সিসিফাস: মৃত্যুকে ধোঁকা দিতে চেয়েছিল যে!

প্রচন্ড ক্ষেপে গেছেন মহাবিশ্বের অধীশ্বর। সামান্য রক্ত-মাংসের মরণশীল মানুষের কর্মকান্ডে আগেই বিরক্ত ছিলেন জিউস। কিন্তু এবার ধৈর্যের বাধ ভেঙে গেছে। দ্রুত ডেকে পাঠালেন মৃত্যুর দেবতা থ্যানাটোসকে। জিউসের তলব শুনে থ্যানাটোস দ্রুত তার দরবার প্যান্থিওনে এসে হাজির। জিউস তাকে করিন্থের রাজা সিসিফাসকে ধরে এনে টারটারাসে নিক্ষেপ করে ভয়ংকর শাস্তি দেবার আদেশ দিলেন। মর্ত্যের মানুষের জান কবচ করা থ্যানাটোসের নিত্যদিনের কাজ। আর একজন মানুষকে ধরে এনে শাস্তি দিয়ে মেরে ফেলা তো তার কাছে জল-ভাত। থ্যানাটোস দ্রুত প্যান্থিওন থেকে বেরিয়ে এসে পৃথিবীর দিকে যাত্রা শুরু করলেন। কিন্তু কী এমন করলেন সিসিফাস যে দেবরাজ তাকে এমন ভয়ংকর শাস্তি দেবার সিদ্ধান্ত নিলেন!

সিসিফাস ছিলেন করিন্থের রাজা। ভয়ংকর নিষ্ঠুর, বুদ্ধিমান ও ধুরন্ধর। কোনো দয়া-মায়া ছিল না তার মাঝে। তার রাজ্যে আসা পথিক বা নতুন লোককে হত্যা করে তিনি পৈশাচিক আনন্দ পেতেন। প্রতিনিয়ত তার এমন নিষ্ঠুর কর্মকাণ্ড বেড়েই চলছিল। তাই প্রথম থেকে জিউস তার উপর কিঞ্চিৎ বিরক্ত ছিলেন।

জিউস; Image Source: greeksaiyans

অপরদিকে জিউসের নারীপ্রীতি কথা তো সবারই জানা। ঘরে হেরার মতো সুন্দরী স্ত্রী থাকলেও মর্ত্যের সুন্দরী নারীদের উপর তার সবসময়ই নজর থাকত। পৃথিবীতে এমনই এক নারী ছিল এজিনা। জিউস তার চেহারা পাল্টে হেরার চোখ ফাঁকি এই এজিনার সাথে প্রেম করার চেষ্টা চালাচ্ছিলেন। এজিনার বাবা ছিলেন অ্যাসোপাস। তিনি মানুষ হলেও সাধারণ কোনো ব্যক্তি নন। তার বাবা ছিলেন স্বয়ং সমুদ্র দেবতা পোসাইডন। মেয়ের সাথে অন্য কারও এমন মেলামেশা তার একদমই পছন্দ ছিল না। তাই রেগে গিয়ে জিউস সোজা এজিনাকে অপহরণ করে লুকিয়ে রাখেন। দেবরাজের এই অপহরণ দেখে ফেলে সিসিফাস। 

মেয়েকে না পেয়ে তাকে খুঁজতে বের হন অ্যাসোপাস। করিন্থে এসে তার সাথে দেখা হয় সিসিফাসের সাথে। সিসিফাসের কাছে অ্যাসোপাস তার মেয়ে গায়েব হয়ে যাওয়ার ঘটনা খুলে বলে। এজিনার অপহরণের ঘটনা জানলেও এত সহজে বলার মতো পাত্র তো সিসিফাস নয়! তাই সে অ্যাসোপাসকে বলল,

“যদি তুমি যদি করিন্থে অফুরন্ত সুমিষ্ট পানির ঝর্ণা তৈরি করে দিতে পারে তবে তোমার মেয়ের খোঁজ আমি দিতে পারি।”

অ্যাসোপাস তার শর্তে রাজি হয়। এবং এই ঝর্ণার বিনিময়ে সিসিফাস অপহরণ কান্ডের কথা সম্পূর্ণ খুলে বলে। স্বর্গের সকল দেবতার পাশাপাশি হেরাও জিউসের এই ঘটনার কথা জেনে যান। আর জিউসের অগ্নি-দৃষ্টি এসে পড়ে সিসিফাসের উপর।

জিউস এবং হেরা; Image Credit: albertina.at

প্যান্থিওন থেকে পৃথিবীতে এসে করিন্থ রাজ্যে যেতে থ্যানাটোসের বেশি সময় লাগল লা। দরজার বিরাট পাখাওলা এক অবয়ব দেখে সিসিফাসও বুঝে গেল তার মৃত্যু হাজির। এই সুন্দর ভুবন ছেড়ে কে যেতে চায়? আর সিসিফাস তো ভাবতেই পারেনি এত দ্রুত মৃত্যু এসে উপস্থিত হবে। মৃত্যুকে ফাঁকি দিতে ভয়ংকর এক পরিকল্পনা করে বসলো করিন্থের রাজা। থ্যানাটোসকে দরজা খুলে ভেতরে ঢুকিয়ে হাতের কাছে যে ভারী বস্তু পেল, সেটা দিয়ে সজোরে আঘাত মৃত্যুদেবের মাথায়। থ্যানাটোস শিকল নিয়ে এসেছিল। সেই শিকল দিয়ে তাকে বেধে ফেলল সিসিফাস। 

সিসিফাসের স্ত্রী মেরোপে বাসায় ছিল না। বাসায় এসে সব শুনে তার চিন্তায় পাগল হবার দশা। মৃত্যুকে কি ফাঁকি দেওয়া সম্ভব! তার স্বামী ভুল করেছে। এটা বারবার শোনাতে লাগল সিসিফাসকে। কিন্তু কে শোনে কার কথা। সিসিফাস নিজের কথায় অনড়। এখনই মরে যেতে একটুও ইচ্ছা নেই তার। যা করেছে, ঠিক করেছে। যদি কোনো সমস্যা হয় তো তখন দেখা যাবে।

মৃত্যুর দেবতা শেকলবন্দী। তাই পৃথিবীতে আর মৃত্যু আসে না। মানুষ মরে না। বৃদ্ধ, শয্যাশায়ী মানুষগুলোও বেঁচে রইল অনেক দিন। এর মাঝে আচমকা যুদ্ধ শুরু হয়ে গেল গ্রিসের দুই নগরীর মাঝে। কিন্তু দুই পক্ষের ভয়ংকর যুদ্ধের মাঝেও কেউ মৃত্যুবরণ করল না। যুদ্ধদেবতা এরিস সন্দিহান হয়ে উঠল। দুই পক্ষ যুদ্ধ করছে। মানুষ ভয়ংকরভাবে আহত হচ্ছে কিন্তু মৃত্যু হচ্ছে না। ঘটনা কী? মৃত্যু কোথায়! থ্যানাটোস কোথায়! 

থ্যানাটোস; Image Source : blackwings.mharz.com

এরিস খোঁজখবর নেয়া শুরু করলেন। দ্রুতই তার কাছে খবর আসল থ্যানাটোসকে সর্বশেষ সিসিফাসের বাড়ির দিকে যেতে দেখা গেছে। কী ঘটেছে বুঝে গেলেন যুদ্ধদেব। দ্রুত সিসিফাসের বাড়ি গিয়ে মৃত্যদেবকে শেকলে বাঁধা অবস্থায় আবিষ্কার করলেন। তাকে মুক্ত করার পর সিসিফাসকে পাকড়াও করে থ্যানাটোসের হাতে তুলে দেন এরিস। দুই দেবতাকে খেপিয়ে তোলার ফল হাতে-নাতে পেলেন সিসিফাস। 

থ্যানাটোস এবার সিসিফাসকে বেঁধে পাতালের দিকে চললেন। কিন্তু যাওয়ার আগে ঠিকই এক চালাকি করে গেলেন। স্ত্রীকে বললেন, তার শেষকৃত্য অনুষ্ঠান বা সৎকারের ব্যবস্থা যেন না করা হয়!

থ্যানাটোস সিসিফাসকে আষ্ঠেপৃষ্ঠে বেঁধে নিয়ে চললো পাতাললোক টারটারাসে। সিসিফাসেরও ভাগ্য! পাতালে গিয়ে কীভাবে কীভাবে যেন সোজা হেডিসের সামনে গিয়ে পড়ল। পাতালের দেবতার সামনে হাঁটু গেড়ে শুরু হলো তার নাটক। নিজের ভুল স্বীকার করে সিসিফাস বলল,

“ভুলের সাজা ভুগতে রাজি আছি প্রভু। কিন্তু আমার স্ত্রী তো স্বামীর শেষকৃত্যানুষ্ঠানও করেনি। বউ দেবতাদের অপমান করেছে। এ কথা জেনে তো শান্তিতে অত্যাচারও সইতে পারবো না। অনুমতি দিন। ফিরে গিয়ে স্ত্রীকে শিক্ষা দিয়ে আসি। কথা দিচ্ছি, কাজ সেরেই ফিরে আসবো।”

হেডিস জানতো, আত্মারা মিথ্যা কথা বলে না। আবার সিসিফাসের স্ত্রীর এমন কান্ড দেখে সে মনে মনে বেশ রেগে গিয়েছিল। তাই হেডিস সিসিফাসকে অনুমতি দিলেন। এভাবেই তার আত্মা আবার পৃথিবীতে ফিরে এলো। 

চতুর সিসিফাস জানতেন, হেডিস যে পরিমাণে ব্যস্ত থাকে তার কথা মনেই থাকবে না। আসলে তা-ই হলো। হেডিস সিসিফাসের কথা ভুলে গেলেন। আর সিসিফাসও কোনোরকম ঝামেলায় না গিয়ে চুপচাপ পার করে দিল কয়েক বছর। নিজের বাড়ি থেকে বের হয় না, হলেও ছদ্মবেশ নিয়ে। হেডিস ভুলে গেলেও থ্যানাটোস কী আর সিসিফাসের কথা ভুলতে পারে! হুট করে একদিন কৌতূহল জন্ম নিল তার, পাতালে চললেন সিসিফাসের খবর নিতে। থ্যানাটোসের কথায় হেডিসের সব কথা মনে পড়ল। থ্যানাটোসকে বন্দি করার পর সিসিফাস তাকেও ধোঁকা দিয়েছে। রেগে আগুন হয়ে উঠলেন পাতাল দেবতা। 

হেডিস বসে আছে তার পাতালের রাজ্যে;  Image Source: Gods and Monsters

এবার হার্মেস চললেন সিসিফাসকে পাকড়াও করতে। তাকে ধরে এনে সোজা হেডিসের সিংহাসনের সামনে ছুঁড়ে মারল সে। সিসিফাসকে দেখে শীতল হাসি হেসে তাকে শাস্তির মাঠের দিকে নিয়ে গেল। প্রায় পাঁচশ ফুট খাড়া পাহাড়ের পাদদেশে রাখল তাকে। পাদদেশের পাশে রয়েছে একটা বিরাট বড় গোলাকার পাথর। তা দেখিয়ে হেডিস বলল,

“শাস্তি বুঝে নাও। এই পাথর যদি ঠেলে পাহাড়ের চূড়ায় নিয়ে যেতে পারো, তাহলে তোমার তোমার মুক্তি।”

ভয়ে থরথর করে কাঁপতে থাকা সিসিফাস স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে উত্তর দিল,

“প্রভু! আপনি দয়ালু।” 

মুচকি হাসি হেসে হেডিস বিদায় নেবার পরই সিসিফাস কাজে নামল। কিন্তু অচিরেই টের পেল, তাকে কী অসম্ভব শাস্তি দেওয়া হয়েছে। পাথর চূড়ার কাছাকাছি নিতেই তার শরীরের সকল শক্তি উধাও হয়ে যায়। আর তখনই সে পাথর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে নিচের দিকে গড়িয়ে পড়তে থাকে। আবার বিশ্রাম নেবারও সুযোগ নেই। থামলেই শুরু হয় ফিউরিদের চাবুক পেটা। তাই অনন্তকালের জন্য সিসিফাসকে পাহাড়ের ঢাল বেয়ে পাথর তুলতে হবে, কিন্তু কখনোই শীর্ষে পৌঁছাতে পারবে না।

অনন্তকালের জন্য সিসিফাসকে পাহাড়ের ঢাল বেয়ে পাথর তুলতে হবে ; Image Source: Artstation

সিসিফাসের থেকে শিক্ষা নিয়েছিল থ্যানাটোসও। এখন সে আর বলে-কয়ে পৃথিবীতে থেকে আত্মা সংগ্রহ করতে যায় না। আদেশ পেলে চুপিচুপি গিয়ে আত্মা নিয়ে চলে আসে সে। আরও একবার বন্দী হয়ে থাকার কোনো ইচ্ছা তার নেই।

সিসিফাসের শাস্তি পাবার গল্প তো শেষ! কিন্তু, গ্রীক পুরাণে বর্ণিত এই গল্প-গাথা কি কেবলই কাল্পনিক? সিসিফাসের এই শাস্তির কথা বাস্তব জীবনের সাথে তুলনা করা হয়েছে বার বার। যুগে যুগে বিভিন্ন জ্ঞানী ব্যক্তি সিসিফাসের এই কিংবদন্তির ব্যাখ্যা দেওয়ার চেষ্টা করেছেন।  খ্রিস্টপূর্ব প্রথম শতকের দার্শনিক লুক্রেটিয়াসের মতে,

“সিসিফাস হলো সেই রাজনীতি ব্যক্তি, যিনি ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য চিরকাল চেষ্টা করে গেছেন, কিন্তু কোনো দিন ক্ষমতায় যেতে পারেননি।”

আলবেয়ার কামু ‘দ্য মিথ অন সিসিফাস‘ বইয়ে এই কাহিনী অন্যভাবে ব্যাখ্যা দিয়েছেন। তিনি বলেন,

“সিসিফাস যখন পাথর ঠেলে তোলে, তখন ঐ কাজ সে হাসিমুখে করে। একটু আগে কী ঘটেছিল বা একটু পর কী ঘটবে, এটা তার ভাবনাতেই নেই।”

বিভিন্নজন এই গল্পের বিভিন্ন ব্যাখ্যা দিলেও এই পুরাণ-কাহিনী আসলে আমাদের চক্রাকারে বাধা জীবনের একটি অংশ। সিসিফাস আমাদের আশাবাদী হতে শেখায়। আর তার শাস্তি বলে উদ্দেশ্যটা সৎ কি না, কারণ উদ্দেশ্যের ওপর নির্ভর করে আমাদের ভবিষ্যৎ জীবনে কী অপেক্ষা করছে।

This article is in Bangla language. It is about greek myth character Sisyphus, he is famous because of his general trickery and twice cheating death and his eternal punishment.  

Feature Source :

1. Sisyphus

2. Sisyphus - Greek Mythology

3. Percy Jackson's Greek Gods Written by Rick Riordan.

Feature Image Source : 

 

Related Articles