ঞানী- এ কথাটা অস্বীকার করবার হিম্মত কারো হবে না। পৃথিবীর সবকিছু নিয়েই তিনি কিছু না কিছু জানেন। বিচিত্র সব দায়ে ঠেকে মানুষ যায় তার কাছে। বাবা ইয়াগাও তাদের হরেক রকমের বুদ্ধি বাতলে দেন। এই যেমন সুন্দরী ভাসিলিসাকে কিভাবে ফেরত আনা যায় বা আপনি বাজা বাদ্য, রগুঢ়ে বেড়াল, নাচিয়ে হাঁস প্রভৃতি বিচিত্র বস্তুর সন্ধান তিনি দিয়ে থাকেন। সব মিলিয়ে ভালো মন্দ মিশিয়ে এক অদ্ভুত বৈপরীত্য দেখা যায় তার চরিত্রে।

অবশেষে

বাবা ইয়াগার মতো পুরাকথার চরিত্রগুলোর ভালো-মন্দ বিচার আসলে অসম্ভব। তবে প্রাচীন স্লাভ জাতির অনেক কিছুই বাবা ইয়াগার কাহিনীগুলো থেকে জানা যায়। বাবা ইয়াগার কুড়েটির কথাই ধরা যাক। অনেকের ধারণা, আদি স্লাভেরা মৃত মানুষকে পোড়ানোর জন্য এমনিধারা খুঁটির ওপরে বসানো কুড়েঘর ব্যবহার করতো।

বাবা ইয়াগা এবং অতিথি; Source: lidenz.ru

রুশদেশে বাবা ইয়াগা বরাবরই বেশ গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র। তাকে নিয়ে বাঁধা হয়েছে পিয়ানোর সুর, সোভিয়েত আমলে বানানো হয়েছে চলচ্চিত্র। রুশ লোকগাথার এই খুনখুনে বৃদ্ধাকে অনেকে প্রকৃতি দেবীর একটি প্রতিরুপ হিসেবেও কল্পনা করেন। প্রকৃতি যেমন পরিশ্রমী আর ভালো মানুষকে দু’হাত ভরে উপহার দেয় এবং লোভী লোকদেরকে দেয় চরম শাস্তি, বাবা ইয়াগার চরিত্রটি যেন ঠিক সেদিক লক্ষ্য রেখেই বানানো হয়েছে। শত শত বছর ধরে তাতে যোগ হয়েছে নানা উপাদান। দাঁড়িয়ে গিয়েছে এক বর্ণিল চরিত্র।

কাজেই কেউ যদি রুশ দেশের বিরাট বনগুলোতে যান, আর সেখানে কোনো এক সন্ধ্যা রাতে বার্চের বন ফুড়ে হামানদিস্তায় চড়ে এই ভয়ানক বুড়িকে উড়ে আসতে দেখেন, তাহলে ভয় পাবেন না যেন! আপনি যদি নিষ্কলুশ হৃদয়ের অধিকারী হন, রহস্যময়ী দিদিমা আপনাকে মাথায় তুলে রাখবেন। অবশ্য মনে অসৎ মন্ত্রণা থাকলে স্রেফ চুল্লীতে সেদ্ধ হওয়া ছাড়া কোনো উপায় নেই! এভাবেই ভালো-মন্দ, সু আর কু এর ধারণাগুলো নিয়ে টিকে আছেন রুশভূমির এই বিখ্যাত দিদিমা- বাবা ইয়াগা।

ফিচার ইমেজ: artstation.com